#অভিমাননামা
#md_shifu /৬ষ্ঠ পর্ব
তায়েবার ঘুম ভেঙেছে বেশ ভোরে।
বিছানায় কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করলেও আর ঘুম এলো না। তাই একসময় উঠে পড়ল সে। জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখল, সকালটা এখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। আকাশজুড়ে নরম আলো ছড়িয়ে আছে, চারপাশে এক ধরনের শান্ত নির্জনতা।
হঠাৎ তার ইচ্ছে হলো ছাদে গিয়ে একটু ঘুরে আসার। মুখে পানি ছিটিয়ে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে গেল তায়েবা।
ভোরের শীতল বাতাস মুখে লাগতেই মনটা ভালো হয়ে গেল। ছাদের এক কোণায় গিয়ে দাঁড়িয়ে দূরের আকাশ দেখতে লাগল সে। পূর্ব দিগন্তে সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে।
ঠিক তখনই তার মনে পড়ল চিলেকোঠার কথা। আর চিলেকোঠার সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল সেখানে থাকা একজন মানুষের কথাও।
সাজেদ।
কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে নিজের মনেই মুচকি হাসল তায়েবা। তারপর মনে হলো, মানুষটাকে একটু জ্বালানো যাক।
সে জানে, এত সকালে কেউ গান গাইতে শুরু করলে চিলেকোঠার ঘরে শুয়ে থাকা সাজেদের কানে নিশ্চয়ই পৌঁছে যাবে। এই ভেবেই আস্তে আস্তে গান ধরল সে
“তোর এ সকাল ঘুম ভেঙে দিতে পারি,
তোর এ বিকেল ঘুড়ি ছিঁড়ে দিতে পারি”
গাইতে গাইতে তার নিজেরই হাসি পাচ্ছিল।
গানের কয়েক লাইন শেষ হতেই হঠাৎ চিলেকোঠার ভেতর থেকে একটা শব্দ ভেসে এলো। মনে হলো যেন তাড়াহুড়ো করে কেউ বিছানা থেকে নামতে গিয়ে কোথাও ধাক্কা খেয়েছে।
শব্দটা শুনেই তায়েবার মুখে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।
” তাহলে উঠেছে।”
নিজের মনেই ফিসফিস করে বলল সে। তারপর আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকল না।
সাজেদ যদি দরজা খুলে বের হয়ে আসে, তাহলে যে তাকে দেখেই ফেলবে। আর কেন জানি সেই মুহূর্তটার মুখোমুখি হওয়ার সাহস হলো না তার। তাই দ্রুত সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
…………………………………………………..
এখন সকাল আটটা ডাইনিং টেবিলে বসে নাস্তা করতেছে সবাই। জাবেদ ও এসে যোগ দিলো। নাস্তা করতে করতে অমুক বললো
” সাজেদ কেমন যাচ্ছে তোমার চাকরি?”
কথা শুনে একপলক চাই সাজেদ।তারপর ছোট করে বলে
” আলহামদুলিল্লাহ ভালো।”
” চাঁদ তায়েবা কি তোমাকে বিরক্ত করে। করলে আমাকে বলবে।তারপর আমি দেখে নিবো।” মুখে এটা বললেও বাস্তবে তা কোনোদিন ও করবে না। এই ঘরে সবচেয়ে বেশি ওদের লাই দেই সে। তাই ওর কথা শুনে বাকিরা মিটিমিটি হাসতেছে।
সাজেদ একবার তায়েবার দিকে আড়চোখে চেয়ে বলে
” কেউ বিরক্ত করে না আংকেল।”
একটু পর চাঁদ এলো নাস্তা করতে। এসে দেখলো সাজেদের পাশের চেয়ার খালি। কোনো দ্বিধাহীনভাবে সেই চেয়ারে বসে সাজেদকে এক পলক দেখে নাস্তা নিলো খাওয়ার জন্য। এখন বড়রা উঠে গেছে। টেবিলে শুধু এখন চাঁদ সাজেদ সাইফ আর তায়েবা। চাঁদ মনে মনে ভাবলো
” কখন যে আপনার পাশের চেয়ার টা আমার স্থায়ীভাবে হবে সাজেদ ভাই।”
চাঁদ না খেয়ে বসে আছে দেখে সাইফ বলে
” কিরে চাঁদ তুই জেগে জেগে স্বপ্ন দেখতেছস নাকি। নাস্তা না করে বসে আছস যে।”
সাইফের কথায় চাঁদ ক্ষেপে যায়। ক্ষেপা সুরে বলে
” জেগে জেগে স্বপ্ন দেখলে আপনার কি। অযথা বকবক করিয়েন না তো।”
চাঁদ এর কথা শুনে জাবেদ বিরক্তে ভ্রু কুঁচকে পেলে। আস্তে করে বলে ফেলে
