#চৈত্রের_প্রেম_নির্বাসন— —০৬
#আরোবী_খান_সিনথিয়া
“মাহির ভাইয়া ! আমা… আমার হাত ভীষণ জ্বলছে !”
অশ্রুসিক্ত নয়নে পিহু ব্যথায় চেঁচামেচি শুরু করেছে একপ্রকার। মুহূর্তেই পিহুকে বুকে টেনে নিল মাহির ,
— “শান্ত হো , পিহু। আমি আছি না তোর সাথে , আমরা এক্ষুনি ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি ! উনি হাতে মলম লাগিয়ে ব্যথা দূর করে দিবে।”
কথাগুলো বলতে বলতে মাহির , পিহুর পিঠে হাত বুলাতে লাগল। মাহির ফের বলল ,
— “উঠ এবার দেখি , পিহু! যলদি উঠ , ডাক্তারের কাছে যাবো !”
কথাটা বলেই মাহির, পিহুকে টেনে তুলল। গাড়িতে পিহুকে ফ্রন্ট সিটে বসিয়ে , নিজে ড্রাইভার সিটে বসল। গাড়ি স্টার্ট দিতেই যাবে , কী ভেবে মাহির থেমে গেল। পিহুর কাছে এগিয়ে গিয়ে , জানালাটা আটকানো কি না দেখল।
*
পিহুকে নিয়ে মাহির এসেছে তার বন্ধু নোমানের
চেম্বারে । পিহুর হাতে ক্ষতের সাথে লাগা মাটির ময়লাগুলো পরিষ্কার করতে করতে নোমান , পিহুর সাথে হালকা পাতলা কথা বলল ! পিহু জানালো , মাহির তাকে টেনে ফেলে দিসে রাস্তায়! নোমান ভ্রু কুঁচকে তাকালো মাহিরের দিকে !
পিহুর পাশের চেয়ারে বসা মাহির। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল , — “দু’টো ছেলে বাইকে করে আসছিল , তার মধ্যে একটা ছেলে পিহুর দিকে এসিড ছুড়ে মারার চেষ্টা করেছে , নোমান !”
নোমানের কাছে এসব কেস আগেও এসেছে। তাই তার কাছে ব্যাপারটা ভীষণ স্বাভাবিক ঠেকল। পিহুর হাতে মলম লাগিয়ে দিতে দিতে চাপা স্বরে নিজেকেই বলল , — — “কে করতে পারে মেয়েটার সাথে এমন ?”
উত্তর মেলল না তার কাছে । পিহুর দিকে তাকালো নোমান , — — “আচ্ছা , পিহু? তোমাকে কোন ছেলে স্কুলে , রাস্তায় ডিস্টার্ব করে ?”
পিহু কথাটা শুনে মাথা নিচু করে ফেলল। পিহুকে চুপ থাকতে দেখতে মাহির ভ্রু কুঁচকালো , — — “এখানে তাকা , পিহু?”
মাহিরের ডাকে তাকালো পিহু। মাহিরের মুখটা ভীষণ গম্ভীর হয়ে আসল , — — “কী লুকাচ্ছিস আমার থেকে তুই ?”
পিহু চোরের মতো আশপাশ দেখতে লাগল। মাহির ধমকে উঠল রাগে। মুহূর্তেই পিহু কেঁপে উঠল! নোমান মাহিরকে হাত দিয়ে চুপ করার ইশারা করে , পিহুকে ধীর কন্ঠে বলল , — — “ মাহির তোমাকে বকবে না , আমি মাহিরকে বলে দিব! আমি তো ওর বন্ধু , ও আমার কথা শুনবে । তুমি আমাদের বলতে পারো…”
পিহু কাচুমাচু করে বলল , — — “মাহির ভাইয়া ভাববে , আমি ঐ লোকটার সাথে প্রেম করছি ।”
মাহির অস্থির কন্ঠে বলল , — — “কোন লোক ?”
পিহু একবার মাহিরকে দেখল। মাহিরের চোখ মুখ গম্ভীর। নোমান পিহুকে আস্বস্ত করল , — — “ মাহির কেন ভাববে , তুমি কারো সাথে প্রেম করছো ? তুমি কী কোন ছেলের সাথে লুকিয়ে লুকিয়ে কথা বলো ? কিংবা দেখা করো ?”
