Soulmate_to_Enemy #পর্ব_২১

0
2

#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_২১(প্রণয় মুহূর্ত)
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

নূরশাদ ভিলার প্রতিটি কক্ষ এখন এক একটি জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। জেনিন নূরশাদ তার স্টাডি রুমে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তার সামনে রাখা দামী ওক কাঠের টেবিলটি এখন ভেঙে চুরমার হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে। তার হাতের তালু থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, কারণ সে নিজের হাতেই কাঁচের দামী ল্যাম্পটা ভেঙে ফেলেছে। ঘরের ভেতরে বাতাসের পরিবর্তে এখন কেবল এক তীব্র বারুদের গন্ধ আর জেনিনের ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ। তার চোখ দুটো এখন আর নীল নয়, বরং রক্তের মতো লাল হয়ে উঠেছে। সে এক আহত পশু, যে তার সবচাইতে দামী শিকারকে হারিয়ে ফেলেছে।

“ইউজি!” জেনিনের গর্জন পুরো প্রাসাদের দেয়ালে আছড়ে পড়ল।

ইউজি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছে। সে পনেরো বছর ধরে জেনিনের সাথে আছে, কিন্তু জেনিন নূরশাদকে এতটা অনিয়ন্ত্রিত সে কোনোদিন দেখেনি। ইউজি মাথা নিচু করে এগিয়ে এল। “বস, শহরের প্রতিটি এক্সিট পয়েন্টে আমাদের লোক মোতায়েন করা হয়েছে। রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, এমনকি ছোট ছোট লঞ্চ ঘাটগুলোও আমাদের নজরদারিতে। কিন্তু গতরাতের সেই ট্রাকটি শহরের সীমানা পার হওয়ার আগেই ওটা একটি নির্জন জায়গায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। মিস আকারি ওখানে নেই।”

জেনিন হঠাৎ ইউজির কলার খামচে ধরল। তার শক্তির সামনে ইউজি বাতাসের মতো হালকা মনে হচ্ছে। জেনিন তার মুখটা ইউজির খুব কাছে নিয়ে এল।
“নোবারা কে খুঁজে না পেলে জেনিন নুরশাদ কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা তোমাদের কল্পনায় ও নেই ইউজি। আই নিড হার, রাইট নাউ।”

জেনিন ইউজিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। সে তার বিশাল ডিজিটাল ম্যাপের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। স্ক্রিনে পুরো শহরের লাইভ ট্র্যাকিং চলছে।

এদিকে, শহরের এক ঘিঞ্জি এবং অন্ধকার বস্তির ভাঙা ঘরে নোবারা বসে আছে। তার পরনের সেই শাড়িটা এখন ছিঁড়ে গেছে, সারা শরীরে কাদার দাগ। সে আজ সারাদিন না খেয়ে এই নোংরা ঘরের এক কোণে লুকিয়ে আছে। বাইরে বৃষ্টির তোড় কমছে না। নোবারা জানে, জেনিনের লোকগুলো প্রতিটি গলিতে টর্চ নিয়ে ঘুরছে। সে শুনতে পাচ্ছে মাঝে মাঝে সাইরেনের শব্দ। তার বুকটা ভয়ে দুরুদুরু কাঁপছে।

নোবারার মনে হলো জেনিন নূরশাদ মানুষ নয়। যে মানুষটা রহমত চাচাকে চোখের সামনে গলা কেটে মারতে পারে, সে নোবারাকেও কোনোদিন ক্ষমা করবে না। নোবারার মনে হাহাকার করে উঠছে জেনিনের সেই শেষ মুহূর্তের কথা, ‘আমি পৃথিবী জ্বালিয়ে দেব নোবারা!’

নোবারা জানালার ভাঙা ফাঁক দিয়ে দেখল দূরে কিছু কালো এসইউভি ধীরগতিতে বস্তির ভেতর ঢুকছে। তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এল। ওগুলো জেনিনের গাড়ি! জেনিন কি তবে ওর ঘ্রাণ পেয়ে গেছে? নোবারা তার ছেঁড়া চাদরটা দিয়ে মুখ ঢেকে পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল। কর্দমাক্ত গলি দিয়ে সে দৌড়াতে শুরু করল। তার পায়ে জুতো নেই, পাথরের আঘাতে তার পায়ের তলা ফেটে রক্ত বেরোচ্ছে, কিন্তু সে থামছে না। সে জানে, এই রক্ত জেনিনের হাতে লেগে থাকা রক্তের চেয়ে অনেক বেশি পবিত্র।

জেনিন তখন তার গাড়িতে বসে মনিটরে দেখছিল বস্তির সিসিটিভি ফুটেজ। হঠাৎ তার চোখে পড়ল একটি কালো চাদর পরা নারীমূর্তি অন্ধকারের ভেতর মিলিয়ে যাচ্ছে। জেনিনের ঠোঁটে এক পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠল। সে তার হাতে থাকা অটোমেটিক রাইফেলটি চেক করল।

