#চৈত্রের_প্রেম_নির্বাসন— —০৭
#আরোবী_খান_সিনথিয়া
“ওমা ! আমাকে বাঁচাও ! প্লিজ আপু আমার হাত ছাঁড়ো ! ব্যথা লাগছে ভীষণ !”
—পিহুর চিৎকারে নিজের রুম থেকে বেরিয়ে আসলেন প্রিয়তা আর রাশেদা বেগম । রাশেদা বেগম দ্রুত এসে , মোহনার থেকে পিহুর হাত ছাড়িয়ে , কষে এক চড় মারলেন মোহনার গালে !
হতভম্ব হয়ে গেল মোহনা। গালে হাত দিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ল ,
— — “বড় আম্মু ? তুমি আমায় মারলে ? এই অপয়া মেয়ের জন্য মারলে ?”
প্রিয়তা বেগম এবার মোহনার হয়ে কিছু বলতে পারলেন না। পিহু , প্রিয়তা বেগমকে জড়িয়ে ধরে কান্না করছে।
রাশেদা বেগম আরও দ্বিগুন চেঁচিয়ে উঠলেন ,
— — “সমস্যা কী তোর ? পিহুর সাথে সবসময় এমন ব্যবহার কেন করিস? দেখছিস না পিহুর হাতে ব্যান্ডেজ? তারপরও কেন ব্যথার জায়গায় ব্যথা দিচ্ছিস?”
মোহনা রক্তবর্ণ চোখে পিহুর দিকে তাকালো। রাগে দাঁতে দাঁত পিষে বলল , — — “আই হেইট পিহু! আই হেইট হার! যখন থেকে আমাদের বাড়িতে এসেছে ! সবাই শুধু পিহুর গুনগান করে ! পিহু ছাড়া বুঝি ভালোবাসা আদর পাওয়ার আর কেউ যোগ্য না ?”
কথাগুলো চেঁচিয়ে বলতে বলতে হঠাৎ মোহনা চিৎকার দিয়ে উঠল। পেটে হাত চেপে ধরল। চিৎকার দিয়ে বলতে লাগল , — — “ও মা! আমার বাচ্চা! আমার বাচ্চা !…”
রাশেদা বেগম মুহূর্তেই জড়িয়ে ধরল মোহনাকে,
—- — “কী হয়েছে তোর ? এই মোহনা ? মোহনা…”
— — “আমার বাচ্চা ! আমার বাচ্চাকে বাঁচাও ! আমার পেট ব্যথা করছে ভীষণ ! আ…”
পিহুকে ছেড়ে প্রিয়তা বেগমও মোহনার কাছে ছুটে আসলেন। মোহনাকে গাড়ি করে দ্রুত হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হলো। পথিমধ্যে রেদওয়ান আর মাহিরকেও জানানো হলো বিষয়টা! মাহির আর রেদওয়ান ছুটে আসল হসপিটালে !
সবার চোখে মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ! কতক্ষণ পর ডাক্তার বের হয়ে বললেন , বেশি উত্তেজনার জন্য লিভার পেইন উঠেছিল। এই সময় মেয়েদের নিজেকে খুশি রাখা উচিৎ। পরিবেশ বন্ধুসুলভ হওয়া উচিৎ! বেশি বেশি আদর যত্নের দরকার !
ডাক্তারের কথা শুনে , রাশেদা বেগমের নিজের ওপর রাগ হলো। এ সময় মেয়েটার সাথে খারাপ ব্যবহার করলেন। কিন্তু কী করবেন ? এসব দেখতে দেখতে অসহ্যকর হয়ে উঠেছে তার কাছে!
*
রাতের তখন বারোটা বেঁজে পাঁচ মিনিট। মাহির আর রেদওয়ান হসপিটালে! আজ মোহনাকে হসপিটালেই রাখা হবে। তাকে ডিসচার্জ করা হবে !
মাহির তাদের মাঝের নীরবতা ভেঙে বলল ,
— — “জানিস , আজকের দিনটায় বাজে ! পিহুর কিছু হয়নি দেখে একটু শান্তি পেয়েছিলাম ! কিন…কিন্তু মোহনার খবর শুনে দেহ থেকে আত্মা বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো !”
