প্রজাপতির_রং🦋 Part_13

0
523

প্রজাপতির_রং🦋
Part_13
#Writer_NOVA

— ভেতরে কি ঢুকতে দিবে না? এভাবেই বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখবে পাখি?

রোশানের মুখে পাখি ডাকটা শুনে আরো রাগ উঠে গেল।কিন্তু নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রাখার চেষ্টা করছি।আমার সামনে আর কেউ নয় রোশান দেওয়ান দাঁড়িয়ে আছে। আমি কিছু বলবো তার আগেই এরিন এসে হাজির।

এরিনঃ কে আসছে রে নোভা? এতো সকাল সকাল কে আবার আমাদের স্মরণ করলো?

কথাগুলো বলতে বলতে দরজার সামনে আসতেই রোশানকে দেখে এরিন ভ্রু কুঁচকে ফেললো।জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো। আমি মুখে কৃত্রিম হাসি টেনে নিলাম।

এরিনঃ কে উনি? উনাকে তো চিনতে পারলাম না।তোর পরিচিত কেউ নাকি?

আমিঃ হুম অনেক পরিচিত। (দাঁতে দাঁত চেপে)

রোশানঃ হাই শালিকা সাহেবা।আমি আপনাদের নতুন দুলাভাই। নোভার ভবিষ্যৎ জামাই।

এরিনঃ মানে???

আমিঃ আশায় থাকে কাউয়া,পাকলে খাইবো ডেওয়া।(বিরবির করে)

এরিনঃ এই নোভা কি বলে উনি? কি হয় তোর? এটা তো এনাজ নয়।তাহলে দুলাভাই কেন বলে?

আমিঃ এর কথায় তুই কিছু মনে করিস না।এই ব্যাটা পাগল।মাথায় একটু সমস্যা আছে। কয়েক মাস পাবনায় ভর্তি ছিলো।এই সপ্তাহে ছাড়া পেয়েছে। কিন্তু পাগলামি এখনো যায়নি।মনে হচ্ছে আবার ভর্তি করতে হবে।

এরিনঃ দেখে তো পাগল মনে হয় না।

রোশানঃ কি বললে তুমি পাখি? আমি পাবনায় ভর্তি ছিলাম।এমন কথা তুমি বলতে পারলে? অবশ্য তোমায় খুঁজে না পেলে সত্যি ভর্তি হতে হতো।যাক গে সেসব কথা। আমি কিছু মনে করি নি।মেহমান এলে কি এভাবেই দরজার কাছে দাঁড়া করিয়ে রাখো তোমারা?ভেতরে তো ঢুকতে দেও।পা ব্যাথা হয়ে গেলো।

আমি এরিনের সামনে কোন ধরণের সিনক্রিয়েট করতে চাইছি না।তাই সৌজন্যতা রক্ষা করার জন্য বললাম।

আমিঃ ভেতরে আসুন।

এরিনঃ এই লোক কে তাতো বলবি।বলা নেই কওয়া নেই একজন অচেনা লোককে তো আমরা ভেতরে ঢুকতে দিতে পারি না। এমনি আমাদের পেছনে শত্রুর অভাব নেই। এই দালানেই তো দুই কুটনি বুড়ি আছে।তারা যদি জানে আমরা কোন অপরিচিত ছেলেকে ঘরে ঢুকিয়েছি তাহলে তিলকে তাল বানিয়ে চরিত্রে দাগ লাগাবে।বাড়িওয়ালা তখন ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাসা থেকে বের করে দিবে।আমরা তিনটা মেয়ে থাকি।কোন ছেলে মানুষ নেই। এখন যদি কোন ছেলে দেখে তবে কেলেংকারী হয়ে যাবে।

আমিঃ যা বোইন তুই একটু পানি খেয়ে আয়।এতবড় বক্তৃতা দিতে গিয়ে তোর গলা শুকিয়ে গেছে। গলা ভিজিয়ে নে।আমি কাউকে এখন ভয় পাই না।তাই এতসব আমাকে বলে কোন লাভ নেই। (রোশানের দিকে তাকিয়ে) কি ভেতরে কি ঢুকবেন? নাকি বাইরে থেকে চলে যাবেন? বিনা দাওয়াতে যখন ডেং ডেং করে নাচতে নাচতে চলে আসতে পেরেছেন, তাহলে ভেতরে ঢুকতে এত শরম কেন?

