#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_ ১৫
ঘড়ির কাঁটা তখন একটা ছুঁইছুঁই। চারদিকে তখন নিস্তব্ধ ঘুমেরা ছনের, টিনের, ইটের ঘরের কোণে কোণে নিজ দায়িত্বে বিরাজ করছে, সেই নিস্তব্ধতার চাদর ভেদ করে মিঠাপুকুর সদর হাসপাতালে পরপর কয়েকটি ভ্যান ঢুকলো। একটার পর একটা। আর ঢুকতেই জয়তুন আরার লোকেদের মধ্যে কয়েকজন হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে গেলো ভেতরে । তারা যেতেই নামলো এরশাদ। ভাইয়ের মাথাটা পুরো রাস্তা শক্ত করে বুকে চেপে বসে ছিল। ছিল বলেই গায়ে ঘিরে রঙে শার্টটা রক্তে মেখে একাকার। মুখ থমথমে, চোয়াল শক্ত। সেই শক্ত চোয়ালে ঝলসে যাওয়া মুখটা যেন আরো শান্ত, গভীর, অন্য রকম ভয়ংকর।
এরশাদ ভেতরে গেলো না। সে দাঁড়িয়ে রইল, ছোট ভাইকে শুইয়ে রাখা ভ্যানের সাথেই। শাহবাজের জ্ঞান নেই! অর্ধেক রাস্তা কোনরকম ছিল। মোটা কাঠের বাড়ি। আরেকটা পড়লে এইটুকুও থাকতো না। বড় ভাইয়ের বুকে মাথা রেখে ফিসফিস করে বলেছে, — আমার ভাগের বাড়ি এই ফাজিল মেয়েটা নিয়েছে ভাই। আমার যদি কিছু হয়, তুমি নিজ দায়িত্বে একে ইটের চুলায় দেবে। শাহবাজের সাথে ঢং। এতো বড় সাহস?
এরশাদ নিশ্চুপ শুনেছে। ছোট ভাইয়ের কথায় তার ধ্যান ছিল না। তার সব ধ্যান তখন কাপড় দিয়ে চেপে রাখা শাহবাজের মাথায়। ভিজে কেমন চিপচিপে হয়ে যাচ্ছে।
তখনই স্ট্রেচার নিয়ে দৌড়ে এলো হাসপাতালের লোকেরা। শাহবাজকে তুলে নিয়েই আয়নার ভ্যানের দিকে গেলো। সেই ভ্যানে পৃথিলা, আম্বিয়া। আম্বিয়া স্বাভাবিক থাকলেও পৃথিলা থমকে আছে। তার জলপাই রঙের শাড়িও পুরো রক্তে মাখামাখি।
আয়নার চিৎকার শুনেই তারা ছুটে বেরিয়েছে। সারেং বাড়ি বিশাল উঠান নিয়ে, ইমরানের ঘরটাই বরং কাছে, তাই তারাই আগে এসেছে। আর এসেই স্তব্ধ! মাত্র দুই মিনিটের মধ্যে কী থেকে কী হয়ে গেল!
পৃথিলা কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। তবে দৌড়ে গিয়েই শাড়ির আঁচল দিয়ে আয়নার মাথাটা চেপে ধরেছে। তখনো আয়নার জ্ঞান আছে। ধরতেই নিভু নিভু চোখে তার দিকে তাকালো, কাঁপা হাতে পৃথিলার হাতের উপরে হাতটা রাখলো হালকাভাবে। অস্পষ্ট কণ্ঠে কিছু একটা বললো, পৃথিলা বুঝতে পারল না ঠিক, কিন্তু অনেক অনেক দিন পরে তার চোখ দুটো পানিতে ভিজলো। এই তো, এই তো কিছুক্ষণ আগেই এই মুখে তুলে ভাত খাওয়ালো। সেই অশ্রুসজল চোখেই পাশে পড়ে থাকা শাহবাজের দিকে তাকালো। রাতের আধো আলো আধো অন্ধাকারে খুব কিছু বোঝা যায় না, তবে ধূসর মাটিতে কালো বর্ণের কিছু উপরে তার মাথাটা পড়ে আছে। আর এই কালো বর্ণ কিসের তার বুঝতে অসুবিধা হলে না।
