#অভিমাননামা
#md_shifu /৫ম পর্ব
ঢাকায় আসার আজ পাঁচ দিন হয়ে গেছে। অন্য দিনের তুলনায় আজ একটু তাড়াতাড়িই ঘুম থেকে উঠল সাজেদ। কারণ আজ তার নতুন অফিসে যোগদানের প্রথম দিন। নতুন কর্মজীবনের শুরু নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা উত্তেজনা আর অজানা এক ধরনের নার্ভাসনেস কাজ করছে তার মধ্যে। তবে এই পাঁচ দিনে শুধু সময়ই এগোয়নি, বদলে গেছে অনেক কিছু। যে সাজেদ নিজের আত্মসম্মানের কারণে এতগুলো বছর ফুফির বাসায় আসেনি, আর যখন এসেছিল তখনও স্পষ্ট শর্ত দিয়েছিল যে সে কারও সঙ্গে বেশি মিশবে না সেই সাজেদই এখন প্রতিদিন সবার সঙ্গে বসে নাস্তা করে, দুপুর রাতের খাবার খায়। অবশ্য শুরুটা নিজের ইচ্ছায় হয়নি।
টানা দুই-তিন দিন ধরে সাইফের জোরাজুরিতে শেষ পর্যন্ত আর না করতে পারেনি সে। প্রথম দিকে নিজের রুমেই খাওয়া-দাওয়া করত সাজেদ। নিচে নেমে সবার সঙ্গে বসার কোনো আগ্রহই ছিল না তার। কিন্তু সাইফ প্রতিবারই একই কথা বলত “এভাবে আলাদা হয়ে থাকলে হবে? এটা তো তোরও পরিবার।” প্রথমে কথাগুলো গুরুত্ব না দিলেও বারবার শুনতে শুনতে একসময় আপত্তি করার শক্তিটাই হারিয়ে ফেলেছিল সাজেদ। তাই বাধ্য হয়েই একদিন নিচে নেমে সবার সঙ্গে খেতে বসেছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এরপর আর তাকে কখনো জোর করতে হয়নি। কারণ সেই প্রথম দিনেই সে দেখেছিল তায়েবাকে। তারপর থেকে নিচে নেমে খাওয়া যেন তার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেল। পরিবারের সবাই ভেবেছে, হয়তো এতদিনের অভিমান ভুলে অবশেষে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে সাজেদ। কিন্তু আসল কারণটা একমাত্র সে নিজেই জানে।আর সেই কারণটা হলো তায়েবা।
মানুষ হয়তো ঠিকই বলে, ভালোবাসা মানুষকে বদলে দেয়। কখনো কখনো নিজের অহংকার আর আত্মসম্মানের কিছু অংশও বিসর্জন দিতে হয়। সাজেদেরও হয়েছে ঠিক তাই। তবে এতে তার কোনো আফসোস নেই। যদি সেই অজুহাতে প্রিয় মানুষটাকে একটু বেশি দেখা যায়, তাহলে ক্ষতিটাই বা কোথায়?
