#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_ ১৪
আবদুল আজিল বাড়িতে পা রাখতেই ফাতিমা চিন্তিত মুখে এগিয়ে এলো। তার গায়ে মোটা পাড়ের লাল কাপড়। সাধারণ বাঙালি বধুর মতো গোঁজা দিয়ে গায়ে, মাথায় লম্বা টানা ঘোমটা। গোলগাল মুখের রুপবতী মহিলা। ফরহাদ বাপ, চাচাদের গড়ন পেলেও গায়ের রং পেয়েছে মায়ের। শুধু’ই রং, কেননা ফাতিমা তার নামের মতোই শান্ত, নরম, কোমল মনের মহিলা। কারো দুঃখ দেখা তো ভালোই শোনার সাথে সাথে চোখে নাকে পানি গড়িয়ে পড়ে।
কাজের লোক থেকে শুরু করে গ্রামের অনেকে তাকে ডাকে আম্মা বলে। তার উঠান থেকে আজ পর্যন্ত কেউ খালি হাত, খালি মুখে উঠে যায়নি। দু’হাত ভরে দান খয়রাত করে।
মিলাদ মাহফিল শুনেন, যে যেমন তার জীবন সঙ্গীও হয় তেমন। তার বেলায় এমন উল্টো হলো কেন কে জানে ? উপরওয়ালার খেল বোঝা তো বড়ই মুশকিল।
আজিজ বসার ঘরে বসতেই ফাতিমা ফ্যান ছাড়লো, স্বামী পা থেকে জুতা খুললো। কাজের লোক হাজার থাক স্বামীর সব কাজ তিনি নিজের হাতে’ই করেন।
আজিজ আরাম করে বসলো! বসতে বসতে বললো, — মুখ অমাবস্যার রাত কেন?
— তো কি হবে? দুনিয়া দারি দেখে দিন রাত কাবার, নিজের ছেলের দিকে তো তাকাতেও দেখি না। কাল এসেছে নাক, মুখ ফাটিয়ে। আজ জ্বরে বেহুঁশ।
— সামান্য জ্বরে আমার ছেলে কাবু হয় না।
ফাতিমা বিরক্ত হলো! বিরক্ত মুখে বললো, — কাবু না হোক। বয়স হচ্ছে না? এক ছেলে তো থেকেও নেই। এই ছেলের বউয়েরও সেবা বুঝি এই জন্মে আমার কপালে নেই।
আজিজ হাসলো! হেসে বললো, — হবে হবে, সব হবে। এতো অস্থির হলে হয়?
— ছাই হবে? বলেই মাথার আঁচল মুখ বরাবর টেনে ভেতরের দিকে গেলো। রাতের খাবার গরম করতে হবে। বাপ, পুতের আবার গলা দিয়ে ঠান্ডা খাবার নামে না।
ফাতিমা যেতেই আজিজ উঠল। ভেতরে গিয়ে ছেলের রুমে উঁকি দিলো। গলা পর্যন্ত কাঁথা টেনে শুয়ে আছে। ফর্সা মুখে ঠোঁট দু’টো রক্ত জবার মতো টকটকে লাল।
সে এগিয়ে গিয়ে মাথায় হাত রাখলো! এখন হয়ত জ্বর কিছুটা কম। মাথা ঘামে ভেজা ভেজা লাগছে। হাত বাড়িয়ে ফ্যান ছাড়তেই ফরহাদ চোখ বন্ধ রেখেই বললো, — তুমি আয়নামতিকে কি বলেছো বাবা?
আজিজ চমকালো না, ভালো করেই জানে তার ছেলে বোকা না। এই প্রশ্নের সম্মুখীন তার হতে হবে আগে থেকেই জানতো। আজিজ এগিয়ে খাটের পাশে রাখা চেয়ারে বসলো। বসে হালকা হেসে বললো, — কি বলবো? অবুঝ মেয়ে, বুঝিয়ে বললাম।
— সেই বোঝানোটা আসলে কি?
