Soulmate_to_Enemy #পর্ব_৮

0
2

#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৮
লেখনীতে:#মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল পরবর্তী সেই অনিশ্চিত দিনগুলোতে শহরের আকাশটা যেন একটু বেশিই নীল হয়ে উঠেছিল। জেনিনকে জোর করে সরিয়ে নেওয়ার সেই প্রথম প্রচেষ্টার পর, নানামির বাবার হস্তক্ষেপে এবং আইনি কিছু জটিলতায় জেনিন আরও কয়েকটা মাস এই শহরে থাকার অনুমতি পেয়েছিল। কিন্তু সেই অনুমতি ছিল এক ধরণের দণ্ডাদেশের মতো, প্রতিটি মুহূর্ত ছিল ঝরে পড়ার অপেক্ষায় থাকা পাতার মতো কম্পমান। এই অনিশ্চয়তার মাঝেই জেনিন আর নানামি তাদের জীবনের সবচেয়ে প্রগাঢ়, সবচেয়ে নিবিড় সময়টুকু কাটিয়েছে। সেই দিনগুলো আজ স্মৃতিতে ধুলোবালি মাখা এক পুরনো অ্যালবামের মতো, যা খুললেই কৈশোরের ঘ্রাণ পাওয়া যায়।

শহরের সেই নির্জন রেললাইন, যেখানে জেনিন নিজের হাত কেটে রক্ত ঝরিয়েছিল, সেই জায়গাটা এখন তাদের নিয়মিত আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন বিকেলে সূর্য যখন হেলে পড়ে, তখন দুই বন্ধু সেখানে গিয়ে বসে। জেনিন এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি চুপচাপ। সে নানামির কাঁধে মাথা রেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে। কোনো কথা নেই, কোনো উচ্চবাচ্য নেই—কেবল দুটি হৃদস্পন্দনের এক হওয়া। নানামি অনুভব করে জেনিনের প্রতিটি নিঃশ্বাস। সেই নিঃশ্বাসে এখন আর কোনো বিদ্রোহ নেই, আছে কেবল এক গভীর শূন্যতা। জেনিন জানে, তার সময় ফুরিয়ে আসছে। সে চায় এই কয়েকটা দিনের প্রতিটি সেকেন্ডকে তার স্মৃতির মণিকোঠায় খোদাই করে রাখতে।

এক সন্ধ্যায় তারা যখন স্টেশনের সেই পুরনো রেইনট্রি গাছটার নিচে বসে ছিল, জেনিন হঠাৎ নানামির শার্টের হাতাটা শক্ত করে ধরল। নানামি লক্ষ্য করল জেনিনের হাতের আঙুলগুলো কাঁপছে। জেনিন আজ কোনো ডায়েরি আনেনি, কোনো লাইটার জ্বালেনি। সে শুধু নানামির চোখের দিকে তাকালো। সেই চোখে এমন এক আর্তি ছিল, যা কোনো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। নানামি জেনিনের চোখের জল মুছিয়ে দিল না, কারণ সে জানে এই জল ঝরানো প্রয়োজন। জেনিন নুরশাদের মতো পাথুরে ছেলের চোখের জল মানে হলো তার ভেতরে জমে থাকা হিমশৈল গলে যাওয়া। নানামি জেনিনকে আরও কাছে টেনে নিল। জেনিন নানামির বুকের ওপর মুখ লুকিয়ে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল। সেই কান্নায় কোনো শব্দ ছিল না, ছিল কেবল এক নিদারুণ হাহাকার।

নানামির শার্ট ভিজে যাচ্ছিল, কিন্তু সে নড়ল না। সে শুধু তার বন্ধুর পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল, যেমনটা এক মা তার সন্তানকে দেয়।

সেই দিনগুলোতে তাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল নীরবতা। তারা যখন শহরের অলিগলি দিয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াত, তখন তাদের ছায়াগুলো একসাথে মিশে এক দীর্ঘ অবয়ব তৈরি করত। জেনিন মাঝেমধ্যে কোনো এক চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে নানামির দিকে তাকিয়ে অদ্ভুতভাবে হাসত। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল এক ধরণের বিদ্রূপ, ভাগ্যের প্রতি বিদ্রূপ। নানামি বুঝতে পারত জেনিন তাকে কিছু বলতে চায়, কিন্তু বলতে পারছে না। জেনিন হয়তো বলতে চেয়েছিল,
“জায়দান, আমাকে এই নরক থেকে নিয়ে যা।” কিন্তু সে জানত নানামি চাইলেও তা পারবে না। বাস্তবতার দেয়ালগুলো অনেক উঁচু।

