Tell_me_who_I_am (#বলোতো_আমি_কে?) #পর্ব_২

0
2

#Tell_me_who_I_am
(#বলোতো_আমি_কে?)
#পর্ব_২
#আয়সা_ইসলাম_মনি
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
________________________________________☞
শারমিন ঠোঁটের কোণে ঈষৎ হাসি নিয়ে বলল, “ম্যাডাম একটা প্রবাদ আছে না; আগে দর্শনধারী, পরে গুণবিচারী। সৌন্দর্য কে না ভালোবাসে বলুন?”
মিরা কোনো উত্তর দিল না। শুধু একটি গভীর নিশ্বাস ফেলে মন থেকে বেদনাকে সরানোর চেষ্টা করল।
শারমিন আবার বলল, “ম্যাডাম, পৃথিবীতে কত রকম ফুল আছে বলুন! কিন্তু আমরা সেই ফুলটাই হাতে নিই, যা আমাদের চোখে সুন্দর লাগে। আপনিও কি তাই করেননি?”
মিরা মৃদু হাসির আড়ালে গভীর বেদনাকে লুকিয়ে বলল, “আপনার কথা ঠিক। তবে জানেন, আমার চোখে দেখা প্রতিটি ফুলই সুন্দর ছিল। তাই আমি হয়ত সৌন্দর্যের প্রকৃত অর্থ বুঝতে পারিনি।”
এই আলাপের মাঝেই আমান হোসেন কয়েদখানায় প্রবেশ করল।
শারমিনের দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে কর্কশ কণ্ঠে বলল, “কতদূর কাজ হলো শারমিন?”
শারমিন ধীরস্বরে মাথা নত করে উত্তর দিল, “জি স্যার, উনি স্বীকারোক্তি দিচ্ছেন।”
আমান শারমিনের কথায় একটু মাথা ঝাঁকিয়ে মিরার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। চোখ সংকুচিত করে ভারী কণ্ঠে বলল, “বড়লোকের বউ হয়েও খুন করতে যাওয়ার কী দরকার ছিল? তাও কিনা নিজের স্বামীকে! নাকি পরকীয়ার কোনো কেস?”

মিরা উত্তরহীন দৃষ্টি মেঝেতে নিবদ্ধ করে রাখে। তার এমন নিস্তব্ধতায় আমানের ভ্রূ কুঞ্চিত হলো।
তিনি ক্রুদ্ধ স্বরে শারমিনকে নির্দেশ দিলেন, “প্রত্যেকটি কথা রেকর্ড করবেন। হোক সে কারান চৌধুরির স্ত্রী বা আসাদ চৌধুরির বৌমা, ছাড় দেওয়া হবে না। যথেষ্ট সম্মান করা হচ্ছে। অন্য কেউ হলে এতক্ষণে…” বলে আমান উত্তপ্ত শ্বাস ফেলে থেমে গেল।
কিন্তু এর বেশি কিছু বলার সাহস করলেন না, কারণ মিরাকে কিছু বলার অর্থ চাকরিচ্যুত হওয়ার শঙ্কা।
আমান ক্রুদ্ধ মুখে বেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতেই মিরার ঠোঁট অতি মৃদু নড়ে উঠল, “ও কি বেঁচে আছে?”
মিরার প্রশ্ন শুনে আমান থমকে দাঁড়াল।
বিস্ময়ভরা চোখে পেছন ফিরে বলল, “কে? মিস্টার কারান চৌধুরি?”
মিরা চোখ নামানো অবস্থাতেই নীচু গলায় জবাব দিল, “হ্যাঁ।”

আমান একটু আড় হেসে বিদ্রুপের সুরে বলল, “বাবাহ! আপনার কি মনে হয় যেভাবে আঘাত করে ক্ষতবিক্ষত করেছেন, তারপরও কি তার বেঁচে থাকার কথা?”
এ কথায় মিরার মুখ বিষণ্নতায় ছেয়ে গেল। সহসা তার চোখ থেকে নিঃশব্দ অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। এটা অবলোকন করে আমান কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। কারণ কাল জেলে আসার পর থেকে ক্ষণকাল আগে পর্যন্তও মিরার চোখে এক বিন্দু জল দেখা যায়নি।
একটু পর আমান কঠোর স্বরে বলল, “এভাবে কেঁদে পুলিশের মন গলাতে পারবেন না। প্রতিদিনই আপনার মতো চার পাঁচটা কয়েদি দেখি। (থেমে শারমিনের পানে তাকিয়ে) শারমিন, ওনার মুখ থেকে বাকি কথা বের করুন। আমি রিপোর্টটা লিখে আসি।”
“ওকে স্যার।”

