চোরাবালির_পিছুটানে #অন্তিম_পর্ব #জেরিন_আক্তার

0
2

#চোরাবালির_পিছুটানে #অন্তিম_পর্ব
#জেরিন_আক্তার

সাইমন আর সিফাত রাদিফকে কল দিলো। রাদিফ জানালো আর দশ মিনিটের মতো লাগবে। বলেই ফোন কেটে দিলো। সাইমন রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলে,

“রায়ান তুই কি যে ভুল করেছিস রাদিফকে আটকিয়ে। এখন ও এসে যে তোকে কি করবে সেটা আল্লাহ ভালো জানে। তবে সিফাত শোন, রাদিফ এলে আমি ওকে একটা কাজ করতে বলবো।”

সিফাত কপাল কুঁচকিয়ে বলে,

“কি কাজ?”

“না না, আগেই বলবো না। রাদিফ এলেই বলবো। এখন বলে দিলে বিনোদন পাবি না। ওকে আসতে দে।”

রায়ান সাইমন আর সিফাতকে দেখে জ্বলছে। মনে মনে বলছে,,,কেনো যে সকালে পালাতে গেলাম না। আগেই ভেবেছিলাম রাদিফ শান্ত থাকার ছেলে না। ও কিছু একটা করবেই। করলোই তো! এখন এসে কি করবে আল্লাহ ভালো জানে। ধুর এই উল্টো হয়ে কি থাকা যায়?

রাদিফ হনহনিয়ে গোডাউনের ভিতরে এসে রায়ানকে উল্টো হয়ে ঝুলে থাকতে দেখে মনে মনে খুব খুশি হলো। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বাকা হেসে বলে, “ভাই তুই আমাদের কত সুন্দর টাইম উপহার দিয়েছিলি। আর এখন এর থেকেও আরও সুন্দর সময় কাটাবি? দেবো নাকি?”

রায়ান নিশ্চুপ। পাশে থেকে সাইমন বলে, “রাদিফ, শোন ভাই অনেক ক্ষন ধরে ভাবছিলাম ওকে হাফ প্যান্ট পড়িয়ে ঝুলিয়ে রাখি? ওর জন্য বেস্ট উপহার।”

রাদিফ বাকা হেসে বলে, “মন্দ হবে না।”

বলেই রাদিফ একটা চেয়ার টেনে বসলো। আরও দুইটা চেয়ারে সাইমন আর সিফাত বসলো। সাইমন রাদিফকে বলে,

“শুনলাম রাহার ছেলে হয়েছে?”

“হুমম।”

সিফাত সাইমনের দিকে এগিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠলো,,, রাহার ছেলে হয়েছে শুনে তোর কষ্ট হচ্ছে না?

সাইমন কপালে ভাঁজ ফেলে বলে উঠলো,,আমার কষ্ট হবে কেনো?

সিফাত আগের থেকেও আরও আস্তে করে বলে উঠলো,,,যতই হোক পছন্দ করতি তো?

এই কথা শুনতেই সাইমন সিফাতকে ধাক্কা দিয়ে বলে,

“সর তো! বেশি কথা বলিস?”

রাদিফ বলে,

“তোদের কি হয়েছে?”

সাইমন বলে,

“আর বলিস না। ও শুধু মেয়েদের মতো ঘেষে কথা বলে।”

সিফাত রেগে গিয়ে বলে,

“কি বললি আমি মেয়েদের মতো ঘেষে কথা বলি?”

রাদিফ দুজনকে থামিয়ে দিয়ে বলে,

“তোরা থাম তো?”

সিফাত বলে,

“ও আমাকে কি বলল আর তুই থামতে বলছিস? শুধু ওর কোনো দরকার হোক দেখিস ওকে কিভাবে উপকার করি।”

রাদিফ বলে,

“এই যা করার করিস এবার থাম। এখন এইটার উপরে নজর দে। রায়ানকে কি করা যায়?”

রায়ান একটা কথাও বলে না। আর বললেও কোনো লাভ হবে না। কারণ রাদিফকে ও যখন বেঁধে রেখেছিল তখন রাদিফও ওকে ছেড়ে দিতে বলেছিল কিন্তু ছেড়ে দেয়নি। আরও উল্টো মিষ্টিকে ধরে নিয়ে এসেছিল।

সাইমন রাদিফকে বলে,

“আমি তোকে যা বললাম তুই তাই কর! ওকে হাফপ্যান্ট পড়িয়ে রাখ সারারাত। আর যদি তা না করিস তাহলে এইভাবেই একটু ড্যান্স করা।”

রায়ান শুধু দাঁত চেপে কথাগুলো হজম করছে। কিচ্ছু বলার নেই।

রাদিফ ঘাড় ঘুরিয়ে রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলে,

“কিরে তোকে দিয়ে কি করবো বল? আজ তুই যা বলবি তাই করবো।”