“ইউজি, ড্রাইভ করো। ৩ নং সেক্টরের পেছনের রেললাইন। ও ওখানেই যাচ্ছে। ও শহর ছাড়ার জন্য মালবাহী ট্রেনে ওঠার চেষ্টা করবে,” জেনিনের কণ্ঠস্বর এখন পাথরের মতো শীতল।

গাড়িগুলো প্রচণ্ড গতিতে ধাওয়া করতে শুরু করল। নোবারা যখন রেললাইনের কাছে পৌঁছাল, তখন একটি মালবাহী ট্রেন খুব ধীরগতিতে কু ঝিক ঝিক শব্দ করে স্টেশনের দিকে এগোচ্ছে। নোবারা ভাবল এটাই তার শেষ সুযোগ। সে ট্রেনের হাতল ধরার জন্য হাত বাড়ালো। ঠিক সেই মুহূর্তে একটি তীব্র হ্যালোজেন লাইটের আলো তার চোখে এসে পড়ল। নোবারা হাত দিয়ে চোখ ঢেকে ফেলল।
“কোথায় যাচ্ছেন মিস আকারি?”

গলাটা শুনতেই নোবারার রক্ত হিম হয়ে গেল। জেনিন নূরশাদ! জেনিন তার গাড়ির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তার হাতে একটি লেজার ট্র্যাকার। তার চারপাশ ঘিরে অন্তত ত্রিশজন সশস্ত্র বডিগার্ড। নোবারা ট্রেনের হাতল ছেড়ে দিয়ে কয়েক পা পিছিয়ে গেল। তার পেছনে রেললাইন, আর সামনে জেনিন নূরশাদের বিশাল সেনাবাহিনী।

জেনিন গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে নিচে নামল। সে খুব ধীরস্থির পায়ে নোবারার দিকে এগিয়ে আসছে। তার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন মৃত্যুর পদধ্বনি। জেনিন তার মাস্কটা খুলে ফেলল। বৃষ্টির পানিতে তার মুখটা ভিজে একাকার।

“আপনি কি ভেবেছিলেন ওই বস্তিতে লুকিয়ে আমাকে ফাঁকি দেবেন?” জেনিন খুব নিচু স্বরে বলল, কিন্তু তাতে ছিল এক অমোঘ আদেশ।

“কাছে আসবেন না একদম! আমি আপনার সাথে আর এক সেকেন্ডও থাকব না!” নোবারা চিৎকার করে উঠল। সে তার ব্যাগ থেকে একটি ছোট ছুরি বের করল—ওটা তার ঘর থেকে নেওয়া।
“আমি মরে যাব, তবুও আপনার ওই রক্তমাখা প্রাসাদে ফিরে যাব না!”

জেনিন হাসল। সে মোটেও ভয় পেল না। সে তার বুকটা এগিয়ে দিল। “মারুন। আপনার হাতের ছোঁয়া লাগলে আমার মুক্তি হবে এই শ্বাসরুদ্ধকর যন্ত্রণা থেকে।”

নোবারার হাত কাঁপছে। সে বুঝতে পারছে জেনিন সম্পূর্ণ পাগল হয়ে গেছে। জেনিন হঠাৎ বিদ্যুদ্বেগে এগিয়ে গিয়ে নোবারার কব্জিটা ধরল। সে নোবারার হাত থেকে ছুরিটা কেড়ে নিয়ে দূরে ছুড়ে মারল। তারপর এক ঝটকায় নোবারাকে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। নোবারা ছটফট করতে লাগল, সে জেনিনের বুকে কিল-ঘুষি মারতে লাগল, তার কাঁধে কামড় বসালো, কিন্তু জেনিন যেন কোনো লোহার খুঁটি। সে নোবারার কোনো আঘাতই অনুভব করছে না।

“ছেড়ে দিন আমাকে! আমি কোথাও যাবো না!” নোবারা আর্তনাদ করে উঠল।

জেনিন ইশারা করতেই ইউজি একটি ইনজেকশন নিয়ে এগিয়ে এল। নোবারা পালানোর চেষ্টা করার আগেই জেনিন তাকে শক্ত করে ধরল এবং ইউজি তার ঘাড়ে সিডেটিভ পুশ করে দিল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নোবারার শরীর নিস্তেজ হয়ে এল। তার চোখগুলো বুজে এল, কিন্তু জেনিনের প্রতি সেই ঘৃণার চাউনিটা যেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত স্থির হয়ে রইল।

জেনিন নোবারাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। সে তার গাড়ির দিকে হাঁটা দিল। বৃষ্টির তোড়ে তার স্যুট ভিজে গেছে, কিন্তু সে আজ বিজয়ী। সে তার হারিয়ে যাওয়া নক্ষত্রকে আবার বন্দি করেছে।

“ইউজি, ভিলাতে খবর দাও। কাজী সাহেবকে বলো তৈরি থাকতে। আজ রাতেই নোবারা আকারি হবে নোবারা নূরশাদ। কোনো বাধা আমি শুনব না,” জেনিন হুকুম দিল।

