#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা
১৯.
বেশ অনেকটা সময়ের ব্যবধানে অনুর কান্নার আওয়াজ কমে আসলো। ওকে ছেড়ে ওরদিক তাকালো স্নিগ্ধতা। অনুও নিজেকে কিছুটা সংবরন করে তাকালো ওর দিকে। চোখজোড়া লাল হয়ে আছে স্নিগ্ধতার। ফর্সা মুখটা কান্নাভেজা। চোখের পাপড়ি অশ্রুতে জরিয়ে আছে একজন আরেকজনের সাথে। এলোমেলো চুলের মাঝেও যেনো ঢেউয়ের উত্থানপতন। অনু বললো,
-সার্থক সে রুপ, যে রুপ দেখলে কেউ তার আঘাত ভুলে যায়। যার একটুখানি জরিয়ে ধরায় শরীরের বিষাক্ততার অনুভবের ইতি হয়। সার্থক সে স্পর্শ।
স্নিগ্ধতা অবাকচোখে কেবল তাকিয়ে রইলো। অনু জলভরা চোখে ওর দিকে তাকিয়ে থেকে বললো,
-কিন্তু সেই রুপ, সেই স্পর্শের জন্য যদি কারো জীবন যদি নরক হয়ে ওঠে, তা কি করে সার্থক স্নিগ্ধতা? তা কি করে সার্থক?
-ক্ কি হয়েছে অনু?
সাহস সঞ্চার করে প্রশ্ন ছুড়লো স্নিগ্ধতা। অনু দৃষ্টি সরিয়ে গা ছাড়া দিলো। বসে পরলো করিডোরের নোংরা মেঝেতেই। স্নিগ্ধতা ওকে সামলানোর চেষ্টা করেও দাড় করিয়ে রাখতে পারলো না। হাটু মাটিতে ঠেকিয়ে বসে পরলো ওউ। ব্যস্তভাবে অনুকে বললো নিজেকে সামলাতে। হাত পা অসাড় হয়ে আসতে লাগলো ওর নিজেরই। অনু মেঝের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো,
– শেইপ-আর্ট করা শেষে স্টোররুমের সামনে দিয়ে আসছিলাম। হঠাৎই পেছন কেউ একজন ওড়না ধরে টান লাগায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই স্টোররুমে ঢুকিয়ে দরজা লক করে দেয়।
শ্বাস আটকে আসছিলো স্নিগ্ধতার। পরেরটুক শোনার জন্য মোটেও প্রস্তুত করতে পারছিলো না ও নিজেকে। অনু নির্বাক চাওনিতে ওর দিকে তাকালো। ভাঙা গলায় বললো,
– একটামাত্র জানালা খোলা ছিলো রুমের। আবছা আলোয় মাস্কের আড়ালে থাকা চেহারাটা দেখতে পারলাম না। চিৎকার করতে যাচ্ছিলাম। লোকটা ঝড়েরবেগে এসে প্রথমে ওড়না দিয়ে মুখ বেধে দিলো আমার। তারপর ওড়নাতেই হাতদুটোও বেধে দিলো। পেচিয়ে পিলারে চেপে ধরলো আমাকে।
স্নিগ্ধতা চুপ। বলতে বলতেই আবারো অস্থির হয়ে উঠলো অনু। নিজের ঘাড় গলা ডলতে শুরু করে দিলো আচমকা। বললো,
– ভয়ে কাদছিলাম। আমার অসহায়ত্বে দয়া হলো না তার স্নিগ্ধতা। নড়চড় করতে দেখে আরো শক্তিতে ওড়না দিয়ে পিলারে চেপে ধরলো সে আমাকে। এই্ এইখানে নিশ্বাস পরেছে তার। আমার ঘাড়ে, গলায় তার নিশ্বাসবায়ুর ছোয়া আছে স্নিগ্ধতা। বড়বড় শ্বাস ফেলে, লোলুপ ঘ্রান নেওয়ার মতো করে বলছিলো, ‘কি নাম দেবো তোমার? কাটার বাগানের পাহারায় থাকা প্রস্ফুটিত ফুল? নাকি আমাকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করা স্বয়ং রুপকন্টক? এতোটা সামনে পেয়েও ছুতে পারছি না, এতোটা কাছে পেয়েও ধরতে পারছি না। বড্ড কষ্ট হচ্ছে আমার। বড্ড কষ্ট হচ্ছে! বিশ্বাস করো!’