রোশানঃ অপমান করছো পাখি? কোন সমস্যা নেই। তুমি আমাকে যা বলো বা করো তাতে আমার একটুও খারাপ লাগে না। কারণ তোমাকে সেই অধিকার আমি দিয়েছি।তুমি ছাড়া আর কারো সাধ্যি নেই এই রোশান দেওয়ানের সামনে গলা উঁচু করে কথা বলার।আর অপমান তো অনেক দূরের কথাই।

রোশান ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকলো।ওকে সোফায় বসতে বলে আমি আর এরিন আপ্যায়নের ব্যবস্থা করতে ব্যস্ত হলাম।শত হোক উনি এখন আমার অতিথি। তার আপ্যায়ন তো করতেই হয়।আর এরিন বা হিমি কাউকে আমি আমাদের বিষয় কিছু জানাতে চাইছি না।তাই নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টায় আছি।ঘরে তিন আইটেমের ফল,বিস্কুট চানাচুর ছিলো।জলদী করে তাই বের করলাম।যদিও সকালবেলা ফল দিলে কিরকম দেখায়।কিন্তু ঘরে আপাতত এগুলো ছাড়া আর কিছু নেই।

মিনিট পনের পর খাবারের ট্রে হাতে নিয়ে আমাদের ছোট ড্রয়িং রুমে আসতেই, আমি রোশানকে পেলাম না।ছোট টি-টেবিলে ফুলের তোড়া রাখা।কিন্তু রোশান নেই। দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলাম দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। তার মানে রোশান ভেতরেই আছে।আমার রুমে উঁকি মারতেই আমার চোখ ছানাবড়া। রোশান নাভানকে কোলে তুলে ওর সাথে হেসে হেসে কথা বলছে।

আমিঃ আপনি আমার বেডরুমে কি করছেন?

রোশানঃ নাভান উঠে গিয়েছিলো।তাই আমি এসে কোলে তুলে নিলাম।

আমিঃ দিন, আমার কোলে দিন।

রোশানঃ থাকুক না একটু আমার কোলে।

রোশান পুরো ইনোসেন্ট ফেস করে কথাটা বললো। আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে মানা করতে পারলাম না।তাছাড়া নাভানও ওর কোলে চুপ করে আছে।

আমিঃ এদিকে আসুন।

রোশান ভদ্র ছেলের মতো আমার পিছু পিছু ড্রয়িং রুমে এলো।নাভানকে কোলে নিয়েই সোফায় বসলো।কিছু সময় পর পর ওর গালে, কপালে চুমু খাচ্ছে। ওর সাথে হাত নাড়িয়ে খেলছে।নাভান খিলখিল করে হাসছে।রোশানের মুখেও হাসি।আমার কেন জানি এই চিত্রটা ভীষণ ভালো লাগলো।এনাজ থাকলে হয়তো এভাবেই নাভানের সাথে খেলতো।

আমিঃ মিস্টার রোশান, কিছু একটা খেয়ে নিন।

রোশানঃ শুধু শুধু এসব করতে গেলে পাখি।আমি এখন কিছু খাবো না। ব্রেকফাস্ট তোমার সাথে করতে চাই। যদি তুমি কিছু মনে না করো।

