ধূপছায়া #নূপুর_ইসলাম #পর্ব_৪৪

0
2

#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৪৪

আয়নার খালার নাম কুলসুম। বয়সে আয়নার মায়ের চেয়ে এই বছর দুই এক বড়। অভাবের তাড়নায় শহরমুখী হয়েছিলেন। অভাব কিছুটা কমেছে তবে আর গ্রামে ফেরা হয়নি। ঝুপড়ি এলাকায় দু-রুমের টিনের ঘর নিয়ে ভাড়া থাকেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গার্মেন্টসে কাজ করেন। সন্ধ্যায় ক্লান্ত শরীরে আর ডানে, বামে চোখে দেখেন না। কোন রকম কয়টা পেটে দানা ফেলেই বিছানায় শরীর এলিয়ে দেন। সেই দেওয়ায় একেবারে সকাল। তবে আজ তার ঘুম ভাঙলো রাতের মাঝামাঝি প্রহরে। কেউ দু’পাল্লার কাঠের দরজায় টোকা দিচ্ছে।

কুলসুম কিছুটা ধড়ফড়িয়ে উঠল। তার স্বামী এক কারখানার দারোয়ানের চাকরিতে আছে। আজ নাইট ডিউটি। তার নাইট ডিউটি থাকলে কুলসুম কিছুটা ভয়ে ভয়ে থাকে। ভয়ে থাকার অবশ্য কারণ আছে। ঘরে তার সেয়ানা দুটো মেয়ে। ঝুপড়ি এলাকা, দিন যেমন তেমন, রাত নামলেই চরিত্র পাল্টাতে থাকে। তার মধ্যে চেহারা কাটিং ভালো। ভালোর দিকে নজর আগে পড়ে। মাস খানেক আগে তাদের দু’ বাড়ি পরের এক মেয়েকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে গেছে। তাই রাতদিন সেও খুব আতঙ্কে থাকে।

তখনই আবার দরজায় টোকা পড়লো। যারা তুলে নিতে আসে, তারা দরজায় টোকা দেয় না, লাথি বসায়। তাই নিজেকে সামলে বলল, — কেরা?

ওপাশ থেকে তার ভাসুরের ছেলে বলল, — চাচি, আমি রমিজ।

কুলসুম হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। বাঁচলেও মনে মনে কিছুটা বিরক্ত হলো। শহরে থাকার এই জ্বালা। গ্রাম থেকে কেউ এলেই রাত নাই, দিন নাই, বাড়িতে উইঠা আসে। অবশ্য বলতে গেলে রমিজ প্রায়ই আসে। গ্রামের এটা সেটা, গাছের ফল, খোয়ারের মুরগি, পিঠা চিরা দু’হাত ভরে নিয়ে আসে। কেন আসে, সে জানে। জেনেও লাই দেয়। একটা মেয়ে ঘাড় থেকে নামলে তার বোঝাই কমে। তবে সব সময় আসে দিন দুপুরে। আজকে এমন রাত বিরাতে কেন? কোন বিপদ হয়নাই তো? বলেই কিছুটা তাড়াতাড়িই উঠল। বাতি জ্বালিয়ে দরজা খুলতেই ভ্রু কুঁচকে তাকালো। রমিজ একা না, বরং তার সাথে আরও দু’তিনজন। দরজা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মধ্যে থেকে একজন ঘাড় কাত করে দু’ঠোঁট ছড়িয়ে হেসে বলল, — “আসসালামু আলাইকুম খালা শাশুড়ি। আমি সারেং বাড়ির ছোট নাতি আর আপনার প্রিয় ভাগ্নি আয়নার স্বামী।

কুলসুম ঢোক গিলল। আয়নার ব্যাপারে সে সবই জানে। এই রমিজের মাধ্যমেই সব খবরা খবর নেয়। তবে তার আর ক্ষমতা কতদূর? টেনেটুনে চলা সংসার। তবুও সারেং বাড়ির বউ সে হতে দিতে চায়নি। যখন শুনেছে আয়না পালিয়ে তার কাছে আসছে, খুশিই হয়েছিল। দৌড়ে স্টেশনে গিয়েছিল। এক সকাল থেকে আরেক সকাল স্টেশনে বসে ছিল। আয়না আসেনি। তখনই বুঝেছে কোন অঘটন ঘটেছে। ছুটে গিয়েছিল মিঠাপুকুরে। ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। আয়না সারেং বাড়ির বউ। আর সেই বাড়ির বউকে টেনে বের করার ক্ষমতা কি আর তার আছে?