একদিন দুপুরে তারা নদীর ঘাটে গিয়েছিল। রোদের তীব্রতা ছিল প্রখর, কিন্তু নদীর বুক থেকে আসা ঠান্ডা বাতাস তাদের জুড়িয়ে দিচ্ছিল। জেনিন নদীর জলে পা ডুবিয়ে বসে রইল। সে ছোট ছোট নুড়ি পাথর কুড়িয়ে জলে ছুড়ছিল। প্রতিটি পাথরের আঘাতে জলে যে বৃত্ত তৈরি হচ্ছিল, জেনিন সেদিকে অপলক তাকিয়ে ছিল। নানামি তার পাশে বসে জেনিনের জন্য একটা কাগজের নৌকো বানাচ্ছিল।

জেনিন হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে নদীর ওপারে আঙুল বাড়িয়ে দেখালো। সেখানে দিগন্তের রেখায় মিশে গেছে নীল আকাশ। জেনিন ফিসফিস করে বলল,
—”যদি আমি কোনোদিন ওই আকাশের ওপারে হারিয়ে যাই, তুই কি আমাকে খুঁজে আনবি?”

নানামি উত্তর দেয়নি। সে শুধু জেনিনের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় এমনভাবে পিষল যে মনে হচ্ছিল সে জেনিনকে কোনোদিন ছাড়বে না। সেই স্পর্শে ছিল এক অলিখিত প্রতিশ্রুতি। নানামি মনে মনে বলেছিল—”আমি তোকে খুঁজতে যাব না নুরশাদ, আমি তোর জন্য আকাশ হয়ে থাকব যাতে তুই হারালেও আমার বুকেই ফিরে আসিস।”

বিকেলের দিকে তারা যখন ফিরছিল, তখন জেনিন বারবার নানামির বাসার দিকে তাকাচ্ছিল। সে এখন আর নিজের বাড়িতে ফিরতে চায় না। তার কাছে নানামির সেই ছোট দুই কামরার বাসাটাই ছিল স্বর্গ। নানামির মা যখন জেনিনকে ডাকতেন, তখন জেনিনের মনে হতো সে সত্যি কারো সন্তান।

সে রাতে নানামি আর জেনিন একই বিছানায় শুয়ে ছিল। ঘরটা অন্ধকার, শুধু জানালা দিয়ে আসা চাঁদের আলো মেঝের ওপর এক মায়াবী জলছবি তৈরি করেছে। জেনিন নানামির দিকে ফিরে শুয়ে তার হাতটা ধরল। নানামি তখনো জেগে ছিল।

জেনিন খুব নিচু স্বরে নানামিকে তাদের শৈশবের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। কীভাবে তারা প্রথমবার প্রাইমারি স্কুলে দেখা করেছিল, কীভাবে জেনিন নানামির টিফিন চুরি করে খেয়েছিল, আর কীভাবে নানামি তার জন্য শিক্ষকের কাছে মার খেয়েছিল। সেই কথাগুলো বলতে বলতে জেনিনের গলার স্বর বুজে আসছিল। স্মৃতির প্রতিটি পরত আজ এক নিদারুণ কষ্টে রূপান্তরিত হয়েছে। নানামি অন্ধকারে জেনিনের হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরল। সে বুঝল জেনিন আজ বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রতিটি স্মৃতি আজ এক একটা তীরের মতো তাদের বিঁধছে।

পরের দিন সকালে নানামি দেখল জেনিন খুব ভোরে উঠে তৈরি হয়েছে। জেনিন আজ খুব পরিপাটি, তার চুলগুলো সুন্দর করে আঁচড়ানো। তাকে দেখতে খুব মাসুম এক কিশোরের মতো লাগছে। জেনিন নানামিকে বলল আজ তারা পুরো শহরটা একবার পায়ে হেঁটে ঘুরবে। তারা হাঁটতে শুরু করল। তারা গেল সেই স্কুলে, যেখানকার করিডোরে তারা কত দৌড়াদৌড়ি করেছে। তারা গেল সেই লাইব্রেরিতে, যেখানে নানামি জেনিনকে জোর করে নিয়ে যেত পড়তে। তারা গেল সেই মাঠের কোণে, যেখানে জেনিন প্রথমবার সিগারেট হাতে নিয়েছিল আর নানামি সেটা কেড়ে নিয়ে ভেঙে ফেলেছিল। প্রতিটি জায়গা আজ কথা বলছিল। প্রতিটি ইটের ওপর যেন তাদের বন্ধুত্বের ছাপ লেগে আছে।

