Soulmate_to_Enemy #পর্ব_৫৬

0
4

#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৫৬
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

নূরশাদ ভিলার ভূগর্ভস্থ মেডিকেল ল্যাব। জেনিনের সারা শরীরে ব্যান্ডেজ, কাঁধের ক্ষত থেকে এখনো হালকা রক্ত চুইয়ে পড়ছে, কিন্তু তার দৃষ্টিতে যে তীব্রতা, সেটি কোনো আহত মানুষের নয়, সেটি কোনো ক্ষতবিক্ষত ক্ষুধার্ত নেকড়ের। সে জানালার কাঁচের ওপাশে তার নূরাকে দেখছে। নোবারা শান্ত হয়ে শুয়ে আছে, যেন মৃত্যুর কিনারা থেকে ফিরে এসে সে এখন কোনো এক মায়াবী স্বপ্নের দেশে হারিয়ে গেছে। জেনিনের চোখের সামনে ভেসে উঠছে মাহিতোর কুৎসিত মুখটা, যে বলেছিল নোবারা তাকে ধরার জন্য এসেছিল। জেনিন নিজের হাত দিয়ে নিজের কপাল চেপে ধরল। সে জানে না এই বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে তার ভালোবাসাটা কতটা অটুট থাকবে।
কিন্তু জেনিন নূরশাদের জীবনে শান্ত সময় বলে কিছু নেই। তার অস্তিত্বের প্রতিটি ধূলিকণা আজ বিপদের বার্তার অপেক্ষায়।

ঠিক সেই মুহূর্তেই ভিলার মেন এন্ট্রেন্সের সিকিউরিটি অ্যালার্মটা কেঁপে উঠল! একটা দীর্ঘ, নিরবচ্ছিন্ন আর্তনাদ। জেনিন দ্রুত তার পকেট থেকে ওয়াকিটকি বের করল। ওপাশ থেকে ভেসে এল তার এক বিশ্বস্ত গার্ডের আর্তনাদ,

“বস! আমরা চারপাশ থেকে বিপদে! ওরা সাধারণ কেউ নয়… ওরা ভলকান! বস, ভলকান এসেছে!”

জেনিনের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। ভলকান! আন্ডারওয়ার্ল্ডের একচ্ছত্র সম্রাট, যার অস্তিত্ব মানেই মৃত্যু। ভলকান জেনিনের পুরোনো শত্রু, যাকে টপকে সে মাফিয়া সম্রাট জেড হয়ে উঠেছে। যে বহু বছর ধরে ছায়ার মতো জেনিনের পতনের অপেক্ষায় ছিল। সে নিশ্চয়ই খবর পেয়েছে, এই মুহূর্তে জেনিন শারীরিকভাবে রক্তাক্ত, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, এবং তার ভিলার নিরাপত্তা বলয় আজ এক ভয়াবহ হুমকির মুখে। ভলকান সুযোগ বুঝেছে, এটা জেনিনের জীবনের সবচাইতে দুর্বল সময়।

জেনিন ইউজিকে ইশারা করে কাছে ডাকল। ইউজি, যে নিজেও মারাত্মকভাবে আহত, সে তার রাইফেলটা তুলে নিল। তার চোখে আজ কোনো ভয় নেই, আছে কেবল নিজের বসের প্রতি অসীম আনুগত্য।

“বস, আপনি এখানে থাকুন, আমি দেখছি,” ইউজি বলল।

“না!” জেনিন দৃঢ় গলায় বলে উঠল। তার কণ্ঠে সেই চেনা মাফিয়া জেডের আধিপত্য।
“আজ কেউ আড়াল হবে না। ওরা জানে না, আহত নেকড়ে আর আহত জেনিন নূরশাদের মধ্যে বিন্দুমাত্র পার্থক্য নেই!”

বাইরে তখন কালবৈশাখীর তান্ডব। ভলকানের ভাড়াটে খুনিরা ভিলার মেন গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকছে। তাদের কালো ট্যাকটিক্যাল স্যুটগুলো অন্ধকারের সাথে মিশে আছে। জেনিন আর ইউজি ভিলার গ্রাউন্ড ফ্লোরের গোপন প্যাসেজ দিয়ে বেরিয়ে এল। বৃষ্টির ঝাপটা জেনিনের আহত শরীরে যেন আগুনের মতো লাগছে, কিন্তু সে ভ্রুক্ষেপ করছে না। তার হাতে আজ কোনো পিস্তল নয়, তার হাতে একটি মারাত্মক কাস্টমাইজড সাব-মেশিনগান।

জেনিন যখন ভিলার সামনের খোলা চত্বরে এল, সে দেখতে পেল ভলকান মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। ভলকান একজন লম্বা, সুঠাম দেহের মানুষ, তবে চেহরা পুড়ে যাওয়া, যার চোখেমুখে এক অদ্ভুত শীতলতা। সে জেনিনকে দেখে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। “জেড, তোর পতন আজ দেখার জন্য আমি বছর ধরে অপেক্ষা করছিলাম। আজ…আজ সেই দিন জেড।”

