কাছে_আসার_মৌসুম! #নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি (৫০_খ)

0
2

#কাছে_আসার_মৌসুম!
#নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি
(৫০_খ)

“ একা রাত,বাঁকা চাঁদ,
লাগে না ভালো যে আর,
নেই রোদ, নেই রং
জানি নেই কিছুই করার!
পড়ছে মনে,মুখের আদল,
ভাঙে বুক,ভাঙছে পাহাড়…..
মন মাঝিরে,বল না কোথায়!
মন মাঝিরে,আয় ফিরে আয়…
আয় ফিরে আয়…

অদূরের কোনো বাড়িতে ফুল ভলিউমে কেউ একজন গান শুনছিল। রাতের সুনসান হাওয়ায় ভেসে ভেসে কথাগুলো পৌঁছে গেল সার্থর বারান্দা অবধি। এই রাত বারোটা বাজে নয়নতারা গাছের মরা পাতা,মরা ফুল কাঁচি দিয়ে ছাটতে বসেছে সে মানুষ । অথচ কাজের মধ্যে সামান্য একটু মনোযোগ যদি থাকতো! যতবার সার্থ গাছের পাতার দিকে তাকায়,কোনো না কোনোভাবে তুশির হাত অয়নের হাতে, দৃশ্যটা ধুপধাপ করে ভেসে ওঠে চোখে।
শেষ মূহুর্তে যখনই তুশির ওই মুখ ফিরিয়ে নেয়া মনে পড়ল, ঝট করে ক্ষুব্ধ হাতে ফুলের টব শেল্ফ থেকে ঠেলে ফেলে দিলো সার্থ। সেই কফি মগের মতো অবলা এই বস্তুটাও এবার স্বীকার হলো বলির! মাটির সাথে সাথে টবের টুকরোগুলো ভেঙে ছড়াল চারিপাশে।
তক্ষুনি দরজায় খটখট শব্দ হয়। কেউ এসেছে। সার্থ চোখ বুজে নিজের হিঁসহিঁসে শ্বাসের গতি কমাল। বলল চিল্লিয়ে,
“ কাম ইন!”
সেকেন্ড দুয়েকে নরম পায়ে এসে দাঁড়াল আইরিন। অথচ মুখের হাসি উবে গেল বারান্দার মেঝেটা দেখে। আর্তনাদ করে বলল,
“ এ বাবা,টবটা ভেঙে গেল দেখি। তোমার লাগেনি তো?”
সার্থ আগুন চোখে এমন ভাবে চাইল, তড়িঘড়ি করে কথাটা শুধরে ফেলল সে। মিনমিন করে বলল,
“ মানে আপনার লাগেনি তো!”
সার্থ উঠে আসে। ওর পাশ কাটিয়ে চুপচাপ ঘরে ঢুকে যায়। বেসিনে হাত ধোয়ার মাঝেই আইরিন সেখানে গিয়ে দাঁড়াল। নিজেই উদ্বেগ নিয়ে বলল,
“ মাম্মাম তখন নিচে যা বলল আপনি তো শোনেননি। তাই ভাবলাম আপনাকে একবার জানিয়ে যাই।”
সার্থর দরাজ কণ্ঠ রুক্ষতার সীমা পেরিয়ে গেল উত্তরে,
“ আমি তোমার কাছে জানতে চেয়েছি?”
“ না, আসলে, ভাবলাম ব্যাপারটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমরা তো কাল আমাদের বাসায় ফিরে যাব। বৃহস্পতিবার পাপা ইভেন্ট রেখেছেন। বললেন সেখানে বিয়ের এনাউন্সমেন্ট হবে!”
“ তো?”
