নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা ১৬.

0
2

#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা

১৬.

গেইট পার হয়ে ক্যাম্পাসের ভেতর ঢুকতেই শারাফের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিলো স্নিগ্ধতা। ছাতার বাইরে বৃষ্টিতে দাড়িয়ে গেলো ও। শারাফ ভ্রুকুটি করে তাকালো। ও চেয়েছিলো ছাতাসহ ফাইনআর্টসের বিল্ডিং অবদি পৌছে দেবে স্নিগ্ধতাকে। কিন্তু সে মাঝরাস্তায় দাড়িয়ে গেলো। কেনো? উত্তর জানতে কুঁচকানো কপাল নিয়ে বললো,

-বৃষ্টিবিলাস করবেন?

-নিজের সীমার মধ্যে থাকুন স্যার। আমার হাত ধরার অধিকার আপনাকে দেইনি আমি।

স্নিগ্ধতার স্পষ্ট জবাব। কপাল শিথিল হলো শারাফের। একপা এগিয়ে আবারো স্নিগ্ধতার মাথার ওপর ছাতা ধরলো ও। চোখে চোখ রেখে বললো,

-যদি আপনি চান, সীমাপার করতে, কিংবা অধিকার আদায় করে নিতে আমার কোনো দ্বিধাবোধ নেই মিস স্নিগ্ধতা।

কয়েকদন্ডের দৃষ্টিবিনিময় হলো দুজনার। স্নিগ্ধতার বাধ্যবাধকতার চাওনি। আর শারাফের হয়তো বেসামাল অনুভূতি জড়ানো অবাধ্য চাওনি। যেটুকো ভিজেছে, তাতেই চুল, চোখের পাপড়ি আর গাল বেয়ে পানি গড়াচ্ছে স্নিগ্ধতার। মুগ্ধতা নিয়ে কেবল দেখতে ব্যস্ত হয়ে পরলো শারাফ। ওর শ্বাসপ্রশ্বাস হয়তো বলে চলেছে, ‘আমার সামনে তোমার নামকরন স্নিগ্ধতা না হোক! তুমি কেবল প্রলয় হানতে জানো মেয়ে! তুমি প্রলয়া হও! আমার হৃদস্পন্দন থামাতে জানা প্রলয়া!’ দৃষ্টিনত করে ঠোট টিপে হাসি আটকালো শারাফ। আবারো চোখ তুলে তাকিয়ে বললো,

-কবি বলেছেন, যদি সত্যিকারের প্রেমিক হতে চাও, নারীর অশ্রুসিক্ত আঁখিতে বাধা পরিও। বৃষ্টিসিক্ত আঁখির ডেফিনেশন দেয়নি। এজন্য তার কেমন সাজা হওয়া উচিত মিস স্নিগ্ধতা?

দাতে দাত চেপে আঙুল উচালো স্নিগ্ধতা। বললো,

-আপনি…

-স্নিগ্ধতা!

অনুর গলা শুনে স্নিগ্ধতা পাশে তাকালো। চুপচাপ আঙুল নামিয়ে নিলো ও। যতোই হোক, শিক্ষাগত যোগ্যতায় শারাফ বর্তমানে ভার্সিটির স্যারদেরই সমতুল্য। অনু শারাফ-স্নিগ্ধতা দুজনকে দেখে নিলো। শারাফের সাথে চোখাচোখি হতেই সালাম দিয়ে ছাতা এগিয়ে ধরলো স্নিগ্ধতার দিকে। শারাফ সালামের উত্তর নিলো। একহাতে ছাতা রেখে আরেকহাত প্যান্টের পকেটে ঢুকালো। সুন্দর একটা হাসি দিয়ে অনুকে বললো,

-কেমন আছেন মিস অনু?

-জ্ জ্বী আলহামদুলিল্লাহ। আপনি কেমন আছেন স্যার?

-এইতো! কারো উপকার করতে গিয়ে বৃষ্টিতে আধভেজা।

স্নিগ্ধতার দিকে তাকিয়ে বললো শারাফ। ওর দিকে তাকালো অনুও। আর ও চোখমুখ শক্ত করে অন্যদিক তাকিয়ে আছে। শারাফ বললো,

-আপনাকে ততোটাও ভালো দেখছি না। পরের সেমিস্টারের পড়া বাদ রয়ে গিয়েছে কিছু বুঝি?

বিস্ময়ে তাকালো অনু। শারাফ ওর নাম জানে, এটা ওর প্রথম বিস্ময়ের কারন ছিলো। এতোটা মিষ্টিভাব দ্বিতীয়বার বিস্মিত করেছে ওকে। এখন শেষের প্রশ্নটা যেনো সীমাপারই করিয়ে দিলো ওকে। শারাফ মৃদ্যু হেসে বললো,

-আপনার দেওয়া সার্ভের কোশ্শেনগুলোর এন্সার থেকে আমাকে আপনার মেন্টাল হেল্থের রিপোর্ট তৈরী করতে হয়েছে মিস অনু। আর সেজন্য আপনার ডিটেইলস্ মোটামুটিরকমের মুখস্ত করতে হয়েছে। আপনার মতে এক্সিসটেন্স মানে রেজাল্ট। হাতে থাকা বইটার কোর্স কোড দেখছি সেকেন্ড ইয়ারের। আপনার বিষন্নতার কারন হিসেবে আর কি কমেন্ট করবো বলুন?