বিকেলের রোদে যখন তারা ক্লান্ত হয়ে পার্কের বেঞ্চিতে বসল, জেনিন তার ব্যাগ থেকে একটা ছোট কাঁচের বয়াম বের করল। বয়ামটার ভেতরে ছিল একমুঠো শুকনো কৃষ্ণচূড়া ফুল। জেনিন সেটা নানামির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল—”এগুলো আমি গত এক বছর ধরে কুড়িয়েছি। যখনই আমাদের কোনো ভালো মুহূর্ত কেটেছে, আমি একটা করে ফুল তুলে রাখতাম। এগুলো তুই রাখিস। যদি কোনোদিন আমার কথা খুব বেশি মনে পড়ে, এগুলো একটু ছুঁয়ে দেখিস।” নানামি বয়ামটা হাতে নিয়ে দেখল ফুলগুলো শুকিয়ে গেলেও তার রঙ তখনো ম্লান হয়নি। ঠিক তাদের বন্ধুত্বের মতো, পরিবেশ বদলালেও যার নির্যাস অমলিন।

সেই দিনটি ছিল বন্ধুত্বের চরম পরাকাষ্ঠার। জেনিন আর নানামির মধ্যে কোনো ঝগড়া ছিল না, কোনো প্রতিযোগিতা ছিল না। ছিল কেবল এক গভীর বিসর্জনের বেদনা। জেনিন আজ বারবার নানামির চোখের দিকে তাকাচ্ছিল, যেন সে নানামির মণি দুটোকে নিজের মস্তিষ্কে স্ক্যান করে নিতে চায়। সে জানত, সামনে যে জীবন আসছে, সেখানে কেবল অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারে এই মুখটাই হবে তার ধ্রুবতারা। নানামিও জেনিনের প্রতিটি চলাফেরা দেখছিল। সে জেনিনের শার্টের কলারটা ঠিক করে দিচ্ছিল, তার মাথার চুলগুলো সরিয়ে দিচ্ছিল ঠিক যেমন এক বড় ভাই তার ছোট ভাইকে আগলে রাখে।

<><><><><><><><><>

বিচ্ছেদের ঘণ্টা যখন মাথার ওপর বাজছে, তখন মানুষের মস্তিষ্ক এক অদ্ভুত গোলকধাঁধায় হারিয়ে যায়। জেনিন নুরশাদ গত কয়েকদিন ধরে এক অগ্নিকুণ্ডে বাস করছে। তার বাবা তাকে শহর ছাড়া করার সব আয়োজন চূড়ান্ত করে ফেলেছেন। এই চরম অস্থিরতার মাঝে জেনিনের একমাত্র আশ্রয় ছিল নানামি আর নোবারা। কিন্তু জেনিনের ভেতরের সেই আদিম, উগ্র সত্তাটি এখন ফণা তুলে দাঁড়িয়েছে। সে অনুভব করছে, সে চলে যাওয়ার পর নানামি আর নোবারা এক হয়ে যাবে। নানামির সেই নিখুঁত ব্যক্তিত্ব আর নোবারার স্নিগ্ধতা, এই দুইয়ের মাঝে জেনিন নিজেকে এক বাড়তি আবর্জনা ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারছে না।

সেদিন বিকেলে আকাশটা ছিল তামাটে রঙের। গুমোট গরমে দম বন্ধ হয়ে আসছিল। স্কুলের পেছনের সেই নির্জন বটতলায় জেনিন একা বসে ছিল। তার হাতে একটা ব্লেড, সে আনমনে গাছের ছাল খুঁটছে। ঠিক তখনই সে দেখল দূরে নানামি আর নোবারা হেঁটে আসছে। নানামি নোবারার হাতে একটা বই দিচ্ছে এবং নোবারা খুব উজ্জ্বল চোখে নানামির দিকে তাকিয়ে হাসছে।