— তুই তো সেই বাড়িতে প্রতিদিন’ই যাস। নিজেই জিজ্ঞেস করিস।
— আয়নামতি মিথ্যা বললো কেন?
— সেটা তো আমার জানার কথা না। সব তো তোরাই করেছিস।
— সব করলেও শেষের চালটা আয়নামতি দিয়েছে। তবে সে দিয়েছে না তাকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে সেটা বুঝতে পারছি না।
— আমি কোন কিছুতেই নেই। বশির এসে ডেকে না নিয়ে গেলে হয়ত জানতামও না কাহিনী কি?
ফরহাদ চোখ খুলে বাবার দিকে তাকালো। তাকিয়ে বললো, — তুমি কি আমার কাছ থেকে কিছু আড়াল করছো ?
— অনেক কিছু’ই তো করি। মহাজন আমি! এমনি এমনি তো আর হয় নাই। বাপের বোঝা তো তোমরা নেবে না। তাই বলে লাভ কি?
ফরহাদ আর কিছু বললো না। এসব মহাজন টহাজনে সে মহা বিরক্ত। যত্তোসব, ফালতু কারবার। কাঁথা টেনে মুখ ঢেকে বললো, — যাওয়ার সময় দরজা টেনে দিয়ে যাবে। আর খবরদার সকাল হওয়ার আগে কেউ যেন আমার রুমে না আসে।
— খাবি না?
— না।
আজিজ আবার হাসলো! হেসে উঠে যেতে যেতে বললো, — জয়তুন আরার কাছে বীণাকে চাইবো আমি। অনেক আগে একবার সারেং বাড়ির মানুষেরা চেয়েছে, এবার আমরা চাইবো। আশা করি এবার আর তুমি নিরাশ করবে না।
আগের বিয়ের দু’দুটো সম্বন্ধ নিয়ে ফরহাদের যেমন মাথা ব্যথা ছিল না। এবারো দেখা গেলো না। সে আরো আরাম করে শুলো। শুতে শুতে বললো, — দরজার সাথে ফ্যানটাও বন্ধ করে যেও।
শাহবাজ বাড়ি ফিরলো ঘন্টাখানেক পরে। ঘড়ির কাটা তখন রাত দশটার উপরে। চারিদিকে নিস্তব্ধতায় ঘেরা। তিরতির করে বয়ে যাওয়া নদীর শীতল একটা বাতাস শরীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। এই নিস্তব্ধ রাত, নিস্তব্ধ নদী তাদের বাড়ির ছেলেদের জন্য তেমন কোন ব্যাপার স্যাপার না। এই ডালভাতের মতো। তাই তাকে তেমন বিচলিতও মনে হলো না।
সে নৌকা থেকে নামলো একটু ঝিমিয়ে । নেমে ঘাটের সিঁড়িতে পা ছড়িয়ে বসলো। তার চোখ টকটকে লাল। দুদিনের ক্লান্তি, ঘুম তার মধ্যে খেয়েছে দু’ঢোক তাড়ি। এই দু’ঢোক তাড়িতে তার নেশা হওয়ার কথা না, তবে মাথা হালকা ঝিমঝিম করছে।
শাহবাজ বসেই নিচু হয়ে মাথায় পানি দিলো। তখনই ঢেউ তোলা নদীর বুকে একজনের ছায়া এসে পড়ল। ছায়ায় মালিক এসে দাঁড়ালো একদম তার পেছনে। শাহবাজ অনায়াসেই বুঝলো কে। না বুঝে উপায় কি? রক্তের ভাই বলে কথা। অবশ্য পুরো বাড়িতে এই রকম ভূতের মতো সারা রাত একজন’ই ঘুরে। সে হলো এরশাদ সারেং। রাতে সে ঘুমায় না। অবশ্য ঘুমায় না বললে ভুল। ঘুম আসে না। সেই যে এক রাতে ডাকাতেরা তার চোখের সামনে বাবা, মা সবাইকে খুন করলো, তখন থেকে সে ঘুমাতে পারে না। ঘুমালেও ঘুমাবে একেবারে শেষ রাতে।
তাই মাথায় পানি দিতে দিতে’ই হালকা হাসলো! হেসে বললো, — কি চাই?
