#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা
৪৩.
সাইফ টেবিলে কনুই ঠেকিয়ে, কপাল চেপে ধরে চেয়ারে বসে আছে। তৃতীয়বারের মতো দরজায় নক করে অনুমতি নিয়ে ওর কেবিনে ঢুকলো কনস্টেবল। জড়োসরো পায়ে এগিয়ে গিয়ে, খালি কফির মগটা বদলে নতুন কফিভর্তি মগ দিয়ে গেলো সে। ডাক্তারের এপার্টমেন্ট থেকে সকালবেলাই সোজা পুলিশস্টেশনে চলে এসেছে সাইফ। সে সাথে নিয়ে এসেছে একঝাক প্রশ্নের দল। ডাক্তারের ঠিক কোন শত্রু তাকে অপহরন করেছিলো? তার প্রতি এতোটা ক্ষোভ কার? সে রাগটা কতো বেশি, সেটা তার শরীরের প্রত্যেকটা ক্ষতের ভয়াবহতা বলে দিচ্ছিলো। কিন্তু প্রশ্নটা অন্যত্রও। কেবল আঘাত করার জন্যই কি তাকে অপহরন করা হয়েছিলো? নাকি শেষ পরিণয়ের জন্য? যদি অপহরণকারীর লক্ষ্য তাকে মেরে ফেলা হতো, তাহলে সেটা না করে তাকে ভ্যানে করে বাসা অবদি পৌছে দেওয়ার কি মানে? আর সবচেয়ে বড় যে প্রশ্ন, ডাক্তারের সাথে কিছু ঘটানোর আগে ওকে কল করে কেনো জানানো হলো? ফোনকলে কে ওকে ডাক্তারের অপহরণের ব্যাপারে পূর্বাভাস দিয়েছিলো? কেনো দিয়েছিলো? তার প্রথমকথায় এটা স্পষ্ট, এই সিরিয়াল কিলিং কেইসগুলো সাইফ হ্যান্ডেল করছে, সেটা জানে সে। সে বিষয়েও কিছুটা ইঙ্গিতপুর্ণ কথা বলেছিলো সে। তাহলে ডাক্তার সে কথোপকথনে কোথথেকে আসলো? কেনো আসলো?
এতোসব ভাবনার মাঝেই ফোন বেজে ওঠে সাইফের। চোখ তুলে ফোনের দিক তাকিয়ে দেখে ওটা শারাফের নম্বর। গলা ঝেরে কল রিসিভ করলো সাইফ। বললো,
– হ্যাঁ শারাফ। বলো?
শারাফ একহাত ট্রাউজারের পকেটে গুজে বারান্দায় দাড়িয়ে ছিলো। উজ্জ্বল সকালটা উপভোগ করতে গিয়ে সাইফের কথা মনে পরেছে ওর হঠাৎ। তাই কল করা। তবে সাইফের গলা শুনে বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না ও। পকেট থেকে হাত বের করে, রেলিংয়ে ঠেস দিয়ে দাড়িয়ে বললো,
– আপনার গলা বেশ বিব্রত শোনাচ্ছে মিস্টার এহমাদ। সব ঠিকাছে তো?
জিভ দিয়ে ঠোট ভিজালো সাইফ। শারাফ অনেকটাই জানে, ঠিক কতোটা অস্থির পরিস্থিতিতে দিননিপাত করছে ও। কেইসে ইন্সপেক্টর আফজাল নিজে যুক্ত করেছে ওকে। তাই ঘটনাপ্রবাহ জানার সবরকমের সম্ভবনা আছে ওর। সাইফ একটা ছোট শ্বাস ফেলে চেয়ার থেকে উঠে দাড়ালো। টেবিলে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে বললো,
– আই থিংক আজকে সিক্সথ অ্যাটাকটা হতে যাচ্ছিলো।
শারাফ প্রতিক্রিয়া করলো না। সোজা হয়ে দাড়িয়ে গিয়ে আবারো ট্রাউজারের পকেটে হাত পুরলো৷ এরপর বারান্দাতেই পাইচারী করতে করতে বললো,
– ইউ থিংক সো অর ইউ আর শিওর অফ দ্যাট?
