আন্তঃনগরের_ভালবাসা লেখকঃ আবির খান পর্বঃ ১০(শেষ পর্ব)

0
164

#আন্তঃনগরের_ভালবাসা
লেখকঃ আবির খান
পর্বঃ ১০(শেষ পর্ব)
আমি বাবার সামনে বসে আছি। বাবা বললেন,

— হুম বল কি বলবি।

আমি বলতে শুরু করলাম,

— বাবা আমার অনেক দিন আগে থেকেই একটা ইচ্ছা ছিল। কিংবা বলতে পারো এটা আমার স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন পূরণে লাগবে অনেক টাকা। যার জন্য গত এক বছর ধরে আমি দিন রাত পরিশ্রম করেছি। আমার ইচ্ছাটা হলো, আমার মতো যারা আছে, যারা একটু হলেও কাজ করার মতো যোগ্যতা রাখে তাদের নিয়ে আমি একটা ব্যবসা শুরু করবো। আমি আমার নিজের নামে একটা ব্রান্ড চালু করতে চাই। যেখানে আমার মতো এবং সবধরনের মানুষ কাজ করতে পারবে৷ তাদেরকে সমাজের চাপের মুখে পড়তে হবে না৷ ভালোরা অসহায়দের সাহায্য করবে আর অসহায়রা ভালোদের। এভাবেই তাদের মাঝে একটা ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠবে৷। আমার স্টুডেন্টদের এখন সেমিস্টার ব্রেক চলছে। আমি আর দেরি করতে চাই না। আমি দ্রুত আমার স্বপ্নের বাস্তবিক রূপ দেখতে চাই। তুমি একটু সাহায্য করবে আমাকে?

বাবা অসম্ভব খুশি হন আমার আইডি শুনে। তিনি হয়তো ভাবতেই পারেননি আমি আমার মতো অসহায় মানুষদের কথা ভাববো। তাদের জন্য কিছু করতে চাইবো। বাবা আমাকে বললেন,

— হাজারবার করবো। বল বাবা তোর কি সাহায্য লাগবে?
— বাবা আমি একটা মাঝারি আকারের ফ্যাক্টরি ভাড়া নিতে চাই। সেখানে তোমার কোম্পানির বানানো র’ কাপড় দিয়ে আমি আমার মতো করে বিভিন্ন ডিজাইনের শার্ট প্যান্ট ইত্যাদি বানাতে চাই। এরজন্য আমার ৫০ টি মেশিন লাগবে। কারণ প্রথম দিকে আমি ৫০ জন নিয়ে কাজ করতে চাই। যার মধ্যে ২৫ জন থাকবে আমার মতো আর বাকি ২৫ জন হবে স্বাভাবিক। তাদের সংমিশ্রণেই আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো স্বপ্নটা পূরণ করার লক্ষ্যে কাজ শুরু করতে চাই। তুমি যদি আমাকে একটা ভালো ফ্যাক্টরি আর কোথায় এই মেশিন পাওয়া যাবে বলতে তাহলে আমার জন্য ভালো হতো। আর কত টাকা খরচ হতে পারে সেটাও যদি বলতে তাহলে আরও ভালো হতো।

বাবা আমার কথা শুনে একটু চিন্তায় পড়ে গেলেন বোধহয়। তিনি চেয়ারের সাথে হেলান দিয়ে কিছুক্ষণ গভীর ভাবে ভেবে বললেন,

— আসলে বাবা তুই যে বিজনেস আইডিয়া নিয়ে এসেছিস সেটা নিঃসন্দেহে ভালো। কিন্তু এখানে যে লাখ টাকায় হবে না, কোটি টাকা লাগবে৷ তুই যে মেশিন চাচ্ছিস সেগুলা কিনতে গেলে তোর কাছে যা আছে সব শেষ হয়ে যাবে৷ তাহলে ফ্যাক্টরি ভাড়া আর কাপড় কিনবি কিভাবে? আর শ্রমিকদের বেতনও বা কিভাবে দিবি বল?

