প্রজাপতির_রং🦋 Part_33

0
206

প্রজাপতির_রং🦋
Part_33
#Writer_NOVA

এক দিন পর…….

পড়ন্ত বিকেলের মিষ্টি আলোয় আলোকিত এই ব্যস্ত শহর ঢাকা।দুপুরের দিকটা একটু নিরিবিলি থাকলে বিকেল নামলেই শুরু হয় মানুষের আনাগোনা।রিকশা, ভ্যানের টুংটাং আওয়াজে নীরব পরিবেশটা ভারী হয়ে যায়।শুরু হয় কর্মমুখর মানুষের ঘরে ফেরার পালা।সন্ধ্যার আগেই নিজ নিজ নীড়ে ফেরার জন্য চলে এক অদম্য উচ্ছাস। সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে একটু স্বস্তির জন্য পাল্লা ধরে চলে মানুষ। কে আগে ফিরতে পারবে নিজে নিজ স্বস্তির জায়গায়।সবকিছু নিয়ম মাফিক চলে।বারান্দায় দাঁড়িয়ে সেই ব্যস্তমুখর শহরটাকে দেখতে ব্যস্ত আমি।কিছু সময় পর সামনের ছোট রোড দিয়ে চলাচল করছে রিকশা,ভ্যান কিংবা মোটরসাইকেল। তাদের যান্ত্রিক শব্দে বিরক্ত আমি।এখন খুব করে কাছে টানছে শহর থেকে দূরে কোন নিরিবিলি পরিবেশ উপভোগ করতে।যেখানে থাকবে না কোন যানবাহনের শব্দ কিংবা এই ব্যস্ত নগরী।সেখানে থাকবে সবুজ গাছ-গাছালিতে পরিপূর্ণ। গাছে গাছে দোয়েল তার লেজ উঁচিয়ে মিষ্টি সুরে গান গাইবে।এক ডালে বসে দুটো শালিক ঝগড়া বাঁধিয়ে দিবে।দূর থেকে ভেসে আসবে ফিঙে পাখির ডাক।কিন্তু এগুলো এখন কল্পনায় মানাবে। সেটা ভেবে বিশাল বড় একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে আকাশের দিকে তাকালাম।নিজেকে আজ বড্ড বেশি একা লাগছে।

আজ অফিস কিংবা রেডিও স্টেশন কোথাও যাইনি।মনটা ভীষণ খারাপ।সেদিন এনাজ এতগুলো কথা শোনানোর পর থেকে নিজের ওপর একটু বেশি অপরাধবোধ কাজ করছে।মোবাইল হাতে নিয়ে কতবার যে এনাজের নাম্বারে ডায়াল করতে চেয়েছি।কিন্তু জড়তার কারণে পারিনি।কোথায় যেনো একটা বাঁধা পাই।হয়তো এতদিন পর হওয়ায় অনেক বেশি জড়তা কাজ করছে।এনাজও আমায় কল করেনি।হয়তো আমার ওপর অভিমান কাজ করছে ওর। নাভান,হিমি ও এরিনের সাথে আছে। মনের আকাশটা আজ বিষন্ন। কিন্তু বাইরের আকাশটা কি চকচকে!
কাঁধে কারো হাতের স্পর্শে ঘোর কাটে।তাকিয়ে দেখি এরিন দাঁড়িয়ে আছে।

এরিনঃ কি হয়েছে তোর? গত পরশু বাসায় ফেরার পর থেকে তোকে অনেক মনমরা লাগছে।তোকে তো কখনো এতটা আপসেট থাকতে দেখিনি।

আমিঃ আমার আবার কি হবে?আমি ঠিক আছি।তোরা শুধু শুধু টেনশন করিস।

এরিনঃ আমার চোখের দিকে তাকা নোভা।মিথ্যে কেন বলছিস?

আমিঃ আরে ধূর।কিছু হয়নি বাদ দে তো।হিমি কোথায়?