এরশাদ তার শান্ত স্বরে’ই বললো, — ছোট চাচা বাহিরে বসে আছে।
— তো?
— সে আয়নামতিকে ছাড়া ভেতরে যাবে না।
শাহবাজ হাসলো! হো হো করা হাসি। হাসতে হাসতেই সিঁড়িতে প্রায় শুয়ে পড়লো। পড়তেই মাথার পানিতে গলা, ঘাড়, শার্ট পানিতে মাখামাখি হলো । তাকে অবশ্য সেই ভেজা নিয়ে তেমন বিচলিত দেখা গেলো না। বরং হাসতে হাসতেই বললো, — বিরাট সমস্যা হয়ে গেলো ভাই। আয়নামতিকে তো আমি ইটের চুলায় দেবো। আহা! সারেং বাড়ির প্রথম নাত বউ, ইটের চুলায় ছাই। এখন ছোট চাচার কি হবে? বাকি জীবন তো মনে হয় বাইরে’ই থাকতে হবে।
— বাড়ির মানুষ নিয়ে হেঁয়ালি না শাহবাজ।
শাহবাজ কৌতুকের সুরেই বললো, — দুঃখিত ভাইজান।
এরশাদ আর দাঁড়ালো না! যেতে যেতে বললো, — ছোট চাচা যদি বারান্দায় বসে বসে’ই কালকের সূর্যের মুখ দেখে। তাহলে ভুলে যাস, তোর একটা বড় ভাই আছে।
— সেটা আমি এমনিতেও মনে রাখি না। তবে ঐ মিথ্যাবাদির জন্য এতো বড় কথা? আহা! বড় ভালো একটা বর মিস করে গেলো।
এরশাদ দাঁড়ালো! সব ঘটনাই শুনেছে। হঠাৎ করে এমন পাল্টি মারার কারণ কি? সে দাঁড়াতেই শাহবাজ উঠলো! এগুতে এগুতে বললো, — আলাউদ্দিন ফকির বুঝি ডাল গলাতে পারেনি?
— সেটা বউ নিয়ে সামনে যা তাহলেই বুঝবি।
— আরে বাহ্! বউ?
— হ্যাঁ! বউ। সারেং বাড়ির বউ। যাকে চাইলেই এখন ইটের চুলায় জ্বালাতে পারবি না। জ্বালালে আঙুল উঠবে সারেং বাড়ির সম্মানে। আর সম্মান যেখানে জয়তুন আরা কাউকে গোনায় ধরে না।
— সেটা শাহবাজও ধরে না।
— না ধরলে যা, বউ নিয়ে দাদির সামনে দাঁড়া। বড় গলায় কবুল বলতে পারিস, বউ নিয়ে দাঁড়াতে পারবি না কেন? নাকি আয়নার কথায়’ই ঠিক? ভয়ে পাল্টি মারছিস।
শাহবাজ হো হো করে হাসলো! তখনই সদর দরজার বাতিটা ফট করে ফিউজ হয়ে গেলো। এরশাদ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। তাকে অবশ্য কিছু বলতে হলো না। বাড়ির উত্তর সাইডে জয়তুন আরার পোষা লোকের থাকার আলাদা ঘর করা। সেখান থেকেই কালাম দৌড়ে বেরুলো।
এরশাদ আর দাঁড়ালো না। নিজের মতো এগিয়ে গেলো। এগিয়ে গেলো শাহবাজও। তবে সারেং বাড়ির ভেতরের দিকে না। ঐ যে দক্ষিন কোণে হাফ বিল্ডিং সেখানে।
আয়না ঘুমিয়ে আছে না জেগে পৃথিলা জানে না। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছিলো। পৃথিলা নিজেই মাথা ধোয়ালো, জোর করে দু’লোকমা ভাত সাথে ঔষুধ খাওয়ালো, তার বা সাবিহার কারো কাছেই কামিজ নেই। তাই পুড়ে যাওয়া বেনারসি বদলে তার কাপড়ের মধ্যে থেকে একটা সুন্দর করে গায়ে জড়িয়ে দিলো। গহনার খুলে হাত মুখ মুখ পরিষ্কার করে, মাথায় বেনি তুলে দিলো।
