প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন #পর্বসংখ্যা_২ #ফাতেমা_আক্তার_মাইশা

0
2

#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_২
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা

– আপা নিচে আহেন। নানি মা ডাকে আপনারে।

– তুই যা, আমি আসছি।

আভিরা হাতে থাকা চিঠিটা বালিশের নিচে রেখে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। নানিকে খাবারের টেবিলে বসে থাকতে দেখে তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে বলল,
– তুমি এ শরীর নিয়ে নিচে আসতে গেলে কেন? জোনাকিকে বললেই তো তোমার রুমে খাবার নিয়ে যেত।

ভদ্রমহিলা কিছুটা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। বয়সকালে এমন ভার শরীরের কারণে চলনে ফিরনে কিছুটা অসুবিধা হয়। সাথে কোমরে মারাত্মক ব্যথা।

– ছয় মাস ধরে তো উপরে একা একা খাবার খাই। একা খেতে ভালো লাগে না বুঝলি। তুই যে কদিন আছিস সে কদিন তোর সাথেই খাব।

কথাটা বলে সামান্য হাসার চেষ্টা করল আতিয়া খানম।
প্রাণহীন, নির্জীব হাসি। ভিতরে থাকা হাহাকার যেন বুক চিরে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে। চোখ যেন সে হাহাকারের বাস্তব প্রতিচ্ছবি।

আভিরা ভেবে পায় না তার মামারা বৃদ্ধ মায়ের দায়িত্ব চৌদ্দ বছরের একটা মেয়ের কাছে ধরিয়ে এত নিশ্চিন্তে কি করে থাকতে পারে। মায়ের জন্য কি তাদের একটুও চিন্তা হয় না। একা একটা বাড়িতে কী করে থাকছে, কী খাচ্ছে, কী করছে সে খোঁজ নেওয়ার দরকার মনে করে না। মা কী তাদের বোঝা হয়ে গেল? যা ঝেড়ে ফেলে নিজেরা শান্তিতে আছে।

আনেসা কত করে বলল,
– মা তোমার একা একা এ বাড়িতে থাকতে হবে না। তুমি পারবে না থাকতে। আমার বাড়ি এসে আমার সাথে থাকবে।

আতিয়া খানম তখন রয়েসয়ে বলেছিল,
– তিন ছেলে থাকতে মেয়ের শ্বশুর বাড়ি গিয়ে থাকব। লোকে কী বলবে বল। আর তাছাড়া শেষ সময়টা আমি আমার স্বামীর ভিটায় থাকতে চাই। আমায় আর জোর করিস না।

আনেসা হার মানে মায়ের কথায়। অবশ্য বিষয়টা দৃষ্টিকটু।
আমাদের সমাজের মানুষ এসব বিষয় নিয়ে ভালোই মাতামাতি করতে জানে। এ নিয়ে ঠেস দিয়ে কথা বলতে ছাড়বে না। পান থেকে চুন খসলেই বলে উঠবে এত ত্যাগ স্বীকার করে যে ছেলে মানুষ করলে আতিয়া, তা তারা কী করল শুনি? মেয়ের ঘাড়ে তোমার দায়িত্ব চাপিয়ে নিজেরা বউ বাচ্চা নিয়ে দিব্যি শহরে পড়ে আছে। তোমাকে রাখার দায় নেই কারো। এই দিন দেখার জন্য এত ত্যাগ স্বীকার করলে। এখন কী মেয়ের ঘাড়ে বসে খাবে?

এসব কথা শোনার চেয়ে বরং থাক না মা এখানে। যেখানে যেভাবে থেকে শান্তি পায় সেখানে সেভাবে থাকতে দেওয়া উচিত। কিছু মাস যেতে মাকে নিজের কাছে নিয়ে রাখবে। তখন মায়ের কোনো কথা তিনি শুনবেন না। লোক সমাজের পরোয়া তিনি করেন না। কোনোকালেই করেনি।‌ যেখানে মায়ের প্রসঙ্গ আসছে সেখানে তো আরও করবে না। মাকে নিজের কাছেই রাখবে।

আভিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মামাদের উপর রাগ হলো তার।
মেয়েরা কেন বাবা মায়ের দায়িত্ব নিতে পারে না। এই যে
ছেলেরা শেষ বয়সে এসে বাবা মাকে বোঝা মনে করে, সমাজ কেন তাদের কিছু বলতে যায় না। ঘুরেফিরে কেন বাবা মায়ের শিক্ষায় আঙুল তোলা হয়? এটা কেন বলা হয় যে তারা সন্তান মানুষ করতে পারেনি। অথচ এ সন্তান মানুষ করতে গিয়ে তারা হাড় মাংস এক করে ফেলে। সে সন্তান যদি মানুষ না হয় এতে বাবা মায়ের দোষটা কোথায়?

আভিরা তো কোনো দোষ খুঁজে পায় না। আজ যদি তার মায়ের বিয়ে না হতো তাহলে আতিয়া খানমকে একা থাকতে হতো না। মেয়ে থাকত তার সাথে। সমাজের মানুষ এসে তখন তাকে বলবে না যে ছেলেরা থাকতে মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে থাকো কেন? এ প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হতো না তাকে।

আভিরা নিজের বাবা মায়ের কথা ভাবছে। সে কখনো বাবা মাকে ফেলে কোথাও যাবে না। বিয়ে, মেয়ের শ্বশুর বাড়ি এ তকমা নিজের গায়ে লাগাবে না। দরকার হলে সে বিয়ে করবে না।

