ধূপছায়া #নূপুর_ইসলাম #পর্ব_৪৫

0
2

#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৪৫

পৃথিলা গোসল করে বের হলো একটু দেরিতে। বেলা তখন অনেকটা গড়িয়ে গেছে। বলতে গেলে ক্লান্ত দুপুর শেষ হবে হবে করছে। আজকাল তার ঘুম, খাবার, বাকি যে কোন কাজের কোন সঠিক নিয়ম নেই। যখন যা করার করছে। তাইতো সকাল থেকে ঝিমুতে ঝিমুতে গোসলে গেলো এই যে শেষ দুপুরে এসে। যখন না গেলেই নয়।

তার গায়ে হালকা বাদামি রঙের কাপড়, পাড়টা কালো। উজ্জল রংগুলোর কাপড় তার নেই বললেই চলে। এমন না পছন্দ না, তবে কিনতে গেলে কেন জানি এই রংগুলোই বেশি চোখে পড়ে। তাছাড়া তারেকের হালকা রং পছন্দ ছিল, সেই হিসেবে এগুলোই বেশি কেনা হতো।

তারেকের কথা মনে পড়তেই পৃথিলা বড় একটা শ্বাস ফেললো। এতো এতো ঝামেলায় স্মৃতি গুলো কেমন এই অল্প কিছু দিনেই মিলিয়ে গেছে। মনে পড়ে না বললেই চলে। অথচ এই মানুষটাকে ছাড়া একসময় বেঁচে থাকা’ই কষ্টের ব্যাপার ছিল। এজন্যই হয়ত বলে, কারো জন্য কিছুই থেমে থাকে না। চলে, আগের চেয়ে বেশ ভালো ভাবেই চলে। এই যে পৃথিলার নামক মেয়েটার জীবন দিব্যি চলে যাচ্ছে।

পৃথিলা রুমে এসে ফ্যান ছাড়লো। ছেড়ে ভেজা চুলগুলো গামছার বাঁধন থেকে মুক্ত করতে করতে জানালার দিকে তাকালো। তাকাতেই আম্বিয়াকে আসতে দেখলো। দেখে অবশ্য তেমন ভাবান্তর হলো না। সারেং বাড়ির কোন কিছু নিয়ে তার কোন মাথাব্যথা নেই। কে এলো, কে গেল, কেন এলো, কোন কিছুই তার ভাবতে ইচ্ছে করে না। তাই নিজের ভেজা চুলগুলো নিজের মতোই মুছতে লাগলো।

দরজা চাপানো। আম্বিয়া এসে হালকা টোকা দিলো। শিক্ষিত মানুষ, এদের আবার রংঢং থাকে বেশি। দেখা গেল সোজা ঢুকলে, মুখ ফুটে কিছু বলবে না, তবে কপালে কয়েকটা বিরক্তির ভাঁজ ঠিক ফেলবে। আবার গলা চড়িয়ে ডাকো, তাতেও সমস্যা, বলবে অভদ্র। জ্বালা তো কম না।

পৃথিলা তার মতো শান্ত ভাবে শুধু একটা শব্দই বলল, — আসুন।

আম্বিয়া সাথে সাথেই ঢুকলো। হাতে সময় কম। দেখা গেল পাঁচ মিনিট যেতে না যেতেই এরশাদ ভাই এসে হাজির হবে। তাই ঢুকে পৃথিলার দিকে তাকাল না। এগিয়ে টেবিলে খাবারের বাটি, আর ব্যাগ রেখে বলল,

— এই ব্যাগে কাপড়, কিছু গহনা আছে। দামি টামি তেমন কিছু না, গ্রামের সাধারণ বাড়ির বউরা যেমন পরে তেমন। এগুলো গ্রামের বউদের মতো পরে নেবেন। নিয়ে ঐ পাহারার দিকে নজর রাখবেন। আসরের আগেই বরযাত্রী আসবে। বড় যাত্রী এলেই বিয়েবাড়ি এলোমেলো হয়। কে কোন বাড়ির, কেউ ওতো খেয়াল করে না। এরশাদ ভাইও তখন পুরো ব্যস্ত হয়ে যাবে। আমি শুধু ঐ গলির দুজনের একটু ধ্যান সরাবো। সরালেই মাথায় ঘোমটা টেনে গলির বাম সাইড ঘেঁষে গ্রামের মানুষের সাথে মিশে যাবেন। ভুলেও সদর দরজার দিকে যাবেন না। সেখানে এরশাদ ভাই থাকবে। তার চোখ ফাঁকি দেওয়া কঠিন। গলির সাইড ঘেঁষে বাড়ির পেছনে চলে যাবেন। ঘাটে নৌকা থাকবে। ওই নৌকাই আপনাকে স্টেশনে নিয়ে যাবে।

পৃথিলা চুপচাপই শুনল। শুনে স্বাভাবিক ভাবেই বলল, — কোন মেহেরবানে এত করছেন, জানতে পারি?