আমিঃ ব্রেকফাস্ট পরে করবেন।আগে কিছু তো একটু মুখে দিতেই হবে।

রোশানঃ আমার পাখি যখন বলছে তাহলে তো কিছু একটা মুখে দিতেই হয়।

হাত বাড়িয়ে এক পিস বিস্কুট নিয়ে মুখে পুরলো।তারপর আঙুরের থোকা থেকে কতগুলো আঙুর ছিঁড়ে একটু একটু করে নাভানকে খাওয়াতে মনোযোগ দিলো।আশ্চর্য বিষয় হলো নাভান কোন ঝামেলা ছাড়া তা লক্ষ্মী ছেলের মতো করে খাচ্ছে। আমি অবাক চোখে তাকিয়ে রইলাম।খুব সহজে রোশান নাভানের সাথে মিশে গেছে। এরিন আবার পড়তে চলে গেছে।ওর একটা টিউটোরিয়াল এক্সাম আছে। হিমি এখনো ঘুমে।আমি নিশ্চিন্ত মনে কিচেনে চলে গেলাম।

রোশানকে কেন জানি এখন আমার একটুও খারাপ লাগছে না। কিচেন থেকে এখন আমি ওদের দুজনের হাসির ঝংকার শুনতে পারছি।উঁকি মেরে দেখতে পেলাম রোশান আর নাভান দুজনে ফ্লোরে পা ছড়িয়ে বসে একসাথে খেলছে।তাও নাভানের খেলনা দিয়ে। আমার কাছে দুটোকেই বাচ্চা ছেলে মনে হচ্ছে। রোশানকে আমি অন্যরূপে আবিষ্কার করলাম।ওর চোখ, মুখে কোথাও নেই কোন ক্ষোভ বা হিংস্রতা।বরং একটা বাচ্চার সাথে খেলতে গিয়ে ও নিজেও বাচ্চা হয়ে গেছে। নাভানও ওর সাথে এমন আচরণ করছে না জানি কত আগের থেকে রোশান ওর চেনা।আমার মনটা খুশির সাথে সাথে নতুন এক আশংঙ্কা হানা দিচ্ছে। রোশান আবার নতুন কোন চাল চালবে না তো।নইলে হুট করে এভাবে আমার এখানে কেন?তবে ওর মধ্যে কোন ভেজাল আমি খুঁজে পাচ্ছি না। তারপরেও নিজের মনটা তো ওকে বিশ্বাস করতে পারছে না।রোশান পলিটিশিয়ান।উদ্দেশ্য ছাড়া কোন কাজ করে না।ওর সব কাজের পেছনে কোন না কোন উদ্দেশ্য জড়িত থাকে।আবার যদি কোন ঝামেলা পাকায়??

🦋🦋🦋

নিজের কেবিনে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে তাজ।দুদিন ধরে কিছুই তার ভালো লাগছে না। নোভার সাথে দেখা হওয়ার পর থেকে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। সেদিন যখন টুম্পা নামের মেয়েটির থেকে বকুল ফুলের মালা কিনেছিলো।তখন সামনে তাকিয়ে নোভাকেই দেখতে পেয়েছিলো।ব্যাগ হাতে একা দাঁড়িয়ে আছে। এদিক সেদিক তাকিয়ে কাউকে খুজছিলো নোভা।ওকে দেখেই ওর হাত-পা ঠান্ডা হওয়া শুরু করছিলো।অন্যরকম একটা ফিলিংসের মুখোমুখি সে হয়েছিলো।আর গতকাল ওর সামনে ছিলো।তাহলে বুঝুন কতটা নার্ভাস সে ছিলো।যদিও উপরে উপরে তার কিছুই বুঝতে দেয় নি কাউকে। কোনকিছু ভালো লাগছে না তাজের।টেবিলে থাকা ফাইল ঘাটতে শুরু করলো।তখুনি ওর চোখ গেলো টেবিলে থাকা নীল মলাটের এক ডায়েরির দিকে।ডায়েরী হাতে নিয়ে ও সিউর হলো এটা নোভার।কারণ গতকাল নোভাকে এটা ব্যাগ থেকে বের করতে দেখেছিলো।