বাবার কথা শুনে আমার মাথায় বাজ ভেঙে পড়ে। আসলেই তো এত অল্প টাকায় কি করবো আমি? তাহলে কি আমার স্বপ্নটা আর পূরণ হবে না? এত দূর এসে হেরে যেতে হবে? ভীষণ খারাপ লাগছি। হঠাৎই বাবা আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন,

— এত বড়ো পরিসরের ব্যবসা কখনো একার অর্থায়নে করা যায় না৷ কিন্তু তুই যেহেতু চাচ্ছিস আমি বাবা হিসেবে তোকে একটা সুযোগ করে দিতে পারি। তবে সেটা প্রথম সাপ্লাই পর্যন্ত। তারপর কিন্তু আর হবে না।
— কি বাবা বলো প্লিজ বলো।
— শোন তাহলে, আমার একজন পরিচিত লোক আছে, যার একটা ফ্যাক্টরি বেশ কয়েকমাস যাবৎ বন্ধ। আমি তার সাথে কথা বলে তোকে সেটা ভাড়া নিয়ে দিতে পারবো। হয়তো ওনাকে তোকে প্রায় দশ লক্ষ টাকার মতো দিতে হবে৷ শুধু আমি বলবো বলে। নাহলে আরও বেশি নিবে। আর রইলো মেশিন আর কাপড়, সেটা আমিই দিব। কিভাবে? বলছি, আমার কাছে ১০০ টা মেশিন আগে থেকেই স্টকে আছে। সেখানে তোকে ৫০ টা দিলে আমার তেমন কিছু হবে না। আর প্রথম সাপ্লাইয়ের কাপড়ও আমি তোকে কোন টাকা ছাড়াই দিব৷ তুই প্রথম সাপ্লাই দিয়ে যা লাভ করবি সেটা থেকে আমার কাপড়ের যে দাম হয় সেটা দিয়ে দিস। আর আস্তে আস্তে তোর ব্যবসা ঠিক ভাবে চালু হলে তখন কিন্তু মেশিন ভাড়াও দিতে হবে আমাকে। রাজি থাকলে বল।
— আমি রাজি। অসংখ্য ধন্যবাদ তোমাকে। তুমি না থাকলে আমার স্বপ্নটাই আজ মাটি চাপা যেত৷
— শোন আবির, একটা ব্যবসা চালু করা যতটা সহজ দেখায় আসলে বাস্তবে কিন্তু ততটা সহজ না। অনেক সরকারি আইন কানুন মেনে তারপর একটা ব্যবসা চালু করতে হয়। তুই তো সবই জানিস আমি জানি। তাও আবার বললাম। এত বড়ো প্রেসার একা নিতে পারবি?
— আমাকে পারতেই হবে বাবা। পারতেই হবে। আজ আমি না পারলে আমার মতো অনেকেই জীবনের মায়া ছেড়ে চলে যাবে। আমি তাদের বেঁচে থাকার কারণ হতে চাই।
— ঠিক আছে, যা আমার দোয়া আর আমি তোর পাশে আছি। দেখি আমার ছেলে আমাকে দেখিয়ে দিতে পারে কিনা৷
— ইনশাআল্লাহ বাবা আমি পারবো।