গাড়িগুলো আবার নূরশাদ ভিলার দিকে ছুটল। জেনিন পেছনের সিটে নোবারার মাথাটা নিজের কোলে রেখে বসে আছে। সে নোবারার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। তার মনে আজ এক অদ্ভুত প্রশান্তি। সে জানে নোবারা যখন জাগবে, সে হয়তো আত্মহত্যা করতে চাইবে, সে হয়তো জেনিনকে মারতে চাইবে, কিন্তু জেনিন তাতে পরোয়া করে না।

ভোর হওয়ার আগেই নূরশাদ ভিলাকে এক অভেদ্য দুর্গে পরিণত করা হলো। জেনিনের বডিগার্ডরা এখন সাব-মেশিনগান নিয়ে চারদিকে টহল দিচ্ছে। ভিলার ভেতরের একটি ঘরে লাল রঙের বেনারসি আর গয়না সাজিয়ে রাখা হয়েছে। জেনিন নোবারাকে তার বিশেষ বেডরুমে শুইয়ে দিল।

<><><><><><><><><>

জানালার ভারী পর্দাগুলো বৃষ্টির ঝাপটায় কাঁপছে। খাটের পাশে রাখা দামী কার্পেটের ওপর নোবারা শুয়ে আছে, তার মাথার ভেতরটা যেন শত শত কাঁচের টুকরো দিয়ে কেউ আঘাত করছে। সিডেটিভের সেই তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবটা কাটতেই নোবারা চোখ মেলল। সিলিংয়ের ওপর থাকা কারুকার্যময় ঝাড়লণ্ঠনটি তার চোখে এক বিভ্রম তৈরি করছে।

নোবারার মনে হলো সে কোনো এক অন্ধকার অতল গহ্বরে ডুবে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে তার মনে পড়ল গত রাতের সেই বীভৎস দৃশ্য, রহমত চাচার রক্তমাখা নিথর দেহ, জেনিনের সেই খুনে চাউনি আর বৃষ্টির মধ্যে তার সেই নিষ্ফল পালানোর চেষ্টা। নোবারার বুকটা ধক করে উঠল। সে বেঁচে আছে? নাকি এটিও কোনো এক নতুন নরকের শুরু?

সে উঠে বসার চেষ্টা করতেই অনুভব করল তার শরীরটা প্রচণ্ড দুর্বল। বিছানার পাশে রাখা সিল্কের শাড়ি আর সাজানো গয়নাগুলোর দিকে তাকিয়ে নোবারার ঠোঁটে এক বিষাক্ত হাসি ফুটে উঠল। সে বুঝতে পারল জেনিন নূরশাদ তাকে কেবল বন্দি করেনি, তাকে নিজের একান্ত হিসেবে সাজাতে চাইছে।

নোবারা আজ এক অদ্ভুত স্থিরতার সম্মুখীন। সে কাঁদতে চাইল, কিন্তু চোখ দিয়ে জল নামল না। তার ভেতরে থাকা সেই সাধারণ মেয়েটি গত রাতেই জেনিনের খঞ্জরের নিচে মারা গেছে। এখন যে মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে, সে এক লড়াকু সত্তা। নোবারা নিজেকে প্রশ্ন করল, ‘কতদিন আমি পালাবো? জেনিন নূরশাদ একটি ছায়া, যা পুরো শহরকে গিলে ফেলেছে। আমি যত দূরে যাব, সে তত বেশি রক্ত ঝরাবে আমার জন্য। রহমত চাচা মরেছেন আমার জন্য, হয়তো এরপর আমার মা…’

এক তীব্র আতঙ্কের শীতল স্রোত নোবারার মেরুদণ্ড দিয়ে বয়ে গেল। সে বুঝতে পারল জেনিনকে পালানোর মাধ্যমে হারানো সম্ভব নয়। জেনিনকে হারাতে হবে তার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে বসে। জেনিনের সবচাইতে বড় দুর্বলতা হলো তার প্রতি জেনিনের এই উন্মাদ প্রেম। আর সেই দুর্বলতাকেই আজ নোবারা নিজের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিল।

তখনই দরজা খোলার শব্দ হলো। জেনিন নূরশাদ ভেতরে ঢুকল। তার পরনের শার্টের হাতা গোটানো, হাতে এক গ্লাস পানি। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে সারা রাত জেগে ছিল। তার চোখের সেই রক্তিম আভা এখনো যায়নি, বরং সেখানে এক ধরণের উন্মাদনা খেলা করছে। সে খুব ধীর পায়ে নোবারার বিছানার পাশে এসে বসল। জেনিন আজ শান্ত, কিন্তু এই শান্তি ঝড়ের আগের স্তব্ধতার মতো ভয়ংকর।