শাহবাজ তার চেলা বেলাদের নিয়ে ভেতরে এলো স্বাভাবিক ভাবে। ছোট টিনের ঘর। মালামালে ঠাসাঠাসি। তাদের তিন-চারজনেই ঘর ভরে গেছে। সেই ঘরের দরজার কোণেই কুলসুম ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। শাহবাজ আগের মতোই হেসে পুরো ঘরে চোখ বুলাতে বুলাতে তার চেলার একজনের উদ্দেশ্য বলল,– দরজাটা লাগিয়ে দে মান্না। রাত বিরাতে একসাথে এতগুলো পুরুষ সেয়ানা মেয়ের বাড়িতে ঢোকাতো ভালো কথা না। পাড়ায় বদনাম রটাবে। হাজার হলেও শালি। একটা দায়িত্ব আছে না। তাই যা হোক দরজার আড়ালেই হোক।

কুলসুমের কলিজা কেঁপে উঠল। আয়না কি কিছু করেছে? কি করেছে? সিধেসাদা মেয়ে তাদের। আল্লাহ রক্ষা করো। বলেই ভয় মাখা দৃষ্টিতে রমিজের দিকে তাকালো। সে চোখে মুখে অপরাধ বোধ নিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। এলোমেলো চুল, ঠোঁট এক সাইডে ফোলা। অন্ধকারে এতক্ষণ বোঝা না গেলেও, ঘরের আলোতে ঠিক বুঝল। রমিজ ইচ্ছে করে আসেনি, বরং তাকে টোপ হিসেবে নিয়ে আসা হয়েছে। কিন্তু কেন? নাকি সত্যি সবাই জেনে গেছে?

কুলসুমের মাথা ঘুরতে লাগল। শাহবাজ কুলসুমের রক্তশূণ্য মুখটা দেখলো। এই মুখ’ই বলে দিচ্ছে সব জট এখানেই খুলে যাবে। তাই খাটের গিয়ে আরাম করে বসতে বসতে বলল, — দেখেন, আমার হাতে সময় কম। জামাই, শাশুড়ি, কোনো রকম বেয়াদবি করতে চাই না। তাই যা জিজ্ঞেস করবো, সুন্দর করে ফটাফট বলবেন। কেননা, জিজ্ঞেস একবারই করব। উত্তর দিতে দেরি হলেই আমার এই চেলা-পালারা আপনার ওই মেয়েদের রুমে যাবে। গিয়ে তো হাত পা গুটিয়ে বসে থাকবে না। ঐ যে বললাম, সময় কম। আপনার সম্মানও থাক, আমারও থাক। তাই বলেনতো, আয়নার বাবা-মা গায়েব হয়েছে কেন?”

কুলসুম থরথর করে কাঁপতে লাগলো। তার চোখে পানি। তবে গলায় কথা আসে না। তার বোনের শেষ স্মৃতি। সত্য জানলে তো বাঁচতে দেবে না।

শাহবাজ বড় একটা শ্বাস ফেললো! ফেলে তার চেলা-পালাদের দিকে তাকালো। তাকাতেই তারা দাঁত বের করে হাসলো। সেই হাসি কুলসুমের কাছে দানবের হাসির মতো লাগলো। তাই তারা এগোবে তখনই তার শরীর ছেড়ে দিলো। দিতেই ধপ করে নিচে গড়িয়ে পড়ল।

