Soulmate_to_Enemy #পর্ব_৪৩

0
1

#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৪৩
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

ধানমন্ডি, ঢাকা। এসিস্ট্যান্ট কমিশনার(AC) নানামি জায়দান আজ তার ইউনিফর্ম খোলেনি। সেফটি পিন দিয়ে আটকানো মেডেলগুলো ল্যাম্পের আলোয় ঝিকমিক করছে, কিন্তু তার চোখের কোণে জমে আছে এক বিষাদময় ক্লান্তি। ছয় মাস…সুদীর্ঘ ১৮০টি দিন সে এই ছাদের নিচে তনুজার সাথে কাটাচ্ছে। তনুজা, যাকে তার বাবা-মা অনেক স্বপ্ন নিয়ে এই বাড়িতে তার বউ করে এনেছিল, যে মেয়েটি হয়তো তার যোগ্য ছিল, মেয়েটা এনজিও তেও কাজ করতো, বিয়ের পর সব ছেড়ে কেবল তার সাথেই আছে। কিন্তু নানামির মনের গহীনে আজও এক বিশাল শূন্যতা, যেখানে কেবল একটি নামই প্রতিধ্বনিত হয়…নোবারা আকারি।

লিভিং রুমের সোফায় নানামি পাথরের মতো বসে আছে। তার সামনে রাখা এক গ্লাস পানি, যা এখন ঘরের তাপমাত্রার চেয়েও শীতল হয়ে গেছে। দরজার ওপাশে তনুজার চুড়ির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। তনুজা একটি গাঢ় খয়েরী রঙের শাড়ি পরেছে, যে রঙটি নানামির খুব প্রিয় ছিল বলে সে শুনেছে। কিন্তু সে জানে না, নানামির প্রিয় রঙ খয়েরী নয়, বরং নোবারার পরনের ল্যাভেন্ডার রঙের আভা।

তনুজা ঘরে ঢুকল। তার চোখেমুখে এক ধরণের অপরাধবোধ মেশানো ভালোবাসা। সে জানে তার স্বামী তাকে ঘৃণা করে না, কিন্তু তাকে ভালোবাসতেও পারে না। নানামি তাকে সব দেয়…টাকা, বিলাসিতা, সামাজিক মর্যাদা..শুধু দিতে পারে না নিজের মনের সেই গোপন কুঠুরিটির চাবিকাঠি।

“চা দেব?” তনুজা খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল।

নানামি চমকে উঠল। সে তনুজার দিকে তাকাল, কিন্তু তার দৃষ্টি তনুজার মুখ ছাপিয়ে দেয়ালের কোনো এক বিন্দুতে স্থির হয়ে রইল। “না। আমি একটু পরেই বেরোবো। একটা জরুরি ফাইল চেক করতে হবে।”

তনুজা এক পা এগিয়ে এল। সে এক বুক সাহস সঞ্চয় করে বলেই ফেললো, “আজ আমাদের বিয়ের ছয় মাস পূর্ণ হলো। মা-বাবা ফোন করেছিলেন, তাঁরা খুব খুশি। কিন্তু আমরা…?”

নানামি নিরুত্তর। সে জানে এই প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর নেই। তনুজা ভুল কিছু বলেনি। তার বাবা-মা যখন হার্ট অ্যাটাকের ভয় দেখিয়ে তাকে এই বিয়েতে বাধ্য করেছিলেন, নানামি ভেবেছিল সময়ের সাথে সাথে সে নোবারাকে ভুলে যাবে। সে ভেবেছিল জেনিন নূরশাদের রাজত্বের কাছে নোবারা চিরতরে হারিয়ে গেছে, তাই তাকে নিজের মন থেকে মুছে ফেলা সহজ হবে। কিন্তু বাস্তবে হলো উল্টো। নোবারা আজ ধরাছোঁয়ার বাইরে বলেই যেন তার প্রতি নানামির হাহাকার আরও তীব্র হয়েছে।

“খুশি একটা আপেক্ষিক বিষয় তনুজা,” নানামি তার গলার টাইটা আলতো করে আলগা করল। “আমি আমার দায়িত্ব পালন করছি। তোমার কোনো কিছুর অভাব হতে দিচ্ছি না।”

তনুজা হাসল, কিন্তু সেই হাসিতে কোনো প্রাণ ছিল না। “মানুষ শুধু ভাত-কাপড়ের জন্য সংসার করে না। আমি যখন রাতে আপনার পাশে ঘুমাই, আমি অনুভব করতে পারি আপনি সেখানে নেই। আপনি অন্য কারো চিন্তায় বিভোর! কে সে?”

