Soulmate_to_Enemy #পর্ব_৮১ (সমাপ্তি পর্ব-The Endgame of ‘Z’)

0
2

#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৮১ (সমাপ্তি পর্ব-The Endgame of ‘Z’)
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

নুরশাদ ভিলার শেষ সকালটা যেন অন্যদিনের চেয়ে একটু বেশিই কুয়াশাচ্ছন্ন ছিল। পূর্ব দিকে ওঠা সূর্যটার আলো তখনো পুরোপুরি ডালপালা মেলে এই বিশাল প্রাসাদের উঠোনে এসে পৌঁছায়নি। ড্রয়িংরুমের ভারী সেগুন কাঠের দরজার আড়ালে গত রাতের যে বিষাদ জমে ছিল, তা ভোরের আলোয় এক অদ্ভুত, থমথমে নিস্তব্ধতায় রূপ নিয়েছে।

আজ এই নুরশাদ ভিলা থেকে চিরতরে বিদায় নেবে নোবারা নুরশাদ আর তার ছোট্ট মেয়ে জাইনা। সাথে যাবে এই নূরশাদ সাম্রাজ্যের বিশ্বস্ত সুরক্ষাপ্রাচীর, ইউজি উরফে উদয় গালিব। কিন্তু যাওয়ার আগে, এই শেষ সকালের আলো-আঁধারিতে নূরশাদ ভিলার একটি বন্ধ ঘরের ভেতর জন্ম নিচ্ছিল এক সম্পূর্ণ নতুন, অবাধ্য অথচ তীব্র এক উপাখ্যান।

মায়া আজ শাড়ি পরেছে!

বিগত ছয়-সাত বছরে যে মেয়েটিকে নুরশাদ ভিলার বা ট্রিপল শ্যাডো বাহিনীর কেউ কখনো কোনো উৎসব-পার্বণেও একটা সাধারণ কামিজ বা শাড়ি পরা অবস্থায় দেখেনি, যে সবসময় নিজের নারীত্বকে ব্ল্যাক ট্যাকটিক্যাল স্যুট, কার্গো প্যান্ট আর চামড়ার জ্যাকেটের নিচে কঠোরভাবে বন্দি করে রাখত..সে আজ পরেছে এক গাঢ় রক্তলাল রঙের জামদানি শাড়ি। চুলগুলো পিঠের ওপর আলগা করে ছেড়ে দেওয়া, কপালে একটা ছোট্ট কালো টিপ। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের এই অচেনা রূপের দিকে তাকিয়ে মায়ার নিজেরই নিজেকে বড্ড অচেনা লাগছিল। তার চোখ দুটো গত রাতের কান্নায় এখনো সামান্য ফোলা, চোখের কোণটা লালচে।

আজ তার প্রিয় মানুষটা, তার জীবনের একমাত্র ধ্রুবতারা এই দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। মায়া জানে, ইউজি তাকে গত রাতে খুব নির্মমভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। নীলিমার রক্তাক্ত স্মৃতিকে ঢাল বানিয়ে ইউজি তাকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু মায়া নুরশাদ ভিলার আর সবার মতো সাধারণ কোনো মেয়ে নয়। সে সহজে হার মানতে শেখেনি। যদি আজ শেষ দিনও হয়, তবে এই শেষ দিনটাতে সে নিজের সবটুকু অধিকার নিয়ে, সবটুকু অবাধ্যতা নিয়ে ইউজির সামনে দাঁড়াবে। সে দেখতে চায়, উদয় গালিবের ভেতরের পাথুরে পুরুষটা কতটা শক্ত, সে কতটা পারে মায়ার এই রূপকে, এই তীব্র আকুলতাকে অবহেলা করতে!

ধীর পায়ে মায়া করিডোর দিয়ে হেঁটে ইউজির ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। নুরশাদ ভিলার এই অংশটা বড্ড নির্জন। নোবারা তখন জাইনাকে নিয়ে নিচের তলায় গোছগাছ করছে, তাই ওপরের এই করিডোরে কেবল মায়ার নুপুরের হালকা রিনিঝিনি শব্দ প্রতিধ্বনি তুলছিল। হ্যাঁ, আজ সে পায়ে নুপুরও পরেছে। যে পায়ের বুটের শব্দে একসময় অপরাধ জগতের মানুষেরা কাঁপত, আজ সেই পায়ে নুপুরের শব্দ এক অদ্ভুত প্রেমের বন্দনা গাইছে।

ইউজির ঘরের দরজাটা সামান্য খোলা ছিল। মায়া কোনো অনুমতি না নিয়ে, কোনো শব্দ না করে ডান হাত দিয়ে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।

ঘরের মাঝখানে একটা বড় ট্রলি ব্যাগ খোলা অবস্থায় পড়ে ছিল। ইউজি তখন আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে তার কয়েকটা শার্ট ভাজ করে ব্যাগে রাখছিল। তার পরনে একটা সাদা রঙের ক্যাজুয়াল শার্ট, হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটানো। মায়ার নুপুরের শব্দে ইউজি হাত থামাল না, সে যেভাবে শার্ট ভাজ করছিল, ঠিক সেভাবেই করতে করতে খুব শান্ত গলায় বলল,
“শাড়িতে তোমাকে বড্ড বেমানান লাগছে, মায়া। তোমার ওই কালো স্যুটটাই ভালো ছিল। এই রাজত্ব চালাতে গেলে শাড়ির আঁচল সামলাতে সামলাতেই সময় চলে যাবে, ব্যবসা দেখবে কখন?”

ইউজির এই অবহেলা মেশানো, নিস্পৃহ কণ্ঠস্বর মায়ার ভেতরের জমে থাকা বারুদটায় আগুন জ্বালিয়ে দিল। সে দরজার লকটা ঘুরিয়ে খিল আটকে দিল। সেই শব্দে ইউজি এবার বাধ্য হয়ে ঘুরে তাকাল।

ইউজি যখন মায়ার দিকে তাকাল, তার চোখের মণি দুটো এক মুহূর্তের জন্য প্রসারিত হলো। মেঝের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই রক্তলাল পরীটাকে দেখে ইউজির ভেতরের চেনা ডাটাবেজ যেন এক সেকেন্ডের জন্য হ্যাং হয়ে গেল! মায়ার ফর্সা গায়ের রঙের সাথে এই লাল শাড়ি, খোলা চুল আর চোখের অবাধ্য, হিংস্র অথচ তৃষ্ণার্ত চাউনি..যেকোনো পুরুষের বুকে কাঁপন ধরানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ইউজি ঝটপট নিজের চোখজোড়া সরিয়ে নিল। সে আবার শার্টের ভাজে মনোযোগ দেওয়ার ভান করে বলল,
“দরজা আটকানোর কী দরকার ছিল? ভাবী বা জাইনা মা যেকোনো সময় চলে আসতে পারে। যাও, নিচে গিয়ে গাড়িগুলো রেডি আছে কি না চেক করো।”

মায়া এক কদম এগোলো। তার পায়ের নুপুর জোড়া এবার আর রিনিঝিনি নয়, বরং এক প্রকার ক্রুদ্ধ আওয়াজ করে উঠল। সে ইউজির ঠিক পেছনে এসে থামল। ইউজি আলমারির দিকে মুখ করে ছিল, মায়া তার পিঠের ওপর নিজের দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা ছুড়ে দিয়ে বলল,
“আমি নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের সব পেপারসে সই করে দিয়েছি। আজ থেকে আমি এখানকার ডন। আর ডন কারও আদেশ শোনে না, নিজের আদেশ চালায়। জানেন নিশ্চয়ই?”