সার্থ এমন ভাবে তাকাচ্ছে,এমন তেজি তার কণ্ঠ আইরিন নিজেই ভুলে গেল ও আর কী কী বলতে এসেছে! নার্ভাস হয়ে পড়ল মেয়েটা।
জিভে ঠোঁট চুবিয়ে বলল,
“ কিছু না।”
সার্থ মুখের ওপর বলে দেয়,
“ দেন ইউ’ল গো নাউ।”
ঝুঁপ করে আইরিনের মনটা খারাপ হলো খুব। বিমর্ষ কণ্ঠে বলল,
“ আপনি সব সময় আমার সাথে এত রুড কেন সার্থ ভাই ! এখন তো আমাদের বিয়ের কথাবার্তা হচ্ছে,এখন অন্তত একটু নরম হন! অয়ন ভাই কেমন সারাক্ষণ তুশির আগে-পিছে ঘুরঘুর করে দেখেছেন!”
দিয়েছে সার্থর রাগের মশাল জ্বেলে। তুরন্ত দাঁত কপাটি পিষে, রক্তিম চোখে ফিরল সে।
আইরিন বলেই গেল,
“ তাও তো আমি তুশির চেয়ে কত কোয়ালিটিফুল। পড়াশোনা জানি, স্মার্ট! কিন্তু তুশি তো একটা বস্তি! ও আমার….”
সার্থ গর্জে উঠল অমনি,
“ আইরিন, আর একটা বললে তোমার অবস্থাও ওই ফ্লাওয়ার ভাসটার মতো হবে। তুমি তাই চাও?”
আইরিন হতবুদ্ধি হয়ে গেল। এর মানে কী? বারান্দার ওই ফুলের টবটা যেমন ভেঙে টুকরো হয়ে আছে, ওকে অমন টুকরো করে ফেলবে!
তার প্রকট চোখে চেয়ে সার্থ ভণিতাহীন বলে যায়,
“ আমি মেয়েদের গায়ে হাত দেয়া পছন্দ করি না। নাহলে এক্ষুনি তোমাকে গলা ধাক্কা দিয়ে রুম থেকে বের করে দিতাম। তুশিকে নিয়ে ফার্দার তোমার মুখে যেন আর একটাও বাজে কথা আমি না শুনি! ক্লিয়ার? গেট লস্ট নাউ।”
আইরিনের চোখে জল চলে এলো। ভেজা কণ্ঠে বলল,
“ তুশিকে কিছু বললে আপনি এখনো নিতে পারেন না? কেন,আর আমার প্রতি আপনার…. “
কথার মাঝেই চ্যাঁচিয়ে উঠল সার্থ,
“ আই সেইড গো….”
ভারি ওই হুঙ্কারে কেঁপে উঠল সে। এর পর আর এক মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার সাহসে কূলালো না। ত্রস্ত ছুটে বেরিয়ে গেল আইরিন।
অমনি সামনে পড়ল ইউশা। প্রথমে আইরিনকে দেখে একটু ভ্যাবাচেকা খেলেও পরপর খেয়াল করল ও সার্থর ঘর থেকে বেরিয়েছে।
আইরিন থামেনি। এক দৌড়ে নিজের ঘরের পথে ছুটল। কিন্তু কপাল কুঁচকে চেয়েই রইল ইউশা। আইরিন আপু কাঁদছিল না? তাও মেজো ভাইয়ার ঘর থেকে এসে! ব্যাপারটা কী?

বড়ো বড়ো লাগেজগুলো টেনেটুনে ড্রাইভার গাড়িতে তোলার জন্যে নিয়ে যাচ্ছেন। একটু বাদেই বের হবেন নাসীররা। সবাই তৈরি, বিদেয় দিতে ঘরের প্রত্যেকেই আছেন এখানে। নাস্তা শেষে সোফাসেট ভরতি করে চা নিয়ে বসেছেন সকলে। সার্থ থানায় যাবে বিকেলের পর। কিন্তু যেহেতু ফুপিরা চলে যাচ্ছে তাই ভদ্রতার খাতিরে ঘরে না গিয়ে বসে রইল এখানে। অথচ এই এতটুকু চার কোণা জায়গায় দফায় দফায় চোখা-চোখা চলল। অয়ন,তুশি,ইউশা,আইরিন আর সার্থ…. তাদের নির্বাধ চোখাচোখির ভিড়ে কারো দৃষ্টিতে প্রেম,কারো ক্ষোভ আর কারো হাহাকারে চুবানো নয়নতারায় এক বুক জ্বালা!