নানামির চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে উঠে দাঁড়ালো এবং জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়াল। বাইরে বৃষ্টির বেগ বাড়ছে। কাঁচের ওপর বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যেন কান্না হয়ে ঝরে পড়ছে।

“নোবারা…” নানামি খুব অস্পষ্টভাবে বিড়বিড় করল।

তনুজা স্তব্ধ হয়ে গেল। এই নামটি সে আগে কখনো শোনেনি, কিন্তু নামের ঝংকারেই সে বুঝতে পারল এটিই সেই অদৃশ্য দেয়াল যা তাকে নানামির থেকে আলাদা করে রেখেছে। সে দেখল নানামির হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে আছে। একজন সৎ পুলিশ অফিসার, যে পুরো শহরের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করে, সে আজ নিজের অনুভূতির কাছে কতটা অসহায়।

তনুজা নানামির পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো। সে তার হাতটি নানামির কাঁধে রাখার সাহস পেল না। “আমি জানি আমি জোরাজুরি করে আপনার মনে জায়গা করতে পারব না। কিন্তু আমরা কি একবার চেষ্টা করতে পারি না? এই ছয় মাসে আপনি একবারও আমার দিকে তাকিয়ে হাসেননি। আমি কি এতটাই অযোগ্য?”

নানামি ধীরে ধীরে ঘুরল। সে তনুজার চোখের জল দেখতে পেল। তনুজা নিরপরাধ। সে কেবল একটি ভুল মানুষের প্রেমে পড়েছে। নানামির ভেতরটা মচমচে শব্দে ভেঙে যাচ্ছে। সে তনুজার হাতটা ধরল, কিন্তু সেই স্পর্শে কোনো উষ্ণতা ছিল না, ছিল কেবল এক বিষণ্ণ সান্ত্বনা।

“তুমি অযোগ্য নও তনুজা। আমিই হয়তো অপূর্ণ। আমার জীবনের একটা অংশ আমি এমন একজনের কাছে রেখে এসেছি, যে এখন অন্যের ঘরণী। আমি জানি এটা অন্যায়। আমি জানি তোমার ওপর এই অবহেলাটা পাপ। কিন্তু আমার হৃদয় তো আমার অর্ডার মানে না।”

নানামির এই সহজ স্বীকারোক্তি তনুজাকে আরও বেশি রক্তাক্ত করল। সে বুঝতে পারল, সে এক মরীচিকার পেছনে ছুটছে। নানামি তাকে ঘর দিয়েছে, কিন্তু সাথে দিয়েছে ঘর ভর্তি একাকীত্ব।

ডিনার টেবিলটা আজ অনেক বেশি বড় মনে হচ্ছে। তনুজা অনেক যত্ন করে নানামির প্রিয় খাবার রান্না করেছে। নানামি যান্ত্রিকভাবে খাচ্ছে।

“রোস্টটা ভালো হয়েছে,” নানামি সৌজন্যবশত বলল।

“ধন্যবাদ,” তনুজা খুব শান্তভাবে বলল। সে বুঝতে পারছে, তাদের এই কথোপকথনগুলো যেন স্ক্রিপ্ট করা কোনো নাটকের অংশ। এখানে কোনো আবেগ নেই, কোনো চমক নেই।

খাওয়ার পর নানামি তার স্টাডি রুমে চলে গেল। সে সেখানে বসে পুরোনো কিছু ছবি আর ফাইল দেখে রাত পার করে দেয়। তনুজা বেডরুমে একা শুয়ে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে জানে, নানামি আজ রাতেও আর ফিরবে না। সে জানে, এই ছয় মাসের বিবাহিত জীবন আসলে এক দীর্ঘ নির্বাসন।

নানামি স্টাডি রুমে বসে তার ল্যাপটপ খুলল। তার স্ক্রিনসেভারে কোনো ছবি নেই, কেবল এক গভীর অন্ধকার। সে জেনিন নূরশাদের গতিবিধির ওপর নজর রাখছিল, কিন্তু তার অবচেতন মন খুঁজছিল নোবারার নিরাপত্তা। সে যখনই খবর পায় জেনিন আর নোবারা সুখী আছে, তখনই তার বুকটা এক অজানা যন্ত্রণায় ফেটে যায়।

