#প্রাচীর
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ১২
সুবর্ণা মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির মেয়ে। একই গ্রামের ছেলে কায়সার। ভালো চাকরি করতো। ফ্যামিলি থেকেই দেখে শুনে তাদের বিয়ে হয়। কায়সার ছিল খুবই ভালো মনের মানুষ। সুবর্ণার মন জয় করতে সময় লাগে নি তার। সুবর্ণার সব রাগ, জেদ, পাগলামি ভালোবাসায় মুড়িয়ে কেমন শান্ত করে ফেলতো।
চাকরির সুবাদে কায়সারকে শহরে থাকতে হতো। প্রথমে মেসে থাকলেও বিয়ের পরে সুবর্ণাকে নিয়ে উঠে ছোট্ট এক বাড়িতে। সেখানেই শুরু হয় সুবর্ণা সুন্দর, গোছানো, নিজের একটা সংসার।
ওয়াহিদের তখন চার কি বা পাঁচ বছর। এক সন্ধ্যায় পুতুলের মতো সুন্দর এক কিশোরী নিয়ে নাজিম এসে হাজির। নাজিম তাদের গ্রামের’ই ছেলে। কায়সার আর নাজিমরা ছিল প্রতিবেশি। যেহেতু তাদের এক’ই গ্রাম। সেই হিসেবে সেও চিনে। বাবা, মায়ের সংসার ভাঙার পরে গ্রামে না থাকলেও কায়সারের সাথে ভালো সম্পর্ক তার। সেই হিসেবেই এসে দাঁড়িয়েছে।
সে মনে মনে বিরক্ত হলেও কায়সার তাদের ফেলতে পারলো না। তাদের জায়গা হলো সেই ছোট্ট বাড়ির আরেক রুমে। সুলতানা সাদাসিধে অল্প বয়সি মেয়ে। সে যেমন বলতো সে ভাবেই চলতো। আর এভাবেই আস্তে আস্তে বিরক্ত থেকে একটা পরিবার হয়ে গেলো।
সেই পরিবারে ফাটল ধরালো নাজিম। তার ছোট বোন এলো ভার্সিটিতে পড়তে। এই বোনকে কোলে পিঠে বলতে গেলে সেই মানুষ করেছে। মায়ের চেয়ে তার সাথেই ভাব বেশি। এমনিতে আসা যাওয়া থাকলেও সে বার’ই এলো অনেকটা সময়ের জন্য। তখন আর তারা এক বাসায় থাকে না। নাজিমের ব্যবসা হাত ভালো। টাকা পয়সা বেশি ভাগ’ই কায়সারের হলেও, এই ব্যবসা পুরো দাঁড় করেছে নাজিম। কয়েক বছরেই তখন ফুলে ফেঁপে উঠছে। এক বিল্ডিংয়ে থাকলেও তখন আলাদা আলাদা ফ্ল্যাট তাদের। ফ্ল্যাট আলাদা হলেও দু- পরিবার মিলেমিশে একাকার। সেই একাকারের’ই মাঝে সুর্বণা তার বোনকে খেয়াল করলো। কিছু একটা ঠিক নেই। যেই বোন সব সময় হাসি, দুষ্টামিতে মেতে থাকে সেই বোন চুপচাপ, নিশ্চুপ, তাদের মধ্যে থেকেও নেই। কোন কিছু নিয়ে সে বেশ চিন্তিত।
সে তাকে জেকে ধরলো। আর ধরতেই তার বোন তাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। উঠে যা বললো, তার দুনিয়া দুলে উঠল। তার বোন অন্তঃসত্ত্বা। নাজিম আর সে লুকিয়ে বিয়েও করে ফেলেছে।
শুনে আর তার তখন হিতাহিত জ্ঞান নেই। যে হাতে তার বোনকে আদর, ভালোবাসায় বড় করেছে। সেই হাতেই ইচ্ছে মতো আঘাত করলো। কেন সে জেনে বুঝে একটা সংসার ভাঙতে গেছে। নাজিম ফুসলালেই সে ফুঁসবে। তার চোখ নেই, সে দেখেনি। স্ত্রী আছে তার, সন্তান আছে । কেন?