দৃশ্যটা খুব সাধারণ হতে পারত, কিন্তু জেনিনের চোখে তা হয়ে উঠল এক বিষাক্ত দহন। জেনিন নোবারাকে ভালোবাসে তার নিজের অন্ধকার জীবনের একমাত্র আলো হিসেবে। সে নোবারাকে কোনোদিন বলতে পারেনি, কিন্তু সে মনে মনে নোবারাকে তার একান্ত নিজের বলে ভাবত। আর নানামি? নানামি তো তার অস্তিত্বের অংশ। কিন্তু আজ জেনিনের মনে হলো, তার এই দুই প্রিয় মানুষ তাকে ছাড়াই খুব সুখী। সে চলে গেলে তাদের জীবনে কোনো শূন্যতাই তৈরি হবে না। এই হীনমন্যতা আর পসেসিভনেস মুহূর্তের মধ্যে জেনিনের হিতাহিত জ্ঞান কেড়ে নিল।

জেনিন ধীর পায়ে তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখ দুটো রক্তবর্ণ, কপালে ঘাম আর চোয়াল শক্ত।
“খুব হাসাহাসি হচ্ছে, না?” জেনিনের কণ্ঠস্বর ছিল বরফের মতো শীতল কিন্তু তপ্ত।

নানামি আর নোবারা থমকে গেল। নানামি হাসিমুখে বলল, “আরে! তুই এখানে? আমরা তোকে খুঁজছিলাম। নোবারার অংকগুলো একটু বুঝিয়ে দিচ্ছিলাম আর…”

“আর কী?” জেনিন এক পা এগিয়ে এল। “আমি চলে যাচ্ছি বলে কি তোরা উৎসব শুরু করেছিস? নোবারা, তুমি তো বেশ খুশি দেখছি! নানামির সাথে থাকলে তো তোমার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। আমার মতো অপরাধীর ছেলেকে এখন আর দরকার নেই, তাই তো?”

নোবারার মুখটা অপমানে আর বিস্ময়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। “এসব কী বলছেন জেনিন ভাইয়া? আপনি জানেন আমি আপনাকে কতটা শ্রদ্ধা করি!

“শ্রদ্ধা!” জেনিন এবার পৈশাচিক হাসি হাসল। “তোমার ওই শ্রদ্ধার পেছনে যে কী আছে আমি সব বুঝি। আর জায়দান, তুই? তুই তো আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলি। তুই জানতিস আমি নোবারাকে কীভাবে দেখি। জানতিস না?”

নানামির ধৈর্য আজ বাঁধ ভাঙল। সে জেনিনের দুহাত ধরে ঝাঁকুনি দিল। “নুরশাদ! তুই পাগল হয়ে গেছিস! তুই নিজের বন্ধুদের ওপর এমন নোংরা সন্দেহ করছিস?”

জেনিন এক ঝটকায় নানামিকে ধাক্কা দিল। নানামি টাল সামলাতে না পেরে পিঠ দিয়ে গাছের সাথে ধাক্কা খেল। জেনিন এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তার ভেতরে সেই ক্রিমিনাল হার্ট স্পন্দিত হচ্ছে। সে নোবারার দিকে আঙুল উঁচিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“তোরা আমাকে দয়া করিস! তোরা চাস আমি যেন চলে যাই! তোরা দুজন মিলে এক নতুন জগত বানাবি যেখানে আমার কোনো জায়গা থাকবে না। নানামি, তুই চাস নোবারা যেন তোকে ভালোবাসুক, কারণ তুই ওর চোখে হিরো। আর আমি? আমি তো শুধু একটা গুন্ডা!”

নোবারা এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে ফুঁপিয়ে উঠল। “আপনি বড়ই স্বার্থপর জেনিন ভাইয়া। আপনি নিজেকে ছাড়া আর কাউকে ভালোবাসতে জানেন না। আমরা আপনার জন্য কতটা করি, আর আপনি আমাদের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন?”

