#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৪৬
পৃথিলা যে ঘরে নেই, সেটা সবার আগে বুঝতে পারলো ইমরান। ততক্ষণে বিয়েবাড়ির হইহুল্লোড় কিছুটা কমেছে। সন্ধ্যার আযান পড়ছে, সবাই ভেবেছিল বিয়ের পরেই বিদায়। তাই একেবারে বিদায় দেখেই যে যার মতো বাড়িতে ফিরবে।
তবে বাড়ির ছেলে নিখোঁজ। কালাম এখনও খোঁজ বের করতে পারেনি। স্টেশন থেকে খবর পেয়েছে, ঢাকার উদ্দেশ্যে তারা রেলে চেপেছে। তবে তারপর? ঢাকা তো আর চাট্টিখানি কথা না। রেল থেকে নেমে কোন দিকে গেছে, সেটাই ধরতে পারছে না। শত্রুর তো আর অভাব নেই, তাছাড়া যতোই এখানে ওখানে থাক, জয়তুন আরার কোলে সময় মতো ঠিক ফিরে আসে। এবারই যেন সব মাত্রা ছাড়ালো। তাই সবাই মুখে প্রকাশ না করুক, কিছু একটা যে হয়েছে ঠিক বোঝা যাচ্ছে।
গ্রামের মানুষের কাছে আজিজ চাচা আবার দয়ার দরিয়া। বিপদে-আপদে ডাকা মাত্র সেই তো বিনা দ্বিধায় দৌড়ে যায়।আর আজ আত্মীয় বাড়ির এমন অবস্থায় বউ নিয়ে হইহুল্লোড় করে নিজের মতো ফিরে যাবে এমন মনোভাব যে কখনও হবে না, তারা জানে। তাই আজিজ চাচা যখন সবাইকে দুঃখভরা কণ্ঠে যার যার বাড়িতে ফিরতে বলল, কেউ অবাক হলো না। বরং তাদের মহাজনের প্রতি সম্মান কিছুটা আরও বাড়ল, তার সাথে সারেং বাড়ির মেয়ের কপালের তারিফ করলো। এমন শ্বশুর, শ্বশুর বাড়ি ভাগ্য তো শতগুণে মেলে।
তারপরেই একে একে সবাই যার যার ঘর মুখি হলো। সারেং বাড়ির উঠোন সব সময়ের মতো শূণ্য হলো। হতেই সদর দরজার পাল্লাটা আগের মতোই আটকে দেওয়া হলো। আত্মীয় স্বজন তাদের এমনিতেও নেই। তার মধ্যে পরিচিত গন্ডির মধ্যে বিয়ে। আজিজ চাচা নিজেই বলল, “বাকি যা কিছু আছে পরে করলেও চলবে। ঘরের ছেলে আগে ঘরে ফিরুক।”
তাই মহাজন বাড়ির ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ছাড়া বাকি সবাইও চলে গেলো। তাদের সাথে আজিজ চাচা বাড়িতে খবরও পাঠিয়ে দিলো। তারাও বউয়ের জন্য পথ চেয়ে বসে আছে। তারপর চিন্তিত ভাবে বসার ঘরে গিয়ে বসল। কী করবে, কোন দিকে যাবে কিছুই কারো মাথায় আসছে না। তাই ইমরান বাড়ির দিকে এলো। বীণার অবস্থা বলতে গেলে খারাপ। বিয়ের ঝুট-ঝামেলা, তার মধ্যে ভাইয়ের নিখোঁজ সংবাদ। সব মিলিয়ে বেহুঁশের মতো পড়ে আছে। সাবিহা এখনও সেখান থেকে বেরুতে পারেনি। কখন পারবে, জানেও না। তবে পুরো সারেং বাড়ি থমথমে হয়ে আছে।
