নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা ১৮.

0
2

#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা

১৮.

ভার্সিটির গেইটে ভাইয়ের গাড়ি দেখে স্নিগ্ধতা ঠোটে জোরপুর্বক হাসি ফুটালো। মন ভালো নেই ওর। কেনো, তা ও নিজেও জানেনা। শুধু জানে, ঘুণাক্ষরেও যদি সাইফের মনে হয় ওর মন খারাপ, তাহলে তার কারন জানার জন্য আকাশপাতাল এক করে ফেলবে ও। গাড়ির দরজা খুলে দিলো সাইফ। জোরালো হাসি ঠোটে রেখে গাড়িতে উঠে বসলো স্নিগ্ধতা। সাইফ ওর চুলগুলো নেড়ে দিয়ে বললো,

-চুলগুলো এমন এলোমেলো হয়ে আছে কেনো? বৃষ্টিতে ভিজিসনি তো আবার?

হাসি ঠোট থেকে উবে গেলো স্নিগ্ধতার। চমকে উঠলো খানিকটা। শারাফের সাথে একই ছাতায় থাকা মুহুর্তগুলো মনে পরে গেছে ওর। সাইফের কথায় সন্দেহের বিন্দুমাত্র ছাপ না থাকলেও ওর অনুভব হলো, সে মুহুর্তটা সাইফও দেখেছে। আড়স্ট স্বরে বললো,

-ক্ কই? নাতো! এখন তো তুখর রোদ। বৃষ্টি তো সকালে ছিলো। ভিজতে কেনো যাবো আমি? তুমি হঠাৎ ভেজার বলছো কেনো?

-ব্যাগের ছাতাটা দেখছি না, তাই বললাম। এতো এক্সাইটেড হওয়ার কি আছে?

গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে বললো সাইফ। স্নিগ্ধতা দমে গেলো। ধীরগলায় বললো,

-ছাতা এক পিচ্চিকে দিয়ে দিয়েছি।

ভাইয়ের মুখভঙ্গি দেখার জন্য তাকালেও সাইফের ওপাশের জানালার ভাঙা কাচ চোখে পরলো স্নিগ্ধতার। সবটা ভুলে বিস্ময়ে বললো,

-পুলিশের গাড়ির কাঁচ ভাঙা? এটা কি করে ভাঙলো? কে ভাঙলো?

-অগ্নিলা চৌধুরী।

স্বাভাবিক, স্পষ্ট জবাব সাইফের। অবাকচোখে ওরদিক তাকিয়ে রইলো স্নিগ্ধতা। সাইফ সামনে তাকিয়েই বললো,

-নন পার্কিং সাইডে গাড়ি রেখেছিলাম তাই রাগ দেখিয়েছে। অবশ্য ক্ষতিপুরনও দিয়ে গেছে। কফি!

স্নিগ্ধতা উকি দিয়ে ভাইয়ের হাসিটা পরখ করলো। বললো,

-কি ব্যাপার জনাব? অগ্নিলা ম্যামের সাথে আপনাকে ইদানিং একটু বেশিই দেখা যাচ্ছে? কাহীনি কি?

সাইফ প্রতিত্তর না করে কেবলই হাসলো। স্নিগ্ধতা এবারে আরো আগ্রহভরা স্বরে বললো,

-তাহলে হিসাবটা কি দাড়ালো? ইন্সপেক্টর সাইফ এহমাদ আমার ইউনিভার্সিটির ম্যামের সাথে! তাও আবার কফিশপে!

-প্রেমেটেমে পরেছো নাকি ভাইয়া? হিসেবশেষে মুনাফায় ভাবি পাচ্ছি তারমানে। কি বলো?

-তেমন কিছুনা টুকি। তবে তার বিহেভিয়ার ভালোলাগে।

-আহা! তাতেই হবে! দেরিতে হলেও, কারো প্রতি এই ভালোলাগাটা আসলো তো! বিয়েটা এবার তবে করেই ফেলো তবে! আমারনা অনেক শখ, ভাবির আদর পাওয়ার!

-ওসব পরে ভাবা যাবে। আগে তোর বিয়েটা…

-এই প্লান কিন্তু মোটেও খাটছে না ইন্সপেক্টর! আগে বিয়েটা করে তোমার বউসহ তোমাকে জ্বালানোর সুযোগ করে দাও আমাকে। তারপর অতিষ্ট হয়ে না হয় বিয়ে দিয়ে বিদেয় করে দিও। এর আগে আমার বিয়ের কথা মাথাতেও এনোনা। বুঝলে? তোমার আগে আমার বিয়ের কোনো প্রশ্নই ওঠেনা।

ব্রেক কষে গাড়ি থামালো সাইফ। স্নিগ্ধতার আজকের কথাটা মজারছলে নিতে পারলো না ও। সিরিয়াস ভঙিমায় বললো,

-তুই সত্যিই চাস তোর আগে আমি বিয়ে করি?