সেদিনের পর লেগে গেলাম নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে। এই অচল হাত নিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম শুরু করলাম। ফ্যাক্টরি ভাড়া নেওয়া, সেটার ওয়ার্ক ফিল্ড সাজানো, লাইটিং, মেশিন আনা, সেগুলো সেটাপ করা। এরমাঝে সরকারি কাজ তো আছেই। নিজের নামে ব্রান্ড যে চালু করতে হবে। এতদিন বইতে ব্যবসার অনেক কিছু পড়েছি। মনে হয়েছে কত্তো সহজ। কিন্তু বাস্তবে একটা ব্যবসা দাঁড় করানো কতটা যে কঠিন তা বুঝতে পারছি এখন। আজ প্রায় ২০ দিন হবে আমি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৪/৫ ঘণ্টা ঘুমাই। খাওয়া দাওয়াও কোন রকম হচ্ছে আর কি। এই কঠিন সময়ে আমার পাশে আমার পরিবার আর জান্নাতকে পেয়েছি। তারা সবসময় আমাকে সাহস দিয়ে এসেছে। সব কিছু গোছাতে গোছাতে এবার শ্রমিক খোঁজার পালা। পেপার পত্রিকা, অনলাইন অফলাইন সব জায়গায় প্রমোশন করি। আমাকে অবাক করে দিয়ে রাতারাতি অনেক শ্রমিক চলে আসে। তাদের মধ্যে আমার মতোও অনেকে ছিল। একটা ব্যবসার সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো শ্রমিকদের হায়ার করা। কারণ তাদের হাতেই সব কিছু৷ প্রায় একসপ্তাহ লেগে যায় আমাকে এদের হায়ার করতে করতে। সাথে এদেরকে কাজ বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য আবার আলাদা লোক নিতে হয়েছে। সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়েছে ডিজাইনারদের খুঁজতে। কারণ অত সহজে তাদের পাচ্ছিলাম না। আমি মোট চারজন ডিজাইনারকে হায়ার করি। এবং তাদেরকে সব বুঝিয়ে দিয়ে কাজেও লাগিয়ে দিলাম। এর মাঝে আবার আমার স্টুডেন্টদের সেমিস্টার ব্রেক শেষ। সাথে ফ্যাক্টরিটা চালু করার সময়ও চলে এসেছে। নিজেকে মানুষ না রোবট মনে হচ্ছিলো। মনে মনে শুধু আল্লাহকে ডাকছিলাম। সকালে ফজরের নামাজ পড়ে কাজে বের হতাম আর আসতাম যোহরে। কোন রকম সাওয়ার নিয়ে নামাজ পড়ে খেয়ে আবার পড়ানো শুরু। একদম মাগরিব পর্যন্ত দুইটা ব্যাচ পড়িয়ে আবার ফ্যাক্টরিতে যেতাম। আসতাম রাত ১ টায়। এভাবেই আমার কঠোর জীবন চলতে থাকে। একটা হাত নিয়ে কিভাবে এত কিছু করছিলাম জানি না। কিন্তু আমি খুব খুশি ছিলাম। যখন আমার অসহায় শ্রমিকরা আমার ভালো শ্রমিকদের সাথে মিলেমিশে কাজ করছিল, আমি খুশি হচ্ছিলাম যখন তারা আমাকে ধন্যবাদ দিচ্ছিলো। ডিজাইনাররাও অক্লান্ত পরিশ্রম করছিলো। কারণ তাদের সবাইকে ধরে ধরে বুঝিয়ে দিতে হচ্ছিলো। আমিও তাদের সাথে ছিলাম। একদিকে ড্রেস বানানো হচ্ছিলো অন্যদিকে আমি এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি করছিলাম অর্ডার নেওয়ার জন্য। আল্লাহর ইচ্ছায় আমি তিনটা বড়ো বড়ো শপিংমল থেকে অর্ডার আনতে সক্ষম হই। এবার চিন্তা হলো ভালো করে প্রোডাক্ট গুলো বানিয়ে সাপ্লাই দেওয়া। সময় যত যাচ্ছে চিন্তা আর ভয় শুধু বাড়ছেই। সে সাথে আমার অক্লান্ত পরিশ্রমও বাড়ছে। এতগুলো মানুষ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। একদিন ক্লাস শেষ হলে জান্নাত থেকে যায় সবাই গেলে। আমি চেয়ারে বসেছিলাম। খুব ক্লান্ত লাগছিল। জান্নাত আমার পাশে এসে বসে। ওর ব্যাগ থেকে একটা জুসের বোতল আর একটা প্যাকেট বের করে দিয়ে বলে,

~ এগুলো খেয়ে নিন। খাওয়া দাওয়া তো একদম করছেন না৷ কেমন শুকিয়ে যাচ্ছেন দিন দিন৷ আপনাকে এভাবে দেখলে আমার অনেক কষ্ট হয়।

আমি জান্নাতের দিকে তাকাই। দেখি ওর চোখে পানি। আমি মুচকি হেসে ওর চোখ দুটো মুছে দিয়ে বলি,

— এই বোকা কাঁদছো কেন?
~ খুব ভয় হচ্ছে। আপনি এতগুলো দিন বসে কষ্ট করেছেন। সেই কষ্টের মূল্য যদি আপনি না পান। খুব ভয় হচ্ছে আমার।

