প্রজাপতির_রং🦋 Part_06

0
242

প্রজাপতির_রং🦋
Part_06
#Writer_NOVA

টেবিলের ওপর থাকা ঘড়িতে একঘেয়েভাবে এলার্ম বেজে যাচ্ছে। বিছানায় থেকে উঠে তা বন্ধ করতেও ইচ্ছে করছে না।আবার শুয়ে শুয়ে বিরক্তিকর এলার্ম শুনতেও ইচ্ছে করছে না।আমি পরে গেছি দোটানায়।শেষ পর্যন্ত আলসেমিকে দূরে ঠেলে বিছানা থেকে উঠতেই হলো।ওয়াসরুম থেকে ওযু করে এসে নামাজ আদায় করলাম।নামাজ শেষে করে অনেকক্ষণ ডেকে তারপর এরিন ও হিমিকে জাগাতে পারলাম।কোরআন তেলওয়াত করে বেশ কিছু সময় হাটাহাটি করলাম বারান্দায়।নাভান এখন উল্টো হয়ে ঘুমোচ্ছে। এরিনদের রুমে উঁকি মেরে আমি চলে গেলাম কিচেনে।

আমিঃ সকালের জন্য আজ কি করা যায়?(চিৎকার করে)এরিন, হিমি আজ কি খাবি সকালে?

হিমিঃ রুটি, ডিম ভাজি কর।

আমিঃ আচ্ছা। নাভানের দিকে একটু খেয়াল রাখিস।

চুলোয় গরম পানির পাত্র বসিয়ে দিয়ে আমি আটার ডিব্বা থেকে আটা নিলাম।ফ্রীজ থেকে ডিম বের করে সামনে রাখতেই নাভানের কান্নার আওয়াজ পেলাম।
আবারো কিচেন থেকে জোরে চেচিয়ে বাকি দুটোকে বললাম।

আমিঃ দেখ না, নাভান কাঁদছে কেন? কি রে শুনছিস? নাকি আবার ঘুমিয়ে পরেছিস?

এরিনঃ আমি দেখছি,তুই কাজ কর।

গরম পানির বলগ উঠছে।সেটাকে বন্ধ করে আমি বোলে আটা নিয়ে নিলাম।রুটির ডো বানানো শুরু করতেই নাভানকে কোলে তুলে এরিন এসে হাজির।

এরিনঃ কান্না থামছে না।তুই কোলে নিয়ে থামা।ক্ষিদে পেয়েছে ছেলেটার।তুই ওকে খাইয়ে আয়।আমি ততক্ষণে রুটি বেলতে থাকি।

নাভানঃ আমমুউউউউউ। (হাত বাড়িয়ে দিয়ে)

আমি আটা মাখানো হাতেই নাভানকে কোলে তুলে নিলাম।আমি কোলে নিতেই সে পুরো ঠান্ডা।

আমিঃ আমি পাশে নেই, টের পেলেই মহাশয়ের ঘুম ভেঙে যায়। এত কান্না কিসের হুম? আমি কোথাও পালিয়ে যাচ্ছি। ইস,নাকের পানি চোখের পানি এক করে ফেলেছে। ছেলে মানুষের এতো আলগা চোখের পানি হলে কি চলে? তুমি কি জানো না, সকালে উঠে মা-কে রান্না করতে হয়।আর তুমি পাঁজিপানা করো।এটা কি ঠিক বলো বাবাই।আমার লক্ষ্মী ছেলেটা কেন এমনটা করে? খুদু লেগেছে পাখিটার? চলো খাইয়ে নিয়ে আসি।(এরিনের দিকে তাকিয়ে)তুই একটু এদিকটা দেখ।আমি ওকে খাইয়ে নিয়ে আসি। ঘুমের থেকে উঠেছে তো এখন মন-মতলবি করবে।কোন কাজও ঠিকমতো করতে দিবে না।

এরিনঃ আচ্ছা তুই যা।

আমি রুমে চলে এলাম।নাভানকে ব্রেস্ট ফিডিং করিয়ে ওকে আবার ঘুম পারানোর চেষ্টা করলাম।কিন্তু আজ সে ঘুমাবে না বলে পণ করেছে। তাই ব্যর্থ হয়ে তাকে নিয়েই আবার কিচেনে যেতে হলো।

এরিনঃ কি ঘুমায়নি?