এই কয়েক দিনে কোহিনূরের সঙ্গেও তার সম্পর্ক অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। আগে যেখানে প্রয়োজন ছাড়া একটা কথাও বলত না, এখন মাঝেমধ্যে দু-একটা কথা বলে, খোঁজখবর নেয়। আর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়েছে অন্য জায়গায়। চাঁদ আর তায়েবাকে পড়ানোর দায়িত্ব এখন সাজেদ নিজেই নিয়েছে। যেহেতু তারা একই বিষয়ে পড়াশোনা করছে, তাই পরিবারের সবার অনুরোধে সে রাজি হয়ে গেছে। অবশ্য পরিবারের সবাই মনে করছে, সে শুধুমাত্র দায়িত্ববোধ থেকেই এই কাজটা করেছে। কিন্তু সাজেদ জানে, এর পেছনে আরেকটা কারণ আছে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট একটা সময় তায়েবার সামনে বসে থাকার সুযোগ সে কোনোভাবেই হাতছাড়া করতে চায় না।
আজ থেকে তার নতুন কর্মজীবনেরও শুরু। ঘুম থেকে উঠেই ফ্রেশ হতে চলে গেল সে। ফ্রেশ হয়ে পরিপাটি করে তৈরি হলো। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ব্যাগ আর অন্যান্য জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে নিচে নেমে এলো। ডাইনিং রুমে ঢুকতেই দেখতে পেল সবাই ইতোমধ্যে নাস্তার টেবিলে বসে গেছে। সাজেদের চোখ স্বাভাবিকভাবেই সবার আগে গিয়ে থামল তায়েবার উপর। এক পলকের বেশি তাকিয়ে থাকল না সে। তবুও সেই এক ঝলকেই বুকের ভেতর অদ্ভুত এক প্রশান্তি অনুভব করল। মনে হলো, দিনের শুরুটা যেন আরও সুন্দর হয়ে গেল। সবার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল, “গুড মর্নিং, সবাইকে।” বলেই খালি চেয়ারটায় গিয়ে বসল সে। নাস্তা করতে লাগল ঠিকই, কিন্তু তার মনোযোগ বারবার চলে যাচ্ছিল অন্যদিকে। ঠিক তার সামনেই বসে থাকা তায়েবার দিকে। নাস্তা শেষ করে সাইফ আর সাজেদ একসাথে বের হয়ে গেল।
বাড়ির গেট পেরিয়ে গাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সাজেদ। তার মুখের দিকে তাকিয়ে সাইফ হালকা হেসে বলল, “কেমন লাগছে রে?” সাজেদও মৃদু হাসল। “সত্যি বলতে একটু নার্ভাস লাগতেছে।” সাইফ তার কাঁধে হাত রেখে বলল, “এটাই স্বাভাবিক। জীবনের প্রথম চাকরি। একটু নার্ভাস লাগবেই। রিলাক্স কর, কয়েকদিন পর সব ঠিক হয়ে যাবে।” সাজেদ মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। কথা বলতে বলতেই দুজনে গাড়িতে উঠে বসল। ড্রাইভার ইঞ্জিন স্টার্ট দিতেই ধীরে ধীরে গাড়িটা বাড়ির গেট পেরিয়ে মূল সড়কের দিকে এগিয়ে গেল। জানালার বাইরে ব্যস্ত শহরটা নিজের ছন্দে ছুটে চলেছে। আর গাড়ির ভেতরে বসে সাজেদ অনুভব করল, তার জীবনও যেন আজ থেকে নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে।
……………………………..
এখন সন্ধ্যা সাতটা।
সাজেদের অফিস ছুটি হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। প্রথম দিন হিসেবে দিনটা মোটেও খারাপ যায়নি। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ সবকিছুই তার প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি স্বাভাবিক লেগেছে।
অফিসের কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে হালকা-পাতলা পরিচয়ও হয়ে গেছে। গত কয়েকদিনে সাইফ তাকে অফিসের আশপাশের এলাকা, যাতায়াতের রাস্তা আর প্রয়োজনীয় কিছু জায়গা ঘুরিয়ে দেখিয়েছে। ফলে এখন একা একাই চলাফেরা করতে পারবে বলে মনে হচ্ছে তার।
অফিস ভবন থেকে বেরিয়ে মোবাইলটা হাতে নিল সাজেদ। সাধারণত এই সময় সাইফকে কল দিয়ে একসঙ্গে ফেরার কথা। কিন্তু আজ আর কল করল না।
মনে হলো, একটু একা হাঁটা যাক। ঢাকার ব্যস্ত শহরটাকে একটু কাছ থেকে অনুভব করতে ইচ্ছে করছে তার।
