Soulmate_to_Enemy #পর্ব_৭

0
2

#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৭
লেখনীতে:#মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের দিন। বাতাসের আর্দ্রতায় যেন আজ এক ধরণের চাপা উত্তেজনা মিশে আছে। সেন্ট জুড হাই স্কুলের সামনের চত্বরটা লোকে লোকারণ্য। কেউ কাঁদছে, কেউ হাসছে, কেউবা স্নায়ুর চাপে বারবার মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু স্কুলের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা সেই দুই বন্ধুর মধ্যে যেন এক ভিন্ন জগত।

নানামি জায়দান শান্ত। তার মুখে সেই চিরচেনা ধীরস্থির ভাব, যদিও পকেটের ভেতর তার হাত দুটো বারবার মুষ্টিবদ্ধ হচ্ছে। সে নিজের জন্য চিন্তিত নয়, সে চিন্তিত তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ওই ছেলেটির জন্য, যে আজ সকাল থেকে একটা কথাও বলেনি। জেনিন নুরশাদ-এর চোখের নিচে কালি, গত রাতে সে এক মুহূর্তের জন্যও চোখ বুজতে পারেনি। তার কাছে এই রেজাল্ট শুধু একটা মার্কশিট নয়; এটা হলো তার বাবার সেই ‘অপদার্থ’ তকমাটা মুছে ফেলার শেষ সুযোগ।

হঠাৎ স্কুলের নোটিশ বোর্ডের কাছে বিশাল শোরগোল শুরু হলো। হেডমাস্টার মশাই বের হয়ে এলেন একটা কাগজ হাতে নিয়ে। জেনিন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, কিন্তু নানামি ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড পর নানামি যখন ফিরে এল, তার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে আছে। সে জেনিনের সামনে এসে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

“কী হয়েছে? আমি কি ফেল করেছি?” জেনিনের গলার স্বর কাঁপছে।

নানামি কোনো কথা না বলে জেনিনকে জাপটে ধরল। এক নিবিড় আলিঙ্গন। জেনিন অনুভব করল নানামির কাঁধটা একটু কাঁপছে। নানামি জেনিনের কানে ফিসফিস করে বলল, “তুই পেরেছিস! তুই গোল্ডেন না পেলেও জিপিএ ৫ পেয়েছিস! তোর পয়েন্ট আমার প্রায় কাছাকাছি!”

জেনিন এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল। তার মনে হলো তার চারপাশের পৃথিবীটা থমকে গেছে। সে? জেনিন নুরশাদ, যে কি না মারামারি আর ভবঘুরেপনায় দিন কাটাত, সে আজ জিপিএ ৫ পেয়েছে? সে নিজেকে নানামির আলিঙ্গন থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দৌড়ে নোটিশ বোর্ডের কাছে গেল। দেখল তার রোল নম্বরের পাশে উজ্জ্বল অক্ষরে লেখা সেই সাফল্য।

ঠিক সেই মুহূর্তেই তার ফোনের ভাইব্রেশন হলো। স্ক্রিনে ভেসে উঠল, বাবা’। জেনিনের হাতটা থরথর করে কাঁপতে লাগল। সে ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরল।

“রেজাল্ট কী?” ওপাশ থেকে আশফাক নুরশাদের গম্ভীর এবং শীতল কণ্ঠস্বর।

“বাবা, আমি 5 পেয়েছি। জিপিএ 5।” জেনিনের কণ্ঠে এক পরম তৃপ্তি। সে ভেবেছিল আজ হয়তো বাবা তাকে বুকে টেনে নেবেন।

কিন্তু ওপাশ থেকে দীর্ঘ নীরবতা। তারপর শোনা গেল এক বিদ্রূপাত্মক কণ্ঠস্বর, “5 পেয়েছ তাতে কী হয়েছে? নানামি তো গোল্ডেন পেয়েছে শুনেছি। ওর দয়ায় কোনোমতে উতরে গেছ, এটা নিয়ে বেশি লম্ফঝম্প করো না। বিকেলের মধ্যে বাসায় আসো, তোমার সামনের পড়াশোনার ব্যবস্থা আমি করে রেখেছি।”

