#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৮০ (পূর্ব সমাপ্তি)
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজ এর বর্তমান সিইও তথা নুরশাদ সম্রাজ্ঞী নোবারা নুরশাদ এর আমন্ত্রণে আজ নুরশাদ ভিলায় এসেছে নানামি আর তনুজা। বাড়ির প্রধান গেট দিয়ে যখন নানামির কালো এসইউভি গাড়িটা ভেতরে ঢুকল, তখন বাগান থেকে জাইনা চিৎকার করে উঠল,
“টাকলা! তাফু!”
গাড়ি থেকে প্রথমে নামল নানামি জায়দান। পাঁচ বছরে তার ব্যক্তিত্বে এসেছে অসীম গাম্ভীর্য। সে এখন আর সাধারণ কোনো অফিসার নয়, বরং বাহিনীর অন্যতম উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা DIG হিসেবে প্রমোশন পেয়েছে। জেনিন নুরশাদকে ধরা’র বিতর্কিত কিন্তু সফল মিশনের পর তার ক্যারিয়ারের গ্রাফ এখন তুঙ্গে। তবে ইউনিফর্মের বাইরে নানামি এখন একজন আদর্শ স্বামী এবং দায়িত্বশীল পিতা। প্রচলিত আছে, একটা মেয়ে যখন সবচেয়ে বেশি সুখী থাকে তখন তার চেহারার উজ্জলতা বৃদ্ধি পায়। তা আসলেই তনুজা জায়দান এর চেহারার নূর দেখলেই বুঝা যায়। নানামির সাথে সে বর্তমানে সবচেয়ে সুখী নারী। তাদের সম্পর্কের প্রথমদিকে সে জটিলতা দেখা গিয়েছিল, তা আজ বিন্দুমাত্রও নেই!
তনুজা যখন গাড়ি থেকে নামল, তাকে দেখে এক মুহূর্তের জন্য চেনা দায়। তার কোলে তিন বছরের ছোট্ট কন্যা তাফাশশি, আর গাড়ি থেকে লাফিয়ে নামল চার বছরের চঞ্চল ছেলে তাকরার।
তাকরার নামার সাথে সাথেই জাইনার সাথে এক চোর-পুলিশ খেলা শুরু করে দিল, দুষ্টু জাইনা বুড়ি আবার তাকরার কে টাকলা বলে ক্ষেপায়! সে নিয়ে দূজনেই প্রথমে একদফা ঝগড়াও করেছে বটে! বাগানের ঘাসের ওপর তিনটে শিশুর খিলখিল হাসি পাহাড়ের নিস্তব্ধতাকে যেন আশীর্বাদ করে দিচ্ছে। নোবারা বারান্দা থেকে নেমে এসে তনুজাকে জড়িয়ে ধরল। দুই বোনের এই আলিঙ্গনে যেন দীর্ঘ পাঁচ বছরের সব ক্লান্তি ধুয়ে মুছে গেল।
“কেমন আছো নোবারা?” তনুজা নোবারার গাল ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করল।
“ভালো আছি তনু। তোমাদের দেখে আরও ভালো লাগছে,” নোবারা হাসল। তার পাথুরে গম্ভীর মুখে আজ কিছুটা স্নিগ্ধতা ফুটে উঠেছে।
নানামি এগিয়ে এসে নোবারার দিকে তাকাল। একসময় নোবারার প্রতি তার যে সুপ্ত দুর্বলতা বা একতরফা টান ছিল, তা আজ ইতিহাসের পাতা। জেনিনের আত্মত্যাগ এবং তনুজার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা নানামিকে বদলে দিয়েছে। সে আজ তনুজাকে পাগলের মতো ভালোবাসে। তনুজা আর তার এই দুই সন্তানই এখন নানামির পৃথিবী। সে নোবারার চোখের দিকে তাকিয়ে আজ কেবল একজন ভাইয়ের মতো শ্রদ্ধা আর বন্ধুত্ব খুঁজে পায়।
“প্রমোশনের পর তো আপনাকে পাওয়াই যায় না নান্নামিন ভাই” ইউজি এগিয়ে এসে নানামির সাথে হ্যান্ডশেক করল। “পুরো দেশের সব অপারেশন কি আপনি একাই হ্যান্ডেল করছেন?”
নানামি হাসল, তার কাঁধে তনুজা এসে হাত রাখল। “দায়িত্ব তো নিতেই হয় ইউজি। তবে এই যে দুদিনের ছুটি নিয়ে তনুজা আর বাচ্চাদের নিয়ে আসতে পেরেছি, এটাই এখন বড় সার্থকতা। তনুজা তো আসতেই চাইছিল না, বলছিল নোবারা নাকি এখন বড় বিজনেসউইম্যান, আমাদের সময় দেবে কি না!”