“নুরশাদ… তুই জিতে গেছিস,” নানামি নিজের মনে বলল। “তুই রাজত্বও পেয়েছিস, আর রাণীকেও। আর আমি এই নিয়মের ঘেরাটোপে আটকে থেকে নিজের ঘরটাকেও লাশ বানিয়ে ফেলেছি।”

নানামি তার ডায়েরিটা বের করল। সেখানে বিয়ের পর থেকে একটি শব্দও লেখা হয়নি। সে তার কলমটা নিয়ে একটি মাত্র বাক্য লিখল,,,”ছয় মাস পূর্ণ হলো, কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও আমি আমার হতে পারিনি।”

বাইরে বৃষ্টির শব্দ এখন এক গম্ভীর গর্জনে পরিণত হয়েছে। নানামি তার স্টাডি রুমের বাতি নিভিয়ে দিল। অন্ধকারে সে দেখতে পাচ্ছে তনুজার ঘরের দরজার নিচ দিয়ে আসা আলোর রেখা। সে জানে তনুজা জেগে আছে, কিন্তু সে কাছে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে না। নানামি আজ একজন অপরাধী…নিজের বিবেকের কাছে, আর তনুজার জীবনের কাছে।

<><><><><><><><><>

পরদিন সকাল। নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের বিশ তলার রিসেপশনটা আজ এক অদ্ভুত গাম্ভীর্যে থমকে আছে। বাইরে ঢাকার রাজপথে বৃষ্টির ঝাপটা কাঁচের দেয়ালে আছড়ে পড়ছে, যার শব্দে মিশে আছে এক বিষণ্ণ হাহাকার। জেনিন নূরশাদ তখন এক জরুরি মিটিংয়ে ব্যস্ত। নোবারা অফিসেই তার ব্যক্তিগত লাউঞ্জে বসে একটি ম্যাগাজিনের পাতা ওল্টাচ্ছিল। বিয়ের পর সে অফিসে তেমন আসে না। কিন্তু আজ জেনিন এক প্রকার জোর করেই তাকে নিয়ে এসেছে। যদিও কোন কাজ করতে নয়, তবে এই বেকার সময়টা তো কাটছেই না তার!

|||তনুজা আজ অনেক ভেবেচিন্তে বেরিয়েছে। গন্তব্য নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজ। সকালে নানামি পুলিশ স্টেশনে চলে যাওয়ার পর সে নানামির ডায়েরি খুলেছিল, এক প্রকার ঈর্ষা থেকে। সে জানতে চেয়েছিল, তার স্বামীর মনে এমন কোন মেয়ে আছে, যার জন্য বিয়ের ছয় মাস পার হওয়ার পরো নানামি তার দিকে ফিরেও তাকায় না! অবশেষে সে ডায়েরিতে নোবারা আকারি কে নিয়ে কিছু লাইন দেখতে পেল। সে এও জানতে পারলো যে নোবারা জেনিন নুরশাদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ। কিন্তু একটিবার নোবারাকে না দেখলে যেন তার অন্তরাত্মা শান্ত হবে না। তাই সে আজ বেরিয়েছে।

তার পরনে এক সাধারণ ঘিয়ে রঙের শাড়ি, চোখে কাজল নেই…বরং সেখানে আছে না ঘুমানোর কালি। সে রিসেপশনে এসে খুব শান্ত গলায় বলল, “আমি মিসেস নোবারা নূরশাদের সাথে দেখা করতে চাই।”

রিসেপশনিস্ট মেয়েটি অবাক হলো। সাধারণত নোবারার সাথে কেউ এভাবে সরাসরি দেখা করতে আসে না। “আপনার কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে ম্যাম? আর আপনার পরিচয়?”

