#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৪২
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
– খেয়েছেন?
– না, খাওয়া হয়নি।
– কেন?
– খাব এখন। তুমি খেয়েছ?
– না।
– কখন খাবে? সময় তো কম হলো না। এতক্ষণ অবধি না খেয়ে আছো কেন?
– আজ বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে গেল।
হঠাৎ জিদানের মুখাবয়ব কিছুটা কঠিন হয়ে আসে।
– দেরি কেন হয়েছে? কোথায় ছিলে?
– কোথায় থাকব, কলেজে ছিলাম।
– তবে দেরি হলো কেন?
– অন্যদিন তো তিনটে, চারটে ক্লাস করেই বাড়ি চলে আসি। আজ সবগুলো ক্লাস করতে হয়েছে। দারোয়ান চাচা বের হতে দেয়নি। নয়তো এত সময় অবধি কলেজে থাকার মেয়ে আমি না।
– তাহলে তুমি কলেজ পালিয়ে যাওয়া মেয়ে?
কণ্ঠ না শুনে, মানুষকে সামনাসামনি না দেখে তাদের মুখের ভাব ভঙ্গিমা বোঝার সাধ্যি কারো নেই। তবে অনেক সময় না দেখে, না শুনে অপর প্রান্তের ব্যক্তির অভিব্যক্তি বুঝা সম্ভব।
এই যে এখন সাথে সাথে রিপ্লাই আসেনি। এক মিনিট পার হলো বলে। অথচ এখনও টাইপিং করতে দেখা যাচ্ছে। কি এত লিখছে। তার এ সামান্য প্রশ্নের জবাব দেওয়ার জন্য তো এত সময় লাগার কথা না।
– আমি কলেজ পালানো মেয়ে না।
জিদান এমন জবাবে ঠোঁট বেঁকাল।
– এই কথা লিখতে এত সময় লাগল?
ওপাশের মানুষটা যেন এ কথায় বেশ বিপাকে পড়ে। জবাবে কী বলবে ঠিক বুঝে এলো না। সে তো কলেজ পালায় না। ক্লাস করে না এ কথা সত্য। সবগুলো ক্লাস তার কোনোকালে করা হয় না। প্রতিদিন একটা দুটো করে ক্লাস বাদ পড়বেই। সুযোগ পেলেই পুরো দল নিয়ে বাড়ির দিকে দৌড়। তবে সে রোজ রোজ স্বইচ্ছেই এমন করে না। সাথের সবাই ক্লাস শুরু হতেই খুঁচিয়ে যাবে, আজ তিনটা ক্লাস করেই বাড়ি যাব। লাঞ্চ টাইমে ফুচকা খেতে গিয়েই দৌড় লাগায়। আজ এখানে কাল ওখানে যাওয়ার নাম করে সব ক্লাস আর করা হয় না। এদের এই খোঁচাখুঁচির জ্বালায় সে ঠিকমতো ক্লাসে মন দিতে পারে না। কোনোদিন যেতে না চাইলে ধরে বেঁধে নিয়ে যাবে তাকে। তারা একা কেন যাবে, গেলে ওকেও সাথে করে নিয়ে যাবে। এসবের জন্য প্রিন্সিপালের কাছে বেশ নালিশ গিয়েছে তাদের নামে। তবে সে নালিশ কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে বাড়ি অবধি যায়নি। বাড়ি গেলে তার কলেজ থেকে সময় অসময়ে বাড়ি যাওয়া বের করত। তার উপরে বাড়ির সকলের নজরদারিতে থাকে সে। পরিবারের ছোটো মেয়ে বিধায় বাবা চাচাদের আদরেরও। সবকিছুতে ছাড় দিলেও এ ক্ষেত্রে ছাড় নেই। তাদের বাড়িতে পড়ালেখা নিয়ে বেশ জোরদার বিধিনিষেধ রয়েছে। আর এ বিধিনিষেধ সকলকে মান্য করে চলতে হয়। কলেজে তার যত বাঁদরামি। কিন্তু বাড়িতে এসব চলে না একেবারেই। বাড়ির লক্ষ্মী মেয়ে সে। বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে যা একটু অকাজ করে। তাছাড়া সে তো ক্লাস ফাঁকি দেয়, এটাকে কী কলেজ পালানো বলে।
এখন তো কলেজেও নিয়মের বেড়াজালে আটকা পড়েছে। কয়েক দিন বাদে পরীক্ষা তাদের। সেজন্য বেশ কড়াকড়ি নিয়ম করা হয়েছে। ক্লাস শেষ না হওয়ার আগে কেউ বাড়ি যেতে পারবে না। তাই আজ বের হতে গেলে দারোয়ান বের হতে দেয়নি।