তাই ভাবলো, এই ফাঁকে হালকা করে হাত-মুখ ধুয়ে আসা যাক। সারাদিন গেছে দৌড়ের উপর, শরীর ভেঙে আসতে চাইছে। কিন্তু যেতেই দেখল পৃথিলার দরজা হাট করে খোলা। সে বাড়িতে চলাফেরা করে, হাজার হলেও পুরুষ মানুষ। সব সময় তাই কিছুটা আড়াল করার জন্যই দরজা চাপানো থাকে। সেই চাপানো দরজা আজ হাট করে খোলা। সেই খোলা দরজায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে পুরো রুম খালি।
ইমরান প্রথমে মাথা ঘামালো না। ভাবলো, হয়তো বাথরুমে গেছে। তাই নিজের মতো কলপাড় থেকে হাত-মুখ ধুয়ে নিজেদের রুমে চলে এলো। ফ্যান ছেড়ে কিছুক্ষণ আরাম করে বসে রইল। সন্দেহটা তখনি হলো। এতক্ষণ নিশ্চয়ই বাথরুমে থাকার কথা না।
ইমরান ঝট করে উঠে এগিয়ে গেলো। গিয়ে বেশ কয়েকবার গলা খাকারি দিলো। কিন্তু বাথরুমের পাশ নীরব, একেবারে নীরব। সংকোচ ফেলে এগিয়ে গেলো। গিয়ে হতভম্ব, কেউ নেই। তখনি দৌড়ে পুরো বাড়ি খুঁজলো। তার খোঁজা দেখে পাহারার দুজনও এগিয়ে এলো। বুঝতে তাদের সমস্যা হলো না। হলো না বলেই ঢোক গিললো। পুরো বাড়িতে মানুষের ছিটেফোঁটাও নেই। ইমরানের বুক ধক করে উঠলো। সাবিহা শাহবাজের ব্যাপারে বলেছিল। এই ছেলে গায়েব, পৃথিলাও গায়েব। আল্লাহ! ইমরান আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ালো না, সারেং বাড়ির দিকে দৌড় দিলো।
এরশাদ সাইডে এসে সিগারেট ধরিয়েছে, পাশে ফরহাদ। বিয়ের পাগড়ি-টাগড়ি কিছু নেই, শুধু শেরওয়ানি গায়ে। এরশাদের হাত থেকে সিগারেট নিয়ে বললো, — থানায় লোক পাঠা।
এরশাদ মৃদু হেসে বলল — আমার লোক যদি খুঁজে না পায়, দুনিয়ার কেউ পাবে না।
— তাহলে কী করবি?
— আর কিছুক্ষণ দেখবো। তারপর ঢাকার উদ্দেশ্যে যাবো।
— কোথায়?
এরশাদ উত্তর দিলো না, ফরহাদ নিজেও কিছু বললো না। সিগারেটে টান দিতে দিতেই বীণার রুমের দিকে তাকালো। কিছু দেখা যায় না অবশ্য। নিচের তলায় রুম, জানালা উঠান থেকে দৃশ্যমান। সেই দৃশ্যমান জানালা থেকে চোখ সরেই ইমরানের উপর পড়লো। তার পেছনে পাহারার দুটো লোক। হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে আসছে। এসেই কাউকে খুঁজতে লাগলো। আর কাকে ফরহাদের বুঝতে সমস্যা হলো না।
তারা দাঁড়িয়েছে একটু আড়ালে। বাড়ি ভরা প্যান্ডেল। তারা সব দেখলেও তাদের দেখা সম্ভব না। তাই এরশাদকে বললো — ইমরান মনে হয় তোকে খুঁজছে।
এরশাদ উল্টো দাঁড়িয়ে ছিল। ফরহাদের কথা শুনেই পেছনে ফিরে তাকালো। তাকাতেই ভ্রু কুঁচকে গেলো। ইমরান যেমন-তেমন, পাহারার লোক গলি থেকে সরেছে কেন? এরশাদের চোয়াল সাথে সাথেই শক্ত হয়ে গেলো।