এর মাঝেই ডোরবেল বাজল। দরজা খুলতেই হইহই করে ভেতরে এলো জামিল। প্রফুল্ল স্বরে বলল,
“ হ্যালো এভ্রিওয়ান, কেমন আছেন আপনারা? ”
তনিমা বললেন,
“ আরে জামিল,তোমার তো খবরই পাওয়া যাচ্ছিল না। কী অবস্থা, কেমন আছো?”
“ ভালো নেই আন্টি। আসলে আমার একটা পাঠা হারিয়ে গেছে। খুব খুঁজছি ওটাকে। সাইন্স বলল, আপনাদের বাড়িতেই যেহেতু পুলিশ আছে, একটা জিডি করে যাওয়া দরকার।”
বিভ্রান্ত চোখে চাইল সকলে। ব্যাপারটা পরিষ্কার করে কেউই তেমন বোঝেনি। অয়ন কপাল কুঁচকে বলল,
“ পাঠা! আপনি তো সেদিন এলেন ভাইয়া,এর মধ্যে কি পশুপাখিও কেনা শুরু করে দিয়েছেন?”

“ আরে না না, ওটা আসলে খুব নতুন প্রজাতির পাঠা। বেশ হৃষ্টপুষ্ট, গায়ে অনেক শক্তি। দেখতেও সুন্দর। তাই না সার্থ?”
সার্থ নাক ফুলিয়ে চেয়ে রইল।
জামিল ঠোঁট চেপে হাসতে হাসতে গিয়ে পাশে বসল ওর। ছেলেটাকে দেখেই তনিমা চায়ের সাথে পুডিং আর ব্রেড এনে দিলেন। জামিল মুখে তুলতে তুলতে বলল,
“ এ বাড়িতে নাকি জোড়া বিয়ের আয়োজন চলছে! আমাকে তো কেউ ইনভাইট করলেন না আঙ্কেল।”
শওকত হেসে বললেন,
“ ওমা,তুমি কি আমাদের পর নাকি! তুমি তো এ বাড়িরই ছেলে। তোমার বন্ধুর বিয়ে,তোমার ছোটো ভাইয়ের বিয়ে, সব কাজ তো তোমাকেই সামলাতে হবে বাবা। তাছাড়া ডেট তো ফিক্সড করিনি। আগে এনগেজমেন্ট হোক,তারপর।”
জামিল ঘাড় নেড়ে হাসল। তারপর তাকাল রোকসানার দিকে। প্রশংসার ঝুরি মেলে বলল,
“ আরে বাহ আন্টি… আপনাকে তো ভারি সুন্দর লাগছে। দেখলে কিন্তু মনেই হয় না আপনার একটা মেয়েও আছে।”
রোকসানা ভারি লজ্জা পেলেন,গদগদ হয়ে বললেন,
“ কী যে বলো না! অবশ্য, এটা আমাকে অনেকেই বলে।”
পরপরই মুখ কালো করে ফেললেন তিনি। বিরক্ত গলায় বললেন,
“ আমি তো এজন্যেই তোমার আঙ্কেলের বাসায় যেতে চাই না। এই বিয়ের ব্যাপার না এলে এখান থেকেই সোজা ডেনমার্কে চলে যেতাম। ওখানে গেলে আমার শাশুড়ী, ননাশ উফ ওদের জন্যে সারাক্ষণ শাড়ি টাড়ি পরে বুড়ি সেজে থাকতে হয়। তখন বয়স অর্ধেক বেড়ে যায় আমার। এখন তো আবার চুল কেটেছি,এ নিয়ে কতক্ষণ বক্তৃতা শুনব কে জানে! খুব বিরক্তিকর!”