আমিঃ ও এখন ঘুমালে আমায় জ্বালাবে কে? হিমি ঘুমিয়ে পরেছে।নয়তো ওর কাছে রেখে আসা যেত।দে বেলুন,পিঁড়ি আমার দিকে দে।আমি রুটি বেলছি।তুই গিয়ে শুয়ে থাক।তোর তো এত সকালে উঠার অভ্যাস নেই। পরে আবার মাথা ধরবে।

এরিনঃ বেশি কথা বলিস না।গত তিন দিন ধরে সকালে উঠে আমিই তোর শো করেছি।তিন দিন সকাল সকাল জাগায় আমারও আজ ঘুম আসবে না। আমি রুটি বেলে দিচ্ছি। নাভানকে কোলে নিয়ে রুটি বেলতে তোর কষ্ট হবে।তার চেয়ে বরং তুই রুটি সেঁকে দে। তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে।

আমি কথা না বলে তাওয়ায় রুটি সাঁকতে লাগলাম।এক হাতে নাভানকে ধরে আরেক হাতে রুটি সাঁকতে লাগলাম।নাভান আমার কোলে চুপটি করে আছে।শরীরের সাথে লেপ্টে কাঁধে মাথা দিয়ে রাখছে।নাভান মাঝে মাঝে সকালে উঠে এমনটা করে।

🦋🦋🦋

সকালের নাস্তা সেরে কোনরকম রেডি হয়ে চলে এসেছি। আজ নাভানও মর্জি করে আমার সাথে চলে এসেছে। কিছুতেই এরিন,হিমির কাছে রেখে আসতে পারিনি।অগত্যা কি আর করার। ছেলে নিয়ে শো করতে আসতে হলো।নাভানকে কোলে নিয়ে অফিসের লিফটে উঠতেই সাইমনের সাথে দেখা।সাইমন আমাকে দেখে চমকে উঠলো।

সাইমনঃ নননননোভা তুমি!!!

আমিঃ হ্যাঁ, আমি।আমাকে দেখে এরকম চমকে গেলেন কেন?আমি বাঘ নাকি ভাল্লুক?

সাইমনঃ না, তেমন কিছু না।হুট করে তোমায় দেখেছি তো তাই ভয় পেয়ে গেলাম।

তার কথা আমার বিশ্বাস হলো না। চোখ দুটো ছোট ছোট করে তার কার্যক্রম পর্যেবেক্ষণ করতে লাগলাম।সে অনেকটা ছটফট করছে।আর তার হাব-ভাবে মনে হচ্ছে সে আমাকে দেখে ভয় পেয়ে গেছে। কিন্তু কারণটা খুঁজে পেলাম না।আমি হালকা করে মুখ বাঁকিয়ে সামনের দিকে দৃষ্টি দিলাম।তবে একটা বিষয় খোটকা লাগলো।আমি তিনদিন কোথায় ছিলাম সে বিষয় কোন প্রশ্ন করলো না। অন্য সময় তো একদিন না আসলে প্রশ্ন করতে করতে পাগল বানিয়ে ফেলে।

আমিঃ এভরিথিং ইস ওকে মিস্টার সাইমন?

সাইমনঃ হ্যাঁ সব ঠিক আছে। একদম ঠিক আছে। কোন ভুল হতে পারে নাকি।

শেষের কথাটা বিরবির করে বললেও আমি স্পষ্ট শুনতে পেয়েছি।

আমিঃ আমার কাছে তো সবকিছু ঠিক মনে হচ্ছে না। আপনি এরকম ছটফট করছেন কেন? মনে হচ্ছে বাঘের খাঁচায় আপনাকে আটকে রাখা হয়েছে। আর আমাকে এখানে আশা করেননি।

সাইমনঃ কি যে বলেন না।

আমিঃ আপনি এত সকালে এখানে কি করছেন?আমার জানা মতে আপনার শো সকাল দশটায়।আর তিন ঘন্টা আগে এখানে?