সুবর্ণা কি করবে দিশে পায় না। কেননা অন্তঃসত্ত্বা তো শুধু তার বোন না। সুলতানাও! নিশাতের পরে দ্বিতীয় বার মা হতে চলেছে সে। সে ভাবলো নাজিমের সাথে কথা বলা দরকার। কিন্তু নাজিম! সে পুরো পল্টি মারলো। সে এসব কিছু জানেই না। দুশ্চরিত্রা বোন তার। কার পাপের বোঝা তার ঘাড়ে ফেলছে।
রাগলে সুবর্ণা চোখে দেখে না। তার বোনকে দুশ্চিরিত্রা বলা। তাই সেই দিনও দেখলো না। হাতের সামনে ফুলদানি ছিল সেটা দিয়েই এক বাড়ি মারলো। না সেই বাড়িতে নাজিম মরেনি তবে যেই কথা শুধু তার মধ্যে ছিল, সেই কথা কায়সার, সুলতানা থেকে শুরু সবাই শুনলো।
জানা কথা পুরুষের উপরে কখনো আঙুল উঠে না। উঠে মেয়েদের দিকে। তার বোনের দিকেও উঠল। আর সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেলো সুলতানার ব্যবহারে। সেও তার স্বামীকে বিশ্বাস করলো।
এতো অপমান, এতো লাঞ্ছনা তার বোন সহ্য করতে পারেনি। মুখ ফুলিয়ে চলে গেলো। এই চলে যাওয়া সে মেনে নিবে কি করে। তাই তো নামলো ধ্বংসের এক খেলায়। তার বোন মুত্যুর আগে কোন চিঠি লিখে যাইনি। সে নিজেই নাজিমকে দোষারোপ করে লিখেছে। লিখে কেইস করেছে। আর কেইস করে টাকার এমন খেল তিনি খেলেছেন নাজিম যেনো বাকি জীবন আর বাহিরের হাওয়া গায়ে তো ভালোই অনুভবও না করতে পারে। আর সুলতানা? স্বামীকে এতো বিশ্বাস! বিশ্বাসের মূল্যতো চুকাতেই হবে। তার জীবনকে সে নরক বানিয়ে ফেলেছিল। কেউ তো নেই, যাবে কোথায়? পরে পালিয়ে বেঁচেছে। আর এখন সেই নরকে দরজা তার মেয়ে আবার ঠেলে খুলছে। সহ্য হবে তো নাজিমে মেয়ে নিশাত? তাসনিম নিশাত! তার দেয়াই নাম। এক সময় এই হাতে এই মেয়েটাকে খুব আদর করত। আর এখন পায়ে পিষবে। সময় মানুষকে দিয়ে কত কিছু করায়। বলেই সে ইজিচেয়ারে চোখ বন্ধ করে শুলো।
শুতেই নিতু এলো। ঝড় হবে। বাতাসে পুরো ঘর এলোমেলো হচ্ছে। সে গ্লাসগুলো টেনে দিতেই সুবর্ণা বললো, — কে এসেছে?
— মাহফুজ।
সুবর্ণা সাথে সাথেই চোখ খুললো! ব্যস্ত ভাবে বললো,– কখন?