তনুজা নানামির পেটে হালকা চিমটি কাটল।
“মিথ্যে বলবেন না একদম! নোবারা, দেখো এই মুখফোলা অফিসার কত বাজে কথা শিখছে এখন।”
হাসাহাসিতে মুখরিত হলো চারপাশ। নোবারা দেখল, নানামি যেভাবে তনুজার দিকে তাকাচ্ছে, সেই চাউনিতে কেবল ভালোবাসা আর নিরাপত্তা মিশে আছে। জেনিন যা চেয়েছিল, সবাই যেন নিজের মতো করে সুখ খুঁজে পায়, তা আজ সার্থকতা পেল। অথচ জেনিনই নেই! একটা সময় ছিল, যখন জেনূরার রসায়ন দেখে সবাই মুগ্ধ হয়ে যেত! সে দিন কোথায় হারিয়ে গেল?
বাগানের টেবিলে ভাপ ওঠা কফি আর নানারকম ঘরোয়া নাস্তা সাজানো হয়েছে। তাকরার আর জাইনা মিলে বাগানটাকে প্রায় তছনছ করে দিচ্ছে। তাকরার মাঝে মাঝে তাফাশশিকে ভয় দেখাচ্ছে, আর জাইনা তার বড় বোন সুলভ আচরণ দিয়ে তাফাশশিকে আগলে রাখছে।
“জাইনা তো একদম নুরশাদের মতো হয়েছে! নানামি কফিতে চুমুক দিয়ে নিচু স্বরে বলল। “ওর হাঁটাচলা, কথা বলার স্টাইল…আমি তো মাঝেমধ্যে কনফিউজড হয়ে যাই।”
নোবারা উদাস চোখে বাচ্চাদের দিকে তাকাল।
“হ্যাঁ, জেনিন নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ওর ছায়াটা জাইনার ভেতরে রেখে গেছে। তাকরার আর তাফাশশিকে দেখে আমার মেয়েটার জন্য মায়া হয় নানামি ভাইয়া। ওদের বাবা ওদের হাত ধরে বাগানে হাঁটতে পারছে। আর আমার মেয়েটা…!”
পুরো আড্ডায় এক মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে এল। তনুজা নোবারার হাতটা শক্ত করে ধরল। “জেনিন যেখানেই থাকুক, সে কিন্তু খুব খুশি হচ্ছে। তোমার এই সাফল্য, আমাদের এই সুখ, সবটাই ওর পরিকল্পনার অংশ ছিল।”
নানামি তনুজার কাঁধে হাত রেখে তাকে আস্বস্ত করল। সে এখন তনুজার এক মুহূর্তের বিষাদও সহ্য করতে পারে না। সে উঠে গিয়ে বাচ্চাদের কাছে গেল। নানামি যখন তাকরার আর জাইনাকে দুই কাঁধে তুলে নিয়ে ঘোড়া সেজে দৌড় দিল, তনুজা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।
“জানো নোবারা” তনুজা ফিসফিস করে বলল, “নানামি যখন বাসায় ফেরে, তখন ও আর ডিআইজি থাকে না। ও তখন পুরোদস্তুর একজন পাগল বাবা। বাচ্চা দুটো কে নিয়ে কি যে মাতামাতি করে! আমি এখন খুব সুখী জানো?”
নোবারা হাসল। হ্যাঁ, সবাই সুখী। তনুজা তার সংসার পেয়েছে, নানামি পেয়েছে তার গন্তব্য। ইউজি এই পরিবারের অতন্দ্র প্রহরী হয়ে আছে। আর নোবারা? সে হয়তো একা, কিন্তু তার ভেতরে জেনিনের দোর্দণ্ড প্রতাপী অস্তিত্ব আজও তাকে পথ দেখাচ্ছে। জেনিন যে পুরোপুরি তাকে ছেড়ে যায়নি!
<><><><><><><><><>
বিকেলের সোনাঝরা আলোটা যখন বাংলোর বারান্দার কারুকার্যময় রেলিং ছুঁয়ে ড্রয়িংরুমে এসে পড়ল, তখন ভেতরের পরিবেশটা হঠাৎ করেই থমথমে হয়ে গেল। নোবারা তার সামনের সেন্টার টেবিলে কতগুলো আইনি নথিপত্র আর নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের চিরচেনা ‘N’লোগো লাগানো সিলমোহরগুলো গুছিয়ে রেখেছে।
নোবারা দীর্ঘক্ষণ জানালার বাইরে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল। ইউজি দরজার কাছে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার মনে এক ধরণের কু-প্রডাকশন কাজ করছে। নোবারার শান্ত মুখাবয়ব আজ যেন কোনো এক মহাপ্রলয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও তার লিযার্ড কুইন হোক বা ড্রামা কুইন ম্যাম সেই পাঁচ বছর আগেই এমন শান্ত হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আজকের নীরবতা অন্য কিছুর আভাস দিচ্ছে তাকে!
