মেজর_ওয়াসিফ #লেখনীতে_ঐশী_রহমান পর্ব (৪৪)

0
2

#মেজর_ওয়াসিফ
#লেখনীতে_ঐশী_রহমান

পর্ব (৪৪)

সময় যেন বুনো পাখির মতো ডানা মেলে উড়ে যায়। দেখতে দেখতে কেটে গেছে পুরো একটা বছর। গত একটা বছরে জীবনের ক্যানভাসে অনেক কিছুই বদলে গেছে, তবে যা বদলায়নি তা হলো হৃদয়ের সেই চেনা উথালপাথাল ভালোবাসা। হাসপাতালের সেই মেঘলা দিন আর কান্নার দিনগুলো এখন অতীত। মেজর ওয়াসিফ এখন আর বর্ডারের দুর্গম বাঙ্কারে একা রাত কাটায় না, বরং দিনশেষে তার ফেরার একটা নির্দিষ্ট ঠিকানা হয়েছে—সবুজ পাহাড় আর চায়ের বাগানের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা সেনাবাহিনীর এই ছিমছাম কাঠের কটেজটি।

বিকেলের নরম সোনাঝরা রোদ এসে পড়েছে কটেজের বারান্দায়। বারান্দার এক কোণে পেতে রাখা দোলনায় বসে আছে ধারা। এক বছরে সে যেন আরও একটু পরিপক্ক, আরও একটু লাবণ্যময়ী হয়ে উঠেছে। তার কোলের ওপর আধো-আধো বোলে খিলখিল করে হাসছে এক বছরের ছোট্ট ওয়াসিকা বিনতে শাহেদ। ফুটফুটে একটা পুতুলের মতো দেখতে হয়েছে মেয়েটা, গায়ের রঙটা ঠিক ধারার মতো দুধে-আলতা, আর চোখ দুটো একদম তার বাবার মতো তীক্ষ্ণ ও মায়াবী।

“আম্মুমণি, পাপা কখন আসবে বলো তো? আজকে কিন্তু পাপার তাড়াতাড়ি ফেরার কথা!” ধারা ওয়াসিকার নরম গালে আলতো করে নাক ঘষে বলতেই ওয়াসিকা তার পুচকে হাত দুটো দিয়ে ধারার মুখটা খামচে ধরার চেষ্টা করল।

ঠিক তখনই কটেজের কাঠের গেটটা খোলার চেনা আওয়াজ হলো। বুটের শব্দ আর ভারী পায়ের আওয়াজ পেতেই ওয়াসিকা চট করে ধারার কোল থেকে মাথা তুলে গেটের দিকে তাকাল। ইউনিফর্ম পরা, মাথায় কমান্ডো ক্যাপ, কাঁধে মেজরের র্যাঙ্ক নিয়ে দীর্ঘদেহী ওয়াসিফ কটেজের ভেতর পা রাখল। সারা দিনের ডিউটি আর রোদের ক্লান্তিতে মুখটা কিছুটা তামাটে দেখালেও, বারান্দায় দাঁড়ানো নিজের কলিজার টুকরো দুটোকে দেখামাত্রই তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল সেই চিরচেনা ড্যাশিং হাসি।

“পা! আ-পা!” ওয়াসিকা দুই হাত বাড়িয়ে দোলনা থেকেই লাফিয়ে ওঠার চেষ্টা করল।

“আরে, আরে! পড়ে যাবে তো আমার মা-মণি!” ওয়াসিফ দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে ক্যাপটা পাশের টেবিলে রেখেই ওয়াসিকাকে কোল তুলে নিল। এক বছরের মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরতেই মেজরের সমস্ত ক্লান্তি যেন এক ফুৎকারে উড়ে গেল। সে মেয়ের সারা মুখে, কপালে চুমুর বৃষ্টি বইয়ে দিল।

ধারা মুচকি হেসে ওয়াসিফের দিকে এক গ্লাস ঠাণ্ডা লেবুর শরবত এগিয়ে দিল। ওয়াসিফ শরবতের গ্লাসে চুমুক দিয়ে ধারার দিকে তাকাল। তার চোখে সেই এক বছর আগের মতোই তীব্র এক মুগ্ধতা।

“আজকে বড্ড জলদি চলে এলেন যে মেজর সাহেব? কোনো স্পেশাল কারণ?” ধারা একটু চোখ টিপে জিজ্ঞেস করল।

ওয়াসিফ ধারার কোমরে এক হাত দিয়ে তাকে নিজের কাছে টেনে নিল, অন্য হাতে তখন ওয়াসিকা ওয়াসিফের শার্টের কলার নিয়ে খেলছে। ওয়াসিফ ধারার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, “স্পেশাল কারণ তো অবশ্যই আছে, মুমতাহিনা। আজ যে আমাদের কটেজে এক বিশেষ অতিথি আসছে। লুইপা, সামির ওরা ঘন্টা তিনেক আগে রওনা দিয়েছে, এতক্ষণে হয়তো ক্যান্টনমেন্টের মেইন গেট পার হয়ে গেছে।”

‘লুইপা আসছে’ শোনার সাথে সাথেই ধারার চোখ দুটো খুশিতে চকচক করে উঠল। গত কয়েক মাসে লুইপার জীবনেও এসেছে এক পরম পূর্ণতা। লুইপা আর সামিরের ঘর আলো করে এসেছে এক ছোট্ট রাজপুত্র—আহনাফ। মাত্র তিন মাস বয়স তার। লুইপা তার ছেলেকে নিয়ে এই প্রথম ওয়াসিফ আর ধারার কটেজে বেড়াতে আসছে।

সন্ধ্যা নামার আগেই কটেজের সামনে এসে থামল একটা কালো রঙের গাড়ি। গাড়ি থেকে নামতেই লুইপার চটপটে গলার আওয়াজ পাওয়া গেল, “ধারা! ভাইয়া! কোথায় তোমরা? দেখো কাকে নিয়ে এসেছি!”

