#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৪৪ (জেনূরা)
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
রাত ১১ টা পার হয়েছে তখন। জেনিন নূরশাদ তার স্টাডি রুমে কিছু জরুরি ফাইল দেখছিল, পরনে তার সাদা লিনেন শার্টের হাতা গোটানো। ঠিক তখনই দরজায় এক জোড়া চুড়ির রিনরিন শব্দ হলো।
জেনিন না তাকিয়েই হাসল। সে জানে, এই অসময়ে আর কারোরই সাহস নেই তার কাজের মাঝে ব্যাঘাত ঘটানোর। নোবারা ভেতরে ঢুকল, তার পরনে এক মেঘবালিকা রঙের নীল শিফন শাড়ি। তার চুলগুলো আলগা করে পিঠের ওপর ছাড়া, আর চোখে এক অদ্ভুত জেদ মেশানো আবদার।
“ল্যাপটপটা বন্ধ করুন তো” নোবারা জেনিনের টেবিলের সামনে গিয়ে খুব শক্তভাবে দাঁড়ালো।
“কি চাই আমার নূরার?” জেনিন ল্যাপটপ এ চোখ রেখেই জিজ্ঞেস করলো।
নোবারা কোনো কথা শুনল না। সে এক ঝটকায় জেনিনের কোলে বসে পড়ল। জেনিন হকচকিয়ে গেল, ল্যাপটপের টাইপিং মাঝপথে থেমে গেল। নোবারা জেনিনের ডানদিকে দুই পা ঝুলিয়ে দিয়ে তার কোমর জড়িয়ে ধরে সরাসরি জেনিনের চোখের দিকে তাকাল। তার চোখের সেই জেদ আর গালের লাল আভা জেনিনের সব ক্লান্তি ধুয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। নোবারা জেনিনের গলার কাছে মুখ নিয়ে খুব নিচু এবং মায়াবী স্বরে গাইতে শুরু করল—
“মানেনা মন, মানে না…
তোমায় ছাড়া কিছু চায়না!”
জেনিনের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। সে নোবারার কোমরে হাত রেখে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল। নোবারার চুলের ঘ্রাণ তার স্নায়ুগুলোকে শান্ত করে দিচ্ছে। সে নোবারার চোখের গভীরে তাকিয়ে পরের লাইনটা পূরণ করল,
“তোমার মনে আমি যদি একটু জায়গা পাই…!
সারাজনম ধরে তোমায় ভালোবাসতে চাই!”
মুহূর্তের জন্য ঘরটা এক অপার্থিব নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। কিন্তু সেই নিস্তব্ধতা ভাঙল নোবারার অভিযোগের ঝড়ে। সে জেনিনের বুক থেকে সরে গিয়ে আবার ঝগড়া শুরু করল।
“ভালোবাসতে চাই বললেই হলো? গত তিন দিনে আপনি আমার সাথে দশ মিনিটও শান্তিতে কথা বলেননি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আপনি শুধু সিইও। আমি কি আপনার ভিলার কোনো আসবাবপত্র যে এক কোণায় পড়ে থাকব? আমার ভালো লাগে না জেনিন!”
ক্ষণিক থেমে নোবারা ফের বলছে,
“এই এতো বড় বাড়িতে আমার কাজ কি? আপনি থাকেন না সারাদিন। থাকলেও খালি কাজ আর কাজ। আমার জন্য কোন সময়ই নেই নাকি..আপনি একটা..!
