#চৈত্রের_প্রেম_নির্বাসন—০৮
#আরোবী_খান_সিনথিয়া
নিজের বিছানায় ঘুমন্ত পিহুকে দেখে , মুহূর্তেই রুম থেকে বের হয়ে আসল মাহির। একটা দীর্ঘশ্বাস টেনে আবারও পেছন ঘুরল। নাহ ! সে স্বপ্ন দেখছে না! পিহু সত্যিই তার বিছানায়।
মাহির ধীর কদমে পিহুর কাছে এগিয়ে গেল। “পিহু?” ক্ষীণ কন্ঠে ডাকল। কিন্তু বেঘোর ঘুমে পিহু , উঠল না ! মাহির নিজের রুমে পায়চারি করতে লাগল । কী করবে এখন সে ? এত রাতে যদি কেউ পিহুকে ওর রুমে দেখে , কী ভাববে তাদের নিয়ে !
মাহির আর না ভেবে , পিহুকে উঠাতে চলে গেল। পিহুকে বাহু ধরে ডাকল। আধো আধো ঘুমে পিহু তাকালো। নিজের এত কাছে মাহিরকে দেখে , পিহু রীতিমতো চমকে উঠে বসল।
মাহিরও ঘাবড়ে , পিহু থেকে সরে আসল। পিহু বিস্ময়ে বলে উঠল , — “আপ…আপনি আমার রুমে কী করছেন , মাহির ভাই?”
মাহির ভ্রু কুঁচকালো , — “আশপাশ তাকিয়ে দেখ তো , তুই ঠিক কার রুমে আছিস ?”
মাহিরের কথা শুনে , পিহু আশপাশ তাকাতেই জিহ্বে কামড় পরল এক। আমতা আমতা করতে লাগল ,
— “ঐ…তো…আমি তো…”
মাহির এক ভ্রু উঁচিয়ে ইশারায় প্রশ্ন ছুঁড়ল , “কী ?” পিহু দ্রুত মাহিরের বিছানা ছেড়ে নেমে আসল। হাসার চেষ্টা করে বলল ,
— “আপনাকে ভীষণ মিস করছিলাম , মাহির ভাই। তাই আপনার রুমে এসেছিলাম। কখন যে চোখ লেগে গেল টেরও পেলাম না !”
“আচ্ছা?” — মাহিরের ছোট উত্তর। পিহু মাথা নাড়ল। পিহু আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়েই দৌড়ে পালালো। পিহুকে পালাতে দেখে , মাহির মৃদু হাসল। সাথে সাথেই তার বামে টোল পরল।
হসপিটাল থেকে এসেছে দেখে মাহির দ্রুত শাওয়ার নিতে চলে গেল। আধা ঘন্টা পর ওয়াশরুম থেকে বের হলো মাহির। টাওয়াল দিয়ে ভেজা চুল মুছতে মুছতে দেখল , বিছানায় ট্রেতে করে খাবার সাজানো।
মাহির মুচকি হাসল। পিহু খাবার রেখে গেছে তার জন্য , ভেবেই বসে তৃপ্তি করে খেতে লাগল। কিন্তু কয়েক মিনিট পরই মাহির দরজার সামনে কারো ছায়া দেখে , চোখ তুলে তাকালো। রাহাকে দেখে ভড়কে গেল মাহির। পর মুহূর্তেই খাবারের দিকে তাকালো । বুঝতে বাকি রইল না , খাবারটা রাহা রেখেছে। সাথে সাথে খাওয়া থেকে উঠে গেল। চোখ মুখ শক্ত হয়ে আসল মাহিরের।
রাহাকে পাশ কাটিয়ে বের হতে গেলেই , সাথে সাথে রাহা মাহিরের হাতের কব্জি শক্ত করে ধরে ফেলে। মাহির ভ্রু কুঁচকালো ,
— “কী করছো এসব ? আমার হাত ছাড়ো!”
মাহিরের এক ধমকে রাহা কেঁপে উঠল। মাহিরের হাত ছেড়ে হাসার চেষ্টা করে বলল , — “আমি তো তোমার সাথে একটু কথা বলতে আসছিলাম ! আমাকে এভাবে ইগনোর কেন করছো , মাহির ?”
মাহির দাঁতে দাঁত পিষে বলল , — “যখন জানো , ইগনোর করছি , তখন মুখ উঠিয়ে বার বার আমার সামনে কেন চলে আসো? লজ্জা করে না এই মুখ দেখাতে?”
কথাটা বলেই মাহির রুম থেকে বের হয়ে যেতে নিলে , রাহা পেছন থেকে মাহিরকে জড়িয়ে ধরল। মাহির হতবাক। এক মিনিট সময় নিল বোঝার ! কী হচ্ছে তার সাথে এসব ?
মাহির যখন বুঝতে পারল , রাহা তাকে জড়িয়ে ধরেছে , মুহূর্তেই মাহির রেগে গর্জে উঠল ,
— “সাহস কী করে হলো তোমার? আমাকে জড়িয়ে ধরল!”
মাহির নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলে , রাহা মাহিরকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল । অস্থির কন্ঠে বলল ,
— “আমার সাথে সবসময় এমন কেন করো , মাহির ?