অনুর দিকে তাকালো স্নিগ্ধতা। সত্যিই অনুর হাতে পরের সেমিস্টারের বই। শারাফ বললো,

-আনফরচুনেটলি আপনার এন্সারশিটটা আমাদের গ্রুপের কেউ হারিয়ে ফেলেছে মিস স্নিগ্ধতা। এন্ড আই গেইস, এটা জেনে আপনি অবশ্যই আমার ওপর রাগান্বিত নন। আর ইউ?

-ফরচুনেটলি সেদিন আমি এন্সারশিট সাবমিট করিই নি। এন্ড আই গেইস, এরপরও আমি রেগে আছি বললে আপনি অবশ্যই আমার রাগ ভাঙাতে আসবেন না। উইল ইউ?

কথা শেষ করে উত্তরের জন্য একমুহূর্ত দাড়ালো না স্নিগ্ধতা। ছাতা কাধে ধরে অনুকে নিয়ে পা বাড়ালো ও। শব্দ করে হেসে ফেললো শারাফ। তারপর ওদের পেছনপেছন ছাতা ঘুরাতে ঘুরাতে এগোতে লাগলো। বৃষ্টি কমে সামনের পশ্চিমাকাশের রোদ সাতরঙা দেখাচ্ছে। হঠাৎ এতো সাজ যে! কেনো? রংধনু উঠবে বুঝি? আশ্চর্য! রাগ ভাঙানোর জন্য কেউ যে শারাফের ওপর অভিমান দেখিয়ে গেলো, ওর অনুভূতিগুলোকে সাজিয়ে দিয়ে গেলো, সেটা প্রকৃতি জানলো কিভাবে? কিভাবে???

পুলিশস্টেশন থেকে বাসায় ফিরছিলো সাইফ। ড্রাইভে বিন্দুমাত্র মনোযোগ দিতে পারছে না ও আজ। প্রথমবারের মতো মনে হচ্ছে, হাতে থাকা কেইসটা সমাধানের পথ বিকিয়ে ক্রমশ জটিলতর হয়ে উঠছে যেনো। সবুজের প্রেমিকাকে খুজে পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ শেষবার ওকেই প্রমাণ খুজে পাওয়ার একমাত্র অবলম্বন বলে ধারনা করেছিলো সাইফ। সে জ্বলজ্যান্ত মেয়েটা গায়েব। ওর বাসায়, বান্ধবীদের থেকে খবর নিয়ে যতোটুকো বুঝেছে, সবুজ যেমনই থাকুক, মেয়েটার কোনো বাজে স্বভাব ছিলোনা। ওর বান্ধবীদের ভাষ্যমতে, সবুজের মতো কারো সাথে সম্পর্কে যাওয়ার মতো মেয়েই না ও। ওরা নিজেরাই সন্দিহান ছিলো এই সম্পর্ক নিয়ে। হাজাররকম চিন্তা করেও কিছুতেই ঘটনাগুলো মিলাতে পারছে না সাইফ। কিছুটা পথ এসেই জ্যামে আটকা পরতে হলো ওকে। বিরক্ত হয়ে সাইফ মোবাইল হাতে নিলো। কিছুটা বিরতি চাই ওর।

ফেইসবুক ওপেন করতেই কিছু ছবি সামনে পরলো সাইফের। একটা বিখ্যাত পেইজের পোস্ট। ক্যাপশন, ‘বৃষ্টি, বন্ধুত্ব আর প্রেম!’ পনেরোটারও বেশি ছবি সেখানে। আর প্রথম ছবিদুটোই স্নিগ্ধতার ভার্সিটির মেইন বিল্ডিংয়ের। মুচকি হেসে ছবিগুলো দেখতে লাগলো সাইফ। লোকেশন স্নিগ্ধতার ক্যাম্পাস না হলে, ক্যাপশনটা কখনোই গুরুত্ব পেতো না ওর কাছে। ছবিগুলোর কোনোটাতে সাত আটজন বন্ধুদের একসাথে বৃ্ষ্টিভেজার উল্লাস, কোনোটাতে বৃষ্টিস্নাত কাঁঠগোলাপ, কোনোটাতে চায়ের কাপের আড্ডা, কোনোটাতে গিটারপ্রিয়দের সমাহার। নিজের ভার্সিটিলাইফ মনে পরে যাচ্ছিলো সাইফের। স্ক্রল করে স্বাগ্রহে দেখছিলো ও ছবিগুলো।

