Soulmate_to_Enemy #পর্ব_৪৯(Caring জেনিন🦋)

0
1

#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৪৯(Caring জেনিন🦋)
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

নূরশাদ ভিলার সকালটা আজ অন্যরকম এক বিষাদের কালো মেঘে ঢাকা পড়ে গেল। সাধারণত এই সময়টাতে জেনিন আর নোবারা বাগানে বসে কফি খায়, কিন্তু আজ ড্রয়িংরুমের গুমোট পরিবেশ জানান দিচ্ছে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঝড়ের পূর্বাভাস।

সকাল দশটা নাগাদ ভিলার গেটে একটি গাড়ি এসে থামল। সেখান থেকে নামল এক সুঠাম দেহী, কিন্তু চোখেমুখে ধূর্ততা আর লোভ মাখা এক যুবক। সে নোবারার বড় ভাই, আরমান। গত কয়েক বছর সে বিদেশে ছিল, মায়ের কোনো খোঁজখবর না নিলেও সম্প্রতি নূরপুর গ্রামে গিয়ে ভিটেমাটির ভাগ বুঝে নিতে গিয়ে সে জানতে পেরেছে…তার ছোট বোন নোবারা এখন এই শহরের সবচাইতে প্রতাপশালী সিইও জেনিন নূরশাদের স্ত্রী।

আরমান যখন ভিলার ভেতরে ঢুকল, তার জুতো থেকে ঝরে পড়া কাদা নূরশাদ ভিলার ইরানি কার্পেটকে কলঙ্কিত করল। জেনিন তখন ওপরের তলায় একাউন্টিং ফাইল দেখছিল। নোবারা নিচতলায় আরমানকে দেখে বিস্ময়ে এবং আতঙ্কে পাথর হয়ে গেল।

নোবারা সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে জল নয়, বরং এক ধরণের তীব্র ঘৃণা ফুটে উঠল। “ভাইয়া? তুমি এখানে?”

আরমান খুব তাচ্ছিল্যের সাথে ড্রয়িংরুমের ঝাড়বাতি আর আসবাবপত্র দেখছিল। সে একটা সোফায় পা তুলে বসে পড়ল। “কেন? আসতে পারি না? বোন আমার কোটিপতি জামাই ধরেছে, আর আমি দুবাইয়ের বালিতে পড়ে থাকব? গ্রামে গিয়ে তো দেখলাম মা-কে খুব সেবা করছিস! ওসব সেবা-টেবা বাদ দে, জমির দলিলে সইটা এখন আমার চাই।”

নোবারা স্তম্ভিত হয়ে গেল। “মা গত তিন মাস ধরে অসুস্থ, একবারও ফোন করেছ তুমি?

“বেশি নীতি কথা বলিস না নোবারা,” আরমান গর্জে উঠল। “তুই তো জামাই পেয়েছিস রাজপুত্র। মা’র ভরণপোষণ এখন তুই-ই করবি। আমি আমার ভাগ বুঝে নিয়ে চিরতরে চলে যাব। তুই এখন ক্ষমতার জোরে মা’কে তোর কাছে রাখতে পারিস, কিন্তু গ্রাম থেকে আমার হক আমি আদায় করেই ছাড়ব।”

নোবারা ড্রয়িংরুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছিল। তার নিজের ভাই, যে রক্ত এক..সে আজ মা’কে নিয়ে ব্যবসা করছে। আরমান দাঁড়িয়ে নোবারার দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলতে লাগল, “তোর মতিগতি তো আগে থেকেই জানতাম। বড়লোক ছেলের সাথে প্রেম করে নিজের পরিবারকে রাস্তায় বসিয়েছিস। এখন আবার এই বড় বাড়িতে বড় গলায় কথা বলছিস!”

ঠিক এই মুহূর্তে সিঁড়ির ওপর থেকে ভেসে এল এক ভারী পদশব্দ। জেনিন নেমে আসছে। তার পরনে কালো সিল্কের ড্রেসিং গাউন। তার চোখে চেনা ঘন কালো আগুন। সে এতক্ষণ ওপর থেকে সব শুনছিল। সে ভেবেছিল ভাই-বোনের ব্যক্তিগত বিষয়ে হাত দেবে না, কিন্তু আরমানের প্রতিটি কথা জেনিনের ধৈর্যকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল।

জেনিন ধীর পায়ে নোবারার পাশে এসে দাঁড়ালো। নোবারার কাঁধে হাত রাখতেই নোবারার কাঁপাকাঁপি একটু কমল। জেনিন আরমানের দিকে তাকাল, যে আরমান তখনো সোফায় পা তুলে বসে ছিল।
জেনিন খুব শান্ত কিন্তু বজ্রকঠিন গলায় বলল, “আমি ভেবেছিলাম ভাই-বোনের কথার মাঝে নাক গলাবো না, কিন্তু আপনার ব্যবহার আমার রক্ত গরম করে দিচ্ছে!”