ইমরান ভাই, সাবিহা তখন শাহবাজকে ধরেছে। তারও জ্ঞান আছে কি নেই পৃথিলা বুঝতে পারলো না। তবে তার মনে হলো এই আধো আলো, আধো অন্ধকারেও যেন এক দৃষ্টিতে এদিকেই তাকিয়ে আছে। এর মধ্যেই সারেং বাড়ির লোকজন দৌড়ে এলো।
এত পাহারা, এত মানুষ, এতটা সতর্কতার মাঝে কার এমন সাহস হলো? কারোই কোন ধারণা হলো না। ধারণা করার সময়ও অবশ্য কেউ পায়নি। তাদের লোকেরা দৌড়ে কোথা থেকে ভ্যান আনলো পৃথিলা জানে না। তবে ভ্যান আসতেই হাসপাতালের জন্য বেরিয়েছে।
মফস্বল গ্রামের হাসপাতাল। যতোই সদরে থাক চিকিৎসার অবস্থা বড়ই করুন। তার মধ্যে এতো রাত ভালো ডাক্তার নার্স কিছুই নেই। তবে যেই ডিউটি ডাক্তার ছিল সে’ই সারেং বাড়ির কথা শুনে দৌড়ে বেরুলো। সাথে সাথে জরুরি বিভাগে তাদের নেওয়া হলো।
নিস্তব্ধ রাতে, নিস্তব্ধ হাসপাতালের করিডোরে সবাই নিস্তব্ধতার চাদরে মুরিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। দাঁড়িয়ে রইল পৃথিলাও। এখানে সে কেউ না। কোন অধিকারও নেই। কেন আছে, নিজেও জানে না। তবে ভ্যানে যখন আয়নাকে তোলা হলো, সে নিজেও উঠে বসলো। আয়নার মাথাটা নিজের কোলে নিলো। ভেবেছিল কেউ কিছু বলবে। তবে সেই রকম কিছুই হলো না। জাফর লোকটা শুধু এগিয়ে ধরা গলায় বললো, — চেপে শক্ত হয়ে বসো মা, মাটির এবড়ো থেবড়ো রাস্তা, তাল সামলাতে পারবে না।
ফরহাদ যখন হাসপাতালে পৌঁছালো তখন ঘড়ির কাটা দুইটার ঘরে। মধ্য রাত হলেও গ্রামের অনেকের ঘরেই এই খবর পৌঁচ্ছে গেছে আনায়াসেই। তাদের ঘরেও তেমন, আর পৌঁছুতেই ঘুম থেকেই তার মা টেনে তুলে বললো, — সারেং বাড়িতে হামলা হইছে। শাহবাজ আর আয়নার উপরে। তাদের সদরে নেওয়া হইছে।
এক জ্বর তার মধ্যে আকস্মিক ঘুম থেকে টেনে তোলায় ফরহাদ প্রথমে বুঝতে পারলো না। আর যখন বুঝল ধড়ফড়িয়ে উঠল। উঠে ঘরের গেঞ্জির উপরেই কোনরকম প্যান্টটা পরে দৌড়ে বেরুলো।
হাসপাতালে পৌঁছেই ফরহাদ এরশাদকে খুঁজলো। সে করিডোরে নেই। জাফরের দিকে তাকাতেই বললো, — বাহিরে।
ফরহাদ এগিয়ে গেলো। হাসপাতালের এক সাইডে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে সিগারেটের আগুন উঠানামা করছে।
ফরহাদ এগিয়ে গেলো। গিয়ে নিশ্চুপ পাশে দাঁড়ালো। এরশাদের তেমন ভাবান্তর হলো না, তবে নিজের আধ খাওয়া সিগারেট ফরহাদের দিকে এগিয়ে দিলো।
ফরহাদ নিলো স্বাভাবিক ভাবেই। নিয়ে টান দিয়ে বললো, — কিভাবে হলো?
— সম্ভবতো ইমরানের ঘরের কোণা দিয়ে এসেছে। এই সাইডে তো আমাদের দুনিয়ার লোক। ওদের সাইডটাই নিশ্চুপ।
— দুই বাড়ির রাস্তাটা আটকে দিলেই তো পারিস।
— বীণা, সাবিহাদের ওখানে আসা যাওয়া করে। তাছাড়া ইমরানের সাথেও অনেক কাজটাজ থাকে। বন্ধ করলে এক মল্লুক ঘুরে সদর দরজা দিয়ে আসতে হবে।
— ওদের অবস্থা কি?
