অচিনরেখা” বিনতে ফিরোজ ৯.

0
2

“অচিনরেখা”
বিনতে ফিরোজ
৯.

“কি বললে তুমি!” আজাদের কণ্ঠ হতভম্ব শোনালো।
শাহরিয়ার চুপ করে রইলো।
আজাদ ধমকালেন, “কি বললে!”
“ঠিকই শুনেছ। আবার শুনতে চাইলে বলছি। তুমি অনেক আগেই শ্বশুর হয়ে গেছ।” শাহরিয়ারের মাথায় হঠাৎ আজাদকে বিরক্ত করার পোকা ঢুকলো। আজাদের মুখটা আস্তে আস্তে লাল হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে এক্ষুণি ফুলে যাবে। তারপর একসময় ফুলতে ফুলতে ফেটে যাবে। শাহরিয়ার কল্পনায় চলে গেল।
“আমার সাথে একদম ফাজলামি করবে না শাহরিয়ার!”
ফাটাফাটির আগেই কল্পনা থেকে ছিটকে বেরিয়ে এলো শাহরিয়ার।
সে বিরক্ত হলো, “ফাজলামি করছি না। সত্যি কথাই বলছি।”
আজাদ বড় করে দুইবার নিশ্বাস নিলেন।
“তুমি বিবাহিত?”
“হ্যাঁ।” শাহরিয়ার মাথা নাড়ল।
“বিয়ে করেছ?”
“হ্যাঁ।”
“কাকে?”
“মেহরিমাকে।” তক্কে তক্কে বলে ফেললেও পরক্ষনেই সংবিৎ ফিরে পেলো শাহরিয়ার। আফসোস হলো রুমির জন্য। ও দেখতে চেয়েছিল মেহরিমার কথা শুনে বাবা কি রিয়্যাকশন দেয়। দেখতে পেলো না। আহা বেচারী!
“কাকে!” আজাদ চেঁচিয়ে উঠলেন।
“মেহরিমাকে। আরমান বিশ্বাসের বড় মেয়ে। তোমার ভাস্তি। আফজাল বিশ্বাসের বড় নাতনি।”
আজাদ কতক্ষন স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। নড়চড়হীনভাবে। মনে হলো কথাটা তিনি হজম করতে পারছেন না। শাহরিয়ার আস্তে করে ডাকলো, “বাবা?”
আজাদ মেঘ স্বরে বললেন, “কবে?” তার মাথায় যেন বজ্রপাত হয়েছে। আরমানের কাছে ফোন করার জন্যই এই ছেলে বড় হওয়ার পরও মা-র খেয়েছে। সেদিন চড়টা দিয়ে তো আযাদ বিশ্বাস নিশ্চিন্তে ছিলেন শাহরিয়ার আর ওদিকে তাকাবে না। আজাদের চিন্তাকে বহু পেছনে ফেলে সে সেখানে ঘাটি গেড়ে বসেছে। তার মাথা ঘুরতে লাগলো।
শাহরিয়ার গলা খাঁকারি দিলো। পুরো সিনেমা চলছে। এবার আসবে আসল টুইস্ট।
“তের বছর আগে। দুই হাজার বার সালে।”
আজাদ বিশ্বাস চোখ বড় করে তাকালেন।
শাহরিয়ার নিজেই বলল, “আমি জানি তুমি কি ভাবছো। তখন আমার বয়স ছিল বার, মেহুর নয়। দাদা আমাদের বিয়ে দিয়েছিলেন। মেহুর হাতে যেই আংটি সেটা আমাদের বিয়ের।”
আজাদ সাথে সাথেই কিছু বললেন না। ব্যবসায়িক মাথা দিয়ে হিসাব নিকাশ শুরু করলেন। তার মুখে হাসি ফুটে উঠল। কাঙ্খিত উত্তর পেয়ে গেছেন।
এতক্ষণে হতভম্ব ভাব চেহারা থেকে এক নিমিষে উড়িয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “বার বছরে কি কোনো বিয়ে হয়? এটা কি খেলা নাকি? ওসব ভুলে যাও। নাসিরের মেয়ের সাথে কথা বলো।”
শাহরিয়ারের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। এতক্ষণে গা ছাড়া ভাবটা উবে গেল এক ঝটকায়।
“ঠিক বলেছ বাবা। বিয়ে কোনো খেলা না। অলরেডি আমি বিয়ে করেছি। বউ সহি সালামতে বেঁচে আছে এবং তাকে নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নেই। আর বিয়ে করার ইচ্ছেও নেই। তাই আশা করি এই বিষয়ে আর কোনো কথা উঠবে না।”