জেনিন কোনো কথা বলল না। সে তার পিস্তলটি তুলে সরাসরি ভলকানের লক্ষ্যের দিকে তাক করল..এটিই ছিল যুদ্ধের সূচনা। চারপাশ থেকে এজেন্টরা একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। বৃষ্টির তোড়ে জেনিনের রক্তমাখা ব্যান্ডেজ খুলে যাচ্ছে, কিন্তু তার হাতের নিশানা এখনো নিখুঁত। প্রতিটা গুলিতে ভলকানের একজন করে খুনি মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে। ইউজি তার এক হাতে জেনিনকে ঢাল দিচ্ছে, অন্য হাতে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করছে। জেনিন আজ এক নির্মম মেশিন। সে যাকে দেখছে, তাকেই ছিঁড়ে ফেলছে। জেনিনের স্ত্রী, তার নূরা, যে ভেতরে মৃত্যুর সাথে লড়াই করছে, সেটিই তাকে এই পৈশাচিক শক্তি দিচ্ছে! সে হেরে যাওয়ার জন্য জন্ম নেয়নি। সে জিতবে, তাকে জিততেই হবে।

কিন্তু ঠিক সেই সময়েই একটি অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ল। ভিলার বারান্দার এক কোণায় নীলিমা দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনের সকালের বেনারসীটা নেই! বরঞ্চ তার পরনে একটি কালো রঙের ফিটিং ট্যাকটিক্যাল ড্রেস। তার হাতে একটি সাইলেন্সার লাগানো ছোট পিস্তল। নীলিমা ইউজির দিকে তাকিয়ে ছিল না, সে তাকাচ্ছিল ভিলার মেডিকেলের দিকে। নীলিমার এই রূপটি ইউজি আগে কখনো দেখেনি। ইউজি এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে ভেবেছিল নীলিমা ভয়ে কুঁকড়ে আছে, কিন্তু নীলিমার চোখের দৃষ্টিতে আজ অন্যকিছু দেখতে পাচ্ছে ইউজি, যেন প্রতিশোধের আগুন!

নীলিমা খুব ধীর পায়ে ভিলার ভেতরে ঢুকতে শুরু করল। সে জানে জেনিন আর ইউজি এখন ভলকানের সাথে যুদ্ধে ব্যস্ত। সে সুযোগ বুঝে মেডিকেলে গিয়ে নোবারাকে শেষ করে দিতে চায়! নীলিমা যখন করিডোর দিয়ে হাঁটছিল, তার প্রতিটি পদক্ষেপে যেন এক বিষাক্ত সাপের শীতলতা। নীলিমা ইউজির সবচেয়ে কাছের বন্ধু হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিয়েছিল, কিন্তু আজ সেই মুখোশটা খুলে যাচ্ছে। সে তো কখনোই ইউজির বন্ধু ছিলই না! সে ভলকানের গুপ্তচর। যার কাজ ছিল জেড এর উপর নজর রাখা। তবে হ্যাঁ স্টেশনে হারিয়ে যাওয়া মেয়েটিও সেই ছিল। কিন্তু সময় সুযোগ মানুষকে খুব সহজেই পাল্টে দেয়। তাই তো আজ সে ইউজি, তার হবু স্বামীর প্রতিপক্ষ!

জেনিন দূর থেকে তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে সব লক্ষ্য করছিল। সে দেখল নীলিমা মেডিকেলের দিকে যাচ্ছে। জেনিনের বুকের ভেতরে ধক করে একটা শব্দ হলো। নীলিমার চালচলন বেশভুষা সুবিধার ঠেকলো না! তার নূরা! তার নূরার কোন ক্ষতি!

জেনিন আর ইউজিকে ফিসফিস করে বলল,
“ভলকানকে আমি দেখছি। তুমি পেছনে যাও… নীলিমা কিছু করতে চাইছে। ওকে আটকাও!”

ইউজি প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারল না। নীলিমা কে তো সে ভালোবাসে! তার নীলিমা এমন কিছু করতেই পারে না। কিন্তু নীলিমার এই রুপ তার মস্তিষ্ককে অন্য কিছু জানান দিচ্ছে!

