#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৪২
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
পাঁচ বছর আগের একটি দিন। ইউজি তখন জেনিন নূরশাদের এম্পায়ার এর এক উদীয়মান সেনাপতি হতে শুরু করেছে। ডার্ক ওয়েবের জগৎ থেকে বেরিয়ে সেদিন সে ঢাকার এক প্রান্তিক রেলওয়ে স্টেশনে গিয়েছিল এক গোপন ডেটা ট্রান্সফারের জন্য। কিন্তু মুহূর্তেই সেই শান্ত স্টেশন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির দাঙ্গায় পুরো এলাকা বারুদের গন্ধে ভরে উঠেছিল। মানুষ দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটছিল। সেই বিশৃঙ্খলার মাঝে ইউজি দেখেছিল এক স্নিগ্ধ শোভন রমণী কে।
ভিড়ের চাপে মেয়েটি রেললাইনের পাথরের ওপর পড়ে গিয়েছিল। পাশেই একদল উন্মত্ত মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে তেড়ে আসছিল। ইউজি সেদিন নিজের পরিচয়, নিজের কাজ সব ভুলে এক মরণপণ দৌড় দিয়েছিল। সে মেয়েটিকে জাপটে ধরে এক হেঁচকা টানে পাশের এক মালগাড়ির পেছনের অন্ধকারে লুকিয়ে ফেলেছিল। মেয়েটি তখন ভয়ে এমনভাবে ইউজির শার্টের হাতা খামচে ধরেছিল, যেন ইউজিই তার জীবনের শেষ আশ্রয়।
সেদিন মেয়েটির আকাশী ফ্রকের হাতা ছিঁড়ে গিয়েছিল, কপাল দিয়ে ঝরছিল এক চিলতে রক্ত। ইউজি নিজের পকেট থেকে রুমাল বের করে তার ক্ষতটা মুছে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু তার আগেই পুলিশ এসে পড়ে। ভিড়ের চাপে আর পুলিশের লাঠিচার্জে ইউজিকে সরে যেতে হয়। যখন সে ফিরে এল, সেই মালগাড়ি চলে গেছে, আর সেই মেয়েটিও কোথাও নেই। ইউজি শুধু কুড়িয়ে পেয়েছিল মেয়েটির ফ্রক থেকে খসে পড়া একটা ছোট্ট রুপালি বোতাম!
সেই বোতামটি ইউজি আজও তার লকেটে ভরে রাখে। গত কয়েক বছরে সে পৃথিবীর কত সার্ভার হ্যাক করেছে, কত মানুষের গোপন তথ্য বের করেছে, কিন্তু সেই মেয়েটিকে সে কোনো ডাটাবেসে খুঁজে পায়নি। সে ভাবত, মেয়েটি হয়তো এই শহরেরই কোনো গলিতে তার আকাশী স্বপ্ন নিয়ে হারিয়ে গেছে!
আজকের সকালটা জেনিনের জন্য ছিল কর্পোরেট ব্যস্ততার। নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের প্রধান কার্যালয়ে আজ নতুন ডেটা এনালিস্ট পদের ইন্টারভিউ চলছে। জেনিন তার কেবিনে বসে ফাইল দেখছিল, আর ইউজি আজ একটু শখ করেই জেনিনের সাথে অফিসে এসেছে। সে জেনিনের কেবিনের পেছনের কাঁচের দেয়ালের ওপাশে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিল।
“বস, এইচআর পাঁচজনের একটা শর্টলিস্ট পাঠিয়েছে। আপনি কি একবার দেখবেন?” জেনিনের মেন্ডাটরি সেক্রেটারি ভেতরে ঢুকে ফাইলটা রাখল।
জেনিন চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে ফাইলটা দেখল। “ইউজি, তুমিই এই পাঁচজনের ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করো তো। আমার এমন কেউ দরকার যে ফাইলে লুকানো ভুলগুলো সেকেন্ডে ধরতে পারবে।”
ইউজি অনিচ্ছাসত্ত্বেও ফাইলটা টেনে নিল। বসের হুকুম বা ইচ্ছে, কোনটাই এড়িয়ে যাওয়ার সাঁই তার মন কখনো দেয়না!