নিতু হাসলো! হেসে বললো, — কিছুক্ষণ আগে। এসেই তোমার সাথে দেখা করতে চেয়েছিল। তুমি’ই তো বললে কেউ যেন বিরক্ত না করে।
সুবর্ণা ব্যস্তভাবে সাথে সাথেই উঠলো! মাহফুজ শুধু তার মেয়ের জামাই না। তার আরেক ছেলে। সে উঠে বেরুতে বেরুতে বললো, — কেউর সাথে তুই মাহফুজকে তুলনা করিস? গাধী! জামাই এসেছে বাড়ির কারো খবর’ই নেই। বলেই সে বেরিয়ে গেলো।
—–
নিশাত হাই তুলে সায়ানকে বললো, — তোমার কপালে দুঃখ আছে সায়ান।
মাই প্যারেন্টস প্যারাগ্রাফ মুখস্ত করতে গিয়ে সায়ান এমনিতেই দুঃখে ফেটে যাচ্ছে। নিজের বাপ, মা। এদের নিয়ে আবার ইংরেজিতে এতো বলার কি হলো। আবার নাকি আরো দুঃখ আছে। কি দুঃখ? পুরো গুষ্টি নিয়ে ইংরেজিতে লিখতে হবে নাকি? সে মুখ ফুলিয়ে বললো, — আমি আগেই বললাম ম্যাডাম। বাবা, মায়ের উপরে আর কিছু লিখতে পারবো না ।
— সবই লিখবে! ঠেকায় পড়লে বাঘেও ঘাস খায়, সায়ান আর কোন গোয়ালের গরু।
— কেন?
— আমি আর টিউশনি করছি না। হারিয়ে যাওয়া বর পেয়েছি। বিরাট গাড়ি টাড়ি আছে। নতুন ম্যাডাম এসে কি আর এতো সুখ দেবে?
— বিরাট গাড়ি টাড়ি থাকলে আবার টিউশনি করবেন না কেন? গাড়িতে তেল নেই।
— তেল আছে তবে বেল নেই।
— বেল কি?
— সেটা তোমার মাকে বুঝিয়ে বলবো এখন ইংরেজিকে রেহাই দাও। বাংলা বই খুলো। বাংলায় যেন কি দিয়েছিলাম।
সায়ান কথা বললো না, ইংরেজি বই ‘ই আরো আঁকড়ে ধরলো। বাংলার চেয়ে ইংরেজি ভালো। কোথায় ই’কার কোথায় ঈ’কার আর কোথায় আবার কোন র। তারতো মাথাই ঢোকে না।
তখনি নিশাতের ফোন বাজলো। সায়ান হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। যাক বাবা আজকের মতো বেঁচেছে।
নিশাত মোবাইল বের করে দেখলো সজল ভাই। সে রিসিভ করে কানে রাখতেই সজল বললো, — কোথায় তুই?
— টিউশনিতে।
— ছুটি দিয়ে বাইরে আয়, আমি আসছি।
— আসছি মানে?
সজল উত্তর দিলো না! ফোন কেটে দিলো। নিশাতের ভ্রু কুঁচকে গেলো। এতো কাহিনীতে সজল ভাই কে তো ভুলেই গেছে। সে মাথা চুলকালো। চুলকে সায়ানের দিকে তাঁকিয়ে বললো, — আজকে আর পড়াবো না সায়ান। যাও মাকে গিয়ে বলে আসো।
সায়ানের তো আর বত্রিশ পাটি নেই। তাই যেই কয়টা আছে সেই কয়টাই বের করে হাসলো। হেসে দৌড়ে গেলো । বড় বাঁচা বেঁচেছে সে।
নিশাত বের হয়ে রাস্তায় আসতেই দেখলো সজল ভাই রিকশায় বসা। তাকে দেখেই বললো, — উঠে আয় নিশু।
নিশু ডাকটা শুধু সজল ভাই’ই বলে। শুনতে ভালো লাগে। ভালো লাগলেও নিশাত বোকা না। সজল ভাইয়ের হাব ভাব অনেক আগেই স্পষ্ট। তবে সজল ভাই কখনো বড়াবাড়ি কিছু করেনি। বরং সংযত রেখে চলেছে। তবে আজ সজল ভাইকে নিশাতের অন্য রকম মনে হলো। তাই তাঁকিয়ে বললো, — কোথায়?
