কাছে_আসার_মৌসুম!___(৫৯-খ) #নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি

0
2

#কাছে_আসার_মৌসুম!___(৫৯-খ)
#নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি

রাত আনুমানিক শেষের পথে। ফজরের আযান পড়বে যে কোনো সময়। এখনো জ্বলজ্বল করছে সরব থানার আলো।
আয়সাল নামের লোককে ধরার জন্যে সাই সাই বেগ নিয়ে পুলিশের দুটো জিপ ছুটেছিল মাঝরাতের দিকে। কিন্তু বিশেষ লাভের লাভ হয়নি। শরিফ ভুল খবর পেয়েছিলেন। কারণ বাইকের নেমপ্লেট ভুয়া। জানা গেছে,আয়সালই তার বাইক সাড়তে দিয়েছিল গ্যারেজে। সেখান থেকে কদিন আগে বাইক চুরি হয়ে গিয়েছে। এজন্যে গ্যারেজের মালিক একটা ভালো অঙ্কের ক্ষতিপূরণও দিয়েছিল তাকে। সব প্রমাণ পেয়ে সার্থ বুঝে ফেলল,যে বাইকে খুনী গুলি করে ছুটেছে সেটাই ওই চুরি করা বাইক। এ নিয়ে গোটা টিমের মাথাই এলোমেলো হয়ে গেল এবার। এখন কোত্থেকে খুনীকে খোঁজা শুরু করবে,প্রশ্নের একটা আস্ত গোলকধাঁধায় তলিয়ে গেল সবাই। নির্ঘুম কাটল সেই রাত। সার্থ
ল্যাবে বুলেট এনালাইসিস করতে পাঠিয়েছিল আগেই। আর সেই থেকেই হাতে প্রথম ক্লু-টা আসে।

হুট করে নিজের কক্ষে মাস ছয়েক আগের একটা ফাইল নিয়ে বসে পড়ল সে। সকাল আটটা বাজে তখন। গোটা রাত ছোটাছুটি করায়,শরিফ দিশেহারা ঘুমে। বেশ অনেকদিন পর কোনো কেস নিয়ে এরকম দৌড়াদৌড়ি যাচ্ছে। ভদ্রলোক চুপ করে পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন। সার্থ এ পাতা – ওপাতা উলটে দেখল কিছুক্ষণ। আচমকা মোটা ফাইলে হাতের উল্টো পিঠের বাড়ি দিয়ে বলল,
“ ইয়েস!”
তটস্থ চোখে চাইলেন শরিফ- কিছু পেলেন স্যার?”
“ একই ক্যালিবারের বুলেট। থ্রো এন্ড থ্রো, যাতে না বাঁচে। একই মডেল দুটোই। এর মানে মাস ছয়েক আগে যে খুনের কেসটা এসেছিল, সেটা এই খুনীরই করা।”