“যাও ইউজি! ও তোমার ভালোবাসার মানুষ নয়, ও একজন বিশ্বাসঘাতক!” জেনিন এবার গর্জে উঠল।

ইউজি পিছু ফিরে নীলিমার দিকে দৌড়াতে শুরু করল। জেনিন এখন একা লড়ছে, যদিও তার এজেন্ট আর ফাইটার, এলিট ফোর্স ও তাকে ব্যাকআপ দিচ্ছে। তার সামনে ভলকান এবং তার পঞ্চাশজন খুনি। জেনিন নিজের সমস্ত ব্যথাকে এক মুহূর্তের জন্য ভুলিয়ে দিল। তার মাথায় এখন কেবল একটি চিন্তা, তার নূরা যেন নিরাপদ থাকে। জেনিনের নিষ্ঠুরতা আজ তার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছে। সে এক হাতে ভলকানের এক আততায়ীর গলা চেপে ধরল, অন্য হাতে গুলি চালাল। জেনিনের মুখ আজ রক্তে রাঙানো, তার চোখে আজ কোনো দয়া নেই। সে মাফিয়া জেড, যে তার নিজের রক্ত দিয়ে তার সাম্রাজ্য রক্ষা করতে জানে।

এদিকে করিডোরের নিস্তব্ধতায় নীলিমা দ্রুত হাঁটছে। তার হাতে ছুরি ঝকঝক করছে। সে নোবারাকে মারার জন্য এই সুযোগটারই অপেক্ষায় ছিল। ইউজি যখন করিডোরের মোড়ে পৌঁছাল, সে দেখল নীলিমা মেডিকেলের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। নীলিমার মায়াবী রূপ আজ পুরোপুরি উধাও। সে এখন এক রক্তপিপাসু খু’নি।

“নীলিমা?” ইউজির গলার স্বর কাঁপছে।

নীলিমা ঘুরে তাকাল। তার চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা। সে ইউজির দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। সেই হাসিটা ইউজির চেনা নয়। “ইউজি, তুমি এখনো বোঝনি? আমি ভলকানের গুপ্তচর, রিকা সান! তোমার কোন প্রেমিকা নই!”

ইউজির পৃথিবী যেন ধুলোয় মিশে গেল! তার প্রেম, তার স্বপ্ন, তার বিশ্বাস, সবকিছু আজ একটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে। সে কি নীলিমাকে ভালোবাসত? নাকি নীলিমা এই রূপটার আড়ালে তাকে শুধু ব্যবহার করে গেছে? ইউজির বুকের ভেতরটা কেমন যেন দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। সে কান্নার মতো স্বরে বলল,
“নী…..নীলিমা, আমরা তো আজ…আজ তো আমাদের বিয়ে করার কথা ছিল! তুমি কেন এমন করলে?”

নীলিমা উপহাসের হাসি হাসল।
“বিয়ে? বিয়ে টিয়ে আমি করতাম ও না কখনো। আমি আজ নোবারাকে মারব, আর তার লাশ দেখার পর জেনিন নিজেই ভেঙে পড়বে। এটাই আমার কাজ।”

ইউজি করিডোরের মুখে দাঁড়িয়ে স্তব্ধ। তার শরীরের প্রতিটি শিরায় রক্ত যেন হিম হয়ে গেছে। নীলিমার মায়াবী চোখ জোড়া আজ আগুনের গোলার মতো জ্বলছে। ইউজির কণ্ঠনালী শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।

ইউজি কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, “তুমি…তুমি… এটা তুমি কী করছ নীলিমা? ওনি নোবারা ম্যাম, বসের ওয়াইফ! তুমি তাকে মারতে যাচ্ছ কেন? বলো… বলো এটা একটা দুঃস্বপ্ন।”

নীলিমা এক নিষ্ঠুর উপহাসের হাসি হাসল। তার হাসিটা ছিল যেন কাঁচ ভাঙার শব্দ। সে ইউজির দিকে এগোতে এগোতে বলল, “দুঃস্বপ্ন না ইউজি, এতোদিন যা ছিল, তাই ছিল দুঃস্বপ্ন। আসল বাস্তব তো এখন শুরু হচ্ছে। আর আমার নাম রিকা, আদিখ্যেতা করে নীলিমা ডেকো না, অসহ্য একটা নাম। ওফফফ!”

ইউজি আর্তনাদ করে উঠল,
“কিন্তু আমাদের ভালোবাসা? নীল….নীলিমা, আমরা তো কথা দিয়েছিলাম! আমাদের বিয়ের সাজ তো রেডি! তুমি আমাকে ভালোবাসতে, আমি জানতাম!”