– সেটাই মেলাতে পারছি না। কালরাতে কেউ একজন ননট্র্যাকার ফোন থেকে আমাকে কল করে। শুরুতে আমাকে কেইস নিয়ে ডিসটার্বড্ কিনা জিজ্ঞেস করে, দেন লোকেশনসমেত এক ভিক্টিমের খোজ নেওয়ার জন্য বলে। আমি রিস্ক নিতে চাইনি। তাই রাতেই তোমাকে টেক্সট করে বেরিয়ে পরি। এন্ড হি ওয়াজ রাইট। সেখানে…
– আপনি কিকরে জানলেন ওটা হি নাকি শি?
আটকে গেলো সাইফ। সেকেন্ডদুই থেমে বললো,
– মানে? কলার ছেলে ছিলো। ওর ভয়েজ…
– যে ননট্র্যাকার ফোন ইউজ করে আপনাকে কল করতে পারে, তার ভয়েজ চেইন্জার ইউজ করে কল করাটা কি খুব অস্বাভাবিক হবে মিস্টার এহমাদ?
বিমুঢ় হয়ে বসে রইলো সাইফ। সত্যিই তো! প্রযুক্তির এ যুগে ওপাশ থেকে কলটা কোনো পুরুষ করেছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এদিকটা তো ভাবাই হয়নি ওর। কিন্তু শারাফের ইঙ্গিতটাও বেশ বুঝতে পারছে ও। নিজেকে সামলালো সাইফ। শান্ত গলায় বললো,
– ওটা শি হলেও নীলা না শারাফ। আমি নিজে সেটা নিশ্চিত করেছি।
বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে, ঠোট চেপে নিশব্দে হাসলো শারাফ। তারপর কিছুক্ষণ নিচের ঠোট কামড়ে ধরে রেখে বললো,
– সেটাও ঠিক। যেটা আপনি এনশিওর করছেন, সেখানে আর আমার প্রেডিকশনের আর কি কাজ?
– নীলাকে শুধুশুধু সন্দেহ করেছি বলে অলরেডি আত্মগ্লানিতে আছি আমি। ওকে আর এসবে জড়াতে চাইছি না।
– নীলাম্যাডাম আপনার হবু বউ। সো তাকে কোথায় কিভাবে জড়াবেন, সেটা একান্তই আপনার বিষয় মিস্টার এহমাদ। আমি বরং আমার একান্ত বিষয়ে আসি। স্নিগ্ধতার সাথে কথা হয়েছে আপনার?
সাইফ চুপ রইলো। স্নিগ্ধতাকে কল করা হয়নি ওর। স্নিগ্ধতা জানে, ওর ভাই সময় অসময়ে বেরিয়ে যায়, তাই রাতে ওর বেরোনো নিয়ে কোনোরুপ অভিমান করবে না। তবে কল না করার দায়ে নির্ঘাত মন খারাপ করে বসে আছে সে। শারাফ বললো,
– কেইসের চক্করে নিজের বোনকে ভুলে যাচ্ছেন মিস্টার এহমাদ। কল করে কথা বলে নিন ওর সাথে। এন্ড ডোন্ট ওয়ারী। কদিন পর স্নিগ্ধতা আমার ঘরের ঘরণী হবে। তখন আপনার কথা মনে করে করে, মন খারাপের একবিন্দু সুযোগ দেবো না আমি ওকে। প্রমিস!
