#মনটা_তারই_সুরে_অনুরাগিনী [ পর্ব-১৪.২ ]
#মেহুলিনা_প্রাপ্তি
আহিয়ানকে রক্তে মাখামাখি হয়ে বাড়িতে ঢুকতে মাশরিফা আর আইরিন এগিয়ে এলো।আইরিন আহিয়ানকে ভালো করে পরখ করে বললো,
” এ কি হাল করেছিস নিজের? যা বাবা তাড়াতাড়ি গোসল সেড়ে আয়। আমি টেবিলে সবার খাবার দিচ্ছি। ”
মাশরিফা ছেলের ঘর্মাক্ত মুখটা নিজের আঁচল দিয়ে মুছে দিতে নিলে আহিয়ান নিজের মাথা খানিকটা নুইয়ে দিল। মাশরিফা ছেলের দিকে মায়া ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো কতক্ষণ। তখনি মাশরিফাকে দেখতে পেয়ে রোদেলা দৌড়ে ছুটে আসতে লাগলো। মাশরিফা তা লক্ষ্য করে সাবধান করলো রোদেলাকে,
” আস্তে আয়। পড়ে যাবি তো মা। ”
আহিয়াকে রোদেলা এতক্ষণ খেয়াল করেনি। হঠাৎ আহিয়ানে সাথে রোদেলার চোখাচোখি হতেই রোদেলা নিজের গতি কমিয়ে দিল। আহিয়ান এখনও রোদেলার দিকেই চোখ কুঁচকে তাকিয়ে আছে। রোদেলা এবার ভদ্র মেয়ের মতন মাশরিফার সামনে এসে দাড়িয়ে বললো,
” আম্মু! ”
মাশরিফা রোদেলাকে পরম স্নেহে কাছে টেনে নিয়ে মাথার ছেড়ে রাখা চুলে হাত খোপা করে দিতে দিতে বললো,
” বলো আম্মু, কি হয়েছে? ”
মাশরিফা যখন হাত খোপা করছিল আহিয়ান সেটা মোনোযোগ দিয়ে দেখছিল। তারপর নিজের মায়ের বুকে রোদেলাকে বিড়াল ছানার মতো লেপ্টে যেতে দেখে আহিয়ান সেদিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। রোদেলা মাশরিফার বুকে মাথা রেখে আদুরে সুরে বললো,
” তুমি এতো ভালো কেন আম্মু? আমাকে বাবা-মা ব্যতিত একমাত্র তুমিই এতো ভালোবেসেছো। ”
রোদেলা কথাটা বলে চোখের পানি ছেড়ে দিল। মাশরিফা বুঝতে পারলো ঈদের দিন ছোট মেয়েটা নিজের মৃত
বাবা – মায়ের কথা স্মরণ করে কষ্ট পাচ্ছে। মাশরিফা আদুরে হাত বুলিয়ে দিল রোদেলার মাথায়। রোদেলা মাতৃছায়ায় এসে আদরটুকু পেয়ে আরও বিড়াল ছানার মতো মিশে গেল মাশরিফার বুকে।
আহিয়ান সব কিছু নিরব দৃষ্টিতে পরখ করে চুপচাপ সিড়ির দিকে হাটা ধরলো নিজের রুমে যাওয়ার জন্য। আহিয়ান নিজের রুমে গিয়ে ক্লান্তিতে জোরে জোরে কয়েকবার শ্বাস ফেলল। তার চোখে এখনও রোদেলার অশ্রু সিক্ত চোখদ্বয় ভেসে আছে। আহিয়ান নিজের পাঞ্জাবি খানা টেনে খুলে ফেলল।তারপর বেলকনিতে এক কর্ণারে রাখা ডিবানে গা এলিয়ে দিয়ে, আহিয়ান চোখ বুজলো।
রোদেলার ছোট বাচ্চাদের মতো মায়ের সান্নিধ্যে এসে ফুঁপিয়ে ওঠা মুখটা কিছুতেই আহিয়ানের মস্তিষ্ক থেকে সরার নামই নিচ্ছে নাহ। আহিয়ান বিরক্ত নিয়ে চোয়াল শক্ত রেখেই উঠে দাড়ালো। তারপর ওয়াশরুমে ঢুকে ঠাস করে দরজা আটকে দিল।
_______
রোদেলা যখন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদায় ব্যস্ত।তখন জাবির সাহেব বউ মা আর নিজের বউ এর পাশে এসে থম মেরে এসে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থাকলো। সে মূলত বাড়িতে ঢোকার সময় মাশরিফাকে রোদেলার বলা কথা গুলো শুনেছিল। একটা ছোট মেয়ে কতই না কষ্ট বুকে চেপে রেখেছে বিষয়টা মাথায় আসতেই জাবির সাহেবের পিতৃসুলভ কোমল অন্তরটা কেঁপে উঠলো।তিনি ঘোরের মাঝেই এগিয়ে এসে রোদেলার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,
” কাঁদে না মা। আমরা আছি তো মা। আমি কি তোমার বাবা নই? ”
রোদেলা পিতার মতো শশুড় এর থেকে পরম স্নেহ পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে চোখের পানি মুছে মাশরিফার বুক থেকে সোজা হয়ে দাড়ালো। জাবির সাহেব পরম মমতাই পুত্র বধূর মাথায় হাত বুলিয়ে আশির্বাদ করে দিলেন। রোদেলা জাবির সাহেবের স্নেহটুকু গ্রহণ করে দায়িত্ববান মেয়ের মতো এক গ্লাস ঠান্ডা পানি এনে সেটা জাবির সাহেবের দিকে এগিয়ে দিল।জাবির সাহেব পরম তৃপ্তিতে খুশি হয়ে পানিটুকু পান করে নিজের ভিতরটা সিক্ত করে, ছোফায় গিয়ে বসলো।