নীলিমা ছুরিটি শূন্যে ঘুরিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল, “ভালোবাসা শব্দটা তোমাদের মতো ইমোশনাল বোকাদের জন্য। আমি ঘৃণা করি তোমাকে ইউজি। এই যে তোমার প্রতিটা ছোঁয়া, তোমার প্রতিটা আদর, সব ছিল আমার অভিনয়ের অংশ। এখন রাস্তা থেকে সরো, নয়তো আমি তোমাকেও শেষ করে দিব।”

ইউজি মেঝেতে বসে পড়ল। তার চোখের কোণে পানি জমাট বেঁধেছে। সে বিশ্বাস করতে পারছে না তার নীলিমা এতোটা নিষ্ঠুর হতে পারে। নীলিমা এবার মেডিক্যালের দরজার দিকে দৌড় দিতেই ইউজি এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে পেছন থেকে তাকে ঝাপটে ধরল। সে নীলিমাকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

“না নীলিমা! আমি তোমাকে পাপ করতে দেব না! আমি তোমাকে কোনোদিনও কাউকে মারতে দেব না! তুমি রিকা নও, তুমি আমার নীলিমা। এটা করো না।” ইউজি চিৎকার করে কাঁদছিল।

নীলিমা ইউজির বাহুবন্ধন ছাড়ানোর জন্য ছটফট করতে লাগল। সে ছুরি দিয়ে ইউজির পিঠে আঘাত করল। ইউজির পিঠ থেকে রক্ত ঝরতে শুরু করল, কিন্তু সে নীলিমাকে ছাড়ল না। নীলিমা চিৎকার করে বলল, “আমাকে ছাড়ো ইউজি! ছাড়ো বলছি! আমি নোবারাকে শেষ করবই!”

ইউজি চোখের জলে ভাসতে ভাসতে সামনে ঘুরে নীলিমাকে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করাল। সে তার দুই হাত দিয়ে নীলিমার মুখটা ধরল। ইউজির কান্নাভেজা চোখের দিকে তাকিয়ে নীলিমা এক সেকেন্ডের জন্য স্থির হলো। ইউজি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল, “কেন? কেন তুমি এমন করলে? নোবারা ম্যাম বসকে ধ্বংস করতে এসেও শেষমেশ তাকেই ভালোবেসেছে, তার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়েছে। তুমি কেন পারলা না? আমাকে কি ভালোবাসা যেত না? বলো এসব মিথ্যা, তুমি রিকা নও, তুমি আমার নীলিমা।”

নীলিমা তার তীক্ষ্ণ ছুরির আগাটা ইউজির বুকের ওপর আলতো করে রাখল। সে কোনো অনুশোচনা ছাড়াই বলল,
“আমি নোবারা নই। আমার ভেতরে কোনো দয়া নেই। জেনিন নূরশাদকে শেষ করাই আমার জীবনের লক্ষ্য ছিল, আর তুমি… তুমি ছিলে স্রেফ একটা টাইমপাস।”

ইউজি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার ভালোবাসার মানুষটি যখন তার চোখের সামনে নিজের নিষ্ঠুরতা আর ঘৃণা প্রকাশ করছিল, তখন ইউজির হৃদপিণ্ডটা যেন চিরতরে থেমে গেল। সে বুঝতে পারল, যাকে সে এতদিন পরম যত্নে আগলে রেখেছিল, সে আসলে তার জন্য কালসাপ। ইউজি অশ্রুসজল চোখে নীলিমার চোখের দিকে তাকাল। তার হাতে থাকা তার নিজের পিস্তলটি এখন নীলিমার বুকের দিকে তাক করা।

“যদি আমি তোমাকে বাঁচতে দিই, তবে তুমি আরও অনেক মানুষকে মারবে। আমি তোমাকে আমার ভালোবাসার নামে এই নিষ্ঠুরতা চালিয়ে যেতে দিতে পারি না,” ইউজি কাঁদতে কাঁদতে বলল।

নীলিমা বাঁকা হেসে বলল, “তবে মারো আমাকে! উদয়, তুমি কি পারবে তোমার ভালোবাসার মানুষটিকে খু’ন করতে?”

ইউজি এক অমানুষিক কষ্টে চোখ বন্ধ করল। কান্নার বাঁধ ভেঙে গেছে তার। সে বিড়বিড় করে বলল, “আমাকে ক্ষমা করো নীলিমা।”

‘ধুম!’ একটি গুলির শব্দ পুরো ভিলার করিডোর কেঁপে উঠল। ইউজি নিজের হাতে নিজের নীলিমাকে গুলি করল! তাও আবার সেই বুকে, যেখানে থাকার স্বপ্ন দেখেছিল সে!

গুলিটি নীলিমার বুকে বিঁধল। নীলিমার শরীরটা যেন এক ঝটকায় থমকে গেল। সে তার দু হাত দিয়ে নিজের বুক চেপে ধরল। সে ইউজির দিকে তাকিয়ে টলমল পায়ে পিছিয়ে যেতে লাগল। তার ঠোঁট দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এল। সে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। নীলিমা ছটফট করছিল, সে ভাবতেই পারেনি এই বোকার মতো ভালোবাসা মানবটা তাকে খু’ন করতে পারে! তাও আবার একটা ছেলের জন্য, জেড এর জন্য! তার শরীরটা যন্ত্রণায় কুণ্ডলী পাকিয়ে যাচ্ছিল। সে যখন মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছিল, ইউজি তার পাশে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। সে নীলিমার মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিল। তার চোখ বেয়ে অঝোরে পানি নামছে!

