প্রজাপতির_রং🦋 Part_25

0
215

প্রজাপতির_রং🦋
Part_25
#Writer_NOVA

—- সেদিন ছিল ঝুম বৃষ্টি। বৃষ্টির কারণে ভালো মতো সবকিছু দেখা যাচ্ছিলো না।সামনে সাদা হয়েছিলো।এমন অবস্থায় ড্রাইভ করাও কষ্ট হয়ে যাচ্ছিলো আমাদের ড্রাইভার জামালের।ব্যাংক থেকে বাসায় ফিরছিলাম।যেই রাস্তা দিয়ে সচারাচর আমরা বাসায় ফিরি সেটা প্রায় হাঁটু সমান পানিতে তলিয়ে যায়। তাই ভাবলাম দূরের রাস্তা দিয়ে ঘুরে বাসায় আসবো।ড্রাইভারকে বলতেই সে অন্য রাস্তায় মোড় নিলো।চারিদিকে বৃষ্টির কারণে কিছু দেখা যাচ্ছে না।সকাল থেকেই আকাশটা মেঘলা।ব্যাংক থেকে ডেকেছে বলে না যেয়েও উপায় নেই।যাওয়ার সময় ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পরছিলো।আসার সময় যখন গাড়িতে উঠলাম তখনও ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পরছিলো।হুট করে ঝুপঝাপ বৃষ্টি নেমে গেলো।এত বৃষ্টি হবে জানলে কিছু সময় ব্যাংকে থেকে যেতাম।হঠাৎ আমাদের ড্রাইভার জামাল গাড়ি থামিয়ে দিলো।

এতটুকু বলে থেমে গেলেন মুরাদ সাহেব।তার মুখের দিকে উৎসুক চোখে তাকিয়ে আছে নোভা ও তায়াং।ওদের দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিলেন।তারপর ডুব দিলেন অতীতের স্মৃতির পাতায়।যেখানে এখনো জ্বলজ্বল করে ভাসছে সেই ঝুম বৃষ্টির দিনটা।

ফ্লাশব্যাক………

বাইরে তাকিয়ে একমনে মুরাদ সাহেবে কিছু একটা ভাবছিলেন।পুনরায় আবার ঘুরে দাঁড়াতে হবে তার।সবকিছু তিনি গুছিয়ে নিয়েছেন।ড্রাইভারের হুট করে গাড়ি থামাতে সে সামনের দিকে ঝুঁকে গেলেন।যাতে তার হুশ ফিরলো।বৃষ্টির তোড়জোড় বেড়েই যাচ্ছে। বিন্দুমাত্র কমার নাম নেই। কিছুটা বিরক্ত সহকারে ড্রাইভার জামালকে সে বলে উঠলেন।

মুরাদঃ কি ব্যাপার ড্রাইভার গাড়ি থামালে কেন?

জামালঃ স্যার, মনে হইতাছে ব্রীজের ওপর কেউ পইরা আছে।

মুরাদঃ কই কেউ নেই তো।আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।বৃষ্টির কারণে কিছু কি ভুলভাল দেখছো?তোমার কথাও ভালো করে শোনা যাচ্ছে না।একটু জোড়ে বলো।

জামালঃ স্যার,আমার মনে হইতাছে ব্রীজের ওপরে কেউ উপুড় হইয়া পইরা রইছে।(জোরে চিৎকার করে)

এত বৃষ্টি যে এক গাড়িতে বসে দুজন দুজনের কথা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে না।চারিদিকে শুধু বৃষ্টি পরার শব্দ। মুরাদ সাহেব জোর চেচিয়ে বললেন।

মুরাদঃ আমার চোখে কিছু পরছে না।

জামালঃ স্যার বাইর হইয়া কি দেখবেন কেডা পইরা রইছে। আমি কিন্তু অনেকটা স্পষ্ট দেখতে পাইতাছি একটা পোলা ব্রীজের ওপর পইরা রইছে।

মুরাদঃ চলো তো নেমে দেখি।

জামালঃ কিন্তু স্যার যদি কোন ডাকাতের লোক হয়।সিনেমায় তো বহুত দেখছি এমন কইরা রাস্তায় পইরা থাকে।যহন কেউ তার সাহায্য করতে যায় তহন আরো লোক বাইর হইয়া বড় বড় ছুরি দেখাইয়া লগের সবকিছু নিয়ে যায়।