খট করে ফোনটা কেটে গেল। জেনিনের মুখের সেই সাফল্যের হাসিটা এক মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গেল। তার মনে হলো, যে পাহাড়টা সে এতদিন ধরে বাইছিল, সেই পাহাড়ের চূড়ায় উঠে দেখল সেখানে কোনো পতাকা নেই, আছে শুধু একরাশ অবজ্ঞা।

নানামি পাশ থেকে সব শুনছিল। সে জেনিনের কাঁধে হাত রাখল, কিন্তু জেনিন এবার রুক্ষভাবে হাতটা সরিয়ে দিল। “দেখলি? জিপিএ 5 পেয়েও আমার তোর দয়ার বাহবা শুনতে হচ্ছে। তোর এই পারফেকশনই আসলে আমার সবচেয়ে বড় শত্রু।”

“আঙ্কেল রাগের মাথায় বলেছেন…”
“না,উনি ঠিকই বলেছেন। তোর ছায়াটা এত বড় যে সেখানে আমি সবসময়ই বামন হয়ে থাকব।”

জেনিনের চোখে এখন সাফল্যের আনন্দ নেই, আছে এক গভীর হীনমন্যতা আর অভিমান।
তারা যখন স্কুল থেকে ফিরছিল, পথে দেখা হলো নোবারা আকারি-র সাথে। নোবারা মিষ্টির প্যাকেট হাতে দাঁড়িয়ে ছিল। সে রেজাল্ট শুনে খুশিতে নাচতে শুরু করল।

“আমি জানতাম! আমি জানতাম আপনারা দুজনেই কামাল করবেন! জেনিন ভাইয়া, আজ কিন্তু আমাদের পার্টি দিতেই হবে!” নোবারা উজ্জ্বল চোখে জেনিনের দিকে তাকালো।

জেনিন নোবারার দিকে তাকিয়ে একটা ম্লান হাসি দিল। সে দেখল নোবারার চোখে তার জন্য একরাশ শ্রদ্ধা। জেনিন বুঝতে পারল, দুনিয়া তাকে যা-ই ভাবুক, এই মেয়েটি আর নানামি তাকে অন্যভাবে দেখে। কিন্তু বাবার ওই অবজ্ঞা জেনিনের মস্তিষ্কের কোষে কোষে বিষের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।

“আজ না নোবারা। আজ আমাকে বাসায় যেতে হবে। বাবা ডেকেছেন,” জেনিন সাইকেলটা নিয়ে দ্রুত চলে গেল।

নানামি আর নোবারা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল। নোবারা খুব নিচু স্বরে বলল, “নানামি ভাইয়া, জেনিন ভাইয়ার খুশির দিনেও কেন এমন করছেন?”

নানামি আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সূর্যটা তখন মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়েছে। “ও আসলে ভালোবাসার কাঙাল নোবারা। ও সাফল্য দিয়ে ভালোবাসা কিনতে চেয়েছিল, কিন্তু ওর বাবা ওকে এক টুকরো প্রশংসাও দিলেন না। আমি ভয় পাচ্ছি, এই অবজ্ঞা ওকে আবার অন্ধকারের দিকে না ঠেলে দেয়।”
সেই বিকেলে জেনিন যখন তার রাজপ্রাসাদের মতো বাড়িতে ঢুকল, দেখল তার বাবা ড্রয়িংরুমে বসে কিছু নথিপত্র দেখছেন। জেনিন সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আশফাক নুরশাদ মাথা না তুলেই বললেন,
“শোনো জেনিন, তোমার এই রেজাল্ট দিয়ে খুব বেশি দূর যাওয়া যাবে না। আমি তোমাকে এই শহরের নামকরা কলেজে ভর্তি করে দেব ঠিকই, কিন্তু তোমাকে হোস্টেলে থাকতে হবে। নানামির ওই পরিবারের সাথে আর কোনো যোগাযোগ রাখা চলবে না। ওরা তোমাকে নিচু মানসিকতার বানিয়ে দিচ্ছে।”

জেনিন চিৎকার করে উঠল, “নিচু মানসিকতা? ওরা আমাকে মানুষ করেছে বাবা! আপনি তো শুধু টাকা দিয়েছেন, ওরা আমাকে ঘর দিয়েছে, মায়া দিয়েছে!”