শরিফ মনে করে বললেন,
“ ওই কেসটা তো মাহফুজ স্যার দেখছিলেন। প্রমাণ টোমান পায়নি দেখে ফাইল ক্লোজ হয়ে যায়।”
সার্থ ব্যস্ত স্বরে বলল,
“ কল হিম, কুইক।”
শরিফ সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোনের রিসিভার তুললেন। এই ভোর ভোর ফোনের ক্রিং ক্রিং শব্দে বিরক্ত হলেন মাহফুজ। কোনোরকম ধরলেন মুখ কুঁচকে,
“ হ্যাঁ, কে?”
“ এ এস পি সার্থ আবরার বলছিলাম।”
“ ওহ, অফিসার। মিস্টার শফিকের কাছে শুনলাম আপনার ফ্যামিলি মেম্বরের ওপর অ্যট্যাক হয়েছে?”
“ আমি সেই কেস নিয়েই বসেছি। ছ মাস আগের সেই অস্ত্র প্রচারের কেস তো আপনি দেখেছেন। খুনী ধরা পড়েনি কেন?”
মাহফুজ হতাশ সুরে বললেন,
“ কী আর বলব! পুলিশি হাল সম্পর্কে তো জানেনই। আমি একা আর কী করব? রোজ নতুন কেস জমা হয়। কিলারের চেহারা দেখা যায়নি,কোনো শক্ত প্রমাণ নেই। ব্যস, কেস ক্লোজড।”
“ ওখেই।”
সার্থ ফোন রেখে দিলো। দুই ভ্রুয়ের মাঝখানে আঙুল দিয়ে ডলল কিছু সময়। হুট করে বলল,
“ শরিফ, এক কাজ করো। ওই গ্যারেজ, যেখান থেকে আয়সালের বাইক চুরি হয়েছে, তার আশেপাশের সব রুটের সিসি ক্যামেরা কালেক্ট করো। বাইক নিয়ে কোনো না কোনো রুটে তো কিলার গিয়েছেই।”
“ ইয়েস স্যার। এক্ষুনি করছি।”
শরিফ চলে গেলেন দলবল নিয়ে।
সার্থ ফোস করে শ্বাস ফেলল। এক পল চাইল নিজের শার্টের দিকে। রক্ত শুকিয়ে আঠা হয়ে আছে। উঠে দাঁড়াল ও। ওয়াশরুমে ঢুকল ফ্রেশ হতে। একটা লম্বা শাওয়ার নিয়ে আবার ওই একই শার্ট পরল। ফোন তুলে কল দিলো ইউশার নম্বরে। মেয়েটা ধরছে না। ফোন কি সাথে নেই? এবার জামিলকে কল দিলো ও। জামিল হাসপাতাল থেকে রাতে বাড়ি ফিরেছে। ঘুমোচ্ছিল। আধো ঘুম জড়ানো স্বরে বলল,
“ হ্যাঁ বল। কোথায় তুই?”
“ ওর কী অবস্থা?”
“ আমি রাতে চলে এসেছি। এখন আবার যাব। খবর তো কিছু পাইনি। অয়ন জানাবে বলেছিল। কিন্তু তুই কোথায় গেলি অত রাতে?”
“ জামিল আমি কাজে আছি। তুই খেয়াল রাখিস সবার। আমি কবে বাড়ি ফিরব জানি না।”
জামিল আর্তনাদ করে বলল – সে কী! এ..”
বাকিটা বলার আগেই লাইন কেটে দিলো সার্থ। পরপর কল দিলো হাসপাতালে ওর চেনা সেই ডাক্তারকে।
“ আমি সার্থ বলছিলাম।”
“ ওহ অফিসার! আপনার পেশেন্টের ইয়েট নো রেসপন্স। অবস্থার কোনো উন্নতি নেই।”
সার্থ নরম চোখে ঢোক গিলল। বলল,
“ ডক্টর,আমি জানি। আপনি প্লিজ সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। আর ওর একটা আঙুলও যদি নড়ে,খবরটা সবার আগে আমাকে দেবেন,আই রিকোয়েস্ট ইউ!”
“ জি জি নিশ্চয়ই। আপনার কাজিন তো?”
“ না।”
“ তাহলে?”
“ শী ইজ মাই ওয়াইফ!”

সার্থ ফোন রেখে টেবিলে দুহাত ভর দিয়ে শরীর ছেড়ে দিলো। ঝুঁকে থেকে মাথা নুইয়ে রইল কিছু ক্ষণ। যতক্ষণ না রুহানকে না ধরবে,তুশির সামনে ও দাঁড়াবে না। কোন মুখে দাঁড়াবে? কী বলবে গিয়ে? যখন তুশির প্রতি ওর কোনো অনুভূতি ছিল না,তখনও মেয়েটাকে কেউ একটা বাঁকা কথা বললে সহ্য হয়নি ওর। সেখানে আজ সার্থর রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে তুশি,তাহলে আজ ওর ওপর এত বড়ো আঘাতটা সার্থ মানবে কী করে?
কিন্তু কীভাবে ধরবে রুহানকে? কোত্থেকে শুরু করবে? এতগুলো দিন খুঁজেও ওকে পায়নি। রুস্তম দেশ ছেড়েছেন ছেলে জেল থেকে পালানোর দশদিন আগে। এসব যে একটা ছক,বোঝে ও। কিন্তু এখন কার মাধ্যমে কোথায় পৌঁছোবে? যেখানে দিক নেই,সেখানে দিকভ্রান্ত না হয়ে উপায় আছে আর?