আমি ওর আনা নাস্তা খেতে খেতে ওকে আমার সাথে হেলান দিয়ে নিয়ে ওকে বলি,

— চিন্তা করো না। আমার কপালে যা লিখা আছে তাই হবে। এখন সব আল্লাহর হাতে। তিঁনি যা ভালো মনে করবেন তাই হবে৷ কিন্তু তোমার ভয়ের কারণ এটা মনে হচ্ছে না৷ আসল কারণটা বলো।
~ আপনি না আসলেই..
— বলো কি হয়েছে?
~ বাবা যদি আপনাকে মেনে না নেয় সেই ভয়েই আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি।
— তিনি আমাকে অবশ্যই মেনে নিবেন৷ এই যে এত সৎ হালাল ভাবে পরিশ্রম করছি তার প্রতিদান কি আমি পাবো না? অবশ্যই পাবো। সমাজে আমার একটা আলাদা নাম হলে এই ডান হাতটার দিকে তখন আর কেউ তাকাবে না দেখো। আমি সফল হতে পারলে সবার আগে তোমাকেই বিয়ে করবো। আমার কাছে থেকেই পড়াশোনা করবে। তুমি আস্তে আস্তে তোমার মাকে একটু একটু করে আমার সম্পর্কে বইলো।
~ আচ্ছা।
— এরপরও যদি তারা আমাদের মেনে না নেয় তাহলে আমরা বারাবাড়ি করবো না। কারণ তাদের দোয়া ছাড়া বিয়ে করলে আল্লাহ কখনো আমাদের মাফ করবেন না।
~ হুম। আপনি সত্যিই অনেক ভালো। আমার আপনার উপর বিশ্বাস আছে। জানেন, মাঝে মাঝে আমার মনে হয় আপনার এই হাতটা ভালো না হয়ে ভালোই হয়েছে। এই হাতটার জন্যই আমি আপনাকে পেয়েছি, এই হাতটার জন্যই আঙ্কেল আণ্টি এত্তো ভালো একটা ছেলে আর মরিয়ম একটা ভাই পেয়েছে, এই হাতটার জন্যই আপনার মতো কত অসহায় মানুষ আজ কাজ করছে। তাদেরও একটা ভবিষ্যৎ হচ্ছে। এত মানুষের দোয়া আর ভালবাসা আপনার সাথে। আপনি কখনোই হারতে পারেন না। অসম্ভব।
— আল্লাহ ভরসা। আচ্ছা আজান দিচ্ছে আমি নামাজে যাই। তারপর আবার ফ্যাক্টরিতে যেতে হবে। পরশু ডেলিভারি করতে হবে৷ তুমিও নামাজ পড়ে যেও। আসি।
~ আচ্ছা।