সাইফ চোখ বন্ধ করে, মৌনহাসি হাসলো। শারাফের শাসন হজম করলো যেনো। বললো,
– এজন্যই ওর দায়িত্বটা তোমায় দিচ্ছি। কখনো আমি না থাকলে…
– আপনাকে থাকতে হবে মিস্টার এহমাদ। আপনার বোনকে আগলে রাখতে আপনাকেই থাকতে হবে।
সাইফকে শেষ করতে না দিয়ে বলে উঠলো শারাফ। দুজনের নিরবতায় পার হলো কয়েকদন্ড। এরইমাঝে নিচতলা থেকে মেহেরুন ডাক লাগালো শারাফকে। শারাফ অতি বিনয়ী স্বরে বললো,
– আপাতত রাখছি। টেক কেয়ার মিস্টার এহমাদ।
– ইউ টু।
কল কেটেই আনমনা চোখে আকাশের দিকে তাকালো শারাফ। বুকের বা পাশটায় হঠাৎ চিনচিনে ব্যথা। দাতে দাত চেপে নিজেকে সামলানোর প্রচেষ্টা। অতঃপর শ্বাস ফেলে, হাসিমুখে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসা। ড্রয়িংরুমে এসে দেখে মেহেরুন লাগেজসহ দাড়িয়ে। স্বপ্নীলের বাকিসবও রয়েছে সেখানে। শারাফকে দেখে মেহেরুন ফুলানো গাল নিয়ে বললো,
– দুদিন পর তোমার মিস হটির বিয়ে আর তুমি আজও স্বপ্নীলে। ব্যাপারটা কি ঠিক মিস্টার ইয়াকীন শারাফ?
– তোমার বরটাকে দেশে আনতে পারলে না বলে আমার পিছু নিচ্ছো? এটা কি ঠিক মেহুভাবী?
বলতে বলতে সোফার হাতলে এসে বসলো শারাফ। মেহেরুন শাশুড়িকে লক্ষ্য করে বললো,
– কি খাইয়ে ছেলেদুটোকে মানুষ করেছো মা? কোনোদিন কথায় পেরে উঠতে পারলাম না এদের সাথে!
উপস্থিত সকলে হেসে দিলো। শারাফও হাসলো। তারপর বললো,
– মা? বোনের বিয়ে বলে দুদিন আগেই ভাবীকে বাপেরবাড়ি চলে যেতে দিচ্ছো? আমার বিয়েতে ভাইয়াকে দশদিন আগে চাই বলে দিলাম!
মেহেরুনের মনটা খারাপ হয়ে গেলো নিমিষেই। মিসেস নাহিদ ওর কাধে এসে হাত রেখে বললেন,
– মন খারাপ করোনা মেহেরুন। শাওনকে আর কেউ না বুঝুক, তুমি তো বোঝো।
মেহেরুন জোরপুর্বক হাসলো। নখ দেখতে দেখতে বললো,
– ত্ তেমন কিছুনা ছোটমা। আসি এখন আমি। সাবধানে থেকো সবাই। আর কাল সকালসকাল ও বাসায় চলে যেও কেমন?
মাথা নেড়ে ওকে আশস্ত করলেন মিসেস নাহিদ। মেহেরুন সবাইকে বিদায় জানিয়ে শায়েরীকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে এলো। শারাফ গাড়ি অবদি এলো ওর লাগেজ নিয়ে। গাড়িতে ওঠার আগে মেহেরুন ইতস্তত করতে করতে শারাফকে বললো,
– একটা কথা জিজ্ঞেস করবো তোমাকে?
– হুম ভাবী?
অস্বস্তি বাড়লো মেহেরুনের। তবুও একটা দম নিয়ে বললো,
– নীলা আর ইন্সপেক্টরের মাঝে সব ঠিকাছে তো শারাফ?
ওর দিকে অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে রইলো শারাফ। মেহেরুন গকায় আরো কিছুটা অসহায়ত্ব এনে বললো,
– বলোনা শারাফ? তুমি তো নীলাকে সবচেয়ে ভালো জানো। আমাকে না বললেও, সবকিছু তোমাকে ঠিকি বলে। বলোনা, ওদের মাঝে সবটা ঠিকাছে তো? কোনো অসুবিধা হয়নি তো?