ল্যাপটপে নামগুলো টাইপ করতে করতে সে হঠাৎ থমকে গেল। চার নম্বর নামটি পড়ার সাথে সাথে তার বুকটা ধক করে উঠল।
নাম: নীলিমা রহমান। বয়স: ২২ বছর।
নামটা খুব সাধারণ, কিন্তু ইউজির মনে হলো তার বুকের ভেতর সেই পুরনো স্টেশনের ঘণ্টার ধ্বনি বেজে উঠল। সে দ্রুত নীলিমার প্রোফাইল ছবিটা ওপেন করল। স্ক্রিনে একটি মায়াবী মুখ ভেসে উঠল। সেই ডাগর চোখ, চেহারার কাটা দাগ,,সব যেন সময়ের পরিক্রমায় আরও পরিণত হয়েছে। তবে চোখের কোণে থাকা মায়াটা আজও বদলায়নি। নীলিমা তখন আকাশী ফ্রক পরে নেই, তার পরনে এক মার্জিত ফর্মাল শাড়ি।
ইউজির হাত কাঁপছিল। সে কি ভুল দেখছে? সে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নীলিমার একাডেমিক রেকর্ড হ্যাক করে দেখল। নীলিমা তার জীবনবৃত্তান্তে লিখেছে যে সে কয়েক বছর আগে এক বড় দুর্ঘটনায় তার পরিবারকে হারিয়েছে এবং তারপর থেকে সে একাই লড়ছে।
“বস…” ইউজির গলাটা বুজে এল।
জেনিন মুখ তুলে তাকাল। “কী হলো? কোনো ফ্রড ফাইল ধরা পড়েছে?”
“না বস। আপনি কি চার নম্বর ক্যান্ডিডেটকে এখন ডাকতে পারেন?” ইউজি নিজেকে সামলে নিয়ে বলল।
জেনিন একটু অবাক হলো। ইউজি কখনো কোনো ক্যান্ডিডেটের জন্য সুপারিশ করে না। সে ইন্টারকম চেপে সেক্রেটারিকে বলল, “নীলিমা রহমানকে ভেতরে পাঠান।”
অফিসের ভারি কাঠের দরজাটা ধীর লয়ে খুলে গেল। নীলিমা ভেতরে প্রবেশ করল। তার হাতে একটি ফাইল, পায়ে খুব ধীর পদবিক্ষেপ। সে যখন জেনিনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল, সে জানত না পেছনের সেই অন্ধকার কোণে কে বসে আছে।
“গুড মর্নিং স্যার। আ’ম নীলিমা রহমান,” মেয়েটির কণ্ঠস্বর একদম শান্ত, যেন শ্রাবণের বৃষ্টি।
জেনিন তাকে বসতে বলে ফাইলটা দেখতে শুরু করল। “আপনার রেজাল্ট খুব ভালো মিস। কিন্তু এই প্রফেশনে মেন্টাল পাওয়ার অনেক বেশি লাগে। ক্যান ইউ হ্যান্ডেল ইট?”
নীলিমা একটু হাসল। “ইয়েস স্যার, আই উইল ডু মাই বেস্ট।”
পেছন থেকে ইউজি তখনো নির্বাক। সে দেখতে পাচ্ছিল নীলিমার আঁচল টা বারবার কাঁধ থেকে পড়ে যেতে চাইছে। ইউজি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে চেয়ার ছেড়ে ধীর পায়ে জেনিনের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল।
নীলিমা হঠাৎ পেছন ফিরে তাকাল। ইউজিকে দেখা মাত্রই তার চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হলো অফিসের এসি, কম্পিউটারের শব্দ, জেনিনের ফাইল নাড়ানোর আওয়াজ…সবই স্তব্ধ হয়ে গেছে। নীলিমা তার ফাইলটি শক্ত করে চেপে ধরল। তার মনে পড়ে গেল সেই স্টেশনের ধোঁয়াটে বিকেল। সেই অচেনা ছেলেটি!