পিহু ডানে বামে মাথা নাড়ল। পিহু এমন কিছুই করে না। নোমান তখন প্রশ্ন ছুঁড়ল , — — “তাহলে কেন তুমি এত ভয় পাচ্ছো ?”
পিহু চাপা স্বরে বলল , — — “রাহা আপু বলেছে !”
মাহির মুহূর্তেই রেগে উঠল , — — “কতবার বলেছি , তোকে আমি রাহা থেকে দূরে থাকতে ? কথা কানে যায় না ! সাহস কী করে হলে আমার কথা অমান্য করার ?”
মাহিরের ধমক কর্ণকুহুরে আসতেই পিহু মুহূর্তেই কেঁদে উঠল , — — “ আমি রাহার আপুর সাথে এখন আর কথা বলি না। লোকটা অনেক আগে থেকে ডিস্টার্ব করত। রাহা আপু বলেছে , ইগনোর কর । শুধু শুধু আপনাকে না জানাতে । না হলে আপনি লোকটাকে না কী মে রে ফেলবেন !”
মাহির দাঁতে দাঁত পিষে পিহুর দিকে তাকিয়ে। যেন মুহূর্তেই পারলে পিহুকে কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। নোমান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল , — — “পিহু?”
পিহু নোমানের দিকে তাকালো। নোমান ফের বলল ,
— — “তুমি কী লোকটাকে চিনো ?”
পিহু উপর নিচে মাথা নাড়ল । নোমান মাহিরের দিকে তাকালো। মাহির তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পিহুর দিকে তাকিয়ে ,
— — “কে সে ?”
পিহু মাথা নীচু করে ফেলল । তার দু’চোখ দিয়ে অজস্রে অশ্রু ঝরছে । পিহু অস্থির কন্ঠে বলল ,
— — “আমার তার সাথে কোন সম্পর্ক নেই , মাহির ভাইয়া! আমি সত্যি বলছি !”
মাহির স্বাভাবিক হলো , – – “আমি বিশ্বাস করি তোর কথায় । এবার বল দেখি– লোকটা কে ?”
পিহু মাথা উপরে তুলল। মাহিরের চাহনিতে আটকে আসল পিহু। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল , – – “মোহনাকে আপুর যার সাথে বিয়ে ভেঙে ছিল না…”
পিহু কথাটা শেষও করতে পারল না । তার আগেই মাহির বলে উঠল , — — “কে ? আহনাফ?”
পিহু মাথা উপর নিচে করল। মুহূর্তেই মাহির হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলল , — – “কী করত সে ?”
পিহু চোখ নামিয়ে নিল। আশপাশ তাকাতে তাকাতে বলল , — — “উনি আমাকে হুট হাট এসে পথ আটকাতো! বলত– সে আমাকে ভালোবাসে। আমি যেন তাকে বিয়ে করতে রাজি হই ! বাকি সব কিছু নাকি উনি সামলে নিবে ।”
পিহু কথাগুলো বলে থামল। তখন নোমান প্রশ্ন ছুঁড়ল ,
— — “লোকটিকে তুমি কী বলেছিলে পিহু?”
নোমানের প্রশ্ন শুনে পিহু আঁতকে উঠল। আমতা আমতা করে বলল , — “আ…মি…”
“হ্যাঁ , তুমি! কী বলেছিলে তুমি ?” — — নোমানের ফের প্রশ্নে। পিহু সম্পূর্ণ মাথা নিচু করে ফেলল। মাহির রাগে দাঁতে দাঁত পিষে বলল , — — “ছাড় এসব কথা ! ওর কাছে পিহুকে কখনো দেবো না বলেছিলাম ! তারপরও কত বড় সাহস আহনাফের! ওকে আমি ছাড়ব না !”
মাহিরের কথা শুনে , নোমান বলল , — — “দেখ , কথা এটা না ! কথা হচ্ছে , পিহুকে কে এসিডের আঘাত দিতে চেয়েছিল ?”
মাহির চাপা স্বরে বলল , — — “আর কে দিতে চাইবে ? শালা ! ঐ আহনাফই নিশ্চয়ই এ কাজ করেছে ! পিহু ওকে সে দিনও বিয়ে করতে চাই নি ! তাই সে এসব করছে!”
