#তোমার_পিছু_পিছুপর্ব-২৭
পারভিন বেগম চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন….. জরজরি বেগম এক নাগাড়ে ওনার মাথায় পানি ঢেলেই যাচ্ছেন। পারভিন বেগমের মনে হচ্ছে…. উনার বুঝি শেষ সময় চলেই এলো….. নাহলে এটা কিভাবে সম্ভম!!!! যেই ছেলে আজও পর্যন্ত কখনো উনার অবাধ্য হলেন না,,,,,সেই ছেলে কি না এখন উনাকে না জানিয়ে এতো বড় ডিসিশন নিয়ে নিলো!!!!! সব ওই পাগলা মেয়েটার কারসাজি,,,,,, ,, ওই মেয়ে যাদুটোনা করেছে আমার এই আলাভোলা ছেলেকে…….. ওই মেয়ের পাল্লায় আমার ছেলেটা গেলো!!!! এনগেজমেন্ট!!!!! তাও আবার ওই মেয়ের সাথে!!!!
কার্ডও নাকি আবার বিলি করা হয়ে গেছে!!!!!! এতো কিছু ওনার নাকের নিচ দিয়ে ঘটে গেলো!!
কিন্তু উনিও দেখিয়ে ছাড়বেন কিভাবে হয় এই এংগেজমেন্ট!!!!!!!! ওরা বাপ ছেলে আর পাগলা মেয়ে যদি চলে পাতায় পাতায়!!!! তবে পারভিন বেগম চলেন শিড়ায় শিড়ায়…..
– “ওহ আল্লাহগো!!!! আল্লাহ….. রহমত করো….. আমার ছেলেটাকে রক্ষা করো” চাপা স্বরে আর্তনাদ করে উঠলেন পারভিন বেগম…..
পাশ থেকে জরজরি বেগম বলে উঠলেন….
-আম্মা…… অক্ষুনে ডাক্তার আইতাসে…… কতক্ষন সবুর করেন আম্মা….. এইতান কিচ্চু না…… কিচ্চু নাগো…… এবলাদা সব ঠিক হইয়া যাইবো….. দেইহেন চাইন…..
বেশি করে পানি ঢালতে লাগলেন জরজরি বেগম,,,,,,৷,,,
👇👇👇
তামান্না ওর নিজের ডেস্কের উপর অতি দামী ডিজাইনেবল গোল্ডেন এন্ড হোয়াইট এনগেজমেন্ট কার্ডটার দিকে আরো একবার তাকালো………অফিসের প্রত্যেকটা স্টাফ অতি উৎসাহ নিয়ে এই এনগেজমেন্ট নিয়ে গসিপ শুরু করেছে…… এটাই কি স্বাভাবিক না!!!!! আর যাই হোক বড় স্যারের এনগেজমেন্ট বলে কথা!!!!! তামান্না ম্লান হাসলো,,,, নিজের উপর………!!!!
তামান্নার হাতেও দুইটা সাদা এনভেলাপ……… একটা এনভেলোপ অফিসিয়াল আর একটা আনঅফিসিয়াল……….
তামান্না ম্যানেজারের রুমের সামনে গিয়ে দাড়ালো,,,,,,, আচ্ছা এভাবে হুট করে চাকরি ছেড়ে দেওয়াতে ওকে আবার জরিমানা দিতে হবে নাতো!!!!!!
👇👇👇
বর্ন ওদের বাড়ির বিশাল বড় বারান্দায় বসে আছে। কোলের উপর একটা বই। খুব মনযোগ দিয়ে বইটা পড়ছে। এতো বেশি মনযোগী ছিল যে কখন ওর বাবা পাশে এসে বসেছে ওর কোনো খবর নেই। বেশ কিছুক্ষণ বসে থেকে ছেলের বই পড়া দেখার পর ছেলের নড়চড় না দেখে মিলন সাহেব নিজেই বলে উঠলেন,
-কিরে তুতুস, বইটা কি খুব মজার?