সাইমনঃ একটু দরকারে এসেছি।আমরা এসে পরেছি।

লিফটের দরজা খুলতেই সাইমন দ্রুত পায়ে বের হয়ে গেলো।আমি ভ্রু কুঁচকে তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলাম।এত সকালে তার আবার কিসের দরকার?সাইমন আমার কলিগ।কিন্তু ওর হাব-ভাবে আমি রহস্য রহস্য গন্ধ পাই।মাথা থেকে এসব ফালতু কথা ঝেড়ে ফেলে শান্ত পায়ে ভেতরে ঢুকলাম।ভেতরে ঢুকতেই নাভান নাক,মুখ কুঁচকে দাঁত বের করে বললো

নাভানঃ আমমমু সিস।

আমিঃ সিস দিবা, দিয়ে দেও।ডায়পার পরা আছো।তাই নো প্রবলেম😁।

নাভানঃ আত্তা(আচ্ছা)😁।

নাভানের কপালে চুমু খেয়ে শো করার রুমে চলে গেলাম।নাভানকে পাশের এক চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে সাইড ব্যাগ থেকে কতগুলো চিপস,চকলেট বের করে ওর সামনে দিয়ে রাখলাম।এখন এগুলো খেতেই ব্যস্ত থাকবে।আমাকে শো করতে বিরক্ত করবে না। মাইক্রোফোন, সাউন্ড ঠিক করে নিলাম।এখন শুরু করতে হবে একটানা বকবক।

🦋🦋🦋

সন্ধ্যার আকাশটা দেখতে অপরুপ হয়।লাল রাঙা আকাশটা বিদায় দেয় সূর্যকে।সূর্যের অন্তিম আভায় আকাশ নিজেকে সাজায়।গোধূলির এই লগ্নটা দেখতে আমার মন্দ লাগে না। পার্কের বেঞ্চে বসে আছি। এখান থেকে খোলা আকাশ দেখা যাচ্ছে।আশেপাশের পরিবেশটা ভীষণ সুন্দর। বিকেল হলেই এখানে বিভিন্ন বয়সের কাপলদের ভিড় দেখা যায়।সন্ধ্যা হলে অবশ্য কমে যায়।যার কারণে আশেপাশটা মানুষের আনাগোনা নেই ।বিকেলের শো টা শেষ করতেই তায়াং ভাইয়ার কল।এই কফি হাউসের লোকেশন দিয়ে বলে এখানে চলে আসতে।নাভানকে আনিনি।আকাশ দেখতে ব্যস্ত ছিলাম।হুশ ফিরে তায়াং ভাইয়ার কথায়।

তায়াংঃ নাভান কই?

আমিঃ বাসায় রেখে আসছি।সকালের শো টা ওকে নিয়ে করছি।তাই বিকেলে আর আনিনি।হুট করে এখানে আসতে বললি যে।

তায়াংঃ কিছু কথা আছে তোর সাথে।

আমিঃ জলদী বল।বাসায় যেতে লেইট হয়ে যাবে।

তায়াংঃ এমনভাবে বলছিস যেনো তোকে আমি এখানে ফেলেই চলে যাবো।

আমিঃ তা নয়। দেখ ভাই,ঘন্টা দুই অনর্গল ফাউ বকবক করে কার বা মন চায় এখন কথা বলতে?

তায়াংঃ কেন, তোর ঐ বকবকের জন্য কি তারা টাকা দিচ্ছে না।

আমিঃ হুম তা দিচ্ছে। কিন্তু এখন বিরক্ত লাগে।

তায়াংঃ ছেড়ে দে।

আমিঃ মা-ছেলের চলবো কি করে?আমি কারো দ্বারে হাত পাতবো না। নিজের ইনকামে সন্তানকে মানুষ করবো।(শক্ত গলায়)

তায়াংঃ খালামণি আমায় কল করেছিলো।বললো তুই নাকি বাসার কল উঠাচ্ছিস না।

আমিঃ কেন, আরেকটা বিয়ে করার জন্য ফোর্স করতে।কতবার বলছি আমি আর কোন বিয়ে করবো না। বাকি জীবনটা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দিবো।তা কানে যাচ্ছে না কেন তাদের? তারাই তো এনাজের সাথে আমাকে বিয়ে দিয়েছিলো।আমি তো পালিয়ে বিয়ে করিনি।সমাজে কি সিঙ্গেল মাদার হিসেবে কেউ তার সন্তানকে বড় করছে না? তারা আমার নিজের বাবা-মা হয়ে কি করে বলতে পারে আরেকটা বিয়ে করতে।আমি যে নাভানকে ছাড়া বাঁচবো না তা কেন বুঝে না ভাই।মানলাম উনারা আমার ভালো চায়।কিন্তু আমি তো এভাবেই ভালো আছি।তা কেন বুঝে না। কেন নতুন করে জাহান্নামে পাঠাতে চায় আমাকে? তারা যদি আমাকে না বুঝে তাহলে আমি কোথায় যাবো?