__
তখনি সেখানে তৃষ্ণা আর মেহনূর এলো। মেহনূর মাশরিফাকে বললো,
” মেজো মা, আমরা আমাদের ছোট বেলার বান্ধবী ইমাদের বাড়িতে যাচ্ছি।ওদের বাড়ি তো তুমি চেনোই।এইতো কয়েক কদম হাটলেই ওদের বাড়ি। আমরা আমাদের সাথে রোদেলা ভাবিকেও নিয়ে যায় হে? ”
মাশরিফা মেহনূরের কথায় রোদেলার দিকে তাকালো। মেয়েটার বাইরে কোথাও যাওয়া হয় না তেমন। মাশরিফা রোদেলাকে বললো,
” যাবি? ”
রোদেলা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো।মানে সে যাবে। মাশরিফা বললো,
” আচ্ছা ঠিক আছে যা তবে। ”
রোদেলা খুশি হয়ে শাড়ি বদলে একটা লং সাদা ফ্রক আর মাথায় হিজাব বেঁধে এসেছে। মেহনূর আর তৃষ্ণা ও শাড়ি বদলে থ্রিপিস পরে মাথায় হিজাব বেঁধে নিয়েছিল। তারপর তিন জন রেডি হয়ে এক সাথে যাত্রা শুরু করলো।
__________
আহিয়ানদের বাড়ির নাম ‘ আনন্দ কুটির ‘। আনন্দ কুটির থেকে পাঁচ মিনিটে সময় লাগে ইমাদের বাড়িতে যেতে।
আনন্দ কুটির থেকে মাত্র কয়েক কদম পথ এগোলেই একটা বাড়ি পরে। এটা আমির সাহেবের ছোট ভাই আসমত আহমেদর বাড়ি। এই বাড়িটা সব সময় ফাঁকায় পরে থাকে। কারণ আসমত আহমেদরা স্বপরিবারে আমেরিকায় থাকে। আসমত সাহেবের দুই মেয়ে।তারা সবাই নিজেদের সংসার আমেরিকায় গুছিয়ে নিয়েছে।তারপর এক সময় বৃদ্ধ বাবা-মাকেও নিজেদের সাথে নিয়ে গিয়েছিল। তখন থেকে এই বাড়ি খালিই পরে আছে।এই বাড়ি দেখাশোনার জন্য অবশ্য একজন কেয়ারটেকার আছেন। তিনিই সব দেখে রাখেন সব কিছু। আমির সাহেবও চেষ্টা করেন নিজের ছোট ভাইয়ের গ্রামের নির্বাসনটুকুকে আগলে রাখতে। এই বাড়িতে অনেক ফলের গাছ-গাছালি আছে। যার কারণে মাঝেমাঝেই মেহনূর আর তৃষ্ণার আগমন ঘটে এখানে।
আজকেও বাড়ির গেইট খোলা দেখে মেহনূর তার তৃষ্ণা ইমাদের বাড়ি যাওয়ার আগে এখানে একটু ঘুরবে ভেবে নিল।রোদেলার হাতটা দুইজন দুই দিক থেকে ধরে টেনে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো। বাড়ির গেইট খোলা থাকলেও কেয়ারটেকারকে কোথাও চোখে পরলো না তাদের। রোদেলা বাড়িটার দিকে নজর বুলালো এটাও আহিয়ানদের বাড়ির মতো কারুকাজ খচিত পুরুনো আমলের জমিদার বাড়ির মতন দেখতে। রোদেলাকে এভাবে বাড়িটাকে পর্যবেক্ষণ করতে দেখে তৃষ্ণা হেসে বললো,
” এটা তোমার ছোট দাদা শশুরের বাড়ি।তারা এখানে থাকে না অনেক বছর ধরে। ”
রোদেলা মনোযোগ দিয়ে সবটা শুনে বললো,
” তাহলে তারা এখন কোথায় থাকে ? ”
মেহনূর রোদেলার হাতটা ধরে বাগানের দিকে যেতে যেতে বললো,
” আমেরিকায় থাকে। আসো এদিকটায় আমার সাথে। ”
রোদেলা আর কিছু না বলে বাধ্য মেয়ের মতো দুইজনের হাত ধরে এগোতে লাগলো।বাগানের দিকে এসে রোদেলারা একটা কামরাঙা গাছ দেখে থেমে গেল। গাছটায় কামরাঙা থোকায় থোকায় ঝুলে আছে। তিনজনের মুখেই তা দেখে জল চলে আসলো প্রায়। তৃষ্ণা,মেহনূর আর রোদেলার চোখাচোখি হলো। তাদের চোখের ভাষা এই যে যেকোনো মূল্য এই থোকা থোকা কামরাঙা তাদের চাই, চাই। অবশ্য এতে কারো অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই,কেনো না তাদের ছোট দাদার অবর্তমানে এসব তারাই ভোগ করছে। মেহনূর কোমরে হাত রেখে বললো,
” গাছে কে উঠবে? আমার তো ভাই পিরিয়ড চলছে। তোমরা কেউ ওঠো। ”
রোদেলা গাছের দিকে তাকিয়ে থেকেই নিজের হাত তুলে ধরে বললো,
” আমি। আর কে উঠবে বললো। আমি একা উঠবো না বলে দিচ্ছি। তৃষ্ণা আপুকেও উঠতে হবে। ”
রোদেলা, মেহনূর, তৃষ্ণা তিন জনেরই গাছ-গাছালিতে চড়ার ভালোই অভিজ্ঞতা আছে। তৃষ্ণা রোদেলাকে বললো,
” ঠিক আছে। বিসমিল্লাহ বলে উঠে পরো। আমিও তোমার সাথে যোগ দিচ্ছি। ”