রায়ান মুখ ফিরিয়ে অন্য দিকে তাকায়। সিফাত বলে

“দেখ শালার অ্যাটিটিউড কত! আমাদের ক্ষতি করার চেষ্টা করে এখন আবার মুখ ঘুরিয়ে নেয়। মনে করে আমরাই ওর ক্ষতি করতে চাইছি। আর ও যে করেছে আগে সেটা গোনায় ধরবে না।”

সাইমন দাঁত চেপে বলে,

“ইচ্ছে করছে মামলা দিয়ে জেলে ঢুকিয়ে দেই!”

রাদিফ বলে,

“এই থামতো এটা বাংলাদেশ না। এটা জাপান। এখানে মামলা দিলে ও কি বের হতে পারবে?”

এই শুনে সাইমন রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলে,

“তোকে জেলে দেওয়ার কথা বলেছি আর ও সেটা না করছে। শেখ ওর থেকে। আর তুই ওকে মারতে চেয়েছিলি। সবাই শত্রু হয় না।”

রায়ান এবার খানিকটা নিচু হয়ে বলল,

“ভাই আমার ভুল হয়েছে। আমার তোর সাথে ওইরকম করা উচিত হয়নি। আর ভাবির সাথেও। আমি মাফ চাইছি।”

_________________

অনেক দিন পরে সোহেল শিকদার তুহিন আর জারাকে দেখতে তুহিনের ফ্ল্যাটে এলেন। তুহিনকে তো অফিসে দেখতে পায়। জারাকে দেখতে পায়না অনেক দিন। দুজনের সাথে ফোনে কথা বলেন ঠিকই। কিন্তু সামনাসামনি দেখতে পান না। তাই না বলে হুট করেই চলে এলেন। তুহিন আর জারা ওদের সম্পর্কটা কিছুটা গভীর হয়েছে এই কয়েক মাসে। একটা জায়গায় থাকতে থাকতে কেউ কাউকে ছাড়া থাকতে পারে না। কিন্তু কেউ কাউকে বলে উঠতেই পারেনি যে আমি তোমাকে চাই। দুজনেই আলাদা আলাদা মানুষকে ভালোবেসেছিলো। সেইটা কাটিয়ে উঠতে জারার বেশি সময় লাগেনি। কিন্তু তুহিনের সময় লেগেছে। তুহিনও আস্তে আস্তে মিষ্টিকে ভুলে গিয়েছে। যতটা সময় জারার সাথে থাকে, জারাকে খুশি করার চেষ্টা করে। জারার মাঝে আনন্দ খুজতে থাকে।

সকাল বাজে প্রায় দশটার মতো। আজ তুহিনের অফিস ছুটির দিন ছিল। তাই ঘুমিয়েই ছিলো। দুজনে আলাদা আলাদা রুমে ঘুমায়। জারা সকালেই ঘুম থেকে উঠে গিয়েছে। ভার্সিটিতে পরীক্ষা আছে বলে সকালে পড়তে বসেছিল। সকালের খাবারটা কাজের বুয়া রান্না করে দিয়ে গিয়েছে। জারা খাবার খেয়ে আবারও নিজের রুমের ব্যালকনিতে বই হাতে নিয়ে বসেছিলো।

কলিং বেলের শব্দ পেয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।এরপরে দরজা না খুলে গলা উঁচিয়ে বলে,

“কে?”

সোহেল শিকদার বাহিরে থেকে বলে উঠেন,

“আমি তোমার বড় আব্বু!”

জারা কথাটা শুনে শুকনো ঢোক গিলে পেছনে ফিরে তুহিনের রুমের দিকে তাকায়। এখন যদি তার বড় আব্বু ওদের আলাদা আলাদা রুমে থাকতে দেখে তাহলে অনেকটাই কষ্ট পাবে। জারা তাড়াহুড়ো করে তুহিনের রুমে ঢুকলো। তুহিনকে ডেকে তুলল। তুহিন চোখ-মুখ খিচে বন্ধ করে বলে উঠে

“কি হয়েছে?”

“বড় আব্বু এসেছে।”

তুহিনের ঘুমের ঘোর এক নিমিষেই উড়ে গেলো। পট করে উঠে বসে বলল,

“কি বাবা এসেছে? কোথায় কখন এলো?”

“মাত্রই এসেছে। বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে। এখন আমরা কি করবো?”

তুহিন ঠোঁট কামড়ে কিছু ভেবে বলে উঠে,

“কি করবি এখন?”

