#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৫
লেখনীতে:#মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
স্কুলের নাটকের রেশ কাটতে না কাটতেই আকাশে আবার দুর্যোগের ঘনঘটা দেখা দিল। জেনিন নুরশাদ চেষ্টা করছিল নিজেকে বদলে ফেলতে, কিন্তু তার চারপাশের দেয়ালগুলো যেন ক্রমেই ছোট হয়ে আসছিল। নানামি জায়দানের বাড়িতে জেনিন আশ্রয় পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু দিন যত যাচ্ছিল, জেনিনের ভেতরে এক অদ্ভুত হীনমন্যতা দানা বাঁধছিল। নানামির বাবার স্নেহ, মায়ের মমতা, সবকিছুই জেনিনের কাছে এখন করুণার মতো মনে হতে শুরু করেছে। সে নিজেকে এই সাজানো-গোছানো, আদর্শ পরিবারে একজন ‘বহিরাগত’ ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারছিল না।
সেদিন সকালে নানামি আর জেনিন স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। বৃষ্টির তোড়ে পুরো মাঠ ডুবে গেছে। নানামি ব্যস্ত ছিল তার ক্লাসের প্রজেক্ট নিয়ে, আর জেনিন উদাসীনভাবে বৃষ্টির ফোঁটা গুনছিল। ঠিক তখন জেনিনের এক সহপাঠী, যে কি না জেনিনের বাবার অফিসের এক কর্মচারীর ছেলে, জেনিনের কাছে এসে দাঁড়াল।
“জেনিন ভাই, খবর শুনেছেন? আপনার বাবা কিন্তু বসে নেই। তিনি অলরেডি সব জায়গায় বলে দিয়েছেন আপনি নাকি বাড়ি থেকে অনেক টাকা চুরি করে পালিয়েছেন। তিনি পুলিশেও ডায়েরি করার হুমকি দিয়েছেন যাতে আপনাকে কোথাও আশ্রয় না দেওয়া হয়,” ছেলেটি ফিসফিস করে বলল।
জেনিনের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। তার নিজের বাবা তার ওপর এমন নোংরা অপবাদ দিচ্ছে? জেনিনের হাত দুটো রাগে কাঁপতে শুরু করল। সে পাশের দেয়ালটাতে কষে কয়েকটা ঘুষি মারল।
“কী করছিস তুই?” নানামি দ্রুত জেনিনের হাতটা চেপে ধরল। জেনিনের হাতের গিঁট থেকে রক্ত বেরোচ্ছে।
“দেখলি? দেখলি আমার বাবার আসল রূপ? তিনি চান না আমি মানুষ হই। তিনি চান আমি জেলে পচি, যাতে উনার ইগো শান্ত হয়। আমি এই অপবাদ নিয়ে বাঁচতে পারব না রে!” জেনিনের চোখে তখন জল নয়, আগুন ঝরছিল।
নানামি তাকে শান্ত করার চেষ্টা করল। “আঙ্কেল রাগের মাথায় হয়তো অনেক কিছু বলছেন। কিন্তু তুই যদি এখন ভেঙে পড়িস, তবে উনার জেদই জিতে যাবে। তুই আমার বাড়িতে আছিস, কেউ তোকে কিছু করতে পারবে না।”
“তোর বাড়িতে আর কতদিন থাকব নানামি?” জেনিন এক ঝটকায় নানামির হাত সরিয়ে দিল। “সবাই ভাবছে তুই আমাকে দয়া করছিস। আমি রাস্তা দিয়ে হাঁটলে লোকে ফিসফিস করে বলে, ওই দেখ মাস্টারের দয়ায় নুরশাদের ছেলে বেঁচে আছে। আমি কারো দয়ায় বাঁচতে চাই না নানামি! আমি আমার নিজের পরিচয় গড়তে চাই।”
নানামি স্তব্ধ হয়ে গেল। সে কোনোদিন ভাবেনি তার বন্ধুত্বের এই আশ্রয়কে জেনিন ‘দয়া’ হিসেবে দেখবে। নানামির মনে হলো তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। সে তো জেনিনকে তার হৃদয়ের সবটুকু দিয়ে ভালোবাসত, কিন্তু জেনিনের এই পজেসিভনেস এখন বিষাক্ত রূপ নিচ্ছে। জেনিন চায় নানামি কেবল তার হোক, কিন্তু সমাজ বা পরিবারের কোনো ঋণ সে নিতে চায় না।
ঠিক সেই মুহূর্তে নোবারা সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। জেনিনের রক্তাক্ত হাত দেখে সে দৌড়ে এল। “জেনিন ভাইয়া! একি করেছেন আপনি? হাত দিয়ে রক্ত পড়ছে কেন?”