“জেগেছেন?” জেনিনের কণ্ঠস্বর খুব নিচু।

নোবারা উঠে বসল। সে জেনিনের দিকে তাকালো না। তার দৃষ্টি জানালার ওপাশে থাকা ধূসর আকাশের দিকে। সে খুব ধীর গলায় বলল, “আপনি আমাকে বাঁচিয়ে রাখলেন কেন? মেরে ফেললেই তো পারতেন। আপনার সাম্রাজ্যে তো লাশের কোনো অভাব নেই।”

জেনিন হাসল। সেই হাসিতে এক ধরণের পাগলামি ছিল। সে গ্লাসটা টেবিলের ওপর রেখে নোবারার খুব কাছে সরে এল। “লাশ দিয়ে আমি কী করব নোবারা? আমি তো আপনাকে চেয়েছিলাম। আপনার ওই ঘৃণাভরা চোখ, আপনার ওই জেদ, আমি এগুলোকেই আমি চাই। আপনি যত বেশি আমাকে ঘৃণা করবেন, আমার আপনাকে পাওয়ার তৃষ্ণা তত বাড়বে।”

নোবারা এবার জেনিনের চোখের দিকে সরাসরি তাকালো। জেনিন আশা করেছিল নোবারা হয়তো চিৎকার করবে, হয়তো আবার তাকে আঘাত করবে। কিন্তু নোবারার চোখে আজ এক রহস্যময় শীতলতা। সে খুব ধীরস্থিরভাবে বলল, “আপনি আমাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন না? তাই না?”

জেনিন চমকে উঠল। সে ভ্রু কুঁচকে নোবারার দিকে তাকালো। “আপনি কি আমাকে উপহাস করছেন?”

“না।” নোবারা বিছানা থেকে নামল। সে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। তার আলুথালু চুল আর ফেকাশে মুখ। সে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখছিল না, সে দেখছিল এক নতুন নোবারাকে। “আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি আপনাকে বিয়ে করব জেনিন নূরশাদ। তবে সেটা আপনার চাপে নয়, আমার নিজের ইচ্ছায়।”

জেনিন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মতো মাফিয়া সম্রাট, যে প্রতিটি মানুষের চাল বুঝতে পারে, সে আজ নোবারার এই আকস্মিক পরিবর্তনে খেই হারিয়ে ফেলল। সে ধীর পায়ে নোবারার পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো। আয়নায় তাদের দুজনের প্রতিফলন ফুটে উঠল, একজন রক্তপিপাসু শিকারি, আর অন্যজন এক অপ্রতিরোধ্য শিকার যে নিজেই আজ বর্শা হাতে নিয়েছে।

“আপনার ইচ্ছা?” জেনিন ফিসফিস করে বলল। “কাল রাতেই আপনি পালাচ্ছিলেন। রহমত চাচার মৃত্যুর পর আপনি আমাকে অভিশাপ দিচ্ছিলেন। আজ হঠাৎ এই পরিবর্তন কেন? আপনি কি কোনো চাল চালছেন?”

নোবারা ঘুরল। সে জেনিনের খুব কাছে এল। সে জেনিনের শার্টের ওপর হাত রাখল। জেনিন অনুভব করল নোবারার হাত আজ কাঁপছে না। “চাল আমি চালছি না। আমি বুঝেছি এই শহর থেকে পালানো অসম্ভব। আপনি আমাকে যেখানেই যাই খুঁজে বের করবেন। তার চেয়ে ভালো নয় কি, আমি আপনার এই সিংহাসনের পাশেই বসি? আপনার এই অন্ধকার জগতের ভাগীদার হই?”

জেনিন নোবারার চিবুক ধরে নিজের দিকে ফেরালো। তার চোখে সন্দেহ আর উন্মাদনার লড়াই। “আপনি আমাকে ভালোবাসেন না নোবারা। আপনার চোখে আমার জন্য কেবল বিষ আছে।”

“ভালোবাসা দিয়ে আপনি কী করবেন জেনিন?” নোবারার কণ্ঠে আজ এক বিচিত্র তেজ। “আপনি তো অধিকার চেয়েছিলেন। আচ্ছা আপনি কি ভয় পাচ্ছেন? আপনি কি ভাবছেন আমি আপনার এই সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দেব?”

জেনিন অট্টহাসি দিয়ে উঠল। তার পাগলামি আজ চূড়ায়। সে নোবারার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। “ধ্বংস? আপনি যদি এই সাম্রাজ্য ধ্বংসও করে দেন নোবারা, আমি পরোয়া করি না। আমি চাই আপনি আমার হয়ে এই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়ান। আপনি যদি বিষও হন, আমি সেই বিষ পান করতে রাজি। কিন্তু মনে রাখবেন, একবার যদি আপনি আমার নামের সীল আপনার গায়ে লাগান, তবে এই পৃথিবীতে উপরওয়ালা ব্যাতিত আর কোনো শক্তি আপনাকে আমার থেকে আলাদা করতে পারবে না।”

নোবারা জেনিনের এই উন্মত্ত আলিঙ্গনে কুঁকড়ে গেল না। বরং সে জেনিনের বুকে মাথা রাখল। জেনিন দেখতে পেল না নোবারার ঠোঁটে তখন এক পৈশাচিক জয়ের হাসি।

জেনিন নোবারার চুলে মুখ গুঁজে দিয়ে বলল, “আজ রাতেই বিয়ে হবে নোবারা। আমি কোনো আয়োজন করব না। শুধু আমি, আপনি। আপনি রাজি তো?”