ইউজি একটা শার্ট ব্যাগে রাখতে রাখতে হালকা হাসল।
“ভালো। ডন হয়েছ যখন, তখন নিজের ক্ষমতাটা ওই চামচাদের ওপর দেখাও। আমার ওপর নয়।”

“আপনার ওপরই দেখাবো।”

মায়া আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। সে পেছন থেকে এক ঝটকায় ইউজির কোমর জড়িয়ে ধরল। তার দুই হাত ইউজির পেটের ওপর শক্ত করে লক হয়ে গেল। মায়া নিজের পুরো শরীরটা ইউজির শক্ত পিঠের সাথে লেপ্টে দিল। তার লাল শাড়ির আঁচলটা ইউজির সাদা শার্টের ওপর আছড়ে পড়ল। মায়া নিজের মুখটা ইউজির ঘাড়ের কাছে, তার কলারের ঠিক নিচে চেপে ধরল। ইউজির গায়ের চেনা, কড়া পুরুষালী পারফিউমের ঘ্রাণ মায়ার মগজে এক তীব্র নেশার সৃষ্টি করল।

ইউজি স্তব্ধ হয়ে গেল। তার হাতের শার্টটা আলমারির তাকেই রয়ে গেল। সে চোখ বন্ধ করল। মায়ার শরীরের উষ্ণতা, তার বুকের দ্রুত ধকপকানি ইউজি নিজের পিঠে খুব স্পষ্টভাবে অনুভব করতে পারছিল। মায়ার তপ্ত নিশ্বাস ইউজির ঘাড়ের চামড়ায় বিঁধছিল তীরের মতো। ইউজি নিজের দুই হাত দিয়ে মায়ার হাতের লকটা খোলার চেষ্টা করতে করতে কড়া গলায় বলল,
“মায়া! কী হচ্ছে এসব? ছাড়ো আমাকে।”

“ছাড়ব না। মরে গেলেও ছাড়ব না।” মায়ার কণ্ঠস্বর এবার আর কান্নায় ভেঙে পড়ল না, সেখানে ছিল এক আদিম জেদ। “গত রাতে আপনি আমাকে নীলিমার গল্প শুনিয়ে পালিয়ে গেছেন। আজ আমি আপনাকে পালাতে দেব না। আপনি আমাকে ভালোবাসেন কি বাসেন না, সেটা আমি জানতে চাই না। কিন্তু আজ আপনাকে আমার এই টানটা অনুভব করতেই হবে।”

ইউজি নিজের পুরো শক্তি ব্যবহার করে মায়ার হাত দুটো আলগা করার চেষ্টা করল, কিন্তু মায়া আজ ট্রিপল শ্যাডো বাহিনীর দুর্ধর্ষ কমান্ডোদের মতো ইউজিকে লক করে রেখেছে। সে নিজের নখ দিয়ে ইউজির শার্টের কাপড় খামচে ধরল।

“মায়া, তুমি নিজের সীমা লঙ্ঘন করছ। আমি তোমাকে আমার ছোট বোনের মতো…”

“মিথ্যে বলবেন না! কোনো ভাই তার বোনের শাড়ি পরা দেখে এভাবে চোখ সরিয়ে নেয় না। কোনো ভাই তার বোনের স্পর্শে এভাবে কাঁপতে থাকে না। আপনার হার্টবিট এই মুহূর্তে কত স্পিডে চলছে, আমি তা নিজের বুকে ফিল করতে পারছি, উদয় গালিব।”

ইউজি এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার ভেতরের সেই পাথুরে পুরুষটা, যে পাঁচ বছর ধরে নীলিমার স্মৃতিতে নিজেকে বন্দি করে রেখেছিল, সে আজ এই রক্তলাল নারীর তীব্র আক্রমণের সামনে পুরোপুরি ভেঙে পড়ল। সে এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়াল। মায়ার হাত দুটো তার কোমর থেকে ছুটে গেল ঠিকই, কিন্তু ইউজি মায়ার দুই কাঁধ নিজের শক্ত মুঠোয় চেপে ধরে তাকে পেছনের আলমারির কাঠের পাল্লার সাথে সজোরে চেপে ধরল।

আলমারির কাঁচটা হালকা শব্দ করে কেঁপে উঠল। মায়ার পিঠটা কাঠের সাথে ধাক্কা খেল, কিন্তু তার মুখে কোনো ব্যথার চিহ্ন ছিল না, বরং ছিল এক পরম বিজয়ের হাসি।

ইউজির চোখ দুটো তখন জবা ফুলের মতো লাল। তার মুখে ভোরের আলো এসে পড়ায় তার চোয়ালের শিরাগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। সে মায়ার খুব কাছে ঝুঁকে এল। তাদের নাকের ডগা প্রায় ছুঁইছুঁই। ইউজির তপ্ত নিশ্বাস মায়ার ঠোঁটের ওপর আছড়ে পড়ছিল।

“কী চাও তুমি? কী প্রমাণ করতে চাও?”
ইউজির কণ্ঠস্বর আজ বড্ড নিচু, কিন্তু তাতে এক ভয়ঙ্কর গম্ভীর গর্জন ছিল।
“আমি একটা শেষ হয়ে যাওয়া মানুষ। আমার ভেতরে কোনো বসন্ত নেই। আমি যদি আজ তোমাকে এই বুকে টেনেও নিই, তবে সেখানে তুমি শুধু নীলিমার পোড়া ছাই খুঁজে পাবে। তুমি কি অন্যের ছাইয়ের ওপর নিজের ঘর বাঁধতে চাও?”

মায়া এক মুহূর্তের জন্য ইউজির চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে নীলিমার জন্য যেমন এক অনন্ত বিরহ ছিল, ঠিক তেমনি মায়ার জন্য ছিল এক গোপন, তীব্র আকর্ষণ যা ইউজি এত বছর ধরে নিজের অবচেতনে চেপে রেখেছিল। মায়া নিজের দুটো হাত বাড়িয়ে ইউজির কলারটা খাপ করে ধরে তাকে আরও নিজের দিকে টেনে নিল।
“আপনার ওই পোড়া ছাইয়ের ওপরই আমি আমার ভালোবাসার প্রাসাদ বানাতে চাই, উদয়। আপনি নিজেকে যতই পাথরের মূর্তি ভাবুন না কেন, আমি জানি এই পাথরের ভেতরেও একটা নদী আছে।”