জ্বর, ভয় না অন্য কোন কারণে পৃথিলা জানে না। তবে মেয়েটা একদম নিশ্চুপ হয়ে আছে। তাই মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছে, ঘুমাও। ঘুমালেই ভালো লাগবে।
মেয়েটা অবশ্য ঘুমাতে পারেনি। জ্বরে কিছুক্ষণ ছটফট করেছে। কিছুক্ষণ নিজেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছে। বড় মা, বড় মা বলে কয়েকবার কাকে যেন ডাকলো। তার সাথে অস্পষ্টভাবে কিছুক্ষণ বিরবির করলো। তারপর হয়তো ঔষুধ কিছুটা কাজ করেছে। তারপর থেকে একদম নিরব।
পৃথিলা এখন বসে আছে জানালার পাশে। দৃষ্টি বাহিরে চাঁদের আলোর দিকে। কিছুক্ষণ আগে কোন কারণে উঠানের বাতিটা ফিউজ হয়েছে। ইমরান ভাই কিছুক্ষণ দেখার চেষ্টা করলো। রাতের আঁধারে তেমন কিছু বুঝলো না। তাই হাল ছেড়ে এসে শুয়ে পড়েছে। যা করার সকালে দেখা যাবে। অবশ্য দেখার মতো কিছু নেই। বিনা কারণেই এই যে ছোট ছোট লাল বাল্ব, এগুলো ফিউজ হওয়ার বাতিক আছে।
অবশ্য এক দিক দিয়ে ভালোই হয়েছে। কৃতিম আলোয় এই যে চাঁদের মন মতানো রুপ, এগুলো চোখে পড়ে না। ফিউজ হলো বলেই তো পৃথিলা বসে বসে চাঁদের আলোর ভেলায় মন ভাসাতে পারছে।
সেই ভাসানো দৃষ্টি চাঁদের উপর থেকে নিচে নামলো কারো এগিয়ে আসার দিকে। নামতেই দেখলো চাঁদের আধো আলো, আধো অন্ধকার ভেদ করে কেউ এগিয়ে আসছে। সারেং বাড়ির ছোট নাতির সাথে এখনো তার দেখা হয়নি। তাই এমন আধো আলো, আধো অন্ধকারে চেনার কথা না। তবুও পৃথিলা বুঝতে পারলো কে? কেন পারলো কে জানে? হয়ত তার ধারণা ছিল এই অধম’ই আসবে।
তখনি দরজায় ধরাম করে দুটো পড়ল। পৃথিলা স্বাভাবিক থাকলেও, সাবিহা ধড়ফড়িয়ে উঠল। মেয়েকে ঘুম পাড়াতে গিয়ে নিজেরও চোখ লেগে গিয়েছিল।
তার স্বাভাবিক হতে হতেই ইমরান উঠল। সে ঘুমাইয়নি। ভালো করেই জানতো কেউ আসবে। এরশাদ ভাই কখনও কিছু ফেলে রাখে না। তাই স্বাভাবিক ভাবেই দরজা খুললো। খুলতেই শাহবাজ হাসলো। হেসে বললো, — নিশি রাতে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত ইমরান ভাই।
— সমস্যা নেই! ভেতরে আসো।
— ভেতরে গিয়ে কাজ কি? এমনতো না শ্বশুর বাড়ি। জামাই আদর করে, মেয়েকে দেবেন। তাই যার জন্য এসেছি তাকেই ডাকেন।
ইমরান আর কিছু বললো না। তবে এগিয়ে গিয়ে পৃথিলাদের দরজায় মৃদু টোকা দিলো। সাবিহা অবশ্য রুম থেকে বের’ই হলো না। সে মহা বিরক্ত। এই শয়তানকে সে নিজেও দেখতে পারে না। বদমাইশের বদমাইশ।