সময়টা বড়ো তাড়াতাড়ি চলছে। সকাল থেকে দুপুর গড়াল,দুপুর থেকে বিকেল। গ্যারেজ থেকে আশেপাশে যত মোড়,গলি গিয়েছে সব জায়গার সিসি ফুটেজ কালেক্ট করতে করতে রাত নেমে এলো। এক একজন, এক এক কম্পিউটারের সামনে বসল ভিডিও চেইক করতে। সন্দেহভাজন কাউকে দেখলেই ওই ভিডিওতে ডাক পড়ার নির্দেশ জারি করা। বেশ অনেকটা সময় পর সহকারী এস আই সাগর চ্যাঁচালেন,
“ স্যার স্যার…”
সার্থ তড়িঘড়ি করে ওই মনিটরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ভিড়ল বাকিরাও। সাগর ভিডিও পেছনে টানলেন। একটা ভাঙা বাড়ির সামনে এক যুবক বাইক থামিয়েছে। এদিক ওদিক দেখে তারপর পাতা, খড় আর ডালে ঢেকে দিয়েছে সেটা। রাতের ফুটেজ কিন্তু স্পষ্ট বোঝা গেল ওসব। সঙ্গে সঙ্গে বাটন টিপে পজ করল সার্থ। জুম করতেই পুরো স্ক্রিনজুড়ে ভেসে রইল সেই যুবকের সাবলীল চেহারা। শরিফ বললেন,
“ এই ছেলেই কী স্যার? ফিটনেস আর বাইক তো একই দেখতে লাগছে।”
সার্থ বুক চিতিয়ে দাঁড়াল। ঠোঁটে বিজয়ের সূক্ষ্ণ ছাপ পড়ল সহসা।
কিড়মিড় করে বলল,
“ ক্যাচ দ্যাট বাস্টার্ড এনি ওয়ে…”

***
খুনীর নাম ফরহাদ মোল্লা। বয়স আনুমানিক ৩৪ এর মতো হবে। কমলাপুর রেলস্টেশনের পাশে পুরোনো পোড়া বাড়ি থেকে পুলিশ অস্ত্র সমেত ধরল ওকে । আনুমানিক রাত ১টা বাজে তখন। কিন্তু ছেলেটার মুখে ভয়ডরের চিহ্ন মাত্র নেই। শরিফ ওকে গারদের ভেতর ধাক্কা দিয়ে ঢোকালেন। সেন্ট্রি তালা দিতে যাবেন,ও তক্ষুনি গা দুলিয়ে বলল,
“ আমারে আটকাইয়া লাভ নাই স্যার। একটা কল দিলে রাইত পোহানোর মইধ্যে জামিন আসলো বইলা! আমাগো থানায় রাখা যায় না।”