আম্বিয়া চোখ তুলে তাকালো। ভেজা চুল, বাদামি কাপড়ে অন্য রকম সুন্দর একজনকে দেখল। কেমন জানি কোমল, সারা অঙ্গে আদুরে একটা ভাব। শহরে পেলে বেড়া উঠা মেয়ে তাই হয়তো। অথচ চোখমুখ কি কঠিন! চাইলেই চট করে এই মুখের বিপরীতে কিছু বলা যায় না। তবে সে তার মতোই বলল,– অবশ্যই পারেন। পারবেন না কোনো? বলার মতো কোন কারণ’ই নাই। আসলেই নাই। আপনে এখানে পঁচে গলে মরলেও আমার কিছু নাই, আবার চলে গেলেও নাই। ব্যস, এমনিই।

— আপনাকে শাহবাজ পাঠিয়েছে?

— না, তবে তার বউ পাঠিয়েছে।

পৃথিলা কিছুটা বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলল,– আয়না?

— জ্বি! কী জাদু যে মানুষের ওপরে করতে পারেন, আল্লাহই জানে। একদিকে একজন দিন দুনিয়া ভুলে বসে আছে। আরেকদিকে এই ছেড়ি। জানতে পারলে এরশাদ ভাই খুন করে ফেলবো।

পৃথিলা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, — আপনাকে করবে না?

আম্বিয়া হাসলো! হেসে বলল,– করলে আমার সৌভাগ্য হতো।

পৃথিলা ভ্রু কুঁচকে তাকালো! আম্বিয়া দেখে আগের মতোই হেসে বলল,– এতো চিন্তাগিরি এখান থেকে বের হইয়া কইরের। আমি কিন্তু বেশিক্ষণ ধ্যান সরাইতে পারবো না। এরশাদের ভাইয়ের লোক এরা। নিজের বুদ্ধি খাটাইয়া যতো তাড়াতাড়ি পারেন, নৌকায় উইঠা যাইয়েন।

— নৌকা কার?

— আজিজ চাচার। সে আবার আয়নাকে খুব ভালা পায়। তাই নাকি সাহায্য করছে। আমি ভাই ওতো জানি টানি না। আমার কাজ যেইটুকু, সেইটুকু কইরা দিলাম।

–ওহ।

— আর কিছু জানার আছে?

— না।
— ভালো, আসি আমি। বলেই আম্বিয়া বেরিয়ে গেল।

পৃথিলা আগের মতোই নিশ্চুপ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। তবে বসে থেকেও কোন লাভ। দেখা যাক, ভাগ্য তাকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করায়। তাই সবার আগে খুঁজে শাহবাজের চিঠিটা বের করলো। করে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলে দিলো। তার জন্য আয়নার জীবনে কোনো ঝড় না আসুক। বোকা মেয়ে! একটু আদর করে মাথায় হাত রেখেছে, সব কিছু তুচ্ছ করে ভালোবাসার মূল্য দিতে নেমেছে।

তারপরই প্রথমবার সারেং বাড়ির খাবার নিজ ইচ্ছায় খেলো। কাল থেকে না খাওয়া। ইচ্ছে করলেই রান্না করে খাওয়া যেত। তবে আজকাল কিছুই তার ভালো লাগে না। তাই করেওনি। এখন শক্তির জন্য হলেও কিছুটা খাওয়া দরকার। খেয়ে কাপড়ের ব্যাগ থেকে কাপড়টা গায়ে দিল। লাল-গোলাপির টকটকে কাপড়। হাতভর্তি চুড়ি। আর কিছু অবশ্য পরলো না। তার দ্বারা আর কিছু সম্ভবও না। তাই যেটুকু চোখে পড়বে, সেইটুকুই করলো। করে জানালার কাছে বসলো। বসতেই খেয়াল করল, তার ভেতর একেবারে শান্ত। কোন উত্তেজনা নেই, ভয় নেই, আতঙ্ক নেই, নেই মুক্তির কোন সাধ। কেন? অথচ এই দিনটার জন্য সে মরমে মরমে অপেক্ষা করেছে।