নোবারার চিৎকার দেখে জেনিনের ভেতরটা এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল, কিন্তু পরক্ষণেই তার উগ্রতা তাকে গ্রাস করল। সে হাতের সেই ব্লেডটা দিয়ে নিজের কব্জিতে এক গভীর আঁচড় কাটল। রক্ত ছিটকে পড়ল মাটির ধূসর ঘাসে।

নানামি দৌড়ে এসে জেনিনের হাতটা চেপে ধরল।
“তুই এটা করিস না ভাই! তুই রক্তারক্তি করিস না! আমি কথা দিচ্ছি আমি আর নোবারার সামনে আসব না, তুই ওকে যা বলতে চাস বল, কিন্তু নিজেকে শেষ করিস না!”

নানামির গলার সেই অসহায় আর্তনাদ জেনিনকে আরও বেশি উত্তেজিত করে তুলল। সে নানামির কলার চেপে ধরল। দুই বন্ধুর মুখ আজ খুব কাছাকাছি। একসময় যেখানে ভালোবাসা ছিল, আজ সেখানে কেবল বিষাক্ত অভিমান।
“তুই আমাকে শেখাবি না!” জেনিন দাঁতে দাঁত চেপে বলল। “তোর এই ‘ভালো মানুষ’ ইমেজটাই আমাকে তিলে তিলে মেরেছে। তুই সবসময় ঠিক, আর আমি সবসময় ভুল। তুই সবসময় দাতা, আর আমি সবসময় গ্রহীতা। আমি এই অসম বন্ধুত্ব আর চাই না।”

জেনিন এক ঝটকায় নানামিকে ছেড়ে দিল। নানামি মাটিতে বসে পড়ল। সে জেনিনের পায়ের ওপর হাত রাখতে চাইল, কিন্তু জেনিন পিছিয়ে গেল। জেনিনের এই পসেসিভনেস আসলে তার ভালোবাসারই একটা বিকৃত রূপ। সে জেনিনকে হারানো সইতে পারছে না বলেই সে জেনিনকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। সে নোবারাকে এত বেশি ভালোবাসে যে সে চায় নোবারা যেন কেবল তার জন্যই কাঁদে।

“আজ থেকে আমাদের সব শেষ নানামি জায়দান,” জেনিন খুব শান্ত গলায় বলল, যে নিস্তব্ধতা ঝড়ের চেয়েও ভয়ংকর। “আমি কাল ভোরে শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছি। আমার পেছনে আসার চেষ্টা করবি না। যদি আসিস, তবে আমি হয়তো তোকেই মেরে ফেলব, নয়তো নিজে মরব।”

জেনিন আর পেছনে তাকালো না। সে ধীর পায়ে অন্ধকারের দিকে হেঁটে চলে গেল। নোবারা বটতলায় বসে হাউমাউ করে কাঁদছে। নানামি পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে জেনিনের ফেলে যাওয়া রক্তের দাগের দিকে তাকিয়ে রইল।

জেনিন যে খারাপ মানুষ নয়, তা নানামি জানে। সে জানে জেনিন এখন এক মানসিক যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। জেনিন নিজেকে অযোগ্য মনে করছে বলেই সে তার প্রিয় মানুষদের ওপর আক্রমণ করছে। এটা জেনিনের ঘৃণা নয়, এটা জেনিনের চরম হাহাকার। কিন্তু এই হাহাকার আজ এমন এক ক্ষতের সৃষ্টি করল যা হয়তো কোনদিনও শুকাবে না।

<><><><><><><><><>

প্রভাতটি ছিল কুয়াশাচ্ছন্ন। শহরের ধুলোবালি মাখা আকাশে সূর্যের আলো ফোটার আগেই চারপাশটা এক বিষণ্ণ চাদরে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। জেনিন নুরশাদ-এর জন্য সেদিন কোনো উৎসব ছিল না, ছিল এক চূড়ান্ত নির্বাসন। আগের বিকেলের সেই বিষাক্ত সংঘাতের পর জেনিনের ভেতরে এখন কেবল শূন্যতা। তার সেই উগ্রতা, সেই রক্তমাখা ক্ষোভ এখন ছাই হয়ে গেছে; পড়ে আছে কেবল এক শীতল হাহাকার। তার বাবা আশফাক নুরশাদ নিজে উপস্থিত থেকে তদারকি করছেন, যাতে জেনিন কোনোভাবেই আর পেছনের দিকে তাকাতে না পারে। বাড়ির সামনের কালো রঙের দামী গাড়িটা স্টার্ট দিয়ে রাখা হয়েছে। জেনিন তার ছোট ট্রাভেল ব্যাগটা নিয়ে যখন গাড়িতে উঠল, তার মনে হলো সে তার নিজের জানাজা নিজেই বহন করছে।

