Soulmate_to_Enemy |৬৭| লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

0
1

#Soulmate_to_Enemy |৬৭|
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

কর্ণফুলীর উত্তাল ঢেউগুলো শান্ত হয়ে এলেও প্রশাসনের অন্দরমহলে আজ এক প্রবল জলোচ্ছ্বাস বইছে। জেনিন নূরশাদ ওরফে দ্য শ্যাডো কিং জেড, এর পতনের পর এক মাস পেরিয়ে গেছে, কিন্তু পুলিশের নথিপত্রে এই কেসটি এখনো ক্লোজড তকমা পায়নি। কেন পায়নি, সেই উত্তর খুঁজতেই আজ সিআইডি হেডকোয়ার্টারে এক উচ্চপর্যায়ের রুদ্ধদ্বার বৈঠক বসেছে।

টেবিলের চারপাশে বসা ডিবি, সিআইডি এবং র‍্যাবের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, যাদের সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে জেনিনের রক্তমাখা শার্টের টুকরো, ব্রিজের ফরেনসিক রিপোর্ট আর ড্রোন থেকে তোলা কর্ণফুলীর অস্পষ্ট সব ফুটেজ।

র‍্যাবের স্পেশাল উইংয়ের প্রধান কর্নেল রাশেদ ফাইলটা সজোরে টেবিলের ওপর আছড়ে ফেললেন। তার চোয়াল শক্ত। তিনি উপস্থিত সবার দিকে তাকিয়ে বজ্রকণ্ঠে বললেন,
“আমরা কি আসলেই বিশ্বাস করি যে জেনিন নূরশাদ মারা গেছে? আপনারা কি কর্ণফুলী নদীর স্রোত সম্পর্কে ধারণা রাখেন? গত এক মাসে আমাদের নেভি আর কোস্টগার্ডের ডুবুরিরা নদীর তলদেশ চষে ফেলেছে। একটা সাধারণ মানুষের লাশও যদি হতো, তবে তা ফুলেফেঁপে ভেসে ওঠার কথা ছিল। অথচ আমরা কী পেলাম? কিচ্ছু না!”

সিআইডির তদন্তকারী কর্মকর্তা রাইহান সাহেব চশমাটা ঠিক করে নিয়ে বললেন,
“স্যার, ব্রিজের ওপর পাওয়া রক্তের ডিএনএ রিপোর্ট কিন্তু পজিটিভ। জেনিন নূরশাদের রক্তের গ্রুপের সাথে তা হুবহু মিলে গেছে। তাছাড়া নানামি জায়দানের মতো একজন অফিসারের পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জের গুলি খাওয়ার পর কারো বেঁচে থাকা কি সম্ভব?”

“সম্ভব!” কর্নেল রাশেদ এবার উঠে দাঁড়ালেন। “যদি সেই মানুষটার নাম হয় জেনিন নুরশাদ। আর যদি তার সাথে থাকে ইউজির মতো একজন মাস্টারমাইন্ড। আপনারা কি ইউজির প্রোফাইল চেক করেছেন? সে কেবল একজন শ্যুটার নয়, সে একজন ক্যাকটিক্যাল এক্সপার্ট। সেই রাতে ব্রিজের ওপর যে স্মোক গ্রেনেড আর ল্যান্ডমাইন ব্যবহার করা হয়েছিল, তা কোনো অপেশাদার চোরের কাজ ছিল না। ইউজি জেনিনকে নিয়ে ঝাঁপ দেওয়ার পর থেকেই সে উধাও। আমরা তার একটা লোমও ছুঁতে পারিনি।”

পুরো রুমে এক অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল। পুলিশের সদর দপ্তর থেকে নানামিকে পুরস্কার আর প্রমোশন দেওয়া হলেও, ভেতরের খবর হলো, তদন্তের মোড় এখন ঘুরে গেছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে খবর আসছে, জেনিনের সাম্রাজ্যের যে অংশগুলো মাহিতো বা রায়ানের হাতে ছিল, সেগুলো এখন আর আগের মতো অনাথ নেই। পর্দার আড়াল থেকে কেউ একজন সেই সুতো নাড়ছে। জেনিনের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলোর লেনদেন বন্ধ থাকলেও, তার আন্ডারওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্কের সদস্যরা এখনো চুপচাপ। এই সাইলেন্স বা নীরবতাই পুলিশকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলছে!