সার্থ সবে নিজের কেবিনের দরজা অবধি গিয়েছিল, কথাটা শুনেই পায়ের রক্ত মাথায় উঠল ওর। অমনি হনহন করে এসেই সেন্ট্রিকে ঠেলে সরিয়ে নিজে ভেতরে ঢুকে গেল। শরিফ বিড়বিড় করে বললেন,
“ ব্যস,হয়ে গেল।
ব্যাটা তোর কপালে দুঃখ আছে।”
সার্থকে এমন দানবের মতো সামনে এসে দাঁড়াতে দেখে ছেলেটা ঘাবড়ে গেল একটু। শ্বাস ফেলতেও পারল না, একেবারে ওর বুকের হাড় বরাবর দড় এক লাথি মারল সার্থ । ঐ এক লাথিতেই ফরহাদের মুখ থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটে এলো৷ প্রকট চোখে চাইতেই
সার্থ থাবা মেরে কলার ধরে কাছে টেনে আনল, পরপর ওর আস্ত শরীরটা ছুড়ে মারল দেওয়ালে। সিমেন্ট ঘষা ওই শক্ত দেওয়ালে থুবড়ে পড়ে,ফরহাদ প্রচণ্ড এক বাড়ি খেলো মাথায়। মনে হলো এক্ষুনি ভেতরের কোষ ফেটে বাইরে ঠিকড়ে আসবে। এক ঘায়ের পর ফরহাদের শরীর বলের মতো ছিটকে এলো আবার। সার্থ চিড়বিড় করে বলল ,
“ শুয়ারেরবাচ্চা, মানুষ মেরে আবার দাঁত কেলাস? তাও আমার সামনে!
ভেবেছিলাম তোকে দু মিনিট বিশ্রাম নিতে দেব। কিন্তু দিলি মেজাজ চড়িয়ে। এখন বাপের নাম বলবি,নাকি…”
ফরহাদ হড়বড়িয়ে বলল,
“ আমি বলতে পারমু না। আমাগো নিয়ম নেই।”
“ জানতাম এটাই শুনব। শরিফ…”
“ জি স্যার।”
“ এটাকে আন্ডারগ্রাউন্ড সেলে নেয়ার ব্যবস্থা করো। ওখানেই ওর খাতির-যত্ন করব।”
ফরহাদ ভড়কে বলল,
“ আন্ডারগ্র্যাউন্ড সেল?”
শরিফ হেসে হেসে ফিসফিস করে বললেন,
“ টর্চার সেল৷ আসলে এখানে তো কাউকে মন ভরে পেটানো যায় না। তাই আমাদের যাদের পেটাতে ইচ্ছে হয় সেখানে নিয়ে যাই। সিক্রেট সেল তো! শুধু লাঠির বাড়িও না,
ইলেক্ট্রিক শকও দেয়া হয়। সেবার তো সার্থ স্যার,একজনের আঙুলের নখই উপড়ে দিয়েছিল।”
ফরহাদের চোখ বাইরে ছিটকে এলো। ত্রাসে জবুথবু হয়ে চাইল সার্থর পানে। এদিকে
সার্থ নিজেই হতভম্ব হয়ে ভাবল,
“ ও আবার কখন কার আঙুলের নখ তুলল? শরিফ শেখানো বুলি আওড়াতে গিয়ে একটু বেশিই বলে ফেলল না?”
কিন্তু ব্যাপার সে বুঝতে দিলো না। উলটে ক্রুর হেসে বলল,
“ ওখানে নিলে তোকে তো আর থানায় খুঁজে পাবে না। জামিনটা করাবে কে হুঁ?”
ফরহাদকে দেখেই বোঝা গেল ও ভয় পেয়েছে। একে এই মার, ব্যথা-যন্ত্রনায় সারামুখ জ্বলছে। পেট টনটন করছে। সিনেমা-টিনেমায় আয়রন সেল তো দেখেছে অনেক। এর মানে এসব সত্যি হয়?
ছেলেটা ঢোক গিলে বলল,
“ দেখেন স্যার,
আমি আসলে সাতে-পাঁচে থাকি না। টাকা পাইলে কাম করি। আপনারে মারতে ফোন আইছিল। কইছিল করতে পারলে ৫ লাখ দিবো। আমি রাজি হইছি। তারপর এডভান্স দুই লাখ দিছে। বাকিটা কাম শেষে পাওয়ার কথা, কিন্তু টার্গেট মিস হওয়ায় আমি নিজেই ওগো ফোন ধরিনাই।”

সার্থ সরু চোখে বলল,
“ ফোন করেছিল যে,তার নাম কী?”
“ ওসব কয়নাই। আমি অত জিগাইওনাই। টাকা দিয়া আমাগো লেনদেন,পাইলেই হইল। আর ফিরতি ফোন দিলে ওই নাম্বারও বন্ধ কইতো।”
সার্থ ঠোঁট কামড়ে ভাবল,
বলল,
“ আর টাকা? সেটা কীভাবে নিয়েছিস?”
“ আমার আস্তানার সামনের রোডে একটা পোড়া দোকান আছে। ওইখানে গর্ত খুড়ছিলাম। রাইখা যাইতে বলছিলাম রাতের দিকে। তারপর ওগো এক লোক আইসা রাইখা গেছে।”
সার্থ শরিফের দিকে চেয়ে ইশারা করল কিছু। সাথে সাথে তিনি চললেন কোথাও।
সার্থ বেরিয়ে আসতে নিলেই ফরহাদ চ্যাঁচাল,
“ আমারে তাইলে আর ওইখানে নেবেন না তো?”
উত্তর দিলো না ও। বেরিয়ে এলো। ফরহাদ বলল,
“ আমারে তাইলে একটা কল করতে দেন।”
সার্থ যেতে নিয়েও থামল। ঘাড় ভেঙে তাকাল টেবিলে। সাদা রুমালের ওপর ফরহাদের মোবাইল,পিস্তল, বাইকের চাবি রাখা। গিয়ে মোবাইল ফোনটা তুলল ও। ফরহাদ ভাবল ওকে দেবে। অথচ ওকে চমকে দিয়ে সার্থ ফোনটা নিজের পকেটে ভরে ফেলল। ছেলেটা উদ্বীগ্ন হয়ে বলল,
“ ও স্যার,ফোনটা দেন স্যার…ফোন না দিলে জামিন হইব ক্যামনে হায়হায়।”

