#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৪০
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
ঢাকার রাত মানেই এক অদ্ভুত অস্থিরতা। চারদিকে সোডিয়াম ল্যাম্পের হলুদ আলো, কিন্তু সেই আলোর নিচে জমে আছে হাজারো কালচে অন্ধকার। নূরশাদ ভিলার চারপাশ এখন নিস্তব্ধ। জেনিনের ভিলার চারপাশের ভবনগুলোর অন্ধকার জানালা থেকে এখন লাল রঙের ইনফ্রারেড লেজার পয়েন্টারগুলো জেনিনের ঘরের দেয়ালে নাচানাচি করছে। ‘জিরো’ তার মরণফাঁদ পেতে রেখেছে ঢাকার এই ঘিঞ্জি আর উঁচু অট্টালিকার আড়ালে।
জেনিন ইউজির রুমের ভেতরে দাঁড়িয়ে ছিল। এসি চলছে ঠিকই, কিন্তু জেনিনের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সে তার হাতের ট্যাবটি দেখল, পুরো সিস্টেম লকড। ইউজি তখনো সেডেশনের প্রভাবে গভীর ঘুমে, তবে তার ঘুমের মধ্যেও সে মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে। জেনিন বুঝল, ইউজির মস্তিষ্কে যে চিপ বা ম্যালওয়্যার ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা সরাতে হলে তাকে সরাসরি সেই উৎসে পৌঁছাতে হবে যেখান থেকে এই সিগন্যাল আসছে।
“রায়ান!” জেনিন নিচু কিন্তু তীক্ষ্ণ গলায় ডাকল।
রায়ান দেয়ালের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। “বস। বাইরের স্নাইপাররা পজিশন নিয়েছে। আমাদের জিবরান অলরেডি ছাদ থেকে দুজনকে খতম করেছে। কিন্তু সমস্যা হলো, ওরা সংখ্যায় অনেক।”
“ওরা আমাদের মারতে আসেনি রায়ান,” জেনিন শান্তভাবে বলল। সে তার ব্ল্যাক লেদার জ্যাকেটটা টেনে পরল। “ওরা এসেছে আমাকে ভয় দেখাতে এবং ওই প্রজেক্ট নূরশাদের ফাইলগুলো হাতিয়ে নিতে। কিন্তু ওরা জানে না, জেনিন নূরশাদ ভয় পাওয়া ভুলে গেছে অনেক আগে। আমি এখন এখান থেকে বেরোব।”
“এই অবস্থায় বের হওয়া মানে সুইসাইড বস!” রায়ান বাধা দিল।
“সুইসাইড নয়, এটা সারপ্রাইজ,” জেনিন তার হাতের রুপালি পিস্তলটা লোড করল। “ইউজি শেষ মুহূর্তে একটা সিগন্যাল ট্র্যাক করেছিল। ওই সিগন্যালটা আসছে কারওয়ান বাজারের একটা পুরোনো আইটি পার্কের পরিত্যক্ত ফ্লোর থেকে। জিরো ওখানেই বসে তার এই ডিজিটাল জাল বুনছে। আমি একা যাব।”
জেনিন যখন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামল, সে দেখল নোবারা ড্রয়িংরুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে একটি ছোট ব্যাগে কিছু ওষুধ আর একটা ফার্স্ট এইড কিট। নোবারার চোখের সেই ভয় এখন এক ধরণের জেদে পরিণত হয়েছে।
“আপনি একা যাচ্ছেন না।” নোবারা স্থির কণ্ঠে বলল।