আরমান জেনিনকে দেখে একটু নড়েচড়ে বসল। সে জানত জেনিন ভয়ংকর, কিন্তু লোভ তার ভয়কে ছাপিয়ে গেছে। সে উদ্ধত ভঙ্গিতে বলল, “আমি আমার বোনের সাথে কথা বলছি, তুমি চুপ থাকো।”

জেনিনের চোয়ালের হাড় শক্ত হয়ে এল। সে এক পা এগিয়ে গেল। “আপনার বোন আমার স্ত্রী, সেটা মাথায় রেখে ওর সাথে বুঝেশুনে কথা বলবেন।”

আরমান বিদ্রুপের হাসি হাসল। “তোমার স্ত্রী হওয়ার আগে ও আমার বোন। ওর সাথে আমি যেমন খুশি তেমন কথা বলবো।”

জেনিন তার দুচোখ ছোট করে বলল, “আর আপনার বোন হওয়ার আগে ও একজন মানুষ। সেই মনুষ্যত্বের খাতিরেই বলছি, একজন মানুষ কে এভাবে হেনস্থা করার অধিকার আপনার নেই।”

নোবারা জেনিনের হাতটা জাপটে ধরল। সে জানে জেনিনের রাগ একবার সপ্তম আকাশ ছুঁলে এই আরমানকে খুঁজেই পাওয়া যাবে না!

“জেনিন শান্ত হোন, আমি কথা বলছি তো!” নোবারা অনুরোধ করল।

কিন্তু আরমান যেন মরার জন্য আজ প্রস্তুত হয়েই এসেছে! সে নোবারার দিকে তাকিয়ে বিশ্রী অঙ্গভঙ্গি করে বলল, “তুই থেকে কি করবি রে? তোর তো মতিগতি ই ঠিক নেই। ছেলেটার সাথে ইটিশ-পিটিশ করে বিয়ে করেছিস, মা-ভাইকে পর করে দিয়েছিস।”

জেনিন এবার নোবারার হাত ছাড়িয়ে আরমানের দিকে এক ধাপ এগোলো। তার কণ্ঠস্বর এখন পিশাচের মতো ঠাণ্ডা। “আই রিপিট ভদ্রভাবে কথা বলুন, নোবারা আমার ওয়াইফ। ওর সাথে উঁচু গলায় কথা বলার সাহস দেখালে গলাটা আর শরীরে থাকবে না।”

নোবারা এবার জেনিনকে জড়িয়ে ধরল। জেনিন বলেছিল যদি সে রেগে যায় আর নোবারা তাকে জড়িয়ে ধরলে সে শান্ত হবে। তাকে আটকানোর সবটুকু চেষ্টা করছে নোবারা। কিন্তু জেনিন যেন আজ কোন কিছুই মানার ধাঁচে নেই! নোবারা জেনিনের বুকে মাথা রেখে আর্তনাদ করে উঠল, “জেনিন, শুনুন। আমি কথা বলছি না? শান্ত হোন। ও আমার ভাই, আপনি প্লিজ ওকে কিছু করবেন না।”

আরমান হাসতে লাগল। সে ভাবল জেনিন হয়তো নোবারার খাতিরে কিছু করবে না। সে আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে নোবারার মুখে থুতু দেওয়ার মতো ভঙ্গি করে বলল, “কে কি করবে আমার? কোটিপতি জামাই পেয়ে পরিবার পরিচয় ভুলে বসেছিস, কুলাঙ্গার কোথাকার! মা গ্রাম থেকে কাঁদে আর তুই এখানে এসি ঘরে শুয়ে থাকিস!”