ইউজি মায়ার এই অবাধ্য কিশোরীর মতো জেদ দেখে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল। মায়ার রক্তলাল ঠোঁট দুটো তখন সামান্য আলগা হয়ে ছিল, সেখান থেকে বের হওয়া গরম নিশ্বাস ইউজির পুরো সংযমকে এক নিমিষে পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছিল। ইউজি নিজের একটা হাত মায়ার কোমরে শক্ত করে বসিয়ে দিল। শাড়ির পাতলা কাপড়ের ওপর দিয়ে ইউজির শক্ত, গরম হাতের ছোঁয়া মায়ার সারা শরীরে এক বৈদুতিক তরঙ্গ খেলিয়ে গেল। ইউজি মায়ার কোমরটা ধরে তাকে নিজের শরীরের সাথে একদম লেপ্টে নিল। তাদের মাঝখানে এখন এক সুতোর ব্যবধানও অবশিষ্ট ছিল না।

“তুমি বড্ড একগুঁয়ে, মায়া।” ইউজি মায়ার কানের লতিতে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। তার কন্ঠস্বর একদম বুজে এসেছে। “আমাকে চাওয়ার খেসারত কিন্তু বড্ড ভারী হবে।”

মায়া ইউজির এই আকস্মিক ও তীব্র সান্নিধ্যে চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার সারা শরীর কাঁপছিল। ইউজির ঠোঁট যখন তার কানের লতি বেয়ে ধীর পায়ে তার গলার উন্মুক্ত চামড়ার ওপর নেমে এল, মায়ার মুখ থেকে এক হালকা, অবদমিত আর্তনাদ বেরিয়ে এল। সে ইউজির চুলগুলো নিজের আঙুলের মাঝে শক্ত করে খামচে ধরল।

“হোক খেসারত…” মায়া কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আমি এই খেসারত সারাজীবন ধরে সুদে-আসলে মিটিয়ে দেব। আপনি শুধু একবার… একবার বলুন যে আমি আপনার।”

ইউজি মায়ার গলার নরম, ফর্সা চামড়ায় নিজের ঠোঁট আর দাঁতের এক তীব্র, কড়া আঁচড় বসিয়ে দিল। মায়ার গলার নিচে, কলারবোনের ঠিক ওপরে ইউজির সেই তীব্র সোহাগের ছোঁয়ায় মায়ার পিঠটা ধনুকের মতো বেঁকে গেল। সে ইউজিকে আরও শক্ত করে নিজের দিকে টেনে নিল।

ঠিক সেই মুহূর্তে, ইউজি মায়ার কোমর থেকে হাত সরিয়ে এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড করে বসল। সে মায়ার শাড়ির কুঁচি আর কোমরটা নিজের দুই হাতের ওপর তুলে নিয়ে এক ঝটকায় মায়াকে কোলপাঁজা করে শূন্যে তুলে নিল।

মায়া আঁতকে উঠে ইউজির গলা জড়িয়ে ধরল। তার পায়ের নুপুর দুটো একসাথে ঝনঝন করে ডেকে উঠল। ইউজি মায়াকে কোলে নিয়ে ঘরের মাঝখানের বড় সোফাটার দিকে এগিয়ে গেল। মায়ার লাল শাড়ির ঘেরটা ইউজির শরীরের চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। ইউজি মায়াকে সোফার নরম গদির ওপর আলতো করে শুইয়ে দিল, কিন্তু নিজের শরীরটা মায়ার ওপর থেকে সরাল না। সে মায়ার দুই পাশে নিজের দুই হাত রেখে তার ওপর ঝুঁকে রইল।

মায়া অপলক চোখে ইউজির দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চুলগুলো সোফাময় ছড়িয়ে পড়েছে, কপালে থাকা কালো টিপটা সামান্য একপাশে সরে গেছে। ইউজি নিজের একটা আঙুল দিয়ে মায়ার ঠোঁটের কোণটা আলতো করে ছুঁয়ে দিল।

“আজ আমি চলে যাচ্ছি, মায়া।” ইউজির চোখে এবার আর কোনো কৃত্রিমতা ছিল না, সেখানে ছিল এক গভীর, সত্য আশ্বাস। “কিন্তু আমি তোমাকে এই নুরশাদ সাম্রাজ্যের খাঁচায় একা ফেলে যাচ্ছি না। আমি যাচ্ছি ভাবী আর জাইনাকে তাদের আসল গন্তব্যে পৌঁছে দিতে। যে নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজ আজ তুমি নিজের কাঁধে নিলে, ওটা তোমার পরীক্ষা। তুমি যদি এই সাম্রাজ্যকে জেনিন ভাইয়ের মতোই অজেয় করে রাখতে পারো, তবে ঠিক পাঁচ বছর পর…”

মায়া ইউজির মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল,
“পাঁচ বছর পর কী?”

ইউজি মায়ার কপালে নিজের কপাল ঠেকাল। তাদের চোখের মণি দুটো এক হয়ে গেল।
“পাঁচ বছর পর এই উদয় গালিব নিজে ফিরে আসবে তোমার এই লাল শাড়ির আঁচল ধরতে। সেদিন আর কোনো নীলিমা আমাদের মাঝখানে থাকবে না। সেদিন এই উদয় শুধু মায়ার হবে। তুমি কি পারবে এই পাঁচটা বছর নিজের ওপর সম্পূর্ণ কন্ট্রোল রেখে এই ডন ইমেজটা ধরে রাখতে?”

ইউজির এই কথাটি মায়ার কানে পৌঁছানো মাত্রই তার বুকের ভেতরের সব মেঘ কেটে এক লহমায় এক রোদ্দুরঝরা আকাশের সৃষ্টি হলো। এতক্ষণ যে কান্নাটা সে জেদ দিয়ে চেপে রেখেছিল, এবার তা আনন্দের অশ্রু হয়ে তার দুগাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। ইউজি তাকে প্রত্যাখ্যান করেনি! ইউজি তাকে এক চরম লক্ষ্য দিয়েছে, এক পরম আশার আলো দেখিয়েছে।

“আমি পারব, উদয়! আমি এই পাঁচ বছর পুরো দুনিয়া শাসন করব শুধু আপনার ফিরে আসার অপেক্ষায়। এই ৪জি-র যুগে এসে আমি ইউজি চাইছি বলে কত খেসারত করতে হচ্ছে আমার! ঠিক আছে, আমিও সব সুদে-আসলে মিটিয়ে নেব সেদিন!”

ইউজি শব্দ করে হেসে উঠল। তার সেই চেনা, প্রাণখোলা হাসিটা ঘরের চার দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো। সে মায়ার নাকটা নিজের আঙুল দিয়ে টেনে দিয়ে বলল,
“ডন সাহেবা, এখন তাহলে কোল থেকে নামুন। আমার শার্টের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন।”

মায়া হাসল এবং ইউজিকে আরও একটু নিজের দিকে টানতে চাইল। ঘরের ভেতরের পরিবেশটা তখন এক চরম উষ্ণ আবহাওয়ায় ম ম করছিল। ইউজি আবার মায়ার ঠোঁটের খুব কাছে নিজের মুখটা নিয়ে আসছিল, ঠিক তখনই,
“ধ্যাত! তোমরা এখানে কী করছো?”