পৃথিলা চোখ বন্ধ করে জানালার কপাটে মাথা রাখলো। কতোক্ষণ এভাবে বসে রইল জানে না। তখনই আতশবাজি ফুটিয়ে বর আসার হুল্লোড় পড়ে গেল। সেই হুল্লোড়ের মধ্যে চোখ খুলে গলির দিকে তাকালো। আম্বিয়া ছেলেদুটোকে কি যেন বলছে। বলতেই একজন একটু এগিয়ে গেল, আরেকজনের পুরো মনোযোগ আম্বিয়ার দিকে। আম্বিয়ার গায়ের কাপড়কে কখনই মার্জিত বলা যায় না। আর আজ আরো বেশি যেন চোখে বাজলো। কেন বাজলো, পৃথিলা বুঝতে এতোটুকুও সমস্যা হলো না। আসলে কোন মানুষকেই বাহির দিয়ে ভেতর মাপা যায় না। এই মেয়েটারও পৃথিলা পারেনি। এই ঋণ গুলো কি কখনও তার শোধ হবে?

পৃথিলা বড় একটা শ্বাস ফেলে উঠল। সাবিহার ঘরটার দিকে একবার তাকাল। সাথে নিয়ে আসা কোন কিছুই নেওয়া যাবে না। একবার ঢাকায় যাক তারপরে নেওয়ার ব্যবস্থা করা যাবে। তাই তাকিয়ে নাক বরারবর ঘোমটা টানলো। টেনে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো, আর বিয়ে বাড়ির হই হুল্লোড় মানুষের মাঝে অনায়াসেই মিশে গেল।

মিশে ঘাট পর্যন্ত আসতে তার সমস্যা হলো না। গ্রামের দুই বড় বাড়ির ছেলে মেয়ের বিয়ে। অর্ধেক গ্রাম ওবাড়ি থেকে এসেছে, অর্ধেক এসেছে এবাড়ির। আর এতো এতো মানুষজনের মাঝে কে কাকে দেখবে! পৃথিলার দিকেও কেউ বিশেষ ভাবে খেয়াল কররো না।

তবুও পৃথিলা এলো কিছুটা সংকুচিত হয়ে। মিথ্যা, নাটক, অভিনয় তার দ্বারা হয় না। তাই মনে হলো এই বুঝি কেউ ধরে ফেললো।

সেই ধরে ফেলার জড়তা নিয়ে ঘাটে আসতেই কয়েকটা নৌকা চোখে পড়ল। তার মধ্যে দুটো তার পরিচিত। বিশাল, সারেং বাড়ির নৌকা। এই নৌকা করেই সারেং বাড়িতে প্রথম এসে পা রেখেছিল। এই নৌকা থেকেই পানিতে পড়েছিল। কে জানে, হয়ত তার ভাগ্যটা এই নৌকায় পা রাখার সাথে সাথেই বদলে গিয়েছিল।

আজ আবার নৌকা। ভাগ্য তাকে কোন দিকে নেবে কে জানে। অবশ্য আজ আর সারেং বাড়ির বিশাশ নৌকায় যাচ্ছে না। তাদের পাশেই মাঝারি সাইজের একটা নৌকা। যেই নৌকায় তিনজন লোক বসে আছে। তাকে দেখেই বলল,– তাড়াতাড়ি উঠে আসেন।

পৃথিলা এগিয়ে গিয়ে উঠে বসলো। শান বাঁধানো ঘাট উঠতে সমস্যা হলো না। তবে নৌকা ছাড়াতে তার ভ্রু কুঁচকে গেলো। এই ঘাটে তার আসা তৃতীয় বার। একবার একেবারে প্রথম দিন, দ্বিতীয়বার জ্বরে। অবশ্য সেই দিন হুঁশ বলতে কিছুই ছিল না। আর আজ। তাই ভ্রু কুঁচকে-ই মনে করার চেষ্টা করলো। সেই প্রথম দিন রাতে নৌকাটা কোন দিক থেকে এসেছিল। সাদা চুনকাম করা বাড়ির পেছন সাইড, অন্ধকার, গাছগাছালি, আর এরশাদ। এরশাদ তার ডান সাইডে ছিল। আগে নেমে দাঁড়িয়েছে। তারপর সে নামলো। নামতেই বাড়িটা চোখে পড়লো। এই যে এই সাইড। আর আজ নৌকাটা যাচ্ছে অন্য সাইডে। মানে স্টেশনের বিপরীত দিকে।

