#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৫০
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
নাওয়াজের ডাকে আভিরার ঘুম ভাঙে। মেয়েটা চোখ মেলে না, আরও গুটিসুটি মেরে কাঁথা মুড়িয়ে গা ঢাকে। শীত নেই এখন। তবে রাতের দিকে ঠান্ডা লাগছিল বিধায় এই কাঁথা গায়ে জড়িয়ে ছিল।
– আঞ্জুম, ডাকছি আমি।
আবার ঐ লোকের ডাক কানে যেতে বিরক্ত হয় আভিরা। বিড়বিড় করে ক্ষোভের জানান দেয়। কিছুটা চেঁচিয়ে বলল,
– উঠব না আমি।
– আচ্ছা উঠতে হবে না। শুয়ে থাকুন, বের হব এখন।
বের হবে মানে। আভিরা কাঁথা সরিয়ে তড়াক করে ওঠে। নিভু নিভু চোখে চেয়ে দেখল নাওয়াজ হাত ঘড়ি পরছে। একেবারে রেডি হয়ে ফিটফাট সে। ডার্ক নেভি ব্লু শার্টের সাথে ব্ল্যাক প্যান্ট।
আভিরার চোখের ঘুম উড়ে যায়। এ লোক এমন সুদর্শন বেশে কোথায় যাবে। আজ নাওয়াজের ডিউটি আছে কী? বা হসপিটাল কর্তৃপক্ষ কর্তৃক কোন মিটিং? নেই তো। আর আজ তো শুক্রবার। এদিনে তো নাওয়াজের ডিউটি থাকে না। তবে লোকটা যাবে কোথায়? আভিরার মাথায় এলো না। মেয়েটা চুপচাপ বসে নাওয়াজের কার্যকলাপ পরখ করছে।
এই যে সে উঠে বসেছে লোকটা কী দেখেনি। তার কাছে আসছে না কেন? একবারের জন্য তার দিকে তাকায়নি অবধি। নিজের কাজে ব্যস্ত সে। আভিরা ভাবল ঐ লোক হয়তো দেখেনি সে যে উঠেছে। আভিরা গায়ের কাঁথা সরিয়ে উঠে দাঁড়ায়। চুলগুলো এলোমেলো খোঁপা বেঁধে একেবারে নাওয়াজের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। নাওয়াজ তখনও নিজের কাজে ব্যস্ত। আস্ত তাকে অদেখা করে চলছে। আভিরা বুঝল না লোকটা এমন করছে কেন। মেয়েটার মেজাজ খারাপ হলো। সকাল সকাল ডেকে তুলে এ লোক এখন তামাশা করছে। দু পা এগিয়ে নাওয়াজের বুকের সাথে মিশে গেল একেবারে। নাওয়াজ তখনও প্রতিক্রিয়াহীন। নিষ্প্রাণ চোখে তার দিকেই চেয়ে আছে। আভিরা জাপটে ধরে বুকে মুখ গুঁজল। খানিকটা এলোমেলো ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল,
– এমন করছেন কেন?
– কেমন করছি?
নাওয়াজের দায়সারা জবাব। আভিরার চোখে পানি এলো। কী করেছে সে, এ লোক তার সাথে এমন কেন করছে।
মেয়েটা ফ্যাচফ্যাচ কণ্ঠে বলল,
– এভাবে কথা বলছেন কেন?