একটি অতি পরিচিত, চিকন আর অত্যন্ত অসন্তুষ্ট কণ্ঠস্বর দরজার ওপাশ থেকে ভেসে এল।

ইউজি আর মায়া দুজনেই এক সেকেন্ডের জন্য শকড হয়ে গেল। ইউজি চট করে মায়ার ওপর থেকে সরে সোফার পাশে এসে দাঁড়াল। মায়া দ্রুত উঠে বসে নিজের শাড়ির আঁচল আর চুলগুলো ঠিক করতে লাগল। তার মুখটা লজ্জায় আর অপ্রস্তুত অবস্থায় টকটকে লাল হয়ে উঠেছে।

দরজার নিচে থাকা ছোট্ট ফাঁকা অংশটা দিয়ে দেখা গেল জাইনা বুড়ি নিজের দুটো হাত কোমরে রেখে দাঁড়িয়ে আছে। দরজা লক থাকায় সে ভেতরে ঢুকতে পারছে না, কিন্তু তার তীক্ষ্ণ কান ঠিকই ভেতরের সব আওয়াজ শুনে ফেলেছে।

“মিনিপাপা! তুমি চিটার! তুমি মাম্মামকে বললে তোমার ব্যাগে শার্ট ভরছো, আর এখানে এসে মায়া আন্টির সাথে কুস্তি খেলছো? আমি সব মাম্মামকে বলে দেব!” জাইনা বাইরে থেকে দরজায় ছোট ছোট লাথি মেরে চিৎকার করতে লাগল।

ইউজি নিজের কপালে হাত দিয়ে একটা লম্বা নিশ্বাস ফেলল। মায়া সোফায় বসেই নিজের মুখটা বালিশে লুকিয়ে হাসতে লাগল।

ইউজি ধীর পায়ে গিয়ে দরজার লকটা খুলল। দরজা খুলতেই পাঁচ বছর বয়সী জাইনা নুরশাদ ফ্রক পরে, দুই পাশে দুটো ঝুঁটি নাড়িয়ে হনহন করে ঘরের ভেতর ঢুকল। তার হাতে একটা ছোট খেলনা পিস্তল। সে ইউজির সামনে এসে পিস্তলটা ইউজির পেটে ঠেকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“হ্যান্ডস আপ, মিনিপাপা! তুমি মায়া ফুফুকে কেন সোফায় ফেলে দিয়েছিলে? ফুফু কি ব্যথা পেয়েছে?”

ইউজি হাত দুটো ওপরে তুলে জাইনার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। সে মায়ার দিকে এক নজর তাকিয়ে জাইনার কানটা হালকা টেনে দিয়ে বলল,
“আরে না, প্রিন্সেস! ফুফু শাড়ি পরে হাঁটতে পারছিল না তো, তাই তোমার ফুফুকে একটু হাঁটাহাঁটি শেখাচ্ছিলাম। তোমার পাপা যেমন তোমার মাম্মামকে শেখাতো, ঠিক তেমন।”

জাইনা চোখ দুটো সরু করে মায়ার দিকে তাকাল। মায়া তখন সোফা থেকে নেমে জাইনার কাছে এসে তাকে কোলে তুলে নিল। জাইনার নরম গালে একটা বড় করে চুমু খেয়ে বলল,
“তোমার মিনিপাপা একটা মস্ত বড় চোর, জাইনা মা। ও আমার একটা খুব দামী জিনিস চুরি করে নিয়ে যাচ্ছিল, আমি ওটাই কেড়ে নিচ্ছিলাম।”

জাইনা অবাক হয়ে ইউজির দিকে তাকাল।
“মিনিপাপা! তুমি চোর? তুমি ফুফির কী চুরি করেছো? আমাকে দেখাও!”

ইউজি মায়ার চোখের বিজয়ের আর ভালোবাসার দীপ্তিটার দিকে তাকিয়ে নিজের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে তুলল। সে জাইনার নাকটা টিপে দিয়ে বলল,
“ওটা একটা গোপন ফাইল, প্রিন্সেস। ওটা বড় হলে তুমি নিজেই দেখতে পাবে। এখন চলো, নিচে তোমার মাম্মাম ডাকছে। আমাদের নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজে যেতে হবে।”

জাইনা ইউজির কোল থেকে নেমে ইউজির হাত ধরল। যাওয়ার আগে মায়া ইউজির দিকে তাকিয়ে নিজের শাড়ির আঁচলটা একটু ঠিক করল। ইউজি দরজার কাছে গিয়ে এক মুহূর্ত থামল। সে মায়ার দিকে পেছন ফিরেই খুব নিচু কিন্তু স্পষ্ট স্বরে বলল,
“পাঁচ বছর, মায়া। আমি ফিরে আসবো মায়ার মায়ায়!”

মায়া নিজের বুকের বাম পাশে হাত রাখল। সেখানে এখন আর কোনো হাহাকার নেই, আছে এক নতুন সাম্রাজ্য গড়ার ইস্পাতকঠিন প্রতিজ্ঞা। সে মাথা নাড়ল, যদিও ইউজি তা দেখতে পেল না।

ধীর পায়ে তারা সবাই নিচে নেমে এল। নুরশাদ ভিলার প্রধান ফটকের সামনে তখন নোবারা দাঁড়িয়ে ছিল। তার পরনে সেই গাঢ় কালো রঙের শাড়ি, চোখে সোনালী ফ্রেমের চশমা। সে জাইনা আর ইউজিকে নিচে নামতে দেখে নিজের ঘড়ির দিকে তাকাল।
“অনেক দেরি হয়ে গেল ইউজি। চলো, নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের সবাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আজ আমাদের শেষ দিন।”

ইউজি নোবারার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। সে গাড়ির পেছনের দরজাটা খুলে ধরল। নোবারা আর জাইনা গাড়িতে গিয়ে বসল। ইউজি ড্রাইভিং সিটে বসার আগে শেষবারের মতো নুরশাদ ভিলার বারান্দার দিকে তাকাল। সেখানে রক্তলাল জামদানি শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে নুরশাদ সাম্রাজ্যের নতুন একচ্ছত্র মালকিন..মায়া। তার চোখে আজ কোনো জল ছিল না, ছিল এক অসীম অপেক্ষা আর বিজয়ের গল্প।

গাড়ির ইঞ্জিনটা গর্জে উঠল। নুরশাদ ভিলার চিরচেনা সীমানা পেরিয়ে কালো মার্সিডিজটি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের বিশাল হেড অফিস চত্বরের দিকে, যেখানে হাজার হাজার মানুষ তাদের প্রিয় ম্যাডামকে শেষ বিদায় জানানোর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে!