নোবারা একটি ভারী নীল ফাইল ইউজির দিকে এগিয়ে দিল। তার কন্ঠস্বরে কোনো দ্বিধা নেই, বরং এক ধরণের মুক্তি পাওয়ার স্বাদ আছে। কোন প্রকার ভূমিকা ছাড়াই সে সরাসরি বলেই দিল,
“ইউজি, এই ফাইলে নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের সব শেয়ার তোমার নামে ট্রান্সফার করার পেপারস আছে। আজ থেকে এই সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র মালিক তুমি।”
ইউজি এক মুহূর্তের জন্য মনে করল সে ভুল শুনেছে। তার হাতের মুঠো শক্ত হয়ে এল। সে ফাইলের দিকে না তাকিয়ে সরাসরি নোবারার চোখের দিকে তাকাল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
“ভাবী, এসব কী বলছেন আপনি?” ইউজির কন্ঠস্বর সামান্য কেঁপে উঠল।
নোবারা ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। তার পায়ের শব্দ নিস্তব্ধ ঘরটায় প্রতিধ্বনিত হলো। সে ইউজির খুব কাছে এসে থামল। তার দৃষ্টিতে আজ এক অদ্ভুত ক্লান্তি।
“আমি অনেক ক্লান্ত ইউজি। এই পাঁচ বছর আমি জেনিন হয়ে বেঁচে ছিলাম। কিন্তু আর পারছি না। আমি আমার সাধারণ নোবারা জীবনে ফিরে যেতে চাই। আমি জাইনাকে নিয়ে এমন কোথাও যেতে চাই যেখানে নুরশাদ নামের কোনো বোঝা থাকবে না। তাই এই বিসনেস আমি তোমাকে দিয়ে যেতে চাই।”
ইউজি এক পা পিছিয়ে গেল। তার চোখে পানি টলমল করে উঠল। যে ইউজি কখনো শত্রুর বুলেটের সামনে চোখ পিটপিট করেনি, সেই ইউজি আজ ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। সে তার কাঁপা হাত দুটো বাড়িয়ে নোবারার সামনে জোড় করল।
“আপনি কি আমাকে পর করে দিচ্ছেন? আপনি আমাকে এই টাকার পাহাড় দিয়ে দূরে সরিয়ে দিতে চান? এমনটা করার তো দরকার নেই!”
নোবারা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানালার দিকে ফিরে গেল যাতে ইউজির চোখের পানি তাকে দুর্বল করতে না পারে। ঘরের দেয়ালের ঘড়িটা টিকটিক শব্দে সময়ের অপচয় জানান দিচ্ছে।
“তুমি আমার অনেক করেছ ইউজি। তোমার নিজের একটা জীবন থাকা উচিত। নীলিমা, যাকে তুমি মন প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিলে, যার বিশ্বাসঘাতকতার বিরহে তুমি আজও সংসার করোনি। আমি তো সব জানি। কিন্তু আর কত বলো? এই বিসনেস তোমার ভবিষ্যৎ গড়ে দেবে। তাই আমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
ইউজি এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে হাঁটু গেড়ে মেঝের ওপর বসে পড়ল। তার দুগাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সে নোবারার শাড়ির আঁচলটা খপ করে ধরে ফেলল, ঠিক যেভাবে একজন ছোট শিশু তার আশ্রয়কে ধরে রাখে।
“প্লিজ, ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড, আমি ব্যবসা চাই না! আমি টাকা চাই না! আমি শুধু ভাইয়ের আমানত রক্ষা করতে চাই। জাইনাকে ছাড়া থাকা আমার পক্ষে অসম্ভব! ওকে আমি নিজের মেয়ের মতো বড় করেছি।”
ইউজির এই আর্তনাদ নোবারার হৃদয়ে সজোরে ধাক্কা দিল। সে বুঝতে পারল, ইউজির কাছে এই ইন্ডাস্ট্রিগুলো কেবল ইট-পাথরের দালান নয়, এগুলো জেনিনের স্মৃতি। নোবারা নিচু হয়ে ইউজির কাঁধে হাত রাখল। সে অনুভব করল ইউজি হিঁচকি তুলে কাঁদছে। নোবারার নিজের চোখও আজ লোনা হয়ে এল।
“একি করছো! শান্ত হও.. ওঠো।” নোবারা খুব নরম স্বরে বলল।
ইউজি চোখ মুছে দাঁড়াল। তার লাল হয়ে যাওয়া চোখ দুটো অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
ইউজি যখন কোনোভাবেই নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের এই বিশাল সাম্রাজ্য নিজের কাঁধে নিতে রাজি হলো না, তখন ড্রয়িংরুমের বাতাস আরও ভারী হয়ে উঠল। ইউজির লাল হয়ে যাওয়া চোখ দুটোর অবাধ্য জেদ নোবারাকে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দিল। জেনিনের মৃত্যুর পর এই দীর্ঘ পাঁচটা বছর ধরে ইউজি যেভাবে নিজের জীবনের সমস্ত সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে, নীলিমার দেওয়া বিষাক্ত বিশ্বাসঘাতকতার ক্ষত বুকে চেপেও জেনিনের আমানত আর তার ছোট্ট মেয়ে জাইনাকে আগলে রেখেছে, তা নোবারা খুব ভালো করেই জানে। কিন্তু নোবারার ভেতরের ক্লান্তিটাও যে আজ পাহাড়সমান। সে আর পারছে না জেনিন নূরশাদ সেজে এই অপরাধ আর ক্ষমতার রাজত্ব সামলাতে। তাকে বাইপাস প্ল্যান টা চালূ্ করতে হবে হয়তো!