শারাফ জোরালো হাসি দিলো একটা। স্বাভাবিকভাবে বললো,
– এসব কি বলছো ভাবী? কাল দিনটা পর ওদের বিয়ে। হঠাৎ এসব কেনো মনে হচ্ছে তোমার?
দৃষ্টিনত করলো মেহেরুন। নুয়ানো আওয়াজে বললো,
– জানিনা শারাফ। মনটা কেবলই কু ডাকছে আমার। নীলা আমার আপন বোন হলেও ওকে কেনো যেনো আমার বদ্ধ কুঠুরির মতো লাগে। যেখানে হাজারো রহস্য লুকোনো। আমরা চেয়েছিলাম ওর বিয়েটা আরো বেশি জাঁকজমকতার সাথে হোক। কিন্তু ও চায়না। প্রেমের বিয়ে হওয়া সত্ত্বেও ইন্সপেক্টর সাইফের সাথে সেরকম দেখাসাক্ষাৎও নেই ওর। যদিও দেখানো প্রেম করার বয়সটা পার করে গিয়েছে৷ তারপরও! ওর…
শারাফ কাধে হাত রাখলো মেহেরুনের। ভরসার কন্ঠে বললো,
– মিস্টার এহমাদ তার কেইস নিয়ে ব্যস্ত এখন। তাই তোমার বোন তাকে অতিরিক্ত ঝামেলায় জড়াতে চাইছে না ভাবী। এটাকে বড় ইস্যু বানিয়ে, শুধুশুধু দুশ্চিন্তা করো না। সব ভালোই হবে।
হাসি ফুটলো মেহেরুনের ঠোঁটে। স্বপ্নীল ওকে অনেককিছু দিয়েছে। আর তারমাঝে অন্যতম সুন্দর বিষয়টা হলো শারাফের এই ধনাত্নকবোধ। যেকোনো বাজে পরিস্থিতিতেও, সবাইকে ভালো দিকগুলো নিয়ে ভালো রেখে এসেছে শারাফ। তেমনি অনুভব স্নিগ্ধতার সাথে কথা বলেও অনুভব করেছে মেহেরুন। দুজনের একজনের কথায় প্রশান্তি, আরেকজনের উপস্থিতিতে। মেহেরুনের তখনই মনে হয়েছে, ওদের মিলন স্বপ্নীলের জন্য সবচেয়ে সুন্দর মুহুর্তগুলো বয়ে আনাবে। মেহেরুন বললো,
– তুমি যেমন, স্নিগ্ধতাও ঠিক তেমন শারাফ। ওপরওয়ালা একদম পার্ফেক্ট জুটি বানিয়েছেন তোমাদের দুজনকে। অনেক ভালো থাকবে তোমরা।
প্রতিত্তরে শারাফ কেবল হাসলো। ‘আসছি’ বলে গাড়ি করে চলে গেলো মেহেরুন। ওকে বিদায় করে আবারো বাসায় ঢুকলো শারাফ। ফ্রেশ হয়ে, গাড়ির চাবিটা হাতে নিলো। জ্যাকেটটা পরতে পরতে, স্বপ্নীল থেকে বেরিয়ে এলো দ্রুতপদে।
•
স্নিগ্ধতার ঘরের দরজা ঠেলে উপস্থিত হলো এক ষাটোর্ধ বয়স্কা। পরনে সাদা কাপড়, প্রায় সর্বপক্ক চুল, ঝুলে পরা চামড়ার মহিলা পুরো রুমটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিলো আগে। এরপর বারান্দায় তাকিয়ে দেখলো, স্নিগ্ধতা দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে রেলিংয়ে বসে আছে। আজকে ক্লাস নেই ওর। দাতে দাত চেপে কোলে থাকা খাতায় অতিদ্রুত পেন্সিল চালাচ্ছে ও। মৃদ্যু বাতাসে আশেপাশের সাদা পর্দাগুলো উড়ছে। রোদে পুরো রুমটা ঝলোমলো করছে যেনো। পাশের বাসার ছাদে কবুতর পোষে কেউ একজন। সেখানকার বাকবাকুম আওয়াজও কানে আসে এদিকে। বৃদ্ধা শব্দ না করে হাতের খাবারের ট্রে টা টেবিলে রাখলো। তারপর খাবারের প্লেট হাতে নিয়ে, বারান্দার দিকে এগিয়ে বললো,
– সেইযে আলতা রঙ নিয়ে বসেছিস, খাবারটাও মুখে তুলিসনি এখনো!