শাহবাজ বিরক্ত মুখে বলল, — এই মাইয়া-মানুষের ঢং দেখে আর বাঁচি না। যেমন ভাগ্নি, তেমন তার খালা। সোজা কথা কানেই নেয় না। ঐ চোখে-মুখে পানি ঢাল। এমনিতেই সময় কম, তার মধ্যে যত ঢং।

কুলসুমের জ্ঞান ফিরলো কিছুক্ষণ পরেই। না ফিরে উপায় কী? ঘরের কলসি উপরে মনে হয় তার উপরে ঢালা হয়েছে। মাথা তো ভালোই, গায়ের কাপড়ও ভিজে একাকার। সে সেই ভেজা শরীর নিয়েই দেয়ালে হেলান দিয়ে বসলো। তার পাশেই দুই মেয়ে। ঘুম থেকে মনে হয় টেনে তুলেছে। ভয়ে তারা আধমরা হয়ে আছে।

শাহবাজ ততক্ষণে হাত পা ছড়িয়ে খাটে শুয়ে পড়েছে। চোখ বন্ধ, সেই ভাবেই বলল, — আধা ঘণ্টা এমনিই নষ্ট করে ফেললেন। দুপুরের আগে আবার বাড়ি ফিরতে হবে আমার। এখন আপনি কী চান, আপনিই বলেন?

— আমি কিছু জানি না, বাবা।

— ছোট বোন, ছোট বোনের জামাই গায়েব, দুঃখ টুঃখ ভাগ করেও নেননি? ছ্যা! কেমন বোন আপনি?

কুলসুম কথা বলে না। শাহবাজ চোখ খুললো, ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়ে বলল, — রাতের ঘুম হারাম করে প্রথম বার খালা শাশুড়ির বাড়িতে এসেছি। খালি মুখেই ফেরাবেন? এটা তো আমার প্রতি অন্যায় হয়ে গেলো।

— আমি সত্যি বলতাছি বাজান, আমি জানি না।

— না জানলে আর কি করার। বলেই তার চেলাদের দিকে তাকালো। তাকিয়ে স্বাভাবিক ভাবে বলল,– অন্যায় যা হওয়ার আমার সাথে হোক, তোদের সাথে হবে এটাতো মানতে পারি না। তাই যা, মিষ্টিমুখ কর। তাড়াতাড়ি কর। ফিরতে হবে। ঘরে আমার সুন্দরী বউ, দূরে থাকতেও তো এখন কলিজায় টান লাগে।

মান্না দাঁত বের করে হেসেই কুলসুমের বড় মেয়ের দিকে এগুলো। বড় মেয়ে ভয়ে কুলসুমের গলা ঝাপটে ধরলো। ধরতেই কুলসুম চেঁচিয়ে বলল, — বলতাছি, বলতাছি আমি!

শাহবাজ ঝট করে উঠে বসলো। কিছুটা ঝুকে তীক্ষ্ণ ভাবে তাকিয়ে বলল, — আয়নার বাবা, মা গায়েব। তারা দুনিয়ায় আছে না গেছে।

কুলসুম আস্তে করে দু’পাশে মাথা নাড়লো। শাহবাজ ভ্রু কুঁচকে বললো,– কে মেরেছে?

— মহাজন।

শাহবাজ শুনেই হেসে ফেললো। তার বোকা বউ। বাপ-মায়ের খুনিদের গলা জড়িয়ে ধরে, বসে বসে শোক পালন করছে। আর এদিকে ঘৃণা করি, ঘৃণা করি বলে তার মাথার পোকা নাড়িয়ে ফেলছে। সে হেসেই বললো,– কেন?

কুলসুমের বুক কাঁপে। গলা শুকিয়ে গেছে। গাল বেয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ে।

শাহবাজ এবার অবশ্য বিরক্ত হয় না। বরং আগের মতোই বলল,– কেন?