” রাস্কেল এখনো বড়দের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় শিখে নাই। আদর দিয়ে দিয়ে বেয়াদব বানাই পেলছে।”
কথাটা কেউ না শুনলেও চাঁদ শুনছে। আর শুনেই মুখ কালো করে ফেলছে। তারপর আর কোনো কথা না বলে চুপচাপ নাস্তা করে উঠে যায়। সাইফের নাস্তা শেষ হলে সে ও উঠে রুমে যায় অফিসের ব্যাগ আনার জন্য। এখন টেবিলে সাজেদ আর তায়েবা ছাড়া কেউ নাই। সেই সুযোগে সাজেদ তায়েবা কে আস্তে করে বলে
” প্রতিদিন এমন করে ঘুম ভাঙালে মন্দ হয় না।”
সাজেদের কথায় তায়েবা লজ্জা পেয়ে যায় তবে সাজেদকে তা বুঝতে না দিয়ে বলে
” বিয়ে করে বউ আনেন। আমি পারবো না।”
কথাটা বলে আর বসলো না তায়েবা। উঠে চলে যায় তার রুমে।
……………………………………………
সাজেদ ভাই,
কি করলে আপনার অভিমানের, ভুল ভাঙার পর্দা কখন সরবে বলুন তো। কি করলে আপনি বুঝবেন আমি আগের মতন নাই। আপনার ছোট ছোট তিক্ত কথাও আমার হৃদয় ভাঙতে যথেষ্ট। অথচ আমি বেহায়ার মতন আপনার পথ চেয়ে বসে আছি। আপনার সামনে গিয়ে মনের কথা বলতে আমার ভয় হয় যদি আপনি আমাকে আরো বেশি ভুল বুঝেন। এই ভয়ে আপনার সামনে যেতে পারি না। একদিন সব ভয় পিছনে রেখে আপনার সামনে যাবো আর আমার মনের অভক্ত কথা আপনার নামে জমানো সব কথা বলবো। সাথে এইও বলবো আমি কয়েকবছর ধরে আমার মনে আপনার জন্য কতটা ভালোবাসা জমা রেখেছি।
প্রিয়া সাজেদ ভাই,
কথারা থমকে যায় আপনি সামনে থাকলে
হৃদয় শান্ত হয়ে যায় যদি আপনি কাছে থাকেন।
আমার বলতে ইচ্ছে হয়
“কত যাতনা যন্ত্রণা সয়েছি তোমায় পাবো বলে, সব বৃথা যাবে তোমাকে না পেলে।”
এতটুকু লিখেই ডাইরি বন্ধ করলো চাঁদ। ডাইনিং টেবিল থেকে এসে দরজা বন্ধ করে কিছুক্ষণ বসে ছিলো চুপ করে। তারপর পড়ার টেবিলের ডয়ার থেকে ডাইরি নিয়ে লিখতে বসেছিলো। লিখলে মন হালকা হয়। এই ডাইরিতে সাজেদ কে নিয়ে হাজারো কথা আছে। চাঁদের ইচ্ছে একদিন কথাগুলো সাজেদকে বসে শুনাবে।আবার মনে প্রশ্ন জাগে সাজেদ ভাই কি শুনবে তার এইসব কথাগুলো নাকি আজাইরা ভেবে চলে যাবে।
………………………………………..
“কিরে বিয়ে কখন করবি। বুড়া হয়ে যাচ্ছস তো।” কথাটা বলেই সাজেদ সাইফের দিকে চাই। সাজেদের কথার প্রেক্ষিতে সাইফ বলে ” হঠাৎ তুইতুই আমার বিয়ের পিছে কেন লাগছস। মতলব কিরে? নাকি তুর বিয়ে করতে ইচ্ছে হচ্ছে?”
সাইফের কথায় সাজেদ থতমত খেয়ে যায়। সাইফকে তা বুঝতে না দিয়ে বলে
” আমার তো এখনো দেরি আছে। মাত্রতো অফিসে জয়েন হলাম। আগে গুছিয়ে নিই তারপর। তুই বল তুই কখন করবি?”
সাইফ একটু অন্যমনস্ক হয়ে বলে
” করবো করবো সময় হোক।”
দুজন আরো টুকটাক গল্প করতে করতে গাড়ি সাজেদ এর অফিসের সামনে চলে আসলে সাজেদ নেমে যায়।
গাড়ি থেকে নেমে সাজেদ প্রথম তলায় লিফ্টের সামনে দাড়াই। তারপর চার নাম্বার ফ্লোর এ চাপ দিয়ে উঠে যায়। লিফ্ট থেকে বের হওয়ার সময় ভুল ক্রমে একটা মানুষ এর সাথে ধাক্কা খাই। সাজেদ সাথে সাথে সরি বলে চলে যায় কার সাথে ধাক্কা খেয়েছে তা না দেখে।
সিইউর একটা ফাইল গাড়িতে রেখে এসেছে ভুলে। আর সেই ফাইলটা আনতে যায় এসিস্ট্যান্ট সায়মা রহমান। তাড়াহুড়ো করে লিফটে ঢুকতে গেলে একটা ছেলের সাথে ধাক্কা খাই সায়মা। ধাক্কা শরীরের সাথে মনেও ধাক্কা খাই। মানে প্রথম দেখায় ক্রাস মানে বাঁশ খেয়ে পেলে। শরীরে ব্যাথা পেলেও তা তোয়াক্কা না করে সাজেদ এর যাওয়ার দিকে চেয়ে থাকে। ভাবে তার মন কেড়ে নেওয়া এই ছেলে কে?
চলবে…….
[ কিছু ভুল ত্রুটি থাকলে জানায়েন। ভালো লাগলে রেসপন্স করিয়েন। একটা রিভিউ দিয়েন।
ধন্যবাদ ]