— কিছু হবে না।
ফরহাদ ভ্রু কুঁচকে তাকালো! এরশাদ ফরহাদের হাত থেকে সিগারেট নিয়ে আবার টান দিয়ে বললো, — মারার জন্য এই আক্রমন হয়নি। হলে কেউ এতো রিস্ক নিয়ে কাঠের টুকরো নিয়ে আসে না। লোহার হাতিয়ার বা অন্য কিছু। যেন এক বাড়িতেই কাজ খতম।
— তাহলে?
এরশাদ উত্তর দিলো না। সিগারেটের শেষ অংশ পায়ে পিষলো।
তখনি আয়নার চাচার হাউকাউ শোনা গেলো। খবর পেয়ে সেও দৌড়ে এসেছে। আর এসে সব দোষ সারেং বাড়ির লোকদের দিচ্ছে। জাফরের সামনে গিয়ে গলা চড়ে একচোট চোটপাটও করলো। করবে না কেন? পাঁচ জনের সামনে দায়িত্ব নিছে। কেমন দায়িত্ব নিলো? কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তার ভাতিজি মরার সাথে লড়ছে।
এরশাদ এগিয়ে গেলো। গিয়ে অবশ্য ডানে বামে কোন দিকেই গেলো না। সোজা গেলো আয়নার চাচার সামনে। গিয়েই কান বরাবর একটা মারলো।
আয়নার চাচা শুকনো মানুষ। উলটে পৃথিলার পায়ের কাছে পড়লো। পৃথিলা হতম্ভব! অন্তত এই মানুষটার কাছ থেকে এমন কিছু আশা করেনি। সারেং বাড়ির এতো মানুষের মাঝে একমাত্র এই লোকটাকে’ই কেন জানি অন্য রকম মনে হয়েছিল।
তার হতম্ভব কে আরো বাড়িয়ে এরশাদ এগিয়ে আয়নার চাচার সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো। বসে বললো, — মেয়ের জন্য প্রস্তাব কি গেছে বাড়িতে , কলিজা গলা পর্যন্ত উঠে গেছে। সারেং বাড়ির মানুষের সামনে আঙুল নাচিয়ে গলা চড়ে কথা বলিস। এতো সাহস! শুধু আয়নার চাচা বলে এখনো বেঁচে আছিস। তা না হলে হাওয়ায় মিশে যেতি। এখন ওঠ! ওঠে সোজা নাক বরাবর হাঁটা ধরবি। আয়না নামের কাউকে চিনতি একেবারে ভুলে যাবি। আয়না এখন সারেং বাড়ির বউ। মরবে, বাঁচবে, যা হবে সব সারেং বাড়ির মানুষ দেখবে। আর একবার যদি এই মুখ এরশাদ দেখে। তোর কমস, এবার চুল যাবে না, সোজা মাথা।
বশির কাঁপতে কাঁপতে উঠল। এরশাদের এই রুপ আজ পর্যন্ত কেউ দেখে নি। বরং ভদ্র নম্রের খেতাব তার আছে। তবে আজ কি হলো? সে হন্তদন্ত হয়ে যেভাবে এসেছিল, সেভাবেই দিক বেদিক না দেখেই দৌড়ে গেলো। পৃথিলা এখনোও হতম্ভব। সেই হতম্ভব মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়েই এরশাদ উঠে দাঁড়ালো।
পৃথিলা নিজেও এখানে বাহিরের। যেখানে আয়নার চাচাকে স্পষ্ট ভাবে বলা হলো। সেখানে সে কে? পৃথিলা উঠে দাঁড়ালো। বাইরে ভ্যানগুলো এখনো সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো। কাউকে বললেই নিয়ে যাবে। সে ঘুরে বাইরে যাবে তখনি এরশাদ শান্ত ভাবে বললো, — আপনাকে কিছু বলা হয়নি।
পৃথিলা ভ্রু কুঁচকে ফিরে তাকালো। সেই ভ্রু কুঁচানো চোখের দিকে তাকিয়ে এরশাদ আগের মতোই বললো, — এক সাথে এসেছি, ইনশাআল্লাহ আমার ভাই, ভাইয়ে বউকে নিয়ে একসাথেই ফিরে যাবো।
পৃথিলা সোজা দাঁড়ালো! দাঁড়িয়ে বললো, — এইসব কে করেছে?
— আমি জানি না।
— কেন করেছে?