ফরহাদ এরশাদের দিকে একপলক তাকিয়ে সিগারেট পায়ে পিষলো। পিষতে পিষতে বললো — তোর পাখি উড়াল দিয়েছে।
— অসম্ভব।
— ঠিক। তবে তোর অসম্ভব সম্ভব হয়ে গেছে।
এরশাদ দাঁতে দাঁত চেপে বললো — বীণাকে নিয়ে বাড়ি যা। বাকি যা নিয়ম-কানুন আছে, তোদের ওখানে করিস।
— না।
সব সময়ের শান্ত এরশাদ আজ আগুন চোখে তাকালো। ফরহাদ কারো কিছু গোনায় ধরেছে কবে? সে আগের মতোই দাঁড়িয়ে রইলো। সে ভালো করেই জানে, সারেং বাড়িতে আগুন লাগবে এখন। সেই আগুনে বন্ধুকে নিশ্চয়ই একা ফেলে চলে যাবে না।
এরশাদ সোজা এগিয়ে গেলো। পৃথিলা নিজে থেকে পালাতে পারবে না। কেউ তাকে সাহায্য করেছে। আর পুরো সারেং বাড়িতে এরশাদের উপরে যাওয়ার মতো একজনই আছে। আর সেই একজন জয়তুন আরা। তাই বসার ঘরের সবাইকে পুরো উপেক্ষা করে সোজা জয়তুনের সামনে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে বললো — পৃথিলা কোথায়?
আজিজ ঠোঁট টিপে হাসলো। হেসে আরাম করে বসলো। যেন যাত্রাপালা শুরু হবে। তাই ঠিক ঠাক বসে মনোযোগ একদিকে নিচ্ছে। নিতে নিতেই আশেপাশে তাকালো, জাফরটা গেলো কোথায়? বলল ভালো লাগছে না। নিজের রুমে গেছে নাকি? যাক! নরম মনের মানুষ। ঝামেলা থেকে যত দূরে থাকবে ততোই ভালো।
এরশাদ রাগ দেখালো না। তার দাদি, তার প্রিয় দাদি। নিজেকে শান্ত করার ব্যর্থ চেষ্টা করলো। করতে করতে খেয়াল করলো, তার ভেতর কাঁপছে। অনেক, অনেক দিন পরে আবার এই কাঁপনটা অনুভব করছে। শেষবার করেছিল অনেকদিন আগে, ছোট ছোট ভাই-বোনদের নিয়ে চৌবাচ্চার ভেতরে যখন বসে ছিল, তখন।
এরশাদের মাথায় যন্ত্রণা হতে লাগলো। এই যন্ত্রণা ভয়ংকর। সে নিজের মধ্যে থাকে না। তাই অনেক কষ্টে নিজেকে দমিয়ে সব সময়ের মতো শান্তভাবেই বললো — বেশি কথা ভালো লাগছে না, দাদি। তাই সোজা বলছি। পৃথিলা কোথায় বলো।
জয়তুন রাগে ফুঁসলো। বোনের বিয়েতে গজব পড়ে গেছে। ভাই নিখোঁজ। এই ছেলে আছে এই নষ্টা মেয়েছেলে নিয়ে! তাই চেঁচিয়ে বললো — পৃথিলা, পৃথিলা, পৃথিলা! আর একবার যদি এই নাম আমার সামনে উচ্চারণ হয়, আমি সব কয়টাকে দাফন করবো।