প্রায় শেষের দিকের একটা ছবিটা দেখে একপ্রকার থমকে গেলো সাইফ। হাত থেমে গেলো ওর। নিজের চোখকেই বিশ্বাস করা দায় কথাটার রেশ ফুটে উঠলো ওর চেহারায়। ছবিটায় স্নিগ্ধতার হাত ধরে কোনো ছেলে ক্যাম্পাসের দিকে এগোচ্ছে। ক্যাপশন,’Perheps only October has the charm of rejoining seasons. But when it comes to the fragnence of charm, the October’th rain always fail before you.’ ছেলেটাকে চিনতে বেশি সময় লাগলো না সাইফের। ওটা শারাফ! স্নিগ্ধতার হাত ধরে আছে ও! আর স্নিগ্ধতাও পা বাড়িয়েছে ওর সাথে! কি ভেবে স্ক্রল করলো সাইফ। কিন্তু নিচে ওদেরই আরেকটা ছবি। সেটাতে এক ছাতার নিচে শারাফ-স্নিগ্ধতা। শারাফ বৃষ্টিতে ছাতা ধরে আছে আর স্নিগ্ধতা সেই ছাতার নিচেই দাড়িয়ে। দুজন দুজনার বেশ কাছাকাছি আর একে ওপরের দিকে তাকিয়ে। সে ছবিটার নিচে ক্যাপশন,’আসিও বরষা হয়ে, ভাসিবো তোমার স্রোতে; সাজিও অলকানন্দা হয়ে, ডুবিবো তোমার মোহে।’ কি। স্ক্রল করে শেষের ছবিটায় আসতেই আপনাআপনি কপালে আঙুল চলে গেলো সাইফের। ছবিটাতে চোখ বন্ধ করে শারাফকে জরিয়ে রেখেছে স্নিগ্ধতা। তার ক্যাপশনে লেখা, ‘থেমে যাক সময়, অনুভবেরা হোক স্পর্শী; হৃদ হৃদয় হৃদস্পন্দন, তুমিযোগে অকালদর্শী’

সাইফের ঠোটের কোনে অসম্ভব সুন্দর একটা হাসি ফুটলো। ছবিগুলো আর মুহুর্তগুলো কল্পনা করতেই ভালো লাগছিলো ওর। শারাফকে এ কয়েকদিনে বেশ ভালো লেগেছে ওর। যদিও স্নিগ্ধতার জন্য ভেবে দেখেনি। তবে যদি শারাফই স্নিগ্ধতার পছন্দের কেউ হয়, বিন্দুমাত্র দ্বিমত করবে না ও। এটা আগে থেকেই ভেবে রেখেছিলো সাইফ। আর স্নিগ্ধতা চাইলে এমনটাই করবে ও। আচমকা পুরো গাড়িটা ঝাকি দিয়ে ওঠায় ধ্যান ভাঙলো সাইফের। যেনো তীব্র বেগে পেছন থেকে অন্য কোনো গাড়ি এসে ধাক্কা লাগিয়েছে ওর গাড়িকে। ভাবনায় ছেদ পরায় প্রচন্ড পরিমানে রাগ হলো সাইফের। সাতপাচ না ভেবে, মোবাইলটা পাশের সিটে রেখে সিটবেল্ট খুললো নিজের। নামবে বলে সবে গাড়ির দরজা খোলার উদ্দেশ্যে হাত বাড়িয়েছে, জানালার বাইরে থেকে কেউ শব্দ করে টোকা মেরে বললো,

-গাড়ি কি সরাবেন? নাকি পিষে দিয়ে যাবো?

গলা শুনে চোখ তুলে জানালায় তাকালো সাইফ। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জানালার ওপার থেকে ভেতরে তাকিয়ে আছে অগ্নিলা। ছাড়া চুল, কালোফ্রেমের চশমা, কালো টিপ তার কপালে। দু দন্ড থেমে রইলো সাইফ। পরের সেকেন্ডেই কি হয়ে গেলো, হাতের পিঠে মুখ ঢেকে, চোখ খিচে বন্ধ করে অন্যদিক ফিরতে বাধ্য হলো ও।
সেকেন্ডদুই সময় নিয়ে আগে নিজেকে সামলে নিলো সাইফ। তারপর জানালায় তাকালো। অগ্নিলা কিছু একটা দিয়ে বারি লাগিয়েছে ওর গাড়ির জানালায়। আর তাতে গাড়ির কাচ ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে একদম। গাড়ির ভেতর সাইফকে দেখে অগ্নিলার হাত থেকে পেন্সিল হিলটা রাস্তায় পরে গেলো। ওটার সরু খুঁড় দিয়েই কাচে বারি লাগিয়েছিলো ও। আর এ দায়ে সাইফের রাগী চাওনি ওর দিকে স্থির। সাইফ গাড়ি থেকে নামতে যাবে, অগ্নিলা তৎক্ষনাৎ বলে উঠলো,

-এ্যাম্বুলেন্স!

#চলবে…

[ তুলনামুলক ছোট হয়েছে জানি। ক্লাস-টিউশনি মিলিয়ে ১২+ ঘন্টা বাসার বাইরে ছিলাম। তারপরও লিখেছি আজ। রিচেইক করিনি। তাই ভুলগুলো বুঝে নেওয়ার অনুরোধ রইলো। হ্যাপি রিডিং ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here