আমি তোমাকে কতটা পাগলের মতো ভালোবাসি ? একটুও কী চোখে পরে না !”
— “তোমার মতো বেহায়া , নির্লজ্জ মেয়ে আমার কাছে যাস্ট ইরেটেটিং ফিল হয় ! লিভ মি রাহা !”
কারো পায়ের পদধ্বনির আওয়াজ শুনেই , মাহির পাশে তাকাতে দেখেই যমের মতো পিহুকে দেখে থ’মেরে গেল। এক ঢোক গিলে বলল ,
— “পিহু….”
পিহু যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল , — “মাহির ভাইয়া আর রাহা আপু….”
পিহুর কন্ঠ কর্ণকুহুরে আসতেই , রাহা পিহুকে দেখে মুহূর্তেই মাহিরকে ছেড়ে দিল। আমতা আমতা করতে লাগল , — “পিহু…আসলে আমরা…”
পিহু মুহূর্তেই নিজের রুমের দরজা আটকে ফেলল। সে কী বুঝল , সে নিজেও জানে না। তার মনটা যেন বিষিয়ে গেল। খুব কান্না পাচ্ছে তার। মুহূর্তেই দরজায় গা ঘেঁষে পিহু ফ্লোরে বসে পরল। তার চোখ দু’টো থেকে অশ্রু গালে গড়িয়ে পরতে লাগল । আচমকায় বলতে লাগল , — “মাহির ভাইয়া ভীষণ খারাপ ।”
পিহুকে দরজা লাগাতে দেখে মাহির ছুটে গেল সেদিকে। কিন্তু পিহু ততক্ষণে দরজা আটকিয়ে ফেলেছে। মাহির অস্থির হয়ে টিপুর দরজায় টোকা দিতে লাগল , ধাক্কা দিতে দিতে লাগল। অস্থির কন্ঠে বলল , — “পিহু! তুই যা ভাবছিস , একদমই এমন কিছু না ! পিহু! পিহু প্লিজ একবার আমার কথা তো শুন! আই ক্যান এক্সপ্লেইন , পিহু!”
কিন্তু পিহু এক মুহূর্তের জন্যও দরজাটা খুলল না।
পিহু রুমের ভেতর থেকেই চেঁচিয়ে উঠল ,
— “মাহির ভাইয়া ! আমি আপনার সাথে কোন কথা বলতে চাইনা ! প্লিজ চলে যান! আপনি অনেক অনেক খারাপ একটা লোক ! এ জীবনে আমি আপনার চেহারাও দেখতে চাই না ।”
পিহুর কথাগুলো শুনে থমকে যায় মাহিরের হাত দু’টো। মাহির বুকটা ভীষণ বাজে ভাবে পুড়ল পিহুর কথায়। মাহিরের ঠোঁট জোড়া নড়ল। বিড় বিড় করল মাহির ,
— “আমার চেহারাও দেখতে চাইছিস না ?”
মাহির সরে আসল দরজা থেকে। পেছন ঘুরে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকালো রাহার দিকে। রাহা ঠোঁট কামড়ে হাসছে। বড় বড় কদম ফেলে রাহা কাছে আসল মাহির। সজোরে কষিয়ে এক চড় মারল রাহার গালে। রাহার মুখের হাসি মুহূর্তেই গায়েব হয়ে গেল। দাঁতে দাঁত পিষে বলল , — “তুমি একটা ব*স্তির মেয়ের জন্য আমাকে…রাহাকে থাপ্পড় মারলে মাহির ?”
রাহার কথাগুলো শুনে মাহিরের আরও বেশি রাগ উঠল। দ্বিতীয় বারের মতো রাহার আরেক গালে নিজের পাঁচ আঙুলের ছাপ বসিয়ে দিল । রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল , — “কাকে বস্তির মেয়ে বলছো? পিহুকে ? সাহস তো কম না তোমার ! আর একবার ওকে নিয়ে উল্টা পাল্টা কিছু বললে , জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলব তোমার ! বেহায়া মেয়ে কোথাকার! আজ যা করলে , আমি তা কখনো ভুলব না! কখনো না! আমার আর পিহুর মাঝে যে দূরত্ব , তৈরি করেছো , তার মাশুল তোমাকে হাড়ে হাড়ে দিতে হবে , রাহা। মার্ক মাই ওয়াডস!”
কথাটা বলেই দ্রুত কদমে নিজের রুমে ঢুকে গেল মাহির। শব্দ করে জোরে দরজা আটকিয়ে ফেলল।
মাথাটা কেমন ধরে গেছে মাহিরের। সব কিছু এলোমেলো লাগছে। কানে শুধু বাজছে , পিহুর কাতর কন্ঠের কথাগুলো ! মুহূর্তেই মাহিরের ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে , নিজেকে দেখল ! নিজের শরীরে রাহার স্পর্শ লেগেছে ভাবতেই শরীর রি রিং করে উঠল তার!
ড্রেসিং টেবিলের সব কিছুই মুহূর্তে ছুঁড়ে ফেলল এদিক সেদিক! চেঁচিয়ে উঠল , — “আই লাভ ইউ , ইডিয়েট! আমার চাহনি দেখেও বুঝিস না !”
চলবে—