সার্থ যেতে যেতে গোটা থানায় ঘোষণা দিলো,
“ আমরা যে একে ধরেছি,এর একটু শব্দও যেন বাইরে না যায়।”
সবাই মাথা নাড়ল একইসাথে,
“ ওকে স্যার।”

ফরহাদ যে পোড়া দোকান আর গর্তের কথা বলেছিল, মিলেছে সেটা। কিন্তু সেখানকার কাছাকাছি কোনো সিসিক্যামেরা না থাকায়, সুরাহা পাওয়া গেল না।
এদিকে ঘড়িতে সময় কাটছে । মাঝে বারবার জামিলকে ফোন করে খবর নিলো সার্থ। তুশির এখনো কোনো রেসপন্স নেই। যন্ত্রপাতির সবগুলো কাঁটা ঐ একই জায়গায় স্থির।
দ্বিতীয় রাত পার হলো,
কিন্তু এক ফোঁটা ক্লু পেলো না সার্থ। হঠাৎ ম্যাসেজ এলো ফোনে।
জামিল পাঠিয়েছে :
“ডাক্তার বললেন,আজকের দিনটা দেখবে। তারপর ভালো-মন্দ বলবে। দোয়া করিস!
আর তোর হবু বউ এসেছে তোর এক্স বউকে দেখতে।”
সার্থর গলা সুদ্ধ তেতো হয়ে গেল। দুম করে ফোন ছুড়ে রাখল টেবিলে। জামিল,বকের মতো লম্বা একটা ছেলে; কিন্তু কখন কোন সিচুয়েশনে কী বলতে হয় এখনো বুঝলো না।
ও চেয়ারে বসে রইল দুহাতের মুঠোয় কপাল নুইয়ে। চিন্তায় মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে।
শরিফ এসে দাঁড়ালেন তখনই। ডাকলেন আস্তে,
“ স্যার!”
সার্থ মাথা তুলল না। চুপ রইল। উনি নিজেই বললেন,
“ বাড়ি যাবেন না, স্যার? দুটোদিন থানাতেই আছেন।”
“ তুমি চাইলে যাও।”
“ না না স্যার,আপনাকে রেখে আমি যাই কী করে? স্যার তাহলে কিছু খাবার আনাব?”
সার্থ মুখ তুলে চাইল। কপালটা বেঁকে বসল আচমকা। তেমন ঝট করেই বলল,
“ শরিফ… ফরহাদকে এখানে নিয়ে এসো তো।”
ভদ্রলোক একটু ভীমড়ি খেলেও,রওনা করলেন ত্রস্ত। ফরহাদ এলো ভয়ে ভয়ে। ওর কপাল ছুলে গেছে কাল দেওয়ালে এক বাড়ি খেয়ে। থানা থেকে ফাস্টএইড দিয়েছে আপাতত। জড়সড় হয়ে দাঁড়াতেই সার্থ ভ্রুয়ের ইশারায় চেয়ার দেখাল,
“ বোস।”
এক পল বিভ্রান্ত চোখে শরিফের দিকে দেখল ছেলেটা। অমনি পিঠে ধাক্কা মারলেন তিনি,
“ বস শালারপুত,আমার মুখের দিকে কী দেখোস?”