নোবারা তার ব্যাগ থেকে একটা রুমাল বের করে জেনিনের হাত মুছিয়ে দিতে চাইল। কিন্তু জেনিন এবার নোবারার হাতটাও রুক্ষভাবে সরিয়ে দিল। “থাক নোবারা, তোমাদের এই করুণা আমার দরকার নেই। রক্ত বেরোচ্ছে বেরোক, আমি তো রক্ত দেখেই বড় হয়েছি।”
নোবারার চোখে জল চলে এল। সে অপমানের চেয়েও বেশি অবাক হলো জেনিনের এই ব্যবহারে। সে নানামির দিকে তাকালো, কিন্তু দেখল নানামিও পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। জেনিন কারো দিকে আর না তাকিয়ে বৃষ্টির মধ্যেই মাঠের দিকে দৌড়ে চলে গেল।
সেদিন স্কুল ছুটি হওয়ার পর নানামি জেনিনকে অনেক খুঁজল, কিন্তু কোথাও পাওয়া গেল না। নানামি একা বাসায় ফিরল। বাসায় ঢুকে দেখল তার মা জেনিনের জন্য প্রিয় পায়েস রান্না করে রেখেছেন। নানামির বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। সে কীভাবে মাকে বলবে যে জেনিন আজ নিজেকে এই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছে?
রাত দশটা বাজে। জেনিন তখনো ফেরেনি। নানামির বাবা চিন্তিত হয়ে পায়চারি করছেন। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। নানামি দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলল। কিন্তু দরজায় জেনিন নেই, দাঁড়িয়ে আছে পুলিশের দুইজন কনস্টেবল।
“জনাব জায়দানের বাড়ি এটাই? আপনাদের বাড়িতে জেনিন নুরশাদ নামে একজন কিশোর আছে? ওর বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে আমাদের ওকে কাস্টডিতে নিতে হবে। ওর বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ আছে,” পুলিশের কথা শুনে নানামির মা আর্তনাদ করে উঠলেন।
নানামির বাবা সামনে এসে দাঁড়ালেন। “জেনিন কোনো চুরি করেনি। ও আমার কাছে আছে, আমি ওর দায়িত্ব নিয়েছি।”
“দেখুন স্যার, আপনি শিক্ষক মানুষ। ঝামেলায় জড়াবেন না। ওর বাবা প্রভাবশালী মানুষ, উনার অভিযোগ তো আর উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আপনি যদি ওকে লুকিয়ে রাখেন, তবে আপনারও বিপদ হতে পারে।”
নানামি আড়ালে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। তার ভেতরটা জ্বলে যাচ্ছিল। জেনিনকে বাঁচাতে গিয়ে তার নিজের বাবাকেও আজ এই অপমান সহ্য করতে হচ্ছে। ঠিক তখনই অন্ধকারের ভেতর থেকে জেনিন বেরিয়ে এল। তার সারা শরীর কাদায় মাখা, চোখ দুটো লাল।
“কাউকে ডিস্টার্ব করতে হবে না। আমি এখানে,” জেনিন ধীর পায়ে পুলিশের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
সে পুলিশের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। তারপর নানামির বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, “আঙ্কেল, আপনি আমার জন্য যা করেছেন, তা আমি কোনোদিন ভুলব না। কিন্তু আমার লড়াইটা আমাকেই লড়তে হবে।”
পুলিশ জেনিনকে নিয়ে চলে গেল। নানামি জেনিনের পিছু পিছু দৌড়াতে চাইল, কিন্তু তার বাবা তাকে জড়িয়ে ধরলেন। “যেতে দে বাবা। জেনিনকে এখন তার নিজের সাথে লড়তে হবে। আমরা আইনিভাবে লড়ব, কিন্তু ও যদি মানসিকভাবে নিজেকে আলাদা করে নেয়, তবে আমরা কেউ ওকে বাঁচাতে পারব না।”
সেই রাতে নানামিদের বাড়িতে কোনো চুলা জ্বলল না। নানামি তার ঘরে জেনিনের শূন্য বিছানার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হতে লাগল, জেনিন যেন ইচ্ছে করেই নিজেকে এই নরকে ঠেলে দিল। কেন? নানামির প্রতি কি তার কোনো ঘৃণা জন্মেছে? নাকি সে আসলে নানামিকে এই বিপদ থেকে দূরে রাখতে চাইছে?