><><><><><><><><>

নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের বিশালাকার শোরুম আর হেড অফিস চত্বর। আজ এখানে পা রাখার জায়গা নেই যেন! খবরটা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে যে, তাদের ম্যাডাম আজ চিরতরে বিদায় নিচ্ছেন। শুধু কর্মকর্তা রা নয়, কারখানার সাধারণ শ্রমিক, দারোয়ান থেকে শুরু করে ক্লিনার পর্যন্ত সবাই আজ জড়ো হয়েছে প্রধান কার্যালয়ের সামনে। পুরো ইন্ডাস্ট্রি জুড়ে আজ কাজ বন্ধ, অথচ কারো মুখে কোনো অভিযোগ নেই। সবার চোখে কেবল একরাশ বিষাদ।

দুপুর নাগাদ নোবারার গাড়ি যখন গেট দিয়ে ঢুকল, তখন কয়েক হাজার মানুষ একসাথে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। গাড়ি থেকে নামল নোবারা, পাশে ইউজি আর জাইনা বুড়ি। নোবারার পরনে আজ কোনো দামী কর্পোরেট স্যুট নেই, কালো রঙের শাড়ি। জাইনা ইউজির হাত ধরে বড় বড় চোখে চারপাশটা দেখছে। তার হাতে একটি ছোট গোলাপ ফুল।

নোবারা যখন স্টেজের মতো তৈরি করা ছোট ডাইসটার ওপর গিয়ে দাঁড়াল, নিচ থেকে একজন বৃদ্ধ শ্রমিক চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। তিনি জেনিন নুরশাদের সময় থেকে এই কারখানায় আছেন।

“ম্যাডাম, আপনিও আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন? বস যাওয়ার পর আপনিই তো আমাদের আগলে রেখেছিলেন!” বৃদ্ধের বুকফাঁটা আর্তনাদে চারপাশটা গুমোট হয়ে উঠল।

নোবারা মাইক্রোফোনটা হাতে নিল। তার গলা ধরে এল। সে দেখল হাজারো মানুষের ভিড়ে জেনিনের বিশাল পোট্রেটটা ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে। জেনিনকে এই মানুষগুলো কোনোদিন মাফিয়া ডন হিসেবে দেখেনি। তাদের কাছে জেনিন ছিল সেই রক্ষাকর্তা, যে কি না তাদের অভাবের দিনে ত্রাতা হয়ে আসত, তাদের সন্তানদের শিক্ষার ভার নিত।

“আমি আপনাদের কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছি,” নোবারার কণ্ঠস্বর পুরো চত্বরে প্রতিধ্বনিত হলো। “গত পাঁচ বছরে যদি অজান্তে কারো মনে কষ্ট দিয়ে থাকি, তবে আমাকে নিজ গুণে ক্ষমা করবেন। আজ থেকে এই নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের দায়িত্ব আমার বোন মায়ার ওপর রইল। আমি জানি, আমার স্বামী জেনিন নুরশাদ থাকলে আপনাদের যেভাবে আগলে রাখত, সে ও ঠিক সেভাবেই রাখবে।”

ভিড়ের মাঝখান থেকে একজন মধ্যবয়সী নারী এগিয়ে এলেন। তার চোখে জল।
“ম্যাডাম, জেনিন স্যারআমাদের জন্য যা করে গেছেন, তা পৃথিবীর কোনো মাফিয়া করতে পারে না। তিনি ছিলেন আমাদের কাছে এক ফেরেশতার মতো। নিষ্পাপ মানুষের গায়ে তিনি কোনোদিন আঁচড় লাগতে দেননি। আমরা এখনো বিশ্বাস করি না যে তিনি নেই। তিনি আমাদের হৃদয়ে বেঁচে আছেন।”

চারপাশ থেকে জেনিন নুরশাদ অমর হোক ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠল। নোবারা দেখল, জেনিন যা চেয়েছিলেন ঠিক তা-ই হয়েছে। সে ঘৃণা দিয়ে নয়, বরং ভালোবাসা আর নিরাপত্তা দিয়ে এক বিশাল সৈন্যদল তৈরি করে গেছে, যারা আজও তার নামের জয়গান গায়!

ওদিকে জাইনা যখন স্টেজের এক কোণে দাঁড়িয়ে ইউজির হাত ধরে উঁকি দিচ্ছিল, তখন শ্রমিকদের একদল প্রতিনিধি এগিয়ে এল। তাদের সবার হাতে ছোট ছোট প্যাকেট। কারখানার সাধারণ মানুষরা তাদের সামান্য সামর্থ্য দিয়ে জাইনার জন্য উপহার নিয়ে এসেছে। কেউ কাঠের তৈরি খেলনা, কেউবা হাতে বোনা ছোট সোয়েটার, আবার কেউ এনেছে মাটির তৈরি পুতুল।

একটি ছোট মেয়ে, যে হয়তো জাইনারই বয়সী, সে এগিয়ে এসে জাইনার হাতে একটি মাটির ব্যাংক তুলে দিল।
“এটা নাও আপু। এটা আমার জমানো সব খুচরো পয়সা। তোমার জন্য এনেছি,” মেয়েটি লাজুক হাসল।

জাইনা খুব আদরের সাথে মাটির ব্যাংকটি দুই হাতে জড়িয়ে ধরল। সে নোবারার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল, “মাম্মাম, দেখো! সবাই আমাকে কত ভালোবাসে! পাপা কি এদের সবাইকে চিনতো?”

ইউজি নিচু হয়ে জাইনাকে কোলে তুলে নিল। তার নিজের চোখেও আজ জল। “হ্যাঁ মা, পাপা এদের সবাইকে নিজের পরিবারের মতো মনে করতেন।”

জাইনা ভিড়ের দিকে হাত নেড়ে চিৎকার করে বলল, “সবাই ভালো থাকবেন! আমি আবার আসব! তখন সবার সাথে অনেক খেলবো!” তার ওই নিষ্পাপ কণ্ঠে আবার আসব শুনে সবাই কান্নায় ভেঙে পড়ল। মানুষের এই অফুরন্ত ভালোবাসা আজ জেনিন নুরশাদের আভিজাত্যকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেল।

বিদায়ের ঠিক আগ মুহূর্তে নোবারা ডাইস থেকে নেমে সবার মাঝে গিয়ে দাঁড়াল। সাধারণ শ্রমিকরা তার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে চাইল, কিন্তু নোবারা তাদের জড়িয়ে ধরল। জেনিন শিখিয়েছিল, ক্ষমতার দাপট দেখাতে হয় শত্রুর কাছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে হতে হয় মাটির মতো বিনম্র। নোবারা আজ সেই শিক্ষাটাই পালন করছে।

ইন্ডাস্ট্রিজের প্রবীণতম ম্যানেজার নোবারার সামনে এসে দুহাত জোড় করলেন।
“ম্যাডাম, আপনি আমাদের গর্ব। একজন নারী হয়ে যেভাবে এই সাম্রাজ্য রক্ষা করেছেন, তা ইতিহাস মনে রাখবে। দোয়া করি আপনি যেখানেই যান, শান্তিতে থাকেন। জেনিন স্যারের আমানত আপনি খুব সুন্দরভাবে পালন করেছেন।”

সবাই সমস্বরে নোবারার জন্য দোয়া করতে শুরু করল। হাজার হাজার মানুষের তোলা হাত আর তাদের কান্নার শব্দে এক আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি হলো। নোবারা বুঝতে পারল, জেনিন নুরশাদ অপরাধী ছিলেন কি না তা তর্কের বিষয় হতে পারে, কিন্তু তিনি যে একজন মহানুভব মানুষ ছিলেন, তা এই জনসমুদ্রই তার প্রমাণ।

নোবারা যখন শেষবারের মতো জেনিনের পোট্রেটের দিকে তাকাল, তার মনে হলো ছবির সেই গম্ভীর জেনিন যেন আজ তৃপ্তির হাসি হাসছে। সে জেনিনকে মনে মনে বলল, “দেখুন জেনিন, আপনার মানুষেরা আপনাকে আজও কতটা ভালোবাসে। আমি আপনার মান রেখেছি।”