ডিবি প্রধান চৌধুরী সাহেব মুখ খুললেন,
“আমাদের সোর্সরা বলছে, চট্টগ্রাম আর ঢাকার অন্ধকার গলিগুলোতে একটা গুজব ছড়িয়েছে। ওরা বলছে, ‘লাইওন ইজ ব্যাক’। যদি জেনিন বেঁচে থাকে, তবে নানামি যে প্রমোশনটা পেল, সেটা হবে আমাদের ডিপার্টমেন্টের জন্য সবচাইতে বড় লজ্জা। আমরা কি একজন জীবিত মানুষকে মৃত ঘোষণা করে জাতীয় বীর বানালাম?”

রাইহান সাহেব ঘামতে শুরু করেছেন।
“স্যার, আমরা কি তবে নানামিকে আবার জেরা করব? নানামিই তো শেষবার জেনিনকে নিজের কোলে ধরেছিল।”

“নানামি এখন ধরাছোঁয়ার বাইরে,” কর্নেল রাশেদ ব্যঙ্গাত্মক সুরে বললেন। “সে ভিকটিম নোবারাকে নিয়ে রাঙামাটিতে সেফ হাউসে আছে। কিন্তু আমার সন্দেহ হচ্ছে, জেনিন যদি বেঁচে থাকে তবে সে প্রথম যার কাছে পৌঁছাবে, সে হলো নোবারা। আমাদের নজরদারি বাড়াতে হবে। র‍্যাবের একটা বিশেষ টিম অলরেডি সিভিল ড্রেসে রাঙামাটিতে অবস্থান নিচ্ছে।”

এদিকে, শহরের দেয়ালে দেয়ালে জেনিনকে নিয়ে সাঁটানো সেই পোস্টারগুলো এখন ছিঁড়ে বৃষ্টির পানিতে লেপটে গেছে। কিন্তু আন্ডারওয়ার্ল্ডের সেই কালো সাম্রাজ্যের প্রতিটি কান এখন সজাগ। পুলিশ এখনো লাশের অপেক্ষায় আছে, আর জেনিনের অনুগতরা অপেক্ষা করছে একটা ইশারার।

কর্নেল রাশেদ মিটিং শেষ করার আগে বললেন, “আজ থেকে জেনিন নূরশাদ আর ইউজিকে মোস্ট ওয়ান্টেড: ডেড অর অ্যালাইভ হিসেবে পুনরায় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হলো। কর্ণফুলী থেকে বঙ্গোপসাগর, প্রতিটি ইঞ্চি চেক করুন। আর নানামির ওপর কড়া নজর রাখুন। যদি কোনোভাবে প্রমাণ হয় যে নানামি আমাদের সাথে কোনো গোপন গেম খেলছে, তবে তার পরিণাম ভালো হবে না।”

শহরের আকাশে তখন কালো মেঘ জমছে। সিআইডি আর র‍্যাবের এই যৌথ অভিযানে এখন একটাই লক্ষ্য, জেনিন নূরশাদের লাশ, অথবা তার জ্যান্ত শরীর। কারণ, লাশ না পাওয়া পর্যন্ত এই গল্পের শেষ নেই। আর ‘জেড’ যদি বেঁচে থাকে, তবে যে প্রতিহিংসার ঝড় উঠবে, তাতে প্রশাসনের অনেক বড় বড় ইমারত তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।

<><><><><><><><><>

সাজেক থেকে ফেরার পর নোবারা যখন একটু বিশ্রামের চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই সিআইডি এবং ডিবি-র একটি বিশেষ দল আকস্মিক হানা দিল নানামির বাড়িতে। এই হানা কোনো সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎ নয়, বরং এটি ছিল এক কঠোর এবং শীতল জেরা। যে নানামিকে এক মাস আগে বীরের মর্যাদায় প্রমোশন দেওয়া হয়েছিল, আজ তাকেই নিজের ড্রয়িংরুমে অপরাধীর মতো বসিয়ে রাখা হয়েছে।

জেরার কেন্দ্রে রয়েছেন সিআইডির তুখোড় কর্মকর্তা এএসপি রাইহান। তার সামনে বসে আছে নানামি। নানামির চেহারায় এখন আর সেই প্রমোশন পাওয়ার আনন্দ নেই, বরং এক গভীর ক্লান্তি আর চাপা উত্তেজনা খেলা করছে।

“নানামি সাহেব,” রাইহান সাহেবের কণ্ঠস্বর বরফের মতো শীতল। “আপনি তো জেনিন নুরশাদকে নিজের হাতে গুলি করেছিলেন, তাই না? পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে?”