নোবারা এবার টেবিলের ওপর রাখা ইন্টারকমটা তুলে নিয়ে খুব শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল,
“মায়াকে একবার আমার কাছে পাঠিয়ে দাও।”
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ড্রয়িংরুমের ভারী সেগুন কাঠের দরজাটা নিঃশব্দে খুলে গেল। ভেতরে প্রবেশ করল মায়া। জেনিন নূরশাদের পুরনো, দুর্ধর্ষ ট্রিপল শ্যাডো বাহিনীর অন্যতম স্তম্ভ সে। জেনিন থাকতে সবসময় একটা কথা বলত, ইউজির পর যদি এই দুনিয়ায় কাউকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করা যায়, তবে সে হলো মায়া। সময়ের ক্রূর থাবায় রায়ান বেইমানি করে মরেছে, জিবরান আগেই শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু মায়া? মায়া আজও নুরশাদ পরিবারের প্রতি তার ইস্পাতকঠিন আনুগত্য ধরে রেখেছে। জেনিনের মৃত্যুর পর যখন সিআইডি আর রাষ্ট্র মিলে চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ের নিচে থাকা জেনিনের প্রাণের চেয়েও প্রিয় বাইপাস ভিলা সিলগালা করে দিয়েছিল, তখন মায়াই নিজের জীবন বাজি রেখেছিল। সেই ভিলার পেছনের বকুলতলায় ঘুমিয়ে থাকা নোবারার মা হালিমা বেগমের লাশটা অত্যন্ত গোপনে, পরম শ্রদ্ধায় সেখান থেকে তুলে এনে এই নূরশাদ ভিলার পবিত্র মাটিতে পুনরায় সমাধিস্থ করার পুরো অসাধ্য সাধনটা মায়াই একা হাতে করেছিল। নোবারার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার আর দুঃসময়ের দিনগুলোতে মায়া কোনো প্রতিদান ছাড়াই এক অদৃশ্য ঢাল হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। আজও এই নুরশাদ ভিলায় মায়ার বিশ্বস্ততা সবাই জানে। ঐই নুরশাদ ভিলার জমিনটা ফিরে পেতেও অনেক লড়াই করতে হয়েছিল নোবারা ইউজির। তখনো মায়া তাদের সঙ্গ ছাড়েনি। যে মায়াকে ক্ষণিকের জন্য নোবারা হিংসে করেছিল, সেই মায়াকেই নোবারা এখন চোখে হারায়!
মায়া ঘরে ঢুকে নোবারা আর ইউজির এই থমথমে অবস্থা দেখে এক পাশে মাথা নিচু করে দাঁড়াল। তার পরনে চিরচেনা কালো ট্যাকটিক্যাল স্যুট, চোখে এক গম্ভীর পেশাদারিত্ব।
“ম্যাম, আমাকে ডেকেছেন?” মায়ার কণ্ঠস্বরে এক গভীর সমীহ।
নোবারা সেন্টার টেবিল থেকে ভারী নীল ফাইলটা তুলে নিল, যা একটু আগে সে ইউজিকে দিতে চেয়েছিল। সে মায়ার দিকে এগিয়ে গিয়ে ফাইলটা তার প্রসারিত দুটো হাতের ওপর রাখল।
“মায়া, জেনিন চলে যাওয়ার পর থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত তুমি যা করেছ, তার ঋণ শোধ করার যোগ্যতা আমার নেই। জেনিন সবসময় বলত, ইউজির পর তুমিই তার সবচেয়ে বড় বিশ্বস্ত। আজ আমি এই রাজত্ব থেকে চিরতরে মুক্তি নিচ্ছি। আমি জাইনাকে নিয়ে এক সাধারণ মানুষের মতো বাঁচতে চাই। ইউজি এই ব্যবসার দায়িত্ব নিতে চাইছে না, কারণ ও জাইনা আর আমার ছায়া হয়েই থাকতে চায়। তাই আজ থেকে নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের সমস্ত শেয়ার, জেনিনের রেখে যাওয়া এই বিশাল সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র মালিকানা আর সিলমোহর আমি তোমার নামে লিখে দিচ্ছি। আমি অনেক চিন্তা ভাবনা করেই তোমাকে এই দায়িত্ব দিচ্ছি। আশা করি প্রতিবারের মতো আমাকে ফিরিয়ে দিবেনা!”