নোবারার অভিযোগ থামছেই না। সে একটার পর একটা পুরনো কথা তুলে আনছে, জেনিনের অবহেলার ফিরিস্তি দিচ্ছে। জেনিন দেখল নোবারা হাপিয়ে উঠছে, তার বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে। জেনিন আর কথা দিয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করল না। সে খুব ধীর লয়ে নোবারার চিবুকটা নিজের ডান হাতে উঁচু করে ধরল।
নোবারার কথাগুলো মাঝপথেই থমকে গেল যখন জেনিন তার খুব কাছাকাছি চলে এল। জেনিন নিজের ঠোঁট দিয়ে নোবারার অভিযোগের পথটা রুদ্ধ করে দিল। এক নিবিড় এবং অতলান্তিক স্পর্শে জেনিন নোবারাকে বুঝিয়ে দিতে চাইল যে তার এই মৌনতা আসলে কতটা শব্দবহুল।
হঠাৎ জেনিনের চোখের চশমাটা দুজনের মাঝে একটা বাধা হয়ে দাঁড়াল। জেনিন এক হাত দিয়ে চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর ছুড়ে ফেলল। এবার কোনো বাধা রইল না। সে আবার নোবারার অধরে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করল। নোবারার দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা রাগটা যেন জেনিনের এই শীতল অথচ তীব্র স্পর্শে মোমের মতো গলতে শুরু করল। তার আঙুলগুলো জেনিনের শার্টের কলার শক্ত করে চেপে ধরল।
কিছুক্ষণ পর জেনিন নিজেকে একটু সরিয়ে নিল। নোবারা তখনো হাপাচ্ছে, তার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা। জেনিন তার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,
“এখনো কি রাগ আছে?”
নোবারা কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে মুখটা ঘুরিয়ে নিল, যদিও তার কণ্ঠে আগের সেই ধার নেই। “একটু ছোঁয়া দিলেই সব ভুলে যাব ভাববেন না। আমি এখনো আপনার ওপর রেগে আছি। আই হেইট ইউ মি:!”
জেনিন তার মুখটা নোবারার ঘাড়ে রেখে বললো,
“তুমি আমাকে ভালোবাসো কিংবা ঘৃণা করো, দুদিক থেকেই আমি সেরা।”
নোবারা মুখ ভেংচি কেটে অন্যদিকে ফিরে গেল। সিরিয়াস কথার সময় ও এই লোকের অ্যাটিটিউড যায় না!
জেনিন এবার একটু হাসল। সে নোবারার কানের লতিতে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে আবার জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা ঠিক আছে। আমার নূরপরী কী চায়? আমায় শাস্তি দিতে চান? দিন। আমি প্রস্তুত।”
নোবারা ঘাড় ঘুরিয়ে জেনিনের ল্যাপটপের ঢাকনাটা নিজ হাতে সশব্দে বন্ধ করে দিল। “আমি আমার জেনিনকে চাই। দিবেন?”
জেনিন উৎসুক হয়ে তাকাল। “তার মানে?”
“আমি চাই সাধারণ মানুষের মতো রাতের এই শান্ত শহরে আপনার হাতে হাত রেখে হাঁটতে। শুধু আপনি আর আমি। কোনো প্রটোকল ছাড়া। ওই কালো গাড়িগুলো বা বডিগার্ডদের ভিড় ছাড়া আপনি কি আজ শুধু আমার জেনিন হতে পারবেন?”
জেনিন এবার একটু চিন্তিত হলো। “নূরা, আপনি জানেন এটা কতটা বিপজ্জনক। আমার কত শত্রু বাইরে ওত পেতে আছে। প্রটোকল ছাড়া বাইরে যাওয়া মানে হলো আগুনের সাথে খেলা করা।”
নোবারা এবার জেনিনের খুব কাছে এল। সে জেনিনের শার্টের কলারটা ঠিক করতে করতে তার চোখের দিকে এমনভাবে তাকাল যে জেনিনের সমস্ত যুক্তি মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে গেল। “আমার সাথে থাকলে কি আপনি আমাকে আগলে রাখতে পারবেন না? নাকি জেনিন নূরশাদ এখন কেবল তার বডিগার্ডদের ওপর ভরসা করে? হুম?”
এই এক কথায় জেনিনের পুরুষত্ব আর দর্প জেগে উঠল। সে নোবারার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে আরো কাছে টেনে নিল। “আপনি জানেন, এই চ্যালেঞ্জটা বড্ড দামি। জেনিন নূরশাদ কাউকে ভয় পায় না!”