পরের দিন থানায় গিয়ে নানামি দেখল জেনিন লকআপের এক কোণে চুপচাপ বসে আছে। তার চেহারায় কোনো অনুশোচনা নেই, আছে এক ভয়ংকর জেদ। নানামি জেনিনের সাথে কথা বলতে চাইল, কিন্তু জেনিন মুখ ঘুরিয়ে নিল।
“কেন করলি এমন? আমি তো ছিলাম তোর পাশে!” নানামি গরাদ ধরে চিৎকার করে বলল।
“তুই ছিলি, কিন্তু তোর ছায়াটা আমাকে ছোট করে দিচ্ছিল জায়দান” জেনিন শান্ত গলায় বলল। “তোর বাবা-মার চোখে আমি সবসময় একটা ‘বেচারা’ হয়ে থাকতাম। আমি বেচারা হয়ে থাকতে চাই না। আমি অপরাধী হব, তবু কারো করুণার পাত্র হব না।”
নানামি বুঝতে পারল জেনিন নুরশাদ আর সেই বাউন্ডুলে কিশোর নেই, সে এখন একজন বিদ্রোহী। জেনিনের এই পজেসিভনেস এখন ঘৃণার সাথে মিশে এক জটিল আকার ধারণ করেছে। সে নোবারাকে ভালোবাসে, সে নানামিকে ভালোবাসে, কিন্তু সে এই ভালোবাসার বন্ধনকে নিজের স্বাধীনতার পথে বাধা মনে করছে।
জেনিনকে সেদিন জামিন দেওয়া হলো না কারণ তার বাবা মামলা তুলে নিতে অস্বীকার করেছিলেন। জেনিনকে রিমান্ড হোমে পাঠানো হলো। রিমান্ড হোমের সেই অন্ধকার ঘরগুলোতে জেনিন প্রথম শিখল কীভাবে ঘৃণা করতে হয়, কীভাবে প্রতিশোধ নিতে হয়। সে দেখল জগতের নিয়ম হলো, হয় শিকার হও, নয়তো শিকারি। জেনিন ঠিক করল সে আর কোনোদিন শিকার হবে না।
নানামি প্রতিদিন জেনিনের জন্য খাবার নিয়ে যেত, কিন্তু জেনিন সেই খাবারে হাতও দিত না। নোবারা একবার গিয়েছিল জেনিনের সাথে দেখা করতে। জেনিন শুধু একটা কথা বলেছিল নোবারাকে,
“তুমি নানামির সাথেই থেকো নোবারা। ও তোমার মতো ভালো মানুষের যোগ্য। আমার মতো কলঙ্কিত মানুষের ছায়া থেকেও দূরে থেকো।”
নোবারা সেদিন কেঁদেছিল। কিন্তু জেনিন নুরশাদ কাঁদেনি। সে শুধু দেখছিল গরাদের ওপাশে নীল আকাশটা কীভাবে ধীরে ধীরে ধূসর হয়ে যাচ্ছে। নানামি জায়দান সেই দিনগুলোতে শপথ নিয়েছিল, সে বড় হয়ে এমন এক বিচারব্যবস্থা তৈরি করবে যেখানে কেউ মিথ্যা অপবাদে জেনিনের মতো হারিয়ে যাবে না। কিন্তু সে জানত না, জেনিন ততদিনে আলোর পথ থেকে চিরতরে বিদায় নিয়েছে।
স্কুলের সেই সোনালি দিনগুলো এখন কেবল স্মৃতির পাতায়। জেনিন নুরশাদের জীবনে এখন কেবল একটাই শব্দ, প্রতিশোধ। সে বড় হচ্ছে, তার ভেতরটা পাথর হয়ে যাচ্ছে। নানামি তার বন্ধুত্বের মশাল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু জেনিন এখন অন্ধকারের অতল গহ্বরে ডুব দিতে শুরু করেছে।
<><><><><><><><><>