নোমান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল , — — “সব ছেলে এক হয় না , মাহির ! ভালোবাসা পাইনি বলেই , মেয়েটার লাইফ নষ্ট করে দিবে ! এটা সবাই করেও না ! আমার মতে , তোর পুলিশ কমপ্লেন্ট করা উচিৎ !”
মাহির রাগে তার তর করে কাঁপছে। সে মাথা নাড়ল! সে পুলিশ কমপ্লেন্ট করবে । পিহুকে নিয়ে মাহির বেরিয়ে পরল পুলিশ স্টেশনের দিকে। গাড়ি চালাতে চালাতে মাহির বলল , — — “পিহু !”
— “হু ?”
— “আমার কথা শুনবি?”
— “কী কথা ?”
— “তুই অহনাফের কথাটা ছাপিয়েছিস , ভীষণ কষ্ট পেয়েছি আমি !”
মাহিরের কথাটা শুনতেই পিহু মুহূর্তেই মাথা নিচু করে ফেলল। চাপা স্বরে বলল , — — “আই’ম সরি , মাহির ভাই !”
মাহির এক হাতে গাড়ি চালাতে চালাতে , আরেক হাত পিহুর মাথায় রাখল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল , — — “প্লিজ আর কখনো আমার থেকে কথা ছাপাবি না ! প্রমিস কর ?”
পিহু মাথা তুলল। মাহিরের দিকে তাকিয়ে বলল ,
— — “আমি আর কখনো এমন করব না , মাহির ভাই! আই…আই প্রমিস !”
মাহির সামনে তাকিয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে বলল ,
— — “অলরাইট !”
পুলিশ কমপ্লেইন করে , পিহুকে বাড়ি নামিয়ে মাহির কোথাও একটা চলে গেল। পিহু ভেতরে ঢুকতেই , ড্রয়িংরুমের সোফায় মোহনাকে বসা দেখল। মোহনা পায়ের শব্দ পেয়ে , দরজার দিকে তাকাতেই পিহুকে একা দেখে ভ্রু কুঁচকালো , — — “আমার ভাই কোথায় , মুখ পুড়ি? তোর সাথে না গিয়েছিল ?”
সবসময়ের মতো পিহু ভয় পেল মোহনাকে। মাথা নিচু করে মোহনাকে পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে বলল ,
— — “মাহির ভাইয়া বলল , তার নাকি একটা কাজ আছে ! সে সন্ধ্যায় ফিরবে বাড়ি !”
মোহনা আর কিছু বলল না। পিহুকে আগাগোড়া খেয়াল করল , পিহুর হাতে ব্যান্ডেজ দেখে ভ্রু কুঁচকালো ! চেঁচিয়ে উঠল , —- — “এই দাঁড়া !”
পিহু কেঁপে উঠল। মোহনার দিকে তাকালো। পিহুর দিকে এগিয়ে আসতে আসতে মোহনা বললো ,
— — “কী হয়েছে তোর হাতে ? আমার ভাই কোথায় সত্যি করে বল তো ? কোন এক্সিডেন্ট হয়নি তো ?”
পিহু দ্রুতই ডানে বামে মাথা নাড়ল। তখন মোহনা পিহুর অনেকটাই কাছে এসে পরেছিল। ব্যান্ডেজের জায়গাটায় চেপে ধরে মোহনা চেঁচিয়ে উঠল , — — “তাহলে এসব কী তোর হাতে ? ঢং করতে এসব লাগিয়েছিস , কপাল পুড়ি ! সত্যি করে বল , আমার ভাই কোথায় ? না হলে এখন তোর জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলব! যে মুখে আমার কাছে মিথ্যা বলেছিস , সে মুখ আমি আর রাখব না , কপাল পুড়ি !”
হাতের ব্যথায় মুহূর্তেই পিহু চেঁচিয়ে উঠল ,
— — “ওমা ! আমাকে বাঁচাও ! প্লিজ আপু আমার হাত ছাঁড়ো ! ব্যথা লাগছে ভীষণ !”
চলবে—- সবাই বড় বড় গঠনমূলক মন্তব্য করবা— নাহলে !!! গল্প দিবো না আররররর!!!!!