কুলসুম কিছুক্ষণ নিশ্চুপ তাকিয়ে রইল। তারপর নিস্তেজ গলায় বলল, — সারেং বাড়িতে যে ডাকাতি হয়েছিল, তার মধ্যে আয়নার বাবাও ছিল।

শাহবাজ যেভাবে বসে ছিল, সেভাবেই বসে রইল। চোখ, মুখ আগের মতোই স্বাভাবিক, নির্বিকার। যতোই বড় ভাইয়ের বিপরীত হোক। গায়ে তো একই রক্ত। কিছুটা গুণ অজান্তেই মিলে যায়। তাই তো ঘরে উপস্থিত একটা মানুষও বুঝল না, কতোটা ধাক্কা সে খেয়েছে। এই যে বসে আছে, মনে হচ্ছে গলা কেউ চেপে ধরেছে। এমন ধরা ধরেছে, নিশ্বাস ফেলতে গিয়ে টের পাচ্ছে কতোটা কষ্ট। তার বাবা মায়ের খুনির মেয়েকে যে মন দিয়ে বসে আছে।

কুলসুম চোখের পানি মুছল। মুছে আগের মতোই বলল, — সেই দিন রাতে তিন-চারজন ফিরে এসেছিল। সেই তিন-চারজনের মধ্যে, একজন মহাজন, আরেকজন আয়নার বাবা। আয়নার বাবা মহাজনের ডান হাত ছিল। তোমাগো ইটের ভাটায় কাজ করতো নামমাত্র। কাজ করতো কম, খবর পাচার করতো বেশি। তবে সারেং বাড়িতে ডাকাতির লোভ কখনও করেনি। তাদের মাথা নষ্ট করেছে মহাজন। বলেছে, যা লুট হবে, সব তাদের। সে শুধু চায় রক্ত। ব্যস! ঘরে তো সবারই ভাতের অভাব। এমন সুযোগ ছাড়ে কে ? তাছাড়া সারেং বাড়ির অলিগলি মহাজন চেনে। ভালো করেই চেনে। তাই আর সমস্যা হবে কি? হয়ও নাই। তারা শুধু একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। সেই সুযোগ এলো সেই দিন। জাফর ভাই শহরে গেলেন, আর আকাশ ভেঙে নামলো বৃষ্টি। ব্যস! তারা তাদের কাজে নেমে গেলো। তবে তোমার ভাইয়ের রূপ অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল। এতোগুলো মানুষকে এই বয়সে কেউ মাত করতে পারবে, তাদের ধারণা ছিল না। তাই জান বাঁচিয়ে পালিয়েছিল।

তবে পালালে কি হবে। তোমার ভাই যা শুরু করেছিল, মহাজনের সত্য বেশিদিন গোপন থাকতো না। সে তার রাস্তা পরিষ্কার করেছে। যে তিনজন ছিল, সেই তিনজনকে মহাজন গায়েব করে ফেলেছে। আর করতে তার কোন সমস্যাও হয় নাই । সারেং বাড়ির হাজার বদনামের সাথে সেটাও জুড়ে গেছে।

আমি সব কিছু জানি অনেক পরে। আয়নার মা সব জেনেও চুপ হয়ে যায়। কেননা, মুখ খুললে হয়তো মহাজনের সত্য আসতো, তবে এরশাদ তাদের কাউকেই জীবিত রাখত না। না মহাজন, না তাদের। সে তখন উন্মাদ। নিজের, নিজের পরিবার, আর এই যে ছোট্ট আয়না তার মুখের দিকে তাকিয়ে একেবারে মুখে প্রলেপ দিয়ে বসে। তবে মহাজনের দারস্ত আর হয় নাই। স্বামী নাই, অভাবের সংসার। আর কোথায় যাবে? সেই আবার সারেং বাড়ির ইটের ভাটা। তবে মহাজন আবার তার পেছনে লাগলো। এরশাদ ততদিনে সারেং বাড়ির সামনে এমন এক দেয়াল দাঁড় করিয়েছে, চাইলেই সেটা টপকানো যায় না। তার তো ভেতরের খবর চাই। যে কোন মূল্যে চাই।