“জেদ করবে না শাহরিয়ার। এটা কোনো বিয়ে হলো? আব্বা কি মনে করে এসব করেছেন উনিই জানেন। কেউ জানে তোমাদের বিয়ের কথা? বলো?” আজাদকে বিরক্ত মনে হলো।
“রাশেদা খালা জানেন। দাদা নিষেধ করায় কাউকে বলেননি। উনি নিজেই বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আল্লাহ হয়তো অন্য কিছুই চান।”
“সেই অন্য কিছুটা নাসিরের মেয়ের। আরমানের মেয়ে না। আমার কথা তুমি বুঝেছো?”
“আমি বিয়ে করতে না চাইলে তুমি কি আমাকে জোর করবে?”
“প্রয়োজনে করবো।” একগুঁয়ে কণ্ঠে বললেন আজাদ।
“কোনো প্রয়োজন নেই বাবা। আমার সারা জীবনের একটা ডিসিশান। আমাকে পছন্দ মতো নিতে দেবে না?”
“যেটাতে তোমার ক্ষতি সেটাতে তোমার পছন্দ খাটবে না।”
“মেহুকে তুমি কতটুকু চেনো? কিভাবে বুঝলে ওর সাথে থাকলে আমার ক্ষতি হবে?”
“আরমানের মেয়ে নিশ্চয়ই ওর মতোই হবে। না জানার কি আছে? এসব মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো শাহরিয়ার।”
শাহরিয়ার উঠে দাঁড়ালো। কাঠ কাঠ কণ্ঠে বলল, “ঝেড়ে ফেলানোর জন্য তো এখানে আসিনি। মেহুকে সসম্মানে নিয়ে যেতে এসেছি। ভেবেছিলাম তোমার দোয়া নিয়েই কাজটা করবো।”
“কক্ষনো না! তুমি এমন কিছু করবে না শাহরিয়ার!”
“করবো বাবা। ইনশাআল্লাহ্। তের বছর ধরে বউকে ফেলে রেখেছি। আর কতো?”
“চুপ! আমি ঐ মেয়েকে আমার বাড়িতে ঢুকতে দেবো না।”
“আচ্ছা।”
“কোথায় রাখবে ওকে?”
“তুমি বোধহয় জানো না আমার চাকরি প্রায় কনফার্ম।”
“ও! বাপের টাকায় পড়াশোনা করে, চাকরি পেয়ে এখন সেই চাকরির দাম আমাকে দেখাচ্ছ?”
শাহরিয়ার দাঁতে দাঁত চাপলো। চোখ বন্ধ করে নিশ্বাস ছেড়ে বলল, “দাম দেখাইনি বাবা। তোমাকে না জানিয়ে কিছু করব না বলেই এখানে ডেকেছি। নয়তো মেহুকে আমি নিয়ে যেতে পারতাম না?”
“শাহরিয়ার দেখো এসব ফালতু কথা মাথা থেকে বাদ দাও। ওরা কোনোভাবেই আমাদের সাথে যায় না। আরমানের অবস্থা দেখেছো তুমি?” কণ্ঠ নরম করার চেষ্টা করলেন আজাদ।
“মেহরিমাকে দেখাই যথেষ্ট না?”
“এখন এসব মনে হচ্ছে। বিয়ের পর যখন এক্সপেকটেশন মিলবে না তখন কি আর সবকিছু ঠিক করতে পারবে?”
“তোমার দুজন তো একই বাবার ছেলে। তাহলে নিজেদের মাঝে এতো তুলনা করছ কেন!”
মেকি শান্ত ভাবটা নিমিষেই উড়ে গেলো, “আরমানকে চেনো তুমি! জোচ্চোর কোথাকার! সবসময় ধান্দায় থাকে কিভাবে ব্রদারি হক মা-রা যায়!”
কষ্টের মাঝেও শাহরিয়ার হাসলো, “ওটাকে কি তুমি তোমার অধিকার বলে ভাবো? অথচ সেটা আমার দায়িত্ব। বুড়ো বয়সে ঐ মানুষ দুটোকে দেখার দায়িত্ব।”
“একদম জ্ঞান দেবে না আমাকে। নাসিরের মেয়েকে তুমি বিয়ে করবে। কোনো কথাবার্তা বলা লাগবে না। আমি আজকেই ওর সাথে কথা বলব। বিয়ে করিয়েই নিয়ে যাবো তোমাকে।”
আজাদ উঠে চলে যাচ্ছিল শাহরিয়ার ওখানেই দাঁড়িয়ে ছিল। শান্ত কণ্ঠে সে বলল, “বাবা পরে বলবে না আমি তোমাকে জানাইনি।”
আজাদ বিশ্বাস শুনলেও থামলেন না। হনহন করে চলে গেলেন। শাহরিয়ার দম ছাড়লো। অনেক কাজ করতে হবে।