রাস্তার দুই পাশে জ্বলতে শুরু করেছে রঙিন বাতি। কোথাও খাবারের দোকানের ভিড়, কোথাও অফিস শেষ করে বাড়ি ফেরা মানুষের ব্যস্ত পদচারণা। চারপাশের কোলাহল, যানবাহনের শব্দ আর শহরের ছুটে চলা জীবনকে দেখতে দেখতে ধীর পায়ে হাঁটতে লাগল সাজেদ। অদ্ভুত এক ভালো লাগা কাজ করছে তার ভেতরে।
নতুন চাকরি, নতুন শহুরে জীবন আর নতুন কিছু স্বপ্ন—সব মিলিয়ে দিনটা বেশ সুন্দরই কেটেছে। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ সময়ের কথা মনে পড়তেই কব্জির ঘড়ির দিকে তাকাল সে।
তারপরই মনে পড়ল একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা। আজ চাঁদ আর তায়েবাকে পড়ানোর কথা আছে। মুহূর্তের মধ্যেই ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল তার।
চাঁদকে পড়ানো অবশ্য দায়িত্বের মধ্যে পড়ে, কিন্তু তায়েবাকে দেখার সুযোগটাও যে সেখানে লুকিয়ে আছে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। আর দেরি না করে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে একটা রিকশা ডাকল সাজেদ।
রিকশায় উঠে বাড়ির ঠিকানা বলতেই ধীরে ধীরে রিকশাটা সামনে এগিয়ে চলল।
সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে ঢাকা শহর পিছনে পড়ে রইল, আর সাজেদের মন অজান্তেই ছুটতে লাগল সেই বাড়িটার দিকে, যেখানে হয়তো এই মুহূর্তে তায়েবা পড়ার টেবিলে বসে তার অপেক্ষা করছে।
………………………..
এখন রাত সাড়ে আটটা। চিলেকোঠার রুমে পড়ার টেবিল ঘিরে বসে আছে সাজেদ, চাঁদ আর তায়েবা। তায়েবা এবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইতোমধ্যে একটা ভালো কোচিং সেন্টারেও ভর্তি হয়েছে সে। তারপরও পরিবারের পরামর্শে সাজেদের কাছ থেকে আলাদা করে পড়ছে, যাতে প্রস্তুতিটা আরও ভালো হয়। সত্যি বলতে, সাজেদের পড়ানোর ধরণও বেশ ভালো। কঠিন বিষয়গুলো খুব সহজ করে বুঝিয়ে বলতে পারে সে। তাই তায়েবাও মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনছে। টেবিলের একপাশে বসে খাতায় নোট নিচ্ছে তায়েবা। মুখে কোনো কথা নেই। মাঝে মাঝে প্রয়োজন হলে প্রশ্ন করছে, উত্তর শুনে আবার মন দিয়ে লিখতে শুরু করছে। কিন্তু তার ঠিক উল্টো অবস্থা চাঁদের। পাঁচ মিনিটও শান্ত হয়ে বসে থাকতে পারছে না সে। কিছুক্ষণ পরপরই নতুন কোনো সমস্যা নিয়ে হাজির হচ্ছে। এইসব বাঁদরমুখো আচরণের জন্য সাজেদ চাঁদ কে পড়াতে মন না চাইলেও পড়াতে হচ্ছে। একজন কে পড়াই অন্য জন কে না পড়ালে খারাপ দেখায়। তাই পড়াতে হচ্ছে। না হলে একটুও পড়াতো না। সাজেদকে বিরক্ত করতে পেরে চাঁদের ভালো লাগতেছে। চাঁদ একটূ বই নিচে রেখে আসছে সেটা আনার জন্য গেলে সাজেদ তায়েবা কে জিজ্ঞেস করে
” আমি আসার আগে কি প্রতিদিন ছাঁদে এসে গান করতে?” সাজেদের কথায় তায়েবা একটু লজ্জা পেলেও হালকা গলাই বলে
” প্রতিদিন না। মাঝে মাঝে। ”
” ওহ তাহলে এখন আসো না যে। আমাকে লজ্জা পেয়ে আসো না নাকি?” ভ্রু নেড়ে জিজ্ঞেস করে সাজেদ।
সাজেদের কথায় তায়েবা সাজেদের চোখের দিকে থাকিয়ে বলে
” আপনি আমার কে হোন যে লজ্জা পাবো।” কথাটা মুখে বললেও আসলেই লজ্জা আর সংকোচে আসা হয় না। না হলে আগে মাঝে মাঝে এসে গান করতো। এখন সাজেদ আছে তাই আর আসা হয় না। সাজেদ স্পষ্ট বুঝতেছে তায়েবা কথাটা বললেও লজ্জা পাচ্ছে। তাই আরো দ্বিধায় পেলতে বলে
“আচ্ছা শুনো, আমার কথা শোনা তোমার দায়িত্ব। এইবার থেকে প্রতি শুক্রবার তোমরা ছাঁদে চলে আসিও আড্ডা দিতে।” সাজেদের কথায় তায়েবা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে শুধু মাথা নাড়ে। এই কয়েকদিনে তায়েবাও সাজেদ কে আধ আধটু পছন্দ করতে শুরু করেছে। তাই হয়তো কথাটা মেনে নিয়েছে।
……………………….