তখনই আমাকে বললো। আমি তখন বউ মানুষ। কী করবো? বললাম, আয়নাকে নিয়ে পালিয়ে যা। সেও সেটাই ঠিক মনে করলো। কিছুদিন ইটভাটায় আসা-যাওয়ার অভিনয় করলো। বাড়ি থেকে ইটভাটার জন্য বের হলেও, বসে থাকতো আমাদের বাড়িতে এসে। মহাজন যে তাকে যেতে দেবে না, সে ভালো করেই জানে। ভেবেছিল, এমন আসা-যাওয়ার মাঝেই টুপ করে একদিন পালাবে। সেই দিনটা আর আসে নাই। একদিন বের তো হয়েছিল, তবে না আমার বাড়িতে এসেছিল, না পালিয়েছিল। ব্যস, আয়নার বাপের মতোই গায়েব হয়ে গেল। কেননা বাঁচতে হলে খবর দাও, আর না দিলে মরো। মহাজন তো সাক্ষী কোনদিনও রাখবে না।

আর আমিও সব জেনে মুখে পাথর বেঁধে বসলাম। এমন ভাব কিছু জানিই না। বোন গেছে, বোনের জামাই গেছে, অন্তত বোনের শেষ স্মৃতিটা থাক। বলেই ডুকরে কেঁদে উঠল। কেঁদে উপুর হয়ে শাহবাজের পা ছুঁতে গেলো, শাহবাজ ঝট করে উঠেই সরে দাঁড়ালো।

দাঁড়াতেই কুলসুম হাউমাউ করে কেঁদে বলল, — আমার আয়না নিষ্পাপ। তার কোনো দোষ নাই। জানেই না কোন দোষে দোষী সে। তারে কিছু কইরো না, বাপজান। তার জীবনটা ভিক্ষা দাও।

শাহবাজ এখন আর স্বাভাবিক নেই। চোখ টকটকে লাল। স্তব্ধ, পাথরের মতো হয়ে আছে। বড় ভাইয়ের চাদরের তলে বড় হয়েছে। কখনও কি এমন পরিস্থিতির সামনে পড়েছে?

সেই ভয়ংকর ঘটনার সময় তারা ছোট। তেমন কিছু মনেও নেই। তাছাড়া তারা ছিল ছাদে, চৌবাচ্চার ভেতরে। কিছু দেখেওনি। বাবা-মায়ের মৃত্যুর কষ্ট তো ছিল, তবে সেই ছায়া জীবনযাত্রার কখনও প্রভাব পড়েনি। ভাই পড়তে দেয়ওনি। সে সব কিছু নিজের ভেতরে টেনে দাফন করে ফেলেছিল। তাইতো তাদের জীবন ছিল আর পাঁচ দশটা মানুষের মতোই। তবে ভাগ্য আজ তাকে কোথায় এনে দাঁড় করালো? বাবা-মায়ের খুনির মেয়ে তার আয়নামতি। আর মেয়ে বলেই কলিজা ছিঁড়ে এলো। এতো বড় হয়েছে শাহবাজ, ভয় তো দূরে কখনও কোন কিছু পরোয়া করেনি, কোন কিছু তার ভেতরেকে ঘামাতে পারেনি, তবে আজ অজানা কোন সঙ্কায় বুক টিপটিপ করতে লাগলো। সেই টিপটিপ বুক নিয়ে বলল,– আজিজ চাচা এসব কেন করেছে?

— আমি জানি না, বাপজান। আয়নার মাও জানতো না। তবে সে তোমাদের ঘৃণা করে। নিজের জীবনের উর্ধ্বে গিয়ে ঘৃণা করে। তবে জাফর ভাইকে না। জাফর ভাই তার খুব স্নেহের। তাই তো জাফর ভাই যেদিন শহরে গিয়েছিল, সেই দিনই হামলা করে। সে তার গায়ে তো ভালোই ছায়ায়ও ফুলের টোকা দিতে চায়নি।

শাহবাজের মাথা ঘোরে। গলা শুকিয়ে আসে। সে শুকনো গলায়ই ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। তার সাথে তার লোকেরাও আসে। সে হাত দিয়ে ফেরায়। একা থাকতে চায় সে।