রোদেলা বিসমিল্লাহ বলে গাছে চড়তেই।তার পরপর তৃষ্ণাও উঠে গেল। মেহনূর বেচারি নিচ থেকে কামরাঙার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে।রোদেলা দুইটা কামরাঙা ছিড়ে একটা নিচে মেহনূরের দিকে ঢিল ছুড়ে দিল।মেহনূর নিচ থেকে দাড়িয়ে সেটা কেচ ধরে নিল। তৃষ্ণা নিজেও কয়েকটা কামরাঙা ছিড়ে নিচে ফেলল। তৃষ্ণা একটা কামরাঙায় এবার কামড় দিয়ে রোদেলার দিকে তাকালো।রোদেলা তার থেকেও এক ডাল উপরে।রোদেলা তৃষ্ণার দিকে তাকিয়ে বোকা হাসি দিয়ে নিজেও কামরাঙায় কামড় বসালো।
নিচে মেহনূরও থেমে নেই। একটা কামরাঙায় কামড় বসিয়ে তৃপ্তিতে চিল্লিয়ে উঠলো সে। এই গাছের কামরাঙা গুলো দেখতে যেমন রসালো ঠিক তেমনি টক। টক রোদেলা,মেনূর আর তৃষ্ণার বেশ পছন্দ। তাইতো প্রথম কামড় বসিয়েই সবাই মুখে সেই একটা রিয়েকশন দিল।মেহনূর নিচ থেকে কামরাঙায় কামড় বসিয়ে পরিতৃপ্তিতে আওড়ালো,
” উফফ সেই টক। এর সাথে একটু বিট লবণ হলে একদম জমে যেত। ”
মেহনূর তার কথা শেষ করতে না করতেই তার সামনে বিট লবণ পেয়ে গেল।মেহনূর খুশিতে গদগদ করে কামরাঙাটা বিট লবণে মাখিয়ে মুখে নিয়ে কামড় বসাতেই ভয়ে জমে গেল।উপরের দুই জনও বিষ্ময় কর দৃষ্টিতে নিচের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে।মেহনূর নিজের সাথে কি ঘটলো বিষয়টা বুঝত পেরেই ভয়ে ভয়ে নিজের বাম সাইডে তাকালো।
মেহনূর দেখলো তার দিকে তেরো / চৌদ্দ বছরের ধবধবে ফর্সা আর ছিপছিপে লম্বা গড়নের একটা ছেলে এক হাতে একটা কাগজে লবণ ধরে রেখেছে মেহনূরের সামনে।মেহনূর ছেলেটার দিকে তাকিয়ে দেখলো,
” ছেলেটা তার দিকে রেগে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। ”
ছেলেটা রেগে চোয়াল শক্ত করে কটমট করে বললো,
” ইউ নটি গার্লস, হাউ ডেয়ার ইউ! হ্যাভ ইউ কাম টু স্টিল ফ্রম আওয়ার ট্রি? ”
মেহনূর এক লাফে ছেলেটার থেকে দুরে সরে গেল।গাছে থাকা রোদেলা আর তৃষ্ণাও দ্রুত নেমে পরলো গাছ থেকে।রোদেলা, তৃষ্ণা আর মেহনূরের চোখাচোখি হলো। ধবধবে ফর্সা ছেলেটার সামনে রাগ নিয়ে এগোতে নিলে মেহনূর,রোদেলা আর তৃষ্ণা সেই ছেলেকে ঘিরে ধরলো।তারপর চোখের পলকে ছেলেটাকে ধরে সেই কামরাঙা গাছের কাছে নিয়ে গেল। মেহনূর হিজাবের সাথে থ্রিপিসের যেই ওড়নাটা পরেছিল সেটা খুলে নিল। তারপর সেই ওড়না দিয়ে তাড়াতাড়ি সেই ধলা ছোকরাকে গাছের সাথে বেঁধে ফেলল।
রোদেলা, তৃষ্ণা,মেহনূর নিজের কর্ম সম্পন্ন করে ছেলেটার থেকে কয়েক কদম দূরে সরে তিন জন হাতের দুই বাহু বুকে বেঁধে দাড়ালো।তারপর তিন জন হেসে একে অপরের দিকে তাকালো।
মেহনূর বুকে বাহু বেঁধে রেখেই বললো,
” এই ছোকরা, ভূতের বাচ্চা। তুই এখানে টপকালি কোথা থেকেরে? ”
রোদেলা ভ্রু কুঁচকে বললো,
” মেহনূর আপু ভূতটা মনে হয় বিদেশী।দেখোছো না ছোট ভূতের মাথায় গোল্ডেন কালার চুল। ”
তৃষ্ণাও হেসে গলা মেলালো,
” ভূত হলেও দেখতে কিন্তু কিউট আছে। ”
—
গাছের সাথে বেঁধে রাখা এই নতুন আগন্তক হচ্ছে আসমত সাহেবের ছোট মেয়ের একমাত্র ছেলে সাইফান বেনজামিন।যে তার বড় খালার ছেলে ইরফান চৌধুরীর সাথে বাংলাদেশে নিজের নানু বাড়িতে ঘুরতে এসেছে।সাইফানের বাংলা বুঝতে অসুবিধা হয় না।ছোট থেকেই মায়ের কাছ থেকে বাংলা ভাষা শুনতে শুনতে মাতৃভাষার মতো বাংলাকে আয়ত্ত করে নিয়েছে।সাইবানের বাবা ওলিভার বেনজামিন সাইফানের মা তৃষা আহমেদকে ভালোবেসে বিয়ে করেছে। ওলিভার বেনজামিন নিজের প্রিয়তমার প্রেমে পড়ে নিজের ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। তারপর তৃষাকে বিয়ে করে নিজের করে নিয়েছিল। আমেরিকায় সাইবান আর ইরফানরা একত্রে তাদের নানা-নানির সাথে থাকে। ইরফানের মা আসমত সাহেবের বড় মেয়ে।যার নাম রুহানিয়া আহমেদ। রুহানিয়ার বিয়ে অবশ্য বাংলাদেশী একজন মানুষের সাথেই হয়েছে। রুহানিয়ার স্বামীর নাম ইশান চৌধুরী।রুহানিয়া আর ইশানের দুই ছেলে মেয়ে।বড় ছেলের নাম ইরফান চৌধুরী ছোট মেয়ের নাম রূপকথা চৌধুরী।