নোবারা জেনিনের বুকে মাথা রেখে আদুরে গলায় বলল, “একটু চলুন না জেনিন। দেখুন বৃষ্টির পর শহরটা কত সুন্দর লাগছে। আমরা ফুটপাত দিয়ে হাঁটব, মাঝরাতের নির্জনতা উপভোগ করব। প্লিজ?”
জেনিন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই নারীর কাছে সে চিরকালই পরাজিত। সে নোবারাকে আলতো করে নামিয়ে চেয়ারে বসিয়ে দিল। তারপর নিজের ড্রয়ার থেকে একটি ছোট ৯ এমএম পিস্তল বের করে পেছনের পকেটে গুঁজে নিল। এটি কেবল আত্মরক্ষার জন্য। তারপর সে তার স্যুটটা খুলে এক সাধারণ কালো জ্যাকেট গায়ে চড়িয়ে নিল।
“ঠিক আছে। কিন্তু একটা শর্ত। কোনো ভিড় দেখলে বা আমি বললে সাথে সাথে গাড়িতে ফিরতে হবে,” জেনিন গম্ভীরভাবে নোবারার দিকে তার হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো।
নোবারা খুশিতে লাফিয়ে উঠে জেনিনের গালে একটা চুমু খেল। “আই স্যুয়ার! আপনি পৃথিবীর বেস্ট হাসবেন্ড।”
|||জেনিন নিজেই নিজের প্রিয় মার্সিডিজটি স্টার্ট দিল, ড্রাইভার আসতে চেয়েছিল, কিন্তু নোবারার জেদের সামনে ঠিকতে পারলো না। ভিলার বিশাল গেটটি যখন নিঃশব্দে খুলে গেল, গার্ডরা অবাক হয়ে দেখল তাদের বস কোনো প্রটোকল ছাড়াই বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছেন। জেনিন ইশারায় তাদের পিছিয়ে থাকতে বলল। গাড়িটি যখন ঢাকার রাজপথে নামল, তখন শহরটা এক মায়াবী কুয়াশায় ঢাকা।
ধানমন্ডির লেকের ধারের একটি নির্জন জায়গায় জেনিন গাড়িটি পার্ক করল। চারদিকে কোনো মানুষ নেই, শুধু ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো রাস্তার ভেজা পিচের ওপর পড়ে এক অদ্ভুত প্রতিবিম্ব তৈরি করেছে। জেনিন গাড়ি থেকে নেমে ওপাশ থেকে নোবারার জন্য দরজা খুলে দিল।
নোবারা গাড়ি থেকে নেমে এক গভীর নিঃশ্বাস নিল। “দেখুন জেনিন, কত শান্তি! কোনো সাইরেন নেই, কোনো চিৎকার নেই।”
জেনিন নোবারার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরল। তাদের আঙুলের ফাঁকে আঙুলগুলো যেন একে অপরের সাথে কথা বলছিল। জেনিন অনুভব করল নোবারার হাতটা কিছুটা ঠান্ডা। সে নোবারাকে নিজের আরও কাছে টেনে তার বাহুডোরে আবদ্ধ করে নিল।
তারা ফুটপাত ধরে হাঁটতে শুরু করল। জেনিনের প্রতিটি ইন্দ্রিয় তখন সজাগ, তার চোখ চারদিকের অন্ধকারে কোনো বিপদের আভাস খুঁজছে, কিন্তু তার মনটা পড়ে আছে নোবারার দিকে। নোবারা ঠিক এক শিশুর মতো লাফাচ্ছে, কখনো রাস্তার পাশের রেলিং ছুঁয়ে দেখছে, কখনো বা ভেজা ঘাসের ওপর পা রাখছে।
“জেনিন, জানেন? আপনি যখন সবার সাথে গম্ভীর চেহারা নিয়ে কথা বলেন, তখন আপনাকে দেখে আমার খুব ভয় লাগে,” নোবারা হঠাৎ বলল।
জেনিন হাসল। “ভয় পান? তাহলে এই যে আমার ওপর এত জোর খাটান, সেটা কোথা থেকে আসে?”