নীলিমার মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে কেবল রক্ত আর বাতাসের শব্দ বেরোচ্ছিল। সে যন্ত্রণায় তার শরীরটা কাঁপছিল, যেন এক মাছ ডাঙ্গায় এসে ছটফট করছে। নীলিমার স্নিগ্ধ রূপ আজ ধূসর হয়ে গেছে। তার চোখের মণিগুলো স্থির হয়ে আসছে। সে ইউজির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল, কিন্তু সেখানে এখন আর ঘৃণা নেই, আছে এক অদ্ভূত শূন্যতা।

নীলিমার শেষ নিঃশ্বাসটি ছিল ইউজির হাতের ওপর। সে শেষবারের মতো কেঁপে উঠল, তারপর শান্ত হয়ে গেল। ইউজি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সে তার ভালোবাসার মানুষটির লাশের পাশে পড়ে আছে। ভিলার বাইরে তখন জেনিনের ফোর্স, রায়ান, মায়া এবং তাদের বিশাল বাহিনী ভলকানের বাহিনীর সাথে তুমুল লড়াই করছে। গোলাগুলির আওয়াজ আর আগুনের হলকায় আকাশ লাল হয়ে আছে। ইউজি সেই ধ্বংসযজ্ঞের মাঝে নিজের জীবনের সবচাইতে বড় শোকের সাক্ষী হয়ে বসে রইল।

সে ভাবল, তার ভাগ্য কি আসলেই এতো খারাপ? জেনিন নূরশাদের মতো মাফিয়া জেড তার স্ত্রীকে বাঁচাতে গিয়ে যুদ্ধ করছে, আর সে? সে তার ভালোবাসার মানুষটিকে নিজের হাতেই শেষ করে দিল। তার বিয়ের সাজ তো রয়েই গেল, কিন্তু বর বেঁচে রইল তার কনের লাশ নিয়ে!

এদিকে বাইরের চত্বরে জেনিন নূরশাদ তখন ভলকানের বাহিনীর ওপর তান্ডব চালাচ্ছে। জেনিন একা নয়, তার পাশে রায়ান এবং মায়ার বাহিনী আগুনের বৃষ্টি ঝরাচ্ছে। জেনিনের চোখে আজ শুধুই আগুন। সে ভলকানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ভলকান তার ফোর্স নিয়ে পিছু হটছে, কিন্তু জেনিন আজ কোনো দয়া দেখাচ্ছে না। তার প্রতিটি গুলিতে যেন প্রতিটা শত্রুর অস্তিত্ব শেষ হয়ে যাচ্ছে। জেনিন আজ নিষ্ঠুরতার চরম শিখরে। সে তার সাম্রাজ্য রক্ষা করতে নয়, সে আজ তার নূরাকে রক্ষা করার জন্য লড়ছে।

গোডাউনের যুদ্ধ হোক বা এই ভিলা, জেনিন কোথাও হার মানেনি। কিন্তু ভেতরে ইউজি তখন নীলিমার লাশটা আঁকড়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদছে। একপাশে জেনিনের রাজত্ব রক্ষা পাওয়ার লড়াই, অন্যপাশে ইউজির তিলে তিলে ভেঙে যাওয়া হৃদয়। নূরশাদ ভিলার আজ কোনো জয় নেই, আছে শুধু এক বিশাল ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ক্ষতবিক্ষত কিছু প্রাণ।

ওদিকে জেনিন যখন ভলকানকে কোণঠাসা করল, তখন সে এক চিলতে স্বস্তি পেল না। ভলকানের বাহিনীর সাথে তুমুল লড়াই শেষ করলো জেনিন। হ্যাঁ! ভলকানকে মারতে সফল হয়েছে সে এবং তার বাহিনী। তবে তার অসংখ্য ফাইটার মারা গিয়েছে এতে! অবশিষ্ট যারা আছে তারাও গুরুতর আহত, প্রায় সবারই গুলি লেগেছে গায়ে। জেনিন তার সব এজেন্ট দের তার মেডিকেল চেম্বার এ গিয়ে চিকিৎসা নিতে বললো।

লড়াই শেষ হওয়ার পরপরই জেনিন ভিলার প্রধান ফটকের কাছে এসে পৌঁছাল। জেনিনের শরীরে তখন বুলেটের ক্ষত আর জামার প্রতিটি তন্তু রক্তে ভেজা। তার পায়ের নিচে মাটি কাঁপছে, কিন্তু সে অদম্য। সে হাঁটছে এক আহত বাঘের মতো, যার কাছে এখন আর কোনো রাজত্ব নেই, নেই কোনো ক্ষমতার মোহ। আছে শুধু তার নূরা, যাকে সে রক্ষা করতে চায়।