জেনিন থমকে দাঁড়াল। “নোবারা, এটা কোনো ক্যান্ডেল লাইট ডিনার নয়। ওখানে মৃত্যু ওত পেতে আছে। আপনি ভিলাতেই নিরাপদ।”
“না!” নোবারা এক পা এগিয়ে এল। “আপনি যদি একা যান, তবে আমি এখানে প্রতি সেকেন্ডে মরে যাব। আমি আপনার সাথে গাড়িতে থাকব। আপনি ভেতরে যাবেন, আমি ব্যাকআপে থাকব।”
জেনিন নোবারার চোখের দিকে তাকাল। সে দেখল নোবারা আজ আর সেই অবলা নারী নেই যাকে রক্ষা করতে হবে। সে আজ এক যোদ্ধার সঙ্গিনী। জেনিন বুঝতে পারল, নোবারাকে আটকে রাখা সম্ভব নয়।
“ঠিক আছে। কিন্তু আপনি গাড়ি থেকে এক পা-ও নামবেন না। রায়ান, তুমি ভিলার দায়িত্ব নাও। মায়াকে বলো নোবারার সিকিউরিটি কনফার্ম করতে।”
জেনিন তার বুলেটপ্রুফ ব্ল্যাক এসইউভি বের করল। ঢাকার নির্জন রাস্তায় গাড়ির চাকার ঘর্ষণে আগুনের ফুলকি ছুটল। জেনিন গাড়ি চালাচ্ছে এক উন্মত্ত গতিতে। পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে ফার্মগেট, তেজগাঁও, কিন্তু জেনিনের চোখ নিবদ্ধ কারওয়ান বাজারের সেই পরিত্যক্ত অট্টালিকার দিকে।
গাড়ি যখন কারওয়ান বাজারের সেই পুরোনো ভবনের সামনে থামল, তখন রাত তিনটা। চারদিকে কেবল কুকুরদের ডাক আর দূরে কোনো ট্রাকের হর্নের শব্দ। ভবনটি বিশ তলা উঁচু, কিন্তু এর দশ তলার পর থেকে কোনো কাঁচ বা ফিনিশিং নেই। কেবল কংক্রিটের এক বিশাল কাঠামো।
জেনিন গাড়ি থেকে নামার আগে নোবারার হাতটা শক্ত করে ধরল। “নূরা, যদি আধ ঘণ্টার মধ্যে আমি ফিরে না আসি, তবে আপনি সোজা নানামির কাছে চলে যাবেন। ও আপনাকে সেফটি দেবে।”
“আপনি ফিরে আসবেন জেনিন। আমি জানি,” নোবারা জেনিনের হাতে একটা হালকা চাপ দিল।
জেনিন নোবারার মাথাটা এক মুহূর্তের জন্য নিজের বুকে টেনে নিল। তারপর ওকে ছেড়ে দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে ভবনের পেছনের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করল। সে জানে লিফট ব্যবহার করা মানে নিজেকে টার্গেট করা। তার হাতে নাইট-ভিশন গগলস। প্রতিটি ধাপে জেনিন অনুভব করতে পারছিল কেউ তাকে দেখছে। ‘জিরো’ তার জন্য রেড কার্পেট বিছিয়ে রেখেছে।
দশ তলায় পৌঁছাতেই জেনিন দেখল এক বিশাল হলরুম। সেখানে শত শত সার্ভার র্যাক রাখা আছে, যেগুলোর নীল আর লাল আলোতে ঘরটা এক ভৌতিক রূপ নিয়েছে। হলরুমের মাঝখানে একটা চেয়ারে কেউ একজন পিঠ ফিরিয়ে বসে আছে। তার সামনে ডজনখানেক মনিটর।
“স্বাগতম জেনিন নূরশাদ,” এক যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর স্পিকার দিয়ে বেজে উঠল। চেয়ারটি ধীরে ধীরে জেনিনের দিকে ঘুরল।
