প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন #পর্বসংখ্যা_৪৮

0
2

#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৪৮
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা

সকাল হতেই আভিরা ব্যস্ত হাতে কাজ করে চলেছে। লাবণ্য নেই বাড়িতে। মাহিরাদের বাড়িতে গিয়েছে। তার শাশুড়িও গিয়েছে সেখানে।‌ পুরো বাড়িতে সে আর নাওয়াজ রয়েছে আপাতত। সন্ধ্যার পর তারাও যাবে ও বাড়ি। আভিরা লুচিগুলো ভেজে তুলে নিন। গরম গরম ফুলকো ফুলকো লুচির সাথে আলুর দম। আলুর দম হয়ে আসতে খানিকটা গরম মশলা ছিটিয়ে দেয় তাতে। এর মাঝে নাওয়াজের ডাক কানে এলো। ঐ লোক ঘুম থেকে উঠে গিয়েছে তবে। নাওয়াজ আবার ডাকতেই হাতের কাজ ফেলে দৌড়ে রুমে গেল। রুমে যেতেই দেখল লোকটা এখনও বিছানা থেকে ওঠেনি। মাথা হেলিয়ে দরজার দিকে মুখ করে কিছুটা উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। আভিরা গুটিগুটি পায়ে খাটের ধারে গিয়ে দাঁড়ায়।

– কাছে আসুন।

আভিরা কিছুটা ঝুঁকে এলো। এ লোকের কথার মানে বুঝতে অসুবিধা হয় না আজকাল। না বলতেই বুঝে যায়‌ লোকটা ঠিক কী বুঝাতে চেয়েছে। যেন তার জন্য এই লোকের একটুখানি ইশারায় যথেষ্ট। নাওয়াজ ওড়নায় হাত দিতেই কলিজা ছলকে উঠে আভিরার। বিস্ফোরিত চোখে চাইল নাওয়াজের দিকে। ঐ লোকের কোনো হেলদোল নেই। এতে যেন আভিরা আরও মিইয়ে যায়। দু হাতে ওড়না আঁকড়ে কম্পিত গলায় কোনোরকম বলল,
– ছাড়ুন।

নাওয়াজ ছাড়ে না। শক্ত হাতে ওড়না মুঠোয় নিয়ে মেয়েটার গলার ধারে লেগে থাকা আটার গুঁড়ো মুছে দেয়। আভিরা হতভম্ব হয়ে দেখে গেল তা। মেয়েটা নিজের ভাবনায় নিজেই লজ্জা পেল যেন। তড়িঘড়ি করে চোখ ফেরায়। খানিকক্ষণ নীরব থেকে মিনমিন করে বলল,
– খেতে আসুন।

– এমন অসময়ে?

– অসময় কোথায়? বিকেলে তো মানুষ হালকা পাতলা নাস্তা করেই। আপনি আসুন তাড়াতাড়ি। গরম গরম লুচি ঠান্ডা হয়ে এলে পরে খেতে ভালো লাগবে না।

– মা, লাবণ্য আসেনি এখনও?

– রাতের আগে আসবে না।

নাওয়াজ ওয়াশরুমে গেল ফ্রেশ হতে। আভিরা এর মাঝে বিছানা গুছিয়ে রুম ঝাড়ু দিয়ে নেয়। ঘর অগোছালো দেখতে পারে‌ না সে। অগোছালো রুম দেখলেই কেমন মেজাজ গরম হয়ে যায় তার। খিটখিট করে, মেজাজ যেন একেবারে নিয়ন্ত্রণে থাকে না। আর আভিরা যা বুঝল ঐ লোকও রুম অগোছালো রাখাটা পছন্দ করে না। তাই
নাওয়াজ উঠতেই রুম গুছিয়ে নিল।

– দাঁড়িয়ে না থেকে আমার পাশে এসে বসুন আঞ্জুম।‌ আমার খাওয়ার সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। এরপর থেকে দাঁড়িয়ে থাকবেন না।‌ আমার পাশের চেয়ারে বসবেন। ঠিক আছে?

আভিরা মাথা নাড়িয়ে সায় জানায়। নাওয়াজ লুচি প্রথমে মেয়েটার মুখের সামনে তুলে ধরে। আভিরা কথা বাড়ায় না। চুপচাপ মুখে নেয়। নাওয়াজ মুখে দিতেই বুঝল আলুর দমে অনেক ঝাল দেওয়া হয়েছে।

– ঝাল তো খেতে পারেন না। এত ঝাল কেন দিতে গেলেন?