আমান প্রস্থান করলেন, কিন্তু মিরার অশ্রুধারা থামবার নয়। সে এমন কিছু শুনতে প্রস্তুত ছিল না। যাকে সে নিজের হাতে প্রাণনাশের চেষ্টায় আক্রমণ করেছিল, আজ তার জন্যই বুকের গভীরে মোচড় দিয়ে উঠল। মনে হলো, যেন স্বামীকে আঘাত করেনি, নিজেকেই ধ্বংস করে এসেছে।
শারমিন কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, “ম্যাডাম, কান্না করে কোনো লাভ হবে না। এখানে আপনার কান্নার কদর নেই। তার চেয়ে ভালো হবে আপনি ঘটনাটা খুলে বলুন।”
মিরা ডান হাতের উলটো পাশ দিয়ে চোখের জল মুছে, নিজের ভিতর থেকে উঠে আসা সব আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে বলল, “জি।”
তারপর ঢোক গিলে কণ্ঠ পরিষ্কার করে ধীরে ধীরে ঘটনার পুনরাবৃত্তি করতে শুরু করল।
___________
ঘড়ির কাঁটা রাত একটার ঘর ছুঁইছুঁই। মিরা শুয়ে আছে নিজের কক্ষে, কিন্তু নিদ্রা তার চোখের পাতায় স্পর্শ করছে না। মনে যেন অজানা এক অশান্তি।
বারবার এপাশ-ওপাশ করতে করতে সে ভাবে, “আজকে কি তবে ঘুম আসবে না? ওকে দেখার পর থেকেই সবকিছু যেন এলোমেলো লাগছে… ধ্যাত!”
অস্থির হয়ে উঠে বসে। খানিকক্ষণ বসে চার্জ থেকে খুলে ফোনটি হাতে নেয়। কারানের ছবিটি খুঁজে বের করে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। কখনো ছবিটি জুম করে কারানের গভীর নীল চোখ দুটো খতিয়ে খতিয়ে দেখে, আবার কখনো দূর থেকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
কিঞ্চিৎ হাসি ছড়িয়ে বলে ওঠে, “ব্লু আইজ হিপনোটাইজ তেরি কারদি অ্যায় মেইনু… আয়হায়! আমি তো গেলাম একেবারে!”
তারপর হঠাৎই চোখ ফিরিয়ে নেয়। ফের ফিসফিস করে বলে, “না, ওর চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকানো যাবে না।”
তবুও লুকোচুরি করা দৃষ্টিতে আবারও কারানের ছবি দেখতে শুরু করে। এবার মুখে এক চপল হাসির রেখা ফুটে ওঠে।
মনে মনে বলে, “এমন ভাব করছি যেন ও আমার পাশে বসে আছে, আর আমার এই পাগলামি দেখছে। আমার বাগদত্তা, আমি দেখব না তো কে দেখবে?”

মিরার ভাবভঙ্গিতে তখন এক শিশুসুলভ কৌতুক খেলে যায়।
“আচ্ছা বাবা শুধু একটাই ছবি দিল! আরও কয়েকটা দিতে পারত না? (থেমে) ওয়েট ওয়েট… ওর নিশ্চয়ই ফেসবুক আইডি আছে। আসাদ আঙ্কেলের ছেলে, সারনেইম তো চৌধুরিই হবে!”
এই ভাবনায় সে দ্রুত ফেসবুক খুলে অনুসন্ধানে মগ্ন হয়ে যায়। একটু পরই সবার উপরে কারানের প্রোফাইল দেখে মিরার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে ওঠে।
ভ্রূ উঁচিয়ে বলে, “বাবাহ, ফেমাস! আচ্ছা, উনি কি সেই কারান চৌধুরি, যাকে টিভিতে দেখেছি?”
প্রোফাইলের ছবিগুলো দেখতে দেখতে অবিলম্বে সে যেন নিজেকে অন্য এক জগতে খুঁজে পায়।
“ওহ, তার মানে এই কারানই আসাদ আঙ্কেলের ছেলে, সেই হট টপ বিজনেসম্যান কারান চৌধুরি!”

মিরার মুখে লজ্জার হালকা আভা ফুটে ওঠে। সারা রাত বসে বসে কারানের ছবিগুলো দেখতেই থাকে। তার মনপ্রাঙ্গণে আজ ফুটে উঠেছে অনাবিল বাসন্তিক ছোঁয়া।
তার হৃদয় আকুল হয়ে উঠেছে সেই পুরুষের জন্য, যার ছবি একে একে তার মনের কোণে কোণে জায়গা করে নিচ্ছে। অথচ এই অপরূপা নারী নিজেও জানে না যে, তার নিজের সৌন্দর্যই কতখানি অমোঘ। কিছুদিন পর তার বিয়ে, তার এই রূপের অধিকারী অন্য কেউ হবে। তখন হয়ত মমতাজের দীর্ঘস্থায়ী ভয়ের অবসান ঘটবে। কিন্তু এখানেই কি ভয়ের শেষ?
____________
প্রভাতে মমতাজ মিরার ঘরে এসে দেখে মিরা ফোনের দিকে মগ্ন, চোখ দুটো এক দৃষ্টিতে কী যেন দেখছে।
মমতাজ শীতল স্বরে ডেকে ওঠে, “মিরু।”
মায়ের ডাক শুনেই মিরা চমকে উঠে। দ্রুত চুলগুলো একটু ঠিকঠাক করে ঈষৎ হেসে বলে, “দাঁড়িয়ে আছো কেন মা? বসো।”
মমতাজ এসে মিরার পাশে বসে। কিছুক্ষণ চুপচাপ মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছুদিন পরই মেয়ে অন্য বাড়ির মানুষ হয়ে যাবে, এই ভাবনা মমতাজের বুকের ভেতর হাহাকার জাগিয়ে তোলে।
মিরা মায়ের কাঁধে মাথা রেখে নরম স্বরে বলে, “মা, কিছু বলছো না কেন? বকা দেবে না? বলবে না যে, এখনো শুয়ে আছি কেন?”
মিরার কথায় মমতাজ হালকা হাসে, কিন্তু মুখে গাঢ় বিষণ্নতা। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে, চোখের কোণে জমে থাকা জল আঁচলের মাধ্যমে মুছে মেয়ের দিকে আরও কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে।
তারপর কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে, “মা, পরশু তোর বিয়ের দিন ঠিক হলো। ভাবতেই কেমন লাগে; আমার মেয়ে এত বড় হয়ে গেল!”
মিরা মায়ের কথা শুনে আবেগে আপ্লুত হয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, “মাআআ, এমনভাবে বলো না তো! তাহলে আমি কিন্তু বিয়ে টিয়ে করছি না।”

