#মনটা_তারই_সুরে_অনুরাগিনী [ পর্ব-১৯.২ ]
#মেহুলিনা_প্রাপ্তি
রোদেলা ফোনের দিকে তাকিয়ে চিন্তায় ডুবে থাকতে থাকতেই দুইবার রিং হয়ে কল কেটে গেল। রোদেলা হাফ ছেড়ে বাঁচলো যেন এ যাত্রায়। রোদেলা ফোনের অপর পাশের লোকটাকে মনে মনে বকে গুষ্ঠি উদ্ধার করতে করতে নিচে এলো। আজকে বিকালে অন্ত এসেছে। স্কুল থেকে তার আম্মুকে না জানিয়ে বাসার গাড়িতে করে এখানে চলে এসেছিল। তারপর যখন এখানে এসে নানু,নানাভাই, মামিকে না দেখতে পেয়ে চলে যেতে নিচ্ছিল। তখনি রোদেলাদের গাড়িটাও প্রবেশ করেছিল বাড়িতে।পরে নানু,মামি আর নানাভাইকে দেখে আর যায়নি।
__________________
কয়েকদিন ধরে গরমের তীব্রতাটা খুব বেড়েছে।জাবির সাহেব নিজের কলেজ থেকে ফিরেই স্ত্রীকে হাক ছেড়ে ডাকতে ডাকতে নিজেদের রুমে এলো।আহিয়ানের ছোট চাচ্চু,আরভিদ আহমেদের বিয়ে ঠিক হয়েছে।সামনের শুক্রবারে বিয়ের দিনকাল ঠিক করা হয়েছে। আজকে রবিবার।বিয়ের আর মাত্র চারদিন বাকি আছে। জাবির সাহেব স্ত্রীকে তাড়া দিচ্ছেন দ্রুত গোছগাছ করে নিতে।
রোদেলাকে জাবির সাহেব ডাকতে লাগলো,
—- ” রোদেলা , আম্মু একটু এদিকে আয় তো । ”
রোদেলা আহিয়ানের রুমেই জয়ের মাথার চুল গুলো আঁচড়ে দিচ্ছিল।সবে ছেলেটাকে সে গোসল করিয়ে এনেছে। গা মুছিয়ে জয়ের শরীরে কাপড় জড়িয়ে ছেলেটার চুল গুলো পরিপাটি করে দিচ্ছিল।তখনি শ্বশুরের ডাক শুনে রোদেলা মাথায় কাপড় টেনে ছোট জয়কে কোলে নিয়ে মাশরিফার ঘরের দিকে পা বাড়ালো।
রোদেলার পরিক্ষা শেষ হয়েছে সাতদিন হতে চললো। অন্বেষা আর অবন্তির বাচ্চা তিনটা নানু বাড়ি আসবে,মামির কাছে যাবে, বলে মাথা খেয়ে ফেলছিল। রোদেলার পরিক্ষা থাকায় এতোদিন কোন মতো এদের ভুলিয়ে ভালিয়ে রেখেছিল তারা। রোদেলার পরিক্ষা শেষ হতেই রোদেলা নিজেই বাচ্চাদের তার কাছে রেখে যেতে বলেছিল। অন্ত আর অনন্যা এসেছে রোদেলার যেদিন পরিক্ষা শেষ হলো সেদিনিই আর জয়কে অবন্তি চার দিন হলো এখানে রেখে গিয়েছে। ছোট জয় মা বাবাকে ভুলে একদম মামির নেওটা হয়ে গিয়েছে যেন।সারাদিন পুঁচকেটা মামির আঁচল ধরে ঘুরে বেড়ায়।
অন্ত আর অনন্যা রোদেলার বাম হাত ডান হয়ে গিয়েছে।তাছাড়া অন্ত একপ্রকার মামির বডিগার্ড এর দায়িত্ব পালন করছে এই বয়সেই।রোদেলা বাইরে একটু বের হলেও ছেলেটা পাই পাই করে জবাব নেয়।সেদিন একটু বান্ধবীদের সাথে ঘুরতে বের হয়েছিল রোদেলা অন্ত তার মামির দেখভাল করার জন্য নিজেও চলে গিয়েছিল মামির সাথে।পথে এক ছেলে রোদেলাকে দেখে শিস বাজিয়েছিল বলে, অন্ত সেই ছেলের কপাল বরাবর গুলতি দিয়ে পাথর মেরে কপাল ফাটিয়ে দিয়েছিল।
________
রোদেলা জয়কে কোলে নিয়ে মাশরিফার রুমে ঢুকতেই দেখলো, মাশরিফা বিছানার উপর কাপড়-চোপড়, শাড়ি আর কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখছে। আর জাবির সাহেব আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে বারবার ঘড়ি দেখে স্ত্রীকে তাড়া দিচ্ছেন।
—”আর কতক্ষণ লাগবে তোমার? আমি তো সেই কখন থেকে তৈরি হয়ে বসে আছি!”