— বলতে পারছি না।
— কিসের ক্ষমতা দেখান আপনার? নিজেদের মানুষকেই দেখে রাখতে পারছেন না। অহংকার, জেদ, ক্ষমতা কখনোও ভালো কিছু বয়ে আনে না। এই যে আজ যা হলো, হয়ত আপনাদের কোন কর্মকান্ডের’ই অংশ। আর আপনাদের অংশে নির্দোষ মেয়েটা ফেসে গেছে।
এরশাদ কিছু বললো না। বাকি জীবনে এই মুখের উপরে কিছু বলতে পারবে বলে মনেও হয় না। তার অবস্থা তার দাদার মতোই হবে। উঠতে বললে উঠো, বসতে বললে বসো।
পৃথিলা চোখ ফিরিয়ে নিলো। নিতে নিতে বললো, — লোকটা আপনার বাবার বয়সী ছিল। হয়ত সে ভুল, তবে হাতটা না ওঠালেও চলতো।
এরশাদ এবারো কিছু বললো না। তাবে এক নার্স এসে বললো, — মেয়েটার জন্য রক্ত লাগবে। রক্তের গ্রুপ এ পজেটিভ।
জাফর,পৃথিলা দু’জনে এক এক সাথেই বললো, — আমার এ পজেটিভ। জাফর অবাক হয়নি, নিজের মেয়ে, মিল থাকা স্বাভাবিক। পৃথিলা ও অবাক হয়নি। এই পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষের রক্ত এ পজেটিভ।
বরং সে স্বাভাবিক ভাবেই বললো, — আপনি বসুন! আপনি বয়স্ক মানুষ। তাই আমি দিচ্ছি। বলেই এগিয়ে গেলো। এগিয়ে গেলো এরশাদও। ডাক্তার কে দেখে জিজ্ঞেস করলো, — আমার ভাইয়ের কি অবস্থা?
— আঘাত ভালোই। তবে অন্ধকারে বাড়িটা হয়তো যে ভাবে দিতে চেয়েছিল সে ভাবে দিতে পারেনি। তাই আপাতত দুশ্চিন্তার কিছু নেই। তবে আপনার ভাইয়ের চেয়ে মেয়েটার টা বেশি গুরুতর।
— সমস্যা হবে নাতো কোন?
— আপাতত দেখছি না। জ্ঞান ফিরুক তারপর বাকিটুকু বোঝা যাবে।
জয়তুন আরা বসে আছেন পাথর হয়ে। ঐ যে সারেং বাড়ির খোলা লম্বা টানা বারান্দা, চুপচাপ সেখানে। তার পাশেই সাবিহা, বীণা। ইমরানও সাথে গেছে। তাই সাবিহা এক হাতে মেয়ে, আরেক হাতে বীণাকে ঝাপটে ধরেই বসে আছে। মেয়েটার শরীর থরথর করে কাঁপছে। জ্ঞান হওয়ার পরে তো আর এমন কিছু দেখে নি। শুধু দেখেছে সারেং বাড়ির ক্ষমতা। সেই ক্ষমতা এই প্রথম ধুমড়ে মুচড়ে যেতে দেখলো।
জয়তুন আরা কাঁদেন না। শেষ বার তার চোখ ভিজেছিল তার বড় ছেলের লাশটার মুখে হাত বুলিয়ে। নিজের পেটের সন্তান না, তবে এই সন্তানটা তার কলিজা ছিল, বুকের ধন ছিল। এই হাতের উপরেই বড় করেছে। করেছে বলেই বিশাল এক পাপ করতেও তার হাত একবার কাঁপেনি। কাঁপা তো দূর আজ পর্যন্ত একবারের জন্য আফসোসও আসেনি। সেই জসিমের গলাটা তার চোখের সামনে কাটা হয়েছিল। আহা যন্ত্রণা! আহা ছটফট! সেই ছটফটের কষ্টটা যেন জয়তুন অনেক অনেক দিন পরে আবার পেলো। আর পেলো বলেই। অনেক অনেক দিন পরে তার চোখের কোণাটা আবার ভিজে উঠল।
সেই ভেজা চোখের পাতার ভেসে উঠল অনেক দিন আগের একটা রাত। সেই রাতটা ছিলো আষাঢ় মাসের এক ঘন বর্ষার রাত। সন্ধ্যা থেকে অবিরাম বৃষ্টি । রাত হতে হতে সেই বৃষ্টির প্রকোপ যেন বাড়লো, আরো বাড়লো।