নানামি সোজা হয়ে বসল। তার চোখেমুখে বিরক্তি। “আমি এই প্রশ্নের উত্তর অন্তত একশো বার দিয়েছি। হ্যাঁ, আমি গুলি করেছি। ও লুটিয়ে পড়েছিল।”

“লুটিয়ে পড়েছিল, নাকি আপনাকে ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইল করে একটা নাটক সাজিয়েছিল?” রাইহান সাহেব ঝুঁকে এলেন। “ফরেনসিক টিম ব্রিজের রেলিংয়ে রক্তের যে ছিটে পেয়েছে, তা যথেষ্ট নয়। একটি মানুষের শরীর থেকে যে পরিমাণ রক্তক্ষরণ হওয়ার কথা ছিল, তার ছিটেফোঁটাও সেখানে নেই। আমাদের সন্দেহ হচ্ছে, জেনিন হয়তো কোনো ব্লাড-ব্যাগ বা কৃত্রিম কিছু ব্যবহার করেছিল। আর আপনি বন্ধুত্বের খাতিরে তাকে সুযোগ করে দিয়েছেন ইউজির সাথে পালিয়ে যাওয়ার।”

নানামি সজোরে টেবিল চাপড়ে উঠল।
“দ্যাটস ইনসাফিসিয়েন্ট! আমি একজন পুলিশ অফিসার! আমি আমার ডিউটি করেছি। জেনিন আমার কোলে শেষ নিশ্বাস ফেলেছে। ওর শরীর তখন ঠান্ডা হয়ে আসছিল।”

“তাহলে লাশ কোথায়?” রাইহান সাহেবের চিৎকার পুরো ঘরে প্রতিধ্বনি তুলল। “ডুবুরিরা এক মাসেও একটা পচা মাংসের টুকরোও পেল না কেন? জেনিন নূরশাদ কি মাছ হয়ে গেল? নাকি আপনাদের চোখের সামনে দিয়ে সে দিব্যি হেঁটে চলে গেল?”

জেরা শুধু নানামিতেই থেমে থাকল না। পাশের একটি ছোট ঘরে তনুজাকে জেরা করছে আরেকজন মহিলা অফিসার। তনুজা কাঁপছে। সে সাধারণ মেয়ে, পুলিশের এই কঠোরতা সে নিতে পারছে না।

“মিসেস তনুজা,” মহিলা অফিসারটি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তালের পাতা নাড়ছেন। “আপনার স্বামী আর জেনিন নূরশাদ তো ছোটবেলার বন্ধু। জেনিনের বাসায় কি আপনাদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল? জেনিন কি নানামিকে কোনো আর্থিক সুবিধার টোপ দিয়েছিল?”

তনুজা ডুকরে কেঁদে উঠল। “না! নানামি কোনোদিন জেনিনের থেকে টাকা নেয়নি। ও তো সবসময় জেনিনকে ঘৃণা করত। আপনারা ওকে কেন সন্দেহ করছেন? ও তো দেশের জন্য নিজের বন্ধুকে নিজের হাতে মেরেছে!”

“বন্ধু মেরেছে নাকি বন্ধুকে বাঁচিয়েছে, সেটাই এখন দেখার বিষয়,” অফিসারটি কঠোরভাবে বললেন।

সবচাইতে কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হলো নোবারার ঘরে। নোবারাকে জেরা করার জন্য সরাসরি ভেতরে ঢুকলেন এএসপি রাইহান। নোবারা তখন জানালার পাশে স্থির হয়ে বসে ছিল। তার চোখে এখন আর সেই শূন্যতা নেই, বরং এক ধরণের রহস্যময় কাঠিন্য।

রাইহান সাহেব নোবারার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। “অফিসার এনএ, আমি আপনাকে এখনো অফিসার বলছি কারণ আপনার পদত্যাগপত্র এখনো গৃহীত হয়নি। আপনি জেনিনের সাথে কয়েক মাস কাটিয়েছেন। আপনি কি বিশ্বাস করেন সে মারা গেছে?”