নোবারা জেনিনের বুক থেকে মাথা তুলল। তার চোখে এখন এক মরণপণ জেদ। “আমি রাজি। তবে আমার একটি শর্ত আছে। আজকের পর ইউজি আমার কোনো কাজে হস্তক্ষেপ করবে না। আর আপনি আমাকে আপনার প্রতিটি বিজনেস ডিল আর আপনার ওই ‘জেড’ সত্তার প্রতিটি গোপন কথা জানাবেন। আমি আপনার কেবল স্ত্রী হতে চাই না, আমি আপনার পার্টনার হতে চাই।”

জেনিন অবাক হলো। সে ভাবতেই পারেনি নোবারা এত বড় দাবি করবে। কিন্তু জেনিনের উন্মাদনা তাকে অন্ধ করে দিয়েছে। সে ভাবছে নোবারা হয়তো তার এই ক্ষমতার মোহে পড়ে গেছে। সে নোবারার হাতে একটা দীর্ঘ চুমু খেল। “তথাস্তু। আজ থেকে জেনিন নূরশাদের প্রতিটি রক্তপাত আপনার চোখের সামনে হবে। আপনি হবেন আমার এই অন্ধকারের একমাত্র সাক্ষী।”

নোবারা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিল। জেনিন যখন দরজা দিয়ে বেরোচ্ছিল, সে একবার ফিরে তাকালো। সে দেখল নোবারা জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। সূর্যের ম্লান আলোয় নোবারাকে এক ভয়ংকর সুন্দর অপ্সরার মতো মনে হচ্ছে। জেনিনের মনে এক অদ্ভুত খটকা লাগল, এই কি সেই নোবারা যাকে সে চিনত? নাকি সে কোনো এক দানবীর জন্ম দিল নিজেরই অবহেলার আগুনে?

জেনিন করিডোরে আসতেই ইউজি তার সামনে দাঁড়ালো। ইউজির মুখ গম্ভীর। “বস, এটা ঠিক হচ্ছে না। মিস আকারি হুট করে রাজি হয়ে গেল? ওনার চোখে আমি অন্য কিছু দেখেছি। ওনি প্রতিশোধ নিতে চাইছে।”

জেনিন ইউজির দিকে তাকিয়ে এক শীতল হাসি হাসল। সে ইউজির কাঁধে হাত রাখল। “আমি জানি ইউজি। আমি জানি ও আমাকে ঘৃণা করে। আমি জানি ও আমাকে ধ্বংস করতে চায়। কিন্তু জানো তো, বাঘিনী যখন কামড় দেওয়ার জন্য কাছে আসে, তখন তার রূপ অন্য সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর হয়। আমি ওই সৌন্দর্যটাই দেখতে চাই। ও যদি আমাকে মারতে চায়, তবে আমি ওর হাতেই মরতে চাই।”

ইউজি স্তব্ধ হয়ে রইল। সে বুঝতে পারল জেনিন নূরশাদ আজ ধ্বংসের নেশায় মেতেছে। সে জেনিনকে বাঁচাতে পারবে না, কারণ জেনিন নিজেই নিজেকে নোবারার আগুনে সঁপে দিয়েছে।

<><><><><><><><><>

নূরশাদ ভিলার প্রধান ড্রয়িংরুম, জানালার ভারী মখমলের পর্দাগুলো টেনে দেওয়া হয়েছে, যাতে বাইরের চাঁদের আলো ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে। ঘরের কোণে কোণে কয়েকশ মোমবাতি জ্বলছে, যাদের কাঁপতে থাকা শিখা দেয়ালগুলোতে জেনিন আর নোবারার দীর্ঘ ছায়া ফেলছে। জেনিন নূরশাদ আজ তার কর্পোরেট রূপ ঝেড়ে ফেলে পরেছে একটি গাঢ় মেরুন রঙের শেরওয়ানি, যার বোতামগুলো হীরের তৈরি। তার কোমরের বেল্টে ঝোলানো আছে সেই পূর্বপুরুষের খঞ্জরটি। তার চোখের উন্মাদনা আজ এক শান্ত আগ্নেয়গিরির মতো, যা কেবল নোবারার আসার অপেক্ষায় থমকে আছে।

ইউজি এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে একটি রূপোর থালায় রাখা দুটি হীরের আংটি। ইউজির চোখেমুখে এখনো সংশয়, সে বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। কাজী সাহেব এক কোণে বসে আছেন, তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। নূরশাদ ভিলার এই থমথমে পরিবেশে কোনো বিয়ের আমেজ নেই, আছে কেবল এক অদৃশ্য যুদ্ধের উত্তেজনা।

