#Tell_me_who_I_am
(#বলোতো_আমি_কে?)
#পর্ব_৩
#আয়েসা_ইসলাম_মনি
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
__________________________________________☞
কারান কক্ষে প্রবেশ করে আড়চোখে মিরার দিকে তাকিয়ে শুধালো, “বারো হাত কাপড়, তেরো হাত ঘোমটা দিয়ে রেখেছে,” বলেই গায়ের কোটটি খুলে পাশে রেখে দিল।
মিরা অজ্ঞাত কথার কোনো প্রত্যুত্তর দিল না। কারান দাম্ভিক চেহারায় একবার মিরার দিকে তাকিয়ে ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে চলে গেল। কারান চলে যাওয়ার পর মিরা কোটটি হাতে নিয়ে সঠিক জায়গায় রেখে দিল। এরই মধ্যে কারান তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে কক্ষে ফিরে এল।
ভারী কণ্ঠে বলল, “আমি ড্রেস চেঞ্জ করবো। চলে যাবে নাকি, তোমার সামনেই চেঞ্জ করবো?”
এবার মিরা লজ্জা পেয়ে মিনমিনে গলায় বলল, “আপনি কি এমনই?”
কারান কিঞ্চিৎ ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “কেমন?”
“না, কিছু না। আমি যাচ্ছি,” বলে পাশের সংযুক্ত কক্ষে চলে গেল।
কারান বাঁকা হেসে আওড়াল, “আমি কেমন সেটা আপনি উপলব্ধি করতে পারবেন না মিসেস চৌধুরি। আমি এক অদৃশ্য শক্তি; কেবল আপনার কল্পনার সীমানায় সীমাবদ্ধ নই। সেই সীমা পেরিয়ে, নীরবে আমি গভীর প্রভাব ছড়িয়ে দেই, যেমন অদেখা ঢেউ আঘাত হানে শান্ত জলে।”
এরপর দরজা আটকে জামাকাপড় পরিবর্তন করে একরঙা টিশার্টের সাথে বরাবরের মতো ট্রাউজার পরে নিল। এরই মধ্যে পিউ দরজায় ঠকঠক শব্দ করে।
কারান দরজা খুলে দিলে পিউ কুর্নিশ করে মাথা নীচু করে আহ্বান জানাল, “স্যার ডিনারের টাইম হয়ে গেছে।”
কারান ভাবলেশহীন ভঙ্গিমায় বলল, “যাও, আসছি।”
পিউ একটু আমতাআমতা করে বলল, “স্যার ম্যাম?”
কারান আর পিউয়ের কথায় কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে দরজা থেকে বেরিয়ে সামনের দিকে পা বাড়ালো।
পিউ কিছু একটা সন্দেহ করলেও চুপচাপ মিরাকে সম্বোধন করল, “মিরা ম্যাম।”
মিরা দরজা খুলে দিল। পিউ নতজানু হয়ে ফের বলল, “ডিনারের টাইম হয়ে গেছে ম্যাম। নিচে আসুন।”
মিরা হেসে কোমল গলায় বলল, “আচ্ছা তুমি যাও, আমি আসছি।”
মিরা নিচে নেমে দেখল, ইতিমধ্যে সবাই খেতে বসে গেছে। কিন্তু সে খেতে না বসে চুপচাপ পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
তৎক্ষণাৎ আশমিনি মিরাকে দেখে খেতে খেতেই ব্যঙ্গ করে জিজ্ঞেস করল, “তা, নতুন বউ কি পর্দা করা শুরু করেছ নাকি? এত বড় ঘোমটা দিয়ে রেখেছ কেন?”
মিরা বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে কী বলবে ভেবে না পেয়ে কারানকে উদ্দেশ্য করে বলল, “সে তার বউকে কাউকে দেখাতে চায় না। তাই ঘোমটা দিয়ে রাখতে বলেছে।”
এমন কথা কারানের কর্ণধার হতেই সে মিরার দিকে তাকালো। ততক্ষণে তার গলায় খাবার বাজতে শুরু করেছে, আর বাকিরা খাবার খাওয়া রেখে অভূতপূর্ব বিস্ময়ে কারানের পানে তাকিয়ে থাকে। কারানের এমন অদ্ভুত আচরণে সবাই হতবাক; কারান যে এমন কাজ করতে পারে এটা তাদের কল্পনাতীত।
রোমানা খেতে শুরু করে মুখ টিপে হাসতে থাকে।
এদিকে কারান কাশতে কাশতে অন্যদের দিকে তাকিয়ে বলে, “পানি দেও কেউ।”
পিউ তাকে পানি দিলে, সে তৃষ্ণা মিটিয়ে নিল।
আরিয়ান বাঁকা হেসে বিদ্রূপের ছলে মন্তব্য করে, “হ্যাঁআআ, বউ যদি অধিক সুন্দরী হয়, ঘরের মানুষের সামনেও পর্দা করতে বলে। যদিও আমি হলেও তাই-ই করতাম।”
আরিয়ানের কথায় রোমানার চোখ-মুখ ক্রোধে লাল হয়ে যায়।
রোমানা খাবার রেখে আরিয়ানের কাছে গিয়ে তেজস্বী কণ্ঠে বলে, “কি বলতে চাও তুমি? আমি কি সুন্দরী নই?”
আসাদ তখন কথার মোড় ঘুরিয়ে বলেন, “খাওয়ার মধ্যে বেশি কথা বলা হচ্ছে।”
রোমানা আর কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে গম্ভীর মুখে আরিয়ানের দিকে একবার তাকালো, আরেকবার মিরার পানে ফিরলো। অর্থাৎ বাড়ির বড়রা পাশে আছে বলে রাগের বহিঃপ্রকাশের সুযোগ পাচ্ছে না। কিন্তু ভিতরে ভিতরে রোমানা ক্রোধে দাউদাউ করে জ্বলছে।
আসাদ চৌধুরি ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করেন, “তাহলে কারান কি ঠিক করলি? হানিমুনে কোথায় যাবি?”