ডায়েরি খুলতে কিছুটা ইতস্তত বোধ করলো তাজ।অন্যের ডায়েরি না বলে ধরা উচিত নয়।আর সেখানে তাজ এটা পরবে।ডায়েরি খুলবে কি খুলবে না তা নিয়ে এখন দ্বিধাদ্বন্দে পরে গেছে।মস্তিষ্ক বলছে অন্যের ডায়েরি খোলা উচিত নয় তাজ।আর মন বলছে খুলে দেখ না কি আছে?তুই তো আর কোনকিছু চুরি করছিস না।অবশেষে মনের কথায় সায় দিয়ে ডায়েরিটা খুলেই ফেললো তাজ।খুলতেই নিচের লেখাগুলো পেলো।প্রথম পৃষ্ঠায় বড় বড় করে ছন্দের আকারে লিখা।

“”ডায়েরির পাতায় পাতায়🍁
লিখা আছে তোর নাম🌹
আমি না হয়, হয়ে রইলাম🍃
তোর নামের বদনাম🍂🍂””

~~~~~~~ভালোবাসি এনাজ,খুব বেশি ভালোবাসি।তোমায় ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ। আরেকবার ফিরে আসো না আমার জীবনে।কথা দিচ্ছি আমি কোন দুষ্টুমি করবো না।আমি তো এখন লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে গেছি।পরিস্থিতি সামলে নিতেও শিখে গেছি।তবুও কি তুমি ফিরে আসবে না। এক বাচ্চার মা হয়ে তো জীবন থেকে অনেক শিক্ষা পেয়ে গেলাম।এখনো কি আসবে না আমার জীবনে?আমার বিশ্বাস তুমি আসবে।আমার সাথে আর কত অভিমান করে থাকবে?আমার যে এখন তুমি হীনা দম নিতেও খুব কষ্ট হয়।পুরো পৃথিবীর সাথে যুদ্ধ করতে করতে আমি যে হাঁপিয়ে গেছি।আমি সত্যি ক্লান্ত হয়ে পরেছি।আর কত কষ্ট দিতে চাও আমায়?এবার চলে আসো না প্লিজ।আমি তোমার সব কথা শুনবো।~~~~~~~~~~

প্রথম পৃষ্ঠা পরে নিজের মনে বিরবির করে উঠলো তাজ।তার ভেতরটা কিরকম জানি ছটফট করছে।কিন্তু কিসের জন্য তা সে বুঝতে পেরেও আবার বুঝতে পারছে না।

ডায়েরির দিকে তাকিয়ে আবার পৃষ্ঠা উল্টাতে লাগলো।তখুনি চোখ যায় আরেক জায়গায়। লেখাগুলো মনে হয় আগের।কারণ কালিগুলো কিরকম ছড়িয়ে গেছে।সম্ভবত লেখাটা নোভার বিয়ের আগের হবে।প্রথমে সম্ভবত বলে ধরে নিলেও পৃষ্ঠার কোণার দিকে তাকিয়ে তাজ সিউর হয়ে গেলো লেখাটা নোভার বিয়ের আগেরই।কারণ সাল লেখার জায়গায় আজ থেকে আরো চার বছর আগের সাল লেখা। চেয়ারে আরাম করে বসে পড়তে লাগলো তাজ।সেখানে নিচের কথাগুলো লিখা আছে।

🍂🍂🍂

একটু আগে একটা কাহিনি হয়ে গেছে।যেটা না লিখলে আমার পেটের ভাত হজম হবে না।তাই লিখতে বসে পরেছি।কথা না বলে কাহিণীতে ফেরা যাক।

আম্মু সবসময় পরার জন্য সিটি গোল্ডের দুটো চুড়ি কিনে আনছে।আগের গুলো পুরনো হয়ে রং নষ্ট হয়ে গেছে বলে।আম্মু বরাবরই নতুন কিছু আনলে আগে আমাদের দুই বোনকে দেখাবে।তারপর নিজে পরবে।হোক সেটা আমাদের দুই বোনের জন্য কিংবা আব্বু অথবা নিজের জন্য।যথারীতি আম্মু আমাদের দেখিয়ে নিজের হাতে চুড়ি দুটো পরছে।