চেয়ারে বসা লোকটি কে তা দেখে জেনিনের পা যেন মেঝেতে গেঁথে গেল। এ কি সম্ভব? এ হতে পারে না! জেনিন দেখল তার সামনে বসে আছে এমন একজন মানুষ, যাকে সে বহু বছর আগে নিজের হাতে কবর দিয়েছিল।
“তুমি…তুমি তো বেঁচে থাকার কথা নয়!” জেনিনের পিস্তল ধরা হাতটা সামান্য কেঁপে উঠল।
“মৃত্যু তো কেবল একটা ভ্রম জেনিন,” লোকটি হাসল। তার চেহারার একপাশ পুড়ে গিয়ে বীভৎস হয়ে গেছে। “তুমি ড্রাগন লিউকে মেরেছ, সাকলাইনকে শেষ করেছ। কিন্তু তোমার নিজের রক্তকে কি চিনতে পারছ না? আমিই সেই ‘জিরো’ যাকে তুমি তোমার ছোটবেলায় হিংসে করতে। আমি তোমার সৎ ভাই, আরিয়ান।”
জেনিনের মাথার ভেতর হাজার হাজার স্মৃতি ভিড় করে এল। আরিয়ান নূরশাদ। জেনিনের বাবার প্রথম পক্ষের ছেলে। জেনিন জানত আরিয়ান এক অগ্নিকাণ্ডে মারা গিয়েছিল। কিন্তু আজ সে দেখল আরিয়ান কেবল বেঁচে নেই, সে এক ডিজিটাল দানবে পরিণত হয়েছে।
“তুমি ইউজির সাথে এটা কেন করলে আরিয়ান?” জেনিন দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
“কারণ ইউজি তোমার শক্তি ছিল। আর আমি চাই তোমার শক্তিকে তোমার বিরুদ্ধেই ব্যবহার করতে। প্রজেক্ট নূরশাদ আসলে আমার পাওনা ছিল জেনিন। বাবা তোমাকে সবকিছু দিয়ে গেছেন, আর আমাকে দিয়েছেন কেবল এই দগ্ধ চেহারা। আজ আমি সব ফিরে নেব।”
আরিয়ান তার কি-বোর্ডে একটা বোতাম টিপল। মুহূর্তের মধ্যে হলরুমের চারদিকের পর্দাগুলো সরে গেল। জেনিন দেখল সে কয়েক ডজন অটোমেটিক টার্রেট গানের নিশানায় দাঁড়িয়ে আছে। সামান্য নড়াচড়া করলেই তার শরীর ঝাঁঝরা হয়ে যাবে।
“এখন বলো জেনিন,” আরিয়ান এক পৈশাচিক আনন্দ নিয়ে বলল। “ফাইলগুলো দেবে, নাকি তোমার এই সুন্দরী বউটাকে আমি এখন এই জানলা দিয়ে লাইভ দেখব কীভাবে গাড়ি থেকে টেনে বের করা হচ্ছে?”
জেনিন স্ক্রিনে তাকাল। সে দেখল নোবারার গাড়ির চারপাশে কালো মুখোশধারী কয়েকজন লোক ঘিরে ধরেছে। জেনিনের বুকটা ধক করে উঠল। সে আজ এক কঠিন ফাঁদে পা দিয়েছে। একদিকে তার সাম্রাজ্য, অন্যদিকে তার প্রাণপ্রিয় নূরা!
জেনিনের কোল্ট পিস্তলের নল আরিয়ানের কপালে তাক করা থাকলেও, জেনিনের আঙুল আজ ট্রিগারে স্থির হয়ে আছে। কারণ সে জানে, তার সামান্য এক ইশারায় আরিয়ানের স্বয়ংক্রিয় গানগুলো তাকে শেষ করে দেবে, আর নিচে থাকা নোবারাকে হায়েনারা ছিঁড়ে খাবে।
“কী হলো জেনিন? থমকে গেলে কেন?” আরিয়ান তার পোড়া মুখের বীভৎস হাসিটা আরও চওড়া করল। “বাবা যখন তোমাকে বিলেতে পাঠালেন আর আমাকে এই ঢাকার নোংরা ড্রেনে ফেলে দিলেন, তখন তো তোমার মায়া হয়নি। আজ হঠাৎ ছোট ভাইয়ের জন্য মায়া জাগল?”