– কীভাবে কথা বলব? আমি তো এভাবেই কথা বলি।
– এভাবে কথা বলেন না। এভাবে কথা বলবেন না আমার সাথে। সহ্য হয় না আমার।
আভিরা ফুঁপিয়ে উঠল। অকারণে কেন এমন করবে তার সাথে। আজকাল এ লোকের অবহেলা সহ্য করতে পারে না সে। একটু কঠিন স্বরে কথা বললেই তার চোখে পানি চলে আসে। আভিরা হাতের বাঁধন আরও শক্ত করে। নাওয়াজ এক হাত রাখে আভিরার পিঠে। এতেই যেন কান্নার তোড় বাড়ে। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে যাওয়ার জো। নাওয়াজ মেয়েটাকে কিছুটা উঁচুতে তোলে। পড়ে যেতে নিলেই দু হাতে নাওয়াজের শার্টের কলার আঁকড়ে ধরল। নাওয়াজ সেদিকে এক পলক চেয়ে আভিরার দিকে চাইল। চোয়াল শক্ত করে রাশভারী কণ্ঠে বলল,
– কান্না থামান।
– থামাব না।
– কান্না না থামালে ফেলে দিব এখন।
– দিন ফেলে।
নাওয়াজ হুট করে বিছানায় ছুঁড়ে মারে আভিরাকে। আভিরা হকচকায়। নাওয়াজ এভাবে তাকে ফেলে দিবে সে ভাবেনি। বড়ো বড়ো চোখ করে চাইল নাওয়াজের দিকে। সে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। নাওয়াজ ঝুঁকে এলো খানিকটা। শক্ত হাতে মেয়েটার গাল চেপে বলল,
– মুখে মুখে তর্ক করবেন আর?
আভিরা বোকার মতো চেয়ে রইল। তর্ক কোথায় করল সে। বুঝে এলো না তার। নাওয়াজ আবার বলল,
– আমার কথার অবাধ্যতা করবেন আর কখনো?
আভিরা কথা বলে না। নাওয়াজের স্বর এখন আগের থেকেও বেশি কঠিন।
– কাল রাতে কখন ঘুমিয়েছেন?
আভিরা হকচকায়। এ আবার কেমন প্রশ্ন। লোকটা কী এই কারণে রেগে আছে। কাল সন্ধ্যার পর বই নিয়ে বসেছিল। কয়েক ঘণ্টা পড়তেই ঘুমে কিছু দেখছিল না। বই রেখেই শুয়ে পড়েছিল তখন। কিছুটা তুতলিয়ে বলল,
– জ্ জি আটটাই।
– খেয়ে ছিলেন?
আভিরা এবার জবাব দিতে পারে না। মাথা নামিয়ে নেয়। নাওয়াজ ধমকে উঠল,
– কথার জবাব দিন।
– না।
– না খাওয়ার কারণ?
– ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম।
– আচ্ছা বুঝলাম। দুপুরেও কী ঘুমিয়ে ছিলেন?
আভিরা শ্বাস আটকে বসে রইল। এই এক প্রশ্নেই যেন বুঝে গেল নাওয়াজের রাগের কারণ। কাল দুপুরে খাওয়া হয়নি তার। সকালে ভার্সিটি গিয়ে ক্যান্টিন থেকে হাবিজাবি খেয়ে ছিল। আবার বেরিয়ে ফুচকাও খেয়ে ছিল। ঝাল ঝাল ছোটো ফুচকা খাওয়া হয়েছে, বোম্বাই মরিচ দেওয়া ছিল তাতে। ঐসব খেয়ে দুপুরে আর কিছু খাওয়া হয়নি। রাতে তো ঘুমিয়েই গেল। নাওয়াজ কোমরে হাত দিতেই আভিরা মৃদু আওয়াজ করে উঠল।
– বেশি লেগেছে?
আভিরা অবাক না হয়ে পারল না। এ লোকের তার প্রতি এত খেয়াল। ওভাবে ফেলে দেওয়াতে খাটের কোণায় লেগেছিল। এই লোক দেখেছে তা? না দেখলে তো জানার কথা নয়। নাওয়াজ কামিজের খানিকটা কাপড় উঠিয়ে কোমরে মলম লাগিয়ে দিল। হাতের স্পর্শে আভিরা ঈষৎ কেঁপে ওঠে। চোখ বুজে পড়ে রইল সেভাবেই। নাওয়াজ মেয়েটার বন্ধ চোখের পাতায় ঠোঁট ছোঁয়ায়। সরে এসে বলল,
– বের হচ্ছি আমি।
আভিরা চট করে চোখ মেলে। তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে নেমে বলল,
– কোথায় যাবেন?