“আপনি…” নীলিমার কণ্ঠস্বর থরথর করে কাঁপছে।
ইউজি কোনো কথা বলল না। সে তার লকেট থেকে সেই ছোট্ট রুপালি বোতামটি বের করে টেবিলের ওপর রাখল।
অতঃপর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নীলিমা ধীর পায়ে টেবিলের কাছে এগিয়ে এল। সে নিজের কাঁপানো আঙুলে বোতামটি স্পর্শ করল। এক শীতলতা যেন তার শরীরে এক বিদ্যুৎ তরঙ্গ বয়ে নিয়ে গেল। স্টেশনের বিভীষিকা, মালগাড়ির পেছনের সেই পোড়া তেলের গন্ধ, আর এই ছেলেটির বুকের উষ্ণতা…সবই যেন এক নিমেষে বর্তমানে ফিরে এল।
“আপনি… আপনি সেই মানুষটা না?” নীলিমা খুব নিচু স্বরে বলল, তার কণ্ঠস্বর আবেগে বুজে আসছে। “আমি জানতাম না আপনার নাম, জানতাম না আপনার পরিচয়। শুধু জানতাম, সেদিন আমার জীবনটা আপনার ঋণে কেনা।”
ইউজি এক ম্লান হাসি হাসল। সে জেনিনের সামনে খুব একটা আবেগপ্রবণ হয় না, কিন্তু আজ যেন তার সব দেয়াল ভেঙে পড়ছে। “আমিও তো আপনার নাম জানতাম না নীলিমা। আমার কাছে শুধু এই বোতামটি ছিল।”
জেনিন নূরশাদ তার চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে এই দৃশ্যটি উপভোগ করছিল। সে বুঝতে পারল, ইউজি নামের এই যান্ত্রিক ছেলেটির ভেতরেও একটা বিশাল নীল সমুদ্র আছে। জেনিন তার হাতের ফাইলটা বন্ধ করে মৃদু শব্দে টেবিলের ওপর রাখল।
“ইউজি, তোমার এই হিস্টোরিক্যাল গল্প পরে শুনব। আগে বলো, মিস রহমান কি আমাদের নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের যোগ্য?” জেনিনের গলায় এক ধরণের কৌতুকপূর্ণ গাম্ভীর্য।
ইউজি চট করে নিজেকে সামলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। “ইয়েস বস!”
জেনিন নীলিমার দিকে তাকাল। “নীলিমা, আপনি আজ থেকেই জয়েন করতে পারেন। ইউজি আপনাকে আপনার ডেস্ক আর কাজের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেবে। তবে মনে রাখবেন, নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজে কাজ করা মানে কেবল ফাইল নাড়ানো নয়, এখানে আনুগত্যই সব। মাইন্ড ইট।”
নীলিমা জেনিনকে সম্মান জানিয়ে মাথা নিচু করল। “আমি বুঝতে পারছি স্যার। আমি আমার সেরাটা দেব।”
জেনিনের কেবিন থেকে বেরিয়ে করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় ইউজি আর নীলিমার মধ্যে এক অদ্ভুত জড়তা কাজ করছিল। ইউজি, যে কি না সেকেন্ডে কয়েক হাজার কোড লিখে ফেলতে পারে, সে এখন কথা বলার সঠিক শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না। নীলিমা তার শাড়ির আঁচলটা ঠিক করতে করতে বারবার ইউজির দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছিল।
“আপনার নামটা তখনো জানা হয়নি,” নীলিমা নীরবতা ভাঙল।
ইউজি একটু লজ্জা পেয়ে হাসল। “সবাই আমাকে ইউজি বলে ডাকে, পূর্ন নাম উদয় গালিব। জেনিন বসের ছায়াসঙ্গী বলতে পারেন।”
ইউজি নীলিমাকে নিয়ে তার জন্য বরাদ্দ করা ডেস্কে এল। নীলিমা দেখল তার টেবিলে আগে থেকেই একগুচ্ছ তাজা নীল অপরাজিতা রাখা আছে। সে অবাক হয়ে ইউজির দিকে তাকাল।
“এগুলো কি আপনি রেখেছেন?”
ইউজি কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “আমি…মানে, এইচআর থেকে হয়তো ওয়েলকাম গিফট হিসেবে দিয়েছে। আসলে আমি জানি না।”
ইউজি কথা না বাড়িয়ে দ্রুত নিজের কেবিনে ঢুকে পড়ল। তার কানে এখন গরম আঁচ অনুভূত হচ্ছে। জেনিন নূরশাদ তার কেবিনের সিসিটিভি ফুটেজে এই দৃশ্য দেখছিল আর হাসছিল। তার রাইট হ্যান্ড এর জীবনে বোধহয় রাইট মানুষটা চলেই এলো!