ক্লাস শেষ করে আসতে আসতে তিনটা বেজেছে। এসে খাবে কখন, একপ্রকার তাড়াহুড়ো করে মোবাইল হাতে নেয়। তার গায়ে এখনও কলেজ ড্রেস, খোলা হয়নি। এসেই তো ফোন হাতে নিল। মেয়েটা হুট করে অফলাইনে চলে যায়। এখন রিপ্লাই দেওয়া মানে তোপের মুখে পড়া। তার এখন এত কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।
_
ব্যস্ত হাতে টাইপিং করতে থাকা জিদানকে সকলে দেখে চলেছে। তার পুরো অভিনিবেশ মোবাইলে, দৃষ্টিও যেন সেখানে নিবদ্ধ। তাদের এত এত প্রশ্নের জবাব দেওয়ার কোনো তাগিদ দেখা গেল না তার মাঝে। জিদানকে এমন নিরুত্তর দেখে সাথের সকলে বুঝল এ ছেলের মুখ দিয়ে এ নিয়ে আর একটা শব্দও বের হবে না। ঐ মেয়ের নাম, পরিচয় তো বহু দূর। জিদান না বললেই কী? তারা একবার যখন ইঙ্গিত পেয়েছে ঐ মেয়ে কে তা জেনে তবেই ছাড়বে। শুধু মেয়ে কে তা কেন, মেয়ের ঠিকুজি গোষ্ঠী সব জেনে দম নিবে। তারা আর এ নিয়ে কিছু জানতে চাইল না। টেবিলে চাপড় মেরে বলল,
– মামা ছয় কাপ চা দাও তো। আর সাথে বিস্কুট দিবে। ঐ দশ টাকা দামের বিস্কুট দিও না। টোস্ট বিস্কুট দিও। ঐ দশ টাকার বিস্কুটে আমাদের পোষায় না। এক চোবানিতে শালার বিস্কুট গলে এক্কেরে চায়ের লগে মিশ্শা যা। পরে বিস্কুটের গুঁড়াও খুঁইজা পাওন যা না। এই জিদান তুই টোস্ট খাবি তো?
– খাব।
– মামা দুইটা বিড়িও দিও। টান দিতে মন চাইতাছে।
জিদান মোবাইল থেকে চোখ সরিয়ে বলল,
– এখানে সিগারেট ধরাবি না।
– এখানে ধরাম না, ঐদিকে গিয়া খামু। দেখি মামা সিগারেট দাও তো। চা বানানো হইতে হইতে একটা টান দিয়া আসি।
– তোমার বাকির খাতা যে জইমা আছে আব্দুল্লাহ। ঐ টাকা আগে দাও। পরে সিগারেট খাইতে পারবা নে।
আব্দুল্লাহ টেবিল ছেড়ে উঠে বড়ো বড়ো কদম ফেলে একেবারে বশিরের সামনে গিয়ে থামে। সামান্য ঝুঁকে হাত বাড়িয়ে সিগারেট নিয়ে বলল,
– টাকার চিন্তা করতে হইব না। ওটা জিদান দেইখা নিব। এসব টাকার হিসাব আমার লগে নিতা আয়বা না।
বশির নাক মুখ কুঁচকায়। চায়ের কাপে টুং টাক করতে থাকা চামচের শব্দ থামে। বিরক্ত নিয়ে চাইল অদূরে ধোঁয়া উড়াতে থাকা আব্দুল্লাহর দিকে। গায়ে একটা চেক শার্ট, শার্টের হাতাও ঠিকমতো গুটানো নেই। এলোমেলো ভাঁজ দেওয়া। শার্টের কলার সামান্য উঁচুতে তোলা। অনেক দিন ধরে হয়তো চুল কাটা হয় না। কেমন বেসাইজ হয়ে কাঁধে পড়ে রয়েছে।
ছন্নছাড়া বাউন্ডুলে ছেলে। সারাক্ষণ রাস্তায় এ মাথা থেকে ও মাথা চক্কর কাটবে। কাম কাজের খবর নেই। কিন্তু সঙ্গ জুটিয়েছে ভালো ঘরের পোলাপাইনের লগে। নিজে তো বখে গেছেই, এখন এই ছেলেগুলোও ওর দেখাদেখি উচ্ছন্নে যাচ্ছে। বশির আব্দুল্লাহর থেকে নজর সরিয়ে সামনে বসা ছেলেগুলোর দিকে তাকাল। একেকজনের হাতে চা দিতে দিতে বললেন,
– ওর লগে চলো কেন তোমরা? বখাটে একটা। সারাদিন সিগারেট টানব। ঘরে বাপ অসুস্থ, বইন দুইডা বিয়ার বাকি। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে না নিয়ে এ পোলা সারাক্ষণ পায়ের উপর পা তুইলা খায়।
– ও পায়ের উপর পা তুলে খায় না পা নামিয়ে খায়, তা আপনি জানেন?