-তোহ? ভাবির আদর চাইতো আমার! তোমার বউয়ের সাথে রায়বাঘিনী ননদীনি ক্যারেক্টার প্লে না করা অবদি তোমার ঘাড় থেকে তো নামছি না আমি!

-ওকে দেখা যাবে!

সুন্দর একটা হাসি ফুটলো স্নিগ্ধতার ঠোটে। সাইফও মুচকি হেসে গাড়ি স্টার্ট দিলো আবার। কিছুটা সময় পর সামনের ড্রয়ার থেকে একটা ম্যাগাজিন বের করে এগিয়ে দিলো স্নিগ্ধতাকে। ও ভ্রুকুচকে ওটার দিকে তাকালো। সাইফ ড্রাইভ করতে করতে বললো,

-ফ্রন্টপেইজের আর্টিকেলটা দেখ?

স্নিগ্ধতা ম্যাগাজিন হাতে নিলো। ওটার ফ্রন্টপেইজে শারাফের ছবি দেওয়া। সাদা শার্টের ওপর ছাইরঙা স্যুট, কালো প্যান্ট, হেডসেট মাইক্রোফোন। যেনো কোনো লাইভ অডিয়েন্সের প্রোগ্রামে লেকচার দিচ্ছে সে। ছবির পাশের হেডলাইনে লেখা, ‘মাইন্ডগেইমস এন্ড মিস্টার ইয়াকীন শারাফ’। ওর মুখভঙ্গি আড়চোখে একবার পরখ করলো সাইফ। ভাইয়ের কোলে ম্যাগজিনটা ফিরিয়ে দিলো স্নিগ্ধতা। সাইফ বললো,

-ফিরিয়ে দিলি যে?

-এই আর্টিকেল আমি পরে কি করবো?

দৃষ্টি বাইরে রেখে বললো স্নিগ্ধতা। সাইফ আবারো নিশব্দে হাসলো। কফিশপ থেকে বেরোনোর সময় অগ্নিলার সাইডব্যাগে দেখেছিলো ও ম্যাগাজিনটা। ফ্রন্টপেইজে শারাফের ছবি দেখে একপ্রকার চেয়েই নিয়ে এসেছে ও ওটা। ম্যাগাজিনটা একহাতে তুলে ধরে বললো,

-আমার কিন্তু অসম্ভব ভালো লেগেছে আর্টিকেলটা। হিউম্যান সাইকোলজির ওপর ভালোমতোই আয়ত্ত্ব করে নিয়েছে ছেলেটা।

-উনি এই বিষয়ের ওপর দেশের বাইরে থেকে পিএইচডি করে এসেছেন। এটা অস্বাভাবিক কিছু? বশীকরন জানবে এটাই স্বাভাবিক।

-হুম। অনেকবেশি এক্সপার্ট। সেন্স অফ হিউমার ভয়ানকরকমভাবে এক্যুরেট হয়।

-তা তোমাকেও বশ করে নিয়েছে নাকি? এতোকিছু বলছো যে?

-বশ না করলেও আ’ম ইপ্রেসড্।

কিছু বললো না স্নিগ্ধতা। সাইফ উকিঝুকি দিয়ে ওর মুখ দেখার চেষ্টা করে বললো,

-বাই দা ওয়ে, শারাফের বিষয়ে তোর কি মত?

ভাইয়ের দিকে তৎক্ষনাৎ প্রশ্নসুচক চাওনিতে তাকালো স্নিগ্ধতা। ওর মত মানে? এটা বলে কি বোঝাতে চাইছে ও? স্নিগ্ধতার চাওনি দেখে ম্যাগাজিনটা ব্যাকসিটে দিয়ে দিলো সাইফ। ভাবখানা এৃন, যেনো কিছুই বলেনি ও। তারপর অডিও স্পিকারে গান অন করে ড্রাইভিংয়ে মনোযোগ দিলো। স্নিগ্ধতা সিটে হেলান দিয়ে বাইরের দিকে দৃষ্টিক্ষেপ করলো। প্রশ্ন করে আর উত্তরের অপেক্ষায় নেই সাইফ। তবে ও উত্তর খুজে চলেছে। কি মত ওর শারাফকে নিয়ে? গাড়ির অডিও স্পিকারে গান বেজে চলেছে,
‘ভিতর বলে দুরে থাকুক,
বাহির বলে আসুক না।
বাহির বলে দুরে থাকুক,
ভিতর বলে আসুক না…’