চমকে উঠে পাশে তাকালো স্নিগ্ধতা। বয়স্কাকে খাবারের প্লেট ধরে থাকতে দেখে খাতা বন্ধ করে রেলিংয়ের ওপর রাখলো ও। নিজেও নামতে নামতে ব্যস্তভাবে বললো,
– একি আম্মা? তুমি কেনো খাবার আনতে গেলে? আমি তো…
বয়স্কা ওকে ঠেলে দিয়ে রেলিংয়েই বসতে বললো। ভ্রুজোড়া কিঞ্চিৎ কুঁচকে পা ঝুলিয়ে বসলো স্নিগ্ধতা। বয়স্কা বললেন,
– আমাকে খাবার দিয়ে চলে এলি আর নিজে কুটোটিও মুখে তুললি না। সকাল থেকে তুই না খেয়ে আছিস শুনলে সাইফ এসে আমাকে জেলে ঢুকিয়ে দিতে দুবার ভাববে? তোর কি মনে হয়?
বৃদ্ধার কথায় হেসে দিলো স্নিগ্ধতা। ওকে হাসতে দেখে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মহিলা। কতো মিষ্টি আর স্নিগ্ধ হাসিটা। বাবা-মা হারা মেয়েটার হাসিমুখ দেখলে কেনো যেনো দুনিয়ার সব দুঃখ ফিকে হয়ে যায় তার কাছে। স্নিগ্ধতা হাসি কমিয়ে ভ্রু নাচালো। সে দৃষ্টি স্বাভাবিক করে বললো,
– হ্ হ্যাঁ হাস! আরো বেশি করে হাস! ওই হাসিতেই তো মরলো সব! সাইফ তো আগেথেকেই বোনের হাসির জন্য সব পারে, আশ্রমে তুই গিয়ে একটা হাসি দিলেই তোর সব কথায় সব রাজি। এইযে এখন হাসছিস, আমি সে হাসি দেখেই ভুলে বসেছি কেনো আসলাম এ ঘরে! হাসতে থাক তুই। দুনিয়া উচ্ছনে যাক!
স্নিগ্ধতা ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষন। তারপর অপরাধীর মতো করে বললো,
– বকছো কেনো আম্মা? তুমি তো জানো আমার একা একা খাওয়ার অভ্যেস নেই।
– জানি না আবার? বেশ জানি! আদরে আদরে বোনটাকে কতোটা বখিয়ে ফেলেছে সাইফ।
গাল ফুলিয়ে বসে রইলো স্নিগ্ধতা। বয়স্কা খাবার মাখিয়ে মুখের সামনে তুলে ধরলো ওর। একদম বাধ্য শিশুর মতো হা করে খাবার মুখে নিলো স্নিগ্ধতা। বললো,
– তোমায় অতোরাতে আশ্রম থেকে নিয়ে এসেছি বলে রাগ হয়েছো?
– রাগ কেনো হবো? এ বাসায় আসলে রাগ হই আমি?
– তাহলে? ওমন কেনো করছো? রাগ কেনো দেখাচ্ছো আমায়?