হঠাৎ জিদানের এমন প্রত্যুত্তরে বশির ভ্যাবাচ্যাকা খেল। এ কেমন কথা। এমনভাবে জবাব দেওয়ার কী মানে। জিদানের এমন জবাবেই যেন তিনি বুঝলেন তার কথা যে কেউ গায়ে মাখেনি। কী যাদু টোনা করে সবগুলোরে বশে আনছে কে জানে। এই পোলার নামে কেউ ভালো মন্দ কিছু কয়লেই সবগুলা ক্ষেইপা যাইব। তবে জিদান ছেলেটারে ভালো ভেবেছিলেন তিনি। প্রতিদিন আসবে। তার হাতের চা খেয়ে সকলের সাথে আড্ডা দিয়েই চলে যাবে। প্রয়োজন ছাড়া কোনো কথা বলে না। কিন্তু এ দেখছি সবার থেকে বেশি উগ্র মেজাজের।
বশির কিছুটা কেশে বলল,
– তোমরা তো ভালো ঘরের ছেলেপেলে। অমন বখাটের সাথে কেন চলো, তাই জানতে চাইলাম আরকি।
– বখাটে বলেই চলি।
তারপর জিদান আঙুল উঁচিয়ে বশিরকে দেখিয়ে বলল,
– ঐ টেবিলের শেষ মাথায় বসে থাকা ছেলেটাকে দেখছেন তো? ওর নাম শান্ত। যেমন নাম ছেলেটাও তেমন শান্ত মেজাজের। একবার ক্লাসের এক ছেলের সাথে সামান্য একটা বিষয়ে কথা কাটাকাটি হয়। কথা কাটাকাটি থেকে হাতাহাতি শুরু হয়ে যায় একেবারে। এই ছেলেকে দেখে মনে হয় কোথাও লাগলে ও মারামারি করে আসতে পারবে। মার খেয়ে আধমরা হয়ে পড়েছিল। আমরা কেউ ছিলাম না সেদিন। তারপর আপনি যাকে বখাটে বলে যাচ্ছেন ঐ আব্দুল্লাহ ওকে হসপিটালে নেয়। নয়তো আপনার দোকানে চা খাওয়ার জন্য দুনিয়ায় থাকত না এ ছেলে।
ওর মতো বখাটের কোনো দায় ছিল না মাঝ রাস্তায় পড়ে থাকা ছেলেটাকে হসপিটাল অবধি নিয়ে যাওয়া। রাস্তায় তো কত মানুষ ছিল। একা একটা ছেলেকে যখন তিন চারটা ছেলে মিলে মারধর করছিল তারা কেউ বাধা অবধি দেয়নি। মরে পড়ে থাকলে কেউ ধরতেও যেত না বোধ হয়।
বিবেক, মনুষ্যত্ব বুঝেন তো? ঐ বখাটের বিবেক আছে। যা রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখতে থাকা মানুষগুলোর ছিল না।
বারবার বখাটে শব্দটা বলার কারণ বশির বুঝল। সে যে আব্দুল্লাহকে বখাটে বলেছে এটা কারো পছন্দ হয়নি। সেজন্য বখাটে বলে চলেছে। উনি আর কিছু বললেন না। চা দিয়ে গিয়ে বসলেন নিজের জায়গায়, মন দিলেন কাজে। এদের কিছু বলে লাভ নেই। এরা তার কথা কানে নিবে না।