মুরাদ সাহেবের কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠলো। জামাল কথা ভুল বলেনি।এই ছেলে ১৭ বছর থেকে তাদের ড্রাইভার হয়ে আছে। এখন বয়স ৩২ এর কোঠায়।মুরাদ সাহেব একে চোখ বুজে বিশ্বাস করতে পারে। ছেলেটা কিছুটা বোকা কিছিমের হলেও মানুষ হিসেবে ভালো।বৃষ্টির বেগ কিছুটা কমেছে। চোখের চশমাটা ভালো করে মুছে সামনের দিকে তাকালো। এবার সেও দেখতে পেলো একটা পুরুষের অবয়ব রাস্তায় পরে আছে। মুরাদ সাহেব ভাবলেন হয়তো ডেড বডি হবে।যদি ডেড বডি হয় তাহলে তো সামনে গেলেই ফেঁসে যাবেন।তাই জামালকে গাড়ি সাইড কাটিয়ে নিয়ে যেতে বললেন।জামাল গাড়ি সাইড কাটালো।যখুনি স্টার্ট দিবে তখন মুরাদ সাহেব কিছু একটা ভেবে আবার বললেন।

মুরাদঃ জামাল গাড়ি থামাও।

জামালঃ কিন্তু স্যার আপনেই তো কইলেন গাড়ি সাইড কাটতে।তার লিগা আমি সাইড কাটলাম।

মুরাদঃ যা বলছি তা কর।

জামাল এক সাইডে গাড়ি থামালো।মুরাদ সাহেব ও জামাল মাথায় একটা পলিথিন ব্যাগ বেঁধে বাইরে এলেন।তাদের কাছে এখন ছাতা নেই। জুলেখা বেগম বারবার করে বলেছিলেন ছাতা নিয়ে যেতে।কিন্তু গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি দেখে মুরাদ সাহেব আনেননি।বাতাসের কারণে তারা সামনেও এগুতে পারছেন না।ঠান্ডা হিম শীতল বাতাসে তাদের কেমন জানি শীত শীত লাগছে।কোনমতে ছেলেটার সামনে গেল।গলায় হাত রাখলেন।তারপর হাতের পালস চেক করলেন।

মুরাদঃ জামাল, ছেলেটা এখনো বেঁচে আছে। ওর পালস চলছে।ওকে সোজা করতে আমায় হেল্প করো। আমি একা পারবো না। বৃষ্টিতে ভিজে অনেক ভারী হয়ে গেছে। তাছাড়া তাগড়া জোয়ান ছেলে। একে একা উঠানোও সম্ভব নয়।

জামালঃ আইচ্ছা স্যার।

মুরাদঃ শরীরের পোশাক জায়গায় জায়গায় পুরে গেছে। পেট্রোলের মৃদু গন্ধ পাচ্ছি। কেউ মেরে জ্বালিয়ে দিতে চেয়েছিলো।

জামালঃ তাই তো দেখতাছি স্যার।আমি এদিকটা ধরি আপনে ঐদিক ধইরা ঠেলা দেন।

মুরাদ সাহেব ও জামাল মিলে ছেলেটাকে উল্টালো।বৃষ্টিতে ভিজে অনেক ভারী হয়ে গেছে। মুরাদ সাহেব দেখলেন বাম গালের মাংস পুরে হা হয়ে গেছে। ঐ গালের নিচে স্টীল জাতীয় কিছু একটা লেগে ছিলো।যার কারণে অনেকখন সেটায় আগুন ছিলো।সেই কারণে গালের মাঝখানটা পুরে মাংস ঝলসে হা হয়ে গেছে। স্টীল জাতীয় জিনিসটা হাতে নিয়ে দেখলেন কোল্ড ড্রিংকসের ক্যান।বাম গাল পাকা ফ্লোরের সাথে লাগানো ছিলো।গাল আর ফ্লোরের মাঝখানে ক্যানটা ছিলো।মুরাদ সাহেব এতক্ষণ পোড়া গালটা পর্যবেক্ষণ করছিলো।যার কারণে ছেলেটাকে চিনতে পারেনি।অন্য পাশটা দেখে সে চমকে উঠলো।

জামালঃ কি হয়েছে স্যার?আপনে কি এরে চিনেন?

মুরাদঃ জামাল এতো অফিসার এনাজ আহমেদ। এর এই অবস্থা কে করলো?তুমি ওকে চিনতে পারোনি?

জামালঃ কোন অফিসার?এনাজটাই বা কে?