কারান ইয়র্কশায়ার পুডিংয়ের টুকরো মুখে পুরে বলতে থাকে, “ভাবছি, এখন থেকে কে.ছি হাউসে থাকবো। অফিসে যেতে সুবিধা হবে।”
আসাদ কারানের এই গা ছাড়া ভাব দেখে মনে মনে একটু বিরক্ত হলেও শান্তভাবে বলেন, “তোকে তো হানিমুনের কথা জিজ্ঞেস করলাম। তবে যাই হোক, তুই যা ভালো মনে করিস। যাচ্ছিস কবে?”
“কালকেই।”
আসাদ মিরার দিকে তাকিয়ে বলেন, “ও তাহলে প্যাকিং করা শুরু করুক।”
কারান চামচ প্লেটে রেখে কপাল কুঁচকে বলে, “কেন? ও কি আমার সাথে যাবে?”
এ কথা শুনে সবাই অবাক হলো। তবে রোমানার এসব কথায় কান নেই, সে ভাবলেশহীনভাবে খেতে ব্যস্ত। ইসহাক আশমিনির পাশে বসা। আশমিনি ইসহাকের দিকে একবার তাকালো।
ইসহাক আশমিনির নিকটবর্তী হয়ে মৃদুস্বরে বলে, “তুমি যেটা ভাবছো, আমিও সেটাই ভাবছি। কাজ করে করে কারানের মাথা খারাপ হয়ে গেছে, বুঝলে।”
তিনি একটু আড় হেসে নেন।
কিন্তু আশমিনি বুদ্ধিমতী। তার মনে কিছুটা খটকা লেগে যায়। আশমিনি মুখের খাবার ধীরে ধীরে চিবাতে চিবাতে ভাবনায় ডুবে যান।
“উঁহুঁ। কারান না ভেবে কিছু বলে না। তাহলে এই বিয়েতে ঘাবলাটা কি?”
এদিকে আরিয়ান হাসতে হাসতে বলে, “কে.ছি হাউসে তো যাচ্ছিস ছোটোখাটো হানিমুনের জন্যই। তা হানিমুন কি তুই একা একা করবি?” বলে সে আবার হাসতে থাকে।
আরিয়ান কিছুটা নির্বোধ, হুটহাট রেগে যাওয়ার অভ্যাসে অভ্যস্ত। কখন কি বলতে হয়, সেটাও সে জানে না। আবার কোন কথার কি মানে, তা বুঝতেও তার মাথায় জট পাকিয়ে যায়। অর্থাৎ কারান যেখানে বলেই দিয়েছে, সেখানে সর্বদা থাকার জন্য যাচ্ছে, তাও সে মধুচন্দ্রিমা নামক উলটো অর্থ বুঝে বসে আছে।
কারান আরিয়ানের কথার জবাব না দিয়ে শয়তানি হাসি হেসে মনে মনে আওড়ায়, “ও যদি আমার সব কিছু মেনে নিতে পারে, তবে যাক।”
এবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মিরার দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে পুনরায় মনে মনে বলে, “ম্যারিং মি উইল টার্ন আউট টু বি দ্য বিগেস্ট রিগ্রেট অফ ইয়োর লাইফ। জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড ইউ’ল সি।”
এর মধ্যে আসাদ মিরার পানে তাকিয়ে বলে উঠে, “মা, তুমি খেতে বসলে না?”
মিরা নরম গলায় বলে, “এইতো বাবা, খাবো। আপনারা উঠুন, তারপর।”
আশমিনি খাওয়া শেষ করে মিরার কাছে গিয়ে গম্ভীর মুখে বলেন, “এসব নিয়মকানুন এখানে খাটিও না। তোমারই ক্ষতি। যাও, খেতে বসো।”
কথা শেষ করে তিনি নিঃশব্দে উপরে উঠলেন। একে একে বাকিরাও আহার সমাপন করে নিজ নিজ কক্ষে চলে গেল।
মিরা এবার ঘোমটা খুলে কঠোর মুখাবয়বে ভারী কণ্ঠে বলল, “যে স্বামী বাসররাতে স্ত্রীর সঙ্গে অমন আচরণ করতে পারে, তাকে মুখ দেখানোর ইচ্ছা আমারও নেই। আপনার প্রথম আদেশ আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করবো। আপনি যদিও স্বামীর কর্তব্য পালন করেননি, আমাকে তো আমার স্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতেই হবে। কারণ, প্রত্যেকের পাপের ফল তাকে নিজেকেই ভোগ করতে হয়,” বলেই কষ্টমিশ্রিত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এরপর মিরা খাওয়ার জন্য প্লেট সাজাতে লাগলো।
এর মধ্যেই পিউ রান্নাঘর থেকে হুড়মুড়িয়ে এসে বলে, “আরে ম্যাম ম্যাম! কি করছেন? আমি বেড়ে দিচ্ছি। আপনি প্লিজ বসুন।”
মিরা হেসে বলে, “তোমার খাওয়া হয়েছে? আর ইভানা খেয়েছে?”
পিউ মাথা নীচু করে সরল কণ্ঠে বলে, “ম্যাম, আমরা মেডরা সবার শেষে খাই। আপনি খেয়ে নিন। দেন আমরা খাবো।”
মিরা হেসে বলে, “ওকে ডাকো। আজকে আমরা তিনজন একসাথে খাবো।”
“কিন্তু ম্যাম…”
“কোনো কিন্তু না, যেটা বলছি সেটা শোনো।”
পিউ হাসতে হাসতে কুর্নিশ করে ইভানাকে নিয়ে আসলো। মিরা চেয়ার থেকে উঠে নিজে ওদের খাবার বেড়ে দিল। তারা যদিও বারণ করেছে এবং বেশ ইতস্তত বোধও করেছে। কিন্তু মিরার এই সুন্দর ব্যবহারে তারা অবাকের সাথে খুশিও হলো। খাওয়া শেষ করে তিনজনে হাতে হাতে ডায়নিং টেবিল গুছিয়ে রাখলো। মিরা কাজের ফাঁকে মাঝে মাঝে তাদের সাথে কথা বলে অনেকটা পরিচিত হয়ে নিল।
অন্যদিকে আরিয়ান কক্ষে গিয়ে বিছানায় বসে ফোন টিপতে মনোযোগী হলো। রোমানা ডিভানে বসে অনেকক্ষণ আরিয়ানের দিকে ক্রোধে অগ্নিমুখী দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু আরিয়ানের হেলদোলহীন মনোভাব দেখে সে বেশ বিরক্ত হলো।
পরে আরিয়ানের কাছে গিয়ে, আরিয়ানের মাথার পিছনের চুল ধরে মাথা তুলে নিজের মুখশ্রীর দিকে তাক করে ক্রোধে চোয়াল শক্ত করে বলে, “ভালো করে দেখে বলো, আমি কি সুন্দরী নই?”