আব্দুল্লাহকে তিনি চিনেন বছরখানেক হবে। তারা যে কলোনিতে থাকেন সেই কলোনিতেই দুটো টিনের ঘর ভাড়া নিয়ে থাকে ওর পরিবার। ছেলেটা ইন্টার অবধি পড়ে আর ভার্সিটির পা মাড়ায়নি। ওর বড়ো দুটো বোন আছে। বোন দুটোই বিয়ের উপযোগী। বড়োটা প্রাইমারি স্কুলে চাকরি করে আর মেজো যে সে এমনি টুকটাক সেলাইয়ের কাজ করে। কাঁথা বানায়, কাপড় সেলাই করে। সেলাইয়ে বেশ দক্ষ। এই দুটো মেয়ে যা আয় রোজগার করে তা দিয়েই টেনেটুনে কোনোরকম সংসার চলে। আর এ দামড়া গোছের ছেলে বোনদের টাকায় বসে বসে গিলবে। এর নাকি বিবেক আছে। বিবেক থাকলে কেউ এমনভাবে চলাফেরা করে। বাপ যে বিছানায় পড়ে আছে সেই চিন্তা অবধি নেই। চিন্তা থাকলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সুখ টান না দিয়ে হন্যে হয়ে কাজের খোঁজে বেরিয়ে যেত।
শুরু থেকেই আব্দুল্লাহর এমন বেশভূষা বশিরের পছন্দ না। তবে তিনি কিছু বলতে যেতেন না। এ ছেলে কেমন করে চলাফেরা করে তা দেখে লাভ নেই। ছেলেটা তার দোকান ছাড়া অন্য কোনো দোকানে বসে না। এতে তারই লাভ। নাস্তা পানি সবই তো তার দোকান থেকে খায়। কিছু বলতে গেলে যদি তার দোকানে আর না আসে। যা দুটো টাকা পাওয়া যায় তাও হাতছাড়া হয়ে যাবে। নিজের লস হোক কে ই বা চায়।
রোজ দু বার করে বিড়ি আর চা খাবে। ভাত না খেলেও চা আর বিড়ি তাকে টানতেই হবে। কয়েক মাস যেতে বাকির খাতা খুলে। মাস গেলে পাঁচশ ছয়শ যত টাকা আসে ঐ হিসাব শেষ করে নতুন করে আবার বাকি খাওন শুরু করে। দুই তিন মাস পর থেকে মাস শেষ হলেও টাকা দেয় না। টাকার অভাব। টাকার অভাব হয়লে তুই এত ফুটানি করে কেন চলস। টাকা কামা এরপর ঐ টাকায় বিড়ি কেন, মদ গিলে পড়ে থাকলেও কেউ কিছু বলতে যাবে না। তার ঘরেও একটা ছেলে আছে। সংসারের অভাব অনটন দেখে তার সতেরো বছরের ছেলে পড়াশোনার পাশাপাশি ছোটোখাটো কাজও করে বেড়ায়। কই তার ছেলে তো অমন উশৃঙ্খলের মতো চলে না।
এই ছেলেগুলোকে নিয়ে তার দোকানে বসে মাস দেড়েক হবে। পোশাক আশাক, কথাবার্তা, চালচলনেই বলা যাবে এরা কত বড়োলোক বাপের পোলাপাইন। আর বস্তির পোলারে নিয়া কথা কওয়াতে সবগুলো জ্বলে উঠল। এত দরদ কেন থাকব এসব রাস্তার ছেলের জন্য। একটা পোলারে রাস্তাত্তে তুইলা হাসপাতালেই তো নিছে। এর জন্য এক্কেবারে দরদ উথলে পড়ছে।
_
– নিন পানি খান। বেশি ঝাল হয়েছে কী?