– কাজ আছে।
– ফিরতে দেরি হবে?
– রাত হবে।
_
– মা, আসব?
– এসো। তোমাকে কতবার বলেছি আমার ঘরে আসার সময় অনুমতি নেওয়ার দরকার নেই।
আভিরা হাসে। ওর হাসি দেখে ইয়াজমীনও হাসল।
– কী জন্য আসা হয়েছে মায়ের কাছে?
আভিরা আবার হাসে। মৃদু স্বরে বলল,
– কী রান্না করব আজ?
– ফ্রিজে দেখো শিং মাছ আছে। দুই নাম্বার ড্রয়ারে দেখবে টমেটো রাখা আছে। টমেটো দিয়ে শিং মাছ রান্না করো। আর চিংড়ির মালাই কারি। তোমার হাতের চিংড়ির মালাই কারি সেই যে তোমাদের বাড়িতে খেয়ে ছিলাম, তারপর তো আর কখনো রান্না করোনি। আজ রান্না করো তো। খেতে ইচ্ছে করছে।
– আচ্ছা। রান্না করব। কিন্তু উনি, মানে আপনার ছেলের জন্য কী রাঁধব? ওনার তো চিংড়িতে এলার্জি।
– একদিন খেলে কিছু হবে না। এলার্জির ট্যাবলেট খেয়ে নিবে না হয়।
– আচ্ছা।
হঠাৎ ইয়াজমীন উঠে এলো।
– তোমার চোখ এমন ফুলে আছে কেন?
আভিরা কিছুটা বিব্রত বোধ করে। সকালে কান্না করার কারণেই এমন চোখ ফুলে আছে। আভিরা কিছুটা বিরক্ত হয়। কান্না করলে সবসময় চোখ ফুলে থাকে তার।
– আসলে মা কালকে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। সকালেও উঠেছি দেরি করে। এত ঘুমের কারণেই চোখ এমন ফুলে আছে। আমি এখন গেলাম। রান্নার দেরি হয়ে যাচ্ছে।
– আচ্ছা যাও।
আভিরা চিংড়ির মালাই কারি নামানোর আগে কাঁচা মরিচ মাঝ দিয়ে চিরে দিল। এভাবে চিরে না দিলে কাঁচা মরিচের ঝাঁজ ঠিকমতো পাওয়া যায় না। শিং মাছের তরকারিতে ঝোল বেশি দিয়ে দিয়েছে। আভিরা চুলোর আঁচ বাড়িয়ে দিল। ঝোল খানিকটা কমে আসতেই কড়াই নামিয়ে ভাত বসাল। হালকা সেঁকে ভাতের পাতিল নামিয়ে দৌড়ে রুমে যায়। গোসল করে সবাইকে খাওয়ার জন্য ডাকতে হবে। আভিরা সেলোয়ার কামিজ নিতে গিয়েও কী ভেবে যেন রেখে দেয়। আলমারি খুলে লাল খয়েরী সুতির শাড়িটা টেনে বের করল। এই শাড়ি নাওয়াজ এনে দিয়েছে গত সপ্তাহে। এখনও পরা হয়নি। আজ এটাই না হয় পরবে।
_
সারা বাড়ি খুঁজেও আভিরাকে পেল না নাওয়াজ। গেল কই এই মেয়ে। নাওয়াজ মায়ের দরজায় কড়া নাড়ে।
– আঞ্জুম কোথায় আম্মু?
ইয়াজমীন বেরিয়ে এলো রুম থেকে। ছেলেকে দেখে বললেন,
– কখন এলি?
– মাত্র। উনি কোথায় জানো?
– রুমে নেই?