অন্য দিনের তুলনায় আজকের সকালটা অনেক বেশি সুন্দর মনে হচ্ছে সাজেদের। ঘুম ভাঙার পর থেকেই মনটা অদ্ভুত রকম ফুরফুরে। যেন আজকের দিনটার ভেতর লুকিয়ে আছে আলাদা কোনো আনন্দ। সাধারণত প্রতিদিন ভোরে মোবাইলের বিরক্তিকর অ্যালার্মের শব্দেই ঘুম ভাঙে তার। কিন্তু আজ ঘুম ভাঙল অন্য এক সুরে। মিষ্টি একটা কণ্ঠ ভেসে আসছে দূর থেকে
“তোর এ সকাল ঘুম ভেঙে দিতে পারি,
তোর এ বিকেল ঘুড়ি ছিঁড়ে দিতে পারি,
তোকে আলোর আলপিন দিতে পারি,
তোকে বসন্তের দিন দিতে পারি,
আমাকে খুঁজে দে জলফড়িং…”
গানটা কানে যেতেই আধোঘুম চোখে মৃদু হাসল সাজেদ। এই কণ্ঠ তার অচেনা নয়। বরং গত কয়েক দিনে এই কণ্ঠই অজান্তে তার দিনের সবচেয়ে প্রিয় শব্দ হয়ে উঠেছে। চোখ না খুলেই বুঝে গেল, গানটা তায়েবার। পরের মুহূর্তেই যেন ঘুম উড়ে গেল তার। তাড়াহুড়ো করে বিছানা থেকে নামতে গিয়েই পাশে রাখা চেয়ারের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা খেল।
“উফফ!” মুখ থেকে ব্যাথাতুর শব্দ বের হলো সাজেদের মুখ থেকে।ব্যথায় মুখ বিকৃত হয়ে গেল। হাঁটুর নিচে বেশ জোরেই লেগেছে। কিন্তু সেদিকে মন দেওয়ার সময় কোথায়? ব্যথাকে উপেক্ষা করেই প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে এলো সে।
চিলেকোঠার দরজা খুলে ছাদে পা রাখতেই চারপাশে তাকাল। কিন্তু পরক্ষণেই তার মুখের উচ্ছ্বাসটা মিলিয়ে গেল। পুরো ছাদ ফাঁকা।কোথাও কেউ নেই। শুধু ভোরের নরম বাতাস বইছে, আর কয়েকটা পাখি আকাশের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। সাজেদ কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ছাদের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে চোখ বুলাল। না, সত্যিই কেউ নেই। মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, তাহলে কি সে স্বপ্ন দেখছিল? কিন্তু না।গানটা এত স্পষ্ট শুনেছে যে স্বপ্ন বলে মনে হয় না। হয়তো তায়েবা একটু আগেই ছাদ থেকে নেমে গেছে। এই ভাবনাটা মাথায় আসতেই সাজেদ বিরক্ত মুখে নিজের চুলে হাত চালাল। তারপর গানের উত্তরে নিজ মনে বিড়বিড় করলো
” যদি তুমি বলো তাহলে পৃথিবীর সব ফড়িং খুঁজে দিতে পারি।”
চলবে…………..
[ ভুল ত্রুটি হলে ক্ষমা করবেন। আর ধরাই দিয়েন। ধন্যবাদ ]