রিমান্ড হোমের দেওয়ালগুলো নোনা ধরা, মেঝের কোণে কোণে জমে আছে বছরের পর বছর ধরে জমা হওয়া ঘাম আর দীর্ঘশ্বাসের নোনা গন্ধ। জেনিন নুরশাদ এখানে সাতদিন পার করেছে, কিন্তু তার মনে হচ্ছে সে কোনো এক অনন্তকালের গহ্বরে আটকে আছে। তার কিশোর মনে যে কোমলতাটুকু নানামিদের বাড়িতে তৈরি হয়েছিল, এই সাতদিনে তা পাথরে রূপান্তরিত হয়েছে। এখানে কেউ কাউকে দয়া করে না, কেউ কারো বন্ধু নয়। খাবারের জন্য কাড়াকাড়ি, রাতে ঘুমানোর জায়গার জন্য মারামারি, জেনিন বুঝতে পারল, এতোদিন সে যে পৃথিবী দেখেছে তা ছিল একটা পর্দা মাত্র। আসল পৃথিবীটা এই অন্ধকারের মতো কুৎসিত।
রিমান্ড হোমের এক কোণে একটা বিশাল অশ্বত্থ গাছ আছে। সেই গাছের নিচে সবসময় এক অদ্ভুত অন্ধকার খেলা করে। জেনিন সেখানে একা বসে থাকত। তার চোখের চাউনি এখন বদলে গেছে। আগে সেখানে একটা চঞ্চলতা ছিল, এখন সেখানে কেবল এক স্থির আক্রোশ। জেনিন ভাবছিল তার বাবার কথা, ভাবছিল নানামি জায়দান-এর সেই আদর্শ পরিবারের কথা। সে যত বেশি নানামির কথা ভাবছে, তার বুকটা তত বেশি হাহাকারে ভরে উঠছে। নানামি এখন হয়তো পড়াশোনা করছে, তার মা হয়তো এখন তার প্রিয় কোনো নাস্তা বানাচ্ছেন। আর জেনিন? জেনিন এখন অপরাধীদের মাঝে এক নগণ্য সংখ্যা।
সেদিন বিকেলে যখন আকাশটা মেঘলা হয়ে ছিল, জেনিন দেখল রিমান্ড হোমের অন্য বন্দিরা এক জায়গায় জড়ো হয়ে ফিসফিস করছে। তাদের চোখে এক অদ্ভুত সমীহ। জেনিন উৎসুক হয়ে সেদিকে তাকালো। দেখল গেট দিয়ে একজন মানুষ ভেতরে ঢুকছে। মানুষটার পরনে ধবধবে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি, পায়ে দামী জুতো। কিন্তু তার মুখটা একটা কালো ছাতার আড়ালে ঢাকা। রিমান্ড হোমের কঠোর গার্ডরা পর্যন্ত তাকে দেখে মাথা নত করল।
“ওটা কে?” জেনিন পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক কিশোর অপরাধীকে জিজ্ঞেস করল।
“উনি ‘ছায়া সাহেব’। উনার নাম কেউ জানে না, চেহারা কেউ দেখেনি। উনি মাঝে মাঝে এখানে আসেন। যাদের মধ্যে আগুনের ফুলকি দেখেন, তাদের তুলে নিয়ে যান নিজের আস্তানায়। একবার উনার নজরে পড়লে তোর জীবন বদলে যাবে। তুই আর এই সাধারণ দুনিয়ার কেউ থাকবি না,” ছেলেটা এক নিঃশ্বাসে বলে গেল।
জেনিন যখন অশ্বত্থ গাছের নিচে একা বসে ছিল, হঠাৎ দেখল সেই কালো ছাতাটা তার দিকে এগিয়ে আসছে। জেনিন নড়ল না, বরং সে আরও শক্ত হয়ে বসল।
ছাতাটা যখন জেনিনের একদম কাছে এল, এক জোড়া ভারি কিন্তু মার্জিত পায়ের শব্দ শোনা গেল। ছাতাটা একটু উপরে উঠলে জেনিন কেবল সেই লোকটার চিবুক আর ঠোঁটের কোণে থাকা একটা কাটা দাগ দেখতে পেল। তার পুরো মুখটা তখনো ধোঁয়াশায় ঢাকা, যেন এক রহস্যময় ছায়া।
“জেনিন নুরশাদ,” লোকটার কণ্ঠস্বর ছিল খুব গম্ভীর এবং শীতল, ঠিক যেন হিমালয়ের বরফ গলা জল। “তোমার বাবা তোমাকে এখানে পাঠিয়েছেন শিক্ষা দিতে। কিন্তু আমি তোমার চোখে অন্য কিছু দেখছি।”
জেনিন নির্ভয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি কী দেখছেন?”