মাহিরের কথায় রেদওয়ানের কোন হেলদোল দেখা গেল না। মাহির ভ্রু কুঁচকে রেদওয়ানের দিকে তাকালো। বাহুতে চিমটি কাটল ! রেদওয়ান নিজের হুশে ফিরল ! মাহিরের দিকে তাকালো।
মাহির এক ভ্রু উঁচিয়ে বলল , — — “এত চিন্তা করছিস কেন ? তোর বউ বাচ্চা দু’টোয় সেফ আছে ! খোদা চাইলে , বাচ্চা আর বাচ্চার মা দু’জনই আজীবন তোর মাথা খা….”
মাহির কথাটা বলেও শেষ করতে পারল না। তার আগেই রেদওয়ান বলে উঠল , — — “পিহুর ওপর এসি*ডের অ্যাটাক মোহনা করিয়েছিল !”
মাহির ভ্রু কুঁচকে বলল , — — “কিহ? কী বলছিস এসব ? আমার বোন এসব করাতে পারে না ! কখনো না!”
রেদওয়ান বিধ্বস্ত অবস্থায় বলল , — — “এখন তুই কী চাইছিস? আমার অনাগত বাচ্চার কসম খেয়ে বলব ? আমি মিথ্যা বলছি না? তোর কী মনে হয় ? আমি আমার ভালোবাসার মানুষের ওপর মিথ্যা আরোপ দেবো?”
মাহির চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো , — — “আমি বিশ্বাস করতে পারছি না ! আমার বোন এতটা নিচে নামতে পারে না ! কখনো না!”
রেদওয়ান চাপা স্বরে বলল , — — “আমিও ভাবিনি! কিন্তু কাল রাতের পর আজ তোর মুখে যা শুনলাম , তারপর বিশ্বাস করতে বাধ্য হলাম !”
মাহির কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল , — — “কাল রাতের পর ? মানে ?”
রেদওয়ান মাথা নিচু করে ফেলল , — — “কাল রাত মোহনাকে আমি এক অগত্যা লোকের সাথে কথা বলতে দেখেছিলাম ফোনে। মোবাইলে চেক করতে দেখে , দেখি— তার একাউন্ট থেকে বড় একাউন্টের টাকা ট্রান্সফারও হয়েছে ! মোহনা প্রেগন্যান্ট দেখে , আমি তার এসব ব্যাপারে মাথা ঘামায় নি ! মেয়েটা যদি বিরক্ত হয় এ ব্যাপারে ?”
মাহির অস্থির কন্ঠে বলল , — — “তাই বলে তো , এটা প্রমাণ হয় না ? আমার বোন এসবের পেছনে !”
রেদওয়ান তখন মাহিরের দিকে তাকালো ,
— — “তাহলে চল , আমরা ঘেঁটে দেখি ! আমি ভুল ভাবছি নাকি তুই ?”
মাহির ধীর কন্ঠে বলল , — — “কীভাবে ?”
রেদওয়ান তখন চাপা স্বরে বলল , — — “আমরা মোহনাকে ব্লেক মেইল করব ! বলব , আমরা জানি , পিহুর সাথে হওয়া ঘটনার পেছনে মোহনা দায়ী ! আমরা টাকা ডিমান্ড করব ! যদি টাকা না দেয় হুমকি দেব , পরিবারের সবাইকে জানানোর !”
মাহির অস্থির হয়ে উঠল , — — “এ সময় আমরা এসব করতে পারি না ! মোহনা আপু প্রেগন্যান্ট! টেনশন, মানসিক চাপে বেবির ক্ষতি হতে পারে !”
রেদওয়ান চাপা স্বরে বলল , — — “আমার বউ টেনশন তো তখনই করবে না? যখন সে অপরাধী হবে ? টেনশন না করলে অবশ্য আমাদের জানাবে ?”
মাহির এবার কিছু বলতে পারল না । রেদওয়ান মাহিরের উত্তর জানার অপেক্ষায়!
*
রাতের তখন একটা বাঁজবে প্রায় । পিহু এপাশ থেকে ওপাশ হয়ে শুয়ে থাকার চেষ্টা করল । কিন্তু ঘুম আসছে! পিহু উঠে বসল ! মাহিরের সাথে অনেকক্ষণ ধরে , তার দেখা হয়নি ! তার যে ভীষণ দেখা করতে ইচ্ছে করছে ? মাহিরের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে!