***বিকেলবেলা। নোবারা নূরশাদ ভিলা থেকে জেনিনের জন্য লাঞ্চ নিয়ে অফিসে এসেছে। সে এসেই শুনল ইউজি নাকি এক নতুন ক্যান্ডিডেটের সাথে খুব সময় কাটাচ্ছে। নোবারার কৌতূহল আকাশ ছুঁল। সে জেনিনের কেবিনে না গিয়ে সরাসরি ইউজির ল্যাবের দিকে এগিয়ে গেল।
সেখানে গিয়ে দেখল ইউজি খুব মনোযোগ দিয়ে নীলিমাকে কম্পিউটারের একটা গ্রাফ বুঝিয়ে দিচ্ছে। নীলিমা খুব মুগ্ধ হয়ে দুহাতের মাঝে থুতনি রেখে ইউজির কথা শুনছে। নোবারা দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে গলা পরিষ্কার করল।
“ইউজি! বেজি বাবা, তোমার কি এখন লাঞ্চ করার সময় হবে? নাকি ক্ষিদে নেই আজ!”
ইউজি চমকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়াল। সে একটানা বলে চললো,,,”ম্যাম! আপনি কখন এলেন? মানে… ইনি হলেন নীলিমা রহমান, আমাদের নতুন এনালিস্ট। আর নীলিমা, ওনি…ওনি আমাদের ম্যাম, বসের ওয়াইফ, নোবারা নুরশাদ।”
নোবারা এগিয়ে এসে নীলিমাকে আপাদমস্তক দেখল। নীলিমার স্নিগ্ধতা আর তার মায়াবী চোখ দেখে নোবারা বুঝল তার ইউজি নামক বেজি আজ কেন এত বিজি! নোবারা নীলিমার হাত ধরল।
“আপনি খুব সুন্দর নীলিমা। আর আমি খুব খুশি যে ইউজির পাশে কাউকে কথা বলার জন্য পাওয়া গেল। নতুবা ও তো সারাদিন কম্পিউটারের সাথে প্রেম করে,” নোবারা হেসে বলল।
নীলিমা একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসল। “থ্যাংকস ম্যাম। উদয় খুব হেল্পফুল।”
নোবারা ইউজির দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল। শখ করে উদয় ডাকা হচ্ছে! এ থেকে নোবারার বুঝতে সময় লাগলো না নীলিমা ইউজিকে পছন্দ করেই ফেলেছে! নোবারা তখন বললো,
“হেল্পফুল? ও তো আস্ত একটা খিটখিটে রোবট! কিন্তু আজ ওকে দেখে মনে হচ্ছে রোবটটার সার্কিটে কেউ ভালোবাসার শর্ট সার্কিট করে দিয়েছে।”
“ম্যাম! প্লিজ!” ইউজি প্রায় মিনতি করে উঠল। “বসের লাঞ্চ বক্সে মনে হয় মুরগির মাংস আছে, আমি বরং সেটা চেক করি গে।”
ইউজি পালানোর পথ খুঁজতে লাগল। নোবারা নীলিমাকে নিয়ে সোফায় বসল। “শুনো নীলিমা, তুমি করেই বলছি, ইউজি আমার ছোট ভাইয়ের মতো। ও একটু ক্ষ্যাপা তবে মন্দ না। বিশ্বাস যদি মানুষের রুপ নিত, তবে হয়তো ইউজির মতোই হতো। তুমি ওকে একটু দেখে রাখবে। কেমন?”
নীলিমা মিষ্টি হেসে মাথা নিচু করে ফেললো। প্রথম সাক্ষাৎকার কারেই ইউজির দায়িত্ব দিয়ে দিচ্ছে এই ম্যাম! সে লজ্জায় মুখ দেখাতেই পারছে না!