“আমি দেখছি একটা বিশাল দাবানল। যে দাবানল পুরো শহর পুড়িয়ে ছাই করতে পারে, আবার চাইলে একটা নতুন জগত তৈরি করতে পারে। তুমি কি এই পচা ভাত আর গারদবন্দি জীবনে পচতে চাও? নাকি তুমি এমন এক জীবন চাও যেখানে আইন তোমার ইশারায় চলবে?” লোকটা পকেট থেকে একটা দামী চকোলেট বের করে জেনিনের দিকে বাড়িয়ে দিল।
জেনিন চকোলেটটা নিল না। সে শুধু বলল, “আমি চাই আমার নিজের পরিচয়। আমি চাই না কেউ আমাকে করুণা করুক।”
ছাতাওয়ালা লোকটা একটু হাসল। তার হাসির শব্দটা ছিল খুব অদ্ভুত, একই সাথে আশ্বস্তকারী এবং আতঙ্কজনক। “ভয় পাওয়া সহজ, কিন্তু শ্রদ্ধা আদায় করা কঠিন। আমি তোমাকে সেই পথটা দেখাব। কিন্তু তার বদলে আমাকে তোমার একটা জিনিস দিতে হবে।”
“কী?” জেনিন জানতে চাইল।
“তোমার এই ‘ভালো মানুষ’ হওয়ার ইচ্ছেটা। তোমার ভেতরের ওই নানামি নামের ছেলেটার স্মৃতি। কারণ এই পথে কোনো আবেগ থাকতে নেই। আবেগই মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।” লোকটা কথা শেষ করে আবার সেই কালো ছাতার আড়ালে মুখ ঢেকে নিলো।
জেনিনের হৃদপিণ্ড থমকে গেল। নানামিকে ভুলে যাওয়া? এটা কি সম্ভব? জেনিন উত্তর দিল না, কিন্তু সেই ছায়া মানব চলে যাওয়ার সময় একটা চিরকুট ফেলে গেল জেনিনের পায়ের কাছে। তাতে একটা ফোন নম্বর আর একটা ঠিকানা লেখা ছিল, যেটা জেনিন তার হাতের মুঠোয় এমনভাবে পিষল যে সেটা যেন তার চামড়ার সাথে মিশে গেল।
পরের দিন নানামি এসেছিল জেনিনের সাথে দেখা করতে। তার সাথে ছিল নোবারা আকারি। তারা অনেক অনুনয় বিনয় করে গার্ডদের রাজি করিয়েছে। নোবারার হাতে ছিল একটা ছোট টিফিন বক্স।
“জেনিন ভাইয়া! দেখো আমরা তোমার জন্য কী এনেছি,” নোবারা খুব আগ্রহ নিয়ে বলল। “তোমার প্রিয় নারকেলের নাড়ু বানিয়ে এনেছি।”
জেনিন আজ তাদের দিকে তাকাতে পারছে না। তার মাথার ভেতর সেই ছায়া মানবের কথাগুলো বারবার প্রতিধ্বনি হচ্ছে, আবেগই তোমার দুর্বলতা। সে দেখল নানামি খুব মমতা নিয়ে তাকে দেখছে। নানামির এই মায়াবী চাহনি আজ জেনিনকে কষ্ট দিচ্ছে। সে নিজেকে অযোগ্য মনে করছে।
“তোরা কেন আসিস বারবার?” জেনিন খুব রুক্ষ গলায় বলল। “আমি এখানে ভালো আছি। তোদের এই সব নাড়ু আমার চাই না। আমি আর স্কুলে ফিরব না।”
“কী বলছিস জেনিন! আর মাত্র কটা দিন, আঙ্কেল মামলা তুলে নেবেন আমি নিশ্চিত। আমি বাবার সাথে কথা বলেছি, তিনি লয়ারের সাথে যোগাযোগ করছেন,” নানামি ব্যাকুল হয়ে বলল।
“তোর বাবা কেন লড়বেন আমার জন্য? উনি কে আমার?” জেনিন হঠাৎ গরাদ ধরে গর্জে উঠল। “আমি কি তোদের আশ্রিত কুকুর? তোরা বারবার আমাকে দয়া করিস কেন? জায়দান, তুই নিজের পড়াশোনা কর, যা খুশি হ, কিন্তু আমার পিছু ছাড়। আমি আর তোদের সেই জেনিন নেই।”
নোবারা স্তম্ভিত হয়ে গেল। তার হাত থেকে নাড়ুর কৌটোটা নিচে পড়ে গেল। সে কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে সেখান থেকে চলে গেল। নানামি পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। সে দেখল জেনিনের চোখে এখন এক অন্যরকম জেদ। এই জেনিনকে সে চেনে না। এই জেনিন যেন এক আগ্নেয়গিরি, যা যে কোনো সময় ফেটে পড়বে।
“দেখ ভাই, আমি জানি তুই খুব কষ্টে আছিস। কিন্তু বন্ধুত্বের ওপর থেকে বিশ্বাস হারাস না। আমি তোকে এখান থেকে বের করে নিয়ে যাবই,” নানামি শান্ত স্বরে বলল এবং তারপর ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল।
জেনিন যখন একা হলো, সে পাগলের মতো নিজের চুল ছিঁড়তে লাগল। সে নিজেই নিজেকে কষ্ট দিচ্ছে যাতে সে নানামির মায়া থেকে মুক্ত হতে পারে। সেই রাতে রিমান্ড হোমের বাথরুমে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে জেনিন তার নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকালো। সে দেখল এক কিশোরকে, যার স্বপ্নগুলো চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। সে মনে মনে সেই ‘ছায়া সাহেব’-কে ডাকল। সে ঠিক করল, সে আর কোনোদিন কারো করুণার পাত্র হবে না।
রিমান্ড হোমে থাকাকালীন জেনিন আর কারো সাথে কথা বলল না। সে শুধু দেখত কীভাবে বড় অপরাধীরা ছোটদের নিয়ন্ত্রণ করে। সে শিখল কীভাবে নিজের ভয়কে ঢেকে রাখতে হয়। সে এখনো জানে না ওই ছায়া সাহেব কে, কিন্তু সে জানে ওই মানুষটাই তাকে ক্ষমতা দেবে।
সাত দিন পর জেনিনের বাবা শেষ পর্যন্ত মামলা তুলে নিলেন, তবে একটা শর্তে, জেনিনকে পাকাপাকিভাবে বোর্ডিং স্কুলে চলে যেতে হবে এবং সে আর কোনোদিন নানামি বা নোবারার সাথে যোগাযোগ করতে পারবে না। জেনিন যখন রিমান্ড হোম থেকে বের হলো, সে দেখল গেটের সামনে তার বাবার দামী গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তার চোখ খুঁজছিল অন্য কাউকে। দূরে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে নানামি আর নোবারা দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের চোখে আকাশ সমান প্রশ্ন।
জেনিন গাড়িতে ওঠার আগে একবার তাদের দিকে তাকালো। তার ঠোঁটের কোণে সেই ছায়া মানবের মতো একটা রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। সে হাত নাড়ল না, কোনো কথা বলল না!