পৃথিলা শান্তভাবেই নৌকায় বসা তিনজনের দিকে তাকালো। বুঝতে তার সমস্যা হলো না। এক চোরাবালির থেকে আরেক গভীর অতল সাগরের দিকে যাচ্ছে সে। অবশ্য বুঝতে পারছে না, কে তাকে এই তলে নিয়ে যাচ্ছে। সারেং বাড়ির কেউই হওয়ার সম্ভবনা বেশি। আবার এমনও হতে পারে, শাহবাজই চাল খাটিয়ে বের করলো। প্রশ্ন নেই, জোর নেই, সবাই ভাববে নিজে থেকেই বেরিয়ে এসেছে। আর এই অতল সাগরের তল থেকে সে কি কখনও আর উঠতে পারবে?

ধীরে ধীরে সারেং বাড়িটা আড়াল হলো। পৃথিলা নিশ্চুপই দেখল। চাইলেই চিৎকার চেঁচামেচি করে কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারতো। অবশ্য লাভ হতো বলে মনে হয় না। তার মন বলছে, এদের কাছে ধারালো অস্ত্রও আছে। ঊনিশ থেকে বিশ হলেই সেটা বের হবে। তাই আগের মতোই নিশ্চুপ বসে রইল। কোথায় এলো কে জানে। তবে বসতবাড়িগুলো ধীরে ধীরে কমছে। সেই কমার মাঝেই একজন তাকে বলল, —

কোন চিৎকার-টিৎকার হাবিজাবি করার কিছু মাথায় আনবেন না। অবশ্য করেও লাভ নাই। এখানে কেউ আসবে না বাঁচাতে। বরং তখন আমাদের অন্য রাস্তা নিতে হইবে। তাই আপাতত আপনার চোখটা বান্ধুম। চুপচাপ সুন্দর মতো বানতে দেন। এতে আপনারই ভালো। বলেই এগিয়ে এলো।

পৃথিলা হাত বাড়িয়ে বলল, — আপনার বাঁধতে হবে না, আমাকে দিন, আমি বাঁধছি।

লোকটা তার হলুদ দাঁত বের করে হাসলো। পৃথিলার ভয়ে সারা শরীরে কাটা দিলো। এই হাসি কোনো মানুষের হাসি হতে পারে না। পিশাচ, পিশাচের হাসি এটা। আর এই হাসির সামনে তার জায়গায় অন্য কোন মেয়ে হলে হয়ত জ্ঞান হারাতো । তবে পৃথিলা সব সময়ের মতো নিশ্চুপ, একেবারে শান্ত হয়ে গেলো। হয়ে কোনোরকম বলল, — আমাকে দিন।”

লোকটা আবারো হাসলো! হেসে হাতে দিলো। তাদের উপরে হুকুম এসেছে রাতে কাম তামাম করার, তামাম করে ইটভাটায় সামনে লাশ রাখার। তাবে শহরের এই মাল দেখে তার নিয়ত ঘুরলো। এমনিও মরবে, ওমনিও মরবে, তো মরার আগে তাদের একটু মনোরঞ্জন হলে সমস্যা কী? তাই দাঁত বের করে আগের মতোই হেসে বলল, — নৌকা বিলের দিকে নে। রাত পড়তে তো অনেক দেরি। একটু আরাম আয়েশ করি।

তার কথা শুনে বাকি দু’জনও ঠোঁট ছড়িয়ে হাসলো। সেই হাসির মাঝে পৃথিলা নিজের চোখে রঙচটা, মলিন গামছা নিজ হাতেই বাঁধল। সেই বাঁধ গলিয়ে উষ্ণ পানি গুলো নিশ্চুপে গামছায় মিশে গেলো। সেই মিশে যাওয়া অন্ধকারে পৃথিলা, এতো এতো মানুষের মাঝে, কেন জানি, ঐ যে ভয়ংকর মুখের, ভয়ংকর মানুষটার মুখটাই ভেসে উঠল। আর উঠতেই পৃথিলা চমকালো।
চমকেই সেই দিন স্বপ্নের কথাটা মনে পড়ে গেলো। যেখানে আলাউদ্দিন ফকির এরশাদকে আসতে দেখে হেসে বলেছিল, — এই ভয়ংকর মানুষটার কাছেই তুমি নিরাপদ পৃথিলা। সবচেয়ে নিরাপদ।