নোবারা ধীরে ধীরে রাইহান সাহেবের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটে এক বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। “আমি সিআইডিতে থাকাকালীন শিখেছিলাম, যে জিনিসের প্রমাণ নেই, তা নিয়ে মন্তব্য করা বোকামি। আপনারা লাশ পাননি, তাই আপনাদের মনে সন্দেহ। কিন্তু আমি…”

নোবারা একটু থামল। সে তার গলার জেড লকেটটা শাড়ির আড়ালে চেপে ধরল। “আমি তাকে প্রতি রাতে অনুভব করি। সে মারা গেছে কি বেঁচে আছে, তা দিয়ে আমার কিছু যায় আসে না। কারণ সে আমার ভেতরে বেঁচে আছে।”

রাইহান সাহেব ভ্রু কুঁচকালেন। “আপনার ভেতরে? এর মানে কী?”

নোবারা শান্ত গলায় বলল, “আমি গর্ভবতী। জেনিন নূরশাদের সন্তান আমার গর্ভে।”

রাইহান সাহেব স্তব্ধ হয়ে গেলেন। এই তথ্যটি তাদের কাছে ছিল না। একজন মাফিয়া ডনের সন্তান পুলিশের সেফ-হাউসে বড় হচ্ছে, এটি প্রশাসনিকভাবে এক বিশাল জটিলতা। রাইহান সাহেব ঘর থেকে বেরিয়ে নানামির দিকে এগিয়ে গেলেন।

“নানামি সাহেব, আপনি তো আমাদের বিশাল বিপদে ফেলে দিলেন। নোবারা প্রেগন্যান্ট, আর এই খবর যদি মিডিয়া জানতে পারে, তবে পুলিশের ইমেজ মাটির সাথে মিশে যাবে। আমরা জেনিনের লাশ খুঁজছি, আর আপনারা তার বংশধরকে পালছেন!”

নানামি কোনো উত্তর দিল না। সে নোবারার ঘরটির দিকে এক পলক তাকাল। তার মনে হলো, সে আজ চারপাশ থেকে আটকা পড়ে গেছে। একদিকে জেনিনের লাশ না পাওয়ার গ্লানি, অন্যদিকে নোবারার এই ঘৃণা।

জেরা শেষ করে পুলিশ টিম চলে গেল ঠিকই, কিন্তু তারা পাহারা বসিয়ে দিয়ে গেল বাংলোর চারপাশে। নানামি এখন তার নিজের বাড়িতেই একজন নজরবন্দি কয়েদি। তনুজা মেঝেতে বসে কাঁদছে। নানামি তার পাশে গিয়ে বসল না, বরং সে জানালার বাইরে তাকিয়ে ভাবছিল, জেনিন কি সত্যিই তাকে এই বিপদে ফেলার জন্য এই নাটকটা সাজিয়েছিল?

তনুজা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,
“ওরা যদি আবার আসে? ওরা যদি আপনাকে গ্রেপ্তার করে?”

নানামি অন্ধকার পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “আমি জানি না তনুজা। আমি শুধু জানি, নুরশাদ মরার পরেও আমাকে জ্যান্ত কবর দিয়ে গেছে। লাশ নেই, প্রমাণ নেই… শুধু আছে এক অন্তহীন সন্দেহ।”

বাংলোর ছাদের ওপর থেকে তখন এক জোড়া চোখ তাদের দেখছিল। কালো হুডি পরা সেই মানুষটি অন্ধকারের সাথে মিশে আছে। পুলিশের এই জেরা, নোবারার এই স্বীকারোক্তি, সবই সে শুনেছে। তার হাতের মুঠোয় একটা ছোট পাথরের টুকরো। সে টুকরোটি সজোরে নিচের লেকের পানিতে ছুড়ে মারল। পানির ঢেউগুলো জানান দিল, সন্দেহ যখন বিশ্বাসে পরিণত হবে, তখনই শুরু হবে আসল প্রতিশোধ।

জেনিন নূরশাদ এখনো মরে যায়নি। সে বেঁচে আছে নানামির সন্দেহে, পুলিশের ভয়ে, আর নোবারার রক্তের স্পন্দনে। রক্ষকই এখন ভক্ষক হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে, আর ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে এক নতুন সাম্রাজ্য মাথাচাড়া দিচ্ছে।