শেষের কথাগুলো শুনে স্নিগ্ধতা সর্বোচ্চ অবাকের পর্যায়ে পৌছালো। আগুন্তকের এই ছুতে পারছি না, ধরতে পারছি না কথার মানে কি? অনু বলে চলেছে,
– এমনভাবে ওড়নায় পেচিয়েছিলো, এতোটুকো নড়চর করতে পারছিলাম না। অজস্র আক্ষেপ শুনাচ্ছিলো সে। যেনো আমি তার চরম কাক্ষিত কোনো বস্তু! আর প্রচন্ড কাছে পেয়েও আমি তার নাগালের বাইরে। টের পেলাম, গলার আওয়াজ ছাড়া আর কোনো হাতিয়ার নেই আমার। মুখ খোলার চেষ্টা করতে লাগলাম তখন। এদিকওদিক ঘুরে যেইনা ওড়নায় কিছুটা ঢিল পরেছে, সর্বোচ্চস্বরে তোকে ডাক লাগাই।
এটুক বলে অনু থামলো। স্নিগ্ধতার বিস্মিত চাওনির দিকে তাকিয়ে বললো,
– আশ্চর্যের বিষয় কি জানিস স্নিগ্ধতা? আমার্ আমার সে ডাকে কেউ সাড়া না দিলেও তৎক্ষণাৎ সে লোকটা তিনপা পিছিয়ে গেলো। ভয়ে নাকি অন্যকোনো কারনে, দ্বিতীয়বার ভাবিনি। ছাড় পেয়ে ছুট লাগালাম আমি। আর…
– তারমানে সে লোকটা তোকে স্পর্শও করেনি।
অনুর কথার মাঝেই বলে উঠলো স্নিগ্ধতা। ঘাড় নাড়িয়ে না সুচক জবাব দিলো অনু। স্নিগ্ধতা আরেকদফায় অবাক হলো। তবে প্রকাশ না করে ব্যস্তভাবে বললো,
– ত্ তাহলে তোর এ অবস্থা কেনো? এমন…
চারপাঁচটা মেয়ের হাসাহাসির আওয়াজ কানে আসলো ওদের। চোখ তুলে তাকালো অনু স্নিগ্ধতা দুজনেই। ক্লাসশেষে বেরোচ্ছিলো মেয়েগুলো। স্নিগ্ধতাদের ফ্লোরে বসে থাকতে দেখে আওয়াজ কমালো ওরা। বিরবিরিয়ে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগলো কিছু।
স্নিগ্ধতা তবুও স্পষ্ট শুনলো, একজন অনুকে দেখিয়ে বলছে,
– আরে এটাই তো সেই মেয়েটা, হলে ওঠা নিয়ে মোহিনী আপুর শর্ত মানে নি। অথচ আজ নাকি স্টোররুম থেকে কোন ছেলের সাথে আপু তাকে হাতে নাতে ধরেছে। আসলে কি বলতো? বাইরে সবাই এমন ভালো সাজতে চায়। ভেতরেভেতরে ঠিকই সব খেলা খেলছে। কেউই বাদ নেই! সাধুবেশি টপাররা তো আরো!
স্তব্ধ হয়ে রইলো স্নিগ্ধতা। অনুর চোখ বেয়ে জল গরাতে লাগলো আবারো। স্নিগ্ধতা উঠে দাড়াচ্ছিলো কিছু বলবে বলে। অনু ওকে শক্ত করে ধরে বসিয়ে রাখলো। বললো,
– কিছু বলবি না তুই স্নিগ্ধতা!
– অনু!
জোরগলায় অনুকে বারন করতে বারন বোঝালো স্নিগ্ধতা। মেয়েগুলো মুখ বাকিয়ে চলে গেলো। হাত ছাড়িয়ে নিয়ে উঠে দাড়ালো স্নিগ্ধতা। বললো,
– তুই হল এপ্লাই করেছিলি?