আমার আবার একটা বাজে অভ্যাস আছে। আম্মু যখুনি আমার সামনে চুড়ি খুলবে তখুনি টুপ করে খুলে রাখা চুড়ি দুটো আমার দুই হাতে পরে নিবো।আমার এই কাজটা করতে ভীষণ ভালো লাগে।আমার মুঠ ভর্তি চুড়ি পরার থেকে দুই হাতে দুটো সিটি গোল্ডের চুড়ি পরা বেশি পছন্দ।কিরকম বিবাহিত বিবাহিত মেয়ে দেখা যায়।এই বিষয়টা আমি বেশ ইনজয় করি। তাই আম্মু চুড়ি খুললেই আমি টুপ করে পরে নেই।

তো সেই চুড়িগুলে সন্ধ্যা থেকে পরে ঘুরছি।মাঝে মাঝে হাত ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছি। ভালো লাগছিলো না,ভাবলাম এক কাপ চা খেলে ভালো লাগবে। তাই চা বানাতে চলে যাই।এক কাপ আম্মুকে দিয়ে আর দুই কাপ নিয়ে ছোট বোন ইভার কাছে চলে আসছি।আমরা দুই বোনের একটা অভ্যাস আছে।যেটা হলো চা খাওয়ার সময় কখন খাটের ওপর বসবো না।দুজনেই নিচে ফ্লোরে বসে, হাত-পা ছড়িয়ে আরাম করে চা খাবো।তো তোমনটা করেই বসে চায়ে বিস্কুট ভিজাচ্ছি। আমার বোন ওর পেছনে খাটে থাকা বালিশে হেলান দিয়ে রেখেছে।

বিস্কুট চায়ে ভিজিয়ে খেতে খেতে হঠাৎ ইভা বলে উঠলো,”বোইনে চুড়ি দুটো খোলো।”আমি বললাম “কেন?”ও বলে, “না তুমি চুড়ি দুটো খুলবা।”আমি বললাম, “যা ভাগ।”ওর কথায় পাত্তা না দিয়ে চায়ে চুমুক দিলাম।কিন্তু ও চা না খেয়ে বিস্কুট হাতে নিয়ে ওর সামনে থাকা বালিশে মুখ গুঁজে বসে রইলো।আমি ভাবলাম হয়তো এমনি করছে।একটু পর ঠিক হয়ে যাবে।মাঝে মাঝে এরকম অদ্ভুত বায়না করে ও।তাই আমি এসবকে পাত্তা দেই না।

চা শেষ হতেই কাপটাকে ধুয়ে যথাস্থানে রেখে আবার ফিরে এসে দেখি ইভা এখনো বালিশে মুখ গুঁজে রেখেছে। এবার একটু খোটকা লাগলো।ও তো কখনো এরকম করে এত সময় থাকে না।দুই হাত দিয়ে মাথাটা সামান্য উঁচু করতেই দেখতে পেলাম নাকের পানি, চোখের পানি এক করে ফেলেছে। কোনকিছু বলেই ওর মাথা উঠানো যাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে আমার চুড়ি দুটো খুলতেই হলো।চুড়ি খোলার সাথে সাথে চোখ মুছে হাসি দিয়ে চা খেতে ব্যস্ত হয়ে পরলো।আমি তো অবাক, এই মেয়ের কান্ড দেখে। তারপর জিজ্ঞেস করলাম, “এমন করলি কেন?”তারপর যা বললো তাতে আমি হো হো করে হেসে উঠলাম।ও কান্না করছে এজন্য যে,আমি দুই হাতে চুড়ি পরলে ওর নাকি মনে হয় আমি ওকে ছেড়ে শ্বশুর বাড়ি চলে যাবো।তাই চুড়ি খুলতে বলেছে।কথাগুলো বলতে বলতেই আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁধে মুখ গুজে আবারো কাঁদতে লাগলো।এবার আমি হাসতে হাসতে ওকে রাগাতে লাগলাম।বললাম,”আমি চলে গেলেই তো তুই খুশি।সবসময় তো তুই বলিস আমাকে কবে তুমি শ্বশুর বাড়ি যাবা।আর কবে তোমার জ্বালা থেকে রেহাই পাবো।আর পুরো রুমটা আমার হবে।তাহলে এখন কাঁদছিস কেন?আমি চলে গেলেই তোর শান্তি।” এতে ওর সামান্য হেলদোলও দেখলাম না। ও তো আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেই যাচ্ছে। অবশেষে অনেক দুষ্টামী করে ওর কান্না বন্ধ করতে পেরেছি।