“তুমি ভুল ভাবছো আরিয়ান,” জেনিন শান্ত কিন্তু বজ্রকণ্ঠে বলল। “বাবা জানতেন তুমি ক্ষমতার অপব্যবহার করছো। তুমি যে আগুন লাগিয়েছিলে, তাতে তুমি নিজেই পুড়েছিলে। আমি ভেবেছিলাম তুমি মারা গেছো, নতুবা আমি নিজেই তোমাকে খুঁজে বের করতাম।”
“খুঁজে বের করতে? মারার জন্য, তাই না?” আরিয়ান সজোরে কি-বোর্ডে একটা থাপ্পড় মারল। “প্রজেক্ট নূরশাদ এর পাসওয়ার্ড দাও। আমি জানি ওই ড্রাইভে বাবার গোপন ফাণ্ডের এক্সেস আছে যা দিয়ে এই পুরো এশিয়া প্যাসিফিকের আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেট কন্ট্রোল করা যায়। ওটা আমার চাই।”
জেনিন এক মুহূর্তের জন্য নিচের স্ক্রিনের দিকে তাকাল। সে দেখল নোবারার গাড়ির খুব কাছে পৌঁছে গেছে আরিয়ানের খুনিরা। কিন্তু নোবারা গাড়ি থেকে নামছে না। জেনিনের মনে এক অদ্ভুত আশা জাগল। সে জানে নোবারাকে সে কী শিখিয়েছিল।
নিচে রাজপথে, নোবারা দেখল চারজন কালো পোশাকধারী লোক তার এসইউভি ঘিরে ফেলেছে। তাদের হাতে লম্বা ছুরি আর সাইলেন্সর লাগানো পিস্তল। নোবারার হৃদপিণ্ড গলার কাছে চলে আসলেও সে জেনিনের সেই শেষ কথাগুলো মনে করার চেষ্টা করল, “নোবারা, যখন বাঘ কোণঠাসা হয়, তখন সে তার থাবা লুকায় না।”
একজন লোক গাড়ির কাঁচে সজোরে আঘাত করল। “ম্যাম, নেমে আসুন। জেনিন ভাই আপনার জন্য উপরে অপেক্ষা করছেন।”
নোবারা ভয় পেল না। সে দ্রুত গাড়ির গিয়ার শিফট করল। জেনিনের এই গাড়িটি সাধারণ নয়, এটি একটি রিইনফোর্সড আর্মড ভেহিকল। তাছাড়া এর কাঁচ ও বুলেটপ্রুফ। নোবারা ব্রেক থেকে পা সরিয়ে এক ঝটকায় এক্সিলারেটর চেপে ধরল। গাড়িটি গর্জন করে উঠল এবং সামনের দুজনকে পিষে দিয়ে ফুটপাতে উঠে গেল।
লোকগুলো হকচকিয়ে গেল। তারা ভাবেনি একটা মেয়ে গাড়ি দিয়ে তাদের ওপর হামলা করবে। যদিও নোবারার কাছে এসব বা হাতের খেলাই! কিন্তু আপাতত তাকে এমন ভান করতে হবে যেন সে এসব জানতোই না, জেনিন তাকে শিখিয়েছে। নোবারা গাড়িটি ঘোরালো এবং হেডলাইটের হাই-বিম জ্বালিয়ে তাদের চোখ ধাঁধিয়ে দিল।
জেনিনের গাড়ির ড্যাশবোর্ডে থাকা একটি সিক্রেট বাটন নোবারার নজরে এল। জেনিন তাকে একবার বলেছিল, বিপদে পড়লে লাল বাটনটি চাপতে।
নোবারা বাটনটি চাপল। সাথে সাথে গাড়ির পেছনের অংশ থেকে ঘন ধোঁয়া বের হতে শুরু করল এবং টায়ার থেকে ছোট ছোট লোহার পেরেক রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ল। আরিয়ানের লোকেরা তাদের বাইক নিয়ে তাড়া করতে গিয়ে স্লিপ করে রাস্তায় আছড়ে পড়ল। নোবারা গাড়িটি রাস্তার মাঝখানে আড়াআড়িভাবে থামিয়ে দিল এবং জেনিনের রাখা ইমার্জেন্সি রিভলভারটি হাতে নিল। তার হাত কাঁপছিল, কিন্তু তার চোখে তখন জেনিনের সেই তেজ।
ওদিকে দশম তলার মনিটরে আরিয়ান দেখল তার পরিকল্পনা ব্যর্থ হচ্ছে। নোবারা পালিয়ে যায়নি, বরং সে লড়াই করছে। আরিয়ানের মুখ রাগে নীল হয়ে গেল।
“তোমার বউ তো দেখছি বিষাক্ত সাপ!” আরিয়ান চিৎকার করে উঠল। “কিন্তু তুমি বেঁচে ফিরবে না। টার্রেটস, ফায়ার!”