– হু। বাড়িতে পৌছোতে রাত হয় বলে মা…
– এপ্রুভ হয়নি কেনো?
– মোহিনী আটকে দিয়েছে।
– মোহিনী কে?
অনু মাটিতে ঠেস দিয়ে উড়ে দাড়ালো। আর কিই বা করার আছে ওর নিজেকে তুলে দাড় করানো ছাড়া? দুহাতে গাল মুছে নাক টানলো ও। ব্যাগটা আস্তেকরে বারি মেরে ধুলো ঝাড়লো। স্নিগ্ধতার দিকে তাকিয়ে বললো,
– তোর এসব শোনার প্রয়োজন নেই। দেরি হয়ে যাচ্ছে। এখন না গেলে বাস মিস করবো। আসছি।
অনু পা বাড়ালো। কিন্তু ওর হাত ধরে আটকে দিলো স্নিগ্ধতা। শান্তশিষ্ট ভঙ্গিমায় বললো,
– মোহিনী কে অনু?
স্নিগ্ধতার গলার স্বর স্পষ্ট বলছে, উত্তর না পেলে অনুকে একচুলও নড়তে দেবে না ও। কিন্তু অনুর ভয় তো সেখানেই। সাইফ বারবার করে ওকে বলে রেখেছে, কোনোরকম ভায়োলেন্সের ধারেকাছে স্নিগ্ধতাকে যেনো ও যেতে না দেয়। এজন্যই এসব এতোদিন বলেনি ওকে। কিন্তু আজ কি করবে ও? স্নিগ্ধতা ওর হাত নিজের মাথায় নিয়ে বললো,
– কথা বল অনু! কে মোহিনী? কিভাবে চেনে সে তোকে?
অনু শ্বাস ফেললো। বললো,
– রাজনীতি করে। ফার্স্ট সেমিস্টারে এসেছিলো ক্লাসে। তার দলের দাওয়াত দেওয়ার জন্য। তোর মনে নেই হয়তো। রাজনীতির জেরে হল সুপার, প্রভোস্ট অবদি সবাইকে কন্ট্রোল করতে পারে ও। হল এপ্লিকেশন জমা দেওয়ার দিন ও ছিলো প্রভোস্ট ম্যামের সাথে। আমাকে দেখে সিজি জানতে চায়। আর রেজাল্ট শুনে পাকড়াও করে ওর দলে যাওয়ার জন্য। চারুকলার ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট মেয়েটা ওর দলে থাকলে মন্দ হয়না। আমি ভদ্রতার সাথে মানা করে দিয়েছিলাম। তাই রাগে সে আমার এপ্লিকেশন ছিড়ে ফেলে সেদিন। এপ্রুভ হয়নি আমার হল এপ্লাই। সে থেকেই হয়তো রাগ পুষে রেখেছিলো। যখন আমি স্টোররুম থেকে বেরিচ্ছিলাম, ও ওর সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে বাইরেই ছিলো। আমার অবস্থা দেখে আটকে দিয়েছিলো। আর…
– আর?
অনুর চোখ টলমল করছে। গলায় দলা পাকিয়ে আসছে ওর সব কথা। তবুও বললো,
– আর অপমান করেছে! নিকৃষ্টতম ভাষায় অপমান করেছে। আমি নাকি ক্যাম্পাসের মধ্যে পুরুষসঙ্গে লিপ্ত হয়েছি, এমন অপবাদ দিয়ে মোহিনী ওর দলবলের সামনে আমাকে বে* ডেকেছে।
ঘৃণায় চোখ দিয়ে জল পরছে স্নিগ্ধতার। অনু জলভরা চোখে নিচদিক তাকিয়ে বললো,
– ওড়না ছিলো না গায়ে। ওটা স্টোররুমে ফেলে দৌড়ে চলে এসেছিলাম। ভয়ে বিদ্ধস্ত হয়ে থাকা আমিটাকে ওরা সবাই মিলে বিবস্ত্রের সাথে তুলনা করেছে। কতো দিলো, কতো ঘন্টা এসব জঘন্য কথা বলে সবার সামনে অপমান করেছে।
স্নিগ্ধতা ভাষাহীন। অনু চোখ তুলে তাকালো। স্নিগ্ধতার চেহারার দিকে তাকিয়ে বুঝলো, একটা মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়েকে কেউ এতো বিশ্রিভাবে অপমান করতে পারে, জানা ছিলো না ওর। জীবনের এতো তিক্ততার মুখোমুখি কখনো হতে হয়নি ওকে। সাইফ হতে দেয়নি। স্নিগ্ধতা বললো,
– কেউ প্রতিবাদ করেনি?