তনুজা এক মুহূর্ত থামল। তার পরিচয় কী? সে কি এক ব্যর্থ প্রেমিকের স্ত্রী? নাকি এক হারানো আত্মার উত্তরাধিকারী? সে ম্লান হেসে বলল, “পরিচয় নেই। শুধু বলবেন এসি নানামি জায়াদনের বাড়ি থেকে একজন এসেছে।”

রিসেপশনিস্ট কল করলো, নোবারা যখন শুনল নানামির নাম নিয়ে কেউ এসেছে, তার বুকের ভেতরটা একটু কেঁপে উঠল। নানামি? তার ছোটবেলার বন্ধু, যার সাথে জেনিনের আজ সাপে-নেউলে সম্পর্ক। নোবারা নানামির বিয়ের খবর জানে না। জেনিন সচেতনভাবেই নানামির ব্যক্তিগত জীবনের কোনো তথ্য নোবারার কান পর্যন্ত পৌঁছাতে দেয়নি। এমনকি নানামির সাথে পর্যন্ত কখনো দেখা করতে দেয়নি। নোবারা ভাবত নানামি হয়তো এখনো সেই পুরোনো জেদ আর একাকীত্ব নিয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টারে দিন কাটায়।

“ভেতরে আসতে বলো,” নোবারা নিজের আঁচল ঠিক করতে করতে বলল।

তনুজা যখন লাউঞ্জের ভারী দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল, তার পা যেন মেঝেতে গেঁথে গেল। জানালার পাশ দিয়ে আসা বিকেলের আলো নোবারার মুখে এক স্বর্গীয় আভা তৈরি করেছে। তার পরনে ল্যাভেন্ডার রঙের এক আভিজাত্যপূর্ণ শাড়ি, হাতে জেনিনের উপহার দেওয়া নীল কাঁচের চুড়ি। নোবারার চোখের সেই স্থিরতা আর ঠোঁটের মৃদু হাসি দেখে তনুজা স্তব্ধ হয়ে রইল।

তনুজা অপলক দৃষ্টিতে নোবারাকে দেখতে লাগল। সে মনে মনে মেলাতে লাগল নানামির ডায়েরির সেই অদৃশ্য শব্দগুলো। এই সেই নারী, যার জন্য তার স্বামী মাঝরাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট পোড়ায়। এই সেই রূপ, যা তনুজার ছয় মাসের সংসারকে এক শীতল মরুভূমি করে রেখেছে। নোবারার সৌন্দর্য কোনো তলোয়ার নয়, বরং এক শান্ত সুতো..যা নানামিকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে।

“আপনি নানামি ভাইয়ার ওখান থেকে এসেছেন?” নোবারার কণ্ঠে এক রাশ উৎকণ্ঠা। “নানামি ভাইয়া কি ঠিক আছে? কোনো বিপদ?”

তনুজা নিজেকে সামলে নিল। তার বুকের ভেতর তখন প্রলয়ংকরী ঝড়, কিন্তু মুখে সে এক কৃত্রিম প্রশান্তি বজায় রাখল। “জি, নানামি সাহেব ভালো আছেন। আমি… আমি তনুজা শাহীন। উনার স্ত্রী।”

স্ত্রী শব্দটা শোনার সাথে সাথে নোবারার হাত থেকে ম্যাগাজিনটা সোফায় পড়ে গেল। তার চোখ দুটি বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে উঠল। “নানামি ভাইয়ার বিয়ে হয়েছে? কবে? আমি… আমি তো কিছু জানতাম না! জেনিনও তো আমাকে একবারের জন্য বলেনি!”

তনুজা নোবারার বিস্ময় মাখা মুখটা খুঁটিয়ে দেখল। সে বুঝতে পারল, এই মেয়েটি সত্যিই নিষ্পাপ। সে জানে না যে তার না থাকাটা অন্য একজনের জীবনে কতটা জায়গা দখল করে আছে। তনুজার মনে হলো, এই সৌন্দর্যের সামনে দাঁড়ানোও এক ধরণের শাস্তি।

“ছয় মাস হলো আমাদের বিয়ে হয়েছে,” তনুজা খুব ধীরস্থিরভাবে সোফায় বসল। “কিন্তু নানামি সাহেব সম্ভবত আপনাকে বলার সুযোগ পাননি। উনি খুব ব্যস্ত থাকেন।”

নোবারা দ্রুত তনুজার পাশে এসে বসল। তার চোখেমুখে তখন একরাশ আনন্দ। “আমি কত খুশি হয়েছি বলে বোঝাতে পারব না! আপনি খুব ভাগ্যবতী, নানামি ভাইয়ার মতো ভালো মানুষ হয় না।”

ভাগ্যবতী শব্দটা তনুজার কানে বিষের মতো বাজল। যে মেয়েটি রাতের পর রাত বালিশ ভিজিয়ে কাঁদে, সে নাকি ভাগ্যবতী!