___
ইরফান আর সাইফান নিজেদের নানু বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল। সাইফানের জেদ থেকেই ইরফান তাকে এখানে নিয়ে এসেছিল। তারা গতকাল রাতেই এখানে এসেছিল। সাইফানের কাছে বাংলাদেশ এবং এর পরিবেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন অপরিচিত হলেও এদেশের ভাষা,সংস্কৃতিকে সে ভালোবাসে। ভালোবাসে এদেশের মানুষকে।
__
সাইফান এই মেয়ে তিনটার মুখে পাগলের প্রলাপ শুনে বিরক্ত লাগলো। তাকে কিনা এই মেয়ে তিনটা ভূত বানিয়ে দিল।সাইফান রাগে কড়মড় করে তাকালো রোদেলাদের দিকে।
এই শূণ্য জরাজীর্ণ বাড়িটিতে সেখানে এতোদিন কোন মানুষের ছায়ায় পরতে দেখেনি তৃষ্ণারা। সেখানে হুট করে এমন ধবধবে সাদা আর সোনালী চুলাওয়ালা ছেলেটাকে তাদের ভূতই মনে হয়েছে।তাইতো নিজেরা বাঁচতে ভূতকেই তারা কয়েদি বানিয়ে গাছের সাথে বেঁধে রেখেছে।
__
সাইফান আর ইরফান কাল রাত চারটায় এখানে আসার পর। বাড়িতে ঢুকেই বিছানায় পরে ঘুম দিয়েছিল। এই যে একটা ঈদের দিন যাচ্ছে,তাতেও তাদের হুশ ছিল না।সাইফান তার ফোনে মায়ের ফোন কল পেয়ে জেগে ছিল একটু আগে। তখন প্রায় দুপুর শেষের পথে।বেলকনিতে পায়চারি করার সময় এই মেয়ে তিনটাকে তাদের গাছে চুরি করতে দেখে তাদের কথোপকথন শুনতে পেয়েছিল। তারপর সাইফান নিজেই লবণ নিয়ে এসে কিছুটা চমকে দিতে চেয়েছিল মেয়েদের। কিন্তু সাইফান তো আর জনতো না বাঙালি মেয়েরা এতো বিচ্ছু হয়।এই তিন শাঁকচুন্নি যে তাকেই ভূত ভেবে সাজা দিয়ে গাছে বেঁধে ফেলবে এটা তো সে জীবনেও ভাবেনি।
__________
ইরফান সবে ঘুমু ঘুমু চোখে টলতে টলতে বারান্দায় এসে দাড়িয়েছে। সময়ের গড়মেলে তার ঘুম ভাঙতে আজ একটু বেশি বেলা হয়ে গিয়েছে। হঠাৎ ইরফানের চোখ বাগানের দিকে পরতেই রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সাইফানকে গাছের সাথে বাঁধা দেখে তার মাথায় রক্ত চড়ে বসলো। তিনটা মেয়ের যে এই কাজ তা তার বুঝতে অসুবিধা হলো না। ইরফান সাইবানকে বাঁচাতে দ্রুত সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো।তারপর সদর দরজা পেরিয়ে দৌড় লাগানোর সময় ফুলগাছ থেকে একটা বাঁশের খুটি তুলে নিল।ইরফান রাগে চোয়াল শক্ত করে গলা ছাড়লো,
” দাড়ারে শাঁকচুন্নির দল। আমার ভাইকে গাছে বেঁধেছিস।তোদেরও আজ কোমর ভাঙবো দাড়া। ”
ইরফানের পুরুষালি আওয়াজ রোদেলাদের কানে পৌঁছাতেই তারা চোখ বড় বড় করে তাকালো পিছনে।রোদেলা ভয়ে ভয়ে মেহনুর তার তৃষ্ণার হাত খামচে ধরে বললো,
” এবার আমাদের কে বাঁচাবে? এটা দেখছি দেশী ভূত, সাইজেও বড়। আবার হাতে বাঁশও আছে। ”
তৃষ্ণা বিরক্ত হয়ে বললো,
” কে বাঁচাবে আবার? চলো দৌড় লাগাও। ”
এই বলে তৃষ্ণা রোদেলার হাত ধরে দৌড় দিতে নিল।রোদেলাও মেহনূরের হাত টেনে ধরে দৌড় দিতে নিল। তবে মেহনূরকে এক চুল পরিমাণ নড়াতে পারলো না। মেহনূর মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায়, তাদের দিকে তেড়ে আসা ইরফানের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। মেহনূরের মনে একটা গান বেজে উঠলো,
Tujhe dekha to yeh jaana sanam
Pyar hota hai deewana sanam
Tujhe dekha to yeh jaana sanam
Pyar hota hai deewana sanam
Ab yahan se kahan jaaye hum
Teri baahon mein mar jaaye hum….