“চুপ করো!” আশফাক নুরশাদ গর্জে উঠলেন।

“মায়ার গল্প আমাকে শোনাবে না। আজ থেকে তুমি আমার কড়া নজরদারিতে থাকবে। আর যদি ওই মাস্টারের ছেলের সাথে দেখি, তবে তোমার পড়াশোনা আমি চিরতরে বন্ধ করে দেব।”

জেনিন নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। সে তার ডায়েরিটা বের করল। সেখানে নানামির সাথে তোলা একটা ছবি ছিল। জেনিন ছবিটার ওপর হাত বোলাতে লাগল। তার মনে হচ্ছিল, সে এক খাঁচায় বন্দি পাখি, আর নানামি হলো সেই মুক্ত আকাশ। সে যত বেশি নানামির কাছে যেতে চায়, খাঁচার শিকগুলো তত বেশি তার বুক চিরে দেয়।

<><><><><><><><><>

শহরের শেষ প্রান্তে পরিত্যক্ত পুরনো রেলওয়ে স্টেশন। জায়গাটা এখন আর আগের মতো কর্মচঞ্চল নেই। ভাঙা প্ল্যাটফর্মের ওপর আগাছা জন্মেছে, আর মরচে পড়া রেললাইনগুলো যেন অতীতের কোনো কঙ্কাল হয়ে শুয়ে আছে। সূর্যাস্তের ঠিক পরের সময়টা এখানে বড্ড বেশি বিষণ্ণ। আকাশে সিঁদুরে মেঘের আভা তখনো মেখে আছে, কিন্তু চারপাশের অন্ধকার ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে। স্টেশনের এক কোণে, যেখানে একটা পুরনো রেইনট্রি গাছ ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে সিমেন্টের ভাঙা বেঞ্চিতে পাশাপাশি বসে আছে জেনিন নুরশাদ আর নানামি জায়দান।

আশেপাশে কোনো মানুষ নেই। শুধু দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে আর থেকে থেকে স্টেশনের ধারের জঙ্গল থেকে বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ ভেসে আসছে। জেনিনের হাতে এসএসসির সেই রেজাল্ট শিটটা। সেটা এখন দুমড়ে-মুচড়ে একটা ছোট গোল্লায় পরিণত হয়েছে। নানামি চুপচাপ বসে আছে। সে জানে, জেনিন যখন এই স্টেশনে আসে, তখন তার ভেতরে একটা পাহাড়সম নীরবতা কাজ করে। এই স্তব্ধতা ভাঙার সাহস নানামিরও নেই।

জেনিন হঠাৎ রেজাল্ট শিটটা পকেট থেকে বের করে মাটির ওপর রাখল। তারপর খুব সাবধানে সেটাকে ঘাসের ওপর বিছিয়ে দিল। তার আঙুলগুলো কাঁপছে। জেনিন আজ এক অদ্ভুত ঘোরগ্রস্ত অবস্থায় আছে। তার পরনে সেই সাদা শার্ট, যার হাতাগুলো কনুই পর্যন্ত গোটানো। নানামি খেয়াল করল, জেনিনের হাতের রগগুলো ফুলে উঠছে। সে বুঝতে পারছে, জেনিনের ভেতরে একটা আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরণের অপেক্ষা করছে।

দীর্ঘ দশটি মিনিট পার হয়ে গেল। জেনিন পকেট থেকে একটা পুরনো লাইটার বের করল। সেটা জ্বালিয়ে সে ম্লান শিখাটির দিকে তাকিয়ে রইল। নানামি একপলক জেনিনের দিকে তাকিয়ে আবার মাথা নিচু করে নিল। জেনিন লাইটারটা দিয়ে রেজাল্ট শিটটার এক কোণে আগুন ধরিয়ে দিল।

খুব ধীরে ধীরে কাগজটা পুড়তে লাগল। নীল ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উপরের দিকে উঠছে। জেনিনের মুখে এক বিচিত্র অভিব্যক্তি, না সেটা কষ্টের, না সেটা রাগের। ওটা যেন এক চূড়ান্ত বিসর্জনের চিহ্ন।

পুরো কাগজটা যখন ছাই হয়ে গেল, জেনিন সেই ছাইগুলো বাতাসের দিকে উড়িয়ে দিল। সে নানামির দিকে না তাকিয়েই খুব নিচু স্বরে বলল, “আজ এই ছাইয়ের সাথে সাথে আমার ভেতরের শেষ ‘ভালো ছেলে’ হওয়ার ইচ্ছে ও উড়ে গেল রে।”