আবারো চোখমুখ মুছে ফেললো অনু। তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললো,
– কেউ কিচ্ছুটি বলেনি। সব শুধু মজা নিয়ে শুনছিলো।
স্নিগ্ধতার চোয়াল শক্ত হয়ে আসলো এবার। অনুর হাত ধরে হাটা লাগিয়ে বললো,
– অনেক শুনেছি। চল এখন তুই আমার সাথে।
– কোথায়?
– ভিসি স্যারের কাছে।
অনু তৎক্ষনাৎ থামলো। থামতে হলো স্নিগ্ধতাকেও। প্রশ্নসুচক চাওনিতে তাকালো ও অনুর দিকে। অনু বললো,
– আমি কোথাও যাচ্ছি না। আর তুইও কাউকে কিছুই বলবি না!
– কি বলছিস তুই এসব?
– ঠিকই বলছি। তুই ওদের সম্পর্কে জানিস না কিছুই! শুধুমাত্র দলে ভিড়তে চাইনি বলে আজ আমার এ দশা। ওদের এগেইনিস্টে বললে হয়তো আরো ভয়ানক কিছু…
– তোকে ওরা যা বলে অপমান করেছে, এরচেয়ে জঘন্য আর কি হতে পারে অনু?
-হয়তো সত্যিই আমার সম্মানহানী করবে, নয়তোবা আমাকে মে’রে ফেলবে।
– অনু!
আবারো চেচিয়ে উঠলো স্নিগ্ধতা। অনু শান্তভাবে বললো,
– তোর কি মনে হয় স্নিগ্ধতা? দলে ভিড়িনি বলে যারা আমার সাথে এমনটা করতে পেরেছে, তাদের বিরুদ্ধে বললে এসব করতে দ্বিতীয়বার ভাববে ওরা? আমি যেটুকো অপমানিত হয়েছি, তা দুদিন পর সয়ে যাবে। কারন সে অপমানের দায়রা মিথ্যে। গোটাকয়েকজনের সামনে ছিলো তা। আরো বিরোধীতা করলে পরেরবার হয়তো ওরা পুরো ক্যাম্পাসের সামনেই আমাকে…না! তুই এটাকে আর বাড়াস না স্নিগ্ধতা। প্লিজ! পায়ে পরছি তোর!
কিছু বলার আগেই ফোন বেজে ওঠে স্নিগ্ধতার। সাইফের কল। অনু চোখমুখ মুছে নিজেকে সামলে বললো,
– ভাইয়াকেও বলিস না প্লিজ।
কল রিসিভ করতে গিয়ে কেবল ‘আসছি ভাইয়া’ বলে কল কাটলো স্নিগ্ধতা। অনুর সাথে হাটা লাগালো। কয়েককদম এগিয়ে করিডর পার হতেই ডানদিকের মনোবিজ্ঞান বিভাগ লেখাটা দেখে পায়ের গতি কমে আসলো ওর। ঠিক তখনি পেছন থেকে পুরুষালী কন্ঠে কেউ বলে উঠলো,
– আমি এদিকে। পেছনে। এক্স সাইকোলজিয়ান বলে সবসময় সাইকোলজির সাইনবোর্ডের সামনে খোজার দরকার নেই! আমি মানুষজনের পেছনেও থাকতে পারি।
#চলবে…
[ একটু বেশিই গ্যাপ পরে গেছে বোধহয়।🥲
যারা তবুও গল্পের অপেক্ষায় ছিলেন, অশেষ ভালোবাসা। আমার নিজের সন্তুষ্টির জন্য লেখা, এ কারনটায় আপনারা জুড়ে গেছেন। তাই হয়তো লেখালেখি একেবারে ছাড়তে পারছি না। সর্বোপরি, ভালোবাসা পাঠকমহল❤️ ]