বর্ন চোখ উঠিয়ে বাবাকে দেখে সুন্দর করে হাসল।
-বাবার সাথে আজকে একটু আড্ডা দিবি?
কোলের উপরের বইটা বন্ধ করতে করতে বর্ন হাসি হাসি মুখ করেই বলল
-দিবো।
-তা, তোর যে বিয়ে ঠিক হয়ে গেলরে। কেমন লাগছে তোর?
– বিশেষ কোনো কিছু অনুভব হচ্ছে নাতো বাবা,,
-সেকি, কি বলিস!! আমার বিয়ের সময়তো আমি লজ্জায় কুটকুট হয়ে গিয়েছিলাম। তোর লজ্জা লাগছে না?
– লজ্জা কিভাবে পেতে হয় তাতো জানি না,,,
-হাহাহা,,কি যে দুর্ভাগ্য আমার,,ছেলের লজ্জা পাওয়া লাল মুখটা দেখা হবে না। আর তোর বউ যে দস্যি,, ওকে দেখেত লজ্জাও মনে হয় উলটো দৌড় দিবে।
এই বলেই মিলন সাহেব বেশ কিছুক্ষণ হাসলেন। তারপর হাসি থামিয়ে হঠাৎই গম্ভীর হয়ে বললেন
-বর্ন, বিয়ে খুবই মজার একটা বিষয় জানিস। এবং বিয়ের জন্য সবচেয়ে বেস্ট পার্টনার হলো তোমার একজন বন্ধু………. কিন্তু………. লাইফ পার্টনারের জন্য একজন বন্ধু বেস্ট চয়েজ হলেও……. বন্ধুত্বের খাতিরে কি কাউকে লাইফ পার্টনার হিসেবে নেওয়া উচিত!!!!!!……………….
তাছাড়াও কাউকে সাহায্য করার জন্য সারাজীবন বন্ধু হয়ে পাশে থাকা যায়, জীবনসঙ্গী হয়ে না। বিয়ে করে সঙ্গীকে সুখী রাখার জন্য আগে নিজের সুখী হওয়া প্রয়োজন জানিসতো।……………. বর্ন আমি বরাবরই তোর একজন ভালো বন্ধু ছিলাম, বাবা হিসেবে দায়িত্ব পালনের আগে আমি বন্ধু হয়ে জানতে চাই তোর আর নীলময়ীর এই এনগেজমেন্ট এবং সম্পর্কটা
করে তুই সুখি হবি কি?
-(নিশ্চুপ)
-তোর যদি কোনো পছন্দ থাকে, ভালোলাগা অথবা ভালোবাসাও থাকে তুই তাও এই বুড়ো বন্ধুটাকে বলতে পারিস।
বর্ন একমনে তাকিয়ে আছে সামনের নাড়কেল গাছটার দিকে।…… বেশকিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর চোখ ফিরালো বাবার দিকে ম্লান হেসে বলল,
-জানো বাবা,,,,,,,,,, আমার কাছে একটা কৌটা আছে। কৌটাটার নাম আমি দিয়েছি ‘স্মৃতি কৌটা’। ………….. আমার জীবনের বেশ কিছু সুন্দর অতুলনীয় স্মৃতি অথবা মুহূর্ত বলতে পারো,,আমি সেই কৌটায় রেখে দিয়েছি। যখন আমার সেই মুহূর্তগুলো নিয়ে ভাবতে ইচ্ছা করে তখন আমি কৌটার মুখ খুলে দেই আর মুহুর্তগুলো আমার সামনে ভেসে উঠে।
-তাই নাকি!!! তা কি কি মুহুর্ত আছে তোর সেই কৌটায়?
-শুনবে,,, অনেকগুলো মুহূর্ত আছে তার মধ্যে দুইটা আমার সবচেয়ে প্রিয়।
– কি কি?