জান্নাত বাসার ভিতরে চলে গেলে আমি নামাজ পড়ে আবার ফ্যাক্টরিতে চলে যাই। দেখতে দেখতে পরশুদিন চলে আসে। খুব সকাল সকাল ভাড়া করা ডেলিভারির জন্য গাড়ি চলে আসে। আমি নিজেই গাড়ির সাথে গিয়ে পুরো দিন বসে ডেলিভারি দিয়ে আসি। এবার শুধু অপেক্ষার পালা। কারণ আমার ফোনটা যদি না বাজে, নতুন অর্ডার না আসে তাহলে সব শেষ। ঘড়ির কাটা তার আপন গতিতে ঘুরছে। সাথে সময়গুলোও পাড় হয়ে যাচ্ছে। আজ তিন দিন হলো কোন কল আসেনি। আমার খাওয়া ঘুম সব অফ। ফোন নিয়ে শুধু বসে আছি। পাঁচ দিন চলে গেল। কোন খবর নেই কোথাও থেকে। আমার অবস্থা দেখে জান্নাত শুধু কান্না করছে। বাবা-মা বোন শুধু আমাকে ভরসা দিয়ে যাচ্ছে। আজ এক সপ্তাহ চলে যাওয়ার পরও আমি কোন কল পাইনি। মানষিক ভাবে আমি এখন পাগল। চোখের জল গুলো শুকিয়ে দাগ হয়ে গিয়েছে। আমার ওয়ার্কাররা আমার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষায় আছেন। তারা এতো ভালো যে আমাকে একটা বকা দেয় নি। উল্টো আমাকে আশ্বাস দিচ্ছে। মহান আল্লাহর কাছে হাত তুলে শুধু সাহায্য চাচ্ছিলাম। জায়নামাজটা চোখের পানিতে ভিজে গিয়েছে। আর পারছিলাম না। ঠিক তখনই আল্লাহ আমাদের সবার ডাক শুনেন। একে একে কল আসতে শুরু করে। বিশাল বড়ো এমাউন্টের অর্ডার আসে। যারা এতদিন বসে আমাদের ক্লোথ কিনেছিল তাদের এত ভালো লেগেছে যে তাদের আত্নীয় স্বজনরা আবার তাদের আত্নীয় স্বজনরা এভাবে অনেকে এসে আমাদের ক্লোথ কিনতে চাচ্ছে। কিন্তু স্টোক শেষ। তাই মুহূর্তেই এত বড়ো অর্ডার চলে আসে। বিশ্বাস করুন জীবনে এত্তো খুশি হইনি তখন যা হয়েছি। আমাদের কাজ আবার শুরু হয়। একদম নতুন উদ্যমে। এবার শুধু লাভ আসছেই। আগে ছিল তিনটা শপিংমল এবার চার/পাঁচটা শপিংমল থেকে অর্ডার আসছে। শুধু তাই না সুদূর ঢাকা থেকেও অর্ডার আসলো। আমি অবাক হলাম ঢাকায় কিভাবে আমার ব্রান্ডের খবর গেল। পরে জানলাম কেউ একজন এখান থেকে আমাদের ক্লোথ কিনে ঢাকা নিয়ে গিয়েছিলেন। যাকে গিফট করেছিলেন তার আত্নীয় ছিল একজন বড়ো ব্যবসায়ী। তার নাকি আমাদের ক্লোথ কোয়ালিটি এবং ডিজাইন অনেক ভালো লাগে। তাই সে দ্রুত আমাদের খোঁজ লাগিয়ে আমাদেরকে অনেক বড়ো অর্ডার দেন৷ এবার পড়ি আরেক ঝামেলায়। সেটা হলো অর্ডার বেশি কিন্তু ওয়ার্কার কম। তাই আরও ৫০ জন ওয়ার্কার নিতে হয় আমাকে। সাথে আরো ৫০ টা মেশিন৷ যেটা বাবা আমাকে ভাড়া দিয়েছে। আমার এই সফলতার পিছনে সবার প্রথম আল্লাহ আর তারপর বাবার হাত। প্রথম কলটা পেলে মহান আল্লাহর কাছে কোটি কোটি শুকরিয়া আদায় করে সোজা বাবার কাছে চলে যাই। তাকে সুখবরটা জানিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদি। বাবা খুব খুশি হন। তারপর মা, বোন আর জান্নাত জানে। তারাও খুশিতে কাঁদে। সেদিনের পর থেকে মহান আল্লাহর ইচ্ছায় আমার সফলতা আর কে আটকায়। আস্তে আস্তে সময় যেতে থাকে। আমার বিজনেস বড়ো হতে থাকে। আগে ভাড়া নেওয়া ফ্যাক্টরিতে কাজ করতাম এখন আমার নিজের ফ্যাক্টরি আছে। প্রচুর টাকা আসছিল। এদিকে আমি কিন্তু এখনো আমার ছাত্রীদের পড়ানো অফ করিনি। আমি ওদের বলেছি, আমি ওদেরকে বিবিএ শেষ না হওয়া পর্যন্তই পড়াবো। জান্নাত আর আমার সম্পর্কটা এখন এমন যে শুধু বিয়ে করার অপেক্ষায়। ওর বাবার কানে ইতিমধ্যে আমার নাম চলে গিয়েছে। ও বা ওর মা বলেনি। আসলে শহরে কোন নতুন ব্রান্ড এভাবে এত ফাস্ট নাম করতে শুরু করলে সবার কানেই তার খবর চলে যায়। শুধু রাজশাহী না ঢাকাতেও আমার ব্রান্ডের ক্লোথের প্রশংসা প্রচার হচ্ছিলো। আমার এখানে যারা কাজ করে তাদের ৫০ % শারীরিক ভাবে পার্ফেক্ট না। সেটা হওয়া স্বত্ত্বেও কিভাবে আমরা এত আগাচ্ছি তা অনেকের নজর কারছিল। যার জন্য অনেক গণমাধ্যম থেকে আমার সাথে কথা বলতে আসে। আমার ব্রান্ড নিয়ে নিউজও হয়৷ যার জন্য আমার নাম আরও জোরসে প্রচার হতে থাকে। বিশ্বাস হচ্ছিলো না কিছুই। এ যেন অবিশ্বাস্য কোন স্বপ্ন পূরণের গল্প। একটা অকেজো হাত নিয়ে এতদূর কিভাবে আমি আসলাম জানি না৷