মুরাদঃ আমার যেবার শেয়ার ব্যবসায় বিশাল লস খাইলাম সেবার আমার নামে মিথ্যা মামলা করা হইছিলো।ঐ মামলায় আমার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হইতো।কিন্তু তা হয় নাই। আমার কেসটা এনাজ নিজ দায়িত্বে নিয়ে গিয়েছিল। আর আমাকে নির্দোষ প্রমাণ করে।ও না থাকলে আমি এখন কারাদণ্ডের চার দেয়ালে বন্দী থাকতাম।

জামাল মাথা চুলকালে।বছর খানিক আগের কথা এগুলো।কিন্তু তার মনে পরছে না।তার আবার ভুলে যাওয়ার রোগ আছে। এই বিষয়ে মাথা ঘামালেন না মুরাদ সাহেব।এক সাইড পুরে গেলোও এনাজকে চিনতে তার কষ্ট হয়নি।কি করে ছেলেটাকে ভুলে যাবে সে।যেই যুদ্ধ করে তাকে বাঁচিয়ে ছিলো।সেগুলো কি ভোলার মতো।এনাজের ওপর অনেক কৃতজ্ঞ সে।মিথ্যা মামলা থেকে বেঁচে যাওয়ার পর খুশি হয়ে এনাজকে কিছু গিফট দিতে চেয়েছিলো।কিন্তু তখন এনাজ বলেছিলো আমার জন্য দোয়া করবেন।আমি একটা মেয়েকে অনেক ভালোবাসি। তাকে যেনো পাই।আমার আর কিছু লাগবে না।কিন্তু মুরাদ সাহেব নাছোড়বান্দা। তিনি এনাজকে কিছু দিবেই।তখন এনাজ মাথা চুলকে বলেছিলো, যদি নিতান্ত কিছু দিতে চান তাহলে সেটা তুলে রেখে দিন।যাতে আমি পরবর্তীতে সেটা চেয়ে নিতে পারি।কে জানতো সেই ছেলেটাকে আজ এই অবস্থায় দেখবে।হয়তো আল্লাহ তার কাছে পাঠিয়েছে সেই উপহার ফেরত দেওয়ার জন্য। এনাজকে এই অবস্থায় দেখে মুরাদ সাহেবের চোখ ছলছল করে উঠলো।ছেলেটার মুখে সবসময় হাসি লেগে থাকতো।কখনও কাউকে কষ্ট দিয়ে কোন কাজ বা কথা বলেনি।ডিপার্টমেন্টেও খুব নামডাক এনাজের।এর মধ্যে প্রায় এক বছর এনাজের সাথে দেখা হয়নি তার।তবে মাঝে মাঝে অন্য কারো থেকে এনাজের টুকটাক খবর নিতেন তিনি।

এবার আসল ঘটনা আপনাদের খুলে বলি।নোভা সেদিন কিন্তু তায়াং কে বলেছিলো, যেদিন এনাজকে মারা সেদিন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি আর বাতাস ছিলো।সে হাত মেলে সেটা উপভোগ করছিলো। লোকগুলো যখন এনাজকে পেট্রোল ছুঁড়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলো তখন সেটা দেখে নোভা অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলো।তারপর কি হয়েছে তা সে জানে না। এনাজকে চোখের সামনে আগুনে পুড়তে দেখে সে স্থির থাকতে পারেনি।লোকগুলো যখন এনাজের নিশ্বাস পরীক্ষা করছিলো তখন ওর দম আটকে ছিলো।যার কারণে এনাজকে ওরা মৃত ধরে নিয়েছে।
এনাজের শরীরে পেট্রোল ছুঁড়ে আগুন জ্বালানোর মিনিট পাঁচ পরেই ঝুম বৃষ্টি নেমে গিয়েছিল। সেকি বৃষ্টি!!! দাঁড়িয়ে থাকার মতো অবস্থা ছিলো না।বৃষ্টির কারণে শরীরর পোড়া অংশগুলো ততটা ঘা হতে পারেনি।শুধু পোশাক পুরে গিয়েছিল। তবে গালের ওপাশটায় বৃষ্টির পানি পৌঁছাতে পারেনি বলে মাংস পুরে গলে গিয়েছিল। আগুন ধরিয়েই লোকগুলো সেখান থেকে কেটে পরেছিলো। ভেবেছিলো পরে এসে পোড়াদেহ নিয়ে গিয়ে গুম করে দিবে।কিন্তু বৃষ্টি থেমেছিল এশার আজানের পর দিয়ে। ততক্ষণে তারা এনাজের কথা ভুলেই গিয়েছিল। যখন মনে হয়েছে তখন তাড়াহুড়ো করে এখানে এসেও লাশ পাইনি।এই কথা তাদের বসকে বললে তো জ্যান্ত কবর দিয়ে দিবে।তাই সেটা খুব সাবধানে তাদের বসের থেকে লুকিয়ে গেছে। আল্লাহর শান বোঝার ক্ষমতা কোন মানুষের নেই। আল্লাহ যাকে বাঁচাতে চান তাকে যেকোন উপায় বাঁচিয়ে দেন।তাই তো সেদিন এনাজকে বাঁচাতে ঝুম বৃষ্টি নামিয়ে ছিলেন আর মুরাদ সাহেবকে এই রাস্তা দিয়ে আসতে বাধ্য করেছিলেন।