“আপনি কি নানামি সাহেবের সাথে দেখা করেন না?” তনুজা আচমকা প্রশ্নটা করে বসল।

নোবারার হাসিটা একটু ম্লান হলো। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “বিয়ের পর আমি জেনিন ছাড়া আর কারো সাথে দেখা করিনি। নানামি ভাইয়ার সাথে জেনিনের সম্পর্কটা এখন আর আগের মতো নেই। জেনিন চায় না আমি বাইরের কোনো ঝামেলায় জড়াই! তাই আর দেখা হয়নি!”

তনুজা অবাক হয়ে দেখল, নোবারা জেনিনকে কতটা ভালোবাসে। প্রতিটা কথায় একবারের জন্য হলেও জেনিন নামটা উচ্চারণ করেছে মেয়েটা। তনুজা বুঝতে পারল, নোবারার জীবনের কোন অংশ এও নানামির কোনো স্থান নেই…কখনো ছিল না, হয়তো থাকবেও না। অথচ নানামি এই ধ্রুব সত্যটা মেনে নিতে পারছে না বলেই তনুজার জীবনটা নরক হয়ে গেছে।

লাউঞ্জে কফি দিয়ে গেল এক স্টাফ। ধোঁয়া ওঠা কফির সুবাসে ঘরটা ভরে উঠলেও তনুজার গলার কাছে কী যেন একটা দলা পাকিয়ে আছে। সে নোবারার দিকে তাকিয়ে ভাবছিল…যদি আমি এই মেয়েটাকে ঘৃণা করতে পারতাম, তবে হয়তো শান্তি পেতাম। কিন্তু একে তো ঘৃণা করাও পাপ।

“আপনি হঠাৎ এভাবে এলেন যে? কোনো বিশেষ প্রয়োজনে?” নোবারা কফির কাপ এগিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করল।

তনুজা কাপটা হাতে নিল, কিন্তু তার হাত কাঁপছিল। সে কি সত্যিটা বলবে? সে কি বলবে যে আপনার স্বামী নানামির ঘুম কেড়ে নিয়েছে? সে কি বলবে যে নানামি আপনার ছবির দিকে তাকিয়ে রাত পার করে দেয়? না, তনুজা তা পারল না। নোবারার এই অমলিন হাসির ওপর সে কালির ছিটে দিতে চাইল না।

“আসলে…আমি জাস্ট আপনাকে দেখতে চেয়েছিলাম,” তনুজা খুব কষ্টে কথাগুলো সাজাল।
“নানামি সাহেবের পুরোনো অ্যালবামে আপনার স্কুলের একটা ছবি দেখেছিলাম। উনার অনেক কথাতেই আপনার নাম আসত। তাই ভাবলাম, যে মানুষটি আমার স্বামীর এত কাছের বন্ধু ছিল, তাকে একবার নিজ চোখে দেখে আসি।”

“আপনি সত্যিই খুব সুখী নোবারা,” তনুজা উঠে দাঁড়ালো। সে আর এক মুহূর্তও এই ঘরে থাকতে পারবে না। তার দম বন্ধ হয়ে আসছে।

“একটু বসুন না তনুজা! জেনিন মিটিং থেকে ফিরলেই আমরা একসাথে ডিনার করব। জেনিন শুনলে খুব খুশি হবে,” নোবারা সনির্বন্ধ অনুরোধ করল।

“না, আমার একটু তাড়া আছে। আমি জাস্ট আপনাকে দেখতে এসেছিলাম। দেখা হলো। ভালো থাকবেন।” তনুজা দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করল।

সে কোনোমতে মাথা নেড়ে লিফটের দিকে এগিয়ে গেল। লিফটের আয়নায় সে নিজের মুখটা দেখল। সে দেখল এক পরাজিত নারীকে, যার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে এক বিজয়ী রানী।

