#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#সূচনা_পর্ব
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
তপ্ত দুপুর। নিস্তব্ধতায় ছেয়ে চারপাশ। খানিক আগেও ঘেউ ঘেউ করছিল কুকুরের দল। ঢিল ছুঁড়তেই দৌড় লাগিয়েছে। ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ তুলে লোহার গেট লাগিয়ে নিশ্চিন্তে চেয়ারে পিঠ হেলিয়ে দেয় দারোয়ান। বাড়ির মালিক বড্ড জাঁদরেল। ঘুমে ব্যাঘাত ঘটলেই খেঁকিয়ে উঠবে। তাই আগেভাগেই তাড়িয়ে দিয়েছে কুকুরগুলোকে। নয়তো একটু পরেই শুরু করবে হাঁকডাক। তখন আরামের ঘুম হারাম হয়ে যেত তার। বারান্দায় দাঁড়িয়ে এমন দৃশ্য অবলোকন করে প্রায়শই। সকলে খেয়ে ভাতঘুম দিলেও, ঘুম নেই অষ্টাদশীর চোখে। সফেদ রঙা কাগজে দৃষ্টি ফেলে আনমনে। কী যেন এক ভাবনায় মত্ত! সাদা কাগজে কালো কালির প্রলেপ। গুটি কয়েক শব্দের বাহার কাগজ জুড়ে। চোখের মণি নিবদ্ধ সেই লেখায়।
– আপনার আমার প্রেম হবে সেই নব্বই দশকের প্রেমের মতো, বিংশ শতাব্দীর মতো নয়।
হাতে থাকা চিঠিটা পড়ে তপ্ত শ্বাস ফেলে আভিরা। এ নতুন কিছু না। গত এক মাস যাবৎ এমন অহরহ চিঠি আসছে তার নামে। তবে কে পাঠাচ্ছে তা তার অজানা। ভদ্রলোক নিজের পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক। অষ্টাদশীর মনের আনাচে কানাচে নানান প্রশ্নের ভিড় জমেছে। অথচ উত্তরের আশায় ফিরতি পত্র প্রেরণ করার সুযোগ নেই। নিয়ম করে সপ্তাহে দুদিন সোম আর শুক্রবার চিঠি আসে। তবে দু চার লাইনের বেশি লেখা থাকে না তাতে।
আভিরা আঞ্জুম, পরিবারের বড়ো মেয়ে। মা বাবা আর ছোটো ভাইকে নিয়ে তার দুনিয়া। বাবা স্বনামধন্য এক সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ। নিয়ম কানুন এ বেশ কঠোর। ছোটো থেকে বাবার কড়া শাসনে বড়ো হয়েছে। বাবাকে ভীষণ ভয় পায় সে।
প্রথম যখন হাতে চিঠি পেয়েছিল তখন ভেবেছিল বাবাকে জানাবে। পরে সে চিন্তা বাদ দিল। কারণ এ কথা শুনে যদি বাবা রেগে যায় বা কোনো কারণে তাকে ভুল বুঝে। সে চায় না তার সম্পর্কে বাবা কোনো ভুল ধারণা পোষণ করুক।
অথচ তোফায়েল আহমেদ মেয়েকে ভীষণ সমীহ করে চলে।
বিয়ের অনেক বছর পর আল্লাহ এ কন্যা সন্তান দান করে তাদের। একদম ফুটফুটে রাজকন্যার মতো দেখতে। সেই মেয়েকে কোলে নিয়ে ভদ্রলোক আনন্দে কেঁদে দিয়েছিল। বাবা হওয়ার যে এত আনন্দ জানা ছিল না তার। নিজের নমনীয়তা চেপে রেখে বরাবর কঠোরতার সহিত মেয়েকে বড়ো করে তুলেছেন যাতে মেয়ে তার বিপথে না যায়।
_
আভিরা জানালায় থুতনি ঠেকিয়ে বিষণ্ণ মনে আকাশ দেখছে। কিছু ভালো লাগছে না তার। কেন লাগছে না তার কারণ জানা নেই। আবার হয়তো জানা আছে।
দুদিন হলো বাবার বাড়ি থেকে নানা বাড়ি এসেছে আভিরা।
এই তো কিছুদিন আগে উচ্চ মাধ্যমিক দিল। পরীক্ষার পর পুরো অবসর সময় কাটছিল তার। চিঠির মালিকের কথা ভেবে মাথা নষ্ট হওয়ার উপক্রম। সারাক্ষণ ঐ লোক মন মস্তিষ্কে ঘুরে বেড়ায়। অথচ সে তার নাম অবধি জানে না। সামান্য কয়েকটা চিঠি পড়ে এমন বেহাল দশার কারণ খুঁজে পেল না আভিরা। আসলেই কী সামান্য? কারো হৃদয়ের অনুরক্তি যেথায় লেখা থাকে তা সামান্য হয় কী করে?
অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা। ভাবল কোনো কাজকর্ম নেই বিধায় এমন হচ্ছে। তাই নানা বাড়ি আসার জেদ ধরে। মেয়ের এমন আচরণে আনেসা কিছুটা অবাক হলো। কারণ মেয়ে তার কখনো এমন করে না। কোনোকিছু নিয়ে জেদ ধরা তো ভুলেও না। তবে হুট করে এমন করার কারণ কী? মাকে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাজি করায় আভিরা। কিন্তু বাবাকে নিয়ে চিন্তার শেষ নেই তার। বাবা যদি না করে দেয়। এ নিয়ে তার যত চিন্তা।
ছোটো থেকে মেয়েকে কোথাও একা ছাড়তে নারাজ। হোক না তা আপন নানা বাড়ি। আনেসাকে সাথে করে পাঠাবে। তবুও একা ছাড়বে না। মেয়ের প্রতি তার সর্বদা কড়া নজরদারি থাকে। যুগ তো ভালো না। মেয়েকে একা ছেড়ে দু দণ্ড শান্তি পাবেন না তিনি। অশান্তির চেয়ে বরং একা না ছাড়াই ভালো।
আভিরা ভাবছে এবারও যদি মাকে ছাড়া যেতে না দেয়। তার ছোটো ভাই তাযীমের পরীক্ষা চলছে। এ সময়ে মা মোটেও বাড়ি থেকে নড়বে না। তাহলে কী তার যাওয়া হবে না। তবে তাকে অবাক করে দিয়ে তোফায়েল আহমেদ রাজি হয়ে গেলেন। আভিরা তো পারে না খুশি হয়ে বাবার গালে দু চারটা চুমু খেতে। তবে তার খুশি খুব একটা টিকল না। এখানে আসার পর থেকে কেমন বিষণ্ণতা ঘিরে ধরেছে।
প্রথমে ভেবেছিল হয়তো বাবা মাকে ছেড়ে এসেছে বিধায় এমন লাগছে। কিন্তু পরে আসল কারণটা বুঝতে পারল। যার কথা ভাববে না বলে এত দূর ছুটে এলো সেই তার কথা ভেবে বিষণ্ণ সময় পার হচ্ছে।
আজ শুক্রবার। নিয়ম অনুযায়ী আজ চিঠি আসার কথা। অথচ সকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল, চিঠির কোনো খবর নেই।
সে যে বাড়ি নেই ঐ লোক তো আর জানে না।
চিঠি যদি তার বাড়ির কারো হাতে পড়ে তখন কী হবে? কী বিচ্ছিরি কাণ্ডটাই না ঘটবে! তার থেকে বড়ো কথা বাবার হাতে পড়লে তার রক্ষে নেই।
কথাগুলো ভেবে আভিরার হাত পা ঠান্ডা হয়ে এলো। এমন ভাবনা আগে কেন মাথায় এলো না। তাহলে ভুলেও বাড়ি থেকে বের হওয়ার কথা ভাবতে যেত না। এখন মনে হচ্ছে এখানে এসে সে মস্ত বড়ো ভুল করেছে।
দূর থেকে অস্পষ্টভাবে মোয়াজ্জিনের ক্ষীণ কণ্ঠ এসে কানে বাড়ি খেল। সন্ধ্যা নেমে এসেছে, ঐ তো উত্তপ্ত সূর্য হেলে আঁধারে মুখ লুকাচ্ছে। আস্তে ধীরে আজানের প্রতিটা ধ্বনি স্পষ্ট হতে শুরু করে। আভিরা অযাচিত ভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে সোজা কলপাড়ে চলে গেল।
_