শাহবাজ দিক বেদিক হয়ে এগিয়ে যায়। কোন দিকে যাচ্ছে, সেই দিশে নেই। তার এক মন ঘৃণায় ভরে যাচ্ছে, খুনির মেয়েকে মন দিয়েছে সে। আরেক মন বলছে, তাড়াতাড়ি গিয়ে বিয়ে ভাঙতে হবে। তার বোনের জীবন সংকটে। আরেক মন বলে, বিয়ে ভাঙতে গেলে আজিজের সত্য বলতে হবে। বললে আয়নাকে ভাই জীবিত রাখবে না। কোনদিনও না। আয়না, বীণা, ভাই তার বাবা-মা…

তখনই তার ধ্যান ভাঙলো কারো চিৎকারে। সে অনেক কষ্টে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে ফেরে। মান্না দৌড়ে আসতে আসতে কিছু বলছে। কী? সে বুঝতে পারে না। তখনই এক চোখ ধাঁধানো আলো। সেটা সরে ট্রাক যে এগিয়ে আসছে, বোঝার আগেই এক ধাক্কায় শাহবাজ উড়ে পড়ল। পড়তে পড়তে রক্তে চারিদিক ভাসতে ভাসতেই তার একটা কথা কানে বাজলো, — আমাকে বলছেন কেন? মরেন গিয়ে!

শাহবাজ হাসলো! তার সেই চিরচেনা হাসি। হেসে বলল, — দোয়া কবুল হোক আয়নামতি।

ঠাস করেই আয়নার হাত থেকে সব গড়িয়ে পড়লো। আয়না হতভম্ব! বরযাত্রী আসবে আসরের দিকে। তাই জোহরের পর পরই গাঁয়ের মানুষের খাবারের পর্বটা শুরু হয়েছে। এদিকে বরের জন্য আলাদা করে পিঠা, পায়েশ করা হয়েছে। সাথে দেবে শরবত। সেই শরবতের জগ আর গ্লাস’ই সব লুটিয়ে তার পায়ের কাছে পড়ল।

জয়তুন বিরক্ত মুখেই ঝাঁঝিয়ে বলল,– চোখ কোন আকাশে রাইখা চলো তুমি? একটা কাজও যদি ঠিক ঠাক করা আসে।

আয়না সব সময়ের মতো কিছুই বললো না, ঢোক গিলে সাথে সাথেই আবার সব পরিষ্কার করতে লাগলো। কি থেকে কি হলো নিজেও জানে না। শয়তানটা বাড়িতে নেই, রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমানোর কথা। তবে সারা রাতে এপাশ ওপাশ করেও দু’চোখ এক করতে পারেনি। কেমন জানি একটা অস্থিরতা। হাঁসফাস করতে করতে সকাল হয়েছে। এই যে এখনও কেমন দম বন্ধ লাগছে। এমন লাগার কারণ কি? সে বড় একটা শ্বাস টেনেই নিজের কাজে মন দিলো।

তখনই এরশাদ ভেতরে এলো। সে সবসময় একা একা কাজেই অভ্যস্ত। তাই সব দিক সামলাতে তার সমস্যা হলো না। তবুও এতো ব্যস্ততার মাঝেও এসে জয়তুনকে জিজ্ঞেস করল, — শাহবাজ কই?

শাহবাজের ফেরার কথা সকালেই। জয়তুনকে এমনই বলে গিয়েছিল। এখনো ফিরছে না কেন, বুঝতে পারছে না। তাই চিন্তিত হয়েই বলল, — গেল তো ঢাকা। বইলা তো গেলো সকালে ফিরে আসবো। দুপুর গড়িয়ে গেল, খবর তো নাই।

— হঠাৎ এতো ঝামেলার মধ্যে ঢাকা কেন ?

— আমি কেমনে কমু? কোন নাতি আমারে এখন গোনায় ধরে?

এরশাদের ভ্রু কুঁচকে গেল। এমনি এমনি এতো কাজের মাঝে ঢাকায় যাওয়ার কথা না। চেলা-পেলাগুলো সব নিয়ে গেছে। কিছু একটা তো হয়েছে। তবে কি? সে বেরিয়ে কালামকে ডেকে বলল, — শাহবাজের খোঁজ বের কর।

— ঢাকা না গেছে।

— তো?