<><><><><><><><><>

রাঙামাটির এক নিভৃত পাহাড়ি গুহা। বাইরের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ গুহার পাথুরে দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে এক অদ্ভুত গুমোট আবহ তৈরি করেছে। গুহাটির প্রবেশপথ লতাগুল্ম আর পাথরের আড়ালে এমনভাবে ঢাকা যে, বাইরে থেকে কারো বোঝার উপায় নেই এখানে কোনো প্রাণের অস্তিত্ব আছে।

গুহার একদম মাঝখানে একটি পাথরের ওপর বসে আছে সেই দীর্ঘদেহী ছায়ামানব। তার পরনের কালো জ্যাকেটটা পাশে পড়ে আছে, উন্মুক্ত পিঠের বাঁ দিকে ব্যান্ডেজটা রক্তে ভিজে লাল হয়ে উঠেছে। আগুনের আলোয় তার শরীরের পেশিগুলো তপ্ত তামার মতো জ্বলছে। ইউজি খুব নিপুণ হাতে পুরনো ব্যান্ডেজটা খুলে ফেলল। ক্ষতের গভীরতা দেখে ইউজির চোয়াল শক্ত হয়ে এল। এটি কেবল একটি বুলেটের ক্ষত নয়, এটি গভীর এক দহনের চিহ্ন।

ইউজি কোনো কথা বলছে না সে একটি বিশেষ ভেষজ লিকুইড তুলাতে ভিজিয়ে ক্ষতের ওপর চেপে ধরল। ছায়ামানবটির শরীর এক মুহূর্তের জন্য টানটান হয়ে গেল, হাতের মুঠো পাথরের ওপর এতটাই শক্ত হয়ে বসল যে নখের চাপে ছোট ছোট পাথর গুঁড়ো হয়ে গেল। কিন্তু তার মুখ দিয়ে একটা অস্ফুট গোঙানিও বের হলো না।

ইউজি খুব সন্তর্পণে নতুন করে ড্রেসিং করে দিচ্ছে। সে মাঝেমধ্যে ছায়ামানবটির চোখের দিকে তাকাচ্ছে, যে চোখে এখন এক অমানবিক জেদ আর নোবারার প্রতি এক আদিম হাহাকার।

“ক্ষতটা এখনো কাঁচা,” ইউজি খুব নিচু স্বরে বিড়বিড় করল। “এই অবস্থায় বার বার পাহাড়ে ওঠা আর ওই বাংলোতে যাওয়া আপনার শরীরের জন্য আত্মঘাতী। পুলিশ এখন চারপাশ ঘিরে রেখেছে। সিআইডি আর র‍্যাব নজরদারি বাড়িয়েছে। আজ রাতে না গেলেই কি হতো না?”

ছায়ামানবটি কোনো উত্তর দিল না। সে কেবল আগুনের শিখার দিকে তাকিয়ে রইল। তার দৃষ্টিতে এক ধরণের শূন্যতা, যা হাজারো শব্দের চেয়েও ভারী। ইউজি জানে, এই স্তব্ধতা ভাঙার ক্ষমতা তার নেই। সে ড্রেসিং শেষ করে এক গ্লাস জল এগিয়ে দিল। ছায়ামানবটি জলটা নিল না, বরং সে তার কালো হুডিটা টেনে আবার গায়ে চড়িয়ে নিল। তার শরীর এখনো জ্বরে কাঁপছে, কিন্তু তার লক্ষ্য স্থির।

ছায়ামানবটি এবার উঠে দাঁড়াল। তার দীর্ঘ ছায়াটা গুহার ছাদ পর্যন্ত পৌঁছে গেল। সে ইউজির দিকে একবার তাকাল। সেই দৃষ্টিতে এক ধরণের আশ্বাস আর আদেশ ছিল, ‘ততক্ষণ পর্যন্ত আমি ছায়া হয়েই থাকব, যতক্ষণ না সময় পূর্ণ হয়।’ সে কোনো শব্দ না করে গুহার অন্ধকার সুড়ঙ্গ দিয়ে বাইরের দিকে পা বাড়াল।

ইউজি তাকে আটকানোর চেষ্টা করল না। সে জানে, এই মানুষের নেশা আর পেশা এখন একটাই, নোবারার সান্নিধ্য। বিগত এক মাস ধরে লোকটা এই রক্তাক্ত শরীর বয়ে নিয়েও নোবারার কাছেই চলে যায়। তাকে যেন কোন কিছুই নোবারার কাছে যাওয়া থেকে আটকাতে পারবে না!