তায়াংঃ তোর যা ভালো মনে হয় তাই কর।আমি আর তোকে জোর করবো না।একবার জোর করে তোর জীবন নষ্ট করে দিয়েছি।

চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পরছে। বাবা-মায়ের প্রতি ইদানীং অভিমানটা বড্ড বেশি জেঁকে ধরেছে। ছোট এক গ্রামের মেয়ে আমি।বাবা-মা আর ছোট বোন নিয়ে আমাদের সুখী পরিবার।বাবা কৃষি কাজ করেন।মা গৃহিণী। সারা বছর আমাদের জমিতে একের পর এক ফসল বোনা হয়।যার কারণে সারাবছরই কাজ লেগে থাকে আমাদের বাড়িতে।ছোট বোন এবার অনার্সে পরছে।আমরা মধ্যবিত্ত পরিবার।বাবা কখনো কোন অভাব আমাদের বুঝতে দেইনি।আমরা দুই বোন ছিলাম বাবার আদরের রাজকন্যা।আমি আমার বাবা-মাকে কখনও ছেলের জন্য আফসোস করতে দেখিনি।তারা সবসময় বলতো, দুই মেয়ে বিয়ে দিয়ে দুটো ছেলে আনবো।এনাজের বাবা-মা কেউ নেই।ছোট বেলায় মারা গেছে। আপন বলতে বছর চারেক ছোট এক ভাই। এনাজের মৃত্যুর ছয় মাস পরেই ওর ছোট ভাই হুট করে উধাও হয়ে যায়।পরে জানতে পারি অস্ট্রেলিয়ায় চলে গেছে। কিন্তু আমার বিশ্বাস হয়নি।দেবরের হুট করে উধাও হয়ে যাওয়ায় আমি অনেকটা অবাক হই।কিন্তু করার কিছু ছিলো না। তাই চুপ হয়ে যাই।

এনাজের মৃত্যুর কয়েক মাস পর থেকেই আমাকে বিয়ের জন্য চাপ দেওয়া শুরু করে। তাদের ধারণা বিয়ে করলে আমি ঠিক হয়ে যাবে। প্রথমে বিষয়টা আমলে নেইনি। কিন্তু দিনকে দিন তারা বিয়ে নিয়ে অতিরিক্ত মাথা ঘামানো শুরু করে।নাভানের বয়স যখন দেড় বৎসর তখন হুট করে একদিন আমাকে ছেলেপক্ষ দেখতে আসে।এতে আমি অনেক রেগে যাই।ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় চলে আসি।মাসখানিক চাকরীর জন্য পাগলের মতো এদিক সেদিক ঘুরে আরজে ক্যারিয়ারে ঢুকি। প্রথম প্রথম সমস্যা হলেও আমি এখন মোটামুটি একটা ভালো অবস্থানে আছি।আমি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের কোন ছবি আপলোড দেই না।তাই কোন লিসেনার আমাকে চিনে না।

আমিঃ ভাইয়া, কি বলবি বল?

তায়াংঃ এনাজের মৃত্যুর ঘটনাটা আবার আমাকে বল।

আমিঃ প্লিজ ভাইয়া,সেই ঘটনা আর মনে করিস না।স্বামী হারিয়েছি, সন্তান হারাতে চাই না।

তায়াংঃ তুই কিডন্যাপ হওয়ার পর থেকে আমি এসব নিয়ে আবার ভাবা শুরু করেছি।তাই আমার আবারো খুটিনাটি জানা দরকার।

আমিঃ কিন্তু…

তায়াংঃ আমি তোর কোন কথা শুনবো না।

আমি বড় করে একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলতে শুরু করলাম।আবার সেই ভয়াবহ দিনের কথা মনে করতে হবে আমায়।যেটার কথা মাথায় এলেই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে।নিজের চোখের সামনে স্বামীকে শেষ হতে দেখেছি।কিন্তু কিছু করতে পারিনি।চোখ দিয়ে অলরেডি পানি পরা শুরু হয়ে গেছে।

তায়াংঃ প্লিজ বল নোভা।

আমিঃ শোন তাহলে।সেদিন………….

#চলবে

রি-চেইক দেওয়া হয়নি।ভুল-ভ্রান্তি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন😊😊।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here