নোবারার এই আকস্মিক ঘোষণা মায়ার মস্তিষ্কে যেন এক তীব্র বজ্রপাতের মতো আঘাত করল। মায়ার মতো এক শক্তপোক্ত, আবেগহীন ঘাতকের সারা শরীর এক মুহূর্তে কাঁপতে শুরু করল। সে অবিশ্বাসে নিজের হাতের ফাইলের দিকে তাকাল, যেখানে নুরশাদ লোগোটা বিকেলের ম্লান আলোয় জ্বলজ্বল করছে। তার পা দুটো যেন আর শরীরের ভার সইতে পারছিল না। মায়া সটান মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার দুই হাত হাতজোড় করা, মাথাটা নোবারার পায়ের কাছাকাছি নুয়ে পড়েছে। কৃতজ্ঞতা, সম্মান আর এক তীব্র আবেগে মায়ার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল ঝরে পড়তে লাগল।
“এ আপনি কী করছেন ম্যাম!” মায়ার কণ্ঠস্বর কান্নায় বুজে এল, যে মায়াকে কখনো কেউ কাঁদতে দেখেনি। “আমি তো কেবল বসের দেওয়া দায়িত্ব পালন করেছি। বস আমাকে বেঁচে থাকার সম্মান দিয়েছিলেন। আপনার আর জাইনা মার সেবা করা, এই নুরশাদ ভিলার দেয়ালগুলোকে রক্ষা করা আমার কর্তব্য, কোনো ব্যবসার মালিক হওয়া নয়! আমি এই সাম্রাজ্যের দাসী হয়েই মরতে চাই ম্যাম, আমাকে এত বড় বোঝা দিয়ে জেনিন বসের সামনে অপরাধী করবেন না!”
মায়ার এই অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতা আর নুয়ে পড়া অবয়ব দেখে নোবারার চোখের কোণ দিয়েও অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে নিচু হয়ে মায়ার দুই কাঁধ ধরে তাকে মেঝে থেকে টেনে তোলার চেষ্টা করল।
“শান্ত হও, ওঠো। এটা কোনো দয়া বা দান নয়, এটা জেনিনের বিশ্বাসের মর্যাদা। জেনিন বেঁচে থাকলে আজ এটাই করত। ইউজি যেমন জাইনার দ্বিতীয় অভিভাবক হয়ে আমাদের সাথে থাকবে, তেমনি তুমি এই নুরশাদ সাম্রাজ্যকে জেনিনের মতোই অজেয় করে রাখবে, এটাই আমার শেষ অনুরোধ। কোন একদিন হয়তো আমি আবার এই নুরশাদ ভিলায় ফিরবো, সেদিন যাতে শান্তিতে থাকতে পারি, তাই আমার এই সিদ্ধান্ত।”
মায়া নোবারার চোখের অনড় সিদ্ধান্ত আর ক্লান্তি দেখে আর কোনো কথা বলতে পারল না। সে নিজের বুকের সাথে নীল রঙের ভারী ফাইলটা চেপে ধরে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ থেকে ঝরে পড়া অশ্রুবিন্দুগুলো ফাইলের ল্যামিনেটেড কভারের ওপর পড়ে মুক্তোর মতো জমে যাচ্ছে। পাঁচ বছর ধরে যে মেয়েটি নিজের ভেতরের সমস্ত নারীসুলভ কোমলতাকে পুড়িয়ে, ছাই করে, জেনিন নুরশাদের ছায়ারাজ্যের এক নিষ্ঠুর প্রহরী হয়ে বেঁচে ছিল..আজ তার সেই ইস্পাতকঠিন বর্মটা চারদিক থেকে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।
নোবারা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মায়ার মাথাটা নিজের কাঁধে টেনে নিল। সে আলতো করে মায়ার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
“আমি জানি মায়া, তুমি পারবে। জেনিনের রাজত্ব সামলানোর ক্ষমতা ইউজির পর যদি কারও থাকে, তবে তা কেবল তোমার। আজ থেকে তুমি আর কারও অধীনস্থ নও, আজ থেকে তুমি নিজেই এক সাম্রাজ্য।”
মায়া কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোচ্ছিল না। সে কেবল অপলক দৃষ্টিতে তাকাল ইউজির দিকে।
ইউজি তখন ড্রয়িংরুমের এক কোণে, চেনা সোফাটার হাতলে হাত রেখে শূন্য চোখে মেঝের দিকে তাকিয়ে ছিল। নোবারা ইউজি আর মায়াকে একান্তে কিছু সময় দেওয়ার জন্য ধীর পায়ে ড্রয়িংরুম থেকে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার আগে সে মায়ার পিঠে হাত রেখে আলতো করে চাপ দিল, যা ছিল এক নীরব সান্ত্বনা। কারণ এখন যা হতে চলেছে তার আন্দাজ সে করতে পারলেও তা দমিয়ে রাখার ক্ষমতা তার নেঈ!