কালাম আর কিছু বললো না। কিছুটা বিরক্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে গেল। কোথায় খোঁজ লাগাবে সে? ঢাকা মিঠাপুকুরের মতো দুই হাত। তখনই আম্বিয়া বেরুলো। এক হাতে একটা ব্যাগ, আরেক হাতে খাবারের বাটি। এরশাদ ভ্রু কুঁচকে বলল, — কোথায় যাচ্ছিস?

আম্বিয়া স্বাভাবিকভাবেই বলল, — সাবিহার ঘরে।

— কেন?

আম্বিয়া বিরক্ত হয়ে এরশাদের সামনে ব্যাগটা আর বাটি ধরে বলল, — সাবিহার জিনিস। সে বীণার কাছ থেকে নড়তে পারছে নাকি। এমনি কাউকে তো ওই সাইডে যেতেও দেবেন না। তাই আমাকে একটু বলল রেখে আসতে। আর আপনার পৃথিলার জন্য খাবার। নিন, আমি গেলে তো খয় হয়ে যাবে। এখন আপনেই রাইখা আসেন। এমনিতেও আম্বিয়ার কাজের অভাব নাই।

খাবার সময়মতো এরশাদই পাঠাচ্ছে। তবে খাচ্ছে বলে মনে হয় না। সেই যন্ত্রণায় নিজেও গলা দিয়ে খাবার নামাতে পারছে না। এরশাদের কোনো জিনিস সে হাত দিয়ে ছোঁবে না। অথচ পুরো এরশাদটা তার জন্য মরে যাচ্ছে। যে এরশাদ উপেক্ষা বিরক্তি নিতে পারে না। সে দিব্যি এই মেয়েটার উপেক্ষা হজম করে যাচ্ছে। এমন হলে আমি ধৈর্য্য রাখতে পারবো না পৃথিলা। একটু নরম হন, দয়া করে এই একটু।

— কি করুম আমি, নিলে নেন, তা না হলে পথ ছাড়েন। দুনিয়ার কাজ আমার। এক জায়গায় এমন খাম্বার মতো দাঁড়াইলে হইবো?

এরশাদ ঠোঁটের ভাঁজে সিগারেট রাখলো। রাখতে রাখতে বললো, — যা, তবে পাঁচ মিনিটের বেশি না। রাখবি আর আসবি।

— কেন, খাইয়া ফেলব?

— তোদের বিশ্বাস নেই। বলেই পাহারায় থাকা দুজনকে ইশারা দিল। দিতেই আম্বিয়া এক নজর এরশাদের দিকে তাকালো। চুল আগের মতো বড় না হলেও, অনেকটা হয়েছে। শাহবাজ এলোমেলো, তবে এরশাদ ভাই সব সময়’ই গোছানো মার্জিত। এই যে এতো কাজের মাঝেও গায়ে গোছানো শার্ট প্যান্ট। চওড়া বুকটা টানটান করে দাঁড়িয়ে আছে। মুখের বাম পাশটা যদি আড়াল করা হয়, যে কোন মেয়ে অনায়াসেই ফিদা হয়ে যাবে। তবে এই সৌন্দর্যের আগে সবাই মুখের বাম পাশটাই দেখে। সেও দেখতো। ঐ ভয়ংকর রাতের পরে সে নিজেও অনেকদিন ভয়ে ধারের কাছেও ঘেষে নিই। পরে আস্তে আস্তে সয়ে গেছে। এতোই গেছে যে এখন না দেখলে অস্থির লাগে। সে অস্থির’ই এখন তার জীবনের বড় কাল।

আম্বিয়া মনে মনে বড় একটা শ্বাস ফেলেই চোখ ফিরিয়ে নিলো। নিয়ে আর দাঁড়াল না। ধীরে ধীরে সাবিহাদের ঘরের দিকে গেলো।

চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here