গাড়িটা চলতে শুরু করল। জেনিন জানালার কাঁচে কপাল ঠেকিয়ে বসে রইল। সে তার পকেটে থাকা সেই চিরকুটটা স্পর্শ করল। তার ভেতরটা এখন এক শূন্য মরুভূমি। সে জানত, সে এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সে এটাও জানত, এই অন্ধকারেই সে নিজেকে খুঁজে পাবে।
<><><><><><><><><>
বোর্ডিং স্কুলে যাওয়ার ভয়ংকর হুমকিটা কোনোমতে নানামির বাবার হস্তক্ষেপে টলে গিয়েছিল, কিন্তু জেনিন নুরশাদ-এর জীবনে শান্তি আর ফিরে আসেনি। সে এখন নিয়মিত স্কুলে আসে ঠিকই, কিন্তু তার বসার জায়গা বদলে গেছে। সে আর নানামির পাশে ফার্স্ট বেঞ্চে বসে না। সে এখন বসে একদম পেছনের বেঞ্চে, জানালার ধারে, যেখান থেকে বাইরের জগতটা খুব ধূসর মনে হয়।
সামনে এসএসসি পরীক্ষা, পুরো স্কুলজুড়ে এক তীব্র পড়ার চাপ। করিডোরগুলোতে এখন আর হাসাহাসি নেই, কেবল বইয়ের পাতার খসখস শব্দ।
নানামি জায়দান এখন জানপ্রাণ দিয়ে পড়াশোনা করছে। সে জানে, তার ক্যারিয়ারই তাকে ভবিষ্যতে জেনিনকে বাঁচানোর ক্ষমতা দেবে। সে প্রতিদিন জেনিনের জন্য নোটস তৈরি করে রাখে, জেনিনের প্রিয় নীল কালির কলম কিনে রাখে, কিন্তু জেনিন সেই আগের মতো আর ঝাঁপিয়ে পড়ে সেগুলো নেয় না। জেনিন এখন এক অদ্ভুত গাম্ভীর্যের চাদর মুড়ি দিয়ে থাকে।
“আজ কি বিকেলে আমার বাসায় আসবি? মা তোর প্রিয় ইলিশ মাছ রেঁধেছেন,” নানামি টিফিন পিরিয়ডে জেনিনের কাছে গিয়ে নিচু স্বরে বলল।
জেনিন জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। সে একবার নানামির দিকে তাকালো। নানামির সেই মায়াবী চোখে আজও বন্ধুত্বের একই পবিত্রতা। কিন্তু জেনিনের ভেতরটা এখন বিষাক্ত। সে নিজেকে নানামির এই ‘আদর্শ’ জীবন থেকে বিযুক্ত করতে চায়।
“না। আমার আজ কাজ আছে। তুই বরং নোবারাকে সাথে নিয়ে বাসায় যা। ও তো ক্লাস নাইন থেকে টেন-এ উঠল, ওকে একটু ম্যাথ বুঝিয়ে দিস,” জেনিন খুব নির্লিপ্তভাবে বলল।
নানামি অবাক হলো। জেনিন কোনোদিন তাকে আর নোবারাকে একা সময় কাটাতে বলেনি। জেনিন তো সবসময় পজেসিভ ছিল। তবে কি জেনিন নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে? নানামি অনুভব করল তাদের বন্ধুত্বের সেই সুতায় টান পড়েছে।
স্কুল ছুটির পর নানামি দেখল নোবারা গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। নোবারা আকারি এখন ক্লাস টেন-এ উঠেছে। তার গায়ের ইউনিফর্মটা একটু বড় হয়েছে, চোখেমুখে এখন আগের চেয়েও বেশি স্নিগ্ধতা। সে নানামিকে দেখে একটু হাসল, কিন্তু তার চোখ খুঁজছিল অন্য কাউকে।
“জেনিন ভাইয়া কোথায়? আজকেও কি উনি আগে চলে গেছেন?” নোবারা জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ, ওর বোধহয় জরুরি কোনো কাজ ছিল,”
নোবারা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আপনারা দুজন আর আগের মতো নেই নানামি ভাইয়া। আগে জেনিন ভাইয়া সারা স্কুল মাতিয়ে রাখত, আর এখন উনি পাথরের মতো হয়ে গেছেন। আমার কেন যেন খুব ভয় লাগে।”