জয়তুনের হুমকিতে এরশাদের কোন ভাবান্তর হলো না। তবে আয়না, সাবিহা বীণার রুম থেকে বেরিয়ে দরজায় দাঁড়ালো। আগা-মাথা তারা কিছুই বুঝলো না। তবে অন্য এক এরশাদকে দেখলো, সব সময়ের মতো মুখে হাসি নেই, মার্জিত ভাব নেই, চোয়াল শক্ত, চোখে আগুন। সেই আগুন নিয়ে আগের মতোই বলল — পৃথিলার গায়ে ফুলের টোকাও যদি আসে দাদি… আমি পুরো সারেং বাড়ি ধ্বংস করে ফেলবো। কসম করে বলছি, সত্যিই ফেলবো।
জয়তুন থমকালো! থমকে তার সামনে দাঁড়ানো আদরের নাতিকে দেখল। দাদির হুমকিতে তার যে ছিটেফোঁটাও কিছু আসে যায়নি, ঠিক বুঝতে পারল। তবুও সে দমল না। জয়তুন আরা সে, সারেং বাড়ির মাথা। তার মুখের ওপরে কথা? তাকে হুমকি দেওয়া। এতো সাহস! তাই আগের মতো তেজ নিয়ে চেঁচিয়ে বলল, — এই, কে আছিস! এই নিমকহারামকে সারেং বাড়ি থেকে বের কর। দুধ-কলা দিয়ে কাল সাপ পুষেছি, এখন ছোবল মারতে ফণা তুলেছে। বের কর, এক্ষুনি বের কর! আজ থেকে সারেং বাড়ির সাথে এর কোনো সম্পর্ক নাই।
কেউ এগিয়ে এলো না। জয়তুন আরার সব লোক মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। জয়তুন বিস্ময়ে তাকালো।
এরশাদ আগের মতোই বলল, — তোমার সব ক্ষমতা তোমার দু’ নাতিতে, দাদি। একজন নিখোঁজ, আরেকজনকে বিপরীতে দাঁড় করিও না। সে ছাড়া তুমি শূন্য।
জয়তুন ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ল। তার শরীর থরথর করে কাঁপছে। ঠিক’ই তো বলেছে, সে আসলেই শূণ্য। এজন্যই আলতাফ তাকে পাগলের মতো ভালোবাসা থাকা সত্যেও দ্বিতীয় বিয়ের জন্য মত দিয়েছিল। কারণ জান প্রাণ খয় করে যতোই আগলে রাখো। ওরজাত সন্তান, সন্তান’ই হয়। এই যে আজ ঠিক প্রমাণ পেলো। দু’দিনের মেয়ের জন্য কি সুন্দর দাদিকে ভুলে গেলো। নিজের রক্ত হলে আজ আর এই দিন কি দেখতে হতো?
রুমের বাকি সবাই হতবাক হয়ে আছে। কি হচ্ছে, কি হবে কিছুই তাদের মাথায় আসছে না। তবে আজিজ তো জানে। তাই ঢং করেই এগিয়ে গেলো। এরশাদকে কিছুটা ধমকে বলল, — এরশাদ! মাথা গেছে তোমার?
এরশাদ উত্তর দিলো না। একদিকে পৃথিলা, আরেকদিকে প্রিয় দাদি। রাগে-জেদে দেয়ালে এক ঘুষি মারল। তার এক ঘুষিতে সাদা চুনকাম করা দেয়ালটায় রক্তের আলপনা হয়ে গেলো।
জয়তুন আর্তনাদ করে বলল, –এরশাদ!
এরশাদ শুনলোও না, বরং আরেকটা ঘুষি দিতে গেল। তাকে দেখতে লাগছে উভ্রান্তের মতো। ফরহাদ এসে ঝাঁপটে ধরল। এই এরশাদকে সে চেনে না। সব সময় শান্ত মূর্তির মতো দেখে এসেছে। তবুও জাপটে ধরে জয়তুনের দিকে তাকিয়ে বলল, — সব সময় অহং আর জেদ ভালো বয়ে আনে না। এরশাদ বলেছিল না, দূরে থাকতে। কি সমস্যা আপনার। সব কিছু আপনার মর্জিতে চলতে হবে কেন?
