প্রজাপতির_রং🦋 Part_07

0
523

প্রজাপতির_রং🦋
Part_07
#Writer_NOVA

আমি বড় করে একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলতে শুরু করলাম।আবার সেই ভয়াবহ দিনের কথা মনে করতে হবে আমায়।যেটার কথা মাথায় এলেই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে।নিজের চোখের সামনে স্বামীকে শেষ হতে দেখেছি।কিন্তু কিছু করতে পারিনি।চোখ দিয়ে অলরেডি পানি পরা শুরু হয়ে গেছে।

তায়াংঃ প্লিজ বল নোভা।

আমিঃ শোন তাহলে।সেদিন সকাল থেকে আকাশটা মেঘাচ্ছন্ন ছিলো।এনাজের অফ ডে।আমি সকাল থেকে ওর সাথে খ্যাচখ্যাচানি শুরু করেছিলাম,বাইরে ঘুরতে যাওয়ার জন্য।আমি তখন ছয় মাসের প্রেগন্যান্ট। তুই জরুরি কোন কাজে বাইরে গেছিস।এনাজ যেতে চাইছিলো না।কারণ তুই নাকি কড়া করে বারণ করেছিলি আমাকে নিয়ে একা কোথাও বেরুতে।কোথাও যাওয়ার হলে তোকে যেনো নিয়ে যায়।আমি কোন কথাই শুনিনি।বরং জেদ করা শুরু করলাম।আমাকে বিকেলে ঘুরতে নিয়ে না গেলে আমি নিজের ক্ষতি করে দিবো।সেই ভয়ে এনাজ আমাকে নিয়ে হাঁটতে বের হলো।বোরখা পরে মাথায় হিজাব বাঁধলাম। এনাজ শেওলা রঙের একটা টি-শার্ট ও কালো প্যান্ট পরলো।দুজন হাঁটতে বের হলো।বিকেল ৫ টা বাজে।কিন্তু চারিদিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিলো সন্ধ্যা শেষ হয়ে রাত নেমছে। আসলে কালো মেঘে অন্ধকার হয়ে আছে।এনাজ ফিরে যেতে চাইলো।কিন্তু আমি আরেকটু থাকার জন্য ওকে রাজী করলাম।হাঁটতে হাঁটতে একসময় আমাদের বাসার উত্তর দিকে যে ব্রিজটা আছে তার ওপর এসে থামলাম।চারিদিকে তখন ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করেছে।আমি চোখ বন্ধ করে দুজন হাত মেলে দিয়ে সেটা অনুভব করলাম।হঠাৎ গাড়ির আওয়াজ পেতেই সেদিকে তাকালাম।কিছু বুঝে উঠার আগে ১৫/১৬ জন মানুষ গাড়ি থেকে নেমে এলোপাতাড়ি এনাজকে মারতে লাগলো।আমাকেও দুইজন এসে আটকে দিলো।এতগুলো মানুষের সাথে এনাজ পারছিলো না।আর সবার হাতে ক্রিকেট স্টাম্পের মতো মোটা স্টীল জাতীয় লাঠি ছিলো।আমি চিৎকার করে ওদের থামতে বলছি।কিন্তু কেউ আমার কোন কথা শুনছিলো না।

এতটুকু বলে থামলাম।চোখের পানি অনরবত পরছে।তায়াং ভাইয়া উৎসুক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তারপরের কাহিনি শোনার জন্য।

তায়াংঃ তারপর কি হলো?