দুটোদিন কেটে গেছে। এ দুদিনে শারাফকে ক্যাম্পাসে দেখেনি স্নিগ্ধতা। তবে ওর মন জানে, নির্লজ্জের মতো ওর চোখদুটো চারপাশে শুধু শারাফকেই খুজেছে। সেদিন ওর বলা কড়া কথাগুলো ওর নিজেরই মানতে কষ্ট হচ্ছিলো। ও জানে, ওই কথাগুলোর জন্যই শারাফ আসেনি ওর সামনে। অবশ্য এমনটা চেয়েছিলো ও নিজেও। তবে এখন কেনো শারাফের অনুপস্থিতি মানতে পারছে না ও? নিজের ওপর করুনা হতে লাগলো স্নিগ্ধতার। লাস্টক্লাস ক্যান্সেল হয়েছে ওদের। অনু আজ আবারো গ্যালারিতে গেছে ওর উড-আর্ট করতে। সাইফ এখনো আসেনি স্নিগ্ধতাকে নিতে। অস্থির লাগছিলো বলে মুক্তমঞ্চে চলে এসেছে ও। মুক্তমঞ্চের সিড়িতে বসে দ্রুততার সাথে পেন্সিল চালাতে লাগলো চুপচাপ। দেখে মনে হবে, পেন্সিলে স্কেচ করার নামে যেনো ড্রয়িংপেপারে অনাকাঙ্ক্ষিত অভিমান ঝরাচ্ছে। হঠাৎই সামনে জনকয়েকের উপস্থিতি অনুভব করলো স্নিগ্ধতা। মাথা তুলে তাকাতেই প্রসারিত হলো ওর দৃষ্টি। ড্রয়িংবুকটা বুকে আঁকড়ে ধরে উঠে দাড়ালো ও। সিড়ির দুইধাপ ওপরে উঠে জায়গা নিলো। নিভুপ্রায় আওয়াজে বললো,

-আপনারা?

ঘাড় বাকিয়ে পৈশাচিক একটা হাসি দিলো চঞ্চল। ওর পেছনে আরো তিন চারটে ছেলে। চঞ্চল স্নিগ্ধতাকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বললো,

-সারপ্রাইজ!

আশপাশ তাকিয়ে দেখে নিলো স্নিগ্ধতা। ক্লাসটাইম প্রায় শেষ। ছেলেমেয়েরা অনেকেই বসেছে সিড়ি আড্ডা দেবে বলে। একপলক ওর সামনে চঞ্চলকে দেখে চোখ সরিয়ে নিলো সবাই। এতোজনের মাঝেও এতোটুকো ভরসা পেলো না স্নিগ্ধতা। বুঝে উঠতে পারলো না, ওর কি করা উচিত। চঞ্চল আড়মোড়া ছাড়ার ভঙিমায় করলো। তারপর স্নিগ্ধতার দিকে ঝুকে বললো,

-তোমাকে আমি পুরো ক্যাম্পাসে খুজে বেরাচ্ছি। আর তুমি এই মুক্তমঞ্চে বসে তোমার মুক্তরুপের ছ্বটা ছিটাচ্ছো সুন্দরী? গার্লফ্রেন্ড নিয়ে আসা ছেলেটা অবদি তাকিয়ে ছিলো তোমার দিকে।

-অবশ্য ওদেরও দোষ নেই। ওরা তো আর জানেনা তুমি চঞ্চল ভাইয়ের পছন্দের।

আরো একধাপ সিড়ি উঠে পিছিয়ে গেলো স্নিগ্ধতা। শুকনো ঢোক গিললো একটা। ওকে ভয় পেতে দেখে চঞ্চল উত্তেজিতভাবে বললো,

-আহা! আহা! আমার থেকে পেছোচ্ছো কেনো? তোমাকে আজ থেকে নিয়মিত আমিই দেখবো শুধু! কতোদিন দেখিনি তোমাকে! দেখি দেখি! দেখতে দাও একটু?

-তা তোমার ভাই তো আমাকে সবুজের মা’র্ডার কেইসে ফাসাতে চেয়েছিলো। পারলো না। এতোদিনে সে শোক মিটেছে তোমার ভাইয়ের?

স্নিগ্ধতা তখনও চুপ। চঞ্চল এতোক্ষন হাসিমুখে কথা বললেও, এবারে চোয়াল শক্ত হয়ে আসলো ওর। গালে হাত বুলিয়ে দাতে দাত চেপে বললো,

-তবে আমার না শোক মিটেছে, না স্বাদ। খুবই কষ্টে আছি গো!