এদিকে,

— বাবা বাবা এটা দেখো। তাড়াতাড়ি নিউজটা পড়ো…

আমার আপন বাবা নিউজ পেপারটা নিয়ে পড়তে শুরু করলেন। সেখানে আমার ছবি দিয়ে অনেক বড়ো করে লেখা, “আবির’স ফ্যাশন হাউস” সেখানে আমার ব্রান্ড সম্পর্কে অনেক কিছু লেখা। বাবা আমার নিউজ পড়ে স্তব্ধ হয়ে যান। তারা ভেবেছিলেন আমি সত্যিই মরে গিয়েছি। কিন্তু আমার সফলতা আজ তাদের দুয়ারে নাড়া দিয়েছে। বাবা আর ভাইয়া বাকরুদ্ধ হয়ে আছে। কারণ সেখানে আমার নতুন বাবার সম্পর্কেও লেখা আছে। যে আমার বাবা এত বড়ো একজন ব্যবসায়ী হওয়া স্বত্ত্বেও আমি নিজ উদ্যোগে এত দূর এসেছি। এত নাম কামাচ্ছি। তারা দুজন পুরো সকড। আমার বিজনেস সেদিন সবে শুরু হয় এরপর দিনের পর সপ্তাহ, সপ্তাহের পর মাস আর মাসের পর বছর কেটে যায়৷ আমার কোম্পানি এবং ব্রান্ডের তিন বছর পাড় হয়। এই তিন বছরে অনেক বাঁধা বিপত্তি, লস মুনাফা ইত্যাদি পাড় করে এসেছি। ঢাকাসহ দেশের বড়ো বড়ো জায়গায় আমার ব্রান্ডের আউটলেট দিয়েছি। সবশেষে এবার ঢাকায় আমার নামেই নতুন শপিংমল উদ্ভাবন করতে আগামী কাল ঢাকায় যাচ্ছি আমরা সবাই। বাবা-মা, মরিয়ম, আমি এবং আমার স্ত্রী জান্নাত। হ্যাঁ এই দৌড়াদৌড়ির মাঝে আমি জান্নাতকে বিয়ে করে ফেলি। ওর বাবা মা খুশি খুশি মনে ওকে আমার হাতে তুলে দিয়েছেন। অবশ্য তার আগে আমার পুরো জীবন কাহানী শুনেছেন তারা। আমার বাবা-মাই তাদের সব বলেছেন। জান্নাতের বাবাও একজন ব্যবসায়ী। তিনি জানেন কিভাবে এবং কতটা কষ্ট করে এতদূর আসতে হয়। আমার সমস্যা থাকা স্বত্ত্বেও আমি যে এতদূর এসেছি এটা ভেবেই তিনি অবাক। তাই আর দেরি না করে জান্নাতকে আমার হাতে দিয়ে দিলেন। যাই হোক কালকে বিশাল বড়ো আয়োজন করা হয়েছে আমার নতুন শপিংমল খোলার উপলক্ষে। সেখানে দেশের অনেক বড়ো বড়ো ব্যবসায়ীরা আসবে৷ অনেক গণমাধ্যমের লোকেরাও আসবে আমার কথা শুনতে। ঢাকার মতো এই বিষাক্ত শহর থেকে একবার হেরে গিয়েছিলাম আজ প্রতিষ্ঠিত আবার ফিরেছি। তাও আমার নতুন পরিবার আর আমার স্ত্রীকে সাথে নিয়ে। তাই আমার আপন পরিবারকেও এই অনুষ্ঠানে ডাক দিলাম। তারাও জানুন আমি কিভাবে এতদূর আসলাম।