আমিঃ আমাকে ধরে রাখার বলে আমি এনাজের কাছেও যেতে পারছিলাম না।ওরা অমানুষের মতো এনাজকে মেরেই যাচ্ছে। আমি জোরে চিৎকার করে কাঁদছি। কিন্তু আশেপাশে কোন মানুষ নেই যে সে আমার কান্না শুনবে।এনাজ বারবার ওদের বলছিলো, আমাকে ছেড়ে দিতে।আমাকে এখান থেকে যেতে দিতে।তারপর ওকে যতখুশি মারুক তাতে ওর সমস্যা নেই। আমাকেও বলছে এখান থেকে পালিয়ে যেতে।কিন্তু আমি ওকে ছেড়ে কিছুতেই যাবো না। ওরা কয়েক মিনিটের জন্য মার থামালো।তারপর তাদের মধ্যে একজন কাউকে কল করে জিজ্ঞেস করলো এনাজকে মেরে ফেলবে কিনা আর আমাকে কি করবে। ততক্ষণে এনাজ উঠে দাঁড়িয়েছে।এক পা আমার দিকে দিতেই পেছন থেকে একজন সজোরে ওর ঘাড়ে বারি মারে।এনাজ মুখ থুবড়ে পড়ে যায়।তারপরেও ওরা থামে না।ইচ্ছে মতো মারতে থাকে। রক্তে জায়গায়টা ভেসে যাচ্ছে। মুখের থেকেও রক্ত পরছে।ওর এই অবস্থা দেখে আমার চোখ ঝাপসা হতে লাগলো।আমার চারপাশের সবকিছু ঘুরছে।একসময় এনাজ নিস্তেজ হয়ে গেলো।একজন এনাজের নাকের সামনে হাত নিয়ে নিঃশ্বাস চেক করে বললো এনাজ বেঁচে নেই। তা শুনে আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেলো।কাঁদতে কাঁদতে বসে পরলাম।ওর কাছে যাওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগলাম।কিন্তু আমাকে যে লোক দুটো ধরে রেখেছে তাদের থেকে নিজেকে ছাড়াতে পারলাম না। কাহিনিটা যদি এখানে শেষ হতো।তাহলে হয়তো আমি এনাজকে জড়িয়ে ধরে শেষবারের মতো কাঁদতে পারতাম।

কাঁদতে কাঁদতে আমার হেঁচকি উঠে গেছে। তায়াং ভাইয়া আমার দিকে টিস্যু এগিয়ে দিলো।মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো।

তায়াংঃ শান্ত হো তুই। চোখ দুটো মুছে নে।

কিছু সময় নিয়ে আবার বলা শুরু করলাম।নিজেকে যথাসাধ্য শান্ত রাখার চেষ্টা করছি।কিন্তু পারছি না।তায়াং ভাইয়া আমার সামনে এক হাঁটু গেড়ে বসে,আমার হাত দুটো তার হাতের মুঠোয় নিয়ে শক্ত করে ধরলেন।আমার গালে আলতো করে হাত রেখে বললেন।

তায়াংঃ কান্না থামা।তোর চোখের প্রতিটা ফোঁটা পানির দাম ওদের দিতে হবে।তার জন্য আবারো আমায় ঘটনাটা পুরো জানতে হবে।

আমিঃ আমি তখন নিজেকে শান্ত রাখতে পারছিলাম না।মনে হচ্ছিলো অজ্ঞান হয়ে যাবো।হালকা ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ফোটা পরছে।তবে ভিজে যাওয়ার মতো নয়।
আমার দুঃখে শামিল হতে তারাও আকাশ থেকে ঝড়ে পরছে।চোখের সামনে নিজের স্বামীকে নিস্তেজ হয়ে পরে থাকতে দেখলে কি বিষাক্ত অনূভুতি হয় তা নিজের সাথে না হলে কেউ বুঝতে পারবে না। লোকগুলোর মধ্যে তিনজন গিয়ে গাড়ি থেকে পেট্রোলের বোতল নিয়ে এলো।এনেই এনাজের শরীরে ঢালতে লাগলো।ততক্ষণে আমিও নিস্তেজ হয়ে গেছি।চোখ দুটোকে আর টেনে ধরে রাখতে পারলাম না।চোখের সামনে সবকিছু ঘোলাটে লাগছিলো।অজ্ঞান হওয়ার আগে দেখতে পেলাম মোটা কালো করে দেখতে একজন দিয়াশলাই বক্স থেকে কাঠি বের করে আগুন জ্বালালো।তারপর সেই জ্বলন্ত কাঠিটা এনাজের দিকে ছুঁড়ে মারলো।তারপর আমি কিছু জানি না।যখন জ্ঞান ফিরে তখন হসপিটালে।পরে জানতে পারলাম এনাজের লাশটা পাওয়া যায়নি।আরে পাওয়া যাবে কি করে? ও তো জ্বলন্ত আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আমি নিজের চোখে ওর শরীরে আগুন ছুঁড়ে মারতে দেখেছি।

চোখ দুটো অসম্ভব জ্বলছে। মাথাটাও ভারী হয়ে আসছে।কান্না করলে এই জ্বালাগুলো ভোগ করতে হয়।তায়াং ভাইয়া থম মেরে বসে আছে। আমাকে থামতে দেখে বললো।

তায়াংঃ তাদের কাউকে তুই চিনতে পারবি?