গাড়ি যখন স্টেশনের দিকে এগোচ্ছিল, জেনিন জানালার কাঁচে কপাল ঠেকিয়ে বসে রইল। তার মনে পড়ল গত কয়েক বছরের প্রতিটি স্মৃতি। নানামির সাথে কাটানো সেই নিবিড় দুপুর, নোবারার সেই লাজুক হাসি, আর সেই রক্তাক্ত অঙ্গীকার, সবকিছু এখন একটা চলচ্চিত্রের মতো তার চোখের সামনে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। জেনিন জানত, সে যা করেছে তা ভুল ছিল। আগের দিন নানামি আর নোবারাকে সে যে কটু কথা বলেছে, তা তার হৃদয়ের ঘৃণা থেকে নয়, বরং হারানোর ভয় থেকে এসেছিল। সে চেয়েছিল তাদের ঘৃণা করতে, যাতে চলে যাওয়াটা সহজ হয়। কিন্তু ভালোবাসা কি এত সহজে ঘৃণা হয়?

শহরের সেই পুরনো রেলওয়ে স্টেশন, যেখানে জেনিন আর নানামির কত বিকাল কেটেছে, আজ সেখানেই তাদের শেষ মিলনস্থল। জেনিন যখন প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়ালো, দেখল দূরে কুয়াশার ভেতরে দুটো অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে। জেনিনের বুকটা ধক করে উঠল। সে জানত তারা আসবে। পৃথিবী উল্টে গেলেও নানামি আসবে। জেনিন নিজেকে শক্ত করল। সে চাইল না তার দুর্বলতা ধরা পড়ুক। সে তার চোখের চশমাটা একটু ঠিক করে নিয়ে গম্ভীর মুখে ট্রেনের কামরার দিকে এগোতে লাগল।

নানামি জায়দান আর নোবারা আকারি তখন ট্রেনের বগির দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। নানামির এক হাতে একটা প্যাকেট, অন্য হাতটা পকেটে ঢোকানো। তার মুখটা ফ্যাকাশে, চোখ দুটো লাল, বোঝাই যাচ্ছে সে এক মুহূর্তের জন্যও ঘুমোতে পারেনি। নোবারার পরনে ছিল সাদা কামিজ, তার চোখ দুটো ফোলা। সে কাল থেকে কেঁদেই চলেছে। জেনিন যখন তাদের সামনে এসে থামল, পুরো প্ল্যাটফর্মে এক অসহ্য নিস্তব্ধতা নেমে এল। কেবল ট্রেনের ইঞ্জিনের ধকধক শব্দ আর থেকে থেকে হুইসেল বাজছে।

জেনিন ট্রেনের কামরার হ্যান্ডেলটা ধরল। সে একবারও তাদের চোখের দিকে তাকাচ্ছে না। নানামি পকেট থেকে হাত বের করে সেই প্যাকেটটা জেনিনের দিকে বাড়িয়ে দিল।
“এটা মা দিয়েছেন। তোর প্রিয় নারকেলের নাড়ু আর ইলিশ মাছ ভাজা। পথে খাস,” নানামির কণ্ঠস্বর এতটাই নিচু যে তা বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে হারিয়ে যাওয়ার মতো।

জেনিন প্যাকেটটা নিল, কিন্তু তার হাতটা কাঁপছিল। সে শুধু মাথা নাড়ল। নোবারা এক পা এগিয়ে এল। সে তার ব্যাগ থেকে সেই পুরনো নীল কলমটা বের করল, যেটা জেনিন তাকে ফেরত দিয়েছিল। নোবারা কলমটা জেনিনের শার্টের পকেটে গুজে দিল। তার চোখের এক ফোঁটা জল জেনিনের শার্টে গিয়ে পড়ল। জেনিন অনুভব করল সেই লোনা জলের উষ্ণতা। সে এখনো নির্বাক। তার সেই উগ্র মেজাজ আজ কোথায় হারিয়ে গেছে। সে এখন কেবল এক কিশোর, যে তার শিকড় ছিঁড়ে চলে যাচ্ছে।

ট্রেন ছাড়ার বাঁশি বাজল। গার্ড সবুজ পতাকা ওড়ালেন। ট্রেনটি এক তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে চলতে শুরু করল। জেনিন দ্রুত ট্রেনের দরজায় উঠে দাঁড়ালো। নানামি ট্রেনের সাথে সাথে হাঁটতে শুরু করল। তার চোখের চাহনিতে ছিল এক বিশাল প্রশ্ন
—”কেন নুরশাদ? কেন এভাবে শেষ করলি সব?”