নানামি নড়ল না। সে শুধু দেখল, জেনিনের চোখ থেকে এক ফোঁটা জলও পড়ল না। জেনিন নুরশাদ আজ পাথরের চেয়েও শক্ত হয়ে গেছে। নানামি জানে, জেনিনের বাবার সেই অপমানজনক কথাগুলো এই কাগজের চেয়েও বেশি পুড়িয়েছে জেনিনকে। সে রেজাল্ট দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছিল সে অযোগ্য নয়, কিন্তু তার পৃথিবী তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে সে চিরকালই ব্রাত্য।

জেনিন বেঞ্চ থেকে উঠে রেললাইনের ওপর গিয়ে দাঁড়াল। দুই লাইনের মাঝখানের পাথরগুলোর ওপর সে ভারসাম্য রেখে হাঁটতে শুরু করল। নানামিও তার পিছু পিছু এল। জেনিন হঠাৎ থেমে গেল। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে নানামির চোখের দিকে সরাসরি তাকালো। স্টেশনের টিমটিমে হলুদ আলোর নিচে জেনিনের চোখ দুটোকে আজ মানুষের চোখ বলে মনে হচ্ছে না। ওটা যেন কোনো এক আহত পশুর চাহনি।

“জায়দান, তুই কি জানিস আমার সবচেয়ে বেশি কষ্ট কোথায় হয়?” জেনিন নিজের বুকের বাঁ দিকে হাত রাখল। “কষ্টটা এখানে নয়। কষ্টটা হয় যখন আমি দেখি তুই আমার জন্য নিজের জীবনটা নষ্ট করছিস। তুই একটা পরিষ্কার আকাশ, আর আমি একটা নর্দমা। তুই কেন আমাকে তোর সাথে টানিস?”

নানামি এবার জেনিনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সে জেনিনের কলারটা শক্ত করে চেপে ধরল। নানামির চোখে রাগ নয়, বরং এক অসহ্য বেদনা। “তুই নর্দমা কি আকাশ সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, তুই আমার অস্তিত্ব। তুই নিজেকে ঘৃণা করিস ঠিক আছে, কিন্তু আমার বিশ্বাসকে ঘৃণা করিস না।”

জেনিন এক ঝটকায় নানামির হাত সরিয়ে দিল। তার ভেতরে জমে থাকা জেদ এখন ঘৃণায় রূপ নিতে চাইছে। কিন্তু সে ঘৃণাটা কার ওপর? নিজের ওপর, নাকি এই সমাজের ওপর? জেনিন রেললাইনের পাশ থেকে একটা ভাঙা কাঁচের টুকরো কুড়িয়ে নিল। জায়গাটা অন্ধকারে আধো-আলো। জেনিন কাঁচের টুকরোটা নিজের হাতের তালুর ওপর চেপে ধরল।

“নুরশাদ! কী করছিস?” নানামি চিৎকার করে উঠল। সে জেনিনের হাত থেকে কাঁচটা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করল।

কিন্তু জেনিন সরে গেল না। সে তার হাতের তালুতে গভীর একটা আঁচড় কাটল। ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়ে এল। রক্তের লাল রঙটা ট্রেনের মরচে পড়া লাইনের ওপর টপটপ করে পড়তে লাগল। নানামি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে দেখল জেনিন যন্ত্রণায় একটুও কুঁকড়ে গেল না, বরং তার মুখে একটা পৈশাচিক প্রশান্তি ফুটে উঠল।

“এই রক্তটা সাক্ষী নানামি,” জেনিন তার রক্তাক্ত হাতটা নানামির দিকে বাড়িয়ে ধরল। “আজ থেকে এই জেনিন নুরশাদ আর কারো দয়ায় বাঁচবে না। তুই আমার বন্ধু, তুই আমার সব, কিন্তু মনে রাখিস, যদি কোনোদিন এই সমাজ বা আমার বাবা তোকে আমার বিরুদ্ধে দাঁড় করায়, তবে আমি নিজেকে শেষ করে দেব, তবু তোর হার মেনে নেব না। এই রক্ত আমি আমার বাবার অপমানের বদলে ঢাললাম।”