এরিনঃ ওর বয়ফ্রেন্ড রাজের সাথে ঝগড়া করে।এদের দুইদিন পর কি হয় আল্লাহ জানে! দুটো দিন যেতে দেরী হয় কিন্তু ঝগড়া করতে দেরী হয় না।ওদের এই রিলেশনটাকে না আমার রিলেশনই মনে হয় না।মনে হয় ঝগড়া কমিটির হেড অফিস।

আমিঃ ওদের কথা ছাড়।তোর বিয়ের খবর কি তাই বল? বিয়ের জল কতদূর গড়ালো।

এরিনঃ সেটা নির্ভর করছে তোর আর এনাজ ভাইয়ের ওপর।(কিছু সময় থেমে চাপা স্বরে বললো)তুই সত্যি আমাদের ফ্রেন্ড মনে করিস না, নোভা।

আমিঃ এমন কথা কেন বলছিস? (চমকে)

এরিনঃ এতবড় বিষয়গুলো আমাদের থেকে লুকিয়েছিস।আমরা কেন আরিয়ানের থেকে জানলাম? তুই তো সবকিছু বলতে পারতি।তোকে কিডন্যাপ করে পর্যন্ত নিয়ে গেলো।তার একবিন্দু কোনকিছু জানি নাআমরা।একবার ভেবেছিস ঠিক সময় তায়াং ভাইয়া, এনাজ ভাইয়া না গিয়ে বাঁচিয়ে আনতো তাহলে তোর কি হতো তোর কোন আইডিয়া আছে তোর? একবার নাভানের কথাও ভাবলি না।

আমিঃ আমি মরে গেলে নাভানকে তোরা লালন-পালন করে বড় করতি।(মুচকি হেসে)

এরিনঃ একটা চড় মারবো ফাজিল মেয়ে। আবার দাঁত বের করিস।সবসময় সবকিছুকে মজা ভেবে উড়িয়ে দিস।

সেদিন বাসায় আসার পর এরিন, হিমি কোনকিছু জিজ্ঞেস না করায় আমি বেশ অবাক হলাম।পরে জানতে পারলাম একদম প্রথম থেকে সবকিছু ওদেরকে আরিয়ান খুলে বলেছে।এর জন্য অনেক টেনশনে ছিলো।এনাজের কথাও সব বলেছে।এনাজ কি করে বেঁচে গেলো,কোথায় ছিলো এতদিন সবই বলেছে।এতে হিমি,এরিন প্রথম প্রথম খুব রাগ করেছিলো।পুরো একটা দিন লেগেছে ওদের রাগ ভাঙাতে।আসার পর থেকে নাভান আমার থেকে সরেনি।কোলের মধ্যে ঘাপটি মেরে ছিলো।চোখও হারায়নি।ভেবেছে আবার যদি দূরে চলে যায়।

এরিনঃ নোভা!!!

আমিঃ হুম বল।

এরিনঃ একটা কথা বলবো।যদি তুই কিছু মনে না করিস।আসলে কথাটা সম্পূর্ণ তোর ব্যক্তিগত বিষয়ে।তাই অনুমতি চাইছি।

🦋🦋🦋

আমি চোখ দুটো ছোট ছোট করে এরিনের দিকে উৎসুক চোখে তাকালাম।কি এমন কথা বলবে এরিন?অবশ্যই সেদিনের ঘটনা সব বিস্তারিত আমি বলে দিয়েছি ওদের। এনাজের রাগারাগি করা, আমাকে থাপ্পড় মারা কোনকিছু লুকায়নি ওদের থেকে।কিন্তু এখন এরিনকে কুচোমুচো করতে দেখে আমি চিন্তায় পরে গেলাম।এরিন আসলে বলবেটা কি?