আরিয়ান রোমানার এমন আচমকা আচরণে আশ্চর্য হয়ে রাগান্বিত কণ্ঠে বলে, “দিনে দিনে বেশ বেয়াদব হয়ে গেছো রোমানা। চুল ছাড়ো।”
রোমানা বাঁকা হাসি দিয়ে বলে, “আমাকে ভালো কবে দেখলে তুমি? আর যা বলেছি, তার আনসার দাও।”
আরিয়ান টান দিয়ে রোমানাকে কোলের মধ্যে বসিয়ে রোমানার ঠোঁটে কামড় বসিয়ে বলে, “সুন্দরী না হলে কি আর এতদিন আরিয়ানের সাথে থাকতে পারতে? কিন্তু রহস্যটা আসলে অন্য জায়গায়; কীভাবে তুমি তার মনটাকে নিজের দিকে বেঁধে রেখেছ,” বলেই হেসে রোমানার গলায় মুখ ডুবাতে থাকে।
কিন্তু রোমানা সেদিকে অনুভূতিহীন হয়ে চোখ-মুখ কঠিন করে মনে মনে আওড়ায়, “তুমি যতই আমার কাছে এসে রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করো, আমি কিন্তু তোমাকে গভীরভাবে চিনি। তোমার প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি, প্রতিটি কথার ভেতরে যে সূক্ষ্ম রেখা নিহিত, তা আমার দৃষ্টি এড়ায়নি। আর আমার অগোচরে তুমি কী করো, তাও আমার অজানা নয়। কিন্তু তাও মাঝে মাঝে তোমার মুখোশের নিচে যে চেহারা, তা আমার কাছে রহস্যের মতো। এই রহস্য আমাকে গভীর চিন্তার অতলে টেনে নিয়ে যায়।”
___________
রাত প্রায় সাড়ে ১২ টার কাছাকাছি। ইসহাক মনোযোগী হয়ে কিছু রিপোর্ট দেখায় ব্যস্ত। আশমিনি কক্ষে ঢোকার পর থেকেই অস্থির, তিনি কিছু একটা গভীর চিন্তায় ডুবে আছেন। বিছানায় বসে বারংবার পা নাড়িয়ে যাচ্ছে।
ইতিমধ্যে ইসহাক কাজ করতে করতেই বলল, “কয়টা বাজে, কোনো খেয়াল আছে? ঘুমাচ্ছ না কেন?”
কথাটা আশমিনির কর্নকূহরে পৌঁছাতেই মস্তিষ্ক সজাগ হয়ে উঠল।
মুখের প্রকাশভঙ্গি পালটে গম্ভীর হয়ে সে প্রশ্ন করল, “তোমার কি কারান মিরার বিয়েটা স্বাভাবিক মনে হয়?”
ইসহাক ঠান্ডা গলায় বলল, “বুঝিনি।”
আশমিনি নড়ে চড়ে বসে ইসহাকের দিকে খানিকটা মাথা ঝুঁকে বলে, “সবসময় এত যে মাথা খাটাও, এসব নিয়ে কিছু ভাবলে না?”
ইসহাক কাজ করতে করতেই কপাল কুঁচকে বলল, “কি সব যা তা বলছো? কি বলতে চাও সোজাসাপটা বলো।”
“আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, এই বিয়ের ব্যাপারটায় ভাইয়ার কোনো উদ্দেশ্য আছে। তুমিই বলো, যেখানে চৌধুরি বাড়ির সবার বিয়ে এত ধুমধামে হয়েছে, সেখানে ওনার আদরের সন্তান কারানের বিয়েই এভাবে কোনো প্রোগ্রাম ছাড়া, রিলেটিভস ও ফ্রেন্ডসদের ইনভাইটেশন ছাড়াই বিয়েটা দিয়ে দিল? তাও কিনা এত জলদি জলদি!”
ইসহাক কাজ বন্ধ করে আশমিনির কাছে গিয়ে বলল, “কি বলতে চাইছো তুমি?”
“দেখো, ভাইয়া যতই বলুক, ইসলাম অনুসারে ধুমধামে বিয়ে দেওয়া উচিত নয় বা কারানের কাজের এক্সকিউজই দিক, তোমার কি কিছু সন্দেহ হয় না? আবার কারানের ব্যবহারটাও কেমন দেখেছো? যেন এই বিয়েটা করে ওর কোনো মাথা ঘামতি-ই নেই। অর্থাৎ বিয়ে করেছে, এই পর্যন্তই। আবার হানিমুনেও যাবে না। তোমার কি কিছুই অন্যরকম মনে হচ্ছে না?”
এবার ইসহাক দাড়িতে হাত বোলাতে থাকলো। কপালে কয়েকটা চিন্তিত তরঙ্গরেখা দৃশ্যমান। আশমিনির পানে তাকিয়ে ইসহাকও বিয়েটা নিয়ে একটু সন্দেহবোধ করলো।
আরেকদিকে সব ঠিকঠাক করে মিরা কক্ষে প্রবেশ করে দেখে ইতিমধ্যে কারান নিদ্রায় আচ্ছন্ন। মিরা গভীর একটা শ্বাস ছেড়ে আলো নিভিয়ে দিয়ে পাশের সংযুক্ত কক্ষে চলে যায়।
____________
এতটুকু বলে মিরা থেমে গেল। কারণ এখন থেকেই তার জীবনের অন্ধকার অধ্যায় শুরু হতে চলেছে।
শারমিন অধীর হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “ম্যাডাম থেমে গেলেন কেন? তারপর কী হলো, প্লিজ বলুন।”
মিরা একটু দম নিয়ে বলল, “এক গ্লাস পানি দিতে পারবেন? গলাটা শুকিয়ে যাচ্ছে।”
শারমিন তড়িঘড়ি করে পানি এনে দিল। মিরা পানি খেয়ে ঢোক গিলে বলল, “ধন্যবাদ। একটা কথা জানতে পারব? কারান চৌধুরি কি বেঁচে আছে? থাকলে এখন তার অবস্থা কেমন?”