কথাটা সবাই শুনল,কেউ কেউ হাসল ঠোঁট টিপে,কিন্তু টু শব্দও হলো না।
তবে জয়নব মৃদূ স্বরে ধমকে বললেন,
“ আহ,থামো। শ্বশুর বাড়ি নিয়ে এভাবে বলতে আছে? গুরুজনরা যা বলে,খারাপের জন্যে বলে না।”
আইরিন আড়চোখে তুশিকে দেখছিল। মেয়েটার কালো মুখ তার ঠোঁটের হাসি বাড়িয়ে দেয়ার কারণ।
হঠাৎ-ই আগ বাড়িয়ে বলল,
“ তুশি,তুমি কিন্তু পার্টিতে এসো। তুমি না এলে আমার খুব খারাপ লাগবে।”
তুশি চুপ। ওর কথা বলতে ভালো লাগছে না।
ইউশা বলল,
“ বাড়ির সবাই যখন যাবে, তখন কি তুশি একা ঘরে বসে থাকবে আপু? ওকে নিয়েইত যাব।”
জয়নব অবাক হয়ে বললেন,
“ বাবাহ,তুমি আমার কবে থেকে তুশিকে নিয়ে ভাবতে শুরু করলে আইরিন? আমার হিসেব মতে ও না গেলেই তুমি সবথেকে বেশি খুশি হবে।”
মেয়েটা গলা ঝেরে প্রসঙ্গ কাটাতে বলল,
“ মাম্মাম তুমি এমন হুট করে পার্টিটা থ্রো করলে না, আমি বেশ ঝামেলায় পড়ে গিয়েছি। এখন এই তিনদিনের মধ্যে স্পা,ফেসিয়াল থেকে শুরু করে কত্ত কী করতে হবে বলো তো। ”
“ বেশ তো কিউটি,আজই চলে যাও। বললে একটা এপোয়েন্টমেন্ট নিয়ে রাখি?”
রেহণুমা এসে তুশির পাশে দাঁড়ালেন। চুলে হাত বুলিয়ে বললেন,
“ তুইও একটু পার্লারে যাবি নাকি তুশি? তোরও তো মুখচোখের অবস্থা ভালো দেখাচ্ছে না। একটু ফ্রেশ লাগতো তাহলে।”
মেয়েটা বিরস গলায় বলল,
“ না মা,আমার ইচ্ছে নেই।”
জামিল বলল,
“ আন্টি সাইন্স তো বলছে , এ বাড়িতে মুখচোখ অনেকেরই ঠিক নেই। এইত ইউশা,কী ব্যাপার তোমার চোখের নিচে এক গাদা কালি কোত্থেকে এলো? কিছু নিয়ে টেন্সড?”
সবার মধ্যে হুট করে বলায় মেয়েটা একটু নড়েচড়ে তাকাল।
আমতা-আমতা করে বলল,
“ আসলে ঐ…”
তুশি কথা কেড়ে নেয়। দুম করে বলে দেয়,
“ ওর সামনে পরীক্ষা না,সেজন্যে চিন্তায় ঘুমই হয় না। রাত জেগে জেগে মাথা ঝুলিয়ে পড়ে। দেখুন,চোখের সাথে সাথে মুখটাও কেমন শুকিয়ে গেছে দেখুন।”
কটমটিয়ে বলতে বলতে ইউশার দুগাল চেপে, জামিলের দিকে ঘুরিয়ে ধরল তুশি।
ব্যথায় ইউশার মাড়ির হাড় ক্ষয়ে পড়ল বোধ হয়। তুশি গালটা ছাড়ল ঠিক ছুড়ে ফেলার মতো। মেয়েটা যে ওর ওপর কীসের রাগ ঝারছে বেশ বুঝল ইউশা। কিচ্ছুটি না বলে অসহায়ের মতো ঠোঁট উলটে বসে রইল বেচারি। জয়নব বললেন
“ তাহলে তুশির সাথে ইউশাও যা, চেহারায় একটু পলিশ করে আয়। তোর দুই ভাই আর এক মাত্র বোনের বিয়ে,তোকেই তো সব থেকে বেশি সেজেগুজে থাকতে হবে।”
ইউশা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসল। এবারেও কিছু বলল না!