পৃথিলা ধীরে সুস্থেই উঠল। উঠে দরজা খুলে দাঁড়ালো একদম শাহবাজের মুখোমুখি। তারপর তার স্বভাব মতো শান্ত স্বরে বললো, — জামাই আদর খেতে হলে, আগে জামাই হওয়ার লায়েক থাকতে হয়। শ্বশুরের কাছে মেয়ের হাত চাইতে হয়। তারপরে দেবে না দেবে সেটা পরের বিষয়। এগুলো জোর খাটিয়ে, ক্ষমতার জোরে হয় না। হয় সম্মান, ভালোবাসায়। আমার মনে হয় না এই শব্দগুলো সাথে সারেং বাড়ির কোন মানুষেরা পরিচিত?
শাহবাজ ভ্রু বাঁকিয়ে তাকালো। এতো এতো ঝামেলার বুঝতে পারলো না কে? তাই ইমরানের দিকে জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকালো।
ইমরান সাথেই সাথেই বললো, — ওনি সাবিহার বান্ধবী। হাই স্কুলে শিক্ষক হিসেবে এসেছেন।
শাহবাজ ভ্রু নাচিয়ে বলল, — ও আচ্ছা! আপনিই সেই মহামনবী। যার জন্য আমার ভাইয়ের এই দশা।
পৃথিলাও তার মতো বললো — জ্বি না। আপনার জানায় কিছুটা ভুল আছে। আমার জন্য আপনার ভাইয়ের এই দশা না, আপনাদের জন্য’ই আপনাদের এই দশা।
শাহবাজ হেসে ফেললো! এই মেয়ের চাপার জোরে সে বলতে গেলে অবাক’ই হলো! অত্র এলাকায় তাদের সাথে সাথে চাপা চালাবে এমন মেয়ে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তাই হেসেই বললো, — বুঝতে পারছি না গো ইমরান ভাই। আজকাল সবার সুর’ই অন্যরকম লাগে। সারেং বাড়ির ভয় ডর সব কমে যাচ্ছে নাকি? যাই হোক, সময় খারাপ। সবাই একটা একটা করে পাছায় লাথি মারছে। সবচেয়ে বড় লাথি মারছে আমার পিরিতের বউ। ভাগাইয়া নিছিলাম গো ইমরান ভাই, ভাগাইয়া। ভয় ডরে তো দাদিরে মুখ দেখাইতে পারুম না। তাই নিয়া দিছিলাম উড়াল। উড়াল দিলেই বুঝি বাঁচা যায়? গ্রামের মানুষ ধইরা দিলো জন্মের এক যাঁতা। যাই হোক! লাথি যখন খাইছি, আর দাদির সামনে দাঁড়াতে কি সমস্যা। তাই দেন, আমার বউ আমারে দেন। নিয়া দাদির সামনে দাঁড়াই। সে আবার ঘোষনা দিছে। বউ ঘরে তুলবো না। কি যে যন্ত্রনায় পড়ছি বলেই পৃথিলার দিকে তাকিয়ে হাসলো। এই হাসিকে অবশ্য হাসি বলা যায় না। যাকে বলে শুধু দু’ঠোঁট ছড়িয়ে হাসির বারোটা বাজানো।
পৃথিলা আগের মতোই শান্ত। শান্ত চোখেই এই হাসি দেখলো। তবে কথার কোন আগা মাথা পেলো না। যতোদূর জানে মেয়েটা নিজের ইচ্ছায় পালিয়েছিল। সেই পালানোতে এর বড় ভাইয়ের হাত ছিল। তো? পৃথিলা ভাবলো! ভাবতে ভাবতেই কিছুটা যেন অনুমান করতে পারলো আর পাললো বলেই মনে মনে বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। মেয়েটার কপালে অনেক ভোগান্তি আছে।
শাহবাজ সেই তাকানোর দিকে তাকিয়ে বললো, — আমি আমার বউকে নিয়ে যেতে পারি মাস্টার সাহেবা?