তবে কথাটা বলতে গিয়ে গলায় বেশ একটা ধাক্কা খেল।
শারমিন মনে মনে সন্দেহ করে, ভ্রূ কুঁচকে নেয়। শারমিন নিজেই নিজেকে বোঝায়,
“এই গল্পের অন্তিম রহস্যের মোড়, যেভাবেই হোক আমাকে শুনতেই হবে। যে নারী কিনা নিজের হাতে স্বামীকে আঘাত করেছে, সেই-ই আবার এত উদ্বেগ নিয়ে তার বর্তমান অবস্থা জানতে চাচ্ছে? ব্যাপারটা স্বাভাবিক খুনের ঘটনা বলে মনে হচ্ছে না।”
এমন সময় আমান ঢুকে কাঠখোট্টা কণ্ঠে বলে উঠল, “বলা যাচ্ছে না বাঁচবে কিনা। কারান চৌধুরি এখন আইসিইউতে, লাইফ সাপোর্টে আছেন। বাঁচার সম্ভাবনা ফিফটি-ফিফটি।”
এ কথা শোনার পরই মিরার শ্বাস ধীরে ধীরে বেড়ে যেতে লাগল। তার চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হতে শুরু করল। মনে হলো অন্ধকার তাকে গ্রাস করতে আসছে, আর সে সেই অন্ধকারে ডুবে যাবে। কারান বেঁচে আছে, এই কথা শোনার অপেক্ষায় ছিল মিরা। কিন্তু আইসিইউ; এই কথাটা শুনেই তার মনের ভিতর মৃত্যু হিমশীতল স্পর্শ নিয়ে এলো। মিরা জানে, আইসিইউতে সেইসব মানুষদেরই রাখা হয় যারা বেঁচে থাকার শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে।
আমান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে পুনরায় বলে, “তবে কারান চৌধুরি যদি মারা যায়, ফাঁসির হাত থেকে আপনাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না, এটা নিশ্চিত।”
অথচ শারমিন মিরার গতিবিধি দেখে বলে, “স্যার ম্যাডামের কি যেন হয়ে…”
কিন্তু শেষ করার আগেই মিরা মেঝেতে ঢলে পড়ল, তার চেতনা হারিয়ে গেল।
শারমিন চিৎকার করে উঠল, “ম্যাডাম! মিরা ম্যাডাম!”
দ্রুতই শারমিন মিরাকে মেঝেতে শুইয়ে দিল।
আমান সামান্য উত্তেজিত হলেও কঠোর কণ্ঠে বলল, “তাড়াতাড়ি ডাক্তার ডেকে আনুন।”
কিছুক্ষণ পর জেলের ডাক্তার এসে মিরাকে পরীক্ষা করে বলল, “তেমন কোনো গুরুতর সমস্যা নেই। মানসিক চাপের জন্য এমনটা হয়েছে। ওনার বিশ্রামের প্রয়োজন,” বলে চলে গেলেন।
শারমিন চিন্তিত স্বরে বলল, “স্যার, উনি কাল রাতে ঘুমাননি। আবার খাওয়াদাওয়াও করেননি। তাই হয়ত এমন হয়েছে।”
আমান চোখে হিংস্র দৃষ্টি নিয়ে মিরার দিকে তাকিয়ে বলল, “ঠিকাছে, আপনি বাহিরে যান। এই রুমে আর কেউ আসবেন না, আমি আছি।”
“জি স্যার।”
শারমিন স্যালুট দিয়ে বেরিয়ে গেল।
______
ঘড়িতে রাত ১১টা ১২ মিনিট। মিরার এখনো জ্ঞান ফেরেনি। আমান টেবিলের সামনে বসে মিরার দিকে একটানা তাকিয়ে থেকে ডেস্কের ওপর থাকা কাগজচাপা অস্থিরভাবে ঘুরিয়ে চলেছে। তার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ ছুরির মতো মিরার দিকে বিঁধে আছে; অর্থাৎ চোখ দিয়েই মিরাকে খেয়ে ফেলতে চায়।
অবশেষে আমান নিজের মধ্যে থাকা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। চেয়ার থেকে উঠে মিরার কয়েদখানায় প্রবেশ করল। হিংস্র দৃষ্টিতে মিরার প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে গভীরভাবে পরখ করল।
আনমনে বলে, “এত সৌন্দর্য কি কারান চৌধুরি একাই ভোগ করবে? এমন ভয়ংকর সুন্দর ফিগার দেখলেই তো খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে,” বলে বাঁকা হাসলো।
আমান চারপাশে তাকিয়ে নিশ্চিত হলো কেউ দেখছে না। এরপর মিরার দিকে আরও এক পা এগিয়ে এলো। তার দৃষ্টি মিরার রক্তমাখা মুখের ওপর স্থির হয়ে গেল। মুখাবয়বের প্রতিটি কোণে রক্ত ছড়িয়ে থাকলেও, সেই লালাভ আবরণ ভেদ করে উজ্জ্বল ও গোলাপি ওষ্ঠাধর তার মনে বিষাক্ত সাপের ফণা তুলছে। রক্তাক্ত চেহারা আমানের কাছে নতুন কিছু নয়। কিন্তু যা তাকে নাড়িয়ে দিল, তা হলো এই ভয়াবহতার মাঝেও লুকিয়ে থাকা এক অভিনব, দুর্নিবার সৌন্দর্য। যা এর আগে কখনো সে দেখেনি।
আমান ঠোঁটের কোণে হিংস্র হাসি ফুটিয়ে মিরার দিকে এগিয়ে গেল। চুম্বনের উদ্দেশ্যে মিরার ঠোঁটের একদম কাছে চলে গেল। কিন্তু হঠাৎ করেই কাল সন্ধ্যার সেই ভয়াবহ মুহূর্ত তার মস্তিষ্কে ভেসে উঠল। যখন মিরা রক্তমাখা ছুরি হাতে থানার বাইরে দাঁড়িয়েছিল। এমনটা মনে পড়তেই আমানের হৃদয়ে আতঙ্কের আবহ সৃষ্টি হলো। এই ভয়ের কারণে সে দুই পা পিছিয়ে গেল।
হাঁপাতে হাঁপাতে ঢোক গিলে ভয়ার্ত গলায় বলে উঠল, “এ আমি কি করতে যাচ্ছিলাম?”