পরদিন আছরের নামাজ শেষ করে আমার নতুন শপিংমল উদ্ভাবন করি। সবাই আমার অপেক্ষায় আছে। আমি আমার পরিবার নিয়ে সবার সামনেই বসে আছি। আমার চোখের সামনেই আমার আপন বাবা, বড়ো ভাই, ভাবী আর আমার ছোট বোনটা বসে আছে। তাদের সবার মুখ মলিন। মাঝ দিয়ে শুনেছি বাবার কোম্পানিটা বিশাল বড়ো লস করেছে একটা প্রজেক্টে। এরপর কোম্পানির অবস্থা নাকি দিন দিন খারাপই হচ্ছে। আসলে বড়ো ভাইয়া আমাকে দেখিয়ে হিসাব নিকাস করেই কোন প্রজেক্টে ইনভেস্ট করতেন। কিন্তু এবার আমি ছিলাম না। যার ফলে…থাক আর নাই বা বলি। যাই হোক সেই অপেক্ষার পালা এখন শেষ। কারণ এবার আমাকে ডাক দিয়েছে। আমি উঠে মাইকের কাছে গেলাম। আর বলতে শুরু করলাম,

— আসসালামু আলাইকুম সবাইকে। প্রথমেই মহান আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করছি। আমি আজ এখানে আমার সফলতার গুণগান করতে আসিনি। আমি আজ আপনাদের একটা ছেলের গল্প শোনাবো। গল্পটার একটা নামও দিয়েছি আমি।
“আন্তঃনগরের ভালবাসা।”
তাহলে এবার গল্পটা শুরু করি। আশাকরি সবাই মন দিয়ে শুনবেন। গল্পের শুরুটা একটা মা হারা ছেলেকে নিয়ে। যার আবার একটা হাত প্যারালাইজড। বলতে গেলে একদম অকেজো। সেই অকেজো হাতটি নিয়ে ছেলেটা বড়ো হতে থাকে। আর সে সাথে এই বিষাক্ত সমাজের চোখে সে একটা হাসি, তুচ্ছতাচ্ছিল্য, মজার এবং বোঝার বিষয় হয়ে যায়। তাকে প্রতি মুহূর্তে সবাই কষ্ট দিতে থাকে। তাকে এটা বোঝানো হয় যে সে একটা বোঝা। সে জীবনে কিছুই করতে পারবে না৷ তার মরে যাওয়া উচিৎ। এমত অবস্থায় ছেলেটার সবচেয়ে বড়ো ঢাল হওয়ার কথা ছিল তার আপন পরিবার। কিন্তু সেই আপন পরিবারও তাকে কোন দিন ভালবাসে নি, তার দিকে মায়া ভরা নয়নে তাকায় নি, সেই আপন পরিবারও তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে মৃত ঘোষণা করে বাসা থেকে বের করে দূরে সরিয়ে দেয়। ছেলেটার আর বেঁচে থাকার কোন ইচ্ছাই থাকে না৷ কিভাবে থাকবে? কি আছে তার বেঁচে থাকার জন্য? কিছুই নেই। ছেলেটা যখন দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে চলে যাচ্ছিলো ঠিক তখনই তাকে একজন বাঁচায়। সেই লোকটা তার কষ্টের জীবনের কথা বলে ছেলেটাকে নতুন একটা জীবন উপহার দেয়। ছেলেটা সেদিন মারা যায়নি। চলে যায় রাজশাহীতে। নতুন একটা শহর, নতুন একটা জায়গায়। না আছে কেউ পরিচিত, না আছে কেউ চেনা। কি করবে সে? কোথায় যাবে? কোন উত্তর ছিল না তার কাছে৷ সে শুধু মনে মনে আল্লাহকে ডাকছিল। তার বিশ্বাস ছিল ওই সৃষ্টিকর্তার উপর। আল্লাহ তায়ালা তার বিশ্বাসকে নষ্ট হতে দেয় নি। অলৌকিক কিনা জানি না কিন্তু একজন বাবার চোখ যায় সেই ছেলেটার উপর। সে কেন জানি নিজেকে আটকে রাখতে পারে না। সে ছেলেটার কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করেছিল, কি হয়েছে বাবা? তুমি এখানে একা কেন? ছেলেটার সব শুনে বাবাটা নিজেকে আটকে রাখতে পারে না। তার আপন ছেলে বানিয়ে ছেলেটাকে তার বাসায় নিয়ে যায়। নিঃস্ব ছেলেটাকে মহান আল্লাহ তায়ালা মুহূর্তেই একটা বাবা একটা মা আর একটা আদরের বোন দিয়ে দেন। সেদিন থেকেই ছেলেটার জীবনের চাকা আবার ঘুরতে থাকে। ছেলেটার নতুন বাবা অনেক ধনী হলেও সে চেয়েছিল নিজ উদ্যোগে কিছু করবে৷ কিন্তু তার এত পড়াশোনা ডিগ্রি দিয়েও সে একটা চাকরি পায়নি তার এই ডান হাতটা প্যারালাইজড বলে। আবারও সেই হাতের জন্য সে হেরে গেল। ঠিক তখনই ছেলেটার জীবনে একটা মেয়ের আগমন হয়। মেয়েটা ছেলেটাকে আবার সাহস দেয় সাথে সাপোর্টও। ছেলেটা মেয়েটার কথা মতো তার বান্ধবীদের পড়ানো শুরু করে। মাস শেষে মোটা অংকের টাকা চলে আসে তার পকেটে। চাকরি করতে গিয়ে যখন ছেলেটা জানে যে মেধার চেয়ে টাকার মূল্য বেশি তখন সে হেরে গিয়েও আবার সেই মেধাকেই কাজে লাগিয়ে সে অনেক টাকা জমাতে থাকে। ছেলেটার এই টাকা জমানোর মূল কারণ ছিল তার স্বপ্ন পূরণ। যে স্বপ্নের জন্য তার বেঁচে থাকা। এই স্বপ্ন সে আজ পূরণ করেছে। আর এই স্বপ্ন পূরণে তার সাথে ছিল, তার নতুন পরিবার, সেই মেয়েটা যে কিনা এখন তার স্ত্রী, আর তার কোম্পানিতে কাজ করা তার মতোই অসহায় মানুষরা এবং বাকি ওয়ার্কাররা। সবাই তার পাশে ছিল। যার জন্য তার এই বিশাল বড়ো স্বপ্নটা আজ সত্যি হয়েছে। আজ তার কাছে নিজের ব্রান্ড, বাড়ি, গাড়ি, টাকা সব আছে। বাবা-মা, বোনের ভালবাসা, তার স্ত্রীর ভালবাসা, তার ওয়ার্কারদের ভালবাসা। সে এই আন্তঃনগরে অনেক ভালবাসা খুঁজে পেয়েছে। সেই ছেলেটি আর কেউ নয়, সে আমি। আপনাদের আবির আহমেদ। আর এই হলো তার ভালবাসাগুলো। (পাশে থাকা পরিবার আর জান্নাতকে।দেখিয়ে) ধন্যবাদ সবাইকে। অসংখ্য ধন্যবাদ।