আভিরা পানির গ্লাস হাতে নিয়ে বলল,
– নতুন আলু একটু ঝাল ঝাল না করলে খেতে ভালো লাগে না।

– আচ্ছা এ জন্য একটু পরপর পানি খেতে হচ্ছে।

আভিরা বেচারি খুকখুক করে কেশে উঠল। পানি নাকে মুখে উঠেছে তার। কাঁচা মরিচ চিরে দেওয়াতে বেশ অন্যরকম ফ্লেভার আসছে আলুর দম থেকে। ঝাল না দিলে এ নতুন আলু কেমন পানশে লাগে যেন। ঝাল ঝাল মাখো মাখো করে না রাঁধলে তো মুখেই তোলা যেত না।

নাওয়াজ টেবিল ছেড়ে উঠতে উঠতে বলল,
– মাহাদদের ওখানে যাচ্ছি। এর মধ্যে তৈরি হয়ে থাকবেন। এসে বের হব আপনাকে নিয়ে।

আভিরা কপাল কুঁচকায়। সন্ধ্যা হতে চলল। এমন সময় আবার কোথায় যাবে এ লোক। তাও তাকে নিয়ে।

– কোথায় যাব?

– শপিং এ।

– হঠাৎ শপিং?

– অনুষ্ঠান সেজন্য।

_

আভিরা বোরকা পরে তৈরি হয়ে নেয়। একটা ওয়ান টাইম মাস্ক লাগিয়ে নিল মুখে। বিছানা থেকে চাদর নিয়ে দৌড় লাগাল মেয়েটা। ঐ লোক বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে। গেটের সামনে গিয়ে নাওয়াজকে পেল না আভিরা। এদিক ওদিক তাকিয়ে খুঁজল, না ঐ লোকের দেখা নেই।

– আমাকে খুঁজে চলেছেন মিসেস?

গম্ভীর কণ্ঠ কানে আসতে ছিটকে সরে গেল মেয়েটা। এ লোক তার পিছনে কখন এসে দাঁড়িয়েছে। নাওয়াজ মেয়েটার হাত ধরে বলল,
– চলুন।

আভিরা আড়চোখে চায় নাওয়াজের পানে। চলুন মানে? হাঁটতে বের হয়েছে না কি তাকে নিয়ে? আভিরা বিরক্ত হলো নিজের অযথা ভাবনায়। এ লোক বের হবে হাঁটতে, তাও আবার তাকে নিয়ে। অন্যদিন হলে মানা যেত। কিন্তু আজ, আজ তো অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান ফেলে নিশ্চয় তাকে নিয়ে হাঁটতে বের হবে না। নাওয়াজ একটা রিকশা ডেকে তাতে চড়ে বসে। এ মেয়ের সেদিকে খেয়াল থাকলে তো। সে তো ভাবনায় মত্ত। নাওয়াজের ডাকে তার ধ্যান ভাঙে।

– উঠে আসুন।

আভিরা উঠে বসল।‌ পুরোপুরি অন্ধকারে তলিয়ে যায়নি ধরিত্রী। খানিকটা আলোর দেখা মিলছে চারদিকে। সূর্য ডুবে সন্ধ্যা নেমে এলো বলে। মিনিট বিশেকে‌ মলের সামনে রিকশা থামে। নাওয়াজ ভাড়া মিটিয়ে মেয়েটার হাত ধরে ভিতরে গেল। এদিক সেদিক না গিয়ে সোজা গেল শাড়ির দোকানে। রাশভারী কণ্ঠে বলল,
– পছন্দ করুন।

আভিরা ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। পছন্দ করবে মানে? কী পছন্দ করবে সে, কার জন্য? মেয়েটার মুখ ফসকে বেরিয়ে এলো,
– কী পছন্দ করব?

নাওয়াজ কপাল কুঁচকে তাকায়।

– শাড়ির দোকানে নিশ্চয় শার্ট, প্যান্ট পছন্দ করার জন্য নিয়ে আসেনি।

আভিরা চোখ নামিয়ে নেয়। এভাবে বলাতে কিছুটা অভিমান হলো তার। এমন করে বলতে হবে কেন? ভালো করে বলা যায় না। খানিকক্ষণ নিশ্চুপ থেকে ক্ষীণ স্বরে জানতে চাইল,
– কার জন্য পছন্দ করব, মানে মাহিরা আপুর জন্য?

নাওয়াজ হাত টেনে মেয়েটাকে টুলে বসায়। তার কথার জবাব না দিয়ে দোকানদারকে বলল,
– শাড়ি দেখান। ঐ উপরের তাক থেকে নামাবেন।

আভিরা কিছুটা নিচু স্বরে বলল,
– মায়ের জন্য একটা শাড়ি নিব?