স্বয়ংক্রিয় গানগুলো জেনিনের দিকে লক্ষ্য করে গুলি শুরু করার আগেই জেনিন এক অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় মেঝেতে স্লাইড করে একটি সার্ভার র্যাকের আড়ালে চলে গেল। গুলির শব্দে পুরো ফ্লোর কেঁপে উঠল। জেনিন তার জ্যাকেট থেকে একটি ইএমপি গ্রেনেড বের করল, যা ইউজি তাকে উপহার হিসেবে দিয়েছিল।
জেনিন গ্রেনেডটি পিন খুলে মাঝখানে ছুড়ে দিল।
‘ঝনঝন!’ এক বিশাল বৈদ্যুতিক ঝিলিকের সাথে সাথে পুরো আইটি পার্কের সব কম্পিউটার, সার্ভার আর টার্রেট গানগুলো অকেজো হয়ে গেল। ঘরটি ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে গেল। আরিয়ান চিৎকার করে উঠল, কারণ তার নাইট-ভিশন গগলসও জ্যাম হয়ে গেছে।
জেনিন অন্ধকারের সুযোগ নিল। সে ছায়ার মতো আরিয়ানের পেছনে গিয়ে তার গলায় ছুরি ধরল। “খেলা শেষ আরিয়ান। ইউজির ব্রেন থেকে ওই ম্যালওয়্যার সরানোর কোড বলো, নতুবা তোমার ওই পোড়া মুখটা আমি আজ শরীর থেকে আলাদা করে দেব।”
আরিয়ান কাশতে কাশতে হাসল। “কোড আমার মাথায় নেই। কোড আছে আমার হার্টবিটে। আমি মারা গেলে ইউজির ব্রেইন চিরতরে ডেড হয়ে যাবে। মারো আমাকে! সাহস থাকলে মারো!”
জেনিন থমকে গেল। আরিয়ান এক ভয়ংকর মাস্টারমাইন্ড। সে নিজের জীবনের সাথে ইউজির জীবনকে বেঁধে ফেলেছে। জেনিন আরিয়ানের কলার ধরে তাকে জানালার কাছে নিয়ে এল। নিচে তখনো নোবারা লড়াই করছে।
এদিকে আরিয়ান জেনিনের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য নিজের পকেটে থাকা একটি ছোট ইনজেকশন নিজের ঘাড়ে ফুটিয়ে দিল। এটি ছিল একটি শক্তিশালী নিউরোটক্সিন।
“জেনিন…আমি মরে গেলে…ইউজি বাঁচবে না। কিন্তু আমি মরার আগে…তোমাকে একলা করে দিয়ে যাব…” আরিয়ানের চোখ থেকে রক্ত ঝরতে শুরু করল। সে টলতে টলতে জানালার ভাঙা কাঁচের দিকে এগিয়ে গেল।
“আরিয়ান! না!” জেনিন তাকে ধরার চেষ্টা করল।