গাড়ি যখন ধীরে ধীরে গেট দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল, মানুষরা দৌড়ে গাড়ির সাথে সাথে আসতে লাগল। ইউজি জানালার কাঁচ নামিয়ে শেষবারের মতো সবাইকে স্যালুট দিল। জাইনা হাত নাড়তে নাড়তে একসময় ক্লান্ত হয়ে নোবারার কোলে মাথা রাখল।
নুরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজ আজ পেছনের পড়ে রইল, পড়ে রইল সেই জৌলুস আর রাজকীয়তা। কিন্তু নোবারা সাথে করে নিয়ে গেল কয়েক হাজার মানুষের দোয়া আর জেনিনের অমর ভালোবাসা। এক জীবনের দীর্ঘ সংগ্রাম আর বিসর্জনের পর নোবারা আজ সত্যি শান্তিতে একটি নতুন দিগন্তের দিকে পা বাড়াল।

<><><><><><><><><>

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ভিআইপি লাউঞ্জ। বাইরের আকাশে মেঘের আনাগোনা, মাঝেমধ্যেই দমকা বাতাস জানান দিচ্ছে এক আসন্ন পরিবর্তনের। নোবারার হাতে কেবল একটি ছোট ট্রলি ব্যাগ আর কাঁধে ঝোলানো ল্যাপটপ ব্যাগ। তার পাশে ইউজি, যার সতর্ক দৃষ্টি আজও চারপাশের প্রতিটি নড়াচড়া মেপে নিচ্ছে। আর সবার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে জাইনা, তার পরনে ছোট্ট একটা কালো রঙের ফ্রক, চোখে কৌতূহল। মা-মেয়ে দুটো আজ কালো রঙের বেশে এসেছে। কারণ তাদের অভিভাবক ও কালো রঙই পছন্দ করতো, এবং আজো হয়তো সে কালো রঙের কোন ওভারকোট পরেই আসবে!

নানামি আর তনুজা এসেছে তাদের বিদায় দিতে, তাকরার আর তাফাশশি কে মায়ার কাছে রেখে। নানামি এখন ইউনিফর্মে নেই, কিন্তু তার ঋজু দেহভঙ্গি আর তীক্ষ্ণ চোখ তাকে ভিড়ের মাঝেও আলাদা করে চিনিয়ে দিচ্ছে। তনুজার চোখে জল থামছেই না। সে বারবার নোবারার হাত জড়িয়ে ধরছে।

“তুমি কি সত্যি চলে যাচ্ছো নোবারা?” তনুজা ফুঁপিয়ে উঠে বলল। “কোথায় যাবে, কীভাবে থাকবে কিছুই তো বললি না। একবার অন্তত বলো, আমরা কি আর কোনোদিন দেখা করতে পারব না?”

নোবারা তনুজার চোখের জল মুছে দিয়ে মৃদু হাসল। এই হাসিতে কোনো বিষাদ নেই, বরং আছে এক অদ্ভুত তৃপ্তি। সে তনুজার কাঁধে হাত রেখে শান্ত গলায় বলল, “আমরা প্যারিসেই যাচ্ছি। মাফিয়া জেড এর চিরচেনা নীড়ে! আশা করি আর কেউ এই কথাটা কেঊ জানবে না, না জানার জন্যই এই পাঁচ বছর ধরে এতো অপেক্ষা করে এসেছি। আজ আমার অপেক্ষার প্রহর শেষ তনু। আমি আজ মুক্ত হবো।”

নানামি এগিয়ে এল। সে নোবারার সামনে এসে এক মুহূর্ত থামল। তারপর পকেট থেকে একটা ছোট খাম বের করে নোবারার হাতে দিল।
“এটা তোমার নতুন আইডেন্টিটি এবং পাসপোর্টের ব্যাকআপ ডকুমেন্টস,” নানামি খুব নিচু স্বরে বলল,
“জানি, ইউজি যখন সাথে আছে, তখন আমার দুশ্চিন্তা কম। তবে মনে রেখো নোবারা, বিপদে পড়লে এই নানামি জায়দান আজও তোমার জন্য তার শেষ রক্তবিন্দু দিতে তৈরি।”

নোবারা নানামির দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতায় মাথা নত করল। “ধন্যবাদ নানামি ভাইয়া। আপনার ঋণ আমি কখনো শোধ করতে পারবো না। তনু আর বাচ্চা দুটোকে দেখে রাখবেন।”

জাইনা তখন নানামির পা জড়িয়ে ধরল।
“হেই চাচ্চু, তুমি কাঁদছো কেন? আমি তো পাপার কাছে যাচ্ছি! ডোন্ট ওরি মাই ডিয়ার, হোয়েন পাই পাপা ইজ হিয়ার!”

নানামি স্বস্তির একটা শ্বাস ফেলে জাইনাকে শেষ বারের মতো কোলে নিল। তনূজাও এসে জাইনাকে আদর করতে লাগলো। মেয়েটা এতো দুষ্টু মিষ্টি যে যে দেখে যেই যেন ভুলতে পারে না। আর এখন কত দূরে চলে যাচ্ছে! তনুজার চোখ বেয়ে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো!

ক্ষণিক পর এনাউন্সমেন্ট হলো। বোর্ডিং শুরু হয়েছে। নোবারা শেষবারের মতো তনুজাকে জড়িয়ে ধরল এবং নানামি নোবারার মাথায় হাত রেখে বড় ভাইসুলভ দোয়া করলো। ইউজি ও ব্যাগগুলো নিয়ে ইমিগ্রেশনের দিকে পা বাড়াল। তনুজা হাত নাড়তে নাড়তে কাঁদতে লাগল। নোবারা জাইনার হাত ধরে ধীর পায়ে কাঁচের গেটটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

ঠিক তখনই ঘটল এক অভাবনীয় ঘটনা। ভিড়ের মাঝখান থেকে লম্বা চওড়া এক ব্যক্তি ধীর পায়ে নোবারার দিকে এগিয়ে এল। লোকটির পরনে কুচকুচে কালো ওভারকোট, মুখে একটি কালো মাস্ক যা তার নাকের ওপর পর্যন্ত ঢাকা। তার চোখে সোনালী ফ্রেমের সাদা কাঁচের একটি চশমা, যার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক জোড়া তীক্ষ্ণ, কুচকুচে কালো মণি। সেই চোখের চাউনিতে এমন এক সম্মোহনী তেজ আর অমোঘ অধিকারবোধ ছিল যে, তার পাশ দিয়ে যাওয়া মানুষগুলো অজান্তেই তাকে জায়গা করে দিচ্ছিল।

লোকটি নোবারার ঠিক পেছনে এসে দাঁড়াল। নোবারা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, তার সারা শরীর যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো। সে পেছন ফিরে তাকানোর আগেই রহস্যময় লোকটা খুব সাবলীলভাবে নোবারার ঘাড় জড়িয়ে ধরল। যেন কত জন্ম-জন্মান্তরের চেনা এক অধিকার! নোবারা আঁতকে উঠল না, চিৎকার করল না; বরং সে তার চোখ দুটো বন্ধ করে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার সারা মুখে এক স্বর্গীয় প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ল।