মেহনূর ঘোরের মধ্যে থেকেই রোদেলার হাত ছাড়িয়ে নিতে নিতে বললো,
” হায় রাব্বা! কোই ভূত ইতনা হ্যান্ডসাম ঔর কিউট কৈসে হো সকতা হ্যায়? ”
রোদেলা আর তৃষ্ণা বিরক্ত হয়ে তাকালো মেহনূরের দিকে।মেহনূরে মাথায় তৃষ্ণা রাগে গাট্টা মেরে ববলো,
” এতই যখন পছন্দ হয়েছে। তাহলে ভূতের হাতে মরে গিয়ে ভূতের বউ হয়ে যা হারাম*জাদী। তারপর বছরে বছরে ভূতের বাচ্চা পয়দা করে ফুটবল টিম বানাস। আমরা গেলাম।”
তৃষ্ণা কথা শেষ করে সামনে তাকাতেই দেখলে একটা বাঁশের বারি তাদের দিকে পরবে পরবে। তৃষ্ণা আর রোদেলা জামায় হাত রেখে চোখ বুজে ফেলেছে। তবে মেহনূর এই জগতে নেই,বললেই চলে।এই যে একটা বাঁশের বারি তার দিকেও ধেয়ে আসছে, এটাকেও তার কাছে শ’খানেক লাল গোলাপ মনে হচ্ছে। মেহনূর নিজের কল্পনায় ঢুবে লাজুক ভঙিমায় বোকা বোকা হাসি দিচ্ছে।
নিজেদের উপর এতক্ষণে কোনো আঘাত আসতে না দেখে রোদেলা আর তৃষ্ণা চোখ খুলে তাকালো।দেখলো এই বাড়ির কেয়ারটেকার হাশিম কাকা বাঁশটা আটকে রেখেছে। হাশিম গলা খাঁকাড়ি দিয়ে বাঁশখানা কেড়ে নিতে নিতে ইরফানকে বললো,
” কি করেন ছোট সাহেব? এরা আপনার বড় নানার নাতি হয়। আপন মানুষের গায়ে হাত তুলবেন? ”
হাশিমের কথায় ইরফান নিজের সামনে দাড়িয়ে থাকা মেয়ে তিনটার দিকে চরম বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। রোদেলা,মেহনূর আর তৃষ্ণাও নিজেদের স্বাভাবিক করে হাশিমের কথায় কান দিল। মেহনূর এবার হাশিম চাচার কাছে এসে লাজুক ভঙিমায় হেসে ইরফানকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললো,
” এই ছেলেটা কে চাচা? ”
ইরফান মেহনূরের দিকে বিরক্তিতে তাকালো।হাশিম হেসে বললো,
” তোমার ছোট দাদার বড় মেয়ে আছে না? উনি তার ছেলে। ”
রোদেলারা নিজেদের অপরাধ আর ভুলভাল ভাবনা থেকে কি কি করেছে সব বুঝতে পেরে একসাথে সবাই জিভে কামাড় দিয়ে মাথায় হাত দিয়ে হায় হায় করে উঠলো।পরক্ষণে তারা পিছে গাছের সাথে বেঁধে রাখা সাইফানের দিকে তাকিয়ে দেখলো,সাইফান তাদের দিকে তাকিয়ে রাগে ফুঁশছে। তৃষ্ণা আমতা আমতা করে বললো,
” ওই ধলা পিচ্চিটাও বুঝি ছোট দাদার নাতি? ”
–
তৃষ্ণার কথায় ইরফান সহ সবাই গাছে বেঁধে রাখা সাইফিনের দিকে তাকালো। ইরফানের রাগে এবার গা পিত্তি জ্বলে উঠলো। ইরফান বিরক্তি নিয়ে মেয়ে তিনটাকে দেখে নিয়ে ভাইকে ছাড়াতে চলে গেল।
তৃষ্ণার কথায় কেয়ারটেকার হাশিম চাচা মাথা দুলিয়ে বললো,
” হ আম্মাজান। ওই ছোট ছেলে তোমাদের ছোট দাদার, ছোট মেয়ের এক মাত্র ছেলে। ছেলের বাপ আমেরিকান।দেখনা; ছেলেও কেমন বিদেশীগোর মতন হয়ছে। ”
রোদেলা চোরা চোখে তাকালো মেহনূর আর তৃষ্ণার দিকে।তারাও চোরা চোখে একে অপরকে দেখে নিল।তাদের চোখাচোখির মানে এই যে,
” উত্তেজনার বশে কি কাজটাই না করে বসলাম। ”
–
ইরফান সাইবানকে বাঁধন আগলা করে বিরক্ততে বাসার ভিতরে যাওয়ার জন্য হাটা ধরলো। তার হাতে মেহনূরের ওড়নাখানা। রোদেলারা সাইফানের কাছে গিয়ে তিনজন একসাথে বললো,
” ভুল হয়ে গিয়েছে পিচ্চি। এবারের মতো বড় বোনদের ক্ষমা করে দিও হে। ”
সাইফান উদার দিলের ছেলে। সাইফান হেসে ভাব নিয়ে বললো,
” ওকে।নিজের মানুষ বলে মাফ পেলে।তবে আমাকে পিচ্চি বলবে না একদম। ”
মেহনূর ইরফানকে নিজের ওড়নাটা নিয়ে চলে যেতে দেখে সে দৌড়ে ইরফানের সামনে গিয়ে দাড়ালো। ইরফান উচ্চতা প্রায় ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি।মেহনূরকে তার সামনে ছোট বাচ্চায় মনে হচ্ছে। মেহনূর ইরফানের ফর্সা তীক্ষ্ণ চোয়ালের দিকে তাকাতেই দেখলো ইরফান বিরক্তিতে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে আছে। মেহনূরের সেটা মোটেও ভালো লাগলো না।তবে কিছু না বলে সে বললো,
” বলছিলাম কি মিস্টার,আপনার হাতে রাখা ওড়নাটা আমার। আপনি ওইটা নিজের বউ এর ওড়না ভেবে হয়তো নিজের সাথে নিয়ে যাচ্ছেন।
ইরফান সামনে দাড়িয়ে থাকা মেয়েটার কথায় চরম বিরক্ত হলো। তারপর একপ্রকার রাগেই ওড়নাখানা মেহনূরের মুখ বরাবর ছুড়ে দিয়ে নিজের গৌন্তব্যে হাটা ধরলো ইরফান।
______________
রোদেলারা এই পরিস্থিতি কাটিয়ে কোনো রকম বেরিয়ে গেল তাদের ছোট দাদার বাড়ি থেকে। এবার গন্তব্য তাদের বান্ধবী ইমাদের বাড়ির দিকে।এই ইমাকেই সেদিন শিবলী রাতের আঁধারে ভুল করে আলিজার মা ভেবে উপদেশ দিয়ে এসেছিল।