— মেয়েটা অসুস্থ! আমি আপনার সাথে যাচ্ছি। গিয়ে বুঝিয়ে বলছি। কাল সকালে গেলেও তো কোন সমস্যা হওয়ার কথা না।
— অনেক সমস্যা।
— আমি আপনার ছোট চাচাকে বুঝিয়ে বলছি। চলুন।
— যেতে চাইলে যান, আমাকে বলছেন কেন? দুনিয়া দারির সব মেয়ের দায়িত্ব আমার ঘাড়েই পড়ছে কেন? কি আজব কারবার। একটা বিয়ের জন্য গায়ে আগুন দেয়। আরেকটা এমনি এমনি বলে “চলুন”। বাবারে বাবা!
পৃথিলা চোয়াল শক্ত করলো। সে শান্ত, ধৈর্যশীল মানুষ! তবুও আজ খুব ইচ্ছে হলো, এই ছেলের গালে ঠাস করে একটা লাগাতে। তবে নিজেকে দমালো। কাদায় ইট ছুঁড়লে কাদার কিছু হয়? বরং নিজের গা নোংরা হয়। তাই নিজেকে দমিয়ে কিছু বলবে, তখনি পেছন থেকে মৃদু স্বরে আয়না বললো, — আমি যাবো।
শাহবাজ আগের মতোই হাসলো! হেসে বললো, — মিয়া বিবি রাজি, আপনি কেন নিমরাজি মাস্টার সাহেবা?
পৃথিলা শাহবাজের কথার উত্তর দিলো না। পেছন ফিরে তাকালো! কাঁপা শরীরে কখন উঠে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করেনি। গায়ে তার বেগুনি কাপড়। কি মায়াময় একটা মুখ। যেই মুখে চাঁদের কলঙ্কের মতো রক্ত ছোপ ছোপ জমাট বেঁধে আছে।
পৃথিলা বড় একটা শ্বাস ফেললো! ফেলে আর একটা শব্দও উচ্চারণ করলো না। চুপচাপ দরজা থেকে সরে দাঁড়ালো।
দাঁড়াতেই আয়না পৃথিলার দিকে তাকালো। কি অসহায় সেই দৃষ্টি। নৌকার পাটাতনে বসে সব কথাই সে শুনেছে। তাই চিনতে কষ্ট হয়নি। তবে এই যে ঘন্টা দু’য়েক! এই দু’য়েক তার মনে হয়েছে, মায়ের বুকে আছে সে। তার ভয় নেই, কোন ভয় নেই।
পৃথিলা সেই অসহায় চোখে দিকে তাকিয়ে রইল। এই চোখ তার চেনা। ভালো করেই চেনা। তারেকের সাথে ডির্ভোসের কয়েকদিন যতোবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছে। ততবার এই চোখ দেখেছে। যেই চোখ আর্তনাদ করে বলেছে, – আমার কেউ নেই, কেউ নেই। এই যে এই বিশাল পৃথিবী। এখানে সে একা, একদম একা। আর এই একা পৃথিবীতে তার সব যুদ্ধ একাই লড়বে সে।
আয়না চোখ ফিরিয়ে এগুলো ধীরে ধীরে। না ভয়ে না, ভয় ডর অনেক আগেই শেষ। তবে শরীর কাপঁছে! জ্বর নেই, তবুও রেশ যেন আছে।
সেই রেশ, রুপ, মায়া কোন কিছুর ধার’ই শাহবাজ ধরলো না। সামনে আসতেই কব্জি থাবা মেরে ধরলো আর ধরতে দেরি চোখের পলকে টেনে ঘর থেকে নিয়ে যেতে দেরি হয়নি।
পৃথিলা শান্ত চোখেই দু’জনের দিকে তাকিয়ে রইল। বেশিক্ষণ অবশ্য দেখা গেলো না। লাইট নেই গাছগাছালিতে ভরা। চাঁদের আলো মন ভোলাতে পারে তবে ঘোর অন্ধকার না।
ইমরান পৃথিলার দিকে তাকালো না! কখনোও তাকায়ও না। পরিচয় না থাক, হাজার হলেও মনিবের মেয়ে। তাই চোখ নামিয়ে বললো — আপনি শুয়ে পড়ুন। এরশাদ ভাই আছেন। সমস্যা হবে না।
— ইটের চুলার ব্যাপারটা কি?