চেয়ার থেকে পড়ে যেতে যেতেও, নিজেকে সামলে বসল ফরহাদ৷ সার্থ ওপাশ থেকে উঠে এলো। ফরহাদের চেয়ারটা ঘুরিয়ে ফেরাল নিজের দিকে। ভীষণ ডরে মিইয়ে গেল ছেলেটা।
ওর পাশের চেয়ারের হাতলে বসল সার্থ।
ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“ এর আগে কটা খুন করেছিস?”
“ ছ-ছয়টা।”
“ কাকে কাকে?”
“ অন্য জেলায় স্যার। ঢাকায় করছি এইটা সহ তিনটা। প্রথমটায় এক রাইতেই জামিন হইছিল। আর পরেরটায় ধরতে পারেনাই।”
শরিফ দাঁত খিচিয়ে বললেন,
“ একদম পাছার মধ্যে দিতে হয়। মানুষ মারোস ক্যামনে,দুনিয়ায় আর কাম নাই?”
ফরহাদ চুপ করে রইল। সার্থ বলল,
” তুই বললি ওদের সাথে নিজে যোগাযোগ করতে পারিসনি। কারণ ফোন বন্ধ থাকতো। তাইত?”
“ জ-জি।”
“ এর মানে ওরাই তোকে কল করেছে। আর সেটা নিশ্চয়ই একটা নির্দিষ্ট সময়? কখন সেটা?”
ফরহাদ হতবাক হয়ে চাইল। বাপ্রে,কী মাথা!
বলল থেমে থেমে,
“ ন-নয়টায়।”
“ রাত?”
মাথা নাড়ল ও। সার্থ আড়চোখে দেওয়াল ঘড়িতে তাকায়। আটটা বাজে এখন।
বলল,
“ আমাকে গুলি করতে আসার পর ওদের সাথে তোর আর কোনো কথা হয়নি?”
“ না স্যার। মারতে গেছি আপনারে,মরছে এক মাইয়া। তাও আপনার সাথের। পাব্লিক ধরলে ধোলাই খাইতাম,আর আপনেরা ধরলে তো… আমাগো নিয়ম আছে মার্ডারের দুইদিন লুকাই থাকতে হয়। ফোন-টোন বন্ধ রাখতে হয়। এরপর হাওয়া ঠান্ডা হইলে আবার আগের মতো।”
অমনি শরিফ পেছন থেকে ওর মাথায় থাপ্পড় মেরে বললেন,
“ হারামির বাচ্চা আবার মুখ নাইড়া কয় এইগুলা। করে খুন,তাতে আবার নিয়ম!”
সার্থ বলল – “ শান্ত হও। শোন ফরহাদ,
এর মানে তুই ওদের খোঁজ দিসনি যখন, ওরাই তোর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করবে।
তাহলে হিসেব মতো আজ রাত নয়টায় ওরা তোকে আবার কল করবে।”
“ করতে পারে স্যার।”
সার্থ বিড়বিড় করে বলল,
“ পারে না,করবেই…”

****
এক ঘন্টা কাটল চোখের পলকে। গোটা কক্ষ নিস্তব্ধ এখন। মাথার ওপর একটা মাত্র টিউবলাইট জ্বলছে। যাতে স্পষ্ট ভেসে আছে ফরহাদের ফ্যাকাশে চেহারা। বারবার হাত তুলে কপালের ঘাম মুছছে সে। হাতে ফোন,ঠকঠক করছে আঙুল। মাঝে এক পল চোখের কোণ তুলে সার্থর নিরেট চিবুকে চাইল। স্থির নজর ঘুরিয়ে দেওয়ালঘড়ি দেখছে সে। পাশের টেবিলে কয়েকটা মনিটর চলছে। গ্রাফ,টাইমার আর ম্যাপের ছবি। মাঝে শান্ত হয়ে থমকে আছে লাল এক চিহ্ন। সবার চোখে অপেক্ষা। নয়টা পেরিয়েছে ঘড়িতে। ঠিক নয়টা পনের নাগাদ ফরহাদের ফোন বেজে উঠল। অমনি নড়েচড়ে বসল সবাই। ও রিসিভ করতে গেলেই সার্থ শান্ত স্বরে হুশিয়ারি দিলো,
“ যতক্ষণ আমি না বলব,লাইন যেন না কাটে।”
ঘাড় নাড়ল ফরহাদ। ধরল ফোনটা। ওপাশ থেকে এক পুরুষ কণ্ঠ বলল,
“ কী রে ভাই,তোমার খবর কী? ফোন ধরো না ক্যান?”
ফরহাদ সার্থর দিকে চাইল। ভ্রুয়ের ইশারায় কথা এগোতে বোঝাল সে।
ও বলল,
“ ঘুমে ছিলাম। আর আমি কইছি না,এক দুইদিন ফোনে না জ্বালাইতে!”
“ হোপ শালা,আমাগো টেনশনে রাইখা ঘুমাইতেছিলা? ওদিকের কী খবর কও?”
“ ক্যান আপনেরা খোঁজ নেননাই?”
“ পাগল! ভাই সাফ সাফ কইছে থানার আশেপাশে না থাকতে। কারো সন্দেহ যেন নাহয়। কিন্তু পাব্লিক প্লেসে মারলে তো টিভিতে দেখায়,ফুটেজ মুটেজ থাকে। কোথাও কিছু পাইলাম না ক্যান? ওই
পুলিশ মরছে, না হাসপাতালে মরতাছে?”
সার্থর রাগ হওয়ার কথা ছিল,কিন্তু ঠোঁটের কোণ তুলে হাসল ও। শরিফের দিকে তাকাল এক পল। তার মুখেও হাসি। মলের আশেপাশের যত সিসিক্যামেরা ছিল সব ফুটেজ ওরা আগেই সরিয়ে ফেলেছিল,যাতে মিডিয়ার হাতে না পরে। তাহলে খুনীকে পাওয়া কঠিন হতো! আরো
সজাগ হয়ে পড়তো সে।
ফরহাদ মিনমিনিয়ে বলল,
“ খবর ভালো না। পুলিশরে গুলি করতে গিয়া এক মাইয়ার গায়ে লাগছে।”
“ কীইইই? শালা কুত্তারবাচ্চা, তুই বালের কিলার! এই জন্যে তোরে দুই লাখ অগ্রীম দিসি? অহন আমি ভাইরে কী কমু! কাম নেয়ার সময় ফাপর নিলি কত। এই তোর কাম? তোর বাপ ওই খয়রুলরে ধরমু আগে। তোরে নিয়ে এত চাপা মারল, তোর দৌড় তো দেখলাম।”