কিন্তু আরিয়ান এক পৈশাচিক হাসি দিয়ে দশ তলা থেকে নিচে ঝাঁপ দিল। জেনিন জানালার বাইরে হাত বাড়িয়েছিল, কিন্তু সে পেল কেবল শূন্যতা। আরিয়ানের দেহটি নিচে একটি সিমেন্ট মিক্সার ট্রাকের ওপর আছড়ে পড়ল।
নিচে নোবারা গাড়ি থেকে বেরিয়ে জেনিনের দিকে তাকাচ্ছিল। জেনিন হারেনি, কিন্তু সে জয়ীও হতে পারল না। আরিয়ান তার সাথে করে ইউজির মুক্তির চাবিকাঠি নিয়ে চলে গেছে।
ভোর হতে শুরু করেছে। কারওয়ান বাজারের আকাশটা এখন ফিকে ছাই রঙের। জেনিন নিচে নেমে এল। নোবারা দৌড়ে এসে জেনিনকে জড়িয়ে ধরল। নোবারার গায়ে রক্তের ছিটে লেগে আছে, তার চুল অগোছালো। জেনিন নোবারাকে শক্ত করে ধরল। সে আজ বুঝতে পেরেছে, এই পৃথিবীতে নোবারাই তার একমাত্র ধ্রুবতারা।
“ইউজি কি ঠিক হবে জেনিন?” নোবারা ডুকরে কেঁদে উঠল।
জেনিন আরিয়ানের ল্যাব থেকে উদ্ধার করা একটি পেনড্রাইভ নিয়ে এসেছে। সে পেনড্রাইভটা মুঠোর ভেতর চেপে ধরল। তার মনে হলো আরিয়ান তাকে শেষ একটা সুযোগ দিয়েছে, নাকি এটাও কোনো মরণফাঁদ? জেনিন নূরশাদ আজ তার নিজের ভাইয়ের রক্তে ভেজা হাত নিয়ে নূরশাদ ভিলার দিকে ফিরছে।
<><><><><><><><><>
নূরশাদ ভিলার বাতাস এখনো ভারী হয়ে আছে। আইসিইউ-র বাইরে জেনিন নূরশাদ একটি কাঁচের দেওয়ালের সামনে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। তার শার্টের হাতা গোটানো, নখ থেকে শুকিয়ে যাওয়া আরিয়ানের রক্ত তখনো পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি। তার হাতের তালুতে সেই ছোট পেনড্রাইভটি। এটি কেবল একটি ড্রাইভ নয়, এটি ইউজির মস্তিষ্কের ভেতরে চলা পৈশাচিক কোলাহলের একমাত্র অ্যান্টি-ভাইরাস। কিন্তু আরিয়ানের মতো ধূর্ত মানুষ কি এত সহজে মুক্তির চাবিকাঠি দিয়ে যাবে? নাকি এটি ইউজিকে চিরতরে শেষ করে দেওয়ার কোনো চূড়ান্ত চক্রান্ত?