বৃষ্টির বেগ কমে গেছে। মুরাদ সাহেব পুরো চুপচুপে ভিজে গেছেন।কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল নেই। সে এনাজকে দেখে যাচ্ছে। পুরনো কথা মনে পরে গিয়েছিল। জামালের ডাকে ভাবনা থেকে ফিরে এলেন।

জামালঃ স্যার চলেন এরে হাসপাতালে নিতে হইবো তো।নয়তো কোন ক্ষতি হইতে পারে।

মুরাদঃ হুম চলো।দুজন একসাথে ধরাধরি করে নিয়ে যাই।আমি ওর কিছু হতে দিবো না।

জামালঃ হো স্যার।আমি এদিকটা ধরি। আপনি ঐদিকটা ধইরা কান্ধে উঠান।

দুজন ধরাধরি করে গাড়িতে উঠালো এনাজকে।সারা শরীর ভিজে দুজন মানুষের ওজন হয়ে গেছে। মুরাদ সাহেবের গাড়ির সিট ভিজে যাচ্ছে সেদিকের পরওয়ানা করলেন না।এনাজের মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিলেন।তার সারা শরীর ঠান্ডায় কাঁপছে। তড়িঘড়ি করে জামালকে বললেন সামনের বড় প্রাইভেট হসপিটালে যেতে।জামালও কথা না বলে হসপিটালের রাস্তা ধরলেন।

ফ্লাশব্যাক এন্ড…………

🦋🦋🦋

মুরাদ আঙ্কেলের চোখে দিয়ে পানিতে টলমল করছে,
যেকোন সময় গড়িয়ে পরবে । আমার চোখ দিয়ে অনরবত পানি পরছে।তায়াং ভাইয়া শূণ্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থম মেরে বসে আছে। আমার মাথা থেকে পুরোপুরি এই বিষয়টা চলে গিয়েছিল যে বৃষ্টিতে কোনভাবে এনাজ বেঁচে গেছে। আল্লাহ আমার স্বামীকে বাঁচানোর জন্য কত সুন্দর করে আগের থেকে সব ভেবে রেখেছিলেন।তার দরবারে লাখো কোটি কোটি শুকরিয়া।

মুরাদঃ ওর মুখের অংশটা খুব বাজেভাবে পুরে গিয়েছিল।যা দিনকে দিন পচন ধরেছিলো।তাই এনাজের মুখ প্লাস্টিক সার্জারি করতে হয়েছে।বাহুর থেকে মাংস নিয়ে ক্ষতস্থানটা পূরণ করতে হয়েছে। তোমাদের কোন খোঁজ আমি জানতাম না যে এনাজের কথা তোমাদের বলবো।প্লাস্টিক সার্জারি করার সময় একটা মুখের আদলের দরকার ছিল। আমি তখন হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে গেছি।আমার কাছে এনাজের কোন ছবিও ছিলো না। তাই ডাক্তারকে বলেছিলাম আপনাদের ইচ্ছে মতো একটা মুখের আদল দিয়ে দিয়েন।

আমিঃ আমি আপনাদের কি বলে ধন্যবাদ দিবো তার ভাষা আমার জানা নেই। তবে আপনাদের কাছে চিরজীবন ঋণী থাকবো আমরা।