“বড্ড বেশি দেরি করে ফেললেন…পাঁচটা বছর, চার মাস, তেরো দিন… হিসাবটা আজ রাতে কড়ায়-গণ্ডায় বুঝিয়ে দিতে হবে, মিস্টার নুরশাদ।” নোবারা খুব নিচু, অভিমানী অথচ পরম তৃপ্তির সুরে ফিসফিস করে বলল।

লোকটি মাস্কের আড়াল থেকেই একটু হাসল। তার চেনা চোখের মণি দুটো নোবারার চোখের দিকে স্থির হলো। সে নোবারার কানের কাছে মুখ এনে গভীর, গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিল,
“সিংহের খাঁচা ভাঙতে একটু সময় লাগে মিসেস নুরশাদ। তাছাড়া, আমার নূরা আমার সাম্রাজ্যটা কতটা নিখুঁতভাবে সামলাতে পারে…সেটার শেষ পরীক্ষাটাও তো নিতে হতো, তাই না?”

লোকটার এই গম্ভীর কণ্ঠস্বর আর নিজের নামটা তার মুখে শোনামাত্রই নোবারার ভেতরের সমস্ত শক্ত বাঁধ এক নিমেষে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল…এই কান্না কোনো যন্ত্রণার নয়, এ যেন এক যুগান্তকারী মুক্তির আনন্দাশ্রু। সে চট করে ঘুরে তার ভেজা মুখটা লোকটার চওড়া বুকের ওপর সজোরে চেপে ধরল। বিমানবন্দরে শত শত মানুষের উপস্থিতি, চারপাশের কোলাহল..সবকিছু এক মুহূর্তে নোবারার কাছে অর্থহীন হয়ে গেল। তার পাঁচ বছরের একাকীত্ব, রাত জেগে কাঁদা, আর লোকটার স্মৃতির সাথে লড়াই করার সব অভিমান আজ তার বুকের ভেতর আছড়ে পড়ল। সে লোকটার কোটটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রুদ্ধশ্বাসে বলল,
“আর কোনোদিন… আর কোনোদিন আমাকে এভাবে ফেলে যাওয়ার দুঃসাহস দেখাবেন না। আমি আপনাকে ছাড়া আর একটা শ্বাসও নিতে চাই না!”

লোকটি পরম আদরে নোবারার পিঠে নিজের শক্ত হাতটি রাখল। তার হাতের ছোঁয়া নোবারাকে জানান দিচ্ছিল, সে আর একা নয়, তার প্রাণভোমরা ফিরে এসেছে।

ইউজি পাশে দাঁড়িয়ে তখনো স্যালুট পজিশনে। তার ঠোঁটের কোণে পাঁচ বছর পর আবার ফিরে এসেছে সেই চেনা, দুর্ধর্ষ চওড়া হাসি। লোকটি ইউজির দিকে তাকিয়ে তার চোখের চশমাটা আলতো করে ঠিক করল। তারপর বাড়িয়ে দিল তার অন্য হাতটি। ইউজির মাথায় হালকা করে একটা টোকা মেরে নিচু স্বরে বলল,
“প্রাউড অফ ইউ, মাই ম্যান। আমার আমানত খুব সুন্দরভাবে রক্ষা করেছো। এবার তোমার ছুটি।”

ইউজির ঠোঁটের কোণে পাঁচ বছর পর এক চওড়া, বুকহালকা করা হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে মাথা নেড়ে বলল, “আজ থেকে এই পরিবার আবার সম্পূর্ণ হলো। তবে জাইনা মা’র উপর আমার অধিকার ঠিক আগের মতো থাকবে, এটা বলে রাখলাম!”

ইউজি জাইনার হাত থেকে মাটির ব্যাংক আর ট্রলি ব্যাগগুলো নিজের হাতে তুলে নিয়ে বোর্ডিং ব্রিজের দিকে এক কদম এগিয়ে গেল। সে খুব ভালো করেই জানে, জাইনার উপর তার অধিকার ভালোবাসা সব আগের মতোই থাকবে। তবে আগে থেকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া ভালো!

লোকটি নিচু হয়ে এবার জাইনাকে এক হাত দিয়ে কোলে তুলে নিল। জাইনা লোকটার মাস্ক পরা মুখটা ছুঁয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল, যেন সে তার হারিয়ে যাওয়া সবচাইতে প্রিয় খেলনাটি ফিরে পেয়েছে! জাইনা রীতিমতো লোকটার চশমাটা টেনে খোলার বায়না ধরল। লোকটি আলতো করে নিজের মাস্কটা একটু নামিয়ে জাইনার নরম গালে একটা কামড় দিতেই জাইনা খিলখিল করে হেসে উঠে লোকটার গলা জড়িয়ে ধরল।

নোবারার চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল, কিন্তু তার ঠোঁটে তখন এক পরম তৃপ্তির হাসি। পাঁচ বছরের প্রতিটি সেকেন্ডের অপেক্ষা, প্রতিটি বিনিদ্র রাতের হাহাকার আজ এই একটি ছোঁয়ায়, এই একটি চেনা কণ্ঠস্বরে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে লোকটার কালো ওভারকোটের হাতাটা খপ করে চেপে ধরল, যেন আর কোনোদিন, কোনো জন্মেই সে এই হাত হাতছাড়া করবে না।

জাইনা এবার লোকটাকে বললো,
“হেই ব্ল্যাক কোট ম্যান! তুমি কি জানো, আমার পাপা বলেছে সে আজ মেঘের ওপর থেকে নেমে আমাদের সাথে প্যারিস যাবে? তুমিও কি যাবে আমাদের সাথে?”

লোকটি মাস্কের আড়াল থেকেই জাইনার তুলতুলে গালে নিজের নাকটা ঘষে দিল। তার চোখের চশমাটা জাইনার কপালে আলতো করে ছোঁয়াতেই জাইনা খিলখিল করে হেসে উঠল। লোকটি জাইনার কানে কানে খুব নরম গলায় বলল,
“ইয়াহ প্রিন্সেস… তোমার পাপা আজ থেকেই সবসময় তোমার আর তোমার মাম্মামের হাত ধরে থাকবে। আর কোনোদিন মেঘের ওপারে ফিরে যাবে না।”

দূর থেকে নানামি আর তনুজা স্তম্ভিত হয়ে এই দৃশ্য দেখছিল। তনুজা তখনো অবিশ্বাসে নিজের মুখে হাত দিয়ে কাঁদছে, কিন্তু নানামির চোখে আজ কোনো বিস্ময় নেই, কোনো হাহাকার নেই। সে শুধু শান্ত চোখে তাকিয়ে রইল চেনা অবয়বটার দিকে।

ঠিক তখনই, ইমিগ্রেশনের শেষ কাঁচের দরজাটা পার হওয়ার আগে, কালো ওভারকোট পরা লোকটি এক মুহূর্তের জন্য থামল। সে নোবারাকে নিয়ে আলতো করে পেছন ফিরল। লাউঞ্জের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা নানামির দিকে সরাসরি তাকাল সে। লোকটি তার ডান হাতটা মাস্কের ওপর দিয়ে কপালে ঠেকিয়ে নানামিকে স্যালুট দিল। বিকেলের সোনাঝরা শেষ আলোটা তখন কাঁচের দেয়াল চিরে এসে লোকটির চোখের সেই সোনালী ফ্রেমের চশমার ওপর আছড়ে পড়ল।