ইমরান একটু চমকালো! অবশ্য সাথে সাথেই সামলে নিলো। নিয়ে বললো, — জ্বি বুঝলাম না। কিসের চুলা?
পৃথিলা সেই চমকে যাওয়া দেখলো। তবে আর কিছু’ই জিজ্ঞেস করলো না। হাজার হলেও বান্ধবীর জামাই। যতোই এক বাড়িতে থাক। কিছুটা জড়তা কাজ করে। তাই দু’পাশে হালকা মাথা নেড়ে বোঝালো “কিছু না “। বলেই রুমে চলে এলো। জ্বরের ঘোরে মেয়েটা অনেক কিছুই বলেছে। পৃথিলা কিছু বুঝেছে, কিছু বুঝেনি। তবে মেয়েটার বাবা, মায়ের সাথে সারেং বাড়ির কিছু একটা সংযোগ আছে, সেটা ঠিক বুঝেছে।
সারেং বাড়ির সদর দরজা আর ইমরানে ঘরের কোণার দুটো’লাইট একসাথেই গেছে। কেন গেছে, গত দুদিনের ঝামেলায় কারো মাথা কিছুই এলো না। সবাই ভাবলো সকাল হলেই ব্যবস্থা করা যাবে। তাই অন্ধকারেই যে যার মতো রইল। সেই রওয়ার মাঝে গাছগাছির অন্ধকার, তার মধ্যে দু’দিনের ক্লান্তি, ঘুম, তাড়িতে শাহবাজ চোখে দেখছে ঘোলা। অবশ্য তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই। কেননা এই চোখের ঘোলা, অন্ধকারেই আয়নাকে গরুর মতো টেনে নিচ্ছে। সেই নেওয়ায় বাঁধা পড়ল আয়না হোঁচট খেয়ে পড়াতে।
তার পড়াতে শাহবাজের তেমন ভাবান্তর হলো না। হলো বিরক্ত, দাঁড়িয়ে থাকতেও তার কষ্ট হচ্ছে। সে নিচু হয়ে আবার আয়নার হাত ধরতে গেলো। তখনি শক্ত কাঠের এক বাড়ি তার মাথায় পড়ল। শাহবাজ থমকালো! তার থমকানের মাঝেই তার পেছনে দাঁড়ানো মুখে কাপড় বাঁধা লোকটা আবার বাড়ি তুললো। আগের টা না দেখলেও আয়না এবার দেখলো, দেখেই এক চিৎকার দিয়ে শাহবাজ কে ধাক্কা মারলো। আর মারতেই শাহবাজ তো সাইড হলো তবে সেই বাড়িটা আয়নার মাথায় সজোরে লাগলো। আর লাগতেই বিন্দু বিন্দু রক্তের ফোঁটা গুলো শিউলি ফুলের মতো ঝড়ে পড়তে পড়তে আয়নাও ধপাস করে পড়ল।
চলবে…..