নানামি কোনো উত্তর দিতে পারল না। সে নোবারাকে নিয়ে তার বাসার দিকে হাঁটা দিল। পথে যেতে যেতে তারা আগের স্মৃতিগুলো রোমন্থন করছিল। কিন্তু প্রতিটা স্মৃতিতেই জেনিন ছিল মধ্যমণি। জেনিন ছাড়া তাদের গল্পগুলো যেন অসম্পূর্ণ। নোবারা নানামির বাসায় গিয়ে নানামির মায়ের সাথে অনেক গল্প করল, পড়াশোনা করল। কিন্তু জেনিনের শূন্যতা সেই বিকেলের রোদে এক অদ্ভুত বিষণ্নতা ছড়িয়ে দিল।
অন্যদিকে জেনিন তখন শহরের রেললাইন সংলগ্ন এক পরিত্যক্ত বস্তিতে বসে ছিল। তার সামনে সেই ‘ছায়া সাহেবের’ পাঠানো দুজন লোক। তারা জেনিনকে শেখাচ্ছে কীভাবে একটা ছোট পিস্তল লোড করতে হয়। জেনিনের হাত কাঁপছে না। সে অবাক হয়ে দেখল, বইয়ের পাতার চেয়ে এই ধাতব অস্ত্রের স্পর্শ তাকে বেশি শিহরণ দিচ্ছে।
“শোন ছেলে, এসএসসি পরীক্ষাটা তুই জাস্ট দিয়ে দে। সার্টিফিকেটের দরকার আছে। তারপর তোকে আমাদের মেইন আস্তানায় নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে তুই পাবি আসল ক্ষমতা,” লোকগুলোর একজন জেনিনের কাঁধে হাত রেখে বলল।
জেনিন অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবল—আজ যদি নানামি তাকে এখানে দেখত, তবে সে কী করত? নানামি হয়তো তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদত। কিন্তু জেনিন আর কাঁদতে চায় না। সে চায় এমন এক শক্তি, যাতে তার বাবা আর কোনোদিন তাকে ত্যাজ্যপুত্র বলার সাহস না পায়। সে চায় এমন এক উচ্চতা, যেখান থেকে সে নোবারাকে পুরো পৃথিবীর বিপদ থেকে আগলে রাখতে পারে, হোক সেটা অন্ধকারের পথ।
পরের দিন স্কুলে মক টেস্ট ছিল। নানামি আর জেনিন পাশাপাশি বসল। পরীক্ষার হলের সেই নিস্তব্ধতায় নানামি দেখল জেনিন কিছুই লিখছে না। সে শুধু খাতার পাতায় কলম দিয়ে হিজিবিজি কাটছে। নানামি নিজের খাতাটা একটু জেনিনের দিকে সরিয়ে ধরল যাতে জেনিন কিছু কপি করতে পারে। জেনিন একবার নানামির খাতার দিকে তাকালো, তারপর এক অদ্ভুত তাচ্ছিল্যের সাথে তার নিজের খাতাটা টেনে নিল।
“আমাকে তোর করুণা করতে হবে না। আমি নিজের ভাগ্য নিজেই লিখব,” জেনিন ফিসফিস করে বলল।
নানামির বুকটা হাহাকার করে উঠল। সে বুঝল জেনিন তার সাহায্যকেও এখন অপমান মনে করছে। এসএসসি পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন শুরু হয়ে গেছে। ফরম পূরণের সময় জেনিন তার বাবার নাম লিখতে গিয়ে বারবার থমকে যাচ্ছিল। নানামি পাশে দাঁড়িয়ে থেকে তাকে সাহস দিল।
স্কুলের সেই বিকেলগুলো এখন আর আগের মতো রঙিন নেই। বাউন্ডুলেপনা এখন অপরাধপ্রবণতায় রূপ নিয়েছে। জেনিন মাঝেমধ্যে স্কুল কামাই করে কোথায় যায় কেউ জানে না। নানামি তাকে আগলে রাখতে চায়, কিন্তু জেনিন যেন এক সর্পিল পথ দিয়ে পাতালে নেমে যাচ্ছে। নোবারা মাঝেমধ্যে জেনিনের জন্য টিফিন নিয়ে আসে, কিন্তু জেনিন তা ফিরিয়ে দেয়।
“নোবারা, তুমি নানামির খেয়াল রেখো। ও অনেক বড় অফিসার হবে। আর আমার দিকে তাকানো বন্ধ করো, আমি অন্ধকারের পথিক,” জেনিন একদিন বৃষ্টির দুপুরে নোবারাকে বলে দিল।
নোবারা সেদিন ঝরঝর করে কেঁদে দিয়েছিল। সেই কান্না নানামির কানে পৌঁছালেও সে কিছু করতে পারেনি। এসএসসি পরীক্ষার রুটিন হাতে পাওয়ার পর দুই বন্ধু শেষবারের মতো স্কুল লাইব্রেরিতে বসল। নানামি জেনিনকে কিছু ইম্পর্ট্যান্ট কোশ্চেন দাগিয়ে দিচ্ছিল। জেনিন চুপচাপ সেগুলো দেখছিল। হঠাৎ জেনিন নানামির হাতটা ধরল।
“যদি আমি পরীক্ষা না দেই?”