নিজের গালে কয়েকটি সপাট সপাট থাপ্পড় মারল। কপালে ঘামের বিন্দু বিন্দু কণা জমা হয়েছে।
পকেট থেকে রুমাল বের করে কপাল মুছে নিয়ে বলল, “যে মেয়ে কিনা কারান চৌধুরীর মতো মানুষকে ঐভাবে আঘাত করতে পারে… (মিরার দিকে তাকিয়ে) না, ও আমাকেও শেষ করে দিবে!” বলে তড়িঘড়ি করে কয়েদখানা থেকে বেরিয়ে এলো।
বেরিয়েই টেবিলের ওপর রাখা পানির বোতল তুলে এক শ্বাসে ঢকঢক করে খেয়ে নিল।
এরপর বড় বড় শ্বাস নিতে নিতে উচ্চস্বরে ডেকে উঠল, “রফিক, রফিক!”
রফিক দ্রুত কক্ষে প্রবেশ করে স্যালুট দিয়ে বলল, “ইয়েস স্যার।”
“তুমি এখানে থাকবে। সাথে আলেয়াও থাকবে। আমি অন্য কয়েদিদের দেখতে যাচ্ছি।”
আমান ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে দ্রুত কক্ষ থেকে প্রস্থান করল।
_______
প্রভাতের আলো ক্রমশ কারাগারের সীমানায় এসে পৌঁছেছে। মিরা ধীরেসুস্থে চোখ মেলে তাকায়, কিন্তু তার দেহ যেন জীবিত হলেও মনটা মৃত। শারমিন মিরার কক্ষে প্রবেশ করে প্রথমেই তার ক্লান্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মিরাকে পর্যবেক্ষণ করে, তারপর হাতের ইশারায় একজনকে খাবার আনতে নির্দেশ দিল।
খাবারের প্লেটটা মিরার সামনে রেখে শারমিন নরম স্বরে বলল, “ম্যাডাম, কিছু খেয়ে নিন। তারপর আমাকে সব ঘটনা বলুন।”
কিন্তু মিরার চেহারায় এমন গভীর বিষাদ, মনে হয় কোনো মৃতপ্রায় মানুষ বসে আছে। ক্লান্ত চোখ, বিবর্ণ মুখশ্রীর পেছনে লুকিয়ে থাকা ভাঙ্গা মনের কাহিনি বুঝতে কারোরই কষ্ট হবে না।
শারমিন ধৈর্য ধরে বারবার খাওয়ার কথা বলছে, কিন্তু মিরা তার কোনো কথাই শুনতে পাচ্ছে না; সে যেন একদম দিন-দুনিয়ার বাইরে। শারমিন শেষমেশ বিরক্ত হয়ে গেল। হাল ছেড়ে দেওয়ার আগে তার মনে হলো, মিরার যে অবস্থা সে মুখ দিয়ে কিছু বললেও হয়ত সেটা শূন্যতায় হারিয়ে যাবে।
তাই সে থামল না। মিরাকে খাওয়ানোর চেষ্টায় শেষবারের মতো অনুনয় করল, “ইনশাআল্লাহ, স্যার বেঁচে থাকবেন। আপনি খেয়ে নিন ম্যাডাম।”
শারমিনের এই কথা শুনেই মিরার শুকনো চোখে জল ছলছল করে উঠল, অর্থাৎ সেই এক টুকরো আশার বাণী মিরার ভেতরের অবসন্নতাকে সামান্য হলেও প্রাণ দিয়েছে। শারমিন বুঝতে পারল মিরার দুর্বল জায়গা কোথায়, তার ভাঙা মন কোথায় ধাক্কা খায়। শেষ পর্যন্ত জোরাজুরির পর মিরা একমুঠো খাবার মুখে তুলল।
কিছুটা শান্তি ফিরে পেয়ে মিরা নিশ্বাস ছেড়ে আবার শুরু করল।
__________
পরদিন খুব ভোরেই মিরা কিছু জিনিসপত্র গুছিয়ে নিল। শাড়ি পরিবর্তন করে নতুন শাড়ি পরে নিল। আর অন্যদিকে কারান কেবল ট্রাউজারটা বদলে একটা প্যান্ট পরে নিল। নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে যাবে বলে সেজেগুজে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি সে। তাই সাদামাটাভাবেই বেরিয়ে পড়ল। কোনো ব্যাগও নিল না।
কারান নিচে নামতেই মিরা ঘোমটা দিয়ে তাকে অনুসরণ করে নিচে এল।
বৈঠকখানায় ইসহাক বাদে বাড়ির বাকি সবাই উপস্থিত থাকায় কারান চাইলেও মিরার সাথে খারাপ ব্যবহার করার সুযোগ পেল না।
ভদ্রতার খাতিরে গম্ভীর মুখে মিরার দিকে তাকিয়ে বলল, “এসো।”
এরপর আর কিছু না বলে বাহিরের পথে পা বাড়াল। মিরা আসাদ এবং আশমিনিকে সালাম জানিয়ে বিদায় নিল।
___________
এরপর দুজনেই মার্সিডিজ গাড়িতে চড়ে ‘কে.ছি হাউজ’ নামক বাংলো বাড়িতে পৌঁছাল।
কারান গাড়ি থেকে নেমেই ড্রাইভারের দিকে চাবি ছুড়ে দিয়ে বলল, “পার্ক করে রেখো।”
এরপর গুপ্ত কোড দিয়ে দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করল। মিরা গাড়ির দরজা খুলতেই তার চোখে পড়ল বিশাল এক শিশমহল; অর্থাৎ কাঁচের তৈরি একটা সুবিশাল বাড়ি। বাড়িটির চারপাশে কয়েক একরজুড়ে কোনো বসতি নেই। লম্বা কংক্রিটের বাউন্ডারি দিয়ে পুরো বাড়িটি আবিষ্ট। প্রবেশপথের পাশেই খোদাই করা নামফলক, তাতে লেখা ‘কে.ছি হাউজ’। বাড়িটিতে আধুনিকতার ছোঁয়া থাকা সত্ত্বেও নামফলকটা পুরোনো যুগের কারুকার্যে গড়া। বোধ হয় এটাই কারানের পছন্দকে আলাদা করে তুলেছে।