মুরাদঃ আমি শুধু আমার দায়িত্ব পালন করেছি।ওর প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেছি।ওর যাতে কোন ক্ষতি না হয় তার জন্য ওর নাম পাল্টে ফেলেছি।ওকে নিজের ছেলে পরিচয়ে রেখেছি।ওর ওপর কেউ যাতে সন্দেহ না করে তার জন্য পুরাতন বাড়ি বিক্রি করে এই নতুন বাড়িতে উঠেছি।আমি সুস্থ, স্বাভাবিক আছি শুধুমাত্র এনাজের জন্য। ও সেদিন আমায় না বাঁচালে আমার স্ত্রী, সন্তান পথে বসতো।আমার অনিশ্চিত ভবিষ্যত পার হতো।এই বাড়ি,গাড়ি, অফিস সবকিছু হয়েছে আল্লাহর রহমতে। আমি সারাজীবন এনাজের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিলেও ওর ঋণ শোধ হবে না।

আমি বিস্মিত চোখে মুরাদ আঙ্কেলের দিকে তাকিয়ে আছি। একটা মানুষ কতটা ভালো হলে এতকিছু করতে পারে।আর আমি এই লোকটার বিষয়ে না জেনে কত আজেবাজে কথা বলেছি।সেটা মনে হতেই নিজেকে ছোট মনে হলো।তায়াং ভাইয়ার মোবাইলে একটা কল আসতেই সে অন্যদিকে চলে গেল।তখুনি জুলেখা আন্টি ও মুসকান ট্রে ভর্তি করে আরো একগাদা খাবার নিয়ে হাজির।

জুলেখাঃ এ মা, তুই দেখি কিছু মুখে দিসনি বড় বউ?না খেয়ে, খেয়ে চেহারার কি হাল করেছিস দেখছিস?আমার ছেলেটার জন্য চিন্তা করতে করতে শরীরের বারোটা বাজিয়ে ফেলেছিস।এখন একটু নিজের যত্ন নে।স্বামী তো চলে এসেছে।তাহলে আর কিসের চিন্তা।শোন,আজ কিন্তু দুপুরে না খেয়ে কিছুতেই যেতে পারবি না।

মুরাদঃ হ্যাঁ,একদম ঠিক কথা।দুপুরে না খেয়ে বাসা থেকে যেতে পারবে না।

মুসকানঃ ভাবী,এতদিন পর তোমাকে পেয়েছি। এত সহজে যেতে দিবো তা ভাবলে কি করে?(কানের কাছে এসে নিচুস্বরে)তোমাকে তো রাখবোই সাথে তোমার ঐ হ্যান্ডসাম ভাইকেও রাখবো।

আমিঃ নজর দিয়ে লাভ নেই ননদি।আমার ভাই বহু আগের থেকে আমার মামাতো বোন নূরের ওপর ফিদা হয়ে আছে।এরা একে অপরকে ভীষণ ভালোবাসে। এখন শুধু বিয়ের অপেক্ষা। (নিচু স্বরে)

নিচুস্বরে ওকে কথাগুলো বলতেই মুসকান চোখ দুটোকে রসগোল্লা বানিয়ে বুকের বা পাশে হাত দিয়ে দুষ্টামীর ভঙ্গিতে বললো।

মুসকানঃ দিল টুট গ্যায়া💔।কোথায় ভাবলাম তোমার এই হ্যান্ডসাম ভাইয়ের সাথে লাইন মারবো। তা আর হলো না। এই কষ্ট আমি কোথায় রাখি?

মুসকানের কথা বলার ভঙ্গিতে আমি ফিক করে হেসে উঠলাম।মুসকানও আমার সাথে যোগ দিলো।তখুনি আমার দুই নাম্বার শ্বাশুড়ি মা (জুলেখা আন্টি আরকি)চোখ গোল গোল করে বললো।

জুলেখাঃ ভাবী,ননদ কি ফুসুরফুসুর করছিস?

মুসকানঃ তোমাকে কেন বলবো? এটা আমাদের সিক্রেট।

মুরাদঃ বউমা,আমি যতদূর তাজ মানে এনাজের মুখ থেকে শুনেছিলাম তুমি ছয় মাসের প্রেগন্যান্ট ছিলে আড়াই বছর আগে। সেই বাচ্চা কোথায় তাহলে?

আমি মুরাদ আঙ্কেলের মুখে এই কথাটা শুনে ভীষণ অবাক হলাম।তাহলে কি আরিয়ান তাদের কে নাভানের বিষয় কিছু বলেনি।কে জানে বলেছে কিনা।নিশ্চয়ই বলেনি।বললে তো জিজ্ঞেস করতো দাদুভাই কে নিয়ে আসোনি কেন?আমি দুই হাত কচলে আমতাআমতা করে বললাম।

আমিঃ আসলে আঙ্কেল হয়েছে কি, আমার একটা…….