সিঁড়ির ওপর থেকে নূপুরের শব্দ পাওয়া গেল। জেনিন দ্রুত মাথা তুলে তাকালো। সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে নোবারা আকারি। তার পরনে টকটকে লাল রঙের একটি বেনারসি, মাথায় অর্ধেক টানা ঘোমটা, যা জেনিন নিজে পছন্দ করে দিয়েছিল। নোবারার চোখে গাঢ় কাজল, আর গলায় মোগল আমলের ভারী হীরের নেকলেস। তার চেহারায় কোথাও কোনো ভয়ের চিহ্ন নেই, বরং এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। সে যখন জেনিনের সামনে এসে দাঁড়ালো, জেনিন এক মুহূর্তের জন্য শ্বাস নিতে ভুলে গেল। নোবারাকে আজ এক রক্তপিপাসুর মতো মনে হচ্ছে, যে নিজের ধ্বংসের ওপর দাঁড়িয়ে অন্যকে ধ্বংস করার শপথ নিয়েছে!

জেনিন নোবারার হাতটা ধরতে চাইল, কিন্তু নোবারা নিজেই নিজের হাত বাড়িয়ে দিল। জেনিন সেই হাতটি ধরে তাকে সোফার কাছে নিয়ে গেল। জেনিনের স্পর্শে নোবারার শরীর আজ শিউরে উঠল না, বরং তার চোখ দুটো জেনিনের চোখের গভীরতাকে মেপে নিল।

“আপনি তৈরি তো নোবারা?” জেনিন খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল। তার কণ্ঠে এক ধরণের তৃষ্ণা ছিল, যা কেবল এই বিয়ের মাধ্যমেই মিটতে পারে।

নোবারা ম্লান হাসল। সেই হাসিতে এক ধরণের শীতলতা ছিল যা জেনিনের হৃদপিণ্ডকেও কাঁপিয়ে দিতে পারত যদি সে অন্ধ না হতো। “আমি তৈরি। আমি তো আপনাকে কথা দিয়েছি।”

কাজী সাহেব কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বিয়ের নিয়মগুলো শুরু করলেন। ড্রয়িংরুমের ভেতর এক পিনপতন নীরবতা। জেনিন অপলক দৃষ্টিতে নোবারার দিকে তাকিয়ে আছে। সে আজ জয়ী। সে তার সমস্ত ক্ষমতা, তার সমস্ত রক্তপাত আর তার সমস্ত নিষ্ঠুরতা দিয়ে এই মুহূর্তটি কিনে নিয়েছে। যখন কাজী সাহেব জেনিনকে জিজ্ঞেস করলেন সে এই বিয়েতে রাজি কি না, জেনিন এক সেকেন্ডও সময় নিল না। তার গম্ভীর কণ্ঠস্বর ড্রয়িংরুমে প্রতিধ্বনিত হলো, “কবুল।”

এবার নোবারার পালা। কাজী সাহেব যখন নোবারাকে একই প্রশ্ন করলেন, নোবারা এক মুহূর্ত থামল। সে এক পলক ইউজির দিকে তাকালো, তারপর জেনিনের সেই উন্মত্ত চোখের দিকে। নোবারা জানে, এই একটি শব্দ তার সারা জীবনের গতিপথ বদলে দেবে। সে আর সেই সহজ-সরল মেয়েটি থাকবে না। সে হবে এক মাফিয়া সম্রাটের স্ত্রী, এক খুনি সত্তার অর্ধাঙ্গিনী।

“কবুল।” নোবারার কণ্ঠস্বর ছিল পাথরের মতো শক্ত।

এরপর জেনিন নোবারার আঙুলে সেই হীরের আংটিটি পরিয়ে দিল। আংটির তীক্ষ্ণ কোণটি নোবারার চামড়ায় সামান্য বিধে গেল, এক ফোঁটা রক্ত বের হলো, যা জেনিন পরম মমতায় নিজের ঠোঁট দিয়ে মুছে দিল। সে নোবারার কপালে একটি দীর্ঘ চুমু খেল।

কাজী সাহেব যখন বিয়ের কাবিননামাটি জেনিনের সামনে রাখলেন, জেনিন কলম ধরার আগে পকেট থেকে একটি বিশেষ আইনি নথি বের করল। সেখানে আগে থেকেই জেনিনের স্বাক্ষর করা ছিল। পুরো ড্রয়িংরুমে এক রহস্যময় নীরবতা নেমে এল। জেনিন সেই নথিটি নোবারার সামনে মেলে ধরল।

“বিয়ের কাবিনে সই করার আগে আপনাকে এই উপহারটুকু দিতে চাই নোবারা,” জেনিন খুব শান্ত কিন্তু ভরাট গলায় বলল।

নোবারা ভ্রু কুঁচকে কাগজের লেখাগুলোর দিকে তাকালো। তার চোখের মণি মুহূর্তেই স্থির হয়ে গেল। সেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল, জেনিন নূরশাদ তার ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ‘নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজে’র ৫০% শেয়ার এবং পূর্ণ প্রশাসনিক ক্ষমতা নোবারা আকারিকে হস্তান্তর করছে। আজ থেকে নোবারা কেবল জেনিনের স্ত্রী নয়, বরং সে হচ্ছে,
“The Chairperson and Queenpin of Nurshad Industries”।

ইউজি পেছন থেকে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল, “বস! এটা কী করছেন? এটা আপনার বছরের পর বছর ধরে বানানো এম্পায়ার!”