<><><><><><><><><>
জেনিন তার কেবিনে রোলিং চেয়ারে হেলান দিয়ে বসেছিল, তার চোখের চশমাটা টেবিলের এক কোণে রাখা। সে জানালার ওপাশে ঢাকার ব্যস্ত দিগন্তের দিকে তাকিয়ে গভীর কোনো ভাবনায় মগ্ন ছিল।
দরজায় খুব মৃদু একটা টোকা পড়ল। জেনিন না তাকিয়েই বুঝতে পারল এটা কে। এই পায়ের ছন্দে এক অদ্ভুত মাদকতা আছে, যা কেবল একজন মানুষেরই হতে পারে।
“কংক্রিটের দেয়াল পার হয়ে আমার এর পাথুরে হৃদয়ে প্রবেশ করার জন্য স্বাগতম নূরা,” জেনিন খুব শান্ত গলায় বলল।
নোবারা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। তার হাতে একটি ছোট শপিং ব্যাগ। সে জেনিনের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো এবং তার দুই হাত জেনিনের কাঁধের ওপর রাখল। জেনিন চোখ বুজে সেই স্পর্শ অনুভব করল। সারাদিনের কর্পোরেট যুদ্ধের ক্লান্তি যেন এক মুহূর্তের ছোঁয়ায় কর্পূরের মতো উড়ে গেল।
“আপনাকে খুব…খুব মিস করেছি জানেন? আপনি কি আমাকে মিস করেছেন মি:?,” নোবারা জেনিনের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল।
জেনিন ঘুরে দাঁড়িয়ে নোবারার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। “আপনি যখন সামনে থাকেন না, তখন এই সিংহাসনটাকে বড্ড ভারী মনে হয় নূরা। মনে হয় সবকিছু ছেড়ে দিয়ে আপনার সাথে কোনো এক শান্ত গ্রামের মেঠো পথে হারিয়ে যাই।”
নোবারা একটু হাসল। সে ব্যাগ থেকে একটি চমৎকার গাঢ় রঙের সিল্কের রুমাল বের করল। “এই নিন। আসার পথে আপনার জন্য কিনলাম। আপনার ওই পুরনো রুমালটা ইউজি সেদিন কফি ফেলে নষ্ট করে দিয়েছে।”
জেনিন রুমালটা নাকের কাছে নিল। নোবারার পছন্দের পারফিউমের সূক্ষ্ম ঘ্রাণ লেগে আছে তাতে। সে নোবারাকে কাছে টেনে নিল।
জেনিন নোবারাকে তার টেবিলের ওপর বসাল। নোবারার পা দুটো দুলছে, আর তার হাতের কাঁচের চুড়িগুলো টুংটাং শব্দ করছে। জেনিন তার দুই হাত দিয়ে টেবিলের ওপর ভর দিয়ে নোবারাকে ঘিরে ধরল।
“নূরা, আপনি জানেন? আজ ইউজিকে দেখে আমার খুব ঈর্ষা হচ্ছিল,” জেনিন হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলল।
নোবারা ভ্রু কুঁচকে তাকাল। “ঈর্ষা? কেন? ইউজি তো আজ নীলিমাকে পেয়েছে! রঙ লেগেছে ছেলেটার মনে।”
“সেই জন্যেই তো,” জেনিন নোবারার চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল। “ওর চোখের সেই নতুন মায়াটা দেখে মনে পড়ছিল আমাদের শুরুর দিনগুলোর কথা। যখন আমি স্কুলে আপনাকে প্রথম দেখেছিলাম, তখন আমার হৃদপিণ্ডের গতিবেগ ইউজির চেয়েও দ্রুত ছিল। আজ অফিসে নীলিমাকে দেখার পর ইউজি যেভাবে বোকা বনে গিয়েছিল, আমি ঠিক সেভাবেই আপনার প্রেমে পড়েছিলাম।”
নোবারা লজ্জা পেয়ে জেনিনের বুকে একটা হালকা কিল মারল। “আপনি বড্ড বানিয়ে কথা বলেন! আপনি তো তখন আস্ত একটা পাথর ছিলেন। কত যে উল্টাপাল্টা কাজ করেছেন! জুনিয়র ছিলাম, তাই ঠাস করে একটা মারিনি!”
“পাথর ছিলাম বাইরে থেকে, ভেতরে তো আগ্নেয়গিরি বইছিল,” জেনিন হাসল। সে নোবারার কপালে নিজের কপাল ঠেকাল। “আজকের বিকেলটা আমি আপনার নামে লিখে দিতে চাই। পরোয়ানা নিবেন?”