“ দেখেন, বাপ নিয়া কথা কইবেন না। আমি তো পুলিশরে নজরে রাইখাই শ্যুট করছি। ওয় নিচু হইলে আমার কী দোষ?”
“ খানকির পোলা তর্ক করিস না। অহন কই আছোস?”
ফরহাদ সার্থর দিক চাইল। সার্থ আঙুল দিয়ে দেখাল কিছু।
ও বুঝতে পেরে বলল – আছি আমার আস্তানায়।”
“ আইচ্ছা, আন্ডারগ্রাউন্ড হইয়া থাক। বেশি বাইর-টাইর হইস না।”
“ আপনে কই আছেন?”
“ আমি কই তাতে তোর কাম কী? আমি আমার জায়গায় আছি।”
“ ওহ,আমার বাকি টাকা দেবেন না?”
তেতে উঠল সে,
“ আবার টাকা চাস? কোন মুখে চাস? রাখ শালা মুডটাই খারাপ কইরা দিছে। কাম তো পারলই না আবার টাকা মারায়।”
ফোনটা কেটে গেল। টেক অফিসার সাথে সাথে বললেন,
“ গট ইট স্যার। নারায়নগঞ্জ থেকে ফোন করেছে। টাওয়ার এ থেকে সি-য়ের দিকে গিয়েছে। তবে ফোন বন্ধ করে দিয়েছে আবার।”
সার্থ ফরহাদের হাত থেকে ফোন নিয়ে নিলো। বাকিদের দিক চেয়ে বলল,
“ এটাকে ভেতরের সেলে রাখো। যেন চ্যাঁচালেও আমার কানে না আসে।”
ফরহাদ বলল,
“ কিন্তু স্যার আমি তো সাহায্যই করলাম, আমারে ছাইড়া দেন না?”
দুজন পুলিশের লোক তাও টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গেল ওকে। শরিফ এগিয়ে এসে বললেন,
“ স্যার, এবার কী করব?”
“ ওরা জেনেছে আমি মরিনি।
মানে এটাও বুঝব আমি এখন ওদের খ্যাপাটে ষাড়ের মতো খুঁজব। ওরা তো লুকোবে শরিফ। যেহেতু রুহানের ছবি দিয়ে আগেই ওয়ান্টেড জারি করা,ও শহর ছাড়বে না। এক কাজ করো,
যে এলাকায় এই লোকেশন ট্রাক হলো,আশেপাশের সব সেইফ হাউস,হোটেলের খবর নাও। ইঁদুর গর্তে বেশিক্ষণ থাকতে পারে না। আমি আজ রাতের মধ্যেই ওকে ধরব।”