মাশরিফা ভ্রু কুঁচকে স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলল,
—-“হ্যাঁ, আপনি তো শুধু শার্ট-প্যান্ট পরে দাঁড়িয়ে গেলেই তৈরি। আমাদের কত কিছু গুছাতে হয়, সেটা বুঝবেন কী করে?”
জাবির সাহেব মুখটা কাঁচুমাচু করে চুপ করে গেলেন।
রোদেলা ছোট্ট করে হেসে বলল,
—-“আম্মু, তোমরা আজকেই গোছগাছ করে নিচ্ছো?”
মাশরিফা তখন হাসিমুখে বলল,
—-“হ্যাঁ! তোর ছোট চাচ্চুর, মানে আরভিদের বিয়ে ঠিক হয়েছে। সামনের শুক্রবার বিয়ে। আমরা বিকেলেই গ্রামের বাড়িতে চলে যাব। এত আয়োজন, এত কাজ,আগে না গেলে কী হয়?”
রোদেলা একটু অবাক হয়ে বলল,
—-” আজকেই গ্রামে যাবো আমরা? ”
জাবির সাহেব এবার এগিয়ে এসে বললেন,
—-“হ্যাঁ মা, এবার তোরও অনেক কাজ। তুই তো বাড়ির মেজো বউ। তোর চাচা শ্বশুরের বিয়েতে তুই না থাকলে চলে?”
রোদেলার মুখে মিষ্টি হাসি ফুটল।
—-” হুম,মানে আমি কি আর তেমন দায়িত্ব নিতে পারি নাকি ?”
জাবির সাহেব নাটকীয় ভঙ্গিতে বললেন,
—-“পারিস না মানে? আমাদের তিনটা পিচ্চি দস্যুকে সামলাতে পারিস, এটাও তো বিশাল যোগ্যতা!”