আজিজের আজ খুশির বাঁধ ভেঙেছে। সেই খুশির ঝিলিক তার চোখে মুখে উপচে পড়ছে। তাই খাবারের আয়োজন শেষ হওয়ার সাথে সাথে এগিয়ে জাফরের কাছে গেলো। গিয়ে এক হাতে জড়িয়ে ধরে আমুদে স্বরে বলল, — বিয়ের পড়ানো শুরু করতে বলি। কি বলো জাফর?

জাফর হালকা হাসলো! হেসে এরশাদের দিকে তাকালো। এরশাদ দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ, ভ্রু কুঁচকানো। সেই ভাবেই বলল, — একটু অপেক্ষা করেন চাচা। একমাত্র বোন আমাদের। শাহবাজ একটু কাজে শহরে গেছে। ফিরুক।

আজিজ কিছু বললো না, বরং জাফরকে নিয়ে আরাম করেই বসলো। শাহবাজের ফেরা না ফেরা নিয়ে তাকে তেমন বিচলিত দেখা গেলো না। কোন মরার দুঃখে ঢাকা গিয়ে বসে আছে কে জানে। তবে বিয়ে তো হবেই। এক ঘণ্টা পরে হোক, আর আগে । বরং শাহবাজ ফিরলেই বিপদ। ভাইয়ের কলিজা গায়েব হওয়ার দায় যে তার ঘাড়ে। আর সাক্ষী হবে তার’ই বউ। এবার দেখি এরশাদ, কলিজার জন্য ভাইয়ের বিরুদ্ধে কোনো হাতিয়ার উঠে।

আজিজ বিচলিত না হলেও, ফরহাদ এরশাদের দিকে তাকালো। তাকিয়ে বুঝল কিছু একটা হয়েছে। সে উঠতে গেলো। তার বড় ভাই হাত টেনে বলল, –কোথায় যাচ্ছিস?

— এখানেই।

— এখানে মানে? পুরো গ্রামের মানুষ আজ এখানে। কোনো ঢং করবি না বলে দিলাম। চুপচাপ বস।

ফরহাদ শুনলে তো, তবুও সে উঠতে গেলো। তার ভাই আবার টেনে বলল,– সবাই হাসবে ফরহাদ। বাবার সম্মান যাবে।

ফরজাদ বিরক্ত নিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকালো। ফরহাদের বড় ভাই দেখে বলল, — এই বিরক্তি অন্য কাউকে দেখাস। চুপচাপ বস। বিয়ে করতে এসে জামাই ঢং ঢং করে ঘুরছে, কেমন দেখায়?”

ফরহাদ কথা বাড়ালো না। বাবার উপরে তার কিছু নেই। তাই জায়গা মতো আবার চুপচাপ বসলো। বসলেও চোখে মুখে উপচে পড়া বিরক্তি।

বীণার অবস্থা খারাপ। কেঁদে কেটে, না খেয়ে মাথাও তুলতে পারছে না। সাবিহা কোনোরকম ধরে বসিয়ে রেখেছে। তাদের পাশে আয়নাও বসে আছে কোন রকম। পৃথিলা আপাকে সাহায্য করে তার খুশি হওয়ার কথা। তবে তেমন কিছুই হচ্ছে না। বরং ভেতরটা কেমন জানি ছটফট করছে। এই ছটফট সে কার কাছে বলবে? কে আছে তার? আর তা মনে পড়তেই শুধু ঘুরে ফিরে একজনের কথাই মাথায় আসছে। অথচ এ বাড়িতে পা রাখার আগে থেকে শয়তানটা জ্বালিয়ে মারছে, জীবনটা অতিষ্ঠ করে ফেলছে। তাই সব সময় যা করে তাই করলো। একচোট মনে মনে গোষ্ঠী উদ্ধার করলো। করবে না কেন? একটা মাত্র বোন, তাও কোথায় গিয়ে পড়ে আছে কে জানে! এতো সময় লাগে? বলেই জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। এতো মানুষের মাঝে চোখ যেন একজনকেই খুঁজল। কোথায় সে?