অফিস থেকে বেরিয়ে তনুজা বৃষ্টির মধ্যেই হাঁটতে শুরু করল। তার কোনো ছাতা ছিল না, কিন্তু বৃষ্টির জল তার চোখের জলকে আড়াল করে দিচ্ছিল। সে বুঝতে পেরেছে, নানামির জীবনে সে কেবল একটি অ্যাডজাস্টমেন্ট। নানামি চিরকালই ওই ল্যাভেন্ডার সুবাসের পেছনে ছুটবে, আর তনুজা ধূপের মতো পুড়ে ছাই হবে।

বাসায় ফিরে তনুজা দেখল নানামি স্টাডি রুমে বসে একগাদা ফাইল নিয়ে কাজ করছে। নানামি একবার মুখ তুলে তাকাল, কিন্তু তনুজার ভেজা কাপড় বা চোখের লাল ভাব তার নজরে এল না।

“ভিজে গেলে কেন? গাড়ি নিয়ে যাওনি?” নানামি যান্ত্রিকভাবে জিজ্ঞেস করল।

“ইচ্ছে হলো ভিজতে,” তনুজা শান্ত গলায় উত্তর দিল। সে নানামির টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। “আজ আমি নোবারার সাথে দেখা করে এলাম।”

নানামির হাতের কলমটা হাত থেকে পড়ে গেল। সে পাথরের মতো স্থির হয়ে তনুজার দিকে তাকাল। তার চোখের সেই আতঙ্ক আর আকুলতা দেখে তনুজার বুকটা ফেটে যাচ্ছিল।

“কেন? কেন গিয়েছিলে ওখানে?” নানামির কণ্ঠস্বর কাঁপছে।

“দেখতে গিয়েছিলাম, কেন আমার স্বামী আমাকে ছুঁতে পারে না,” তনুজা হাসল, এক ভয়ংকর করুণ হাসি। “দেখে এলাম নানামি। ও সত্যিই খুব সুন্দর। ওর চোখের ওই মায়ার কাছে আমি তো ধুলিকণা মাত্র!”

নানামি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। তার সারা শরীর কাঁপছে। সে তনুজার দিকে এগোতে চাইল, কিন্তু তনুজা এক পা পিছিয়ে গেল।
“আজ থেকে এই ঘরে আমরা দুজন কেবল দুজন অপরিচিত মানুষের মতো থাকব। আপনি আপনার নোবারাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখুন, আর আমি আমার একাকীত্ব নিয়ে সংসার করব। আমাদের এই ছয় মাসের বিয়ের উপহার আজ আমি পেয়ে গেছি।”

তনুজা ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরের দরজা লক করে দিল। নানামি স্টাডি রুমে একা দাঁড়িয়ে রইল। বাইরে বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে নানামির ভেতরের কান্নার আওয়াজ যেন পুরো ফ্ল্যাটকে গুমরে তুলল। সে আজ সব হারাল। কেন সবসময় তার সাথেই এমন হয়? এই প্রশ্নের উত্তর আজো পেলো না নানামি জায়দান!

***ওদিকে তখনো নোবারার কপালে চিন্তার ভাঁজ। তনুজা চলে যাওয়ার পর পুরো ঘরটা কেমন যেন গুমোট হয়ে আছে। নোবারা জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখছে ঢাকার আকাশটা আজ বড্ড দ্রুত কালো হয়ে আসছে। তার মাথায় শুধু একটা কথা ঘুরপাক খাচ্ছে…নানামির বিয়ে হয়ে গেছে ছয় মাস আগে, অথচ সে কিছুই জানে না! জেনিন কেন লুকালো? নানামি কেন জানালো না?

ঠিক তখনই জেনিন তার মিটিং শেষ করে রুমে ঢুকল। টাইটা একটু আলগা করে সে নোবারার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল, কিন্তু নোবারার গম্ভীর মুখ দেখে তার হাসিটা মিলিয়ে গেল।

জেনিন ধীর পায়ে নোবারার সামনে এসে ওকে জড়িয়ে ধরে খুব নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে নূরা? আপনাকে এমন লাগছে কেন? শরীর খারাপ?”

নোবারা জেনিনের চোখের দিকে সোজাসুজি তাকাল। “নানামি ভাইয়ার বিয়ে হয়েছে আপনি জানতেন?”