“দুজনকে একসাথে থাকতে হবে। এখন যদি আলাদা আলাদা থাকতে দেখে তাহলে অনেক কষ্ট পাবে।”

তুহিন বিছানায় থেকে নেমে ওয়াসরুমে চলে গেলো। জারা গিয়ে দরজা খুলে দিলো। এরপরে দুজনে স্বাভাবিক ভাবেই সোহেল শিকদারের সাথে কথা বলল। সোহেল শিকদার ঘণ্টা দুয়েক রইলেন। এরপরে চলে গেলেন। যাওয়ার আগে তুহিন আর জারার হাত এক করে বলে উঠেন,

“তোমরা বাড়ি ফিরে যেও। তোমাদের এভাবে দূরে থাকা আমার ভালো লাগে না। আর নিজের নিজেদের সাথে কোনো ঝামেলা করোনা। এক হয়ে থেকো।”

জারা মাথা নাড়িয়ে বলে,

“ঠিক আছে বড় আব্বু।”

সোহেল শিকদার ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তুহিনও হালকা মাথা নাড়িয়ে বলে,

“দোয়া করো আমাদের জন্য!”

“সবসময় করি। আর ভবিষ্যতেও করে যাবো। এখন আসি।”

“এগিয়ে দিবো বাবা?”

“না। ড্রাইভার আছে নিচে।”

“ঠিক আছে।”

“তাহলে আসি। দুজনে মিলেমিশে থেকো। আর সম্ভব হলে বাড়ি ফিরে যেও!”

তুহিন গলার কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলে,

“চেষ্টা করবো।”

সোহেল শিকদার চলে গেলেন। তুহিন নিচতলা পর্যন্ত তার সাথে গেলো। জারা মনটা খারাপ করে আবারও ব্যালকনিতে চলে এলো। ভাবতে লাগলো,,যদি তুহিন বলতো এই সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখবো তাহলে এর থেকে আনন্দ আর কোনো কিছুতেই পেতোনা।

তুহিন তার বাবাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে চলে এলো। অস্থির হয়ে জারাকে খুজতে লাগলো। হাই তুলে ডেকে উঠলো। জারা ব্যালকনি থেকে সারা দিতেই তুহিন সোজা চলে যায়। জারা মাথা নত করে বসে আছে। তুহিন জারার পাশে বসলো। দুজনেই চুপচাপ কারো মুখে কোনো কথা নেই।

জারা নীরবতা ভেঙে বলে উঠে,

“কিছু বলবে?”

তুহিন গলার স্বর গভীর করে বলে উঠলো,

“আমাদের সম্পর্কটা এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। নাটক-ফাটক নিয়ে আর এগোতে চাইনা। ভালবেসে আগলে রাখতে চাই তোকে। থাকবি আমার সাথে।”

জারা নিঃশব্দে তুহিনকে জড়িয়ে ধরে বলে,

“আমিও চাই তোমার সাথে থাকতে।”

রাদিফ রাতে বাড়ি ফিরে। মিষ্টি মাত্র রুমে এসে বিছানায় হেলান দিয়ে শুয়ে পড়ল। রাদিফ এলে একসাথে রাতের খাবার খাবে। রাদিফ চুপচাপ রুমে ঢুকে। মিষ্টি পাশ ফিরে ফোন দেখছিল। রাদিফ চুপচাপ মিষ্টির পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। মিষ্টি রাদিফের উপস্থিতি টের পেয়ে পেছনে ফিরলো। রাদিফ খালি হাতে আসেনি। হাতে ফুল চকলেট, সেদিনের কিনে রাখা গিফট নিয়ে এসেছে।

মিষ্টি ফোন রেখে বসে। রাদিফ আগের ন্যায় দাড়িয়ে থাকে। মিষ্টি বিছানায় থেকে নামতে নিলে রাদিফ ওকে বসিয়ে নিজে তার সামনে হাঁটু গেরে বসে। মিষ্টির চোখের দিকে তাকিয়ে জড়ানো গলায় বলে,

“ভালোবাসি আপনাকে। সারাজীবন আপনাকে ভালোবেসে যেতে চাই।”

_সমাপ্ত_

২৮-১২-২০২৫—-১৩-০২-২০২৬

গল্পটা শেষ হয়তো ভালো করতে পারিনি। এর জন্য দুঃখিত। ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গল্পটায় আপনারা অনেক অনেক রেসপন্স করেছেন। আপনাদের অনেক অনেক ধন্যবাদ। গল্পটা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কেমন লেগেছে এই নিয়ে কিছু গঠনমূলক মন্তব্য করে যাবেন। এই গল্পে যেমন পাশে থেকেছেন পরবর্তী গল্পগুলোতেও পাশে থাকবেন। ধন্যবাদ।

[হেশট্যাগ ব্যবহার ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here