সৈয়দ ভবন থেকে আপাতত আনন্দ গায়েব হয়ে গিয়েছে। দুটোদিন কেউ-ই ঠিক করে খাবার মুখে তোলেনি। তাও তনিমা নিয়ম করে রান্নাবান্না করলেন। বাটি ভরে হাসপাতালে পাঠালেন। আজকেও সকাল সকাল বাড়ির দুই কর্তা হাসপাতালে ছুটেছেন। এদিকে রেহণূমা মুষড়ে গেছেন অনেকটা। নামাজে বসলেই কাঁদছেন। হাসনাও তসবি ছাড়ছেন না। বাড়ির সব থেকে ছোটো সদস্য মিন্তু, সেও বারবার আল্লাহর নাম জপছে।
কতবার হাসপাতালে যাওয়ার বায়না ধরল, কেউ নিলোই না ওকে। তনিমা বড়ো টিফিন ক্যারিয়ারে সবার জন্যে খাবার দিলেন আজও। হাসপাতালে ইউশা,জামিল,শওকত,সাইফুল নাসীর আছেন আজ। রোকসানাও সেখানে।
অয়নের আজকে পেশেন্ট এ্যাপোয়েন্টমেন্ট ছিল। ও বাড়ি ফিরল ভোর বেলা। ফ্রেশ হয়ে বের হতেই ফোন এলো। তনিমা এসে দাঁড়ালেন তখনই। শুনতে পেলেন অয়ন সব এপোয়েন্টমেন্ট ক্যান্সেল করে দিচ্ছে। লাইন কাটতেই বললেন রমণী,
“ বাদ দিলি কেন? তুশির তো জ্ঞানই ফেরেনি। দেখে আসতি না-হয়।”
“ এই মেজাজ নিয়ে পারব না। আমি তো আর তোমার বড়ো ছেলে নই। এই অবস্থায়ও তার থানায় নাকি খুব ব্যস্ততা। বাড়িও তো আসেনি,তাই না?”
তনিমা নিশ্চুপ। ও নিজেই বলল,
“ দুদিন ধরে তুশি আইসিউতে পড়ে আছে। কার জন্যে ওর এই অবস্থা? অথচ তাকে
হাসপাতালের সীমানায়ও দেখলাম না। কোনোরকম ভর্তি করিয়ে দিয়েই কাজে বেরিয়ে গেল। দেশকে খুব উদ্ধার করা হচ্ছে।”

“ কী আশ্চর্য, তুই ওকে টানছিস কেন? ও থেকেও বা করবেও কী? তুশি তো ওর কেউ না। তুশির সাথে কি ওর এখন কোনো সম্পর্ক আছে?”
অয়ন কিছু বলতে গিয়েও থামল। তার ভাইয়ের যে তুশির প্রতি হুট করে এত প্রেম জন্মেছে সেটা মাকে জানানো যাবে না। তাহলে ওই পুরোনো বিয়ের দোহাই দিয়ে মা আবার সব উল্টেপাল্টে দেবেন। কথা না বাড়িয়ে কাবার্ড খুলে শার্ট বের করল ও। তনিমা টিফিন ক্যারিয়ার টেবিলে রাখলেন,
“ খাবারটা নিয়ে যাস। ইউশা ওরা সবাই তো না খেয়ে আছে।”
“ আচ্ছা।”
“ পারলে সাথে করে মেয়েটাকে নিয়ে আসিস।”
“ বলেছি অনেকবার। শুনছে না। তুশিকে অনেক ভালোবাসে তো!
তনিমার চোখ ছলছল করে উঠল,
“ ভালো তো ওকে আমিও খুব বাসি। কিন্তু মা ছোটো,হাসনা খালাকে এভাবে রেখে নড়তেও পারছি না।”
অয়ন ফোস করে শ্বাস ফেলে বলল,
“ কষ্ট পেও না মামুনি। এত মানুষের ভালোবাসা রেখে তুশি যেতে পারে না। ও ঠিক ফিরবে দেখো।”
তারপর মারবেল মেঝেতে চেয়ে ভাবল,
“ তুশিকে তো ফিরতে হবেই মামুনি। প্রথম বার কাউকে চেয়ে, আমি এইভাবে হেরে যেতে পারি না!”

চলবে…

২৮০০ শব্দ। আমি এখন থেকে পর্ব আরো ছোটো করব। সাড়ে তিন হাজার শব্দ এক পর্বে না লিখে,এটাই তিন ভাগ করে পোস্ট করব। তাহলে দুদিন পরপর গল্প পাবেন। হলাম না নিয়মিত?🤌

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here