জেনিনের হাতের আঙুলগুলো নোবারার কাঁধে এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। তার চোখের মণি একটু সংকুচিত হলো, যা সে নোবারার কাছ থেকে আড়াল করতে পারল না। জেনিন এক মুহূর্ত সময় নিল নিজেকে সামলাতে। সে জানত এই সত্যটা কোনো না কোনোদিন সামনে আসবে, কিন্তু এত দ্রুত আসবে তা সে ভাবেনি।

“হ্যাঁ, জানি,” জেনিন খুব শান্ত গলায় উত্তর দিল। “ছয় মাস আগে তনুজা নামের একজন এনজিওর মেয়ের সাথে ওর বিয়ে হয়েছে।”

নোবারা জেনিনের হাতটা সরিয়ে দিল। “আপনি জানতেন? অথচ আমাকে একবারও বলেননি? নানামি ভাইয়া আমাদের ছোটবেলার বন্ধু, ওনি আমার জন্য যা যা করেছে তা আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না। ওর জীবনের এত বড় একটা খবর আপনি আমার কাছে চেপে গেলেন?”

জেনিন জানালার দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। “আমি আপনাকে বলতে চাইনি কারণ আমি জানতাম জায়দান এই বিয়েটা খুশিতে করেনি। ওর বাবা-মা ওকে বাধ্য করেছে। আর সবচাইতে বড় কথা নূরা, নানামি আজও আপনাকে ভুলতে পারেনি। আর আমি চাইনি আমার স্ত্রী এমন একজনের সাথে দেখা করুক যে তাকে আজও অন্য চোখে দেখে।”

“আপনি স্বার্থপরের মতো কথা বলছেন জেনিন!” নোবারার গলার স্বর চড়ে গেল। “নানামি ভাইয়া আজ বিবাহিত। ওর স্ত্রী তনুজা আজ এখানে এসেছিল। আপনি কি জানেন মেয়েটা কতটা বিষণ্ণ? আপনি যদি আমাকে আগে এসব বলতেন, আমি হয়তো ওকে বুঝিয়ে বলতে পারতাম।”

জেনিন হঠাৎ করে ঘুরে দাঁড়ালো। তার চোখে এখন আগুনের আভা। “আমি আপনাকে রক্ষা করতে চেয়েছি নোবারা, কোনো ইনফরমেশন হাইড করে আনন্দ পেতে চাইনি। এসব কথা এখানেই শেষ করুন।”

নোবারা স্তব্ধ হয়ে বসে পড়ল। সে বুঝতে পারছে জেনিনের যুক্তিটা ভুল নয়, কিন্তু এই লুকোচুরি তাকে কষ্ট দিচ্ছে। সে দেখল জেনিন তার ডেস্কে গিয়ে খুব অস্থিরভাবে ফাইল ওল্টাচ্ছে। জেনিন নূরশাদ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু নানামির সেই নীরব প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে সে আজও ভয় পায়। তার উপর তা যদি নোবারাকে নিয়ে হয়!

নোবারা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “মেয়েটা খুব মায়াবী। খুব শান্ত। কিন্তু ওর চোখে কোনো স্বপ্ন নেই জেনিন। মেয়েটা জীবন্ত লাশের মতো। আমি ওকে অনেকবার বললাম ডিনারের জন্য থাকতে, কিন্তু ও ভয়ে পালিয়ে গেল। ও মনে হয় আপনাকে বা এই পরিবেশটাকে ভয় পাচ্ছিল।”

“ও আমাকে ভয় পায় না নূরা, ও আপনাকে দেখে ভয় পেয়েছে,” জেনিন টেবিলের ওপর হাত রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। “ও দেখেছে যা ও ছয় মাসে পায়নি, আপনি তা সারা জীবনের জন্য পেয়ে গেছেন। জায়দানের সেই আক্ষেপটাই তনুজাকে পুড়িয়ে মারছে।”

জেনিন নোবারার কাছে ফিরে এল। সে নোবারার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। নোবারার হাত দুটি নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলল, “নূরা, আ’ম সরি। আমি হয়তো ভুল করেছি আপনাকে না বলে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি চাইনি ওর ব্যক্তিগত জীবনের অন্ধকার আমাদের ঘরে ঢুকুক।”

নোবারা জেনিনের চুলের ভেতর আঙুল চালিয়ে দিল। সে জেনিনকে ঘৃণা করতে পারে না, কারণ জেনিন যা করে সবটাই নোবারাকে আগলে রাখার জন্য। “নানামি ভাইয়া কে একটা কথা বলবেন জেনিন? ও যেন তনুজাকে একটু ভালোবাসার চেষ্টা করে।”

“আমি ওকে বলব,” জেনিন বিড়বিড় করল। যদিও সে মনে মনে জানে, নানামির মতো একরোখা মানুষকে বোঝানো অসম্ভব। যে নীতিবান এসি নানামি তার ভিলায় এসেও নোবারাকে তার সাথে ফিরে যেতে বলে, তখন বুঝতে হবে যে নানামি নোবারাকে আজও কতটা চায়!