মমতাজ মেয়ের মাথায় স্নেহভরে হাত বুলিয়ে বলে, “মেয়ে হয়ে জন্মেছিস রে। কোনো না কোনোদিন তো স্বামীর সংসার করতেই হবে।”
তারপর কিছুটা থেমে স্বপ্নালু স্বরে বলে, “জানিস মিরু, আমি এক শ্যামপুরুষের প্রেমে পড়েছিলাম। গভীরভাবে প্রেমে পড়েছিলাম।”
মিরা মায়ের বুক থেকে মাথা তুলে বিস্মিত স্বরে বলে, “বাবা?”
মমতাজ মৃদু হাসে, তারপর মনের গভীর থেকে বলে, “তোর বাবা যদি আমাকে বন্দিনী করেও রাখত, তবুও আমি সারাজীবন তার সেবায় নিজেকে নিবেদিত করতাম। বিয়ের পর থেকে তোর বাবা যে গ্লাসে পানি খেত, আমি সেই গ্লাসের তার ঠোঁট ছোঁয়া অংশ থেকে পানি পান করতাম। তোর বাবা যখন খাওয়া শেষে হাত ধুতে যেত, আমি তার প্লেটে পড়ে থাকা চাবানো হাড়টাও পুনরায় চিবাতাম। আর যেই নিমঠাল দিয়ে তোর বাবা মিসওয়াক করত, আমি সেটি দিয়েই মিসওয়াক করতাম। সোজা কথা, তোর বাবা যদি কোনোদিন জানতে চায়; আমার জীবনে তার জন্য কী আছে, সেদিন আমি আমার বুক চিড়ে তাকে দেখিয়ে দেব। আমার সমস্ত সত্তা দিয়ে শুধু তাকে ভালোবেসেছি।”
এই কথাগুলো বলে মমতাজ একটি চাপা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। মনের গভীরে পুঞ্জীভূত সবকিছু উজাড় করে দিলেন নিঃশেষে।

মমতাজ ঈষৎ হাসি ধরে রেখে বলেন, “কিছু বুঝলি?”
এদিকে মিরা মায়ের কথাগুলো শুনে অশ্রুসজল চোখে তাকিয়ে রইল। তার কণ্ঠস্বর থেমে গেছে কিন্তু হৃদয়ে তোলপাড় চলছে।
মমতাজ হালকা হেসে আবার বলেন, “তুই আর কারানও একদিন এমনই ভালোবাসার গল্প লিখবি, দেখিস।”
মিরা লজ্জা পেয়ে একটু হেসে নিল। তারপর বলে, “কিন্তু মা, বিয়েটা এত তাড়াতাড়ি কেন ঠিক হলো? আরও কিছুদিন সময় নেওয়া যেত না?”
মমতাজ মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বলেন, “ছেলেপক্ষ থেকে এটাই জানানো হয়েছে রে। আমি তোর বাবাকে সময় নিতে বলেছিলাম। কিন্তু তোর বাবা বলল, ছোটবেলা থেকে চিনি ওদের, কি আর দেখব? তারা যখন বলেছে, পরশুই বিয়ে হোক। তাই আমিও আর আপত্তি করিনি।”
মমতাজ ফোন বের করে কারানের নম্বর মেসেজ করে মিরাকে পাঠিয়ে দিলেন। তারপর হেসে বললেন, “তুই চাইলে ওকে কল করতে পারিস।”

মমতাজের স্নেহদৃষ্টি মিরার ওপর স্থির থাকে। অর্থাৎ মেয়ে চলে যাওয়ার আগে তার প্রতিটি মুহূর্ত ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। খানিকটা সময় পর মমতাজ উঠে দরজা দিয়ে বের হতে যাবে, তৎক্ষণাৎ মিরার ডাক শোনা গেল, “মা, আজ রাতে আমার পাশে শোবে?”
মমতাজ কথাটা শুনেই ফিরে এসে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। আচমকা চক্ষুজোড়া পানিতে ভরে উঠল।
শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছে হেসে বললেন, “তুই না বললেও আমি আজ তোর সাথেই শুতাম মা।”
মা-মেয়ে একটু আবেগ ভাগাভাগি করায় ব্যস্ত, ঠিক তখনই মাহিমা তড়পাতে তড়পাতে কক্ষে ঢুকে পড়ল। তার মুখশ্রী ক্রোধে রক্তিম।
“মানি না! মানবো না!”
মমতাজ অবাক হয়ে বলে উঠলেন, “কি মানবি না? এত ছটফট করছিস কেন? আগে বস।”
মাহিমা ক্রোধ নিয়ে বলল, “কীসের বসাবসি। আগে বলো আপুর বিয়ে পরশু দিন কেন ঠিক করেছো?”
মিরা হেসে বলল, “বাবা বলেছে?”
“হুম, কিন্তু আমি এই বিয়ে মানি না! এত পরিকল্পনা করলাম, গান-নাচ, শপিং… কীভাবে একদিনে সব করব?”
মমতাজ শান্ত গলায় বললেন, “এই বিয়েটা ছোট করে করা হবে, শুধু পরিবারের লোকজন নিয়ে।”