জয়তুন চেয়ারে গা এলিয়ে দিল। সারেং বাড়ি ধ্বংস করে ফেলবে। বাকি আছে কি ধ্বংসের? ধ্বংস কি শুধু এই ইট-পাথরের বাড়ির হয়? না, আসল ধ্বংস তো সম্পর্কের, মানের, সম্মানের। এই যে এতগুলো মানুষ। তাদের সামনে তো জয়তুন ধ্বংস হয়েই গেলো। গেলো সারেং বাড়ির সম্মানের। আর কি বাকি আছে? আলাউদ্দিনের কথাই তাহলে মিলে গেল। আহা! বিপদে-আপদে সব সময় ঢাল হয়ে পাশে থাকার সখিকে ছেড়ে চলে গেলিরে ক্যামনে আলাউদ্দিন? এই যে দেখ, আজ তোর সখির কেউ নাই।
সে গা এলিয়ে বলল, — আমি ঐ মেয়েকে কিচ্ছু করি নাই। তোর বন্ধুকে বলে দে ফরহাদ। জয়তুনের এতো খারাপ দিনও আসে নাই, মিথ্যা ছলনার আশ্রয় নিতে হইবো। কিছু করার ক্ষমতা থাকলে, জয়তুনের গলা চড়ে বলার ক্ষমতাও আছে।
জয়তুনের বলতে দেরি, সাবিহার ফুসে উঠতে দেরি হলো না। তার চোখে পানি। মেয়েটা কোন অবস্থায় আছে, কে জানে! তাই ফুসেই এরশাদের দিকে তাকিয়ে বলল,– সব মিথ্যা। উনিই সব করেছেন। শাহবাজ নিজে পৃথিলাকে চিঠি দিয়েছিল। ইনিই পৃথিলাকে মারার জন্য শাহবাজকে বলছেন। বিশ্বাস না হলে জিজ্ঞেস করেন। ওনাকেই করেন, তার তো গলা চড়ে সত্য বলার ক্ষমতা আছেই।
জয়তুন কোন উত্তর করলো না। সত্য না মিথ্যা এরশাদ জিজ্ঞেসও করলো না। পৃথিলার ক্ষতি করার জন্য তো এর আগেও লোক লাগিয়েছে, তাই হুঙ্কার দিয়ে একটা কথাই বলল, — দাদি, শেষবার জিজ্ঞেস করছি।
জয়তুন এবারও কিছু বলল না। আয়নার শরীর থরথর করে কাঁপছে। আগুন লাগিয়ে ফেলেছে সে। কী করবে সে, কে তাকে বুঝবে। বলেই আজিজের দিকে তাকালো। আজিজ শান্ত থাকার ইশারা দিলো। চোখে বুঝালো, যা হোক মুখ খোলা যাবে না।
তখনই জাফর ওপর থেকে নামল। বারো ঝামেলায় তার ভালো লাগছে না। তাই নিজের রুমে চলে গিয়েছিল। চেঁচামেচি আগেই শুনেছে, তবে প্রথমে গা করেনি। জয়তুন সব সময়ই চেঁচায়। তার মধ্যে শাহবাজ লাপাতা। এখন কি আর চুপচাপ বসবে। তাই বের হয় নি। এরশাদের হুঙ্কারে দৌড়ে এলো। যেই ছেলের কণ্ঠ দু’হাত দূর থেকেও শোনা যায় না, সেই ছেলে চেঁচাচ্ছে! তাই এসেই বলল, — কি হয়েছে?
এরশাদ এবার যেন চমকালো। শুধু কি চমকালো। না, ভয় পেলো। না পাওয়ার ভয়, পৃথিলাকে নিজের করে না পাওয়ার ভয়।
জাফরকে দেখে আজিজ আগের মতোই ঠোঁট টিপে হাসল। এই হাসি অবশ্য কারো নজরে পড়ার কথা না। পড়লও না। তাই হেসেই মুখ কালো করে বলল, — কিছুই তো বুঝতে পারছি না রে জাফর। কোথাকার কোন মেয়ে! সেই মেয়ের জন্য বাড়ি মাথায় তুলে ফেলেছে।
জাফর বুঝতে পারে না। তাই ভ্রু কুঁচকে বলে — কোন মেয়ে?