নানামি জেনিনের সেই রক্তাক্ত হাতটা নিজের দুহাতের তালুতে তুলে নিল। সে তার পকেট থেকে নিজের রুমালটা বের করে জেনিনের ক্ষতে খুব যত্ন করে বাঁধতে লাগল। রুমালটা মুহূর্তের মধ্যে লাল হয়ে গেল। নানামির চোখ দিয়ে এবার অঝোরে জল পড়তে লাগল। সে জেনিনের হাতের ওপর নিজের কপাল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

“কেন তুই নিজেকে এভাবে শাস্তি দিস? আমি তোকে আগলে রাখতে চাই, কিন্তু তুই বারবার নিজের শরীরটাকে ক্ষতবিক্ষত করিস। তুই কি বুঝতে পারিস না তোর শরীরে একটা আঁচড় লাগলে আমার আত্মাটা রক্তাক্ত হয়?” নানামির গলার স্বর কান্নায় ভিজে এল।

স্টেশনের সেই নির্জনতায় দুই কিশোরের এক অদ্ভুত দৃশ্য তৈরি হলো। একজন রক্তাক্ত, অন্যজন ক্রন্দিত। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। জেনিন অনুভব করল নানামির চোখের জল তার হাতের ক্ষতের ওপর পড়ছে। সেই লোনা জলের স্পর্শে জেনিনের পাথুরে হৃদয়টা এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল। সে নানামির মাথায় নিজের অন্য হাতটা রাখল। জেনিন বুঝতে পারল, পৃথিবীতে যদি কেউ তার জন্য সত্যিই নিঃস্বার্থভাবে কাঁদতে পারে, তবে সে এই ছেলেটি।

“কাদিস না” জেনিন খুব মায়াবী গলায় বলল। “তোর চোখে জল দেখলে আমার মনে হয় আমি সত্যি এক বিশাল অপরাধী। তুই জানিস না, তোর এই মায়াটাই আমাকে দুর্বল করে দেয়। আমি চাচ্ছি একটা দানব হতে, কিন্তু তুই আমাকে বারবার মানুষ বানিয়ে দিচ্ছিস।”

নানামি মাথা তুলল। সে তার চোখের জল মুছে জেনিনের দিকে তাকালো। “দানব হওয়ার পথটা অনেক বড় জেনিন, কিন্তু মানুষের হাত ধরে হাঁটার পথটা খুব ছোট আর সুন্দর। তুই কি পারিস না এই ছোট পথটায় আমার সাথে থাকতে?”

জেনিন হাসল। এক করুণ বিষণ্ণ হাসি। “পথটা সুন্দর ঠিকই নানামি, কিন্তু ওই পথের শেষে আমার জন্য কোনো ঘর নেই। আমার ঘর হলো এই অন্ধকার স্টেশনে, এই মরচে পড়া লাইনে।”

তারা আবার সেই বেঞ্চিতে এসে বসল। জেনিনের হাতটা এখন নানামির কোলের ওপর রাখা। রুমাল দিয়ে বাঁধা ক্ষতটা থেকে তখনো হালকা রক্ত চুইয়ে পড়ছে। নানামি সেই হাতটা আলতো করে ধরে আছে, যেন একটু ছাড়লেই জেনিন হারিয়ে যাবে।
রাতের অন্ধকার এখন গাঢ় হয়ে চেপে বসেছে।

স্টেশনের দূরে থাকা কোনো একটা কেবিনের ঘর থেকে টিমটিমে একটা লাল বাতি জ্বলছে-নিভছে। জেনিন এক দৃষ্টিতে সেই লাল বাতির দিকে তাকিয়ে রইল। সে ভাবতে লাগল তার ভবিষ্যতের কথা। এসএসসি শেষ হলো, এখন কলেজ জীবন। জেনিন জানে তার বাবা তাকে হোস্টেলে পাঠিয়ে দেবেন। নানামি থেকে তাকে আলাদা করে দেওয়ার সব ছক কষা হয়ে গেছে। এই বিচ্ছেদ জেনিন সহ্য করতে পারবে না। সে যদি নানামিকে না পায়, সে পুরোপুরি বিচ্যুত হয়ে যাবে।

“জায়দান” জেনিন হঠাৎ ডাকল।

“বল।”

“যদি কোনোদিন পরিস্থিতি এমন হয় যে তোকে আর আমাকে একে অপরের বিরুদ্ধে বন্দুক ধরতে হয়, তুই কি গুলি চালাতে পারবি?”