এরিনঃ আরে এত ভাবিস না।তেমন কিছু না।যদি তুই অনুমতি দিস তাহলেই বলবো।

আমিঃ হুম বল।

এরিনঃ দেখ, যত অভিমান সেটা শুধু তোর আর তাজ ভাইয়া আই মিন এনাজ ভাইয়ার মধ্যে। সেটা তোদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখ।মাঝ থেকে বাচ্চা ছেলেটাকে কষ্ট দিচ্ছিস কেন বল তো? তোর কথা মতো আমি যা বুঝলাম। তা হলো, এনাজ ভাইয়া জানেই না নাভান কে? তার মানে সে এটাও জানে না যে তার একটা ছেলে আছে। তাহলে তুই কেন বলছিস না তাকে? নাভানের থেকে কেন ওর বাবাকে দূরে রেখেছিস।ওকে ওর বাবার অধিকার থেকে কেন বঞ্চিত করছিস? তোদের মনমালিন্যের প্রভাব কেন নাভানের ওপর পরছে? এই ছোট বাচ্চাটাও তো বাবার অভাবে অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে। বাবা থাকতেও কেন ও শূন্যতায় ভুগবে? এতটুকু বয়সে ও কি বুঝে আমি জানি না। তবে আমি দেখেছি, কোন বাচ্চার বাবা ওর সামনে বাচ্চাকে আদর করলে করুন চোখে তা খেয়াল করে।তারপর ওর মুখটা মলিন হয়ে যায়।তোদের সম্পর্কের ভুক্তভোগী কেন এই ছোট বাচ্চাটা হবে আমাকে একটু বলবি? ওর কি দোষ বল? তোদের মধ্যে ওকে কেন টানছিস? কেন ওর কথা তুই এনাজ ভাইয়াকে বলছিস না।বলে দে না রে।আর কত অভিমান নিয়ে থাকবি?এত শক্ত হোস না যাতে নিজের আপন মানুষগুলো কে হারিয়ে ফেলিস।বাচ্চাটাকে আর কষ্ট দিস না।ওর মুখের দিকে তাকিয়ে এবার না হয় মাফ করে দে।এটাই শেষবার।বাচ্চা ছেলেটাকে তার বাবার স্নেহ থেকে দূরে রাখিস না।অনেক তো হলো।এবার না হয় থেমে যা।

আমি মলিন মুখে এরিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম।কি উত্তর দিবো তা আমার জানা নেই। কারণ আমি নিজ চোখেও দেখেছি যে পাশের ফ্ল্যাটের বাচ্চা ছেলেটার বাবা যখন তার ছেলেটাকে আদর করে,তখন নাভান এক ধ্যানে সেদিকে তাকিয়ে থাকে।ওর প্রতি আমি সত্যি কি অন্যায় করে ফেলছি?? হিমি, নাভানকে কোলে নিয়ে আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। সম্ভবত ও এরিনের সব কথাই শুনেছে। নাভান আমার দিকে তার ছোট ছোট হাত দুটো বাড়িয়ে দিলো।আমি রোবটের মতো করে ওকে কোলে নিয়ে নিলাম।

হিমিঃ তোর জীবন, তোর ইচ্ছামতো চলবি।কিন্তু কখনও এমন কাজ করিস না যার জন্য পরবর্তীতে পস্তাতে হয়।ছেলেটার কথাও চিন্তা করিস। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু কিছু জিনিস মেনে নিতে না চাইলেও মেনে নিস।ওর সাথে কোন অন্যায় করিস না।তোদের সম্পর্ক টানাপোড়েনের প্রভাব ওর ওপর পরতে দিস না।এতে ছেলেটা সুস্থ মন-মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠতে পারবে না। ওর জন্য হলেও নতুন করে সব গুছিয়ে নে।আমার বিশ্বাস তোরা তিনজনই তাতে ভালো থাকবি।আমার বলার দরকার আমি বললাম।বাকিটা তোর ইচ্ছা।

এরিন,হিমি দুজন ওদের রুমে চলে গেল।আমি নাভানকে শক্ত করে আমার সাথে ধরে শূন্য দৃষ্টিতে নজর দিলাম।আমি বুঝে গেছি কি করতে হবে আমায়।আমি চাই না আমার বাচ্চাটা আর কষ্ট পাক।ওর জন্য হলেও আমার সবকিছু স্বাভাবিক করতে হবে।হ্যাঁ,আমাকে করতেই হবে।এসব কিছুর প্রভাব ওর ওপর আর পরতে দিবো না আমি।