– প্রথমটা হচ্ছে যখন আমি ছিলাম ক্লাস টু’তে। আমদের স্কুলে যেমন খুশি তেমন সাজ হল সবাইকে বলা হল সুপারহিরো সেজে আসতে। সবাই নিজের পচ্ছন্দমত সাজলো, কেউ স্পাইডারম্যান তো কেউ সুপারম্যান। সবার শেষে আমাকে উঠানো হল স্টেজে। আমি খুব সাধারন একটা সাদা পাঞ্জাবি পরে গিয়েছিলাম। আমাকে যখন জিগ্যেস করল তুমি কোন সুপারহিরো সেজেছো আমি খুব সহজভাবেই বললাম”আমার বাবা”। একসময় সবাই তালি বাজিয়ে উঠল, আর আমি দেখলাম অনুষ্ঠানে লেট হয়ে যাওয়ার ফলে একজন মানুষ কোণায় দাড়িয়ে আছে। উনি একই সাথে হাসছেন আর কাদছেন। জানো বাবা আমি একই সাথে কখন কাউকে হাসতে আর কাদতে দেখি নি।
মিলন সাহেবের চোখ ছলছল করে উঠল। তিনি ভাবেন, সবসময় ছেলেগুলো হয় মা পাগলা তার ছেলেটা বাপ পাগলা হল কি করে!! উনি ছলছল চোখেই জিগ্যেস করলেন,
-আর একটা প্রিয় মুহূর্ত?
এতক্ষণ কথাগুলো বাবার দিকে তাকিয়ে বললেও এবার বর্ন শুরু করল বাহিরে তাকিয়ে,
-ঝুম বৃষ্টিতে একটি মেয়ের সাথে ফুটো ছাতা মাথায় হেটে যাওয়া। একজন অপরিচিত ছেলের সাথে ছাতা শেয়ার করা এবং ফুটো ছাতা শেয়ার করার জন্য একই সাথে মেয়েটির চেহারায় রাগ ও লজ্জা ভেসে উঠল। একদিকে ঝুম বৃষ্টি অন্যদিকে ভিন্ন আভাময়ী এক মেয়ে। একই সাথে এতো সুন্দর দুটি দৃশ্য। অদ্ভুত এক মুহূর্ত বাবা, জানো।
কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বর্ন আবার শুরু করল,
-বাবা আমি জানি না ভালোবাসা কি!! কিভাবে হয়!! কিভাবে বাসতে হয়, কিন্তু কি বাবা জানো,, জটিল জটিল বইয়ের জটিল জটিল বিষয়গুলো নিয়ে মেয়েটির সাথে কথা বলতে ভালো লাগে, কি করব বাবা বলো আমি যে গল্প পারি না,,কিন্তু এইসব হাবিজাবির অজুহাতে মিথ্যা বলে মেয়েটিকে সামনে বসিয়ে রাখতে ভালো লাগে,,কিন্তু আমি আগে কখনো কিন্তু মিথ্যা বলিনি,,দুষ্টুমি করে মেয়েটিকে রাগিয়ে দিতে ভালো লাগে,,কিন্তু বাবা আমি তো কখনোই দুষ্টু ছিলাম না। মেয়েটির রাগারাগি শোনার জন্য মনযোগী শ্রোতা হতেও ভাল লাগে। কিন্তু…………….
বলেই বর্ন চুপ করে গেল। মিলন সাহেব অবাক হয়ে শুনলেন যে…………… বইয়ের বাহিরেও তার ছেলের একটি দুনিয়া আছে,,,,। কিছুক্ষণ পর তিনিই নিরবতা ভেঙে বললেন
– তোর জন্য এই অনুভূতিগুলোর কি নাম জানি না। কি ব্যাখ্যা এদের দিবি তাও জানি না। কিন্তু যদি আমাকে জিগ্যেস করিস তাহলে আমি একটা কথাই বলব my son,,congratulation you are in love.
এই কথা বলেই তিনি বর্নর কাধে হালকা চাপড় দিয়ে চলে গেলেন। বর্ন অবাক হয়েই মনে মনে বলল “তাই নাকি!!”
(আসছে)