কথাটা শুনে মাশরিফা আর রোদেলা দুজনেই হেসে ফেলল।ঠিক তখনই ছোট জয় মামির কোল থেকে মুখ তুলে বলল,
—-“আমিও বিতে যাব।”
তারপর একটু ভেবে আবার বলল,
—-“আমি নুতুন জামা পব্বো।”
অনন্যা আর অন্তও ছুটে এলো। মাশরিফা সবাইকে তাড়া দিল তৈরি হয়ে নিতে,তারা আজকেই চলে যাবে গ্রামে। অন্বেষা আর অবন্তি তাদের হাসব্যান্ডদের নিয়ে পরে যাবে সেখানে। রোদেলা শাশুড়ির কথা মতো নিজের রুমে গিয়ে তৈরি হয়ে নিল। তারপর অনন্যা আর জয়কে রেডি করে দিল। অন্ত বুঝদার ছেলে সে আগে আগেই তৈরি হয়ে নিয়েছে।
বিকাল চারটা নাগাত তারা রওনা হলো।রোদেলারা আহিয়ানদের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা নেমে এলো। রোদেলাদের গাড়ি থেকে নামতে দেখেই মেহনূর,তৃষ্ণা আর আফরিণ দৌড়ে এলো। রোদেলকে তিন জন একসাথে জাপটে ধরে খুশির ঠেলায় হৈ হৈ করে উঠলো।রোদেলাও খুশি হয়ে দুই হাতে যতুটুটু পারা যায় সবাইকে আঁকড়ে ধরতে লাগলো। তখনি আইরিন বেগম চেঁচিয়ে পুত্রবধু আফরিণকে বলতে লাগলো,
—- ” আরে বড় বউ, করো কি করো কি? তোমার কি খালি শরীর নাকি? পোয়াতি হয়ে এভাবে লাফাচ্ছ কেন বাপু? ”
আইরিনের ধমকে সবাই থেমে গেল। আরফিণ কাচুমুচু করে সরে গিয়ে একটু দূরে দাড়ালো।রোদেলা গিয়ে আইরিন আর জয়াকে সালাম করলো। তাদের পিছনের আহিয়ানের দাদি আলফিনা এসে দাড়িয়েছে। রোদেলাকে ডাক দিলেন তিনি। রোদেলা দাদী শাশুরির কাছে গিয়ে সালাম করলো। রোদেলার একটা হাত ধরে আলফিনা ভেতরে নিয়ে গেল।
_______________
ছোট চাচ্চুর বিয়ে উপলক্ষ্যে শিবলী এইবার লম্বা ছুটি নিয়ে, কয়েকদিন আগেই এসে পড়েছে।আহিয়ান এখনও আসেনি। আহিয়ান বিয়ের একদিন কি দুইদিন আগে আসবে হয়তো।
শিবলী বাড়ির ছাদে দাড়িয়ে কবুতরদের গম ছিটিয়ে দিচ্ছিল খাওয়ার জন্য। তার পাঁচটা কবুতর ছিল। দুইটা আগেই হারিয়ে গিয়েছিল।কোথায় যে উড়ে গিয়েছল,তারপর আর ফিরে আসেনি। একদম মালিকের মতো ছন্নছাড়া কিনা।শিবলীর অবশ্য সেসব নিয়ে মাথা ব্যথা ছিল না।তবে তার আজ সত্যিই রাগ লাগছে কেন না, বাকি তিনটা কবুতর এর থেকেও একটা কবুতরও উড়ে চলেগিয়েছে।
–
গতকাল শিবলী বাড়িতে ফিরে কবুতর তিনটার কাছে এসেছিল। তখন এই কবুতর তিনটা কি সুন্দর কুটুর কুটুর শব্দ করে খাচ্ছিল আর উড়ে বেড়াচ্ছিল। তখনি পাশের বাড়ি মানে ইমাদের বাড়ি থেকে একটা পায়রা উড়ে এসে শিবলীর পায়রার সাথে ভাব জমিয়েছিল। শিবলী সেটা দেখে ঠোঁট বাঁকিয়ে নিচে চলে গিয়েছিল। তাই শিবলীর আজ সন্দেহ হচ্ছে,তার সবগুলো কবুতর নিশ্চই ওই পায়রাটায় ভাগিয়ে নিয়ে গিয়েছে।