“সেটা ভালোবাসা থেকে আসে,” নোবারা জেনিনের কাঁধে মাথা রাখল। “কিন্তু আজ এই মুহূর্তে আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি শুধুই আমার।”
জেনিন দাঁড়িয়ে পড়ল। সে নোবারার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার দুই হাত ধরল। বাতাসের শব্দে নোবারার আঁচল উড়ছে। জেনিনের চোখের গভীরতায় এক ধরণের তীব্র প্রেম ফুটে উঠল। সে খুব নিচু স্বরে, এক মখমল কোমল কণ্ঠে বহুদিন পর এক শায়েরি শুরু করল,
“Mera har lamha tere naam se shuru hota hai,
Tujhe dekhun to dil mein ik sukoon sa hota hai,
Zamaane ki bheed mein khud ko kho diya tha maine, Magar tere paas aakar khud ko paaya sa hota hai.”
নোবারা স্তব্ধ হয়ে জেনিনের কথাগুলো শুনল। তার চোখে জল চিকচিক করে উঠল। সে জেনিনকে জড়িয়ে ধরল।
“আপনি আমাকে এত ভালোবাসেন কেন?” নোবারা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
জেনিন নোবারার চুলে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল। “কারণ আপনি না থাকলে জেনিন নূরশাদ কেবল একটা শরীর হতো, কোনো আত্মা থাকত না। আপনিই আমার অন্ধকার জগতের একমাত্র বাতিঘর, আবার আমার পেয়ারে দুশমন ও!” এই বলে জেনিন নোবারার নাকটা একটু টেনে দিল।
চারপাশের ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো নোবারার নীল শাড়িতে পড়ে এক অদ্ভুত রহস্যময় আভা তৈরি করেছে। ঝিরঝিরে বাতাসের সাথে লেকের জলের একটা ঠান্ডা স্পর্শ ভেসে আসছে, যা নোবারার গায়ে কাঁটা দিয়ে তুলছে।
জেনিন অনুভব করল নোবারা সামান্য কাঁপছে। সে মুহূর্তের দেরি না করে নিজের হাতটা নোবারার কাঁধের ওপর তুলে নিল এবং তাকে নিজের আরও কাছাকাছি টেনে আনল। নোবারা জেনিনের উষ্ণতা অনুভব করে তার বাহুর নিচে গুটিসুটি মেরে ঢুকে গেল।
“ওই দেখুন!” নোবারা হঠাত্ থেমে গিয়ে রাস্তার পাশের এক সারি কৃষ্ণচূড়া গাছের দিকে আঙুল তুলল। বৃষ্টির পর গাছের পাতায় জমে থাকা জলের ফোঁটাগুলো চাঁদের আলোয় হিরের টুকরোর মতো জ্বলজ্বল করছে। “প্রকৃতি কত সুন্দর, তাই না?”