‘কুলাঙ্গার’ শব্দটা কানে যাওয়া মাত্রই জেনিনের ভেতর থেকে মানুষের ছদ্মবেশে থাকা সেই মাফিয়াটি বেরিয়ে এল। নোবারার হাতের বাঁধন জেনিন এক ঝটকায় আলগা করে দিল। জেনিন হুট করে আরমানের গলাটা জাপটে ধরল এবং এক সেকেন্ডের মধ্যে তাকে দেওয়ালের সাথে শূন্যে ঝুলিয়ে দিল।

আরমানের পা এখন মেঝে থেকে অন্তত এক ফুট ওপরে। সে শ্বাস নিতে পারছে না, তার মুখ নীল হয়ে আসছে। জেনিনের চোখের মণি এখন পুরো কুচকুচে কালো। জেনিন তার অন্য হাত দিয়ে আরমানের শার্টের কলারটা মোচড়াতে লাগল।
“পরিচয়?” জেনিন ফিসফিস করে বলল, কিন্তু সেই ফিসফিসানি যেন ড্রয়িংরুমের কাঁচ ফাটিয়ে দিচ্ছিল। “নোবারার পরিচয় তুই দিবি জানোয়ার? যে মেয়েটি নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে মা’র চিকিৎসার টাকা জুগিয়েছে, তার পরিচয় দিবি তুই? দুবাইয়ে বসে নিজের মা’র খবর নিয়েছিস? গ্রামে গিয়ে জমির দলিল খুঁটিয়ে দেখার সময় মা’র প্রেসারের ওষুধের খবর নিয়েছিলি শুয়োরের বা|চ্চা?”

জেনিন আরমানকে আরও উপরে তুলল। আরমানের চোখগুলো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম। এই মুহূর্তে ছেড়ে না দিলে এভাবেই দম আটকে মা|রা যাবে!নোবারা চিৎকার করে কাঁদছে, “জেনিন! শান্ত হোন। প্লিজ, ছেড়ে দিন। ও ম|রে যাবে!”

জেনিন নোবারার দিকে না তাকিয়ে আরমানের কানে মুখ নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আমি এই সাম্রাজ্য গড়েছি মানুষের কলিজা চিবিয়ে। তুই ভেবেছিস আমি তোর সামনে শান্ত হয়ে বসে থাকব কারণ তুই নোবারার ভাই? ভুল। নোবারার সাথে যে রক্ত মিশে আছে, সেই রক্ত যদি আজ বিষাক্ত হয়ে থাকে, তবে সেই রক্ত ঝরিয়ে দিতে আমার এক সেকেন্ডও লাগবে না। কোন সাহসে তুই আমার ওয়াইফ কে অপমান করলি?”

জেনিন আরমানকে মেঝেতে সজোরে আছাড় মারল। আরমান মার্বেলের মেঝেতে পড়ে কাতরাতে লাগল। জেনিন সেখানে থামল না। সে আরমানের পেটে সজোরে এক লাথি মারল। আরমান কোঁ কোঁ শব্দ করে কুণ্ডলী পাকিয়ে পড়ল।

“জেনিন! প্লিজ!” নোবারা জেনিনের ওপর আছড়ে পড়ল। “ওকে চলে যেতে দিন! আমি ওর মুখ দেখতে চাই না, ওকে চলে যেতে বলুন! তবুও মারবেন না প্লিজ!”

জেনিন নিচু হয়ে আরমানের চুলের মুঠি ধরে তার মাথাটা উঁচিয়ে ধরল। তার মুখ তখন রাগে কাঁপছে। তবে সে তার কষ্ট খাদে নামিয়ে আনল!
“শুনুন আরমান সাহেব, আজ যদি নোবারা মাঝখানে না থাকত, তবে আপনার লাশটা নূরপুর গ্রামের ওই জমিতেই পুঁতে দিতাম আমি। আপনি আজই এই শহর ছাড়বেন। আপনার জমির ভাগ আপনি পাবেন, কিন্তু সেটা আপনার দালালি দিয়ে নয়, আমার দয়া দিয়ে।”

জেনিন পকেট থেকে একটা মোবাইল বের করে ইউজিকে ফোন দিল। “ড্রয়িংরুমে এসো। এই আবর্জনাটাকে ভিলার গেটের বাইরে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে এসো। আর শোনো, এর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ট্র্যাক করো। এর জীবনের সবচাইতে খারাপ সময় শুরু হতে যাচ্ছে।”

আরমান কাঁপতে কাঁপতে ইউজির এজেন্টদের হাতে ধরা পড়ল। সে যাওয়ার আগে জেনিনের খুনে চোখের দিকে তাকাতে সাহস পেল না। তার লোভের নেশা জেনিনের নিষ্ঠুরতার ধাক্কায় চুরমার হয়ে গেছে। জানে বাঁচতে পেরেছে এর চেয়ে বড় শুকরিয়া আর কি করবে সে!