পাঁচ মিনিট হাটার পর রোদেলারা ইমাদের বাড়িতে পৌঁছালো। ইমা বান্ধবীদের পেয়ে খুশিতে কয়েকটা লাফ দিল। ইমা ইন্টার সেকেন্ড ইয়ার এ পড়ে। তৃষ্ণা অনার্স ১ম বর্ষ আর মেহনূর ইন্টার ১ম বর্ষে।তাদের মাঝে ক্লাসের মিল না হলেও তারা বান্ধবী। মূলত ছোট বেলায় এক স্কুলে পড়ায় তাদের মাঝে এতো ভাব। তাছাড়া তৃষ্ণার বাবা আর ইমার বাবা বন্ধু।তাদের বাড়ি কাছাকাছি হওয়ায় মেহনূররা একসাথেই বড় হয়েছে। তাই বয়স,ক্লাস সব কিছু ছাড়িয়ে তাদের মাঝের বন্ধনটায় তাদের বন্ধুত্বের ভিত্তি মজবুত করে রেখেছে। আজকে ইমা রোদেলাকে প্রথমবার দেখে বেশ চমকেছে।রোদেলার পরিচয় জানার পর রোদেলাকে ইমার বাড়ির লোক ছাড়তেই চাইছিল না। অন্তত একটা দিন রোদেলাকে নিজেদের বাড়িতে রাখতে চেয়েছিল। তবে মাশরিফা বলে দিয়েছিল তাড়াতাড়ি চলে যাওয়ার জন্য।তাই তারা বাহানা দিয়ে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পরলো।
_____________
শিবলী নিজের রুমে বিছানায় শুয়ে তার ভেরিফাইড ফেসবুক প্রোফাইলে ঢুকলো। সকালে আপলোড করা গরুর সাথে ছবিটায় প্রায় 100 K + রিয়েক্ট হয়েছে।কমেন্ট বক্সেও হাজারটা মন্তব্য পরেছে। শিবলী এই ছবির কমেন্ট বক্সে ঢুকতেই একটা কমেন্টে তার চোখ আটকালো। যেটাতে প্রায় 1k + হা হা রিয়েক্ট পরেছে।অনেকে আবার এই কমেন্টের উত্তরও দিয়েছে।
কমেন্টটা শিবলী ভ্রু কুঁচকে পড়তে শুরু করলো,
” গরুর সাথে নিজের পিক দিয়েন না,
কোনটা আপনি কোনটা গরু চিনতে সমস্যা হয়। ”
এতো টুকু পড়েই শিবলীর চোয়াল ঝুলে গেল। শিবলী উৎসুক হয়ে কমেন্টকারীর নামটা পড়লো,
” Ifat Ara Ima ”
শিবলী ভ্রু কুঁচকে নিল নামটা পড়ে। নামটা তার চেনা চেনা ঠেকলো। শিবলী ঠোঁট কামড়ে মেয়েটার ফেসবুক প্রোফাইলে ঢুকতে নিয়ে দেখলো প্রোফাইল লক করা।শিবলী এটা দেখে ঠোঁট বাঁকালো। তারপর এই বিষয়টাকে আর পাত্তা না দিয়ে সে আহিয়নের কাছে চলে গেল আহিয়ানকে জ্বালাতে।
___
আহিয়ান গোসল করে ফ্রেশ সবে আরেকটা সাদা পাঞ্জাবি পাজামি পরে রেডি হয়েছে।খাওয়া, দাওয়া করে একটু বাইরে বের হবে সে। কিন্তু হঠাৎ নিজের রুমে শিবলীকে ঢুকতে দেখে আহিয়ান বিরক্তিতে চোয়াল শক্ত করে বললো,
” এখন আবার কি চাই? ”
শিবলী বাঁকা হেসে শিবলর বিছানায় গা এলিয়ে দিল। আহিয়ান বিরক্তিতে কটমট করে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে আয়নায় তাকালো নিজের চুল ঠিক করে নিতে।
তখনি শিবলী আচমকা আহিয়ানের সামনে এসে দাড়ালো। তারপর ফোন বের করে আহিয়ানের সাদা পাজামা পাঞ্জাবিতে র*ক্তে মাখা ছু*রি হাতে দাড়িয়ে থাকা ছবিটা দেখালো। আহিয়ান সেটা দেখে বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে নিল।এটা শিবলী তার ভেরিফাইড প্রোফাইলে পোস্ট করেছিল কিছুক্ষণ আগে।
ক্যাপশন দিয়েছে-
” এই ছবি ফেসবুকে কিছুদিন পর মানুষ দেখলে লোকটাকে বলবে একজন উগ্রবাদি জামায়েত শিবির এর নেতা। তবে আসলে সে আল্লাহর নামে কুরবানি দিয়ে ফিরেছেন। ”
এই পোস্টখানা মুহূর্তের মাঝেই ভাইরাল হয়ে গিয়েছ। হাজার খানেক শেয়ার পরেছে। আহিয়ান এটা দেখেই শিবলীর উপর চোখ কটমট করে তাকালো।তারপর শিবলীর কলার চেপে ধরে বললো,
” তাড়াতাড়ি ডিলিট কর এটা বেয়াদবের হাড্ডি। নয়তো আজ এমন জায়গায় কোপ বসাবো।জীবনে আর বংশের আলো জ্বালাতে পারবি না ফাজিল। ”
আহিয়ানের কথায় শিবলী চোখ বড় বড় করে তাকালো।আহিয়ানের বিশ্বাস নেই। সে শিবলীর বংশের বাতি নিভিয়ে দিতেই পারে। তাই শিবলী আর খেপালো না আহিয়ানকে। টুপ করে এফবিতে ঢুকে পোস্ট খানা ডিলেট করে দিল।
আহিয়ান এবার নিজেই শিবলীকে রেখে বেরিয়ে যেতে নিল, কারণ এই গন্ডারের সাথে থাকলে তার মাথা গরম হয়ে যাবে।আহিয়ান বেরুতে পারলো না। তার আগেই শিবলী তার পথ আটকে দাড়ালো।
আহিয়ান বিরক্ত হয়ে শিবলীকে সরিয়ে দিতে নিলে শিবলী আহিয়ানের দিকে একটা কাপড় ছুড়ে দিল। আহিয়ান বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে দেখলো এটা হুজুরদের বা মুসলিমদের পাঞ্জাবীর উপর গলায় ঝুলিয়ে পরার শেমাঘ। এটাকে অনেক জায়গায় কেফিয়েহ বা গুতরা বলে ডাকে। দেশ ও অঞ্চলের ভেদে নাম কিছুটা আলাদা হতে পারে।
আহিয়ান বিরক্তিতে সেটা হাতে নিয়ে বললো,
” এটা দিয়ে কি করবো? ”
শিবলী বাঁকা হেসে বললো,
এটা মাথায় আর মুখে বেধে আমার সাথে চুপচাপ রিলস বানাবি। যদি বানাস, তবে তোকে একটা জরুরি ইনফরমেশন দিব। কি রাজি ?