আমার আন্তঃনগরের ভালবাসার গল্প শুনে উপস্থিত সবার চোখ জলে ভেসে যায়। আর গল্পের শেষ হয় তাদের করতালি দিয়ে। আমি দেখেছি বাবা, বড়ো ভাইয়া, ভাবী আর বোনটাও কাঁদছিল। খুব ইচ্ছা হচ্ছিলো ওদের কাছে ছুটে যাই। কিন্তু যাইনি। আজ আমি প্রতিষ্ঠিত বলে তারা আমাকে তো চাইবেই। তাহলে আমার খারাপ সময় যারা আমার পাশে ছিল তাদের কি হবে? আমি কোন ভাবেই তাদের সাথে বেইমানি করতে পারবো না। আমি তাদের নিয়েই খুশি। তারাই আমার আপন পরিবার। আমার আআন্তঃনগরের ভালবাসা।

— সমাপ্ত।

—> “সমাজ যাদেরকে ছুড়ে ফেলে দেয়, তারাও চাইলে জীবনে অসম্ভব কিছু করতে পারে।” – এই শিক্ষার আলোকেই এই গল্পটা লিখা। আশা করি প্রতিটি পর্ব জুড়েই আপনাদের কিছু না কি শিখাতে পেরেছি। এ গল্পে কোন রোমান্টিকতা নেই। জীবনের চরম বাস্তবতাকে কিছুটা কাল্পনিক আর বাস্তবিক সংমিশ্রণে মাখিয়ে আপনাদের সামনে তুলে ধরেছি। আশা করি ভালো লেগেছে। যদি লেগে থাকে অবশ্যই গঠন মূলক একটা মন্তব্য করে জানাবেন। আর হ্যাঁ ভুল তো কিছু না কিছু হয়েছেই। সেগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন। হয়তো আবার ফিরে আসবো কোন এক গোধূলি বিকেলে নতুন কোন গল্প নিয়ে।

© আবির খান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here