– না।
– দুপুরে খাওয়ার পর তো বলল ঘুমাবে। ঘুমিয়ে আছে ভেবে আর যাইনি মেয়েটার রুমে। এই ভর সন্ধ্যায় কোথায় যাবে।
– আচ্ছা। আমি দেখছি।
নাওয়াজ সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল। মেয়েটাকে ডাকল কয়েকবার। সাড়া নেই কোনো। নাওয়াজের এবার মেজাজ খারাপ হচ্ছে। সারাদিন বাহিরে থেকে ঘরে এসে মেয়েটাকে না দেখলে মেজাজ ঠিক থাকে না তার। স্টোর রুমের সামনে গিয়ে নাওয়াজ থামে, ভিতর থেকে শব্দ আসছে। দরজাটাও খোলা। নাওয়াজ দরজা খুলে ভিতরে গেল। ধুলোবালি এসে নাকে মুখে লাগল তার। কেশে উঠল নাওয়াজ। তার কাশির শব্দে নিজ কাজে ব্যস্ত থাকা রমণী এবার পিছন ফিরে চায়। নাওয়াজ মাথা তুলে চাইতেই নজর আটকায় রমণীর দিকে। শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে কাজ করছে সে। হঠাৎ স্টোর রুমে কেন এলো। এখানে তার বাবা মায়ের ব্যবহৃত সকল কিছু রাখা। নাওয়াজ কিছুটা রেগে গেল। ধমকে উঠল মেয়েটাকে।
– এখানে কেন এসেছেন?
হঠাৎ ধমকে আভিরা কেঁপে ওঠে। ভয়ে পিছিয়ে যায় কয়েক কদম। টেবিলের কোণায় পা বেঁধে পড়তে নিলে নাওয়াজ মেয়েটার কোমর জড়িয়ে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়।
আভিরা আটকে আসা গলায় বলল,
– এগুলো পরিষ্কার করছিলাম। ধুলোবালি জমে ছিল অনেক। সেজন্য…
নাওয়াজ মেয়েটার ঠোঁটে আঙুল ছুঁয়ে চুপ করিয়ে দেয়।
– ছাড়ুন আমায়, গায়ে ময়লা লেগে আছে।
– তো?
নাওয়াজ আভিরার চুলে হাত দিতেই আভিরা বলল,
– কী করছেন?
ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে বলল,
– হুশ! কথা বলবেন না।
আভিরা কথা বলে না। নাওয়াজ প্যান্টের পকেট থেকে গাজরা বের করে মেয়েটার খোঁপায় বেঁধে দিল। আভিরা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে।
– আমার জন্য এনেছেন?
– না। আসার সময় দেখলাম বাচ্চা একটা মেয়ে রাস্তার ধারে গাজরা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একটাই গাজরা ছিল মেয়েটার কাছে। পথচারীদের কেউ কিনেও নিচ্ছিল না। এই একটা গাজরা বিক্রি না হওয়া অবধি ঐ মেয়ে বোধহয় বাড়িও যাবে না। সেজন্য কিনে নিয়ে এলাম। টাকা দিয়ে কিনে আনা জিনিস তো ফেলা দিতে পারব না। তাই গুঁজে দিলাম আপনার খোঁপায়।
আভিরা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল নাওয়াজকে। তার জন্য আনেনি এ লোক। সে কেন রাখবে এ গাজরা। আভিরা গাজরা খুলতে নিলেই নাওয়াজ টেনে মেয়েটাকে আবার নিজের কাছে নেয়।
– খুলছেন কেন?
– কেন রাখব? আমার জন্য তো আনেননি আপনি।
মেয়েটার এমন অভিমান দেখে নাওয়াজ হাসল। আভিরাকে উল্টো ঘুরিয়ে ঘাড়ে মুখ গুঁজল। ফিসফিস করে ধীর আওয়াজে বলল,
– বোকা পাখি এটা আপনার জন্যই এনেছি। আজকাল অভিমান করতে শিখেছেন দেখছি।
আভিরাকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে নাওয়াজ কণ্ঠ আরও খাদে নামায়। কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
– এভাবে, এভাবে কথা বললে সহ্য করতে পারবেন মিসেস ইয়াজিদ?