মাহিমা আশ্চর্য হয়ে চোখ উল্টে বলে, “কি? নাআআআ। এটা হতেই পারে না। আমি সেনু, আদিবাদের সব বলে রেখেছি। ওদেরকে ইনভাইটেশন দিব। এত এত প্ল্যান করলাম। হবেই না।”
মিরা হেসে বলল, “তোকেই বা কে বলেছিল সবাইকে জানিয়ে বেড়াতে?”
মাহিমা ঠোঁট উল্টে বলল, “আমি কি জানতাম বাবা-মা আমাকে এইভাবে ঘোল খাওয়াবে?”
মমতাজ হেসে বললেন, “থাক, আর রাগ করিস না। মিরার বিয়ের অনুষ্ঠান যখন জমিয়ে করা হবে, তখন আনন্দ উল্লাস করিস। তাছাড়া মুসলমানদের বিয়ে ধুমধাম করে করতে হয় না। আর বিয়ে কম খরচে কম মানুষ নিয়ে করাই ভালো। তুই বড় হলে সব বুঝবি।”
অথচ মাহিমা রাগ করে মুখে বিরক্তির ভঙ্গি নিয়ে কোনো উত্তর না করেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
____________
রাতের নির্জনতা ভেদ করে মিরা মায়ের গা ঘেঁষে শুয়ে আছে। মন থেকে কোনোভাবেই সেই চিন্তাগুলো সরাতে পারছে না।
মনে মনে সে ভাবে, “আচ্ছা, আমার কি ওকে একবার কল করা উচিত? কিন্তু যখন জিজ্ঞেস করবে ‘কে আপনি?’ তখনই তো আমার সব গুলিয়ে যাবে। এমনিতেও তো অপরিচিতদের সাথে কথা বলতে গেলেই আটকে যাই, আর ওর সাথে কথা বলতে গেলে তো শরীরের প্রতিটি স্নায়ুতে ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট টিভির মতো ঝিরঝির শুরু হয়ে যাবে। থাক বাবা, এতদিন যেমন ছিলাম, তেমনই থাকি। যা হবে হালালভাবেই হবে।”
এ কথা ভেবে মিরা লজ্জায় মায়ের বুকের মধ্যে মাথা গুঁজে নেয়।
মমতাজ একটু নড়েচড়ে উঠে নরম কণ্ঠে বলে, “কি রে মিরু, ঘুমাচ্ছিস না কেন?”

মায়ের কণ্ঠ শুনে মিরা কোনোরকম রা না করে মাকে আরও দৃঢ়ভাবে জড়িয়ে ধরে। কিন্তু কথায় আছে, প্রেম যে কাঁঠালের আঠা, লাগলে পরে ছাড়ে না। মিরার মনের অবস্থা এখন সেইরকমই, ভালোবাসার বুনন তার মনের কোণে কোণে জমাট বেঁধে আছে। অনেকক্ষণ চেষ্টার পরও মিরার ঘুম আসছে না। সামনে থেকে অদেখা পুরুষটির ভাবনা, প্রতিনিয়ত কল্পনায় এসে ভেসে উঠছে। প্রতিটি চিন্তা একে একে মস্তিষ্কের সব কোষে জট পাকিয়ে দিচ্ছে।
মিরা হালকা আক্ষেপের সুরে মনে মনে বলে, “ধুর, বিয়ের আগে সামনাসামনি একবার ওকে দেখলামও না!”
এই বলে মায়ের হাতটা আলতো করে সরিয়ে দিয়ে আবার মায়ের বুকের কাছে গুটিয়ে যায়। যেন সেই বুকের উষ্ণতায় সে নিজের দুশ্চিন্তাগুলোকে ভুলে থাকতে চায়, তবু মনের ভিতরের সেই গভীর তোলপাড় তাকে প্রতিমুহূর্তে জাগিয়ে রাখছে।
____________
মিরা এবং কারানের বিয়ের আয়োজন ছিল সাদামাটা শুধুমাত্র দুই পরিবারের সদস্য মিলিয়ে পারিবারিক ভাবে, কিন্তু সেই সাদামাটা অনুষ্ঠানে লুকানো ছিল অজস্র আবেগের স্রোত।
আজ তাদের বাসর রাত; এক বিশেষ রাত, যেখানে তরুণীদের হৃদয়ে ভরে ওঠে স্বপ্নের ফুল। মিরাও সেই স্বপ্নের আবেশে বোনা, যাকে সে চিনেও উঠতে পারেনি, অথচ আজ থেকে তার সঙ্গে সারাজীবন কাটাতে হবে।
কক্ষটি প্রশস্ত এবং শুভ্র। সাদা রঙের চারপাশে থাকা আসবাবপত্রগুলোও শুভ্রতার সূতিকাগার। এমনকি কক্ষে অবস্থান করা ফুলদানিসহ ফুলদানিতে রাখা আরটিফিসিয়াল অর্কিড ফুলগুলোও সাদা। কক্ষটি জুড়ে সাদা স্ফুটিকের আলো ঝলমল করছে, একমাত্র বিছানার ওপর ছড়িয়ে থাকা লাল গোলাপের পাপড়িগুলোই রঙিন আবহ তৈরি করেছে। কক্ষের কোণে জ্বালানো একগুচ্ছ সাদা মোমবাতি ও জলে ভাসমান লাল গোলাপের পাপড়ি। সব মিলিয়ে রোমান্টিক পরিবেশে প্রেমের ভাস্কর্য তৈরি হয়েছে। এরই মাঝে আরও একটা রঙের দেখা মিলে। সে হলো শুভ্র রাজকীয় দানবাকৃতির বিছানার মধ্যখানে বসে থাকা সদ্য বিবাহিতা নববধূ মিরা।
তার শরীরে শোভা পাচ্ছে মেরুন লেহেঙ্গা। আর সোনালি ডিজাইনের সূক্ষ্ম রেখাগুলো মিরার সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। মিরার প্রতিটি নড়াচড়ায় লেহেঙ্গাটি তরঙ্গের মতো উঠছে-নামছে।