কিন্তু নিয়তি বোধহয় জেনিনের অস্তিত্বের শিকড়গুলো উপড়ে ফেলার পরিকল্পনা করেছিল। সে যখন মেইন হলরুমের বিশাল দরজাটা লাথি মেরে খুলল, তখন তার চোখের সামনে যে দৃশ্যটি ভেসে উঠল, তাতে জেনিনের ধমনিতে বইতে থাকা রক্ত হিম হয়ে গেল। মেঝেতে পড়ে আছে মা হালিমা নিথর দেহ। যে মানুষটি এই ভিলার অন্দরে স্নেহের বাতি জ্বালিয়ে রেখেছিলেন, যিনি নোবারাকে নিজের ছায়ার মতো আগলে রাখতেন, তিনি আজ রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছেন। হালিমা বেগমের চোখের তারা স্থির, যেন মৃত্যুর শেষ মুহূর্তে তিনি নিজের মেয়ের মুখটা খুঁজছিলেন।

জেনিন পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার হাত দিয়ে পিস্তলটা খসে পড়ে গেল মেঝেতে। সে বিশ্বাস করতে পারল না, এই নিষ্ঠুরতা কার কাজ হতে পারে? ভলকান কি এতোটাই নিচে নেমেছে? সে তার ফোনের লোকেশন ট্রেকার খুলে দেখল, তার বাবার, আশফাক নূরশাদের, গোপন আস্তানা থেকেও সিগন্যাল পাওয়া যাচ্ছে না। জেনিন দ্রুত তার ওয়াকিটকিতে ইউজিকে ডাকল, কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এল না।

জেনিন কি তবে হেরে গেল? সে কি তবে সব হারিয়ে ফেলল? সে অমানুষিক দ্রুততায় তার গাড়িতে উঠে বাবার আস্তানার দিকে ছুটল। রাস্তাঘাট আজ জনশূন্য। জেনিন যখন সেখানে পৌঁছাল, তখন সেখানকার দৃশ্য ছিল আরও বীভৎস। তার বাবার শক্তপোক্ত আস্তানাটি আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সে ধুলোবালি আর আগুনের শিখা মাড়িয়ে ভেতরে ঢুকল। সেখানে পড়ে আছে তার বাবার রক্তাক্ত দেহ। আশফাক নূরশাদ, যে কিনা জেনিনের সব অন্ধকার জগতের রক্ষাকবচ ছিলেন, তাকেও ওরা ছাড়েনি! গলার শিরা কেটে মে’রে ফেলেছে ওনাকে!

জেনিন তার বাবার দেহের পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। সে কোনো চিৎকার করল না। কোনো কান্নাই যেন জেনিনের এই বিশাল শোকের গভীরতাকে প্রকাশ করতে পারবে না! সে শুধু তার বাবার শীতল হাতে নিজের হাতটি রাখল। জেনিন নূরশাদ আজ নিঃস্ব। এখন তার পৃথিবী বলতে কেবল ওই মেডিকেল চেম্বারে শুয়ে থাকা নোবারা আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিধ্বস্ত ইউজি। জেনিনের মাথা ধরে এলো! চারপাশে তার সব ফাইটার দের নিথর দেহ পড়ে আছে। ভলকান কে শেষ করেও জেনিন আজ শেষ হয়ে গেল! তার বাবাকে ভলকান মেরে ফেলল। আশেপাশে একজন জীবিত কেউ নেই যে সাহায্য চাইবে তার বাবাকে কবর দেওয়ার জন্য! জেনিন হঠাৎ তার বাবার নিথর শরীরটা বুকের মাঝে লেপ্টে ধরে চিৎকার করে উঠল! বাবা….বাবা…! আশফাক নুরশাদ এবার আর সাড়া দিলেন না। তিনি তার ছেলেকে আর শাসন করলেন না! কিংবা জোর করে হাত ধরে থেকে ছেলের রাগকে নিয়ন্ত্রন করলেন না। তিনি বিদায় নিলেন এই পৃথিবী থেকে এবং সাথে জেনিন নুরশাদকেও এতিম করে দিয়ে গেলেন! জেনিনের চোখের পানি থামছে না।

বাইরে প্রচুর বৃষ্টিপাত হচ্ছে। আশফাক নূরশাদের রক্তে ভেজা শরীরটা আগলে ধরে জেনিন নুরশাদ কতক্ষণ বসে ছিল, তার কোনো হিসাব নেই। চারপাশের আগুন নিভে ছাই হয়ে এসেছে, কিন্তু জেনিনের বুকের ভেতরকার আগুনটা তখনো দাউদাউ করে জ্বলছে। সে অমানুষিক শক্তিতে নিজের বিধ্বস্ত শরীরটাকে টেনে তুলল। তার বাবার আস্তানার পেছনে একটা ছোট বাগান ছিল, যেখানে আশফাক সাহেব বিকেলের অবসরে বসতেন। আজ সেখানেই তাকে চিরতরে ঘুমানোর জায়গা করে দিতে হবে।

কোনো কোদাল নেই, কোনো লোকবল নেই। জেনিন নিজের হাত দিয়ে মাটি খুঁড়তে শুরু করল। রাজপুত্রের মতো লালিত পালিত জেনিন নূরশাদের আঙুলগুলো ফেটে রক্ত বের হতে লাগল, নখগুলো উল্টে গেল মাটির ঘর্ষণে, কিন্তু সে থামল না। প্রতিবার মাটি তোলার সময় তার মনে পড়ছিল, এই সেই হাত, যা দিয়ে বাবা তাকে ক্ষমতার অধিকারী করেছেন, আজ সেই হাত দিয়েই বাবার কবর খুঁড়তে হচ্ছে!