দরজাটা বন্ধ হওয়ার মৃদু শব্দ হতেই ড্রয়িংরুমের নিস্তব্ধতা যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দটা এখন প্রতিটা সেকেন্ডকে এক একটা চাবুকের আঘাতের মতো মনে করিয়ে দিচ্ছে।
ইউজি একটা লম্বা নিশ্বাস ফেলে সোফা ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। সে নিজের পকেটে হাত রেখে মায়ার দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে চেনা, হালকা, উদাসীন হাসিটা ফুটিয়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করল সে।
“অভিনন্দন, নুরশাদ সাম্রাজ্যের নতুন সম্রাজ্ঞী। ফাইলটা বড্ড ভারী, তাই না?”
মায়া মুখ তুলল। তার ভেতরের পেশাদারিত্বের শেষ সুতোটা এক ঝটকায় ছিঁড়ে গেল। সে ফাইলটা টেবিলের ওপর প্রায় ছুড়ে ফেলে ইউজির দিকে দু পা এগিয়ে এল।
“আপনিও চলে যাবেন?”
ইউজি হাসল। কিন্তু সেই হাসিতে কোনো প্রাণ ছিল না। সে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়া গাছটার দিকে চোখ রাখল।
“ভাবী একা জাইনাকে নিয়ে কোথায় যাবে? জেনিন ভাই আমার ওপর জাইনার দায়িত্ব দিয়ে গেছে। তাছাড়া, এই ইটের খাঁচায় আমার আর কী কাজ, মায়া?”
“আর আমার?”
“তোমার তো এখন মস্ত বড় রাজত্ব। পুরো নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজ তোমার ইশারায় চলবে।”
“আপনি ভালো করেই জানেন, আমি এই টাকা, এই ক্ষমতার কোনোদিন তোয়াক্কা করিনি।”
“তাহলে কিসের তোয়াক্কা করতে?”
মায়া থমকে গেল। তার ঠোঁট দুটো কাঁপছিল, কিন্তু ভেতরের গোপন, তীব্র, দমবন্ধ করা অনুভূতিটা সে মুখে উচ্চারণ করতে পারল না। গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে সে এই মানুষটার ছায়া হয়ে থেকেছে। ইউজি তাকে ছোট বোন বা সহযোদ্ধা ভেবে মায়া বলে ডাকত, আর মায়া তাকে ইউজি ভাই বলে সম্বোধন করত। কিন্তু এই ভাই ডাকার আড়ালে যে কত বড় একটা কালবোশেখী ঝড় মায়া নিজের বুকের বাম পাশে খাঁচাবদ্ধ করে রেখেছিল, তা এই মহাবিশ্বের কেউ টের পায়নি!
মায়া যখনই ইউজির বিষাদগ্রস্ত চোখের দিকে তাকাত, সে দেখতে পেত সেখানে কেবল একজনেরই ছবি খোদাই করা আছে..নীলিমা। রিকা সান উরফে নীলিমা, যাকে ইউজি নিজের হাত দিয়ে শেষ করে দিয়েছিল কেবল নোবারাকে বাঁচানোর জন্য। নিজের ভালোবাসাকে নিজ হাতে চিতাভস্মে পরিণত করার সেই ভয়ঙ্কর ক্ষত ইউজিকে এক জীবন্ত লাশে পরিণত করেছিল।
মায়া তা জানত। সে প্রতিদিন ইউজির সেই নীরব দহন দূর থেকে দেখেছে, আর মনে মনে নিজেকে পুড়িয়েছে। সে কখনো ইউজির কাছে নিজের অধিকার দাবি করেনি, শুধু চেয়েছিল এই মানুষটার আশেপাশে থেকে তার একাকীত্বের প্রহরী হতে। কিন্তু আজ যখন শুনছে, কাল সকালেই ইউজি চিরতরে এই দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে, তখন মায়ার পায়ের নিচের মাটিটা আক্ষরিক অর্থেই ধসে যাচ্ছে।
ইউজিও মায়ার এই নীরব অস্থিরতা খুব ভালো করেই বুঝতে পারছিল। সে তো কোনো অবুঝ বালক নয়, আন্ডারওয়ার্ল্ডের হাই লেভেলের হ্যাকার আর ফাইটার সে। মানুষের চোখের মণির সামান্য কাঁপুনি দেখেই সে ভেতরের পুরো ডাটাবেজ ডিকোড করে ফেলতে পারত। মায়ার এই দীর্ঘদিনের অবক্তব্য ভালোবাসা, তার চোখের এই তীব্র আকুলতা ইউজির অজানা ছিল না। কিন্তু সে নিরুপায়। তার নিজের বুকের ভেতরটা যে নীলিমার স্মৃতিতে পুড়ে অনেক আগেই কয়লা হয়ে গেছে! সেখানে অন্য কোনো নারীর জন্য নতুন করে কোনো বসন্ত আসার জায়গা অবশিষ্ট নেই। তাই সে সবসময় মায়ার এই অনুভূতিগুলোকে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ কৌতুক আর বড় ভাইয়ের স্নেহের চাদরে ঢেকে এড়িয়ে চলত। আজকেও সে সেটাই করতে চাইল।
ইউজি মায়ার কাছাকাছি এসে তার মাথায় একটা হালকা চাঁটি মারল, ঠিক যেভাবে আগের দিনগুলোতে দুষ্টুমি করত।
“আরে, মুখটা এমন পেঁচার মতো করে রেখেছ কেন? তোমাকে তো এখন ডন নুরশাদের মতো কড়া হতে হবে। কাল থেকে কেউ বেইমানি করলেই সোজা লক-আপ, বুঝলে?”