মাথায় ঘোমটা দিয়ে সে অপেক্ষা করছে কারানের জন্য। এদিকে তার অন্তরের গভীরে অসংখ্য প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে।
“এত লজ্জার কি আছে মিরা? ইটস নর্মাল। ইশশ, এক মুহূর্তের মধ্যে আপনাকে নিয়ে কত যে নিঝুম স্বপ্নে ভেসে যাচ্ছি। আর কতক্ষণ? এবার আমার স্বপ্নটাকে সত্যি করে দিন কারান সাহেব।”
মুহূর্তের জন্য থেমে গিয়ে আবার চিন্তা করে,
“আচ্ছা, উনি কি এসে হাত ধরবেন? নাকি কিস করবেন? নাকি হাই হ্যালো দিয়ে শুরু করবেন? হায় আল্লাহ!”
আকাশের মতো বিশাল ভাবনার মধ্য পরে নিজেকে সম্বোধন করে বলে, “এবার থাম মিরা। আর কত? ওর জন্য এই কয়দিন মাথাটাকে যে পরিমাণে খাটিয়েছি, তা তো পরীক্ষার আগের রাতেও খাটিনি,” বলে স্মিত হেসে নেয়।
আবার নিশ্বাস ছেড়ে আবেশমাখা স্বরে বলে, “কিন্তু ওকে তো খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। কখন আসবে, কখন আসবে? কারান বেটা আসোস না কেন? আর কত ওয়েট করাবি বউকে? ধুরো।”
এই অপেক্ষার মধ্যে স্বপ্নের লুকোচুরি আরও গভীর হচ্ছে। সে জানে না কি আছে সেই পুরুষের মধ্যে; যা তার তিন দিনের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।

এমন সময় সহসা দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করে কারান। তার শরীরে সাদা-কালো মিশ্রিত দাগকাটা টিশার্ট আর কালো ট্রাউজার, যা তাকে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
সে ঘরে প্রবেশ করেই আপেলে কামড় বসাতে বসাতে আড়মোড়া ভেঙে ভাবলেশহীনভাবে দুই পা ফাঁক করে ডিভানে বসে আপেল খাওয়ায় মনোযোগ দিল।
মিরা ঘোমটার ভিতর থেকে কারানকে আবছা আবছা দেখে অবাকের স্বরে বলে, “অদ্ভুত! যদিও মানতেই হবে উনি সত্যিই সুদর্শন পুরুষ ইভেন পিকের থেকেও বাস্তবে বেশি সুন্দর লাগছে। কিন্তু কথা হলো, বাসর রাতে শেরওয়ানি রেখে ট্রাউজার টিশার্ট কে পড়ে আসে?”

খানিক বাদে কারান আপেলের শেষ অংশে কামড় বসিয়ে উঠে হিমায়ক থেকে একটা বিয়ার বের করে টেবিলে রেখে ডিভানে শুয়ে পা নাড়াতে নাড়াতে ফোন স্ক্রল করতে লাগলো। কারানের এহেন কর্মকাণ্ডে মিরা আশ্চর্যের সহিত কারানের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে মিরা নিশ্চয়ই কারানকে অদ্ভুত কিছু কথাও শুনিয়েছে।
ক্ষণিকের পর কারান ডিভান থেকে উঠে মিরার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো।
তারপর টেবিলে রাখা দুধের গ্লাসটা ধরে গম্ভীর কণ্ঠে বলে, “So, are you satisfied now?”
মিরা ভ্রুকুঞ্চন করে বলে, “সরি?”
কারান তীর্যক তাচ্ছিল্যের সহিত হেসে বলে, “আমি মনে হয় স্প্যানিশ ভাষায় বললাম।”
মিরা একটু ভরকে গিয়ে ইশতিহারিত বোধ করলো। কিঞ্চিৎ নড়ে বসল।
তারপর শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “না মানে, আপনি কি খুশি না?”

মিরার কথা শুনে কারানের মুখে একটা ঠান্ডা হাসি ফুটে উঠল। তার চোখে ক্ষোভ আর তাচ্ছিল্যের মিশেল স্পষ্ট।
সে বিড়বিড় করে বলল, “আমার লাইফটাকে হেল করে জিজ্ঞেস করছে খুশি কিনা।”
একটু থেমে কারান নিজের রাগকে আর সংযত করতে না পেরে, হাতে ধরা দুধের গ্লাসটি নিচে ছেড়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে কাচের টুকরো ছিটকে সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ল। মিরা চমকে উঠে ঘোমটার আড়াল থেকে কারানের দিকে তাকিয়ে থাকে, তার এমন আচরণে মিরার বুক ধক করে উঠল।
কারান এবার হঠাৎ গর্জে উঠে বলল, “My freedom, my joy, and everything I once cherished have vanished, and it is you who bears the blame.”
(অনুবাদ: “আমার স্বাধীনতা, আমার আনন্দ এবং আমার সবকিছু যা আমি লালন করতাম, সব হারিয়ে গেছে, আর তার জন্য দায়ী তুমি।”)