নানামি শিউরে উঠল। সে জেনিনের হাতটা আরও শক্ত করে ধরল। “কীসব আজেবাজে কথা বলছিস জেনিন! কেন আমাদের একে অপরের বিরুদ্ধে বন্দুক ধরতে হবে?”

“জানি না। কেন যেন মনে হয় আমাদের শেষটা খুব একটা ভালো হবে না। তুই হবি ন্যায়ের মূর্ত প্রতীক, আর আমি হব অন্যায়ের রাজা। এই বৈপরীত্য আমাদের কোনোদিন এক থাকতে দেবে না।”

নানামি দৃঢ় গলায় বলল, “যদি ওই দিন আসে, তবে আমি নিজের বুকেই গুলি চালাব, তবু তোর দিকে বন্দুক তাক করব না।”

জেনিন চুপ হয়ে গেল। সে জানত নানামি এটাই বলবে। নানামির এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা জেনিনকে একই সাথে শক্তি দেয় এবং ভেতরে ভেতরে শেষ করে দেয়। জেনিন চায় নানামি স্বার্থপর হোক, নানামি নিজের কথা ভাবুক, কিন্তু নানামি তো নানামিই। সে জেনিনকে ঘিরেই তার পৃথিবী সাজিয়েছে।

স্টেশনের ঘড়িতে তখন ঢং ঢং করে শব্দ হলো। রাত বাড়ছে। জেনিন উঠে দাঁড়ালো। সে তার শার্টের বোতামগুলো ঠিক করে নিল। তার রক্তাক্ত হাতটা পকেটে ঢুকিয়ে ফেলল। সে চাইল না নানামির মা বাসায় এই রক্তমাখা রুমালটা দেখে কোনো প্রশ্ন করুন।

“চল, বাসায় যাই। মামণি নিশ্চয়ই তোর রেজাল্টের জন্য পায়েস বানিয়ে অপেক্ষা করছেন,” জেনিন স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল।

তারা যখন স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, তাদের ছায়াগুলো সেই দীর্ঘ রেললাইনের ওপর দিয়ে প্রসারিত হচ্ছে। জেনিন একবার পেছন ফিরে সেই রেইনট্রি গাছটার দিকে তাকালো। সে মনে মনে সেখানে নিজের কৈশোরকে সমাহিত করে দিয়ে এল। আজ থেকে সে অন্য এক জেনিন। যে জেনিন কেবল পাওয়ার জন্য লড়বে, হারার ভয় সে আর করবে না।

পথে যেতে যেতে জেনিন লক্ষ্য করল নানামি বারবার তার দিকে তাকাচ্ছে। নানামির চোখে এক ধরণের গভীর উদ্বেগ। সে জানে জেনিন আজ যা করল, তা কেবল একটা শুরু। জেনিনের ভেতরের সেই অবদমিত জেদ এখন এক নতুন রূপ নেবে। নানামি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, সে জেনিনের এই রক্তপাতের ঋণ শোধ করবে মায়া দিয়ে। সে জেনিনকে অন্ধকারের অতলে তলিয়ে যেতে দেবে না।

সেই রাতে জেনিন নানামিদের বাসায় ফিরে নিজের রুমে গিয়ে একা বসে রইল। নানামি তখনো ডাইনিং রুমে তার মা-বাবার সাথে কথা বলছে। জেনিন তার পকেট থেকে সেই রক্তমাখা রুমালটা বের করল। সে সেটাকে ধুতে পারল না। সে সেটাকে তার ড্রয়ারের একদম গভীরে লুকিয়ে রাখল। এটা হলো তাদের বন্ধুত্বের এক রক্তাক্ত দস্তাবেজ।

জেনিন জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখল একটা বড় নক্ষত্র খসে পড়ছে। সে মনে মনে চাইল, যদি কোনোদিন সে অপরাধীও হয়, তবে যেন তার শেষটা হয় নানামির বুকেই। সে যেন অন্য কারো হাতে নয়, কেবল নানামির হাতেই নিজের জীবনটা সমর্পণ করতে পারে।