ধারা দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে এলো। লুইপার কোলে তখন কাপড়ে জড়ানো এক পুঁচকে মাংসের পিণ্ড, বড় বড় চোখ করে চারপাশ দেখছে। লুইপাকে জড়িয়ে ধরে ধারা যেন নিজের বোনকেই ফিরে পেল।

“আয় ভেতরের আয়! রাস্তায় কোনো কষ্ট হয়নি তো রে?” ধারা ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল।

সামির গাড়ি থেকে লাগেজ নামাতে নামাতে বলল, “কষ্ট আর কই ভাবি? আপনার ননদের যা চটপটে স্বভাব, সারা রাস্তা ছেলেকে কোলে নিয়ে নিজেই গাড়ি চালানোর ভয় দেখাচ্ছিল!” সামিরের কথায় সবাই হেসে উঠল।

কটেজের ড্রয়িংরুমে এক অদ্ভুত সুন্দর পরিবেশের সৃষ্টি হলো। কার্পেটের ওপর এক বছরের ওয়াসিকাকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর তার ঠিক পাশেই একটা নরম কুশনে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে তিন মাসের আহনাফকে। ওয়াসিকা কৌতূহলী চোখে তার এই পুচকে ফুফাতো / খালাতো ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। সে তার ছোট্ট আঙুল দিয়ে আহনাফের নরম গালে একটু ছুঁয়ে দিতেই আহনাফও হাত-পা ছুড়ে একটা মিষ্টি আওয়াজ করল।

“দেখো ভাইয়া, ও এখনই ওর আপুকে চিনে গেছে!” লুইপা ধারার কাঁধে মাথা রেখে খুশিতে গদগদ হয়ে বলল।

ওয়াসিফ সোফায় বসে একহাতে মেয়েকে আগলে ধরে এই দৃশ্যটা দেখছিল। বছর আড়াই আগে যে পরিবারটা ঝড়ের মুখে পড়েছিল, আজ তারা কতটা শান্ত, কতটা সুখী। লুইপার কোল পূর্ণ হয়েছে, ধারার মাতৃত্বের এক বছর পূর্ণ হয়েছে, আর সে নিজে এখন শুধু বর্ডারের পাহারাদার নয়, এক একনিষ্ঠ বাবা ও স্বামী।

রাতের খাবার শেষে সবাই যখন যার যার ঘরে চলে গেল, কটেজের চারপাশটা আবার শান্ত হয়ে এলো। বাইরে তখন পাহাড়ি ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর হালকা ঠাণ্ডা বাতাস। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল ধারা, তার গায়ে একটা হালকা চাদর জড়ানো।

ওয়াসিফ পেছন থেকে এসে ধারাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ধারার ঘাড়ে নিজের চিবুক রেখে ফিসফিস করে বলল, “কী ভাবছিস, মুমতাহিনা?”

ধারা পেছনে ফিরে ওয়াসিফের বুকে নিজের হাত দুটো রাখল। ওয়াসিফের শার্টের ভেতর দিয়ে তার চেনা হৃদস্পন্দনটা অনুভব করে বলল, “ভাবছি, এক বছর আগের এই দিনটার কথা। আগামীকাল আমাদের মেয়ের প্রথম জন্মদিন, গতবার এইদিনে আমি হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণায় কাঁদছিলাম, আর আজ… আজ আমার কোল জুড়ে ওয়াসিকা, আমার পাশে আপনি, আর আমাদের পুরো পরিবারটা কত সুখী। মাঝে মাঝে ভয় হয়, এটা কোনো স্বপ্ন নয় তো?”

ওয়াসিফ ধারার কপালে গভীর এবং দীর্ঘ এক চুমু খেল। তারপর তার চোখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর অথচ চরম আকুলতায় বলল, “এটা কোনো স্বপ্ন নয়, মুমতাহিনা। এটা আমাদের কাটানো সেই নয় মাসের একাকীত্ব আর ত্যাগের পুরস্কার। মেজর ওয়াসিফ বর্ডারের কাঁটাতারে দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, আর তার ঘরের ভেতর তুই আর ওয়াসিকা আছিস বলেই সে নিশ্চিন্তে যুদ্ধ লড়তে পারে। তোরা আমার অহংকার, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় মেডেল।”

জানালার বাইরে তখন চাঁদের আলো এসে পড়েছে কটেজের বারান্দায়। ঘরের ভেতর এক বছরের ওয়াসিকা পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছে, আর জানালার পাশে দুই হৃদয় এক হয়ে মিশে আছে এক অনন্ত ভালোবাসার চাদরে। সব ঝড় থেমে গেছে, এখন শুধু সারাজীবন একসাথে পথ চলার সুন্দর এক গল্প।

#চলবে

গল্প প্রায় শেষ প্রান্তে……….
অবশ্যই গল্পটি যারা পড়েছেন রেসপন্স করবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here