একটা ছোট শ্বাস ফেললো বয়স্কা। আগেররাতে স্নিগ্ধতার সাথে আশ্রমে যাওয়া ছেলেটাকে দেখার পর থেকে তার ভালোলাগছে না কিছুই। আশ্রমে স্নিগ্ধতার সাথে শারাফকে দেখে ওকে শারাফের পরিচয় জিজ্ঞেস করছিলো বৃদ্ধা। স্নিগ্ধতা জবাব দিতে পারেনি। তবে ওর চোখমুখ বলে দিচ্ছিলো, সে আর কেউ না, ওর প্রেমিকপুরুষ। আর দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করতেই শারাফ বলে দেয়, সে সাইফের কাছ থেকে সনদপ্রাপ্ত স্নিগ্ধতার হবু বর। সাইফ বাসায় থাকবে না বলে আশ্রম থেকে বৃদ্ধাকে নিয়ে স্নিগ্ধতাদের বাসায় পৌছে দিয়ে গেছে শারাফ। অনেক কথাবার্তাও হয়েছে তাদের। তাই অভিযোগ শারাফকে নিয়ে নয়। অন্যত্র! আরাফাতকে আগে থেকে চিনতো বৃদ্ধা। কেনো যেনো এ সবকিছুর মাঝে আরাফাতকে চেয়েছিলো সে। স্নিগ্ধতার পাশে এই হঠাৎ চলে আসা শারাফকে মেনে নিতে সময় লাগছে তার। স্নিগ্ধতা গলা জড়িয়ে ধরলো বৃদ্ধার। আদুরে গলায় বললো,
– ও আম্মা? এমন কেনো করছো? বলোনা! কি হলো তোমার আজ? আদর না করে বকছো কেনো আমাকে?
ধ্যান ভাঙে বৃদ্ধার। সে শান্তশিষ্ট কন্ঠে বললো,
– আরাফাতের ভালোবাসায় ঠিক কি কমতি ছিলো স্নিগ্ধু বলতো? কিসের জন্য তুই ওকে ভালোবাসতে পারিসনি?
হাত আলগা হয়ে আসলো স্নিগ্ধতার। গলা ছেড়ে, জলভরা দৃষ্টিতে ও তাকালো বৃদ্ধার দিকে। বৃদ্ধা আবারো বললো,
– বল স্নিগ্ধু? কি দোষ ছিলো আরাফাতের? ওকে প্রত্যাখানের কারন কি?
– ওর দোষ ছিলো কোনো দোষ না থাকা। তাইনা স্নিগ্ধতা?
বজ্রপাতের আওয়াজে যেমন শিশুরা কেপে ওঠে, ঠিক তেমনভাবে শরীর ঝাকি দিয়ে উঠলো স্নিগ্ধতার। দরজায় দাড়িয়ে দেখে, অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষটা তার স্নিগ্ধতম হাসি ঠোঁটে নিয়ে দাড়িয়ে আছে। আশপাশের শীতল হাওয়া অকস্মাৎ উত্তপ্ত হয়ে উঠলো যেনো। পিনপতন নিরবতার মাঝে, রেলিং থেকে স্নিগ্ধতার ছবি আঁকার খাতাটা শব্দ করে মেঝেতে পরে গেলো। খোলা পৃষ্টার ছবিটার দিকে চোখ পরলো সবার। পেন্সিলস্কেচে আঁকা ছবিটায় একটা ছেলের সাথে একটা টপস জিন্স পরা মেয়ে দাড়িয়ে। ছেলেটা ছোট্ট একটা ফুল কানে গুজে দিচ্ছে মেয়েটার আর মেয়েটা দুহাত মুখ চেপে ধরে হাসছে। আর ওদের ঠিক পেছনের ভবনটায় বড়বড় করে লেখা, ‘হাভার্ড ইউনিভার্সিটি’
#চলবে…