আভিরা ঝালে মুখ হা করে বারবার শ্বাস ফেলে। নেত্র পল্লব তার অশ্রু ভেজা। কোনোমতে গ্লাস হাতে নিয়ে কয়েক ঢোক পানি গিলে। ঝালের তোড়ে জিভ গলিয়ে একটা শব্দও বের হলো না। নাওয়াজ ভাতের প্লেট থেকে এক লোকমা মুখে দিতেই বুঝল আজ অন্যদিনের তুলনায় ঝালের পরিমাণ অত্যধিক। এত ঝাল দেওয়ার কারণ বুঝে এলো না নাওয়াজের। তরকারিতে এত ঝাল কখনো দেওয়া হয় না। এত বেশি ঝালের দরুনই মেয়েটার মুখ জ্বলছে।
নাওয়াজ গলার স্বর বাড়িয়ে ডাকল,
– লাবণ্য একটু রুমে এসো তো।
লাবণ্য এলো মিনিট পাঁচেক পর। তার হাতে সাবানের ফেনা লেগে রয়েছে। মেয়েটা বালতিতে এক গাদা কাপড় ভিজিয়েছে ধুয়ে দিবে বলে। তিন-চার দিনের কাপড় জমে আছে। ধোয়া হয়নি। সারা বছর বই নিয়ে খুব একটা না বসলেও পরীক্ষার এ সময়টা সে পড়ার বাইরে অন্য কোনো কাজে হাত দিবে না। সেজন্য কাপড়গুলো ধোয়া হয়নি। আজ সময় পেয়েই ভিজিয়েছে। নাওয়াজের ডাক শুনেই ছুটে এলো।
– তরকারি আজ এত ঝাল হলো যে? উনি ঝাল খেতে পারেন না খুব একটা, তা তো জানোই। ঝালে কী অবস্থা দেখো।
লাবণ্য চেয়ে দেখল ঝালে আভিরার চোখ মুখের বেহাল অবস্থা। একটু সময় বাদে বাদেই পানি গিলছে। সেদিক থেকে নজর সরিয়ে বলল,
– আমার খেয়াল ছিল না। এত বেশি ঝাল কীভাবে হলো জানি না।
খেয়াল ছিল না আবার কেমন কথা। এমন জবাবে নাওয়াজের মেজাজ বিগড়ায়। তবে সে কিছু বলে না।
– মিষ্টি জাতীয় কিছু এনে দাও ওনাকে।
আভিরা খেয়াল করল নাওয়াজ আজকাল লাবণ্যর সাথে কেমন গম্ভীর হয়ে কথা বলে। লাবণ্যও তেমন।
– দেখি দইটুকু মুখে দিন।
– না।
– কেন?
– ইয়াক টক।
নাওয়াজ এমন কথায় হেসে ওঠে।
– অল্প একটু মুখে দিন। ঝাল লাগবে না আর। এটা মা বানিয়েছে। অত টক না, মুখে দিয়ে দেখুন।
_
– মুখ জ্বলছে আর?
– না।
– দেখুন তো বেণী ঠিকঠাক বেঁধে দিতে পেরেছি কি না?
আভিরা চুলের গোছা পেছন থেকে সামনে এনে ধরতে হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইল। এত নিখুঁত করে চুলে বেণী বাঁধতে সেও পারে না। মেয়েটা একরাশ বিস্ময় নিয়ে বলল,
– আপনি এত সুন্দর করে চুল বাঁধতে পারেন কীভাবে?
– এর আগেও বহুবার বাঁধা হয়েছে।
আভিরা তড়িৎ গতিতে পিছনে ফিরে চায়। নাওয়াজের সামনে বসে সন্দিহান ক্রোধিত স্বরে জানতে চাইল,
– কোন মেয়ের চুল বেঁধে দিয়েছেন আপনি?