ওদিকে ধানমন্ডির ফ্ল্যাটে নানামি তখনো স্টাডি রুমে বসে আছে। তনুজা পাশের ঘরে দরজা বন্ধ করে কাঁদছে। নানামির সামনে একটা পুরোনো ডায়েরি খোলা। সেই ডায়েরির পাতায় পাতায় নোবারার নাম লেখা।

নানামি তার ফোনটা হাতে নিল। সে জেনিনের নাম্বারটা ডায়াল করতে গিয়েও থেমে গেল। সে জানে জেনিন এখন নোবারার পাশে আছে। জেনিন নূরশাদ আজ বিজয়ী, আর সে…একজন এসি হয়েও নিজের জীবনের বিচার করতে পারছে না।

সে তার টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা ছোট ছবি বের করল। এটা নোবারার ছবি নয়, এটা একটা গ্রুপ ছবি…যেখানে জেনিন, নানামি আর নোবারা একসাথে হাসছে। নানামি একটা কাঁচি দিয়ে ছবিটা মাঝখান থেকে কেটে দিল। জেনিন আর নোবারা একদিকে, আর নানামি একদিকে।

“নুরশাদ… তুই আমাকে আজ সবদিক থেকে একা করে দিলি! আমার সাথেই কেন যত অবিচার হয়?কেন আমি যা মন প্রাণ দিয়ে চাই, তাই আমাকে ছেড়ে দিতে হয়?” নানামি অস্ফুট স্বরে বলল। সে বুঝতে পারছে তনুজা আজ যা দেখে এসেছে, তার পর তনুজার কাছে ফিরে যাওয়া তার জন্য আরও কঠিন হয়ে গেছে।

সে উঠে দাঁড়ালো এবং বৃষ্টির মধ্যেই বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। তার সারা শরীর কাঁপছে। সে বুঝতে পারছে, সে না পারছে নোবারাকে ভুলতে, না পারছে তনুজাকে আপন করতে।

তনুজা কি পারবে এই ভাঙা সম্পর্কের মাঝে নিজের জায়গা করে নিতে? নাকি নানামির এই দহন নূরশাদ ভিলার সুখেও একদিন আগুন লাগিয়ে দেবে?

চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।।।।।

(অ্যাই যে, দুটিক্কা লেখিকার একটিক্কা পাঠক, আপনারা জেনিন বা ইউজির অ্যাকশন সিনগুলো মিস করছেন না? ও হ্যাঁ আরেকটা কথা, পেইজে দেখলাম দুইহাজার ফলোয়ার হইছে! ভাল্লাগছে খুব। কিন্তু সেটা বড় কথা না, বড় কথা হলো গল্পটার প্রতি পর্বে ২৪ ঘন্টার ভেতরই ১০০০ ভিউজ দেখতেছি, দ্যাট মিনস অন্তত…অন্তত ১০০ জন হলেও পড়ছেন, তাই না? এখন আপনারা রিয়েক্ট দিচ্ছেন না কেন বিচ্ছুর দল?😾 হু? এইটা আমার খুব খারাপ ও লেগেছে! বুঝেছেন??

এখন আপনারাই আমাকে বলুন তো দেখি, গল্পের কোন জায়গায় কি ফ্লো হারিয়ে গেছে? এমন কিছু লিখছি যা আপনাদের ভালোই লাগছে না? না, ভালো লাগছে না এটা বলতে পারছি না। কারণ ভিউজ তো বাড়তেই আছে। সেসব আমি বুঝি না। দুটিক্কা একজন লেখিকা। আপনারাই আমাকে বলুন, আমার কি করা উচিত? আপনাদের হাতে ছেড়ে দিলাম। টা টা বিচ্ছুগণ! এক বুক কষ্ট নিয়ে বিদায় নিচ্ছি! যদিও ফিরতেও পারি!🦋)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here