— ঐ যে ম্যাডাম, পৃথিলা না কি যেন নাম! তাকে নাকি পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে শাহবাজ গায়েব। আবার এই মেয়ে বলছে, শাহবাজ নাকি গায়েব করেছে। তাও বড় ফুপুর কথায়।
জাফর চমকে উঠল। চমকে এরশাদের দিকে তাকাল। এরশাদের গলা চেপে এলো। চেপে এলো জাফরেরও। সে চিৎকার চেঁচামেচি কিছুই করলো না। আস্তে করে পাশের চেয়ারে বসলো। তার চোখে পানি। পরের দোষ আর দেবে কি? ব্যর্থ পিতা সে।
আজিজ চিন্তিত হয়েই জাফরের কাছে এগিয়ে গেলো। স্নেহের ভাইকে জাপটে ধরে বলল,– কি হয়েছে রে জাফর, কি হয়েছে। আমাকে বল।
জাফর আজিজকে জড়িয়ে ধরলো! থরথর করে কাঁপছে সে। সেই কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল,– কোথাকার কোন মেয়ে না সে। আমার মেয়ে, পৃথিলা আমার মেয়ে ভাইজান। এক সাগর কষ্ট মাড়িয়ে আমার কাছে এসেছিল। এই মানুষগুলো তাকে শান্তি দেয় নি। এক মূর্হুত্বেরও জন্যও দেইনি। আমি ব্যর্থ পিতা, তার জন্য কিছুই করতে পারিনি। একজন ভালোবাসার দোহাই দিয়ে মেয়েটার গলা চেপে ধরেছে, আরেকজন বাড়ির সম্মান। অথচ এই বাড়ির তারা কেউ না। সারেং বাড়ির কেউ না। সারেং বাড়ির কেউ যদি থাকে সেটা আমি, আর আমার একমাত্র মেয়ে। অথচ এই মেয়েটাকে তারা গায়েব করে ফেলল। মরে যাবো আমি ভাইজান, এবার আমি সত্যিই মরে যাবো।
ঘরের প্রতিটা মানুষ চমকালো। চমকালো জয়তুনও। তার যেন আজ বিস্ময়ের ক্ষমতা শেষ । সে হা করেই জাফরের দিকে তাকালো। কি বলছে জাফর!
আর সবচেয়ে বেশি চমকালো আজিজ। সে জাফরকে আগলে ধরে ছিল। হাত ছুটে গেল। যেতেই বলল, — কি বললি?
জাফর আজিজের কথা উত্তর দিল না। সে তাকালো জয়তুনের দিকে। তাকিয়ে কাতর স্বরে বলল — আম্মা! ও আম্মা। আপনাকে তো কখনো সৎ মা হিসেবে দেখিনি। যা বলেছেন অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি। ভবিষ্যতেও করব। শুধু আমার মেয়েটাকে রেহাই দিন। আপনার সারেং বাড়ি থেকে তাকে আমি অনেক দূরে পাঠিয়ে দেবো। শুধু বলেন, শাহবাজ আমার মেয়েকে কোথায় নিয়ে গেছে?