নাওয়াজ ফিচেল হাসে। মেয়েটাকে টেনে নিজের কাছে এনে বলল,
– নাওয়াজ ইয়াজিদ তার মা, বউ ছাড়া অন্য কোনো নারীর চুলে হাত দেয়নি।
আভিরা লজ্জা পেল প্রশ্ন করেই। হুট করে ঐ কথা শুনে রাগের মাথায় প্রশ্ন করে বসে। সে তো জানে এ লোক কেমন। তবে শাশুড়ি মায়ের কথা শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
_
নাওয়াজের অমন প্রখর দৃষ্টিতে আভিরা হিমশিম খাচ্ছে কেমন। কিছু বলতে গিয়েও অমন দৃষ্টিতে মেয়েটার কণ্ঠনালী বুজে আসে। অমন শানিত চাহনিতে কেউ তাকায়।
– কী বলবেন আঞ্জুম? জলদি বলুন। আমার বের হতে হবে।
আভিরা জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজায়।
– আব্, বলছিলাম কী…
– আপনি কবে থেকে কথা বলতে গিয়ে তোতলান?
আভিরা বুঝতে না পেরে বলল,
– মানে?
– কথা আটকে আসছে কেন?
আভিরা আবার আমতা আমতা করে। কী করে কথাটা তুলবে। আজ সকালে বর্ণা এসে শপিং এ যাওয়ার কথা বলল। তাকেও সাথে নিবে। নাওয়াজকে যেন বলে এ কথা। বর্ণা বললে রাজি হবে না কোনোকালে। তাই আভিরাকে বলল বলতে। আভিরা তাদের সাথে যেতে চায় এ কথা শুনে মানা করবে না নিশ্চয়। এ কথা নাওয়াজকে বলতে আভিরার কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু তার এ অবস্থায় লোকটা যেতে দিলে তো।
– ওই বর্ণা আপু…
– বর্ণা কী?
– আপু বলছিল বিকেলে শপিং করতে যাবে।
– তো এ কথা আমাকে বলছেন কেন?
– আমাকে বলল আপুর সাথে যেন যাই।
– আপনার তো ওদের সাথে কোনো কাজ দেখছি না। শপিং তো করবেন না। কিছু লাগলে আমায় বলুন আসার সময় নিয়ে আসব।
– কিছু লাগবে না।
– তাহলে তো ওদের সাথে যাওয়ার কোনো কারণ দেখছি না।
আভিরা মিনমিন করে বলল,
– সারাক্ষণ বাড়িতে থাকতে আমার ভালো লাগে না।
– ওহ। এ জন্য যেতে চাইছেন। বাহিরে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমি আছি, নিয়ে যাব আপনাকে। ওদের সাথে যেতে হবে না।
– আপনার সাথে যাব কী করে?
– কেন আমার সাথে বের হতে সমস্যা?
– সমস্যা হবে কেন, আপনার সময় আছে? আপনি তো সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকেন।
– সময় বের করা যাবে। কবে যাবেন বলুন?
মেয়েটা হুট করে বলে উঠল,
– আমি আপনার সাথে যাব না। আপুদের সাথে যাব।
এমন কথায় নাওয়াজ ভ্রু কুঁচকায়। এ মেয়ে এত কথা তো বলে না। আবার বলছে তার সাথে যাবে না। দু পা এগিয়ে এসে মেয়েটার থুতনি ধরে আনত মুখশ্রী কিছুটা উপরে তোলে। চোখে চোখ পড়ে দুজনের।
– আমার তোতা পাখি আজ এত বুলি আওড়াচ্ছে কেন? কে শিখিয়ে দিয়েছে?
আভিরা ঐ চোখে চোখ রেখেই বলল,
– কেউ শিখিয়ে দেয়নি।
– তাহলে মুখে বুলি ফুটেছে কেন? আগে তো বোবা পাখি হয়ে ছিলেন, এখন তোতা পাখি হলেন কী করে? কার শিখিয়ে দেওয়া বুলি আওড়িয়ে যাচ্ছেন?
– বললাম তো কেউ শিখিয়ে দেয়নি।
– তাহলে এত কথা বলছেন কী করে?
আভিরা প্রত্যুত্তর করে না। চোখও ফেরায় না, তাকিয়েই রইল। নাওয়াজ মুখ নামিয়ে দৃঢ় চিত্তে বলল,
– নজর ফেরান। এভাবে তাকিয়ে থাকবেন না। পরে কিছু করে বসলে আমায় দোষ দেবেন। অথচ উল্টা পাল্টা কাজের জন্য আমাকে বাধ্য করছেন আপনি।