আমি নাভানের কথা বলার আগেই তায়াং ভাইয়া হন্তদন্ত হয়ে বাগানের ওপর পাশ থেকে এসে বললো।

তায়াংঃ নোভা,জলদী চল তো।আমাদের এখুনি বের হতে হবে।আমার একটা আর্জেন্ট কাজ পরে গেছে।

আমিঃ কি হয়েছে ভাইয়া? তোকে এত নার্ভাস লাগছে কেন? সবকিছু ঠিক আছে তো।কে কল করেছিলো তোকে?

তায়াংঃ তোকে যেতে যেতে সব বলবো এখন চল।

জুলেখাঃ সে কি কথা!!! দুপুরের খাবার না খেয়ে তোমরা দুজন কোথাও যেতে পারবে না।

মুরাদঃ এতদিন পর আমাদের বাড়িতে এলে।কিছু না খেয়েই চলে যাবে।এটা কি ভালো দেখায়?

তায়াংঃ সরি আন্টি,আঙ্কেল।আমাকে এখুনি যেতে হবে। আর নোভাকে আমি বাসায় পৌঁছে দিবো।

মুসকানঃ ভাবী তুমি না হয় থাকো।বিকালে চলে যাবে।

আমিঃ না গো। এখন নয়।( মুসকানের কানের কাছে মুখ নিয়ে)তোমার ভাইয়ের সাথে সবকিছু স্বাভাবিক হোক তারপর আসবো।ব্যাটাকে আচ্ছা করে শাস্তি দিতে হবে তো।আমার থেকে যাতে আর কখনো দূরে না থাকে।

আমার কথা শুনে মুসকান খিলখিল করে হেসে উঠলো। তায়াং ভাইয়া তাড়া দিতে শুরু করলো আমায়।আমিও সবার থেকে বিদায় নিয়ে তায়াং ভাইয়ার বাইকে উঠে বসলাম।আমাদের কে বিদায় জানাতে তারা তিনজন একসাথে গেইট অব্দি এলো।

জুলেখাঃ টেবিলে থাকা একটা খাবারও কেউ ধরিসনি।দুপুরে খেয়ে গেলে খুব খুশি হতাম।কি এমন হতো গরীবের ঘরে একবেলা খেয়ে গেলে।

আন্টি ছোট বাচ্চাদের মতো আমাদের কে অনুরোধ করলো।আমি মুচকি হেসে তাকে বললাম।

আমিঃ আরেকদিন এসে টানা ৭ দিন বেড়াবো।তখন ইচ্ছে মতো জ্বালিয়ে যাবো।যাতে বুঝতে পারেন কাদের কে বাসায় দাওয়াত করেছেন।

মুসকানঃ না আসলেই চলে। সোজা রিয়েকশন নিবো তখন।

মুরাদঃ দুপুরে একসাথে খেয়ে গেলে সত্যি খুশি হতাম।

তায়াংঃ মন খারাপ করবেন না আপনারা।সত্যি আরেকদিন এসে সারাদিন বেড়াবো।

জুলেখাঃ না আসলে পিঠের ছাল তুলবো বলে দিলাম।

তায়াংঃ আচ্ছা, কোন সমস্যা নেই।

আমিঃ আল্লাহ হাফেজ আঙ্কেল, আন্টি।আল্লাহ হাফেজ ননদী।আপনারা নিজেদের খেয়াল রাখবেন।

মুরাদঃ সাবধানে যেও।

তায়াং ভাইয়া বাইক স্টার্ট দিলো।আমি ওর কাঁধে এক হাত রেখে আরেক হাত নাড়িয়ে সবাইকে বিদায় জানালাম।মাত্র ঘন্টাখানিকের পরিচয়। অথচ তাদের ব্যবহার দেখে মনে হচ্ছিল না জানি কত বছরের চেনা পরিচিত আমরা।অনেক ভালো মন-মানসিকতা তাদের। যা আমাকে সত্যি মুগ্ধ করলো।কিন্তু তায়াং ভাইয়ার হঠাৎ কি হলো তা বুঝলাম না। কে কল করেছিলো তাকে?আর আর্জেন্ট কাজটাই বা কি?

#চলবে

তায়াং প্রেমীরা আজ অনেক বড় ছ্যাকা খেল।যারা ছ্যাকা খেয়েছেন তাদেরকে জানাই এক বালতি সমবেদনা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here