মায়া এক ঝটকায় ইউজির হাতটা সরিয়ে দিল। তার চোখ দিয়ে এবার বাঁধভাঙা জল গড়িয়ে পড়ল।
“তামাশা বন্ধ করুন, ইউজি ভাই!”
“তামাশা কোথায় করলাম? আমি তো সিরিয়াস।”
“আপনি বড্ড নিষ্ঠুর। আপনি বসের চেয়েও বেশি নিষ্ঠুর।”
“আমি তো সবসময়ই জল্লাদ ছিলাম, মায়া। নতুন করে জানার কী আছে?”
“বস তাও নোবারা ম্যামের ভালোবাসা বুঝেছিলেন। ওনার জন্য নিজের জীবন দিতে পেরেছিলেন। আর আপনি? আপনি একটা আস্ত রোবট!”
ইউজি এবার চুপ হয়ে গেল। তার চোখের কৃত্রিম কৌতুকের আলোটা এক নিমেষে নিভে গেল। সে একটা গভীর, তপ্ত নিশ্বাস ফেলে মায়ার থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াল। ড্রয়িংরুমের দেয়ালচিত্রে জেনিন আর নোবারার একটা স্কেচ আঁকা ছিল, ইউজি সেটার দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“রোবট হওয়াই ভালো, মায়া। মানুষ হলেই তো এই বুকের বাম পাশটায় যন্ত্রণা হয়। এই যে পাঁচটা বছর কেটে গেল, আমার প্রতিটা রাতে এখনো এই ভিলার শেষ বিকেলের গুলির শব্দটা প্রতিধ্বনিত হয়। আমি যখনই চোখ বন্ধ করি, আমি নীলিমার রক্তাক্ত চেহারা দেখতে পাই। ও আমার দিকে তাকিয়ে হাসত, মায়া। যে হাত দিয়ে আমি ওকে জড়িয়ে ধরেছিলাম, সেই হাত দিয়েই ওর কপালে ট্রিগার চেপেছিলাম। এই হাত নিয়ে আমি অন্য কাউকে ছোঁব কীভাবে, বলো?”
মায়া ডুকরে কেঁদে উঠল। সে নিজের দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে মেঝের ওপর বসে পড়ল। তার এই কান্না ড্রয়িংরুমের চার দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে এক বীভৎস আকুলতার সৃষ্টি করল। যে মায়াকে গত পাঁচ বছরে কেউ একটা মৃদু আওয়াজ করে হাসতে বা কাঁদতে দেখেনি, যাকে সবাই নূরশাদ ভিলার ‘
লোহার তৈরি পুতুল ভাবত, সে আজ এক অবুঝ, অসহায় কিশোরীর মতো মেঝের ধুলোয় লুটিয়ে পড়ছে।
ইউজি মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল। তার নিজের চোখ দুটোও লোনা জলে ভরে উঠছিল, কিন্তু সে নিজেকে শক্ত রাখল। সে মায়ার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল, কিন্তু তাকে স্পর্শ করল না।
“মায়া, ওঠো। তোমাকে এভাবে ভেঙে পড়লে চলবে না।”
“আমি পারব না, উদয়। আমি এই বিশাল বাড়ি, এই ব্যবসা একাকী সামলাতে পারব না।”
“তুমি পারবে। তুমি মায়া। জেনিন ভাই তোমাকে এমনি এমনি নিজের ট্রিপল শ্যাডো টিমে নেয়নি।”
“আপনিও থেকে যান না, প্লিজ! আমি কোনো শেয়ার চাই না, কোনো মালিকানা চাই না। আপনিই সব সামলান, আমি আপনার পেছনে আগের মতো ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকব।”
“ভাবীর আমাকে প্রয়োজন, মায়া। জাইনার একজন বাবাকে প্রয়োজন। জেনিন ভাই নেই, আমি যদি জাইনার হাতটা না ধরি, তবে ও কার পরিচয় নিয়ে বড় হবে?”
“আর আমার কে আছে? আমার এই পৃথিবীতে কে আছে?”