●● ●● ●●

এক প্রকার ছুটেই বাড়িতে এলো শাহরিয়ার। ভেতরে ঢুকতেই থমকে গেলো সে। মেহরিমাদের বাড়িতে একগাদা লোক। অপরিচিত। মেহরিমার নানীর বাড়ির দিকের আত্মীয় ভেবে শাহরিয়ার ঘরে চলে গেলো। রুমিকে ফোন দিয়েছিল মা-কে নিয়ে আসার জন্য। যাওয়ার দিন এগিয়ে এসেছে। তার আগেই আতিয়াকে সে সবটা জানাতে চায়। আতিয়া খুশি না হলেও আজাদ বিশ্বাসের মতো এতো চোটপাট দেখাবেন না বলেই শাহরিয়ারের বিশ্বাস।
তারা আসতে দেরি করলে উঠানে বের হলো শাহরিয়ার। মেহজাবিনকে বের হতে দেখে ডাকলো। মেহজাবিনের মন ভালো ছিল বিধায় এগিয়ে গেল।
শাহরিয়ার ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “বাড়িতে অনুষ্ঠান নাকি?”
“হ্যাঁ।” মাথা নাড়ল মেহজাবিন।
“কেনো? তোমার বিয়ে?”
“না আপার।” নির্বিকার কণ্ঠে বলল মেহজাবিন।
“ওহ আচ্ছা। কিহ!” প্রথমটায় কথাটা ধরতে না পারলেও সেকেন্ডের মাঝেই সেটা মাথায় বি-স্ফো-র-ণ ঘটালো।
“চেচাচ্ছেন কেন?”
“মেহুর বিয়ে!”
“হ্যাঁ।”
“কেন!”
“কি আশ্চর্য! এটা আবার কেমন প্রশ্ন! আপনার বিয়ে হতে পারে আর আমার আপার বিয়ে হতে পারে না?”
“মেহজাবিন এক্ষুনি ভেতরে গিয়ে মেহুকে বলবে আমি ডাকছি। ও যদি না আসে অথবা তুমি যদি না বলো তাহলে আমি ডাইরেক্ট ঘরে ঢুকে যাবো। তারপর মেহুকে টেনে বের করব। সেটা নিশ্চয়ই বাজে দেখাবে তাই না? যাও ভদ্র মেয়ের মতো ওকে নিয়ে আসো। আসতে না চাইলে জোর করবে। তুমি না করলে আমি করব। বুঝেছো? গুড। এবার যাও।”
মেহজাবিন মাথা নাড়ল। শাহরিয়ারকে পাগলের মতো দেখাচ্ছে। মুহুর্তের মাঝেই চেহারার রং পাল্টে ফেলেছে লোকটা। সে দৌড়ে ঘরে গেলো।

“এই আপা!” মেহরিমা বেগুনি রঙের একটা শাড়ি পরে বসেছিল। ইউনূসের বাড়ির লোকজন তাকে দেখতে এসেছে। সে নিজেও জানতো না আজকে আসবে। জানার পরও কিছু বলেনি। তার তো আর কিছু বলার নেই। কি বলবে? কার জন্য বলবে?
অনুভূতিহীন চোখে মেহজাবিনের দিকে তাকালো মেহরিমা।
“ঐ লোকটা পাগল হয়ে গেছে!”
“কে?” অনিচ্ছা সত্ত্বেও জানতে চাইলো মেহরিমা।
“তোর শাহরিয়ার ভাই। বলছে এক্ষুনি মেহুকে বাইরে নিয়ে আসবে নাহলে আমি যেয়ে ওকে টেনে বের করব। তুই চল আপা। ঐ লোক নাহলে সত্যি সত্যি ঢুকে পড়বে। একেবারে ক্ষেপে আছে। ঢুকলে ইউনূস ভাইয়ের বাবা মা যদি কিছু মনে করে!”
মেহরিমার অনুভূতিহীন চোখে মুহূর্তেই ক্রোধ খেলে গেল। শাড়ি সামলে উঠে দাঁড়ালো সে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “নাটক করতে এসেছে এখানে! ওর চ্যাপ্টার আজকেই ক্লোজ করবো।”
বলতে বলতে মেহরিমার কিন্নর কণ্ঠ কেঁপে উঠল। হালকা জল এলো চোখেও। মেহজাবিন ঠিক পেলো না। সে ব্যস্ত দরজার দিকে তাকিয়ে বোনকে বাড়ির পেছনে পাঠাতে।

~চলমান~

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here