– কার মা?

– আপনার।

– আচ্ছা চয়েজ করুন। বেশি লাইট কালার নিবেন না। আম্মু রঙিন শাড়ি পছন্দ করে না একেবারে।

আভিরা মার্জিত একটা কাতান শাড়ি নেয়। সাদার মধ্যে গোল্ডেন। নাওয়াজেরও ভালো লাগল শাড়িটা। হঠাৎ আভিরার বর্ণার কথা মাথায় এলো। সেদিন তাকে শাড়ি কিনে দিল। তারও উচিত বর্ণাকে কিছু দেওয়া। মেয়েটা চিন্তায় পড়ে গেল। মাহিরার জন্য কিছু না কিছু নিতেই হবে। তার শাশুড়ির জন্যও নেওয়া হয়েছে। বর্ণার জন্য নিলে মাঝে লাবণ্য বাদ যাবে কেন? নিলে সবার জন্যই নেওয়া উচিত। আভিরা উশখুশ করছে। শাড়িগুলো ভালোই দামের হবে। হাজার চারেকের কমে তো দিবেই না। এতগুলো শাড়ি কিনলে কম হলেও পনেরো, বিশ হাজার খরচ হয়ে যাবে। এতগুলো টাকা। টাকার কথা মাথায় আসতেই আভিরা এসব বাদ দিতে চাইল। থাক পরে না হয় দেওয়া যাবে। এখন মাহিরার জন্য একটা ভালো দেখে শাড়ি নিয়ে নিলেই হয়। আভিরার এমন অস্থিরতা নাওয়াজের নজর এড়ায় না। এ মেয়ে কিছু বলতে গেলে এত উশখুশ করে।

– কী হয়েছে?

আভিরা হকচকায়।

– ক্ কই কী হবে।

নাওয়াজ হঠাৎ মেয়েটার হাত মুঠোয় নেয়। মেয়েটার হাত ধরে তাকে আশ্বাস দিয়ে বলল,
– বলুন।

– ব্ বর্ণা আপু আর লাবণ্য আপুর জন্য নিব শাড়ি?

তার কথায় কেমন জড়তা। কথা আটকে আসছে।

– নিন।

আভিরা জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজায়। একরাশ অস্বস্তি নিয়ে বলল,
– মানে টাকা…

– আছে। এসব নিয়ে ভাবতে হবে না আপনাকে। শাড়ি পছন্দ করুন।

– একই কালারের শাড়ি নেই সবার জন্য?

– না।

– কেন?

– মাহিরার জন্য আনকমন একটা কালার চুজ করুন। আজকের অনুষ্ঠান যেহেতু ওর জন্য।

মাহিরার জন্য বেগুনি রঙের একটা কাঞ্জিভরম শাড়ি নিল। বর্ণা আর লাবণ্যর জন্যও একই শাড়ি। তবে ভিন্ন রঙের। ওদের দুজনের জন্য নীল রঙের শাড়ি নেয়। চারটা শাড়ি নাওয়াজের সামনে মেলে ধরে বলল,
– ঠিক আছে?

– হ্যাঁ।

এই যে মেয়েটা সব তাকে বলে বলে করছে এতেই যেন নাওয়াজের ঠোঁটের ভাঁজে মৃদু হাসির দেখা মিলে, সামান্য হাসলও ছেলেটা। নাওয়াজকে পুনরায় শাড়ি দেখতে দেখে আভিরা বলল,
– কী করছেন?

– দেখছি।

– এগুলো কী পছন্দ হয়নি আপনার?

– হয়েছে।

– তাহলে?

– আপনার জন্য।

– আমার জন্য কেন?

– নিজেরটা রেখে সবার জন্যই নিয়েছেন দেখছি।

আভিরা মিনমিন করে বলল,
– আপনিও তো নেননি কিছু।

– আমার লাগবে না।

– তাহলে আমারও লাগবে না।

– আমার নেওয়া না নেওয়ার সাথে আপনার কোনো সম্পর্ক নেই।

– তাহলে কার সাথে আছে?

নাওয়াজ কিছুটা থমকায়। মেয়েটা এমন করছে কেন?

– অযথা জেদ করছেন।

– অযথা জেদ কেন মনে হলো?

– অযথা নয় তো কী?