আরমানকে বের করে দেওয়ার পর পুরো ভিলা আবার নিস্তব্ধ। নোবারা মেঝেতে বসে ডুকরে কাঁদছে। তার ভাই তাকে যে অপমান করেছে, আর জেনিন যেভাবে আজ তার আদিম রূপ দেখাল..সব মিলিয়ে সে বিপর্যস্ত।

জেনিন তৎক্ষণাৎ নোবারার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। সে নোবারাকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিল। জেনিনের শরীর তখনো রাগে কাঁপছে, কিন্তু নোবারার গায়ের সুবাস পাওয়া মাত্রই সে নিজেকে শান্ত করতে লাগল। জেনিন নোবারার চুলে আলতো করে চুম্বন করল।

“নসরি। আমি চেয়েছিলাম আপনার সামনে নিজেকে সংযত রাখতে। কিন্তু আপনার চোখের পানি আমার যুক্তিবোধ কেড়ে নেয়,” জেনিন অপরাধীর মতো বলল।

নোবারা জেনিনের শার্ট খামচে ধরে বলল, “আমি শুধু ভাবছিলাম রক্তের সম্পর্ক কি সত্যিই এত সস্তা? আমার ভাই টাকার জন্য আমাকে কুলাঙ্গার বলল?”

“রক্তের সম্পর্ক দিয়ে মানুষ চেনা যায় না নোবারা, মানুষ চেনা যায় তার সঙ্গ দিয়ে,” জেনিন নোবারার মুখটা উঁচিয়ে ধরল। “আপনার ভাই আজ যা করেছে, তার জন্য তাঁকে সারাজীবন আফসোস করতে হবে। আর আপনার মা? আমি ওনাকে এই ভিলাতে নিয়ে আসব। আজ থেকে উনি আপনার মা নন, আমাদের মা।”

ঘন্টাখানেক পর। নূরশাদ ভিলার মাস্টার বেডরুমে এখন এক জমাট বাঁধা নীরবতা। আরমানের ন্যাক্কারজনক ঘটনার পর কয়েক ঘণ্টা কেটে গেছে, কিন্তু নোবারার মনের ভেতর এখনো সঅপমানের বিষবাষ্প দাউদাউ করে জ্বলছে। সে বিছানার এক কোণে হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে আছে। দুপুরের খাবার সাজিয়ে রাখা হয়েছে টেবিলটায়, কিন্তু নোবারার সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

জেনিন গত এক ঘণ্টা ধরে তার পাশে বসে কখনো মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, কখনো খুব নিচু স্বরে সোহাগ মাখা কথা বলছে। কিন্তু নোবারার পাথুরে নীরবতা ভাঙার কোনো লক্ষণ নেই।

জেনিনের ধৈর্য এবার একটু একটু করে কমতে শুরু করেছে, কিন্তু সেটা রাগের জন্য নয়, বরং নোবারার এই ফ্যাকাশে মুখ দেখে তার কলিজা ফেটে যাচ্ছে। জেনিন নূরশাদ, যে কিনা কোটি টাকার ডিল এক মিনিটে সই করে দেয়, সে আজ তার স্ত্রীর মুখে এক লোকমা খাবার তোলার জন্য দিশেহারা।

“নূরা, প্লিজ। এক লোকমা অন্তত মুখে দিন,” জেনিন খুব নরম গলায় বলল। সে একটা বাটিতে স্যুপ নিয়ে নোবারার সামনে ধরল। “সারাদিন তো আপনি শুধু চোখের পানি খেয়েছেন। এবার অন্তত এই স্যুপটা খান।”

নোবারা মুখ তুলল না। তার গলার স্বর বড্ড ধরা। “আমার খিদে নেই। আপনি খেয়ে নিন।”

“আমার খিদে থাকবে কীভাবে যদি আপনি না খান?” জেনিন এবার একটু শাসন করার সুরে বলল। “ঐ লোকটা যা বলেছে তা ওর নিচু মানসিকতা। আপনি কেন নিজের শরীর খারাপ করছেন? আপনি যদি না খান, তবে আমি এখনই ইউজিকে বলব আরমানকে আবার তুলে আনতে। এবার আর শুধু মারধোর নয়, ওর হাড্ডি গুঁড়ো করে দেব।”

নোবারা এবার জেনিনের দিকে তাকাল। তার চোখ দুটো লাল হয়ে ফুলে আছে। “আপনি কি সবসময় শুধু মারপিট দিয়েই সব সমাধান করবেন? আমার ভাই আমাকে কুলাঙ্গার বলেছে, এটা কি আপনি মারপিট করে মুছে দিতে পারবেন?”