জেনিন এবার আর পারল না। সে ট্রেনের রডটা শক্ত করে ধরে নিচু হয়ে নানামির দিকে তাকালো। নানামি দৌড়াচ্ছে ট্রেনের সাথে তাল মিলিয়ে। জেনিন তার হাতের সেই রুমাল দিয়ে বাঁধা ক্ষতটা নানামিকে দেখালো, যেখানে রক্ত তখনো শুকিয়ে কালচে হয়ে আছে। সে কোনো কথা বলল না, শুধু তার ঠোঁট দুটো নিঃশব্দে নড়ল। সে হয়তো বলতে চেয়েছিল,
—”আমি আসব জায়দান। আমি অনেক ক্ষমতা নিয়ে ফিরব। সেদিন তোকে কেউ আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না।”

ট্রেনের গতি বাড়ছে। নানামি আর দৌড়াতে পারছে না। সে প্ল্যাটফর্মের শেষ মাথায় এসে থমকে দাঁড়াল। নোবারা দূর থেকে হাত নাড়ছে, আর তার কান্নার শব্দ কুয়াশার বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। জেনিন দেখল তারা ছোট হতে হতে এক সময় বিন্দুর মতো হয়ে গেল। জেনিন দরজায় দাঁড়িয়ে রইল যতক্ষণ না তাদের ছায়া পুরোপুরি অদৃশ্য হলো।

ট্রেন যখন শহরের সীমানা ছাড়িয়ে দিগন্তের দিকে ছুটছে, জেনিন কামরার ভেতরে নিজের সিটে গিয়ে বসল। সে নানামির মায়ের দেওয়া খাবারের প্যাকেটটা খুলল। একটা নাড়ু মুখে দিতেই জেনিন আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। পুরো ট্রেনের মানুষ তার দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু জেনিনের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে কাঁদছে তার কৈশোরের জন্য, সে কাঁদছে তার শ্রেষ্ঠ বন্ধুর জন্য, সে কাঁদছে নোবারার সেই অপবিত্র অপমানের জন্য। সে আজ একাই তার পুরো জগতকে বিসর্জন দিয়ে এল।

সেই মুহূর্তে জেনিন নুরশাদের ভেতরে এক ভয়ংকর রূপান্তর ঘটল। তার কান্নার প্রতিটা ফোটা তার হৃদয়ের কোমলতাকে ধুয়ে মুছে সাফ করে দিচ্ছিল। সে মনে মনে সেই ‘ছায়া মানবের’ কথা মনে করল। সে ঠিক করল, সে আর কোনোদিন কারও সামনে কাঁদবে না। সে আর কোনোদিন দুর্বল হবে না।

শহরের ওপাশে তখন কুয়াশা কেটে রোদ উঠছে। নানামি আর নোবারা পাশাপাশি স্টেশনে বসে আছে। নানামির হাতে জেনিনের ফেলে যাওয়া সেই লকেট। সে সেটা মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে আকাশের দিকে তাকালো।

অতীতের এই ধূসর বিসর্জনই ছিল তাদের সোনালি দিনগুলোর শেষ সমাধি। সেন্ট জুড হাই স্কুলের সেই অবাধ্য ছেলেটি আজ ট্রেনের চাকার সাথে সাথে অন্য এক মানুষ হয়ে যাচ্ছে। আর নানামি জায়দান? সে হয়ে রইল সেই স্টেশনের এক নিঃসঙ্গ যাত্রী, যে কেবল একটি ফেরার ট্রেনের অপেক্ষা করবে।

চলবে ইংশাআল্লাহ……

আগামীকাল থেকে বর্তমান শুরু হবে‌। এন্ড আ’ম টেলিং ইউ গাইজ, বর্তমান পর্ব লেখায় আমি যে এফোর্টটা দিয়েছি, আপনাদের অবশ্যই অবশ্যই পছন্দ হবে।🫶)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here