বাড়ির প্রবেশদ্বারের সামনে দুইজন রক্ষী দাঁড়িয়ে। ভিতরে ঢুকতেই দেখা গেল এককোণায় একটি মাঝারি আকারের বৃত্তাকার সাঁতারকুন্ড। আর গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গায় পৃথিবীর নামি-দামি গাড়িগুলো সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে।
মিরা খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে চারপাশে নজর বোলাল।
ঠিক তখনই মধ্যবয়সী একজন লোক এগিয়ে এসে মিরাকে সালাম জানিয়ে বলল, “ম্যাডাম, ভিতরে আসুন। আমি এই বাড়ির কেয়ারটেকার ফরিদ মিয়া। আপনি গিয়ে রেস্ট নিন, আমি জিনিসপত্র নিয়ে আসছি।”
লোকটার সরল কথায় মিরার মন খুশি হয়ে উঠলো।
হেসে বলল, “ওয়া আলাইকুমুস সালাম আঙ্কেল। গাড়িতে শুধু একটা ব্যাগ আছে, সেটা আমি নিজেই নিতে পারবো। আর আমাকে ম্যাডাম বলতে হবে না, আমি আপনার মেয়ের বয়সী। মিরা বলে ডাকলেই আমি বেশি খুশি হবো।”
কেন যেন মিরার কথায় ফরিদ মিয়ার মুখ বিষণ্ন হয়ে উঠলো। তবুও সে বিনম্র কণ্ঠে বলল, “আচ্ছা মিরা ম্যাডাম। আমি ব্যাগটা নিয়ে আসছি।”
“আবার ম্যাডাম? বললাম তো, আমি নিজেই নিতে পারবো আঙ্কেল। খুব বেশি কিছু হলে আপনার থেকে সাহায্য নিতাম। আপনি যান, আমি আপনাকে অনুসরণ করছি।”
ফরিদ মিয়া হালকা হেসে সামনে পা বাড়াল।
মনে মনে গভীর চিন্তায় ডুবে গিয়ে বলল, “এমন একটি মেয়ে কারান স্যারের কপালে না পড়লেই ভালো হতো। জানি না, এই দুই বিপরীত মনের মানুষ কীভাবে একসঙ্গে থাকবে।”
মিরা তাকে অনুসরণ করে বাড়ির ভিতরে ঢুকল।
ফরিদ মিয়া দোতলার একটি ঘর দেখিয়ে বলল, “এটাই কারান স্যারের রুম।”
মিরা ঘরে ঢুকতেই দেখল কারান ইতিমধ্যে পোশাক বদলে ল্যাপটপ নিয়ে বসেছে।
আড়চোখে মিরার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “আমার জন্য এক কাপ কফি বানিয়ে নিয়ে এসো।”
মিরা শান্তভাবে বলল, “একটু অপেক্ষা করুন, ফ্রেশ হয়ে এনে দিচ্ছি।”
কারান কপাল কুঁচকে কড়া কণ্ঠে বলল, “আমি যখন যা চাইবো, ঠিক তখনই দিতে হবে। আমার মুখের উপর কথা বলা আমার পছন্দ না।”
মিরা কিছুটা বিস্মিত হলেও কোনো রা না করে নিচে নেমে গিয়ে ফরিদ মিয়ার থেকে রান্নাঘর কোথায় জেনে নিল এবং ক্ষণকাল পর কফি বানিয়ে উপরে চলে গেল।
কারান কফি হাতে নিয়েই রাগান্বিত চেহারায় মিরার দিকে তাকালো। আচমকাই কফির পুরোটা মিরার গায়ে ঢেলে দিল। মিরা গরম অনুভব করে কাঁধে হাত দিয়ে দ্রুত স্পর্শ করল। কারানের এই অদ্ভুত আচরণে মিরা নির্বাকের মতো তাকিয়ে রইল।
কারান বাঁকা হেসে বলল, “আমি ব্ল্যাক কফি খাই।”
তারপর মিরার দিকে ঘনিষ্ঠভাবে এগিয়ে গিয়ে কঠিন স্বরে বলল, “আমার সম্পর্কে আগে থেকে জেনে, তোমার আমাকে বিয়ে করা উচিত ছিল। এরপর থেকে যেন কোনো ভুল না হয়। আবার বানিয়ে আনো। যাও।”
কফিটা খুব বেশি গরম না হওয়ায় মিরার শরীর পুড়ে যায়নি, তবে কিছুটা লাল হয়ে গেছে। মিরা ঘোমটার নিচে মুখ লুকিয়ে চোখের জল মুছে ফেলার চেষ্টা করল।
কান্নাভেজা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি মানুষ?”
কারান শয়তানি হাসি হেসে উত্তর দিল, “না তো। আমার চেহারা তো কোনো ভিনগ্রহের প্রাণীর মতো।”
তারপর চিৎকার করে বলল, “এসব নেকামি বন্ধ করে কফি বানাও, যাও!”
মিরা বিদ্যুৎগতিতে কেঁপে উঠল কারানের সেই হুংকারে। বুঝতে পারল, এমন এক পুরুষের সাথে তার বিয়ে হয়েছে যার মধ্যে মনুষ্যত্বের লেশমাত্র নেই।
মর্মাহত মনে নিশ্বাস ছেড়ে বলল, “আচ্ছা, নিয়ে আসছি।”
কারান আড় হেসে নিজেকে বলল, “মাত্র তো শুরু বেবি। আগেহ আগেহ দেখো হোতাহে কেয়া।”
মিরা নতুন করে কফি বানিয়ে উপরে আসল, কিন্তু কারান তখন কক্ষে নেই। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আবার কোথায় গেল?”