জেনিন ইউজির দিকে ফিরেও তাকালো না। সে নোবারার চোখের গভীরে তাকিয়ে বলল, “আমি আমার রাজত্ব আপনার হাতে সঁপে দিচ্ছি নোবারা। এখন থেকে এই সাম্রাজ্যের প্রতিটি সিদ্ধান্ত আপনার। আমি আপনার সিইও হয়ে কাজ করতেও রাজি। আমি চাই পুরো দুনিয়া জানুক, নূরশাদ সাম্রাজ্যের আসল মালকিন কে।”

নোবারার হাতটা কলম ধরতে গিয়ে সামান্য কাঁপল। সে বুঝতে পারল জেনিন তাকে কেবল একটি নাম দিচ্ছে না, বরং তাকে এক ভয়ংকর ক্ষমতার চূড়ায় বসিয়ে দিচ্ছে। এই ক্ষমতার অর্থ হলো জেনিনের প্রতিটি অন্ধকার ব্যবসার দায়ভারও এখন নোবারার কাঁধে। জেনিন তাকে ভালোবেসে রানী বানাচ্ছে, নাকি নিজের অপরাধের অংশীদার করে তাকে আজীবনের জন্য শিকল পরিয়ে দিচ্ছে, তা নোবারার কাছে এক ধোঁয়াশা হয়ে রইল।

কাজী সাহেব পরম বিস্ময়ে চশমাটা ঠিক করে বললেন, “মা, এবার সই করো। এখন থেকে তুমি কেবল নোবারা আকারি নও, তুমি নোবারা নূরশাদ।”

নোবারা সজোরে নিশ্বাস নিয়ে কাবিননামা আর সেই আইনি নথিতে সই করল। স্বাক্ষর করার সাথে সাথেই জেনিন উঠে দাঁড়িয়ে নোবারার কপালে একটি দীর্ঘ চুমু খেল। তার চোখে তখন এক পরম জয়ের উল্লাস। সে নোবারার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আসসালামু আলাইকুম মিসেস নোবারা নুরশাদ!”

“আজ থেকে আপনি আমার, নোবারা নূরশাদ। আজ থেকে আমার প্রতিটি নিঃশ্বাস আপনার অধিকারে। আপনি যা চাইবেন, এই দুনিয়া আপনাকে তা এনে দেবে। এমনকি যদি আপনি আমার প্রাণ ও চান, আমি তাও দিতে দ্বিধা করব না।” জেনিনের কণ্ঠে আজ চরম আত্মসমর্পণ।

জেনিন নোবারার চিবুক ধরে তাকে নিজের কাছে টেনে নিল। সে আজ নিজেকে খুব শক্তিশালী মনে করছে, অথচ সে জানে না সে নিজেই নিজের পতনের ঘন্টা বাজিয়েছে। জেনিন নোবারাকে কোলে তুলে নিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোতে লাগল। নোবারা জেনিনের গলা জড়িয়ে ধরল।

জেনিনের বেডরুমটি আজ এক অলৌকিক নিস্তব্ধতায় মোড়ানো। ইউজি ই সমস্ত আয়োজন করেছে। চারপাশের ম্লান মোমবাতির আলোয় ঘরটি যেন এক অন্য জগতের রূপ নিয়েছে। খাটজুড়ে বিছানো রজনীগন্ধার শুভ্র চাদর, যার সুবাস জেনিনের সমস্ত অস্থিরতাকে প্রশমিত করতে চাইছে।

জেনিন ধীর পায়ে নোবারার কাছে এগিয়ে এল। তার প্রতিটি পদক্ষেপে যেন এক যুগের অপেক্ষার সমাপ্তি। সে নোবারার কপালে হাত রেখে আলতো করে সরু চুলগুলো সরিয়ে দিল। জেনিনের হাত কাঁপছে, কিন্তু সে অসীম যত্নে নোবারার চিবুক ধরে নিজের দিকে ফেরালো।

“আপনি কি এখনো রেগে থাকবেন নূরা?” জেনিন খুব নিচু স্বরে জানতে চাইল। তার কণ্ঠস্বরে কর্তৃত্ব নেই, আছে কেবল এক গভীর ব্যাকুলতা।