আহিয়ানা সোজাসুজি বলে দিল,
” নোপ ”
শিবলী বাঁকা হেসে বললো,
” আমি জানি তুই কি খুঁজছিস। আমি সবটা বলবো,তার আগে আমার সাথে তোকে আজকে রিলস বানাতেই হবে ব্রো। ”
আহিয়ান এক প্রকার বাধ্য হয়ে শিবলীর কথায় রাজি হলো। শিবলী নিজেই প্রথমে আহিয়ানের মাথায় শেমাঘটা বেঁধে দিয়ে মুখ ডেকে দিল। তার পর নিজেও একই ভাবে নিজের শেমাঘটা দিয়ে নিজের মুখ আর মাথা আবৃত করে আহিয়ানের দিকে তাকিয়ে ফাঁকা হাসলো। আহিয়ান বিরক্তিতে চোখ সরিয়ে নিল।
শিবলী আহিয়ানকে গিয়ে আয়নার সামনে বসতে বললো। আহিয়ান বিরিক্তি নিয়ে উঠে বসে তাই করলো। তারপর শিবলী নিজেও আহিয়ানের পিছনে গিয়ে দাড়ালো। ক্যামেরা অন করার পর শিবলী একটা গান এড করলো। হাবিবি গানটা চালু হতেই আহিয়ান আয়নায় নিজের চোখ নিবদ্ধ করে পিছনে দাড়িয়ে থাকা শিবলীর দিকে তাকালো। শিবলী বাঁকা হেসে আহিয়ানের রাগকে পাত্তা না দিয়ে গানের মিউজিকের তালে এটিউড নিয়ে ভিডিও করা শুরু করলো। পনেরো কি ষোল মিনিটের ভিডিও বানিয়ে শিবলী বিজয়ী হাসি দিল। তারপর সেটা নিজের ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করে দিল।
______________
খাওয়া দাওয়া শেষ করে আহিয়ান যখন সদর দরজা পেরিয়ে কয়েক কদম এগোলো । তখনি আচমকা তার উপর চারজন মানুষ হামলে পরলো।আহিয়ান নিজেকে সামলাতে না পেরে কিছুটা পিছনে সরে গেল। আহিয়ান তাল সামলাতে না পেরে পড়ে যেতে নিলে , শিবলীর সাথে ধাক্কা খেল আহিয়ান। শিবলী আহিয়ানকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে আটকালো পরে যাওয়া থেকে।শিবলী আর আহিয়ান সামনে তাকিয়ে দেখলো তাদের চার বন্ধু সাদাফ,রাফিন,রিদম আর আরাফাত আহিয়ানকে পাঞ্জা মেরে ধরে দাড়িয়ে আছে। এবার শিবলী এদেরকে দেখে নিজেও লাফিয়ে উঠলো। আহিয়ানের পিছনে শিবলীকে দেখে চারজন আবার লাফিয়ে উঠলো।আহিয়ান একটু আগে শিলীর পাল্লায় পরে সাদা জুব্বার সাথে শেমাগ পরেছিল। তাড়াহুড়োই শিবলী আর সে এটা পরেই বেরিয়ে এসেছিল। তবে কাকতলীয় ভাবে আহিয়ান আর শিবলীর বন্ধুদের পরনেও একই রকম সাদা জুব্বা আর শেমাগ। ছয়জনের চোখেই কালো সানগ্লাস।
–
আহিয়ানকে এবার শিবলীসহ পাঁচ জনই সামনে বা পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে হৈ হুল্লোড় করে লাফিয়ে উঠলো।আহিয়ান বন্ধুদের পাগলামি দেখে চুপ থাকলো। শিবলী বন্ধুদের গলা জড়িয়ে ধরে লাফাতে লাফাতে গান ধরলো,
পাগলা হাওয়ার তরে মাটির প্রিদিম নিভু নিভু করে
ওরে ওরে হাওয়া থামনারে বন্ধু আসছে বহুদিন পরে।।
পাগলা হাওয়ার তরে মাটির প্রিদিম নিভু নিভু করে ওরে ওরে হাওয়া থামনারে বন্ধু আসছে বহুদিন পরে।।
শিবলীর গানের তালে এবার বাকি চারজনও গলা মিলিয়েছে। আহিয়ান কেবল দাঁতে দাঁত চেপে বন্ধুদের পাগলামি দেখে যাচ্ছে চুপচাপ। শিবলী আবার গান ধরতেই সবাই তার সাথে তাল মিলালো,
পাগলা হাওয়ার তরে
মাটির পিদিম নিভু নিভু করে,
পাগলা হাওয়ার তরে
মাটির পিদিম নিভু নিভু করে,
ওরে ওরে হাওয়া থামনা রে..