আয়না ফুঁপিয়ে উঠল। তার আর এতো কিছু সইবার ক্ষমতা কই। ফুঁপিয়েই বলল, — উনি পৃথিলা আপাকে নেননি। উনি তো ঢাকা গেছেন। আমি পৃথিলা আপাকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছি।
আজকে যেন সবার অবাক হওয়ার দিন। অবাক হয়েই এবার আয়নার দিকে তাকালো। তবে এরশাদ, সে তাকালো আগুন চোখে । বোকা আয়না কি বলেছে জানেও না। যেই এরশাদ প্রিয় দাদিকে ছাড়েনি, তাকে ছাড়বে কি? তাই ফরহাদকে এক ধাক্কায় সরালো। সরিয়ে তেড়ে আয়নার গলা চেপে ধরতে গেলো। বীণা আয়নাকে ঝাপটে আড়াল করে দাঁড়ালো। তার রুমের দরজায়’ই তো দাঁড়ানো। দেখেই দৌড়ে উঠেছে। তার নিজের অবস্থাও ভালো না। শরীর কাঁপছে। সেই কাঁপতে কাঁপতে কেঁদে বলল,– ভাই।
এই ভাই শব্দ এরশাদের কানে গেলো না। সে বীণাকে সরাতে গেলো। ফরহাদ আবারও ঝাঁপটে ধরল। ধরে বলল,– শান্ত হ এরশাদ, কোথায় যাবে। ঢাকায়’ই তো। খুঁজে বের করবো। শান্ত হ, দোহাই লাগে শান্ত হ।
এরশাদ শান্ত হলো না। রাগলে সে কি ভয়ংকর হয় ফরহাদ জানে না। জানে জয়তুন, জানে আজিজ। তবে জয়তুন আজও কোন টু শব্দ করলো না। ঐ যে ভয়ংকর রাত, সেই দিন যেমন সব হারিয়ে চুপচাপ বসে ছিল। আজও সব হারিয়ে সেই ভাবেই চুপচাপ বসে রইল। আর আজিজ তার এতোসব দেখার সময় কই। এতো ঝামেলায় কেউ খেয়ালও করেনি। পাগলের মতো দৌড়ে সে সারেং বাড়ি থেকে বেরিয়েছে। তার শরীরও কাঁপছে। বাজে কয়টা? তার জাফরের মেয়ে? তার প্রিয় ফুপুর রক্তের মেয়ে। বলেই দিক বেদিক ভুলে দৌড়াতে লাগলো। হারামদাজা গুলো চেয়াম্যানের লোক। কোথায় নিয়ে গেছে কে জানে। আল্লাহ! শুধু বাঁচিয়ে রাখো। তা না হলে মরার পরে ফুপু কে মুখ দেখাবো কি করে।
ফরহাদের কাছ থেকে এরশাদের ছুটতে সময় লাগলো, কয়েক সেকেন্ড। ফরহাদের শক্তি থাক, তবে এরশাদের হাত পাকা। এই পাকা হাতে দু’এক জন মানুষকে সে অনায়াসেই মাত করতে পারে। তাই অতি সহজে ফরহাদকে ছুঁড়ে ফেলল। ফেলে দাঁত চিবিয়ে বলল,– খবরদার আর এগুবি না। দোয়া কর ও যেন সহি সালামত থাকে। তা না হলে খুন করে ফেলবো! সবাইকে ফেলবো। বলেই আয়নার দিকে তাকালো।
আয়না ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগলো। তার দিকে এগুতেই বীণা আয়নার হাত ধরে এক টানে তার রুমের ভেতরে নিলো। নিয়েই দরজায় খিল দিলো। উপরে নিচে সব জায়গায়। এই ভাইকে সে চেনে না। এ তার ভাই হতেই পারে না।
এরশাদ সেই খিল দেওয়া দরজায় একের পর এক থাবা বসালো। বসাতে বসাতে বলল,– দরজা খুলবি না ভাঙবো?
তখনই মান্না দৌড়ে এলো। কিভাবে যে এসেছে, একমাত্র আল্লাহ’ই জানে। তাই হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,– শাহবাজ ভাইয়ের অ্যাক্সিডেন্টে হইছে। অবস্থা খুবই নাজুক। ঢাকার হাসপাতালে আছে। আর ভাই বলেছে, সে না ফেরা পর্যন্ত বীণা আপার বিদায় যেন না হয়।
শাহবাজের কথা শুনতেই এরশাদের হাত আপনা আপনি থেমে গেলো। থামতেই চোখ দুটো বন্ধ করে ফেললো। আয়না তো শুধু এখন আর গ্রামের সাধারণ আয়না না, তার ছোট ভাইয়ের অর্ধাঙ্গিনী।
চলবে……
আমার গ্রুপের লিংক প্রিয় মানুষেরা। ইচ্ছে হলে টুপ করে জয়েন হয়ে যান।
https://www.facebook.com/groups/2626455844207369/?ref=share&mibextid=NSMWBT