-তোমার ভাইয়ের ভয়ে চঞ্চল চুপ আছে এমনটা ভাবার কিন্তু কোনো কারন নেই সুন্দরী। ওই ম্যাডামকে তার দেওয়া চড়ের জবাব না দেওয়া অবদি আমি বোধহয় শান্তি পাবোনা। যতোদিন না ও আমার সামনে মাথা নোয়াচ্ছে, ততোদিন তুমিও আমাকে সুখ দিতে পারবে না। মোদ্দাকথা, তোমার আগে আমার ম্যাডামজ্বিকে চাই। তারপর না হয় তোমাকে…

কথা শেষ না করে স্নিগ্ধতার কাধের দিকে হাত বাড়ালো চঞ্চল। দুপা আরো পেছালো স্নিগ্ধতা। কাতর দৃষ্টিতে আশেপাশের মানুষগুলোর দিকে তাকালো। চঞ্চল হাসলো। তারপর ফিসফিসিয়ে বললো,

-একটা সিক্রেট বলি? এরওর দিকে তাকিয়ে কোনোপ্রকার লাভ হবেনা তোমার। এখান থেকে তোমাকে এই মুহুর্তে তুলে নিয়ে গেলেও কেউ টু শব্দটাও করবে না। বিশ্বাস করো! ক্যাম্পাসে এগুলো অহরহ হয়।

স্নিগ্ধতার চোখ ছলছল করে উঠলো এবার। ঘৃণার চোখে আশপাশটা দেখে নিলো ও। সত্যিই কারো কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই এদিকে। চঞ্চল সেভাবেই ফিসফিসিয়ে বললো,

-একটা উদাহরন দেই? চারুকলা গ্যালারির পাশের স্টোররুমটায় আজকেই কিছু একটা ঘটেছে বোধহয়। যেহেতু এগুলো ডিপেস্ট-ডার্কেস্ট-সিক্রেট, কেউ কারো কাছে মুখ খুলবে না। তবে যদি তোমার বান্ধবীর সাথে এমন কিছু ঘটে থাকে, তুমি কিন্তু চাইলেই জানতে পারো। আপটু ইউ!

টপটপ করে দু ফোটা জল গরালো স্নিগ্ধতার চোখ দিয়ে। কথাটা বলে সেভাবেই হাসছে চঞ্চল। আর একমুহুর্ত দাড়ালো না স্নিগ্ধতা। ছুট লাগালো মুক্তমঞ্চ থেকে। চারুকলার করিডোরের প্রান্ত ঘুরতেই হঠাৎ ধাক্কা ওর লাগে কারো সাথে। টাল সামলাতে না পেরে একেবারে মেঝেতে পরে যায় স্নিগ্ধতা। ওর সামনে দাড়ানো মানুষটা চরম অবিশ্বাসের স্বরে বলে উঠলো,

-স্নিগ্ধতা?

চোখ তুলে তাকালো স্নিগ্ধতা। ওর সামনে আরাফাত দাড়িয়ে। তবে আরাফাতের অবস্থা বর্ণনা করার মতো না। চোখের নিচে কালি জমা পরেছে, চুলদাড়ি বেড়েছে। সারা চেহারায় অযত্নের ছাপ। গুরুত্ব না দিয়ে উঠে আবারো ছুট লাগালো স্নিগ্ধতা। কিছুদুর এগোতেই দেখে স্টোররুমের সামনের ফাকা করিডোর দিয়ে অনু আসছে। একধ্যানে মেঝের দিকে তাকিয়ে। ওকে দেখে মনে হচ্ছে যেনো কোনো পাথরের মুর্তি বাধ্য হয়ে পা চালিয়ে এগোচ্ছে। চুলের বিনুনি উস্কখুশকো, ওড়নাটা কোনোমতে গলায় বাঝানো। পা থেমে যাচ্ছিলো স্নিগ্ধতার। তবুও নিজেকে সামলে, একছুটে গিয়ে অনুকে জরিয়ে ধরলো স্নিগ্ধতা। ওড়নাটা চাদরের মতো করে দিলো ওর গায়ে। কিছুটা সময় পর আবেশ অনুভব করতেই শব্দ করে কেদে দিলো অনু। স্নিগ্ধতার অসহায় লাগছে। অনুর সাথে কি ঘটেছে, কিভাবে ঘটেছে, কে ঘটিয়েছে সবটা মিলিয়ে দিশেহারা লাগছে ওর। অনেক চেষ্টা করলো মুখ দিয়ে কথা বের করার। অনুকে থামতে বলার। পারলো না। সবটা গলায় দলা পাকিয়ে ওর কথাবলার ক্ষমতাকে নষ্ট করে দিচ্ছে যেনো। অনুর মুখগোজা কান্না শুনে বারবার শিওরে উঠতে লাগলো কেবল…

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here