জেনিন স্যুপের বাটিটা পাশে রেখে দিল। সে বুঝতে পারল আদর দিয়ে বা ভয় দেখিয়ে আজ কাজ হবে না। নোবারার মনের মেঘ অনেক গভীর। জেনিন কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। তার তীক্ষ্ণ মস্তিষ্ক এবার অন্যভাবে কাজ করতে শুরু করল। কিছু তো করতেই হবে! তার আদরের বউকে তো আর খালি পেটে রাখা যাবে না!

হঠাৎ জেনিন উঠে দাঁড়ালো। সে তার সিল্কের টাইটা খুলে হাতে নিল। নোবারা ভ্রু কুঁচকে জেনিনের কর্মকাণ্ড দেখছিল। লোকটা কি এবার তাকে মারবে না নাকি শ্বাসরোধ করে! এভাবে টাই খুলার কি আছে! পরক্ষনেই নোবারার মাথায় এলো যে মানুষটা তাকে বাঁচানোর জন্য জীবন বাজি রাখতে পারে, সে কেন তাকে মারবে! সে নিজের এমন আজেবাজে চিন্তার কারণে নিজেই বিরক্ত হলো। এমনিতেই মন ভালো নেই!

ওদিকে জেনিন বাইরে গিয়ে মেইডদের বলে ড্রয়িংরুমের একটা ছোট ট্রলি ভর্তি করে বিভিন্ন পদের খাবার..ফলমূল, মিষ্টি, কিছু ঝাল খাবার আর চকোলেট নিয়ে বিছানার কাছে আনালো।

“কী করছেন এসব?” নোবারা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

“আমরা একটা গেম খেলব নূরা,” জেনিন রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল। “অনেকদিন আপনি আমাকে চ্যালেঞ্জ করেন না যে আমি আপনাকে হারাতে পারি না। আজ দেখা যাক কার ঘ্রাণশক্তি আর স্বাদ গ্রহণ করার ক্ষমতা বেশি।”

নোবারা বিরক্তির সাথে বলল, “আমি কোনো গেম খেলতে চাই না।”

“ওহ! তার মানে আপনি ভয় পাচ্ছেন যে আপনি হেরে যাবেন?” জেনিন একটু উস্কানি দিল। “ঠিক আছে, আমি জানতাম আপনি হার মেনে নিতে পারেন না। থাক, গেম খেলে আর কী হবে!”

নোবারার আত্মসম্মানে একটু লাগল। সে বালিশ থেকে মাথা তুলে বসল। “আমি ভয় পাচ্ছি? আমি মোটেও ভয় পাই না। কী গেম খেলতে হবে বলুন?”

জেনিন মনে মনে হাসল। কাজ হচ্ছে। সে টাইটা দিয়ে নোবারার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। “গেমটা খুব সিম্পল। আমি আপনার চোখ এই টাই দিয়ে বেঁধে দেব। তারপর আমি আপনার সামনে বিভিন্ন ধরণের খাবার ধরব। আপনাকে স্রেফ খেয়ে বা ঘ্রাণ নিয়ে বলতে হবে ওটা কী। আপনি যদি দশটার মধ্যে সাতটা ঠিক বলতে পারেন, তবে কাল আপনি যা বলবেন আমি তাই করব। আর যদি আপনি হারেন, তবে আমি যা বলব তা আপনাকে করতে হবে। ডিল?”