কিন্তু ইভার হঠাৎ এমন বিহেভিয়ারে আমি অনেক অবাক হয়েছি।সচারাচর ও এমন করে না।আমি জানি, আমি চলে গেলে ও প্রথম প্রথম অনেক কান্না করবে।কারণ আমি ছাড়া ওর প্রিয় বন্ধু আর কেউ নেই। সবকিছু আমার সাথে শেয়ার করবে।আমি শ্বশুর বাড়ি চলে গেলে ও পুরো একা হয়ে যাবে।তখন হয়তো ওর সময় কাটানোর মানুষটাও থাকবে না।আম্মুর কাছে কিছু সময় পর পর আমার নামে বিচারও দিতে পারবে না। অবশ্য সময়ের স্রোত একসময় ঠিক মানিয়ে নিবে।কিন্তু প্রথম দিকে ওর খারাপ লাগবে মনে হলেই আমার মনটা নিমিষেই খারাপ হয়ে যায়।

শত ঝগড়া, মারামারি, কিংবা মনমালিন্যর পর আমিই ওর সব।ইভার সাথে রাগ করে যেমন আমি থাকতে পারি না। তেমনি ইভাও পারে না।আমি একটু অসুস্থ হলে পাগল হয়ে যায়।কি রেখে কি করবে?একটা কাজও তখন করতে দিবে না। ও আমার বিশ্বস্ত একজন বন্ধুও।যে কথাটা আমি বলতে মানা করবো কখনো সেটা কাউকে বলবে না।কখনো বা আম্মু-আব্বুর বকার থেকে বাঁচিয়ে দিবে।আব্বু আমাকে বকলে ওর মুখ কালো হয়ে যাবে।আমার চোখে পানি দেখলে ও কেঁদে অস্থির হয়ে যাবে।মায়ের পর এই ছোট বোনটা আমার চোখের পানি সহ্য করতে পারে না। আমার চোখে পানি আসতে দেরী।ওর আসতে দেরী নয়।কিন্তু আমার চোখের পানি পরার আগে ওর চোখের পানি আগে পরে যাবে।

মাঝে মাঝে অবাক হয়ে যাই ওর কাজে।মনে হয় আমি ওর বড় বোন নই।ও আমার বড় বোন।সত্যি নিজেকে আমি খুব ভাগ্যবতী মনে করি।নয়তো ওর মতো এতো কেয়ারিং, আমাকে বোঝে এমন একটা বোন পেতাম না।তবে আমি ওর মতো ভালোবাসার প্রকাশটা করতে পারি না।তবে নিরবে,ধমকে কিংবা শাসনে ওকে আমি ভালোবাসি।

🍂🍂🍂

ডায়েরিটা বন্ধ করলো তাজ।নীল মলাটের মোটা ডায়েরির পাতাগুলো উল্টাতে উল্টাতে চোখে আটকে যায় এক জায়গায় এসে।যেখানে লিখা ছিলো “বোন”।নোভা তার ছোট বোন ইভাকে নিয়ে একটা কাহিনি ও মনের অনুভূতি গুলো লিখে রাখছে।পড়তে পড়তে কখন যে চোখের কোণে পানি জমে গেছে তা নিজেও বুঝতে পারেনি তাজ।ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে পানিটুকু মুছে নিলো।তারপর আবার ডায়েরির পাতা উল্টোতে লাগলো।দুই বোনের জীবন গল্প পড়তে পড়তে নিজের ভাইয়ের কথা মনে পরে গেছিলো।তাই না চাইতেও চোখের কোণে জল এসে ভিড়ছে। কারো হাঁটার শব্দ পেয়ে দ্রুত ডায়েরিটা টেবিলে থাকা ফাইলের ভিড়ে লুকিয়ে ফেললো।

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here