জয়তুন আরা নিজেও অস্থির হয়ে আছে। আদরের নাতনি আজ পর হবে। তার মধ্যে শাহবাজ লাপাতা। মেজার খেই বারবার হারাচ্ছেন। একে ধমকাচ্ছেন, ওকে ধমকাচ্ছেন। বিনা কারণে আম্বিয়াকে একচোট বকাঝকাও করলেন। করে রাগে চুপচাপ ফুঁসতে লাগলেন। শয়তান টাকে আগেই বলেছে, তার নাতনির বিয়ায় কোন ঝামেলা চায় না। এদিকে শয়তানই ঝামেলা পাকিয়ে বসে আছে।

আর এই সরের মাঝেই সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। আজিজ আবার তাড়া লাগিয়ে বলল, — আর কতো, এরশাদ?

এরশাদ জাফরের দিকে তাকালো। জাফর হালকা মাথা নাড়ালো। পুরো গ্রামের মানুষ বসে আছে। কতক্ষণ রাখবে? তাছাড়া এই ছেলের কান্ডজ্ঞান তো কখনও ছিল না। আজ আর কি আশা করবে?

এরশাদ অনুমতি দিলো। দিতেই কাজি, জাফর, আজিজ, আরো কিছু মুরব্বি সবাই ভেতরে গেলো। যেতেই বীণার ছটফটানি বাড়লো। দুচোখে পানি অনবরত গড়িয়ে পড়লো। পড়তেই আশে পাশে তাকালো। তার ভাইয়েরা কই? তার দাদি কই?

জাফর বীণার পাশে বসলো। বসে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, — ভয় নেই রে মা, ছোট চাচা আছে না।

বীণা ঝাপটে ধরলো। ধরে হাউমাউ করে কাঁদলো। কাঁদলো জাফরও। ঐ যে বসার রুমে বসা কঠিন জয়তুন আরা, সেও কাঁদলো। আর ঐ যে বাইরে, ভয়ংকর মুখের ভয়ংকর এরশাদ, সে কিন্তু কাঁদলো না।তবে শক্ত মুখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। সেই দাঁড়ানো মাঝে ভেতরের ঝড়টা কেউ দেখলো না, এমনকি কেউ বুঝলও না। সেই না বোঝার মাঝেই বীণা কবুল বলল।

কবুল বলার সাথে সাথেই আরেক প্রান্তে আরেকজন মৃত্যুর দোয়ার থেকে প্রায় তের চৌদ্দ ঘন্টা পরে চোখ খুলে তাকালো। তাকিয়ে অস্ফুটভাবে বলল — কয়টা বাজে ?

ডাক্তার হাসলো! অবস্থা এতো নাজুক ছিল, তারা আশাই ছেড়ে দিয়েছিল। তবে এতো শক্ত নার্ভের মানুষ কম’ই দেখেছে। তাই হেসে বলল,– সময় বেশি হয়নি, আপনি ঘুমান।

শাহবাজ অবশ্য এমনিতেও বেশিক্ষণ জেগে থাকতে পারলো না, কড়া ডোজের ঔষুধ চলছে। সেই ঔষুদের প্রভাবে ঘুমে তলিয়ে যেতে যেতে বলল,– বাড়িতে খবর পাঠাতে বলুন, আমি না ফেরা পর্যন্ত যেন বীণার বিদায় না হয়।

ডাক্তার কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর বেরিয়ে রোগীর সাথে যে আছে তাদের কে বলল। বলতেই তার চেলা পেলারা কি করবে মাথায় এলো না। এমনিতেই তারা ভয়ে আধমরা হয়ে আছে। ভাইয়ের কিছু হলে জয়তুন আরাতো আস্ত রাখতো না। সব দোষ পড়ত তাদের ঘাড়ে। তবে একজন দৌড়ে মিঠাপুকুরের উদ্দেশ্য ঠিক রওনা দিলো। দিয়েও অবশ্য লাভ আছে বলে মনে হয় না। খবর নিয়ে যেতে যেতে তো রাত। এতোক্ষণ নিশ্চয়’ই কেউ বসিয়ে রাখবে না।

চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here