_

আভিরার চোখে ঘুম নেই। এক ঘণ্টা হয়ে যাবে সে এভাবে বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছে। কয়টা বাজে কে জানে? তবে খুব একটা রাত হয়নি। গ্রাম এলাকায় এশার আজান দিলে মানুষজন ঘুমে বিভোর হয়ে যায়।
আভিরার একটাই সমস্যা। জায়গা নড়লে তার সহজে ঘুম আসে না। ঘুমে চোখ মুদে আসছে। তবুও ঘুমাতে পারছে না মেয়েটা। কয়েক রাত ধরে এমন হচ্ছে। সে ঠিকমতো ঘুমাতে পারছে না। কেন যে এখানে আসতে গেল। আসার জ্বালা হারে হারে টের পাচ্ছে। আভিরা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে সে
আর কখনো বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাবে না। বাড়ির মতো শান্তি কোথাও নেই। শান্তি মতো ঘুমানোর জন্য হলেও তাকে বাড়ি ছাড়া হওয়া চলবে না। নয়তো দেখা যাবে নিশাচরের ন্যায় জেগে থাকতে হচ্ছে।

আভিরা গায়ে শাল পেঁচিয়ে উঠে দাঁড়াল। বিছানায় পড়ে ছটফট করার চেয়ে একটু হাঁটাহাঁটি করা ভালো। ফ্লোরে পা রাখতে ঠান্ডায় পা জমে গেল। পুরো ফ্লোর বরফের ন্যায় ঠান্ডা হয়ে আছে। শীতের প্রকোপ বেড়েছে। গ্রাম এলাকায় শীতটা যেন বেশিই টের পাওয়া যায়। অথচ শহরে অত বেশি শীতের প্রকোপ পড়ে না। পড়লেও খুব একটা বুঝা যায় না।

আভিরা বারান্দায় গিয়ে দোলনায় পা গুটিয়ে শুয়ে পড়ে। তার দৃষ্টি কোথায় নিবদ্ধ বুঝা দায়। ঠান্ডা লাগছে। এ চাদরে তার হবে না। লেপের নিচে ঢুকতে হবে। তবে এখন উঠে বিছানায় যেতে ইচ্ছে করছে না। মেয়েটা আবার এসব কাজে বড্ড অলস। সারা শরীরে যেন আলসেমি জেঁকে ধরে।

আভিরা রাস্তায় নজর দিল। বাড়ির বাইরে লাগোয়া বাল্বের আলোতে রাস্তার একাংশ দেখা যাচ্ছে। আভিরার নানা বাড়ি একদম কাঁচা রাস্তার পাশ ঘেঁষে। কাঁচা রাস্তা বলতে ইট, সিমেন্টের প্রলেপ দেওয়া নেই। সোজা বাংলা ভাষায় মাটির রাস্তা। পথচারীদের চলাফেরার সুবিধার্থে একটা লো বোল্টেজের বাল্ব লাগানো হয়েছে। সেই বাল্বের আলোতে একটা অস্পষ্ট অবয়ব পরিলক্ষিত হলো আভিরার চোখে। যদিও ঠিকভাবে দেখা যাচ্ছে না। তবে আবছা আলোয় এতটুকু ঠাহর করতে পারল এটা কোনো পুরুষালি অবয়ব।
এ রাতের আঁধারে কে দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা। তবে নজর আভিরাতে। আভিরা ভয় পেল। এদিকটা তো কাঁচা রাস্তা। গাঁয়ের লোকেরা সকালে টাটকা শাকসবজি বেচতে এ পথ দিয়ে হাটে যায়। এ রাস্তায় গাড়ি আসে না খুব একটা। আর রাতের বেলায় তো ভুলেও না। তাহলে এত রাতে কেউ গাড়ি চালিয়ে এখানে কেন এসেছে? আর এলেই বা দাঁড়িয়ে কেন আছে? আর তার বাড়ির সামনেই বা কেন? আর দৃষ্টিই বা কেন তাতে নিবদ্ধ! লোকটার উদ্দেশ্য কী?
আভিরা ভয়ে ঘরে ছুট লাগায়। কলিজা কাঁপছে, হৃৎস্পন্দন বেড়ে দ্বিগুণ, হাত পা অবশ হয়ে আসছে। লেপ দিয়ে পুরো পা থেকে মাথা অবধি ঢেকে নিলেও শরীরের কাঁপন কমার নয়।

আভিরা ভিতরে যেতে লোকটার মুখে মৃদু হাসির দেখা মিলে। নিকষ কালো আঁধারে তা আবার মিলিয়েও যায়। গাড়ি ঘুরিয়ে নিজ গন্তব্যে ছুটে গেল।

_

– তুমি এসেছ?

– তোমায় কতবার বলেছি লাবণ্য, আমার আসতে দেরি হলে রাত জেগে না থেকে ঘুমিয়ে যেতে। তবে এখনও জেগে আছো কেন?

– আমি ঘুমালে তোমায় খাবার কে বেড়ে দেবে। তুমি তো নিজে নিয়ে কখনো খাবে না। তাই খালা বলল তোমার জন্য অপেক্ষা করতে।

– মা বললে তোমার শুনতে হবে। এরপর থেকে আর রাত জাগতে হবে না। টেবিলে খাবার সাজিয়ে রেখে ঘুমিয়ে যাবে। ঠিক আছে?

লাবণ্য উত্তর করল না। সামনে বসে থাকা মানুষটার কথা তার পছন্দ হয়নি।

মানুষটা কেন বুঝে না তার জন্য রাত জেগে অপেক্ষা করতে তার ভালো লাগে। খালা তাকে জেগে থাকতে বলে বললে ভুল হবে। সে ইচ্ছে করেই জেগে থাকে। সে তো এভাবে রাত জেগে ভবিষ্যৎ এ তার জন্য অপেক্ষা করবে। এই যে এখন কড়া গলায় তাকে মানা করছে। তখন মানা করলে লাবণ্য মোটেও শুনবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here