জেনিন ঘরটিতে ঢুকল। ইউজি বিছানায় শোয়া, তার শরীর এখন আর ছটফট করছে না, বরং সেটি এক অসাড় পাথরের মতো স্থির। মনিটরের ইসিজি গ্রাফটি খুব ক্ষীণভাবে ওঠানামা করছে। জেনিন ইউজির ফ্যাকাসে কপালে হাত রাখল। ইউজির শরীরটা বরফের মতো ঠান্ডা। জেনিন নিজের জীবনের সবচাইতে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে।
“ইউজি,” জেনিন খুব নিচু স্বরে ডাকল। “আমি জানি তুমি শুনতে পাচ্ছ। আমি তোমাকে মরতে দেব না। তোমাকে আমার জন্য বাঁচতে হবে। তুমি আমার যোদ্ধা ইউজি, তোমাকে ফিরতেই হবে।”
জেনিন পেনড্রাইভটি প্রধান সার্ভারের সাথে কানেক্ট করল। স্ক্রিনে হাজার হাজার কোড বৃষ্টির মতো নামতে শুরু করল। জেনিন নিজে ইউজির তৈরি করা ল্যাঙ্গুয়েজগুলো জানে। সে দেখল আরিয়ান ইউজির নিউরাল নেটওয়ার্কে একটি ‘ডেড-ম্যান সুইচ’ বসিয়ে রেখেছে। যদি জেনিন ভুল কোড ইনপুট দেয়, তবে ইউজির হার্ট সেকেন্ডের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাবে।
জেনিনের আঙুলগুলো কি-বোর্ডের ওপর কাঁপছিল না। স্ক্রিনে ভেসে উঠল, “Password Required”। জেনিন ভাবল। আরিয়ান কী পাসওয়ার্ড দিতে পারে? আরিয়ান তাকে হিংসে করত, ঘৃণা করত। জেনিন টাইপ করল, HATE। ‘Denied’।
জেনিন আবার ভাবল। আরিয়ান তার বাবার ভালোবাসা চেয়েছিল। জেনিন টাইপ করল, NURSHAD। ‘Denied’।
ইউজির পালস রেট কমতে শুরু করল। ৬০… ৫০… ৪০। জেনিনের কপালে ঘাম জমে ড্রপ হয়ে কি-বোর্ডের ওপর পড়ল। নোবারা ঘরের বাইরে থেকে প্রার্থনা করছে। জেনিন চোখ বন্ধ করল। সে মনে করার চেষ্টা করল সেই শৈশবের কথা, যখন আরিয়ান আর সে একসাথে ছাদে ঘুড়ি উড়াত। আরিয়ান তাকে সবসময় বলত, “একদিন আমরা পুরো শহরটা এক সুতোয় বেঁধে ফেলব।”
জেনিন টাইপ করল, ONE_STRING (এক সুতো)
হঠাৎ স্ক্রিনটি সবুজ হয়ে উঠল। ‘Access Granted’। আরিয়ান তার জীবনের শেষ পাসওয়ার্ডটি রেখেছিল তাদের সেই হারিয়ে যাওয়া ভ্রাতৃত্বের স্মৃতিতে! জেনিনের তীক্ষ্ণ আইকিউ আজ ইউজিকে বাঁচিয়ে দিল!
কোডগুলো ইউজির মস্তিষ্কের চিপের সাথে সিনক্রোনাইজ হতে শুরু করল। ইউজির শরীর হঠাৎ ধনুকের মতো বেঁকে উঠল। সে এক ভয়ংকর আর্তনাদ করে উঠল, যা কোনো মানুষের গলার স্বর হতে পারে না। তার নাক আর কান দিয়ে কালচে রক্ত বেরিয়ে আসতে লাগল। জেনিন ইউজিকে সজোরে চেপে ধরল।
“ইউজি! মাই ম্যান। ফাইট করো! ফিরে এসো আমার কাছে!” জেনিন চিৎকার করে উঠল।
মনিটরটি লাল হয়ে গেল। ইউজির হার্টবিট স্ট্রেট লাইন হয়ে গেল! মেশিনের বিরামহীন তীক্ষ্ণ শব্দ ‘টি-ই-ই-ই’ পুরো ঘরে এক বিভীষিকা তৈরি করল। ডাক্তাররা দৌড়ে এলেন ডিফিব্রিলেটর নিয়ে।
“বস, সরে যান! আমরা ওকে শক দেব!” সার্জন চিৎকার করলেন।
“না!” জেনিন ইউজির বুক চেপে ধরল। “ওর হার্টে সমস্যা নেই, ওর সমস্যা মাথায়! ও লড়াই করছে।”