নোবারা জেনিনের টাইটা একটু ঠিক করে দিল। “তাহলে চলুন। আজ আমরা বাইরে কোথাও ডিনার করব না। আজ বাড়িতে গিয়ে আমি নিজ হাতে আপনার প্রিয় শাহী কোরমা রাঁধব। আর ইউজিকে বলব ও যেন নীলিমাকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যায়, আমাদের যেন ডিস্টার্ব না করে।”
জেনিন আর নোবারা দু’জনেই হেসে উঠল।
অফিস থেকে বেরিয়ে জেনিন আজ ড্রাইভারকে ছুটি দিয়ে দিল। সে নিজেই স্টিয়ারিং ধরল, আর পাশে বসল নোবারা। ঢাকার চিরচেনা(অচেনা) জ্যামেও আজ জেনিনের বিরক্ত লাগছে না। সে এক হাতে স্টিয়ারিং ধরছে, আর অন্য হাত দিয়ে নোবারার হাতটা শক্ত করে ধরে রেখেছে।
গাড়ির স্পিকারে খুব নিচু স্বরে একটা পুরোনো দিনের গান বাজছে। বোধহয়”এই কথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো, তুমি বলোতো?” নোবারা জানালা দিয়ে বাইরের মানুষের ব্যস্ততা দেখছিল। জেনিন মাঝে মাঝে নোবারার হাতের তালুতে বুড়ো আঙুল দিয়ে আলতো করে ঘষছিল।
“জেনিন,” নোবারা ডাকল।
“হুম?”
“ইউজি আর নীলিমার ব্যাপারটা কি সত্যিই খুব সিরিয়াস? মানে ইউজি কি পারবে ওকে আগলে রাখতে?” নোবারার গলায় একটু দুশ্চিন্তা।
জেনিন একটা দীর্ঘশ্বাস নিল। “ইউজি আমার চেয়েও বেশি ডেডিকেটেড নূরা। ও যখন কাউকে ভালোবাসে, তখন সে নিজের জীবন দিয়ে দেয়। আমিই তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। তাই আমি নিশ্চিত, ও নীলিমাকে এমন একটা জীবন দেবে যেখানে কোনো ভয় থাকবে না।”
নোবারা একটু চুপ করে থাকল, তারপর বলল, “আমি নীলিমাকে দেখেছি। মেয়েটা খুব শান্ত। ওর চোখে অনেক কষ্ট জমা আছে। আমাদের উচিত ওদের দুজনকে একটু সময় দেওয়া।”
জেনিন গাড়িটা রাস্তার এক পাশে থামাল। জ্যাম নড়ছে না। সে নোবারার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। “আমরা ওদের সময় দেব নূরা। কিন্তু তার আগে আমি আপনাকে সময় দিতে চাই। আপনি কি জানেন? আপনি যখন হাসেন, তখন আমার পুরো রাজত্বের অন্ধকার এক নিমেষে মুছে যায়।”
জেনিন নোবারার গালটা আলতো করে স্পর্শ করল। নোবারা চোখ বুজল। গাড়ির ভেতরে এসি-র ঠান্ডা আবহাওয়া আর বাইরের সোডিয়াম ল্যাম্পের হলুদ আলো মিলে এক মোহময় পরিবেশ তৈরি হয়েছে। জেনিন নোবারার খুব কাছাকাছি এল। তাদের নিঃশ্বাসের শব্দ এখন গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দের চেয়েও স্পষ্ট।
নূরশাদ ভিলাতে যখন তারা পৌঁছালো, তখন আকাশে এক ফালি চাঁদ উঠেছে। জেনিন আর নোবারা হাত ধরাধরি করে ভিলার ভেতরে ঢুকল। ভিলাটা আজ বড় বেশি শান্ত। সম্ভবত ইউজি এখনো অফিসেই আটকে আছে অথবা নীলিমার সাথে কোথাও সময় কাটাচ্ছে।
নোবারা কিচেনে চলে গেল রান্নার আয়োজনে। জেনিন তার স্যুটটা খুলে বারান্দায় আরামদায়ক একটা ইজি চেয়ারে বসল। সে দেখল আকাশের দিকে তাকিয়ে। তার মনে হলো, মানুষের জীবনটা বড্ড অদ্ভুত। কয়েক দিন আগেও সে জানত না কাল সকালে সে বেঁচে থাকবে কি না। আর আজ সে ভাবছে রাতের ডিনারে নোবারা তার জন্য যখন রাঁধবে, সেই খাবার খেয়ে তৃপ্ত হয়ে সে প্রশংসা করতে কি কি বলবে!
চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।।
(একটা ঝামেলা পাকাতে মন চাইতেছে। দেখি, আগামী পর্বে কি করা যায়!!!!)