আইরিন স্ফূর্ত কণ্ঠে বলল,
“ আচ্ছা, পার্টির থিম কিন্তু ব্ল্যাক। তাই সবাই কালো পরবে কেমন! শুধু আমি আর সার্থ ভাই হোয়াইট পরব। আমাদের জন্যেই পার্টিটা রাখা হচ্ছে তো। আমরাই শো-স টপার। তুশি, তুমিও কিন্তু কালো কিছু পরে এসো।”
সাথে ফের পৈশাচিক আনন্দে ঠোঁট চেপে হাসল সে।
উত্তরে তুশি নিজেও হাসল। স্পষ্ট গলায় বলল,
“ তুমি আমাকে নিয়ে এত ভেবো না। আমি খুব সেজেগুজেই যাব। তুমি বরং এখন শুধু তোমাদের নিয়ে ভাবো। ” তারপর
মায়ের দিক ফিরে বলল,
“ আমি পার্টিতে কী পরে যাব মা? আমার তো কোনো ভালো জামা কেনা হয়নি।”
সার্থর মেজাজ অমনি খারাপ হয়ে গেল। ওর বিয়ের এনাউন্সমেন্ট হবে যেখানে,সেখানে এই চোর নাকি সেজেগুজে যাবে!
রেহণুমার আগেই কথা কেড়ে নিলো আইরিন। টেনে টেনে বলল,
“ ওমা কেন তুশি,ইউশার আছে তো। ওর পুরোনো জামাগুলো থেকে একটা নিলেই পারো। আই থিংক তোমার কাছে ওগুলো স্টিল নতুনই লাগবে।”
হঠাৎ ওর চোখ পড়ল সার্থর দিকে। লাল, খ্যাপাটে চাউনিতেই ভয়ে শুকিয়ে গেল মুখটা।গত রাতের ঐ হুমকির কথা মনে পড়তেই থতমত খেয়ে বলল,
“ না মানে আমি সেভাবে কিছু বলিনি।”
তবে ভারি চটে গেল অয়ন। রেগে রেগে বলল,
“ আইরিন, প্রথমত বোনের জামাকাপড় পরলে কেউ ছোটো হয়ে যায় না। আর দ্বিতীয়ত,তুশির বাবা- চাচা আর ওর উড বি হাজবেন্ডের এতটুকু সামর্থ্য নিশ্চয়ই আছে যাতে তোমাদের পার্টিতে পরার মত কাপড় ওকে কিনে দিতে পারবে।”
আইরিন উত্তর দিতে যাচ্ছিলই, রোকসানা চোখের ইশারায় থামালেন। সবার মাঝেই অয়ন তুশিকে বলল,
“ তুশি যাও,তৈরি হও। আমরা এক্ষুনি শপিং-এ বেরোব।”
তুশি না করতে গিয়েও থামে। ঠোঁট টিপে ভাবে কিছু একটা। পরপরই স্ফূর্ত গলায় বলে,
“ আচ্ছা,যাচ্ছি।
তাহলে ইউশা, তুমিও আমাদের সাথে চলো।”
মেয়েটা তাজ্জব বনে তাকাল। সজোরে মাথা নেড়ে বলল,
“ না না। তোমাদের মাঝে আমি কেন?”
“ এ আবার কী কথা? তোমারও তো কেনাকাটার দরকার। চলো সবাই মিলে যাই,বেশ মজা হবে।”
“ আমি যাব না তুশি।”
রেহণূমা বললেন,
“ যা না,ভালো লাগবে।”
“ না মা,আমি যাব না।”
কিন্তু এসব আপত্তি তুশি শুনলই না। একেবারে জবরদস্তি ওর হাত টেনেটুনে হাঁটা ধরল ঘরে। মেয়েটার মুখের টইটম্বুর হাসি সার্থর মাথায় ফের ক্রোধ চড়িয়ে দেয়। অয়নের সাথে শপিং-এ যাবে,হাসি ধরছে না! তার ঐ ক্ষিপ্ত চাউনির মাঝেই,খাবার চিবোতে চিবোতে গুনগুন করল জামিল,
“ ভাই যখন বউ লইয়া
আমার চোখের সামনে দিয়া,
শপিং করতে যাইতে চায়,
ফাইট্টা যায়, ওরে বুকটা ফাইট্টা যায়!”