“কেন? এতদিনের পরিশ্রম…”
“পরিশ্রম তো তুই করেছিস আমার জন্য। আমি তো শুধু তোর ছায়া হয়ে ছিলাম। আমি চাই না তুই আমার জন্য আর কষ্ট কর। তুই তোর পথে চল, আমাকে আমার পথে যেতে দে।”
নানামি জেনিনের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোর পথ আমার পথ আলাদা নয় নুরশাদ। তুই যেখানে যাবি, আমি সেখানে আলোর মশাল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকব।”
কিন্তু জেনিন মনে মনে হাসল। সে জানত, সামনে যে গভীর অন্ধকার অপেক্ষা করছে, সেখানে আলোর মশাল কেবল শত্রুদের নজর কাড়ে। সে চায় নানামি নিরাপদ থাক। সে চায় নোবারা সুন্দর থাক। আর এই সুরক্ষার জন্য জেনিন নিজেকে বলির পাঁঠা করতেও প্রস্তুত।
এসএসসি পরীক্ষার আগে দিয়ে জেনিন পুরোপুরি ভবঘুরে হয়ে গেল। সে আর নানামিদের বাসায় ফেরে না। সে কখনো স্টেশনে ঘুমায়, কখনো গুদামে। নানামি তাকে খুঁজে খুঁজে হয়রান। কিন্তু জেনিন যেন বাতাসের সাথে মিশে গেছে। স্কুলের টিচাররা জেনিনের নাম হাজিরা খাতা থেকে কেটে দেওয়ার হুমকি দিলেন। নানামি প্রতিবার গিয়ে হাতজোড় করে তাদের থামাল।
স্কুল লাইফের এই শেষ ভাগটা ছিল এক দীর্ঘ বিরহ আর মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের গল্প। জেনিন নুরশাদ তার উশৃঙ্খল জীবনের মাঝেও নানামির প্রতি এক গভীর মায়া অনুভব করে, কিন্তু সেই মায়া প্রকাশ করতে সে ভয় পায়। কারণ সে জানে, মায়া মানেই দুর্বলতা। আর নানামি জায়দান তার আদর্শ আর ভালোবাসা দিয়ে জেনিনকে ধরে রাখতে চায়, কিন্তু সে বুঝতে পারছে না যে আগ্নেয়গিরিকে হাত দিয়ে চাপা দিয়ে রাখা যায় না।
এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র যখন ঘোষণা হলো, দেখা গেল জেনিন আর নানামির সিট পড়েছে একই রুমে। নানামি একটু স্বস্তি পেল। সে ভাবল, অন্তত পরীক্ষার ওই কয়েকটা দিন সে জেনিনকে নিজের চোখের সামনে পাবে। কিন্তু সে জানত না, এই পরীক্ষার শেষ দিনটিই হবে তাদের বন্ধুত্বের শেষ দিন।
নোবারা আকারি এখন শুধু প্রার্থনায় মগ্ন। সে চায় জেনিন ভাইয়া সুস্থ হয়ে ফিরে আসুক, সে চায় নানামি ভাইয়া সফল হোক। কিন্তু বড়দের জগতটা বড় নিষ্ঠুর। জেনিন নুরশাদ এখন আর স্কুলপড়ুয়া কিশোর নয়, তার হাতে এখন প্রথম রক্তের দাগ লাগার অপেক্ষা।
চলবে ইংশাআল্লাহ……