–
আহিয়ান আর শিবলীদের বাড়ির পাশে আমির সাহেবের বড় ভাইয়ের বাড়ি। এরপর আশেপাশে আর বাড়িঘর নেই। অনেকটা দূরে ইমাদের বাড়ি। শিবলীদের ছাদ থেকে ইমাদের তিনতলা বাড়িটা অনায়াসে নজর পড়ে।শিবলী দাঁতে কড়মড় করে ইমাদের বাড়ির ছাদের দিকে তাকিয়ে বলল,
—-” পাশের বাড়ির মেয়েটার পায়রাটা উড়ে এসে আমার কবুতরটাকে ভাগিয়ে নিয়ে গেল। এটা কোনো কথা? কত সাধের কবুতর আমার। কই ভাবলাম শুক্রবার আসলে, ওরে ছোট ছোট দেশি গোল আলু দিয়ে রাঁধাবো আম্মাকে দিয়ে।না, তার আগেই হারামিটা লীলা খেলা করতে ভেগে গেল। ভন্ড কবুতর আমার। বলি মালিকের দুঃখটা একটু বুঝলে, কি এমন ক্ষতি হতোরে হারামি । ”
শিবলী কথা গুলো বলে দাঁতে কড়মড় করে নিচে নামতেই জয়, অন্ত আর অনন্যাকে দেখে চোখ বড় বড় করে তাকালো। জয় শিবলীকে দেখে ফিচেল হেসে রোদেলার আঁড়ালে গিয়ে লুকিয়ে পড়লো। মেহনূর আর তৃষ্ণা তা দেখে হেসে হেসে বলল,
—- ” দেখলে সেজো ভাই,তুমি মানুষটা যে বেশি সুবিধার নও, তা এই পিচ্চিটাও বুঝে গিয়েছে। ”
শিবলী বোনদের কথায় হাত নাড়ি ঠোঁট বাঁকালো তারপর বলল,
—- ” এই তোদের নিটকানি থামাতো।”
শিবলী রোদেলাকে ইশারা করে বলল,
—- ” ফুলকলি আসিয়াছেন দেখি,ভালো আছো? ”
রোদেলা মাথার ওড়নাটা আরও বড় করে কপাল সমান টেনে নিয়ে বলল,
—- ” আলহামদুলিল্লাহ,ভালো আছি ভাইয়া। আপনি কেমন আছেন? ”
—- ” ভালো। ”
অন্ত আর অনন্যা দৌড়ে এসে শিবলীর দুই হাত ধরে দাড়ালো। জয় তা দেখে শিবলীর দিকে তাকিয়ে উঁকি দিয়ে মাথা আর মুখটাকে অদ্ভুত ভাবে নাড়িয়ে বিজলালো,
—- ” বেবে বেবে। ”
শিবলী ভাগ্নের সাহস দেখে আসমান থেকে পড়লো যেন। সবাই খিলখিল করে হাসতে লাগলো। শিবলী চোখ কুঁচকে তাকালো রোদেলার মুখের দিকে। রোদেলা থমথম খেয়ে হাসি থামিয়ে মাথা নুইয়ে নিল। শিবলীর বাঁকা হেসে ভাগ্নের দিকে এগুলো,তারপর খপ করে জয়কে রোদেলার আঁড়াল থেকে ধরে ফেলল।তারপর ইচ্ছা মতো দলায় মালায় করে উল্টে পাল্টে ভাগ্নের থেকে প্রতিশোধ নিতে নেমে পড়লো। জয় চিৎকর পেরে তার মামি,নানু,নানা আর ভাই-বোনদের ডাকতে লাগলো। রোদেলা জয়ের পা ধরে টানতে লাগলো ছোটানোর জন্য। তৃষ্ণা আর মেহনূর যেয়ে শিবলীকে কাতুকুতু দিতে লাগলো। তাতেও যেন টলছে না সে।
এবার অনন্যা আর অন্তও সাহস করে তাদের মামুকে কাতুকুতু দিতে লাগলো জয়কে ছাড়ার জন্য।শিবলীর থেকে জয়কে ছাড়ানো যাচ্ছে না,দেখে অন্ত শয়তানি হাসি দিয়ে বলল,
—- ” সেজো মামু,তোমার প্যান্টের চেইন খোলা হি হি হি। ”