জেনিন নোবারার উচ্ছ্বসিত মুখের দিকে তাকাল। সে দেখল নোবারার চোখে সেই শিশুসুলভ বিস্ময়, যা সে ছোটবেলায় স্কুলে দেখেছিল। জেনিনের মনে হলো, এই মানুষটির জন্য সে সারা জীবন এভাবে নির্ঘুম রাত কাটাতে পারে।
“প্রকৃতি সুন্দর, নূরা। কিন্তু আমার চোখের সামনে যা আছে, তার সৌন্দর্য এই প্রকৃতির চেয়েও সহস্র গুণ বেশি,” জেনিন খুব নিচু স্বরে বলল।
নোবারা একটু লজ্জা পেয়ে জেনিনের বুকে মাথা রাখল। সে হাঁটতে হাঁটতে জেনিনের পকেটে নিজের হাতটা ঢুকিয়ে দিল। জেনিনের হাতের শক্ত তালু আর নোবারার নরম আঙুলের সেই মিলন যেন এক নীরব কাব্য।
“আপনার মনে আছে? সেই একবার বৃষ্টির রাতে আপনি আমার জন্য স্টেশনের ওপার থেকে বকুল ফুল নিয়ে এসেছিলেন? সেদিন আপনার খুব জ্বর ছিল, তাও আপনি গিয়েছিলেন,” নোবারা স্মৃতির পাতা ওল্টাতে লাগল।
জেনিন মৃদু হাসল। “মনে থাকবে না কেন? সেদিন আপনি বলেছিলেন, বকুল ফুল না পেলে আপনি আমার সাথে কথা বলবেন না। জেনিন নূরশাদ হয়তো কোনকিছুকেই ভয় পায় না, কিন্তু নোবারার নীরবতাকে বড্ড ভয় পায়।”
তারা লেকের ধারের একটা বেঞ্চে গিয়ে বসল। জেনিন নিজের রুমালটা বের করে বেঞ্চের ধুলো ঝেড়ে দিল যাতে নোবারার শাড়ি নষ্ট না হয়। নোবারা বসার পর জেনিন তার পাশে বসে নিজের জ্যাকেটের এক অংশ দিয়ে নোবারার পিঠ ঢেকে দিল।
“নূরা, আপনি যখন এভাবে আমার হাত ধরে থাকেন, তখন মনে হয় আমার হারানো শৈশবটা ফিরে পেয়েছি। রক্তের জগত, মারামারি..সবই মিথ্যা মনে হয়। মনে হয় এই মুহূর্তটাই ধ্রুব সত্য,” জেনিন আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
নোবারা জেনিনের হাতটা নিজের গালের সাথে ঠেকাল। “আজ রাতে আপনার জন্য আমার একটা সারপ্রাইজ আছে।”
“আবার কী সারপ্রাইজ? আপনার সারপ্রাইজ মানেই আমার জন্য আতঙ্ক!” জেনিন রসিকতা করে বলল।
নোবারা ব্যাগ থেকে একটা ছোট রূপোর আংটি বের করল। আংটিটা খুব সাধারণ, কিন্তু তাতে খোদাই করা আছে… ‘Z&N’। সে জেনিনের ডান হাতের অনামিকায় আংটিটা পরিয়ে একটু চুমু দিয়ে বলল,
“আপনি আমাকে হিরে-জহরত দিয়েছেন, সম্মান ভালোবাসা সব দিয়েছেন। কিন্তু আমি আপনাকে এই সাধারণ আংটিটা দিতে চাই। এটা আপনাকে মনে করিয়ে দেবে যে, এই সিইও বা ডন পরিচয়ের বাইরে আপনি আমার একমাত্র অবলম্বন। যখনই আপনার খুব রাগ হবে বা কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এই আংটিটা ছোঁবেন। মনে করবেন আপনার নূরা আপনার পাশেই আছে।”
জেনিন আংটিটার দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে রইল। তার চোখে জল চিকচিক করে উঠল। সে নোবারার কপালে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল।
হঠাৎ জেনিনের কান খাড়া হলো। দূরে কয়েকটা বাইকের ইঞ্জিনের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। এই নির্জন রাতে এতগুলো বাইকের শব্দ স্বাভাবিক নয়। জেনিনের ভেতরকার সেই মাফিয়া ডন আবার সতর্ক হয়ে উঠল। সে নোবারার হাতটা আরও জোরে চেপে ধরল।