নানামির ঠোঁটের কোণে তখন এক চিলতে রহস্যময়, তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে নিজের ইউনিফর্ম পরা হাতটা ধীর পায়ে কপালে তুলল এবং ইমিগ্রেশনের ওপারে থাকা লোকটাকে পাল্টা স্যালুট দিল। নানামি খুব নিচু স্বরে, কেবল নিজের আত্মার সাথে কথা বলার মতো করে বিড়বিড় করে বলল,
“আমি কী করে পারতাম আমার আত্মার অংশকে ফাঁসিতে ঝুলাতে! তাকে রক্ষা করতে আমি না হয় এই কলুষিত দুনিয়ার চোখে দেশদ্রোহীই হলাম!”
—————————-
আজ থেকে বহু বছর আগে, সেন্ট জুড হাই স্কুলের সবুজ চত্বরে এই গল্পটার শুরু হয়েছিল। দুই মেরুর, দুই ভিন্ন মানসিকতার দুই কিশোর, নানামি জায়দান এবং জেনিন নুরশাদ। একজন আইনের রক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখত, অন্যজন নিজের নিয়মে দুনিয়া শাসন করার জেদ পুষত। কিন্তু তাদের বৈপরীত্যের মাঝেও তারা ছিল বেস্ট ফ্রেন্ড, একে অপরের সোলমেট। নিয়তি তাদের বাধ্য করেছিল দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে বন্দুকের নল তাক করতে। একজন হয়ে উঠেছিল পুলিস অফিসার, অন্যজন মাফিয়া কিং। না চাইতেও তারা একে অপরের চরম শত্রু হয়ে উঠেছিল, জন্ম দিয়েছিল এক রক্তাক্ত ইতিহাসের। নাম হয়েছিল, সোলমেট টু এনিমি!

কিন্তু আজ এই শেষ যাত্রায়, সমস্ত হিসাব-নিকাশ যেন এক অলৌকিক নিয়মে উল্টে গেল। আইনের গণ্ডি, মাফিয়ার সাম্রাজ্য, আর রক্তের প্রতিশোধের দেয়ালগুলো ভেঙে তারা আবার পুরনো সোলমেট হয়ে গেল, হয়তো তারা সোলমেটই ছিল সবসময়। মাঝখানে নোবারা নামের যে মেয়েটি একসময় তাদের বন্ধুত্বের মাঝে এক অদৃশ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিল, আজ সেই নোবারাই তাদের আবার এক সুতোয় বেঁধে দেওয়ার সেতু বন্ধন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কিছুক্ষণ পর বিশাল বোয়িং বিমানটি এক প্রলয়ংকারী গর্জন করে রানওয়ে ছাড়ল। মেঘের বুক চিরে সেটি ডানা মেলে দিল নীল আকাশের অসীমতায়।

নানামি আর তনুজা নিচে দাঁড়িয়ে রইল, তাদের চোখের সামনে দিয়ে মেঘের আড়ালে হারিয়ে গেল জেনিন নুরশাদের শেষ জাগতিক চিহ্নটুকু।

কিন্তু এই পৃথিবীর সাধারণ মানুষ আর রাষ্ট্রের ফাইলগুলো কোনোদিন জানল না, কে ছিল সেই ভিআইপি লাউঞ্জের কালো ওভারকোট পরা ব্যক্তিটি? সোনালী ফ্রেমের চশমার আড়ালে থাকা সেই কুচকুচে কালো চোখ দুটো কার? কেনই বা রাষ্ট্রের জাঁদরেল ডিআইজি নানামি জায়দান একজন দাগী আসামির অন্তর্ধান দেখেও ঠোঁটের কোণে বিজয়ের হাসি হাসল?

ইতিহাসের পাতায় জেনিন নুরশাদ হয়তো এক মৃত অপরাধী হয়েই থেকে যাবে, কিন্তু সত্যের আকাশে সে এক মুক্ত ফিনিক্স পাখি, যে নিজের শেষ থেকেও নতুন এক রূপকথার জন্ম দিতে জানে। পৃথিবীর মানুষ আজও খবরের কাগজে পড়বে মাফিয়া জেডের পতনের গল্প, কিন্তু তারা কোনোদিন জানবে না, ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ জাদুকর তার নিজস্ব রূপকথা নিয়ে কোন দূর দিগন্তে তার নতুন সাম্রাজ্য গড়তে চলে গিয়েছে!

________সমাপ্ত_________

আমার প্রিয় পাঠকবিচ্ছু্রা ,

এই Soulmate To Enemy গল্পের জনরাই হলো, অ্যাকশন থ্রিলার। আর একটা থ্রিলার গল্পের সমাপ্তি ঠিক এমনই হওয়া উচিত বলে মনে করি আমি। অর্থাৎ আক্ষরিক অর্থেই গল্পের শেষ এখানেই। কিন্তু গল্পটা রানিং থাকা অবস্থায় আপনাদের মন্তব্য পড়ে আমি বুঝতে পেরছি, এই গল্প নিয়ে আপনাদের বারবার অনেক প্রশ্ন ছিল। অর্থাৎ আমার থ্রিলার লেখা সফল। এখন নিশ্চয়ই এই ছায়ামানব এর রহস্যটাও জানতে মন চাইছে? আমি এই রহস্য সমাধান করতে আরো দুটো পর্ব বাড়াতে পারি, কিন্তু কার জন্য বাড়াবো? আপনাদের জন্যই তো? তবে আমার একটা দাবি আছে। গল্প লেখার মানসিকতার জন্য পেইজের রিচ বড্ড কাজে দেয়। আপনারা যদি পেইজ রেকমেন্ড করেন, অর্থাৎ রেকমেন্ডেশন অপশনে যদি ৩০+ রিভিউ হয়(গল্পটা রানিং ১০০+ পড়ছেন), তবেই আমি ছায়ামানব অর্থাৎ জেনিন নুরশাদ এর মৃত্যু থেকে জীবিত অবস্থায় ফিরে আসার রহস্য উন্মোচন করবো এবং উদয়-মায়ার পরিণতি লিখবো। আশা করি আমার এই দাবি মোটেও অনুচিত লাগবে না আপনাদের।

এই গল্পটি সফল করার পেছনে সবচাইতে বড় অবদান আপনাদের। আপনাদের প্রতিটি মন্তব্য, উৎসাহ আর ভালোবাসাই আমাকে এত দূর নিয়ে এসেছে। জেনিন আর নোবারার এই চিরন্তন প্রেম কাহিনী আপনাদের হৃদয়ে এক টুকরো জায়গা করে নিতে পারলেই আমার সার্থকতা। রহস্য উদঘাটন পর্ব দেওয়া সম্পূর্ণ আপনাদের হাতেই। এতদিন পাশে থাকার জন্য অসংখ্য শুকরিয়া ও ভালোবাসা।

—মিফতাহুল জান্নাত জেমিম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here