মাটি খোঁড়া শেষ হলে জেনিন তার গায়ের কোটটা খুলে কবরের ভেতরে বিছিয়ে দিল। যেন তার বাবাকে মাটির রুক্ষতা স্পর্শ করতে না পারে। অতি সাবধানে, যেন ঘুম ভেঙে না যায়, সেভাবে সে আশফাক নূরশাদকে কবরের ভেতর শুইয়ে দিল।

জেনিনের কণ্ঠস্বর কান্নায় বুঁদ হয়ে আসছিল। সে যখন প্রথম মুঠো মাটিটা বাবার শরীরের ওপর দিল, তখন তার কলিজাটা যেন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইল।

“বাবা, এখন আমাকে কে শাসন করবে? আমার এই অন্ধকারের জীবনে কে আলো দেখাবে? তুমি তো বলেছিলে তুমি আমার রক্ষাকবচ, তবে আজ কেন আমাকে এই নরকে একা ফেলে চলে গেলে?”

সে দুহাতে মাটি টেনে বাবার শরীরটা ঢেকে দিতে লাগল। প্রতিটি মুঠোর সাথে সাথে জেনিনের পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে আসছিল। কবরের মাটি সমান করে জেনিন আর ধরে রাখতে পারল না নিজেকে। কবরের ওপর আছড়ে পড়ে সে চিৎকার করে উঠল, এমন এক আর্তনাদ, যা হয়তো আসমানের বুকও চিরে ফেলে।

“আল্লাহ! কেন আমার সবটুকু কেড়ে নিলে? আমার রাজত্ব নাও, আমার ক্ষমতা নাও, কিন্তু আমার বাবাকে কেন নিলে? বাবা…বাবা… আমি একা থাকতে পারব না। আমাকেও সাথে নিয়ে যাও!”

রাতের নিস্তব্ধতা চিরে জেনিনের বুকফাটা হাহাকার বাতাসে ভাসতে লাগল। পাশে কেউ নেই সান্ত্বনা দেওয়ার মতো। কেবল পড়ে আছে কতগুলো নিথর দেহ আর এক বিধ্বস্ত রাজপুত্রের হাহাকার। জেনিন মাটির ওপর মাথা রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতে লাগল,
“ভালোবাসি বাবা। বেঁচে থাকতে এই কথাটা না বলার আফসোস থেকে যাবে আজীবন!”

<><><><><><><><><>

জেনিন পুনরায় ভিলার সেই মেডিকেল ল্যাবে ফিরে এল। সে দেখল, ইউজি নীলিমার লাশের পাশে বসে আছে। ইউজির চোখের ভাষা আজ শূন্য। তার যে মানুষটিকে নিজের হাতে আজ গুলি করতে হয়েছে, তার পাশেই সে পাথরের মতো স্থির হয়ে বসে আছে। জেনিন ধীর পায়ে ইউজির কাঁধে হাত রাখল। সে বুঝতে পেরেছিল এমন কিছুই হবে।

ইউজি মুখ তুলল না, শুধু ভাঙা স্বরে বলল, “বস, আমি ওকে ভালোবাসতাম। আমি ওকে বাঁচানোর জন্য নিজের রক্ত দিয়েছি। কিন্তু ও আমাকে কী দিল? শুধু এক রক্তাক্ত লাশের ভালোবাসা!”

জেনিন কিছু বলল না। সে জানে, ইউজির এই ভাঙন তার নিজের ভাঙনের চেয়েও গভীর। নীলিমা ছিল ইউজির একমাত্র আশ্রয়। এখন সেই আশ্রয়ের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে এক মিথ্যা ইতিহাস আর প্রতারণার কঙ্কাল। জেনিন ইউজিকে টেনে তুলল এবং নোবারার রুমের কাঁচের দেয়ালের দিকে নিয়ে এল। নোবারা এখনো অচৈতন্য, কিন্তু তার হার্টবিট এখন আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। জেনিন কাঁচের ওপর হাত রাখল, তার হাত থেকে তখনো বাবার রক্তের দাগ লেগে আছে।