মিরার হৃদয়ে তার কথাগুলো শীতল শূলের মতো বিঁধে গেল।
তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে মিরা সন্দিহান কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “মানে? আপনি কি বলছেন? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।”
কারান বিরক্তি নিয়ে নিশ্বাস ছেড়ে বলল, “আন-এজুকেটেড গার্ল। এনিওয়েস, এই বিয়েটা শুধু একটা বোঝাপড়া ছাড়া কিছুই না। তাই আমাকে নিয়ে হাসব্যান্ড মেটেরিয়াল কোন এক্সেক্টেশন রাখবেন না। ওয়েইট আ মোমেন্ট, হোয়াই অ্যাম আই অ্যাড্রেসিং ইউ ফরমালি? এই মেয়ে তোমার বয়স কত?”
মিরা কারানের এমন উৎকট আচরণে শুধু যে বিরক্ত বোধ করলো এমন নয়, সাথে মাথায়ও তরতর করে রাগ জেকে বসলো। নিজের বউয়ের সাথে কীভাবে আচরণ করা উচিত, সেটা না হয় শিখেনি। কিন্তু একটা মেয়ের সাথে কীভাবে আচরণ করতে হয় তাও কি জানা নেই এই লোকের?
মিরা দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আই অ্যাম টুয়েন্টি-টু ইয়ারস ওল্ড, আ থার্ড-ইয়ার ফার্মাসি স্টুডেন্ট অ্যাট জগন্নাথ ইউনিভার্সিটি।”
কারান তির্যক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “এই হ্যালোওও, আপনার বায়োডাটা কেউ শুনতে চায় নাই। যতটুকু জিজ্ঞেস করেছি ততটুকুই বলবেন। আর হ্যাঁ, তুমি আমার থেকে ছয় বছরের ছোট। (বাঁকা হেসে) বাচ্চা মেয়ে। I don’t know what my family saw in you. But don’t believe that your love can soften me, for I am not easily moved. Remember that.”

মিরা কিছু না বলে তাকে নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে দেখছিল, কিন্তু তার বুকের ভেতর একটা বিস্ময় আর অপমানের ঢেউ বয়ে যাচ্ছিল। প্রথম রাতের এমন অবমাননা কস্মিনকালেও কোনো মেয়ে ভাবতে পারে না।
মিরা ঢোক গিলে বিষাদময় কণ্ঠস্বর নিয়ে বলে, “When you have so many problems, why did you get married? (থেমে) And what is the meaning of ruining a girl’s life like this?”
কারান তার স্বাভাবিক ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলল, “I’m not obligated (বাধ্য) to explain myself to you. This marriage is just a family deal.”
মিরা কারানের এমন বাক্যের মানে বুঝতে চেষ্টা করলো। বিয়েটা একটা পারিবারিক ডিল, এটা কেমন ধারা কথা হলো? কিন্তু কারানকে এই প্রশ্ন করার আর প্রয়োজন বোধ করলো না। কাকেই বা করবে? করেও বা কি হবে? একটা অদ্ভুত উত্তর পাবে বা তাই পাবে কিনা সন্দেহ।
কারান ক্ষণিক পর বাতায়নের পাশে গিয়ে বাহিরের প্রকৃতি দেখতে দেখতে একটু আড় হেসে বলে, “Nevertheless, if you’d like, we can enjoy a night together in bed darling.”

মিরার রাগ এবার তার সমস্ত সত্তাকে ছাপিয়ে গেল। কারানের মুখ থেকে যে বাক্যটি বের হলো, তা যেন নিষিদ্ধ পল্লির মেয়েদের সঙ্গে কথোপকথনের বিকৃত প্রতিধ্বনি। একজন মানুষের বিয়ে যদি নিজের অনিচ্ছায় হয়েও থাকে, তাও হয়ত মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু এমন নির্লজ্জভাবে কি কেউ বলতে পারে, যে সে তার স্ত্রীর সঙ্গে রাত কাটাতে চায়। এ ধরনের কথা বলার আগে অন্ততপক্ষে একজনের বিবেকের দিকে তাকানো উচিত।
মিরা বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলল, “Pardon me Mr., I urge you to reconsider your words. What is your perception of Bangladeshi girls? We hold our self-respect in high regard.”
কারান হাসল, তার চোখে আর ঠোঁটে সেই বিদ্রূপটা ফিরে এলো।
মিরার সন্নিকটে এসে মুখের দিকে ঝুঁকে আস্তে আস্তে বলল, “স্ট্রেঞ্জ। ডিড আই ইনসাল্ট ইউ? আচ্ছা বাসর রাতে তাহলে কি করে? যদিও তোমার মতো মেয়ের সাথে আমার ঠিক যাবে না। তাই এইসব নাটক বন্ধ করো বুঝেছো?”
মিরা আর কিছু না বলে গা জ্বালানো দৃষ্টিতে বিছানায় গিয়ে বসলো।
শোবার প্রস্তুতি নিতেই কারান হঠাৎ বলে উঠল, “তোমার সাহস তো কম না! আমার রুমে আবার আমার বেডেই ঘুমাতে যাচ্ছো? এক্ষুনি রুম থেকে বের হয়ে যাও,” বলে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

মিরা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে মুখ ঘুরিয়ে বলল, “ভদ্রভাবে কথা বলুন। আমারও ইচ্ছে নেই আপনার সাথে ঘুমানোর।”
“ইয়াহ। নাও গেট আউট।”
মিরা রুম থেকে বের হতে যাবে তৎক্ষণাৎ পিছন থেকে কারানের ভয়ানক কণ্ঠস্বর শুনতে পেল, “আর হ্যাঁ, আই নেভার ওয়ান্ট টু সি ইয়োর ফেইস। কথাটা মাথায় ভালোভাবে ঢুকিয়ে নাও।”
মিরার কর্ণধারে কথাটা এসে পৌঁছাতেই অজানা ব্যথায় তার চোখের পাতা ভিজে গেল। মিরার হৃদয়ের ক্ষত তীব্র হয়ে উঠল, এক মুহূর্তেই তার সম্মানের প্রতিটি শিখা নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই নিশ্চুপ হয়ে পাশের কক্ষে চলে গেল।