আভিরাদের নানা বাড়ি একটু পুরোনো ধাঁচের। দুতালা বাড়ির চুন দিয়ে মাজা ঘষা করে রাখা দেয়ালের রঙ উঠে বিচ্ছিরি অবস্থা। স্টিলের জানালার কিছু অংশ ক্ষয় হয়ে গেছে কালক্রমে। এমন অবস্থা হওয়ার কারণও আছে। আভিরার তিন মামাই পরিবার সমেত শহরে থাকে। গ্রামের বাড়িতে তেমন একটা কেউ আসে না। দেখভাল করার মতোও কেউ নেই। তাই বাড়ির এ অবস্থা।
আভিরার নানি বৃদ্ধ মহিলা শহরের আবহাওয়ায় অতিষ্ঠ হয়ে মাস ছয়েক হলো গ্রামে এসেছে। সারা জীবন গ্রামে থেকে শহরে ওনার হাঁসফাঁস অবস্থা। আর তাছাড়া কয়েক মাস বাদে বাদে তাকে এ ছেলের বাড়ি থেকে ও ছেলের বাড়িতে যেতে হয়। ছেলের বউগুলোও যে তাকে খুব একটা পছন্দ করে না তাও বুঝতে পারেন তিনি। তাই শেষ সময়টা স্বামীর ভিটায় কাটিয়ে দেওয়ার জন্য ছুটে এসেছেন।
ছেলেদের বলে কইয়েও খুব একটা সুবিধা করতে পারলেন না। তাদের কথা শহরে যেহেতু তিন জনেরই নিজেদের বাড়ি আছে, তবে কেন শুধু শুধু মোটা টাকা খরচা করে আবার বাড়ির কাজে হাত দিবে। ঐখানে তো আর কারো যাওয়া হয় না। মায়ের বাড়াবাড়িতে তারা কিছুটা বিরক্ত।
আভিরা মাথায় ওড়না দিয়ে দোতলা বেয়ে নেমে সোজা কলপাড়ে চলে গেল। কলপাড়ের মেঝে খুব পিচ্ছিল। কোনোভাবে পা ফসকে পড়লে কোমর ভাঙবে নিশ্চিত। আভিরা পায়ের স্যান্ডেল জোড়া খুলে পা টিপে টিপে কলপাড়ে গেল। কলের হাতল চেপে পানি বের করতে বেশ বেগ পোহাতে হলো তাকে। অনেক দিন ধরে ব্যবহার না হওয়ার ফলে বেশ চাপ প্রয়োগ করতে হচ্ছে। ফর্সা হাতের তালুতে ইতোমধ্যে লাল ছোপ ছোপ দাগ বসে গিয়েছে।
_
নামাজ শেষে জায়নামাজ ভাঁজ করতে গিয়ে কিছু পড়ার শব্দে আভিরা ভ্রু কুঁচকে ফেলে। শব্দটা বারান্দা থেকে এসেছে। হাতের জায়নামাজ জায়গা মতো রেখে দ্রুত পা চালিয়ে বারান্দায় গেল। না তেমন কিছুই তো চোখে পড়ছে না। তাহলে শব্দ হলো কেন? রুমে আসতে নিলে হঠাৎ কিছু একটা চোখে পড়ায় আভিরার চলতি পা থেমে গেল।
দুরুদুরু বুকে সফেদ রঙা খামে থাকা কাগজের ভাঁজ খুলে পড়তে শুরু করল। সাদা কাগজে কালো কালি দিয়ে গোটা গোটা অক্ষরে কারো মনের অভিব্যক্তি লেখা। আজ যেন একটু বেশি লেখা তাতে। খুব ধৈর্য সহকারে লিখেছে বোধ হয়।
– আপনি বড্ড বোকা আঞ্জুম। নিজের অনুভূতি থেকে কেন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন? আপনাকে ক্ষণে ক্ষণে যা জ্বালাতন করছে, তা মেনে কেন নিচ্ছেন না? আপনি যত আমার থেকে দূরে সরে যাওয়ার চিন্তা করবেন নিজের অজান্তে তত বেশি কাছে আসবেন। আমি নিয়ে আসব আপনাকে। আমার ভয়ে এ বাড়ি ও বাড়ি যাওয়া বন্ধ করুন। নয়তো আপনাকে চিরতরে আমার খাঁচায় বন্দি করার ব্যবস্থা করব।
অদ্ভুত হলেও চিঠিতে কোনো প্রকার সম্বোধন বাচক শব্দ থাকে না। সম্বোধন ছাড়াই ব্যক্তিটা গোটা কয়েক লাইনের চিঠি লিখে পাঠিয়ে দেয়।