আমিঃ না রে ভাইয়া।সেই আড়াই বছর আগের কথা। তাছাড়া আমি তাদের ওতটা খেয়াল করিনি।এনাজের দিকেই ছিলো আমার পুরো ধ্যান।তবে ওদের লিডারে যে কালো,মোটা করে লোকটা ছিলো।তাকে আমার স্পষ্ট মনে আছে।তাকে ভুলি কি করে।সে যে আমার এনাজের শরীরে জ্বলন্ত দিয়াশলাইয়ের কাঠি ছুঁড়ে মেরেছে।

তায়াংঃ তোর স্বামী কোন জবে ছিলো তা কি তোর মনে আছে?

আমিঃ সি বি আই অফিসার।এটা আমি ভুলি কি করে? এই চাকরিজীবনের শত্রুতার রেশ ধরে যে কেউ ওকে হত্যা করেছে তা আমি সিউর।তবে জানিস ভাইয়া, ঐ লোকগুলো সম্ভবত কারো হুকুমে এনাজকে মেরেছে। কারণ ওকে এলোপাতাড়ি মারার পর মোটা করে লোকটা কাকে জানি কল করলো।কলের ঐপাশের ব্যক্তিটা বোধহয় এনাজকে মেরে ফেলতে বলেছে।তাই তার এক সঙ্গীকে হাতের ইশারায় মেরে ফেলতে বললো।এই পুরো ঘটনা টাকা দিয়ে তাদেরকে করিয়েছে। এটা আমি চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারি। বিয়ের একবছরের মাথায় আমাকে ওরা বিধবা বানিয়ে দিলো।

তায়াংঃ তোর স্বামী সি বি আই বলেই এখন ওর খুনীকে খুঁজতে টাফ হয়ে যাবে। কোন শত্রুতার রেশ ধরে খুনী এই কাজ করেছে তা বের করতে গিয়ে আমিও হাঁপিয়ে পরবো।

আমিঃ ছাড় না এসব।আমি এভাবেই ভালো আছি।এনাজকে হারিয়েছি কিন্তু তোকে আর নাভানকে হারাতে চাই না।গত দুই বছর তন্ন তন্ন করে খুঁজে পুলিশ,সি আই ডি, সি বি আই কিছু বের করতে পারলো না। আর তুই কি পারবি বল? তার চেয়ে এসব ভুলে গিয়ে নিজের কাজে ডুব দে।

তায়াংঃ যারা তোকে এই সাদা রঙে সাজিয়েছে তাদের কি করে ছেড়ে দেই বল? একদিন আগে হোক কিংবা একদিন পরে।আমি তাদের কে শাস্তি দিয়েই ছাড়বো।

ভাইয়ার কথা শুনে নিজের দিকে তাকালাম।সাদা থ্রি পিস পরে আছি।নাক,হাত,কান সবকিছু খালি।যেই সাদা রং আমার সবচেয়ে অপছন্দ ছিলো, সেটাই আড়াই বছর ধরে পছন্দ হয়ে আছে।আমার এখন নিজেকে সাদায় রাঙিয়ে রাখতেই ভালো লাগে। ভাইয়ার দিকে তাকালাম।ভাইয়া আজও পুরো কালো রঙে সেজে এসেছে। ওকে কালো রঙে মারাত্মক সুন্দর লাগে।আমি মৃদুস্বরে বললাম।

আমিঃ সন্ধ্যা শেষ হয়ে রাত নামতে চললো।চল এখন উঠি।আর দেরী করা ঠিক হবে না।

তায়াংঃ হুম চল।

আমি ও তায়াং ভাইয়া দুজনেই পার্ক থেকে উঠে বাইরে চলে এলাম।গেইটের সামনে ভাইয়ার বাইক ছিলো।ভাইয়া উঠে স্টার্ট দেওয়ার আগে তার হেলমেট-টা আমার দিকে বারিয়ে দিলো।আমি মাথায় হেলমেট পরে ওর কাঁধে এক হাত রেখে বসে পরলাম।

#চলবে

আজ গল্প দেওয়ার কোন ইচ্ছে ছিলো না। তারপরেও ছোট করে দিয়ে দিলাম। এখানে ১১০০+ শব্দ আছে।ছোট করে দেওয়ার জন্য দুঃখীত।আগামীকাল বড় করে দিবো,ইনশাআল্লাহ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here