<><><><><><><><><>

স্টেশনের রক্তাক্ত অঙ্গীকারের পর জেনিন নুরশাদের ভেতরে যেন এক নিদারুণ শীতলতা নেমে এসেছে। এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট পরবর্তী এই দিনগুলো হওয়ার কথা ছিল উৎসবের, কিন্তু জেনিন আর নানামির জন্য তা হয়ে দাঁড়িয়েছে আসন্ন বিচ্ছেদের এক দীর্ঘ শোকগাথা। জেনিনের বাবা তাকে পাকাপাকিভাবে এই শহর থেকে দূরে পাঠিয়ে দেওয়ার সব বন্দোবস্ত করে ফেলেছেন। আর মাত্র কয়েকটা দিন, তারপর জেনিনকে পাড়ি দিতে হবে এক অচেনা গন্তব্যে, যেখানে কোনো নানামি থাকবে না, থাকবে না কোনো আশ্রয়।

সেদিন বিকেলটা ছিল মেঘলা। নদীর পাড়ে ধলপুর ঘাটের পুরনো বটতলায় তারা দুজন বসে আছে। জেনিনের হাতের সেই ক্ষতটা এখন শুকিয়ে কালো হয়ে গেছে, কিন্তু তার মনের ক্ষতটা টাটকা। নদীর জল আজ ঘোলাটে, থেকে থেকে কচুরিপানা ভেসে যাচ্ছে এক অজানা গন্তব্যে। জেনিন জলের দিকে তাকিয়ে একটা মাটির টুকরো ছুড়ল। টুপ করে একটা শব্দ হলো, তারপর আবার সব চুপচাপ।

পনেরো মিনিট পার হয়ে গেল। নানামি আজ কোনো বই আনেনি, কোনো পড়ার কথা বলেনি। সে শুধু জেনিনের পাশে বসে তার কাঁধের সাথে নিজের কাঁধ ঠেকিয়ে রেখেছে। জেনিন অনুভব করতে পারছিল নানামির শরীরের উষ্ণতা। এই স্পর্শটুকু হয়তো আর কয়েকদিন পর তার কাছে এক অলীক কল্পনা হয়ে যাবে।

“নদীটা কত স্বাধীন দেখ নানামি,” জেনিন হঠাৎ খুব নিচু স্বরে কথা বলল। “ও জানে ওকে সাগরে মিশতেই হবে। কেউ ওকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে পারে না। আর আমার জীবনটা দেখ—একটা খাঁচার পর আরেকটা খাঁচা।”

নানামি নদীর ওপারে তাকিয়ে রইল। সেখানে দিগন্তের রেখায় মিশে গেছে ধূসর আকাশ। সে জেনিনের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। জেনিন আজ হাতটা সরিয়ে নিল না। সে তার মাথাটা আলতো করে নানামির কাঁধে রাখল। দুই বন্ধুর এই নৈকট্য আজ এক অদ্ভুত বিষাদমাখা।

“তোকে কি সত্যিই চলে যেতে হবে জেনিন?” নানামির কণ্ঠে এক অব্যক্ত আর্তি।

জেনিন উত্তর দিল না। সে শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। উত্তরটা তারা দুজনেই জানে। জেনিনের বাবা তার পাসপোর্ট আর ভিসা রেডি করে ফেলেছেন। জেনিনকে যেতেই হবে। এটা শুধু দেশ ছাড়ার কথা নয়, এটা হলো জেনিনকে নানামির প্রভাব থেকে মুক্ত করার এক চূড়ান্ত ষড়যন্ত্র।

ঘাটের একপাশে একটা পুরনো নৌকো বাঁধা ছিল। জেনিন উঠে দাঁড়িয়ে নানামিকে ইশারা করল। তারা দুজন সেই নৌকোয় গিয়ে বসল। মাঝি নেই, শুধু জল আর তারা দুজন। জেনিন লগি দিয়ে নৌকোটাকে ঘাট থেকে একটু দূরে ঠেলে দিল। মাঝনদীতে যখন নৌকোটা দুলতে শুরু করল, জেনিন আকাশের দিকে তাকিয়ে শুয়ে পড়ল। নানামি তার পাশে বসে রইল পাহারাদারের মতো।