জেনিন দেখল স্ক্রিনে কোডগুলো ৯৯% এ আটকে গেছে। জেনিন বুঝতে পারল ইউজিকে শেষ ধাক্কাটা নিজেকেই দিতে হবে। সে ইউজির কানের কাছে মুখ নিয়ে তার সেই আদেশটি দিল যা ইউজি কোনোদিন অমান্য করতে পারেনি।
“উদয় গালিব! আমি জেনিন নূরশাদ, তোমার ভাই তোমাকে অর্ডার দিচ্ছি, জেগে ওঠো! তোমার বস একা হয়ে গেছে। তুমি কি চাও আমি এই সাম্রাজ্য ধুলোয় মিশিয়ে দেই? ফিরে এসো ইউজি! আমার তোমাকে প্রয়োজন। জীবনের প্রতিটি ধাপে।”
ঠিক সেই মুহূর্তে স্ক্রিনটি ১০০% পূর্ণ হলো। মেশিনের সেই বিরামহীন শব্দ থেমে গিয়ে আবার ছন্দময় ‘লুব-ডাব’ শব্দ শুরু হলো। ইউজির চোখের মণিগুলো কাঁপতে শুরু করল। সে এক বিশাল বড় নিঃশ্বাস নিল, যেন সে পাতাল থেকে জলের উপরিভাগে উঠে এল।
ইউজি চোখ মেলল। তার চোখ দুটি আর রক্তবর্ণ নয়, সেখানে সেই চেনা বুদ্ধিমত্তা ফিরে এসেছে। সে ঝাপসা চোখে জেনিনকে দেখল। জেনিন নূরশাদ, সেই পাথরের মতো কঠিন মানুষটি, আজ ইউজির হাত ধরে শিশুর মতো কাঁদছে।
“বস…” ইউজির গলাটা ভাঙা, কিন্তু পরিষ্কার।
জেনিন ইউজিকে জড়িয়ে ধরল। “তুমি ফিরে এসেছ ইউজি। মাই ম্যান, ইউ আর এ রিয়েল ফাইটার।”
ইউজি ধীরে ধীরে চারপাশটা দেখল। সে বুঝতে পারল সে কোথায়। নোবারা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে কাঁদছে। ইউজি নোবারার দিকে তাকিয়ে একটু মাথা নোয়ালো।
জেনিন ইউজিকে শুইয়ে দিল। “লিসেন ইউজি, এখন আর কোন মিশন এ যাবে না তুমি। এখন শুধু ঘুম। রেস্ট নাও।”
ইউজি চোখ বুজল। তার শরীরটা অবসন্ন, কিন্তু তার মনটা আজ শান্ত। সে জানে, যতক্ষণ জেনিন বস তার মাথার ওপর হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে, ততক্ষণ দুনিয়ার কোনো ‘জিরো’ তাকে স্পর্শ করতে পারবে না।
সকালটা যখন নূরশাদ ভিলার ড্রাইভওয়েতে সোনালি রোদ বিছিয়ে দিল, তখন ভিলার পরিবেশটা আর আগের মতো নেই। আরিয়ানের সেই মৃত অভিশাপ আজ মুছে গেছে। জেনিন স্টাডি রুমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশে নোবারা।
“ইউজি বিপদমুক্ত জেনিন,” নোবারা জেনিনের কাঁধে হাত রাখল। “আপনি ওকে ফিরিয়ে এনেছেন।”
“না নূরা, ও নিজেই ফিরে এসেছে,” জেনিন আকাশের দিকে তাকালো। “ইউজি ছাড়া এই জেনিন নূরশাদ অর্ধেক। ও আমার ছোট ভাই, ও আমার আত্মা। আরিয়ান আমাকে রক্ত দিয়ে শিক্ষা দিতে চেয়েছিল, কিন্তু ও জানত না যে রক্তের চেয়েও বড় সম্পর্ক হলো বিশ্বাসের।”
জেনিন তার পকেট থেকে সেই পেনড্রাইভটি বের করে ছাদ থেকে নিচে ছুড়ে ফেলে দিল। ড্রাইভটি শ্বেতপাথরের ওপর পড়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। জেনিন আর কোনোদিন আরিয়ানের ছায়া দেখতে চায় না। সে চায় এক নতুন পৃথিবী, যেখানে ইউজি থাকবে তার পাশে, আর নোবারা থাকবে তার হৃদয়ে।
চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।।।।।