সার্থ জ্বলন্ত চোখে চাইতেই সাফাই দিলো হড়বড়িয়ে,
“ আরে, মাই ফেভ্রেট সং ইয়ার। আমার বাবার বিয়েতে শুনেছিলাম। লাইন ঠিকঠাক মনে নেই,তাই নিজের মতো গেয়েছি। কিন্তু তুই এভাবে তাকাচ্ছিস কেন,গানটা ভাল্লাগেনি?”
সার্থ জবাব দিলো না। ঝট করে বলে বসল,
“ আইরিন,তাহলে তুমিও তৈরি হয়ে এসো। আজ নাহয় আমরাও শপিং- এ যাই।”
তুশি হাঁটা থেকে থামল,তড়িৎ চাইল ঘুরে। আনন্দে লাফিয়ে উঠল আইরিন,
“ ওয়াও, সত্যি! আমিত রেডিই আছি । আপনি বললেই যাব।”
রোকসানা হেসে বললেন,
“ ভালোই হবে। তোমরাও ঘুরে এসো তাহলে। সার্থ বেটা, তুমি কিন্তু শপিং শেষে ওকে একেবারে আমাদের বাসায় পৌঁছে দিও, কেমন!”
সার্থর চোখ তখন তুশির ওপর। দৃষ্টির পূর্ণ জেদের ভিড়ে আবেগের ছাঁয়া মাত্র নেই।
অয়ন বলল,
“ তাহলে আমি আরিফ চাচাকে বড়ো গাড়িটা বের করতে বলে দিই। জামিল ভাই,আপনি আর বসে থেকে কী করবেন? আপনিও চলুন।”
” আমি? উম,আচ্ছা চলো যাই।”
আইরিন বলল,
“ আমাদের তো গাড়ি দরকার নেই। সার্থ ভাইয়ার বাইক আছে না। আমরা দুজন নাহয় আলাদা করে বাইকে যাব!”
তুশির চেহারা আর চাউনির বদল হলো না। খুব ঠান্ডা দৃষ্টি সার্থর উত্তপ্ত নয়ন পানে মেলে রাখল সে। পরপর ঠোঁট এক পাশে বেঁকিয়ে নৈশব্দে হেসে ফেলল মেয়েটা ।
সার্থর নাকের পাটা ফুঁসে উঠল সহসা। ওই তীর্যক হাসি নোংরা পানির মতো ছিটকে এসে লাগল তার শরীরে। মনে হলো হাসি নয়, তাকে প্রচণ্ড মাত্রায় তুচ্ছ করল তুশি। বোঝাল,সে যাকে ইচ্ছে বাইকে নিক ওর কিচ্ছু এসে যায় না। অমনি চিবুক ফুটিয়ে বলল,
“ অফকোর্স,আইরিন। আমার উড বি ওয়াইফ তো আমার বাইকেই যাবে। অয়ন, তোরা বরং তোদের মতো চলে যা।”
ইউশা নাক-মুখ খিচে চেয়ে থাকে কিছু পল। তারপর মায়া মায়া চোখে দেখে তুশির মুখটা। মেয়েটার ভেতরের বিধ্বস্ততা ও বোঝে। ইস,না জানি কত কষ্ট পাচ্ছে! ইউশা আস্তে করে হাতটা ধরল বোনের। তুশি নড়ে উঠল, তাকাল, হাসল ঠোঁট টেনে। বুকে দীর্ঘশ্বাস মিটিয়ে ঘুরে হাঁটা ধরল পরপর।
একেরপর এক হযবরল কাণ্ডে মাথায় হাত দিয়ে হতাশ শ্বাস ফেলল জামিল। দুপাশে ঘাড় নেড়ে ভাবল,
“ সাইন্স বলছে, এই পাঠা মৌসুমের ভেতর কাছে আসার মৌসুমটা বোধ হয় আর হবে না!”

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here