মিরা চলে যাওয়ার পর কারান বিছানার উপর ছড়িয়ে থাকা সব গোলাপের পাপড়ি ক্রোধভরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। পাপড়ি ভাসানো স্ফটিকের জলের পাত্রটিও একঝটকায় আছড়ে মেঝেতে ফেলে দিল। এরপর ড্রয়ার থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটি সিগারেটে আগুন ধরিয়ে ধীরস্থিরভাবে ঠোঁটে তুলে নিল। ধোঁয়ার কুণ্ডলী ক্রমশ বাতাসে মিশে যেতে থাকলেও, তার মুখাবয়বের প্রতিটি ভাঁজে আক্রোশের ছায়া গভীর থেকে গভীরতর হয়ে ফুটে উঠল। অর্থাৎ তার অন্তর্গত আগুনকে আর কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না।
অন্য ঘরের বিছানায় নিঃশব্দে শুয়ে থাকা মিরার চোখ থেকে বেদনাবাহী নোনাজল ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ছে। যাকে নিয়ে স্বপ্ন ছিল অগণিত, খুশির আশা ছিল অপরিসীম, আর আকাঙ্ক্ষার শেষ ছিল না, সেই সমস্তকিছু মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। মানুষের চেহারার সঙ্গে যে তার মন বোঝা যায় না; এই সত্য আজীবন মিরার হৃদয়ে অমোচনীয়ভাবে গেঁথে থাকবে। নববধুরূপে সজ্জিত সেই মহিমান্বিতা মিরা সারারাত নির্ঘুম কাটিয়ে ক্রমাগত একাকী কান্নায় ভেঙে পড়ছে।
এই রাত তার কাছে কতটা বিষম, ভয়ংকর এবং অসহনীয় যন্ত্রণার; সেটা কেবল মিরাই জানে। পৃথিবীর নিয়ম বড় অদ্ভুত, যার উপর দিয়ে তুমি যত স্বপ্ন বুনবে, সেই স্বপ্নই শেষে তোমার হৃদয়ের ভার হয়ে দাঁড়াবে। আর এখন থেকে এই কঠিন, বদমেজাজি মানুষটির সঙ্গে এক জীবনের পথ পাড়ি দিতে হবে তাকে।
মিরা ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে নাক টানতে টানতে ব্যথাভরা কণ্ঠে বলে উঠল, “রাতটা তো অন্যরকম হলেও পারতো।”

কত গভীর ভাব লুকিয়ে রয়েছে এই সামান্য বাক্যে! নারী চিরকাল তার সুখের ঠিকানা খোঁজে স্বামীর মাঝে, আর প্রথম রজনির মাহাত্ম্য নারীর হৃদয়ে অন্যরকম দৃঢ়তা নিয়ে আসে; স্বপ্ন, প্রত্যাশা, অনুভূতির এক নিবিড় মেলবন্ধন। কিন্তু সেই বিশেষ রাতেই যদি নিজ স্বামীর কাছ থেকে এমন আঘাত আসে, তা কোনো নারীর পক্ষে সহনীয় হতে পারে না।
___________
ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই কারান নাশতা সেরে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায়। মিরা ফজরের নামাজ শেষে নিজ কক্ষটি গুছিয়ে রাখে। কারান চলে যাওয়ার পর সে তার কক্ষে গিয়ে বিশৃঙ্খল দৃশ্য দেখে দাঁড়িয়ে যায়। তবে এক গভীর নিশ্বাস ফেলে, বিছানা গুছিয়ে এবং ঘরটি পরিষ্কার করে রান্নার উদ্দেশ্যে নিচে নেমে আসে।
নিচে এসে দেখতে পেল, বাড়ির বড় বউ রোমানা আরামে সোফায় বসে পায়ের ওপর পা তুলে আঙুর চিবুচ্ছে। মিরা তার দিকে একবারও নজর না দিয়ে রসুইঘরে ঢোকার জন্য উদ্যত হলো।
ঠিক তখনই রোমানা কপাল কুঁচকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, “তা, কেমন কাটলো বাসর রাত? আমার হ্যান্ডসাম দেবর নিশ্চয়ই তোমাকে খুশি করতে পেরেছে?”

এই বিব্রতকর প্রশ্নে মিরা খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। পিছনে ঘুরে কথা এড়িয়ে অন্য কথায় নিয়ে বলে, “আপনাকে ভাবি ডাকলে হবে?”
রোমানার কণ্ঠে বিদ্রূপের সুর। ভ্রূ কুঁচকে সে বলে, “তুমি আমাকে কিছু না ডাকলেই বরং বেশি খুশি হবো। হতে পারো অনেক সৌন্দর্যের অধিকারী। কিন্তু মনে রেখো, আমি এই বাড়ির বড় বউ। তাই এই বাড়িতে আমার কথাই শেষ কথা। ভুলেও রাজত্ব নেওয়ার চেষ্টা করলে, তোমার সামনে আমি এমন ভয়ংকর রূপে আসবো, যা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না।”
মিরা অবাক দৃষ্টিতে রোমানার পানে তাকিয়ে রইলো। এমন সময় আসাদ চৌধুরির আবির্ভাব ঘটল।
সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে তিনি বললেন, “কী ব্যাপার? ভালোই তো, সকাল সকাল আমার দুই বৌমার আলাপ-আলোচনা জমে উঠেছে!”
মিরা মাথার কাপড় টেনে নিয়ে বিনম্রভাবে বলল, “আসসালামু আলাইকুম বাবা।”
আসাদ চৌধুরী হেসে বললেন, “ওয়া আলাইকুমুস সালাম মা। তা আমার ঘরের লক্ষ্মী এত সকালে উঠে পড়েছে কেন?”
রোমানা ভ্রূ কুঁচকে মনে মনে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে, “আদিখ্যেতা! কই, আমার বিয়ের পর তো এসব কিছু বলেনি।”
মিরা বিনয়ের সঙ্গে উত্তর দিল, “বাবা, নামাজের পর আর ঘুমাতে পারিনি। অভ্যাস হয়ে গেছে, তাই ঘুম আসে না। আমি আপনার জন্য খাবার তৈরি করছি, আপনি বসুন।”