ভাগ্নের কথাটা শিবলীর কানে বাজতেই তড়াক করে জয়কে কোল থেকে ফ্লোরে নামিয়ে দিয়ে,দুই হাত প্যান্টের উপর আড়াআড়ি করে ধরলো। তারপর লজ্জায় আর কোনো দিকে না তাকিয়ে,পিছনে ঘুরে নিজের রুমে চলে গেল। শিবলীকে এভাবে লেজ গুটিয়ে পালাতে দেখে সবাই হাসতে লাগলো। সবাই জানে অন্ত মিথ্যে বলেছে,তবে শিবলীকে জব্দ করতে পেরে সবাই হেসে কুটিকুটি। রোদেলা মিটি মিটি দুইবার হেসে নিজর রুমে গেল। বাকি সবাই এখানেই দাড়িয়ে থাকলো।
____________________
রাতের বেলা রোদেলা, এই বাড়িতে আহিয়ানের যে রুমটা আছে সেখানে শুয়ে পরলো।তার এক পাশে শুয়ে আছে অনন্যা আর অন্য পাশে জয়। এতদিন ওই বাড়িতে বাচ্চা দুইটা রোদেলার সাথে থাকতে থাকতে,তাদের মামির পাশে ঘুমানোর অভ্যাস হয়ে গিয়েছে ।অন্ত গিয়ে শুয়েছে তার ছোট মামা অর্ণের ঘরে।মেহনূর আর তৃষ্ণার রুম একটায়। ওরা দুইজন এক রুমেই ঘুমায়। বাকি সবার আলাদা রুম আছে।
–
রাত প্রায় একটা বাজছে, রোদেলার চোখে ঘুম আসছে না। অবাধ্য মনটা বারবার আহিয়ানের জন্য উথাল পাথাল করছে। তবে সেই মানব কি আর এসবের ধার ধারে। তিনি তো রোদেলাকে স্ত্রী হিসাবেও মানতেও নারাজ। রোদেলার খুব কষ্ট হয় এই কথা মনে পড়ে। এই এক ছোট জীবনে সে যেদিকেই হাত বাড়ালো,সেদিকেই কেবল শূন্যতাই পেল। রোদেলার চোখ ভিঁজে এলো। আজকাল তার নিজের প্রতি খুব বিরক্ত লাগে,কেন যে এই পাষাণ পুরুষের মায়ায় পড়তে গেল?রোদেলা তো নিজের অনুভূতি এতকাল নিজের মধ্যেই লুকিয়ে রেখেছিল,তাহলে হুট করেই বিধাতা কেন সেই পুরুষকেই তার জীবনের অংশ বানিয়ে দিল।
রোদেলা আগে ভাবতো এটা বোধহয় তার আবেগ। কেউ শুনলে তো হাসাহাসিরই করার কথা তাই না।এক রাতে এক পুরুষ একটা কিশোরী মেয়েকে বাঁচালো,মেয়েটার সম্ভ্রম বাঁচালো,অতপর সাবধানে মেয়েটাকে তার গন্তব্যে পৌঁছে দিল। আর তাতেই অবুঝ কিশোরী নিজের ধ্যান জ্ঞান ভুলে ডুবে গেল সেই অমানিশায়। অমানিশার প্রগাঢ়তা না জেনে,কিশোরী তলিয়েছিল অতল গহ্বরে।
রোদেলা কাঁদতে কাঁদতে এপাশ থেকে ওপাশ ঘুরে শুয়েছে।চোখের পানি যেন আজ ভেঙেছে।অবাধ্য জল গড়িয়ে পড়তে পড়তে ভিঁজে যাচ্ছে বালিশটা।তখনি অনন্যা কাচুমুচু করে জেগে গেল। মামিকে নিজের মুখের কাছে দেখে, অনন্যা আরও মামির কাছ ঘেঁষে শুয়ে পরলো।রোদেলাও মেয়েটার গায়ে পাতলা কাঁথা টেনে দিল।
অনন্যা ঘুমুঘুমু চোখে মিনমিনে স্বরে বলল,
—- ” একটা গল্প শোনাও না মামি। ”