নোবারা কিছুক্ষণ ভাবলো। এ আবার কোন ধরনের খেলা! যদিও মন ভালো নেই তো জামাইয়ের সাথে এমন হাবিজাবি খেলা খেলতে ভালোই লাগবে হয়তো। সে মাথা নেড়ে বলল, “ওকেহ! ডিল।”

জেনিন খুশিতে মুচকি একটা হাসি দিল। যার কারণে তার ঠোঁটের নিচের তিলটা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সে খুব সন্তর্পণে নোবারার পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো, রেশমি টাইটা দিয়ে নোবারার টানা টানা দুটো মায়াবী চোখ ঢেকে দিল। জেনিনের আঙুলের স্পর্শ নোবারার কপালে লাগতেই নোবারার শরীরের এক ধরণের শিহরণ খেলে গেল। জেনিন খুব নরম করে গিঁট দিল যাতে নোবারার কষ্ট না হয়।

“এবার কি কিছু দেখতে পাচ্ছেন?” জেনিন ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।

“কিচ্ছু না। সব অন্ধকার,” নোবারা বলল। সে অন্ধকারের ভেতর জেনিনের গায়ের চ্যানেলের মউ মউ পারফিউমের গন্ধটা আরও তীব্রভাবে অনুভব করতে পারছে।

জেনিন এবার ট্রলি থেকে প্রথমে একটা আঙুর নিয়ে নোবারার ঠোঁটের কাছে ধরল। “বলুন তো এটা কী?”

নোবারা মুখটা একটু হাঁ করল। জেনিন পরম যত্নে আঙুরটা নোবারার মুখে দিল। নোবারা চিবিয়ে বলল, “খুব সহজ। আঙুর।”

“এক পয়েন্ট,” জেনিন হাসল। এরপর সে একটা ছোট চামচে করে একটু ঠান্ডা পুডিং তুলে ধরল।

নোবারা খেল এবং হাসল। “এটা তো ক্যারামেল পুডিং।”

এভাবে একে একে জেনিন নোবারাকে আপেল, চকোলেট, এমনকি এক লোকমা মোরগ পোলাও পর্যন্ত খাইয়ে দিল। নোবারা গেমের নেশায় ভুলেই গেল যে সে এতক্ষণ খাবার দেখলেই নাক সিঁটকাচ্ছিল। সে বুঝতে পারল না জেনিন কৌশলে তাকে দুপুরের পুরো খাবারটাই খাইয়ে দিচ্ছে।

জেনিন যখন এক লোকমা মোরগ পোলাও সাথে একটু কাবাব মাখিয়ে ধরল, নোবারা চট করে বলে দিল, “এটা পোলাও আর শামি কাবাব। আমি চিনবো না নাকি? সকালেই রান্না করেছি।”

জেনিন তৃপ্তির হাসি হাসল। নোবারার খাওয়া শেষ। প্রায় সব পদের খাবারই সে কৌশলে নোবারাকে খাইয়ে দিয়েছে। এবার জেনিন ট্রলি থেকে একটা কাঁচা মরিচ তুলে নিল। সে ওটা নোবারার ঠোঁটের কাছে নিতে গিয়ে হঠাৎ থমকে গেল। সে দেখল নোবারা খুব শান্তভাবে মুখটা একটু আলগা করে রেখেছে। তার জেনিনের ওপর এতটাই অগাধ বিশ্বাস যে সে একবারও হাত দিয়ে চেক করার চেষ্টা করছে না জেনিন কী খাওয়াচ্ছে।

জেনিন মরিচটা রেখে দিল। তার হাতটা একটু কাঁপল। সে নোবারার কোমড় জড়িয়ে নিজের আরো কাছে টেনে ওর কপালে নিজের কপাল ঠেকাল। টাইয়ের ওপাশে নোবারার নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে।

“নূরা,” জেনিন খুব ভারি গলায় ডাকল।

“হুম?”

“আমি যদি আপনাকে এখন বিষাক্ত কিছু খাওয়াই? কিংবা এমন কিছু যা আপনার খুব কষ্ট হবে?”

নোবারা এবার হাত বাড়িয়ে অন্ধের মতো হাতড়ে জেনিনের গালটা স্পর্শ করল। তার আঙুলগুলো জেনিনের দাড়িযুক্ত খসখসে চোয়ালে বিচরণ করতে লাগল। নোবারা খুব ধীর আর গভীর স্বরে বলল,
“আমি জানি আপনার রক্ত গরম হয়ে গেলে আপনি দুনিয়া ধ্বংস করে দিতে পারেন। আমি জানি আপনার শত্রু হলে রক্ষা নেই। কিন্তু আমি এটাও জানি যে, আপনি আমাকে আর যাই খাওয়ান, আমার কষ্ট হয় এমন কিছু খাওয়াবেন না। এই বিশ্বাসটা আমার আছে আপনার উপর।”