জাফর সেইদিন বাড়ি ছিল না। তখন সে দু’এক দিন পরপর’ই শহরে দৌড়ে যায়। কেন যায় জয়তুন আরা জানে। তার প্রথম স্ত্রী শায়লা কে খুঁজতে। জয়তুন অবশ্য সব জেনেও আর কখনো কিছু বলেনি। কেননা খোঁজ সে নিজেও করেছে। অবশ্য ছেলের ঘর বসানোর জন্য না, চিরদিনের জন্য মিটিয়ে ফেলার জন্য। কিন্তু আফসোস! জাফর যেমন খোঁজ পায়নি, সে নিজেও পায়নি। তাই হাল ছেড়েছে।
তখনতো তো আর এই বাড়িটা এখনের মতো ছিল না। চারিদিক ছিল খোলা। বাড়ির মানুষজন ছাড়া তেমন কোন মানুষজনও নেই। যার যার রুমে সে সে সুখ নিদ্রায় ব্যস্ত। সেই ব্যস্তটা জয়তুনের ছুটলো একটা শব্দে। জয়তুন ধড়ফড়িয়ে উঠলো। নিচে আম্বিয়া মা, আম্বিয়া আর সে ছাড়া কেউ থাকে না। সবাই উপরে। তাই এই ঝড় বৃষ্টির রাতে শব্দটা তার কানেই আগে এসেছে।
শব্দটা এসেছে বাড়ির পেছন থেকে। পেছনে ছোট একটা কাঠের দরজা আছে। আগে যখন হিন্দু বাড়ি ছিল তখন মহিলারা এটা দিয়ে নদীর ঘাটে আসা যাওয়া করতো। সেটা যে ভাঙা হচ্ছে বোঝার বাকি রইল না। সে দৌড়ে আম্বিয়ার মার রুমে যেতে চাইল। অবশ্য যাওয়ার সুযোগ পেলো না। তার আগেই লাল গামছা মুখে বাঁধা একদল লোক পুরো নিচের ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলো। আধো আলো, আধো অন্ধকারে হারিকেনের আলোয় জয়তুন কাউকেই চিনলো না। এমন ভাবে মুখ বাঁধা চেনার কথাও না।
শব্দ আম্বিয়ার মায়ের কানেও গেছে। গেলেও তার কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে ছোট আম্বিয়াকে খাবার ঘরের গলি দিয়ে উপরে পাঠালো। ছোট খাটো আম্বিয়া অন্ধকারে কারো নজরে পড়লো না। তবে আম্বিয়ার মা ঠিক পড়ল। আর সারেং বাড়িতে সেই দিন রাতে প্রথম রক্তের ফোঁটাটা আম্বিয়ার মায়ের’ই পড়ল।
জয়তুন নিষ্পলোক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তাকে সম্মানেই বসানো হয়েছে চেয়ারে। আর এই সম্মান কেন জয়তুনের বোঝার বাকি রইল না। আম্বিয়ার মতো সহজ মৃত্যু তাকে যে দেওয়া হবে না, সে ভালো করেই বুঝলো।
ততক্ষণে উপরের সবাই জেগে উঠেছে। জসিম কি করবে বুঝে উঠতে পারে না। এক দিকে মা আরেক দিকে সন্তান, স্ত্রী। বীণার বয়স তখন মাস ছয় এক। তার জন্ম একটু দেরিতেই। আর ইচ্ছে ছিল না। তবে আল্লাহ ঘর আলো করে দিয়েছে।
সেই ঘুমন্ত আলোকে এরশাদের কোলে আর শাহবাজ, আম্বিয়ার ছোট হাতটা দুটো দিয়ে বলেছিলো। সোজা ছাদে যাবি, ছাদের ঘরে যেই চোবাচ্চাটা আটকে দেওয়া হয়েছে, সেটার ভেতরে বসে থাকবি। যা’ই হয়ে যাক বের হবি না।
এরশাদ দৌড়ে গিয়েছিল। এই তুমুল বৃষ্টিতে ছোট ছোট ভাই বোনকে নিয়ে সেই চৌ-বাচ্চা ভেতরে গিয়ে’ই পালিয়েছিল। তবে মা, চাচির আর্তনাদ শুনে থাকতে পারেনি। ছোট ভাইয়ের কোলে ছোট্ট বোনকে দিয়ে দৌড়ে নিচে এসেছিল। আর আসতেই দেখেছিল নিজের বাবার – মায়ের খন্ডিত মাথাকে। নিজের মা সমান ছোট চাচির লাশ টা দেখেছিল বিবস্ত্র অবস্থায় একদল হায়নাদের মাঝে। ব্যস! বিশ বছরের যুবকের শরীরে যেন সেই আষাঢ়ের রাতে আজরাইল ভর করেছিল। করেছিল বলেই আজরাইরের রুপ দেখে প্রতিটা হায়নার বুক কেঁপে উঠেছিল।