“ইউজি, আমাদের আর কিছুই নেই,” জেনিন শান্ত গলায় বলল। “সবাই চলে গেছে। ওরা মা হালিমাকেও মেরেছে, আমার বাবাকে মেরেছে। ওরা আমাদের সব শেষ করে দিয়েছে। কিন্তু নূরা… ও এখনো আমাদের মাঝে আছে।”

ক্ষণিক থেমে সে আবারো বলল,
“ইউজি, ভাই আমার, নীলিমা প্রতারক ছিল, কিন্তু নূরা আমাদের জন্য নিজের জীবন বাজি রেখেছে। আমাদের ওকে রক্ষা করা উচিত।”

ঠিক সেই মুহূর্তেই জেনিনের প্রাইভেট এনক্রিপ্টেড ল্যাপটপে একটি জরুরি সংকেত বেজে উঠল। ল্যাপটপটি জেনিনের ইমপেন্ডিং অরেস্টের সংকেত দিচ্ছিল। জেনিন ল্যাপটপটি খুলল। তার গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের প্রধান, মি: জুহায়ের, যে এখনো টিকে আছে, সে মেসেজ পাঠাল, “বস, পালান! সিআইডি, পুলিশ, র‍্যাব, পুরো শহরের সমস্ত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নূরশাদ ভিলার দিকে ধেয়ে আসছে। ওরা আপনাকে গ্রেফতার করার জন্য রেড অ্যালার্ট জারি করেছে। ভলকান আর মাহিতোর মারা যাওয়ার পর ওরা এখন আপনার ওপরই সব দায়ভার চাপিয়ে দিচ্ছে। ওরা নূরশাদ ভিলা ঘিরে ফেলেছে!”

জেনিন ল্যাপটপটা বন্ধ করে দিল। তার মুখে কোনো ভয়ের রেখা নেই। সে ইউজির দিকে তাকাল। ইউজি এখন নিজেকে সামলে নিয়েছে, যদিও তার হৃদয় তখনো নীলিমার লাশের ওপর পড়ে আছে।

জেনিন বলল, “আমাদের হাতে সময় খুব কম। আর ইউ রেডি ম্যান?”

ইউজি তার পিস্তলটি লোড করল। তার চোখে আজ আর কোনো প্রেম নেই, আছে কেবল বেঁচে থাকার এক আদিম লড়াই। সে নীলিমার লাশের দিকে শেষবারের মতো তাকাল এবং তারপর জেনিনের চোখের দিকে তাকাল।
“আমি আপনার সাথেই আছি বস। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত।”

বাইরে তখন পুলিশের সাইরেনের আওয়াজ। নূরশাদ ভিলার চারপাশ হাজার হাজার পুলিশ আর সিআইডি অফিসারের ঘেরাটোপে বন্দি। ড্রোনের আলোয় পুরো ভিলার ছাদ ঝলমল করছে। ওপর থেকে মাইকে ঘোষণা শোনা যাচ্ছে,
“জেনিন নূরশাদ! আত্মসমর্পণ করুন! আপনি চারপাশ থেকে ঘেরাও হয়ে আছেন! আপনার কোনো পালানোর রাস্তা নেই!”

জেনিন মেডিকেল ল্যাবের দরজার সামনে দাঁড়াল। সে তার পিস্তলটি নোবারার শোয়ার ঘরের দরজার দিকে তাক করল। সে জানে, সে যদি আত্মসমর্পণ করে, তবে নোবারাকে ওরা গ্রেফতার করে নিয়ে যাবে। আর জেনিন যদি মরে যায়, তবে নোবারা এই পৃথিবীতে সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়বে।

ভিলার দরজার দিকে তখন পুলিশের ভাঙার শব্দ। জেনিন ইউজিকে ইশারা করল। তারা দুজনে প্রস্তুত। বাইরে থেকে পুলিশ আর র‍্যাবের জওয়ানরা অস্ত্র উঁচিয়ে ভেতরে ঢোকার জন্য মরিয়া। ভিলার ভেতরে তখন স্তব্ধতা। শুধু জেনিনের প্রতিটি হৃদস্পন্দন এখন যেন এক একটি ঘড়ির কাঁটা, যা তার জীবনের অন্তিম মুহূর্তের দিকে এগিয়ে চলেছে।

জেনিন নূরশাদের জীবনের এই অধ্যায়ের সমাপ্তি কি তবে এভাবেই হবে? সিআইডি, র‍্যাব আর পুলিশের সামনে কি মাথা নত করবে দুর্ধর্ষ মাফিয়া জেড? নাকি নোবারার ভালোবাসার ছোঁয়ায় সে আবার নতুন কোনো যুদ্ধের ঘোষণা দেবে?

চলবে ইংশাআল্লাহ…….

(দেখি শেষ প্রশ্নের উত্তরগুলো পাঠকরা দিতে পারেন নাকি! বলুন তো, জেড কি করতে চলেছে! এনি আইডিয়া গাইজ?)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here