পিহু বিছানা ছেড়ে উঠলো। নিজের রুম থেকে বের হয়ে , পাশের মাহিরের রুমে চলে গেল। রুমটা কত পরিপাটি! লোকটা যে ভীষণ পরিপাটি! ভদ্র স্বভাবের ! তার রুমটাও তো তার মতোই হবে ! কিন্তু অন্য দিকে পিহুর রুম ঠিক পিহুর মতো ! পিহু নিজের জীবনে যেমন এলোমেলো , তেমনি তার রুমও এলোমেলো!
পিহু কতক্ষণ মাহিরের রুমে পায়চারি করল। তার পর নজর গেল মাহিরের আলমারির দিকে! মাহির নিজের আলমারি কখনো পিহুকে দেখতে কী টাচও করতে দেয় না! তারও একটা নির্দিষ্ট কারণ আছে ! এই তো বেশি না! কয়েক বছর আগের কাহিনি! পিহু তখন দশ বছরের ! মাহিরের নতুন শার্ট দেখবে পিহু ! মাহির তখন আলমারি খুলে শার্ট বের করছিল ! পিহু হঠাৎ বিচ্ছুর মতো হাত দিয়ে আলমারিতে থাকা মাহিরের আন্ডারওয়্যার ধরে ফেলে !
মাহিরের মুখের সামনে ধরে বলল , —- — “মাহির ভাইয়া! তোমার আন্ডারওয়ারটা তো দেখতে একদমই সুন্দর না! এরপরের বার পিংক কালারেরটা আনবা! এগুলো কেমন কালার ! কালো! আমার একদমই পছন্দ না!”
পিহুর কথা শুনে মাহির বাকরুদ্ধ। পাঁচ মিনিটের মতো লাগল , মাহিরের হুশে ফিরতে ! মাহির তখন ছো মেরে পিহুর হাত থেকে আন্ডারওয়ারটা নিয়ে নিলো। আলমারির ভেতর ছুড়ে ফেলে , লক করে দিল আন্ডারওয়ার! পিহু প্রশ্ন ছুঁড়ল , — — “এটা কী করলে তুমি , মাহির ভাইয়া ? আমাকে আন্ডারওয়ার ধরতেও দিলে না ! যাও ! আমি তোমাকে আমার ঈদের ড্রেস দেখাবো না!”
মাহির কী করবে ? বুঝতে না পেরে পিহুকে সোজা কোলে তুলে , রুমের বাইরে রেখে , দরজা লাগিয়ে দিল। সেদিন মাহির দরজা বিকালে লাগিয়েছিল। খুলেছে তার পরের দিন বিকেলে। এতটা লজ্জা পেয়েছিল। রেদওয়ান দরজা ভাঙার অবস্থা না করলে বোধ হয় মাহির তখনো দরজা খুলতো না! পিহু তখন মাহিরের সাথে অনেক কথা বলার চেষ্টা করছিল! কিন্তু মাহির মুখে কুলুপ এটেছিল! কথা বলছিলই না! এমন কী পিহুর দিকে তাকাতেও পারছিল না! পিহু এ অবস্থা দেখে , ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কান্নায় করেদিল! পিহুর কান্না দেখে , বাধ্য হয়ে মাহির পিহুর সাথে কথা বলল ! শান্ত করল পিহুকে! নিজের সাথে পার্কে ঘুরিয়ে আনল ! নিজের জমানো টাকা দিয়ে পিহুকে চকলেট, চিপস কিনে দিয়ে , সব টাকা শেষ করে ফেলল !
আলমারীটা দেখে , পিহুর পুরোনো কথাগুলো মনে পরতেই , পিহু মুচকি হাসল। আশ পাশ দেখতে দেখে পিহু ক্লান্ত হয়ে মাহিরের বিছানায় শুয়ে পরল ! কখনো চোখ লেগে গেল পিহুর খেয়াল নেই ! আর তখন পিহুর কথা ভেবে , রাতের এক টা ত্রিশের দিকেই মাহিরকে বাড়ি পাঠিয়ে দিল রেদওয়ান!
মাহিরের বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাতের দু’টো বেঁজে গেল! নিজের রুম খেয়াল না করেই , মাহির আগে পিহুর রুমের কাছে গেল। রুম ফাঁকা দেখে মাহিরের মুখে মুহূর্তেই চিন্তার ছাপ পরল ! আশপাশ দেখতে দেখতে নিজের রুমে পিহুকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখে থমকে গেল মাহির !
চলবে—-