🦋🦋🦋

সন্ধ্যা শেষে রাত নেমেছে বহু আগে।রাতের খাবার খেয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়েছি।আজকাল বারান্দায় বেশি ভালো লাগে।নাভান আজ একটু তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে গেছে। বাইরে হালকা ঠান্ডা বাতাস বইছে। বেশ ভালোই লাগছে।দূরের টং দোকানটা এখনো খোলা। সেখনো অনেকগুলো লোক বসে আছে। হয়তো খোশগল্পে মেতে আছে। এদের বাড়ি ফেরার কোন তাড়া নেই। আকাশে আজ বিশাল থালার মতো চাঁদ উঠেছে। তার সাথে জ্বলছে মিটিমিটি তারা।সেদিকে তাকিয়ে আনমনে হেসে উঠলাম।তবে ভাবনার মধ্যে ব্যাঘাত ঘটলো মোবাইল রিংটোন। উঠে গিয়ে টেবিল থেকে মোবাইলটা আনতে ঢেঢ় আলসেমী লাগছে।রিং বাজতে বাজতে অফ হয়ে গেলো।তাই গিয়ে আর আনলাম না।আবার আকাশ দেখায় মনোযোগ দিতে চাইলাম।কিন্তু আবারো ব্যাঘাত ঘটালো অসহ্যকর মোবাইলটা।একঘেয়ে সুরে বেজে উঠলো। আগত্যা ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও উঠতে হলো।মোবাইল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। আননোন নাম্বারে কল দেখে রিসিভ করবো কি করবো না তাই নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দে ভুগছি।হুট করে রিসিভ করেই ফেললাম।ওপাশ থেকে কারো কোন শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না।আমি হ্যালো বলতেই আপরপাশ থেকে শান্ত ভঙ্গিতে সে বলে উঠলো।

—-গেইটের কাছে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছি।জলদী চলে এসো।তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে। তোমার সময় মাত্র পাঁচ মিনিট। এর থেকে বেশি দেরী হলে আমি নিজে এসে কোলে করে নিয়ে যাবো।কথাটা মাথায় রেখো।ইউর টাইম ইজ স্টার্ট নাউ।

টুট টুট করে কলটা কেটে গেল।অপরপাশের লোকটা এনাজ ছাড়া অন্য কেউ নয়।এত রাতে আমাদের বাসার সামনে কি করছে?আর তার এটা কি হুমকি ছিলো নাকি স্বাভাবিক কথা ছিলো আমি জানি না।তবে একে দিয়ে বিশ্বাস নেই। যদি উপরে চলে আসে তাহলে সত্যি কোলে করে নিয়ে যাবে।এরিনদের রুমে উঁকি দিয়ে দেখলাম দুজনেই বাতি বন্ধ করে মোবাইল চালাচ্ছে। আমি পা টিপে টিপে দরজা খুলে বের হয়ে গেলাম।যাওয়ার আগে দরজার ছিটকিনিটা বাইরে থেকে লাগিয়ে দিলাম।দালানের সদর দরজায় এসে অবাক হলাম।অন্য সময় দরজা বন্ধ থাকে।কিন্তু আজ খোলা।বেশি কিছু না ভেবে বাইরে চলে এলাম। এসে দেখি এনাজ গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখে কিছুটা আৎকে উঠলাম। মানুষটাকে পুরো বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। আমার দিকে করুন চোখে তাকালো।সেই চোখের দিকে তাকিয়ে আমার নিজেরই অপরাধী মনে হচ্ছিলো।

আমিঃ এত রাতে এখানে কি করছেন?

এনাজঃ তোমাকে আমার কিছু বলার ছিলো।

আমিঃ জলদী বলুন।আমি এখানে বেশি সময় দাঁড়াতে পারবো না।কেউ দেখে ফেললে তিলকে তাল করে আমার নামে কুৎসা রটাবে।

এনাজঃ ভয় পেয়ো না। তোমাদের বাড়িওয়ালা জানে আমি তোমার হাসবেন্ড। আমি তাকে সবকিছু খুলে বলেছি।কেউ তোমার নামে নালিশ করলেও খাটবে না।কারণ বাড়িওয়ালা সবকিছু জানে।

আমিঃ হু বুঝলাম। কি বলবেন জলদী বলুন।

এনাজ হুট করে এসে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁধে মুখ গুঁজে দিলো।ঘটনার আকস্মিকতায় কিছুটা চমকে গেলেও নড়লাম না।মিনিট খানিক পর কাঁধে ঠান্ডা কিছুর পরশ পেতেই বুঝলাম সে কাঁদছে।কিন্তু কেন তা খুঁজে পেলাম না।

#চলবে

আজকের পর্ব ছোট হয়ে গেছে আমি জানি।যদি বোনাস পার্ট চান তাহলে গঠনমূলক মন্তব্য করেন।আরেক পর্ব দিয়ে পুষিয়ে দিবো।আগামী পর্বে বাবা-ছেলের দেখা হবে🥳🥳। রাত ১০ টার আরেক পর্ব পাবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here