মিরার কথায় রোমানার মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। তখনই সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকা ইসহাক ও তার স্ত্রী আশমিনিও মুখ চেপে হাসতে লাগল।
আশমিনি কটাক্ষের সুরে বলল, “এত বড় বাড়ির বউ হয়েছো, একটু তো ভাব রাখতে শেখো! শুধু রূপের জৌলুস থাকলেই হবে? এই বাড়ির বউরা কাজকর্ম করে না। তাহলে এতগুলো মেইড রাখা হয়েছে কীসের জন্য?”
মিরা বিনয়ের সঙ্গে চোখ নামিয়ে বলল, “ক্ষমা করবেন, বুঝতে পারিনি। তবে নিজের কাজ নিজে করতে ভালো লাগে।”
আশমিনি কঠিন স্বরে বলল, “তোমাকে এত কাজ করতে হবে না। তুমি বরং আমার ছেলে কারানের যত্ন নাও। তা কাল রাতে আমার ছেলেকে খুশি করতে পেরেছো তো, নাকি শুধু রূপ দেখিয়েই রাত পার করে দিয়েছো?”

আশমিনির এই অশালীন কথায় মিরা অবাক হয়ে কিছুটা লজ্জিত হলো। মনে মনে ভাবল, “এ বাড়ির সবাই-ই কি এমন অদ্ভুত? একে তো কাল রাতে স্বামীর রূপের প্রমাণ পেলাম, এখন আবার এরা!”
ইসহাক তখন আশমিনির কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, “এসব কী বলছো? চুপ করো!”
আসাদ দ্রুত বিষয়টি সামলাতে বললেন, “হয়েছে হয়েছে। সবাই খেতে বসো এবার। পিউ (মেইড) সবার খাবার রেডি করো।”
“জি স্যার, রেডি টেবিলে।”
সবাই টেবিলে খেতে বসে গেল। আরিয়ান ও আয়াশও এসে যোগ দিয়েছে। আরিয়ান বসেই তীর্যক নজরে মিরার দিকে তক্কে তক্কে বার বার তাকালো, মিরার প্রতিটি নড়াচড়া খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা করছে। মিরার চোখ তার চোখে পড়তেই, সে দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে খাওয়ায় মন দিল।

আয়াশ আশমিনির হাত নাচিয়ে বলে, “আম্মু ভাবিকে আমার সাথে নিয়ে যাই? প্লিজ প্লিজ। স্কুলের সবাই দেখুক আমার ভাবি কত্তগুলো সুন্দর!”
আশমিনি কড়া চোখে তাকিয়ে বলল, “কথা কম বলে খাওয়া শেষ করো!”
মায়ের রাগী কথায় আয়াশের হাসিমুখটি মলিন হয়ে গেল। আসাদ জিজ্ঞেস করলেন, “কারান কি অফিসে চলে গেছে?”
আরিয়ান গম্ভীর স্বরে জবাব দিল, “ও তো সবসময়ই আগে আগে যায়। বললাম আমি এই দিকটা সামলাতে পারবো। কখনো শুনেছে আমার কথা?”
“খাওয়া শেষ করে তুইও রওনা দে।”
____________
ঘড়ির কাঁটা রাত ৯টা ছুঁয়েছে। মিরা বিষণ্নতার গভীরে ডুবে গিয়ে রুমের কোণায় নির্বাক হয়ে বসে আছে। নিস্তব্ধ অন্ধকারে তার মন ভারী হয়ে উঠেছে।
নিজের মনে বলে উঠল, “সবাই কি আর স্বামীর সুখ পায়?”
কথাগুলো বলা মাত্রই তার ঠোঁট থেকে একটি গভীর, আহত নিশ্বাস বেরিয়ে এলো।
চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু সামলাতে না পেরে ভাঙা কণ্ঠে বলে উঠল, “মা, জানো খুব একা লাগে। এই বাড়ির সবাইকেই কেমন যেন অপরিচিত মনে হয়। একমাত্র বাবার সাথেই কথা বললে একটু স্বস্তি পাই। তাও যদি তোমার মেয়ে মিশুক হতো, তাহলে হয়ত এই নিঃসঙ্গতাটাও কিছুটা কম হতো।”
অকস্মাৎ দরজার বাইরে পায়ের শব্দ শুনে মিরা দ্রুত মাথায় ঘোমটা টেনে নিল। তার বুকের ভেতর এক অজানা শিহরন বয়ে গেল।
🍁চলবে??🍁

➤মূলত গল্পটা মজার ছলেই লিখেছিলাম, ভাবিনি এত মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে। তাই প্রথম ২১ টা পর্ব এক রকম ভুজুংভাজুং করে লেখা এবং প্রচুর ভুল রয়েছে; যদিও আমি সংস্কার করে ঠিক করার চেষ্টা করছি। তবে এই গল্পের মেইন কাহিনি #পর্ব_২২ থেকে শুরু। যা ডার্ক রোমান্সের জন্য পড়তে এসেছেন, প্রথম ২১ টা পর্ব ঝাপসার উপরে পড়ে ২২ থেকে শুরু করুন🖤

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here