জয়তুন আরা শুধু দেখেছিল হাতে তাদের বাড়ির ঐ যে বড় বড় রুই কাতলা কাটার বঁটিটা আর জ্বলজ্বল করা দুটো চোখ। যেই চোখে আগুন, যেই আগুন স্পষ্ট করে বলছে, আজ নিজে মরবে, না হয় এদের মারবে।
একেক পর কোপ পড়েছিল একেক জনের গায়ে। সে সামনে পিছনে কিছুই দেখেনি। যে সামনে এসেছে তাকেই এলোপাথাড়ি কোপ। সেইদির সারেং বাড়ির ঘরে একের পর এক লাশ পড়েছিল। বাকি ছিল মাত্র তিন চারজন। এরশাদের মরার ভয় ছিল না, তবে তাদের ছিল। আর বুঝেছিল, একে বাগে আনা তাদের পক্ষে সম্ভব না।
তাছাড়া বৃষ্টির তেজ কমে আসছিল, রাতও শেষের দিকে। গাঁও গ্রামের মানুষদের কাছে সন্ধ্যা মাঝরাত হলেও ভোর হয় সূর্য ওঠার আগে। তাই তারাও বুঝেছিল, আশেপাশের মানুষ ঠিকই সজাগ হয়ে যাবে।
ব্যস, যাওয়ার আগে এক কেরোসিন তেলের হারিকেন জয়তুনের মুখ বরাবর মারল। জয়তুন তখন নিস্তেজ, রক্তে ভেসে যাওয়া নদীর মাঝে বসে আছে চুপচাপ। সে সরেনি, কিন্তু এরশাদ ধাক্কা দিয়ে ঠিকই সরিয়েছিল। আর সরতেই হারিকেনটা লেগেছিল তার মুখে। লাগতেই কাচটা ভেঙে চৌচির।
কেরোসিনের ছিটায় সেই ভাঙা কাচে আগুন লাগতে সময় লাগেনি। আর লাগতেই সারেং বাড়ির ইটের প্রতিটা কোণা এরশাদের আর্তনাদে কেঁপে উঠেছিল।
উঠেছিল জয়তুনও। কিভাবে টেনে উঠান পর্যন্ত নিয়েছিল, তার জানা নেই। শুধু মনে আছে, পাগলের মতো উঠানের কাদা পানি সব এরশাদের মুখে চেপে ধরছে। সেই ধরায় তার ছটফট কমে না। বাড়ে, আরো বাড়ে, বাড়তে বাড়তে এক সময় একেবারে নিস্তেজ হয়ে পড়ে রয় । নিস্তেজ হতে হতে গায়ে হায়েনাদের রক্তগুলো টিপ টিপ পানিতে ধুয়ে মুছে উঠানের কাদায় মাখামাখি হয়। জয়তুন দেখে, নিশ্চুপ দেখে। দেখতে দেখতেই নরম কোমল সূর্যটা পূর্ব আকাশে উঁকি দেয়।
এই যে অনেক অনেক দিন পরে আজ যেমন দিচ্ছে। জয়তুন তার বৃদ্ধ হাতে চোখের পানি মুছে ধীরে ধীরে উঠানের ঠিক সেই জায়গাটায় এসে দাঁড়াল, যেখানে অনেক অনেক দিন আগে তারা দুটো মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়ে ছিল। যেখানে দাঁড়িয়েই ঐ যে মেঘের শেষে সূর্যটা উঁকি দিতে দেখেছিল।
সেখানে দাঁড়িয়েই আজ চোখ বন্ধ করল। করতেই আলাউদ্দিনের অনেক দিন আগের একটা কথা তার কানে বাজতে লাগল — কেন করলে এই পাপ সখী।
দুনিয়াতে সব মোছা যায়, তবে পাপ না। সেটা ঘুরে ফিরে আসবেই। তুমি বিন্দু পরিমাণ করবে, সেটা অথৈ সাগর হয়ে ফিরে আসবে । এই ফেরার শেষ নেই। পিড়ির পর পিড়ি চলে, চলতেই থাকে। আর তুমি তো করলে মহাপাপ। এই মহা পাপের ভার সইতে পারবে তো?
চলবে…..