দশ মিনিট পর কারান বাথরুম থেকে ফিরে এসে বলল, “কফি ঠান্ডা হয়ে গেছে। আবার বানিয়ে আনো।”
মিরা আবারও বানিয়ে আনল। কিন্তু কারান বলল, “ফ্রেশ হয়ে এসো, নোংরা শরীর দেখলে আমার অস্বস্তি লাগে।”
মিরা ফ্রেশ হতে চলে গেল, আর সুযোগে কারান সেই কফি ডাস্টবিনে ফেলে দিল।
মিরা ফিরে আসার পর কারান আবার গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “কফির টেস্ট ভালো ছিল না। আবার বানিয়ে আনো।”
এভাবে বারবার কফি বানিয়ে আনাল, কারানের আসল উদ্দেশ্য ছিল মিরাকে কষ্ট দেয়া।
অবশেষে মিরা বিরক্ত হয়ে জোরে বলল, “আপনি কি আমাকে রোবট মনে করেন নাকি?”
কারান ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল, “ওহ! তুমি তাহলে চেঁচিয়েও কথা বলতে পারো? কারান চৌধুরির সামনে প্রথমবার কেউ গলা উঁচু করল। (কঠিন স্বরে) এই ফার্স্ট টাইম ভুল করেছো, এটাই যেন লাস্ট হয়। এখন যাও, আবার বানিয়ে আনো।”
মিরা ভীত হলেও প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে পুনরায় কফি বানিয়ে আনল। কফির কাপ কারানের হাতে দিয়ে বলল, “এবার টেস্ট করে দেখুন। ইউটিউব দেখে বেস্ট ব্ল্যাক কফিটা বানিয়েছি।”
কারান এবার আর বাহানা করতে পারল না। মিরা সামনে দাঁড়িয়ে থাকায় বাধ্য হয়ে কফি চেখে দেখল। তার মুখে কফির স্বাদ বেশ ভালো লাগল, তবে সে তা মিরাকে বুঝতে দিল না।
মুখের ভাব পরিবর্তন না করে বলল, “সকাল আর রাতে এভাবে কফি বানাবে। এখন বেরিয়ে যাও।”
মিরা নিরুত্তর বেরিয়ে গেল। হয়ত চেয়েছিল, কারান অন্তত কফি খেয়ে একটুখানি প্রশংসা করবে। কিন্তু সেটা নিছকই বোকাসোকা স্বপ্ন।
মিরা বেরিয়ে যাওয়ার পর, কারান কফিতে চুমুক দিতে দিতে মৃদুস্বরে বলে উঠল, “আর যাই হোক, কফি তো আপনি দারুণ বানান মিসেস চৌধুরি।”
তার কণ্ঠে শয়তানি হাসি ফুটলো। অর্থাৎ মিরাকে কষ্ট দিয়ে নিজের আনন্দ খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু মনের গভীরে কফির প্রশংসা করতে বাধ্য হলো।
রাত গভীর হতে থাকল। যে যার কক্ষে নিজের মতো করে সময় কাটালো। কারান নিঃশব্দে নিজের কক্ষে শুয়ে পড়ল, মাথার ভেতর কেবল বিজয়ীর হাসি, মিরার মনোবল ভেঙে দিয়ে এক ধরনের পরিতৃপ্তি পেয়েছে। আর মিরাকে আলাদা ঘরে ঘুমাতে পাঠিয়ে দিলেও, সে নির্জনতায় চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু আর বুকের ভেতর অগণিত প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছিল।
____________
পরেরদিন ঘর পরিষ্কার করার উদ্দেশ্যে কারানের কক্ষে ঢুকতেই যে দৃশ্য দেখল, তাতে মিরার নিশ্বাস আটকে গেল। দেখে কারান গোসল করে এসে তোয়ালে পরিধানে আলমারি থেকে কাপড় বের করছে। মিরাকে দেখামাত্রই দাঁড়িয়ে গেল। মিরা এক নজরে কারানকে পরখ করে নিল।
ছয় ফুট লম্বা সুঠাম দেহের প্রতিটি পেশি নিখুঁত ছাঁচে গড়া। ভেজা কেশলয়ে হালকা পানি ঝরছে, আর তার তীক্ষ্ণ নীল চোখ মিরার মনের গভীরে খুঁজে ফিরছে এক অপার আকর্ষণ।
কারানের বক্ষদেশে জলকণাগুলো সূর্যের আলোয় জ্বলজ্বল করছে। আর তার শক্ত মসৃণ পেশিবহুল বাহুগুলোই মিরার দৃষ্টিকে আটকে রাখার জন্য যথেষ্ট। সেই চাপদাড়ির নিচে সুগঠিত চোয়াল, আর কালচে গোলাপি ঠোঁটের নিখুঁত ভঙ্গি তাকে মোহময় করে তুলেছে। তার মসৃণ ফরসা শরীরের প্রতিটি ভাঁজ, প্রতিটি শিরা সৌন্দর্যের অদ্ভুত সংমিশ্রণ।
মিরার হৃদস্পন্দনের গতি বেড়ে গেল। কারানের শরীরের সৌন্দর্য তাকে পুরোপুরি বশীভূত করে ফেলেছে।
কারান দেয়ালে হেলান দিয়ে কাটখোট্টা গলায় বলল, “তুমি এই রুমে কি করছো?”
কারানের কথাটা কানে আসতেই মিরার এতক্ষণকার ঘোর ভেঙে গেল।
কারান গম্ভীর কণ্ঠে আবার বলল, “এভাবে বেহায়ার মতো তাকিয়ে আছো কেন? আগে কি ছেলে দেখোনি? নাকি আমার নতুন করে চেহারা খুলেছে?”
কারানের এমন লজ্জাজনক কথা শুনে মিরার কান লাল হয়ে গেল। সাথে যে অনেকটা অপমানিতবোধ করেছে সেটা যদি ঘোমটার আড়াল থেকে কারান মিরার লজ্জায় আরক্ত হয়ে কুঁচকে যাওয়া মুখশ্রী দেখতো, তাহলেই টের পেয়ে যেত। একটা মেয়ে হয়ে একটা ছেলের দিকে কতক্ষণ তাকিয়ে ছিল আবার সেই ছেলেই ওভাবে কতগুলো লজ্জালু প্রশ্ন করলো, এই পরিস্থিতিতে পড়ার থেকে তো পটল তোলা ভালো ছিল।
মিরা অপ্রস্তুত হয়ে চোখের পলক বুঝিয়ে দাঁত দিয়ে কিঞ্চিৎ জিভ কেটে নিল। সাথে সাথে পিছন ফিরে নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল, “সরি সরি। আমি তো আসলে রুম গুছাতে এসেছিলাম।”
এরপর কারানের দিকে পালটা আঙুল ছুড়ে দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “কিন্তু আপনার কি লজ্জা নেই নাকি? এভাবে একটা মেয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন!”