রোদেলা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে দেখলো। অনন্যা চোখ বুজেই এসব বলছে। রোদেলা বুঝতে পারলো মেয়েটা এখনি ঘুমিয়ে পরবে। তাকে গল্প শোনানোর প্রয়োজন নেই। তাই অবলিলায় রোদেলা নিজের চোখের পানিটুকু মুছতে মুছতে নিজের জীবনের দৃশ্যপট তুলে ধরলো,
—- ” এক কিশোরী নিজের পরিণতির কথা না ভেবেই,মায়া নামক মরণ ফাঁদে পা দিয়েছিল।কিশোরী অবুঝ ছিল, তাই তো নিজের ভালো বুঝেনি।অতপর,সেই মায়া নামক চার দেয়ালের মাঝে আবদ্ধ হয়ে,কিশোরী আজও নিজেকে তিলে তিলে ক্ষতবিক্ষত করছে। ”
রোদেলা এতটুকু বলেই থামলো। চোখ দিয়ে বড় বড় ফোঁটায় টুপটাপ অশ্রুর ধারা নেমে,ভিঁজিয়ে দিচ্ছে বালিশখানা।অনন্যা ঘুমিয়ে পড়েছে অনেক আগেই। রোদেলারর বুকের ভেতরটা খুব হাসফাঁস করছে। পাঁচ মিনিট এ কাত ও কাত করেও যখন চোখে ঘুম নামছিল না,তখন সে উঠে বসলো। গলার ওড়নাটা শরীরে ভালো করে জড়িয়ে রোদেলা বেলকনিতে গিয়ে দাড়ালো। বাইরে ঝড়ো-হাওয়া বয়ছে।দমকা হাওয়া ছুটে এসে রোদেলার মাথার কাপড় ফেলে দিল। রোদেলা সেটাকে আর তোলার চেষ্টা করলো না। তার দৃষ্টি আঁটকালো রাতের দূর আকাশে চাঁদের দিকে। যেটা একটু পরপর মেঘের আঁড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে,আবার মেঘের আঁড়ালে গা ঢাকা দিচ্ছে।রোদেলা সেদিকে তাকিয়েই চোখ বুজে ফোঁস করে নিশ্বাস ছাড়লো। চোখ বুজতেই মেয়েটার বাম চোখ থেকে বড় ফোঁটায় অশ্রু বিসর্জণ হলো। অশ্রু ফোঁটা কিশোরীর পেলব গাল বেয়ে গড়িয়ে পরলো সোজা বেলকনির ফ্লোরে।রোদেলা পাঁচ মিনিট সেভাবেই দাড়িয়ে থাকলো।
__
হঠাৎ করেই আবহাওয়া আরও খারাপ হতে লাগলো। মেঘ গুড়মুড় করে গর্জন তুলে বর্ষণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।আচমকা বিদ্যুৎ চমকানির গর্জনে, মুহূর্তেই চারপাশের নীরবতাকে চূর্ণ হয়ে গেল। দূরের তালগাছগুলোর মাথা দুলে উঠল ঝোড়ো হাওয়ার তাণ্ডবে।
বাতাসের তোড়ে রোদেলার এলোমেলো চুলগুলো বারবার মুখের ওপর এসে পড়তে লাগলো, কিন্তু সেগুলো সরানোরও যেন শক্তি নেই তার। নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল সে।প্রথম বৃষ্টির ফোঁটাটা এসে পড়ল তার হাতের পিঠে। তারপর আরেকটা এসে পরলো ঠোঁটের উপর। তারপর পাঁচ ছয়টা ফোঁটা এক সাথে এসে পড়লো রোদেলার পুরো চোখে মুখে। অল্প সময়ের মধ্যেই টুপটাপ শব্দে ভিঁজে উঠল বারান্দার কার্নিশ।
রোদেলা হাত বাড়িয়ে দিল আকাশের দিকে। বৃষ্টির ঠান্ডা জল তার তালু ভিজিয়ে দিতে লাগল।তার মনে হতে লাগলো,
—- ” বুকের ভেতরের দহনটা যদি এভাবেই ধুয়ে যেত! যদি এই বর্ষণ মনটাকেও ভিজিয়ে সমস্ত না-পাওয়া, সমস্ত অভিমান মুছে দিতে পারত! ”