“নোবারা, চলুন। গাড়ির দিকে ফিরতে হবে,” জেনিন খুব শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল।
“কেন? আর একটু থাকি না!” নোবারার গলার স্বরে আবার সেই আবদার।
“নোবারা, প্লিজ। কথা শুনো” জেনিন এবার সরাসরি নোবারার চোখের দিকে তাকাল। জেনিনের চোখের সেই গাম্ভীর্য দেখে নোবারা বুঝতে পারল পরিস্থিতি হয়তো সাধারণ নেই। সে আর তর্ক করল না।
তারা দ্রুত গাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। জেনিন তার জ্যাকেটের ভেতরে হাত দিয়ে পকেট থেকে পিস্তলটির সেফটি লক খুলে ফেলল। তার চোখ তখন চারপাশের প্রতিটি ছায়া আর শব্দ বিশ্লেষণ করছে।
রাস্তার বাঁকে তিনটি কালো বাইক এসে তাদের পথ আগলে দাঁড়ালো। বাইকারদের পরনে লেদার জ্যাকেট আর হেলমেট, যা তাদের পরিচয় গোপন করে রেখেছে। জেনিন নোবারাকে নিজের পেছনে টেনে নিল। তার শরীর এখন ইস্পাতের মতো শক্ত।
“কে তোমরা?” জেনিন খুব ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করল। তার গলার স্বরে এমন এক কর্তৃত্ব ছিল যে বাইকাররা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
বাইকারদের একজন হেলমেট খুলল। সে আর কেউ নয়, ড্রাগন লিউয়ের বেঁচে যাওয়া এক বিশ্বস্ত শ্যুটার, রকি। তার চোখে প্রতিশোধের আগুন।
“জেড ভাই, প্রটোকল ছাড়া একা বেরিয়ে বড় ভুল করেছেন। আজ আপনার ওই নূরশাদ ভিলার দেয়াল আপনাকে বাঁচাতে পারবে না,” রকি তার কোমরের নিচ থেকে রিভলভার বের করল।
নোবারা জেনিনের জ্যাকেটটা খামচে ধরল। তার শরীর কাঁপছে, কিন্তু সে জেনিনের ওপর বিশ্বাস হারাল না। জেনিন নোবারার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “নোবারা, চোখ বন্ধ করুন। আমি না বলা পর্যন্ত খুলবেন না।”
নোবারা চোখ বন্ধ করল। সে কেবল শুনতে পেল জেনিনের হৃদপিণ্ডের দ্রুত স্পন্দন।
রকি ট্রিগার চাপার আগেই জেনিন এক অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় মাটির ওপর স্লাইড করে রকির পায়ের ওপর আঘাত করল। রকি ব্যালেন্স হারিয়ে পড়ে যেতেই জেনিন তার হাতের পিস্তল দিয়ে অন্য দুজনের হাতের ওপর গুলি চালাল। গুলির শব্দ রাতের নিস্তব্ধতাকে চিরে খানখান করে দিল। জেনিন কাউকে মারতে চায় না, সে কেবল তাদের নিরস্ত্র করতে চাইল।
সেকেন্ডের মধ্যে জেনিন রকির গলার কাছে নিজের পিস্তলটা চেপে ধরল। “বাস্টার্ড, তুই জানিস আমি কে। তোদের রক্ত দিয়ে আমি আজকের এই পবিত্র রাতটা নষ্ট করতে চাই না। যা, পালিয়ে যা। আর যদি কোনোদিন আমার কিংবা আমার ওয়াইফ এর ছায়াও স্পর্শ করার চেষ্টা করিস, তবে তোদের হাড় দিয়ে আমি শহরের ড্রেন পরিষ্কার করাব।”
রকি আর তার দলবল জেনিনের এই রূপ দেখে আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে বাইক নিয়ে পালিয়ে গেল। জেনিন দ্রুত নিজের পিস্তলটা আবার লুকিয়ে ফেলল এবং নোবারার কাছে ফিরে এল।