নূরা ডাকনাম শোনা মাত্রই নোবারার সারা শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল। জেনিনের স্পর্শ, যা এতক্ষণ সে ঘৃণার চোখে দেখছিল, সেই স্পর্শেই যেন হঠাৎ এক বিষণ্ণতার ছোঁয়া লাগল। জেনিনের এই ‘নূরা’ ডাকটির মধ্যে কোনো অহংকার ছিল না, কোনো পসেসিভনেস ছিল না, ছিল এক আদিম, পবিত্র ব্যাকুলতা। মনে হচ্ছিল, সে জেনিনকে দেখছে না, বরং দেখছে সেই কিশোর জেনিনকে, যে একদিন তার টিফিন ভাগ করে খেত, যে তার চোখের জল মুছিয়ে দিত।

জেনিনের কণ্ঠে এই ডাকটি শোনার সাথে সাথে তার বুকের ভেতরের ঘৃণা আর ভালোবাসার সীমানাটা ঝাপসা হয়ে এল। সে বুঝতে পারল, জেনিন তাকে কেবল শরীর দিয়ে চায়নি, সে তাকে চেয়েছিল তার সবটুকু স্মৃতি দিয়ে!

নোবারার চোখে জল টলমল করে উঠল। সে জেনিনের দিকে তাকাতে পারছে না, আবার তাকালে নিজেকে ধরে রাখতেও পারছে না। জেনিন যখন তাকে ‘নূরা’ বলে ডাকল, তখন সে আর কেবল জেনিনের বন্দি নয়; সে জেনিনের সমস্ত অন্ধকারের এক অবিচ্ছেদ্য সাক্ষী হয়ে গেল। এই একটি ডাক তাকে যেন জেনিনের সমস্ত অপরাধের দায়ভারের সাথে এক সুতোয় বেঁধে দিল।

নোবারা কোনো উত্তর দিল না। সে জানালার দিকে তাকিয়ে রইল, যেখানে বৃষ্টির অস্ফুট শব্দ কানে আসছে। জেনিন নোবারার হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে তার কপালে ঠেকালো। জেনিনের এই নিঃস্বার্থ আত্মসমর্পণের ভঙ্গিটি নোবারার বুকের ভেতরে এক অদ্ভুত দহনের সৃষ্টি করল। সে কি পারবে এই মানুষটিকে ঘৃণা করতে, যে তার জন্য নিজের সমস্ত অহংকার বিসর্জন দিতে প্রস্তুত?

জেনিন খুব আলতো করে নোবারাকে বিছানার প্রান্তে বসালো। তার প্রতিটি আচরণ ছিল অতিমাত্রায় মার্জিত, যেন সে কোনো পবিত্র স্পর্শের অপেক্ষায় আছে। সে নোবারার চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আমি জানি আপনার মনে এখনো অনেক প্রশ্ন, অনেক অভিমান। আজ রাতে আমি আপনাকে কোনো প্রশ্নের উত্তর দেব না, কোনো দাবি করব না। আমি শুধু চাই আপনি অনুভব করুন, এই জেনিন নুরশাদ আপনাকে ছাড়া আর কারোর নয়।”

নোবারা জেনিনের চোখের গভীরতা মাপার চেষ্টা করল। সে সেখানে দেখল এক সমুদ্র একাগ্রতা। সে ধীরে ধীরে জেনিনের কাঁধে হাত রাখল। জেনিন স্থির হয়ে রইল, যেন নোবারার এই ছোট স্পর্শটুকুই তার জীবনের সবচাইতে বড় উপহার। অথচ নোবারা চাইছিল ধীরে ধীরে জেনিনের বিশ্বস্ত হয়ে উঠতে!

ঘরের নিভৃত কোণে মোমবাতির শিখা তখনো কাঁপছে। জেনিন নোবারার কপালে নিজের কপাল ঠেকালো। তাদের নিঃশ্বাসের উষ্ণতা একাকার হয়ে গেল। এই মূহূর্তে জেনিন নূরশাদ কোনো মাফিয়া সম্রাট নয়, বরং সে এক প্রেমিক, যে বহু বছর পর তার হারানো ঘরকে ফিরে পেয়েছে। আর নোবারা? সে অনুভব করল, তার ভেতরে জমাট বাঁধা সেই কঠিন ঘৃণার বরফ যেন জেনিনের এই স্পর্শে সামান্য হলেও গলতে শুরু করেছে। সে নিজেকে সংযত করতে গিয়েও ব্যার্থ হচ্ছে!

তাদের মাঝখানের এই নীরবতা কোনো অসম্পূর্ণ গল্পের মতো নয়, বরং এটি ছিল দুই ভাঙা আত্মার এক করুণ মিলন। জেনিন আলতো করে আলোটি নিভিয়ে দিল, কেবল এক চিলতে চাঁদের আলোয় ঘরটি আচ্ছন্ন হয়ে রইল। বাইরের বৃষ্টির শব্দের সাথে মিলেমিশে এক অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ তৈরি হলো, যেখানে ঘৃণা আর ভালোবাসার সীমানা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে এল।

চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here