মেয়েটা চোখ বন্ধ করে নিল।তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস বুকের গভীর থেকে বেরিয়ে এলো।
—”আল্লাহ! আমি তো খুব বেশি কিছু চাইনি। শুধু একজন মানুষের মনে আমার জন্য এক চিলতে জায়গা চেয়েছিলাম। সেটাও কি এই বান্দাকে দিতে পারছো না তুমি। ”
কথাগুলো ঠোঁট পেরিয়ে বাইরে বের হলো না। কেবল বুকের ভেতরই প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।ঠিক তখনই তীব্র এক ঝলক বিদ্যুৎ আকাশ চিরে নেমে এলো। আলোটা ক্ষণিকের জন্য পুরো উঠোন আলোকিত করে আবার মিলিয়ে গেল অন্ধকারে।রোদেলা চমকে চোখ খুলতেই অনুভব করল, বিপরীত দিকের বারান্দায় যেন কারও একটা অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে।ঝড়ের দাপট আর বৃষ্টির পর্দায় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না লোকটার মুখ। তবে লোকটা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেন অনেকক্ষণ ধরেই এই দিকেই তাকিয়ে আছে অপলক ভাবে।রোদেলার বুকটা ধক করে উঠল।সে কপালের ওপর ঝুলে পড়া ভেজা চুলগুলো সরিয়ে আবার তাকাল।পরমুহূর্তেই আরেক দফা বিদ্যুৎ চমকালো।সেই ক্ষণিকের আলোয় পরিচিত দীর্ঘদেহী ছায়ামূর্তিটা স্পষ্ট হয়ে উঠল।
রোদেলা বিষ্ময় ভরা চোখে তাকিয়ে উচ্চারণ করলো,
—- ” আমার অভ্র ”
রোদেলার নিঃশ্বাস যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
—- ” কখন এলো মানুষটা?কেউ তো বলেনি সে আজই ফিরবে! ”
আহিয়ানও নিশ্চুপ। দুইজনের মাঝখানে শুধু ঝরে পড়ছে অঝোর বৃষ্টি আর গর্জে উঠছে আকাশ।কত কথা জমে আছে দু’জনেরই, অথচ কেউ একটি শব্দও উচ্চারণ করল না।
দূরত্বটা খুব বেশি নয়, কিন্তু তাদের মাঝখানের নীরবতা যেন বহু বছরের।রোদেলা তাড়াতাড়ি ওড়নাটা মাথায় টেনে নিল। চোখের কোণে জমে থাকা জল বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে গেল। সে ধীরে ধীরে দৃষ্টি নামিয়ে নিল মাটির দিকে।আর ঠিক তখনই আহিয়ান নিঃশব্দে বারান্দা থেকে সরে গেল।
রোদেলা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।বুঝতে পারলো ওপাশের বারান্দায় আহিয়ান দাড়িয়েছিল না। সেটা ছিল রোদেলার হ্যালুসিনেশন।। রোদেলা মনে মনে বিড়বিড়ালো,
—-” এই মানুষটা এত কাঠখোট্টা কেন? ঠিক মরিচীকার মতোই, একবার কাছে আসলে, আবার বার্তা ছাড়ায় দূরে সরে যায়। রেখে যায় শুধু অকারণ অপেক্ষা আর এক বুক না বলা অনুভূতির ভার। ”
চলবে…
( এই পর্বে 1.5 k রিয়েক্ট পূরণ হলেই নতুন পর্ব আসবে। তাই সবাই বেশি বেশি রেসপন্স করবেন)