মায়া হঠাৎ মুখ থেকে হাত সরিয়ে সরাসরি ইউজির চোখের দিকে তাকাল। তার চোখ দুটো কান্নায় জবা ফুলের মতো লাল হয়ে গেছে। সেই চোখে ছিল এক আজন্ম তৃষ্ণার্ত নারীর নিজের অস্তিত্ব বাঁচানোর শেষ আকুল আবেদন। সে কাপঁতে কাঁপতে বলল,
“বিগত ছয়টা বছর আমি প্রতিটা দিন আপনার পেছনে ছায়ার মতো হেঁটেছি। আপনি যখন নীলিমার বিরহে ড্রিঙ্কস করে মাঝরাতে ছাদের কার্নিশে বসে থাকতেন, আমি দূর থেকে গান তাক করে দাঁড়িয়ে থাকতাম যাতে কোনো শত্রু আপনার ওপর হামলা করতে না পারে। আপনি যখন অসুস্থ হতেন, আমি লুকিয়ে আপনার ঘরের দরজার বাইরে সারারাত বসে থাকতাম। আপনি আমাকে কোনোদিন একটা নজরেও দেখলেন না? আমার এই ভালোবাসা কি এতটাই সস্তা ছিল?”
ইউজি স্তব্ধ হয়ে গেল। মায়া যে তাকে এতটা গভীরে নিজের ভেতরে লালন করেছে, তা সে ভাবতেও পারেনি। তার বুকটা এক তীব্র যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠল। সে মায়ার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“মায়া… তুমি বড্ড ভুল মানুষকে ভালোবেসে ফেলেছ।”
“ভুল হোক, পাপ হোক, আমি এই ভুলটা নিয়েই মরতে চাই। প্লিজ, আমাকে এভাবে ফেলে যাবেন না।”
“আমি নীলিমাকে ছাড়া আর কাউকে এই বুকে জায়গা দিতে পারব না, মায়া। দিলে সেটা তোমার সাথেও প্রতারণা হবে, আর আমার নিজের ভালোবাসার সাথেও বেইমানি হবে।”
“আমি তো আপনার বুক চাইনি! আমি শুধু আপনার উপস্থিতি চেয়েছিলাম!”
মায়া আর নিজের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারল না। সে এক বুক হাহাকার আর তীব্র উন্মাদনা নিয়ে মেঝ থেকে উঠে এক ঝটকায় ইউজিকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। তার দুই হাত ইউজির চওড়া পিঠটাকে শক্ত করে খামচে ধরল, যেন সে এই শেষ আশ্রয়টুকুকে কোনোভাবেই এই পৃথিবী থেকে হারিয়ে যেতে দেবে না! সে ইউজির বুকের মাঝে নিজের মুখটা লুকিয়ে অবুঝের মতো কাঁদতে লাগল। তার চোখের জল ইউজির কালো টি-শার্টটাকে ভিজিয়ে একাকার করে দিল।
ইউজি এক মুহূর্তের জন্য পাথরের মতো জমে গেল। তার দুই হাত বাতাসে ঝুলে রইল। সে মায়াকে জড়িয়ে ধরল না, আবার তাকে জোর করে সরিয়েও দিল না। সে শুধু চোখ বন্ধ করে নিজের ভেতরের নীলিমার স্মৃতিটাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। ড্রয়িংরুমের সেই নিস্তব্ধতায় কেবল মায়ার বুকভাঙা কান্নার শব্দ আর ইউজির দ্রুত চলা নিশ্বাসের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল।
ইউজি অত্যন্ত ধীর স্থিরভাবে মায়ার দুই হাতের বাঁধনটা আলতো করে আলগা করল। সে মায়ার ভেজা মুখটা নিজের দুই হাত দিয়ে তুলে ধরল। তার চোখে তখন এক প্রগাঢ়, বড় ভাইয়ের মতো স্নেহ আর অপরিসীম করুণা।
“কেঁদো না, মায়া। নুরশাদ ভিলার সম্রাজ্ঞীদের চোখে জল শোভা পায় না।”
মায়া কোনো কথা বলতে পারল না। সে কেবল অপলক চোখে ইউজির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন এই শেষ চাউনিটা সে নিজের আত্মার ভেতর সারাজীবনের জন্য বন্দি করে রাখছে।
ইউজি আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। সে দ্রুত পায়ে ড্রয়িংরুমের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল। তার বুটের খটখট শব্দটা করিডোর বেয়ে ক্রমেই মিলিয়ে গেল।
মায়া আবার সেই মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার টেবিলের ওপর পড়ে থাকা নীল ফাইলের N লোগোটা যেন জেনিন নুরশাদের অমোঘ সত্যটাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল..অপরাধ আর ক্ষমতার এই ছায়ারাজ্যে সবাইকেই কোনো না কোনো বড় মূল্য চকাতে হয়। জেনিন চুকিয়েছে নিজের জীবন দিয়ে, নোবারা চুকিয়েছে নিজের সংসার দিয়ে, আর মায়া চুকাল তার জীবনের প্রথম এবং শেষ ভালোবাসাটাকে চিরদিনের মতো একাকীত্বের দহনে বিসর্জন দিয়ে!
চলবে ইংশাআল্লাহ…
(আগামী পর্বেই সমাপ্তি টানবো ইংশাআল্লাহ। আশা করি, সবাই এই শেষ মুহূর্তে এসে হলেও নিজের মতামত জানিয়ে যাবেন।)