“নূরা, চোখ খুলুন। সব ঠিক হয়ে গেছে,” জেনিন খুব আদুরে গলায় বলল।
নোবারা চোখ খুলল। সে দেখল জেনিন ঠিক আগের মতোই তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, কোনো ক্ষত নেই, কোনো হিংস্রতা নেই। জেনিন তাকে জড়িয়ে ধরল। নোবারা ডুকরে উঠল।
“কিচ্ছু হয়নি নূরা। আমি আছি তো,” জেনিন নোবারার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল। সে বুঝতে পারল, নোবারার এই সামান্য ভ্রমণের আবদার মেটাতে গিয়ে সে কত বড় ঝুঁকি নিয়েছিল। কিন্তু নোবারার এই জড়িয়ে ধরার সুখের কাছে ওই ঝুঁকি কিছুই নয়।
গাড়িতে ফেরার পর জেনিন একদম চুপচাপ। সে একা হাতে স্টিয়ারিং ধরে আছে। নোবারা জেনিনের দিকে তাকিয়ে দেখল জেনিনের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সে নিজের আঁচল দিয়ে জেনিনের ঘাম মুছে দিল।
“সরি। আমি যদি আজ জেদ না করতাম, তবে এই
ঝামেলাটা হতো না,” নোবারা অপরাধবোধে ভেঙে পড়ল।
জেনিন নোবারার হাতটা ধরল এবং ড্রাইভ করতে করতেই তা নিজের ঠোঁটের কাছে নিল। “সরি বলবেন না। আজ আমি আবার বুঝতে পারলাম কেন আপনাকে আগলে রাখা আমার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।”
গাড়ি যখন নূরশাদ ভিলার গেটে ঢুকল, তখন রাত তিনটে। জেনিন গাড়ি থেকে নেমে নোবারাকে কোলে তুলে নিল। নোবারা অবাক হয়ে জেনিনের গলা জড়িয়ে ধরল।
“জেনিন, কী করছেন! গার্ডরা দেখছে!” নোবারা লজ্জা পেয়ে বলল।
“দেখুক। ওরা জানুক এই জেনিন নূরশাদ তার সাম্রাজ্যের রানীর জন্য কতটুকু করতে পারে,”
জেনিন সিঁড়ি দিয়ে উঠে নিজের ঘরে এল।
সে নোবারাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে তার ওপর এক চিলতে চাদর টেনে দিল। তারপর সে জানালার বাইরে তাকাল। বাইরের রাতটা এখন আবার শান্ত। জেনিন তার হাতের সেই আংটিটার দিকে তাকাল। সে জানে, এই পৃথিবীটা খুব নিষ্ঠুর, কিন্তু নোবারার মতো এক টুকরো জান্নাত তার সাথে থাকলে সে যে কোনো নরক জয় করতে পারে।
নোবারা ঘুমানোর আগে জেনিনের হাতটা ধরে ফিসফিস করে বলল, “জামাই শুনছেন? আর একটা শায়েরি বলবেন? ঘুমের ওষুধ হিসেবে?”
জেনিন হাসল। সে নোবারার কানের কাছে মুখ নামিয়ে আর এক পশলা প্রেম ঢেলে দিল,
“Tumhari ek muskurahat se meri duniya sanwar jati hai, Tumhare saath hone se har mushkil asaan ho jati hai.
Khuda se aur kya mangu main apni zindagi ke liye, Bas tum raho saath mere, yahi meri jannat ban jati hai.”
নোবারা হাসিমুখে চোখ বুজল। জেনিন অনেকক্ষণ সেভাবেই বসে রইল, নোবারার ঘুমন্ত মুখটা পাহারা দিয়ে। আজ রাতের এই শহর ভ্রমণ তাদের প্রেমকে এক নতুন মাত্রা দিয়ে গেল। জেনিন নূরশাদ আজ আরও একবার প্রমাণ করল…ভালোবাসার কাছে সব সাম্রাজ্যই তুচ্ছ।
চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।
(ছোটখাটো ডেট লিখলাম দু’জনের! কেডাই জানি বলছিল, আমি রোমান্টিক লিখতে জানি না। এবার পড়ো বাচা😼)