মিরার এই বক্তব্য শুনে কারান বিস্মিত হলো। অর্থাৎ সে নিজের কক্ষে যেমন খুশি থাকবে, তাতে লজ্জা পাওয়ার কি আছে! কারান ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের সাথে হাসল,
“হিউমারাস (হাস্যকর), আমার কেন লজ্জা করবে? আর আমার তো সমস্যা নেই এভাবে থাকতে।”
“কিহ! কি সব বলছেন, হ্যাঁ? যান, অন্য রুমে গিয়ে জামাকাপড় পড়ে আসেন।”
কারান মিরার লজ্জা দেখে কিছুটা বিস্মিত হলেও এখন বেশ মজা পাচ্ছে। এরপর তীর্যক হেসে ধীরে ধীরে মিরার দিকে অগ্রসর হলো। মিরার কানের কাছে গিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,
“কেন, তোমার কি লজ্জা লাগছে? (নেশালো গলায়) ইফ ইউ ওয়ান্ট, আমি টাওয়ালটাও খুলে ফেলব।”
এতক্ষণ লজ্জার পরিমাণ সাধারণ পর্যায়ে থাকলেও এবার মিরার লজ্জা সপ্তম আকাশ ছুঁলো। হোক তারা স্বামী-স্ত্রী, কিন্তু এখন তো তাদের মধ্যে সাধারণ পতিপত্নীর মতো সম্পর্ক নেই।
মিরা এক পলক নেত্রপল্লব বুঝিয়ে ফের খুলে, মিনমিনে গলায় বলল, “ছিঃইই, আল্লাহ! আপনার কি বিন্দুমাত্রও লজ্জা নেই?”
মিরার লজ্জা আর অস্বস্তি দেখে কারানের মনে এক ধরনের খোশমেজাজি উন্মাদনা দেখা দেয়। তার হাস্যরসাত্মক মুখাবয়বের দিকে নজর দিলেই বোঝা যায়, এই মুহূর্তে সে গভীর আনন্দ অনুভব করছে। হঠাৎ করেই একটি খুকি কাশির শব্দ তুলে, অধর প্রসারিত করে কিছুক্ষণ হেসে বলল, “না, নেই। তাছাড়া তোমার তো রাইট আছে তোমার হাসবেন্ডকে সম্পূর্ণ দেখার। আমি না হয় টাওয়ালটা খুলেই ফেলি, তারপর তুমি তোমার হট সে’ক্সি হাসবেন্ডকে দেখো।”
“আস্তাগফিরুল্লাহ! একটা মানুষ এতটা লজ্জাহীন কীভাবে হতে পারে! আমি অন্য রুমে গেলাম। আপনি তাড়াতাড়ি চেঞ্জ করুন প্লিজ,” বলেই মিরা দ্রুত দরজা থেকে বের হতে যাবে, তৎক্ষণাৎ কারান মিরার সামনে দাঁড়িয়ে, দুই হাত ছড়িয়ে তার যাওয়ার পথ আটকে দিল।
এরপর হেসে বলল, “উঁহুঁ, আমি তো তোমার সামনেই চেঞ্জ করবো, বেইবি।”
মিরা ঘন ঘন নিশ্বাস ত্যাগ করে বলল, “দেখুন, এবার কিন্তু অনেক খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আমার মোটেও আপনাকে ঐভাবে দেখার ইচ্ছা নেই।”
“তোমাকে দেখতেই হবে, সোনা। আমি কিন্তু খুললাম,” বলে কারান তোয়ালেতে হাত দিতেই মিরা কারানের হাতের নিচে থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল, “আমি গেলাম, বাবা।”
মিরা প্রস্থান করার সঙ্গে সঙ্গে কারান খিলখিল করে হাসিতে ভরে উঠল। এটা তার গম্ভীর চেহারার পেছনের গাঢ় আবেগের দুর্লভ প্রকাশ।
ক্ষণকাল বাদে কারান পোশাক পরিবর্তন করে সাধারণ ঘরোয়া ধড়াচূড়া পরিধান করে সিঁড়ি থেকে নিচে নামতে থাকলো।
কারানকে নজরে পড়তেই মিরা মনে মনে ভেংচি কেটে বলল, “নির্লজ্জটায় আসছে।”
কারান উচ্চস্বরে সম্ভাষণ করে, “ফরিদ কাকা।”
ফরিদ রান্নাঘর থেকে বৈঠকখানায় এসে নরম গলায় বলল, “জি স্যার।”
কারান মিরাকে উদ্দেশ্য করে বলে, “এখন থেকে ফরিদ কাকা বাহিরের সব কেনাকাটা করে আনবে। ঘরের সব কাজ তোমাকে করতে হবে। ঘর ঝাড় দেওয়া, ক্লিন করা, রান্না করা, ডিসেস ওয়াশ করা, গার্ডেনে পানি দেওয়া; এভ্রিথিং তোমাকে করতে হবে। (মনে মনে) যদি সম্মানহানির ব্যাপার না থাকতো (মিরার দিকে তাকিয়ে) বাজারটাও তোমাকে দিয়ে করাতাম।”
মিরা নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে। আমার এমনিতেও কাজ করতে ভালো লাগে।”
কারান ম্লান হেসে বলল, “তাহলে তো ভালোই। (আপনমনে) আমিও দেখি কয়দিন আপনার ভালো লাগে। আমাকে বিয়ে করার শখ যদি না মিটিয়েছি বেবি, নিজে থেকে ডিভোর্স দিতে বাধ্য হবে।”
এরপর মিরা কারানকে কফি তৈরি করে দিতে গেল। কারান কফি খেয়ে, উপরে উঠে অফিসের পোশাক পরে, প্রভাতের নাস্তা সেরে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল। কারান বেরোতেই মিরার সারাদিনের নিরবচ্ছিন্ন কাজ শুরু হয়ে গেল। এ কাজের অন্ত নেই; একেকটি কাজ আরেকটিকে ধাবিত করে নিয়ে যাচ্ছে। দিনভর বিরতিহীন কাজ কর?