— আমার কথা আছে।
— যদি পছন্দ, বিয়ে টিয়ের কথা বলতে চাও তাহলে আগেই বলছি সময় নষ্ট।
সজল বড় একটা শ্বাস ফেলে নিশাতের দিকে তাঁকালো। তার মনে হলো এই মেয়েটার হৃদয় বলতে কিছু নেই। তাই শ্বাস ফেলেই বললো, — ওঠ।
— তোমার সাথে এক রিকশায় যাবো না। যদি বোনের নজরে দেখতে তাহলে সমস্যা ছিল না। তবে তোমার নজরে গড়বড় আছে ।
সজল রিকশা থেকে নেমে গেলো। ভাড়া মিটিয়ে বললো,– আয়।
নিশাত হাঁটতে হাঁটতেই বললো, — সকাল থেকে কোথায় ছিলে?
— এক বন্ধু ওখানে।
— খেয়েছো?
— হ্যাঁ।
— রাগ করেছো কেন?
সজল কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইল! তারপর বললো, — আমি তোকে পছন্দ করি নিশু। এখন না অনেক আগে থেকে।
— আমি জানি সজল ভাই। আর এই পছন্দই আমাদের মাঝে দূরত্ব এনে দিয়েছে। তা না হলে ছোট বেলা থেকে আমরা বন্ধুর মতো ছিলাম।
— তুই জানতি?
— হ্যাঁ! না জানার কি হলো?
— আমি ধারণা করেছিলাম তুই বুঝিস’ই না।
নিশাত হাসলো! সজল সেই হাসির দিকে তাঁকিয়ে রইলো। নিশাতের কখনো চোখ হাসে না । খুশিতে পুরো মুখ ঝিলমিল করে না। তার খুব ইচ্ছে করে এই ঝিলমিল করা মুখটা দেখার। সে তাঁকিয়েই বললো, — এই না বললি বিয়ে করবি না। এখন আবার পুরো পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে নেচে নেচে বিয়ে করছিস।
— টাকা পয়সা দেখে মাথা ঘুরে গেছে। তাছাড়া ভাবলাম মরবোই যখন এসি, নরম খাট, বিলাসিতা মাঝেই মরি।
— তুই মরতে যাচ্ছিস নাকি ?
— উঁহু! মারতে।
সজল মলিন ভাবে হাসলো! হাসল নিশাতও! হাসতেই তার নজর পড়ল, তাদের অনেকটা দূরে কালো একটা গাড়ির উপরে। তখনি তার মনে হলো এই গাড়িটা সে যাওয়ার সময়ও দেখেছে। আর কোথায় যেন দেখলো। এক মিনিট! বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকে এ গাড়ি তার পেছন পেছন ঘুরছে। সে ঠোঁটে ঠোঁট চেপেই বললো, — বাসায় চলো।
— তুই যা, আমি পরে আসছি।
— কেন এসেছিলে।
— সত্য বলবো না মিথ্যা।
— তোমার যেটা ইচ্ছে।
— আমি তোকে তুলে নিয়ে যেতে এসেছিলাম। ঐ যে দেখ সিএনজি। সিএনজিতে আমার বন্ধুরা আছে। আমি জানতাম তুই আমার সাথে রিকশায় বসবি না। হাঁটতে হাঁটতে আমি ইশারা দিলেই তার এগিয়ে আসতো।
নিশাত হেসে ফেললো! হেসেই বললো, — নিজেকে আমার সেলিব্রিটি মনে হচ্ছে।
সজল উত্তর দিলো না। পকেট থেকে সিগারেট বের করে আগুন ধরালো। ধরিয়ে চোখ বন্ধ করে ধোঁয়া ছাড়লো। ছেড়ে বললো, — একটা গান শোনা নিশু।
— না! আমি শুধু আমার জন্য গাই।
— ভালো!
নিশাত আর কিছু বললো না। দু’জনে নিশ্চুপ কিছুক্ষণ হাঁটলো। তারপর নীরবতা ভেঙে নিশাত বললো, — প্ল্যান চেঞ্জ হলো কেন?
সজল নিশাতের দিকে তাঁকালো! সন্ধ্যার কোমল আলোয় মুখটা কেমন রং তুলির আঁকা ছবির মতো লাগছে। সেই কোমল ছবির মতো মুখের দিকে তাঁকিয়ে বললো, — ভালোবাসি যে তাই।
চলবে…..