– অযথাই জেদ করছি না আমি।

– তবে কী করছেন? আমার সাথে নিজেকে মেলাচ্ছেন আপনি।

– আপনার সাথেই তো মেলাব।

নাওয়াজ মেয়েটার হাত টেনে দাঁড় করায়। দু তলায় উঠল সিঁড়ি বেয়ে। তার চোখ মুখে তীব্র বিরক্তির ধাঁচ। এ মেয়ে আজকাল বেশি বাড়াবাড়ি করে। সবকিছুতে জেদ দেখাবে।

– এবার পছন্দ আপনি করবেন।

আভিরা গোল্ডেন কালারের একটা পাঞ্জাবি চুজ করে নাওয়াজের জন্য। এ কালারের কিছু পরতে দেখে না এ লোককে। এবার সে নাওয়াজকে বলার প্রয়োজন মনে করল না রঙ ঠিক আছে কিনা। নিজে পছন্দ করে বের হয়ে এলো। আবার শাড়ির দোকানে গেল তারা। মেয়েটার জন্য শাড়ি নাওয়াজই পছন্দ করে।

রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে হয়নি তাদের। রিকশার প্যাডেল ঘুরতেই ঠান্ডা বাতাস গা ছুঁয়ে দেয়। আভিরার যেন শরীর জমে যায় ঠান্ডা হাওয়ায়। মোটা শীতের জামা গায়ে দিয়ে আসা উচিত ছিল। এই চাদরে শীত মানবে না। হঠাৎ নাওয়াজের দিকে চোখ গেল। লোকটার গায়ে একটা টি-শার্ট ছাড়া শীত নিবারণের কিছু নেই। সে চাদর গায়ে দিয়েও শীতে কাঁপছে। আর এ লোক, সে আগে কেন খেয়াল করল না। আভিরার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। এতক্ষণ অবধি এ লোকের সাথে ছিল অথচ নজরে এলো না। আভিরা তীব্র অপরাধবোধে ভোগে। হঠাৎ মনে হলো ও নাওয়াজের প্রতি যত্নশীল না একেবারে। যত্নশীল হলে নিশ্চয়ই নজরে আসার কথা। তার জায়গায় নাওয়াজ হলে নিশ্চয়ই এমন অগোচরে থাকত না।

আভিরা তার চাদরের খানিকটা নাওয়াজের গায়ে মেলে দেয়। নাওয়াজ রাস্তা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আভিরার দিকে চাইল। মেয়েটার দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে প্রশ্ন করল,
– কী করছেন?

আভিরা জবাবে কিছু বলে না। পাল্টা প্রশ্ন করল,
– শীতের কিছু গায়ে দেননি কেন? শীত লাগছে নিশ্চয়?

– ঠিক আছি আমি।

– কেমন ঠিক আছেন তা তো দেখছি।

আভিরার কণ্ঠে কোনো সংকোচ নেই। সারাক্ষণ মিনমিন করতে থাকা মেয়েটার কণ্ঠ কেমন দৃঢ়। নাওয়াজ কথা বলে না। আভিরাকে টেনে নিজের আরও কাছে নিল। ঠান্ডা লাগছে তার। মাহাদদের বাড়ি থেকে বের হয়ে একেবারে শপিং এ এলো। গায়ে শীতের কিছু ছিল না তখন। আর এতটা ঠান্ডা অনুভব না হলেও এখন বেশ ঠান্ডা লাগছে।
একই চাদরে গুটিয়ে বসেছে দুজন। নাওয়াজের হাতের স্পর্শ লাগতে আভিরা চমকে নাওয়াজের দিকে চাইল। হাত বরফ শীতল হয়ে আছে এ লোকের। আভিরা নাওয়াজের দু হাত নিজের মুঠোয় নেয়। নিজের হালকা উষ্ণ হাতের ছোঁয়ায় ঐ লোকের হাতে খানিকটা উষ্ণতা দেওয়ার প্রয়াস চালায় নিজ উদ্যোগে।

নাওয়াজের হঠাৎ কেমন অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব হলো। মেয়েটার একটুখানি প্রচেষ্টায় যেন তার এমন অদ্ভুত প্রশান্তির কারণ। সে ঠোঁট ছোঁয়ায় মেয়েটার কপালে। আভিরা আজ লজ্জায় হাঁসফাঁস করে না, দূরে সরে না নাওয়াজের থেকে। বরং যতটা পারল দূরত্ব কমিয়ে একেবারে মিশে গেল। চাদর টেনে কিছুটা হেলে এক হাতে নাওয়াজকে জাপটে ধরল একপ্রকার। মাথা রাখল শক্ত বুকে। তার এত বেহায়াপনা যেন লোকটাকে একটু উষ্ণতা দেওয়ার নিমিত্তে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here