জেনিন স্তব্ধ হয়ে গেল। নোবারার এই ছোট বাক্যটি জেনিনের মতো একজন দুর্ধর্ষ মানুষের হাড় কাঁপিয়ে দিল। জেনিন নোবারার চোখের বাঁধনটা এক ঝটকায় খুলে দিল। নোবারা চোখ পিটপিট করে আলোতে নিজেকে মানিয়ে নিল। সে দেখল জেনিনের কুচকুচে কালো চোখের মণির পাশে পানি চিকচিক করছে! মনে হচ্ছে এখনি গড়িয়ে পড়বে!

“কী হলো? আপনি কাঁদছেন কেন?” নোবারা ব্যস্ত হয়ে জেনিনের মুখটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিল।

জেনিন নোবারার হাতটা সরিয়ে দিয়ে তাকে সজোরে বুকের মধ্যে টেনে নিল। সে নোবারার কাঁধে মুখ লুকিয়ে ডুকরে উঠল।
“সরি নূরা। আমি আসলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারছি না। আপনি আমাকে এত বিশ্বাস করেন, আর আমি বারবার নিজের শয়তানটাকে সামলাতে পারি না। বারবার আমি আপনাকে কষ্ট দিই।”

নোবারা জেনিনের পিঠ চাপড়ে দিতে লাগল। “শান্ত হোন। আপনি শয়তান নন, আপনি শুধু আমার অসম্মানটা সহ্য করতে পারেন না। আর শুনুন , আমি জানি আপনি আমাকে খাওয়াচ্ছিলেন। আমি কিন্তু জেনেশুনেই খেয়েছি। আমি চাইছিলাম আপনি একটু খুশি হন।”

জেনিন নোবারার বুক থেকে মাথা তুলে তাকাল। “আপনি জানতেন?”

“হুম। মোরগ পোলাও আর কাবাবের স্বাদ কি কেউ না দেখে চিনতে পারে না?” নোবারা হাসল।

জেনিন নোবারার ঠোঁটে একটা গাঢ় চুম্বন করল। “আপনি সত্যিই জাদুকরী নূরা। আপনি আমাকে মুহূর্তের মধ্যে অপরাধী বানিয়ে আবার মহৎ বানিয়ে দেন!”

রাত তখন গভীর। নূরশাদ ভিলার মাস্টার বেডরুমে এখন শুধু পূর্ণিমার আলো। জেনিন নোবারাকে তার বাহুবন্দি করে শুয়ে আছে। জেনিন বুঝতে পারল, দুনিয়ার সবচাইতে বড় সম্পদ টাকা বা ক্ষমতা নয়..সবচাইতে বড় সম্পদ হলো তার স্ত্রীর এই অগাধ বিশ্বাস। জেনিন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, সে তার সারাজীবনের বিনিময়ে হলেও নোবারার এই অন্ধ বিশ্বাসকে অমর করে রাখবে।

“কাল আমরা মা’কে আনতে যাব?” নোবারা আধো ঘুমে জিজ্ঞেস করল।

“হ্যাঁ। কাল সকালেই।” জেনিন নোবারার কপালে একটা দীর্ঘ চুমু দিয়ে বলল।

নোবারা জেনিনের বুকে মাথা রেখে শান্তির ঘুমে তলিয়ে গেল। জেনিন নূরশাদ আজ রাতে আর কাজ করল না। সে শুধু তার পাশে থাকা প্রিয়তমার দিকে তাকিয়ে রইল। সে জানত, এই যে শান্তিতে ঘুমানো নারীটি…তার প্রতিটি নিশ্বাসের দায়িত্ব এখন জেনিনের। আর জেনিন সেই দায়িত্ব পালনে নিজের শেষ রক্তবিন্দু দিতেও প্রস্তুত।

চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।।

(অবিবাহিত পাঠকরা, চলুন আমরাও বিয়ে করে নি(জামাই জেনিনের মতো হলে)। কতবার তো মন খারাপ করে না খেয়ে থেকেছি, কিন্তু এমন আদর করে গেইম খেলে খেলে কেউ কখনো খাওয়াইনি!😞🙌 দুটিক্কা কষ্ট!)

(ছবিটা বরাবর মিলছে না?💅)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here