বন্ধু আসছে বহু দিন পরে
ওরে ওরে হাওয়া থামনা রে…
বন্ধু আসছে বহু দিন পরে।
চন্দ্র গেছে দুর পরবাসে
তারা জ্বলেনি ঐ আকাশে
মাটির পিদিম নিভে গেলে
বন্ধুরে দেখবো কি করে।
চন্দ্র গেছে দুর পরবাসে
তারা জ্বলেনি ঐ আকাশে
মাটির পিদিম নিভে গেলে
বন্ধুরে দেখবো কি করে।
ওরে ওরে হাওয়া থামনা রে..
বন্ধু আসছে বহু দিন পরে
ওরে ওরে হাওয়া থামনা রে..
বন্ধু আসছে বহু দিন পরে।
____
বাড়ির সবাই সদর দরজার সামনে চিৎকার চেচামেচি শুনে দৌড়ে এলো। সবাই সদর দরজার সামনে এসে এমন একটা দৃশ্য দেখে হা হয়ে তাকিয়ে থাকলো।আহিয়ান এবার বিরক্ত হয়ে সবাইকে নিজের উপর থেকে ঠেলেঠুলে সরিয়ে দিতে দিতে বললো,
” এবার একটু থাম তোরা। দেখ চিল্লিয়ে পুরো বাড়ি মাথায় তুলেছিস । ”
আহিয়ানের কথায় সবাই শান্ত হয়ে আশেপাশে সবাইকে এভাবে হা করে নিজেদের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সবাই বোকা বোকা হাসি দিল। রাফিন,আরাফাত,রিদম,সাদাফ এবার বড়দের সবাইকে সালাম জানিয়ে, ভালোমন্দ জিঙ্গাসা করলো।
মাশরিফা আর আইরিন এদের জোরাজুরি করেও ঘরে আনতে পারলো না।বললো সবাই পরে আসবে। এখন আহিয়ান আর শিবলী যেহেতু বেরিয়ে যাচ্ছে। তাই তারাও তাদের সাথে যাবে।অর্ণ বাড়িতে নেই,সেও তার বন্ধুদের সাথে বেরিয়েছে।আহিয়ানদের বাড়িতে একটা জিপ গাড়ি আছে। আহিয়ান সেটা বের করে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসলো।শিবলী আহিয়ানের পাশের সিটে বসেছে। বাকি চারজন পিছনে বসেছে।আহিয়ান চুপচাপ স্বভাব সুলভ গম্ভীর মুখ করেই গাড়ি চালাচ্ছে।
আহিয়ানকে এরকম চুপচাপ থাকতে দেখে রাফিন বললো,
” অভ্র মুখানা এরকম গম্ভীর করে রেখেছিস কেন? এনিথিং রং? বউ মনি কেমন আছে?তোদের সংসার ভালো ভাবে চলছে তো? ”
রাফিনের প্রশ্নে সমস্ত গাড়িতে নিরবতা নেমে এলো। সবাই আহিয়ানের থেকে উত্তরের আসায় তার দিকে উৎসুক হয়ে তাকিয়ে রইল।তবে আহিয়ানের থেকে একটা জবাবও কেউ পেল না। আহিয়ান সেভাবেই গাড়ি চালাতে চালাতে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো কেবল। মুহূর্তেই সবার মুখ মলিন হয়ে উঠলো।শিবলী পরিস্থিতি বুঝতে পেরে বললো,
” দেখছিস না মেজর সাহেব ভাবের ঠেলায় কথা বলতে পারছে না। ভাই আমার বিয়াত্তা, ভাব তো থাকবেই। ”
শিবলীর কথায় সবাই হেসে ফেললো।আহিয়ানের ঠোঁটও খানিকটা বাঁকতে দেখা গেল।আহিয়ান এবার গাড়ির স্টেয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে বললো,
” জীবনে একটা মাত্র বিয়ে করলাম, তাও এখন পর্যন্ত সেটার কোনো ফজিলত পেলাম না।আর তোরা আমাকে সেই বিয়ে নিয়ে টিটকারি মেরে কথা বলিস। ইটস নট ফেয়ার। ”
আহিয়ানের মুখ থেকে এমন কথা বন্ধুমহল শুনতে পারবে তা যেন কেউ কল্পনাও করেনি। সবাই আহিয়ানের কথায় শব্দ করে হেসে ফেলল এক সাথে।
ঠিক তখনি রঙ সাইডে আসা একটা ট্রাক ধেয়ে আসতে থাকলো আহিয়ানদের জিপের দিকে। আহিয়ান সহ সবাই সেটা দেখে চোখ বড় বড় করে ফেলল। আহিয়ান স্টেয়ারিং এ হাত রেখে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে লাগলো ট্রাকটাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার জন্যহ কিন্তু ট্রাকটা ইচ্ছকৃত ভাবেই যেন তাদের গাড়ির দিকে জেনে শুনে ধেয়ে আসছে। তারপর মুহুর্তেই বিকট শব্দে চারপাশটা কেঁপে উঠলো।
চলবে…..
( বিশাল বড় একটা পর্ব দিয়েছি। ১৪ পর্ব আজকে শেষ হলো। সবাই বেশি বেশি রেসপন্স করবেন। সবাই ফলো দিবেন। আপনারা নিরবে গল্প পড়ে চলে যান এইটা কতটুকু ঠিক আপনারই বিবেচনা করে দেখবেন। )
#মনটা_তারই_সুরে_অনুরাগিনী লিংক –
https://www.facebook.com/61581445095817/posts/122135154681048169/
সবাই গ্রুপে জয়েন হয়ে গল্প সম্পর্কে মতামত জানাবেন।
গ্রুপ লিংক- https://facebook.com/groups/2493488501095403/