তারপর জেনিন একটা শুকনো হাসি দিয়ে পকেট থেকে একটা ছোট রুপোর চেন বের করল। চেনের নিচে একটা ছোট লকেট। সে লকেটটা নানামির হাতে দিয়ে বলল,
“এটা আমার মায়ের শেষ স্মৃতি ছিল। এটা তুই রাখ। যেদিন তুই আমাকে ঘৃণা করতে চাইবি, সেদিন এটা দেখে মনে করিস একটা ছেলে তোকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি চেয়েছিল।”

নানামি লকেটটা মুঠোয় চেপে ধরল। সে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু গলার কাছে একটা দলা পাকিয়ে এল। আজ জেনিন যেন সব গুছিয়ে বিদায় নিচ্ছে। এই বিদায়টা বড় বেশি পরিকল্পিত।

সূর্যটা যখন দিগন্তের নিচে ডুবে গেল, চারপাশটা নীলচে অন্ধকারে ছেয়ে এল। নদীর বুকে কুয়াশা জমতে শুরু করেছে। জেনিন নৌকোটা আবার ঘাটের দিকে ঘুরিয়ে আনল। ঘাটে নামার সময় জেনিন হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। সে দেখল দূরে ঝোপের আড়ালে একটা কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। জেনিন চিনে ফেলল—ওটা তার বাবার গাড়ি। তার মানে তার সময় ফুরিয়ে এসেছে।

“তুই এখন চলে যা। আমাকে হয়তো আজই ওরা নিয়ে যাবে,” জেনিন দ্রুত গলায় বলল।

“মানে? আজই? কিন্তু তুই তো বললি আরও কয়েকদিন দেরি আছে!” নানামি আতঙ্কিত হয়ে জেনিনের হাত ধরল।

“বাবা সব বুঝতে পেরেছেন। উনি জানেন আমি পালাব না, কিন্তু আমি তোর সাথে থাকলে উনি আমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। তুই যা নানামি, প্লিজ যা! আমি চাই না তুই আমার জন্য আবার অপদস্থ হ।”

নানামি নড়ল না। সে জেনিনকে জড়িয়ে ধরল। এক নিদারুণ, শ্বাসরুদ্ধকর আলিঙ্গন। জেনিনের বুকের ধুকপুকানি নানামি নিজের বুকে অনুভব করছিল। জেনিন নানামির কানে ফিসফিস করে বলল—”ভাল থাকিস বন্ধু। বড় অফিসার হস। আমাদের সেই অঙ্গীকার মনে রাখিস।”

গাড়ি থেকে দুজন লোক নেমে এল। তাদের চোখেমুখে কোনো মায়া নেই। তারা জেনিনের দিকে এগিয়ে এল। জেনিন নানামিকে ছেড়ে দিয়ে ধীর পায়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। সে একবারও পেছন ফিরে তাকালো না। সে জানত, একবার যদি সে নানামির চোখের দিকে তাকায়, তবে সে আর যেতে পারবে না। সে ভেঙে পড়বে।

নানামি ঘাটে দাঁড়িয়ে রইল। অন্ধকার নদীর বুকে ঢেউয়ের শব্দ আর জেনিনের চলে যাওয়ার পায়ের শব্দ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। গাড়িটা যখন স্টার্ট নিল, হেডলাইটের তীব্র আলোয় নানামির ছায়াটা দীর্ঘ হয়ে মাটিতে পড়ল। জেনিন চলে গেল। রয়ে গেল কেবল শূন্য ঘাট, বয়ে যাওয়া নদী আর নানামির হাতের সেই রুপোর লকেট।

অন্যদিকে জেনিন তখন গাড়ির পেছনের সিটে বসে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চোখে কোনো জল ছিল না। তার বাবার লোকগুলো তাকে সরাসরি বিমানবন্দরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। জেনিন বুঝতে পারল, আজ থেকে তার কৈশোরের সমাপ্তি। সে এখন আর নানামির জেনিন নয়, সে এখন এক যাযাবর।

গাড়ির কাঁচের ওপাশে দ্রুত চলে যাওয়া গাছপালা আর আলো দেখে জেনিন মনে মনে বলল—”আমি ফিরব নানামি। আমি অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ফিরব। সেদিন কেউ আমাদের আলাদা করতে পারবে না।”

চলবে ইংশাআল্লাহ…….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here