রাত তখন আড়াইটে। নানামির বাংলোর চারপাশে পুলিশের কড়া পাহারা। লেকের পাড়ে টর্চের আলো এদিক-ওদিক ঘুরছে। কিন্তু এই দুর্ভেদ্য পাহারার ফাঁক গলে সেই ছায়ামানবটি আবার বাংলোর কার্নিশ বেয়ে নোবারার জানালার কাছে পৌঁছে গেল। তার শরীরে প্রতিটি নড়াচড়ায় ক্ষতটা তীব্র যন্ত্রণা দিচ্ছে, কিন্তু সে ভ্রুক্ষেপহীন।

জানালার খিলটা সে এক বিশেষ কৌশলে খুলে ফেলল। ঘরে ঢুকেই সে দেখল নোবারা আজ ঘুমায়নি। সে জানালার দিকে পিঠ দিয়ে বসে আছে, তার হাতে সেই লকেটটা। নোবারার চোখ দুটো ঘুমে জড়িয়ে আসলেও সে নিজেকে জাগিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।

ছায়ামানবটি পর্দার আড়ালে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে দেখল নোবারা বিড়বিড় করে কিছু একটা বলছে। নোবারার সেই বিধ্বস্ত চেহারা দেখে ছায়ামানবটির হৃদপিণ্ডটা যেন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইল। সে আর দেরি করল না।

সে খুব দ্রুত নোবারার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। নোবারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই, ছায়ামানবটি তার পকেট থেকে সেই ঘ্রাণযুক্ত রুমালটি বের করে নোবারার নাকের ওপর চেপে ধরল। নোবারা এক মুহূর্তের জন্য ছটফট করল, তার হাত থেকে লকেটটা মেঝের ওপর পড়ে গেল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার শরীরটা এলিয়ে পড়ল। ছায়ামানবটি তাকে সযত্নে পাজাকোলা করে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিল।

সে নোবারার পাশে বসল। তার হাতটা কাঁপছে। সে খুব আলতো করে নোবারার কপালের ঘাম মুছে দিল। আজ রাতে সে অন্যরকম এক অনুভূতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সে জানে, এই বিছানায় এখন কেবল নোবারা নেই, আছে তার নিজের অস্তিত্বের একটি অংশ, তাদের অনাগত সন্তান।

ছায়ামানবটি সাবধানে নোবারার পাশে শুয়ে পড়ল। সে নোবারাকে নিজের বুকের ডান পাশে টেনে নিল (বাম পাশে ক্ষত থাকায়)। নোবারার মাথাটা তার কাঁধের ওপর রাখা। ঘুমের ঘোরেও নোবারা এক ধরণের তৃপ্তির হাসি হাসল। সে অবচেতন মনেই ছায়ামানবটির জামাটা শক্ত করে ধরল।

ছায়ামানবটি অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে পড়ল সেই কর্ণফুলী ব্রিজের দৃশ্য, সেই রক্তের হোলি খেলা। আজ সে মৃত, অথচ সে এই নারীর উষ্ণতায় বেঁচে আছে। সে নোবারার কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়ালো, দীর্ঘ এক মাস পর এই প্রথম এক নিবিড় স্পর্শ। তার চোখের জল নোবারার চুলে মিশে গেল।

সে নিজের সাথে নিজে এক নীরব প্রতিশ্রুতি করল। এই সন্তান আর এই নারী, এদের জন্য সে আবার নরক থেকে ফিরে আসবে। নানামি বা প্রশাসন কেউই তাকে আটকাতে পারবে না। সে জেনিন নূরশাদ কি না, তার পরিচয় এখন গৌণ; সে কেবল এই মুহূর্তের জন্য নোবারার স্বামী, নোবারার রক্ষক।

চলবে ইংশাআল্লাহ……..

(প্রতিদিন একটা একটা করে পার্ট দিতে দিতে আমার শব্দভাণ্ডার এ টান পড়েছে! তাই লেখা কেমন খাপছাড়া হয়েছে না? নাকি এই কাঁচা হাতের লেখনী ঠিক আছে? আমি কি বিরতি নিব? আসলে, নিজের লেখা পড়ে নিজেরই সেই একটা ফিল আসছে না কেন!☹️)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here