বিবর্ণ-২য় পর্ব

0
187

বিবর্ণ-২য় পর্ব
#লেখনীতে_শাহরিয়ার

রুমের দরজা লাগিয়ে ড্রীমলাইট জ্বালিয়ে দিয়ে সোজা ওয়াশ রুমে ঢুকে ওযু করে বের হয়ে আসলাম। সত্যি সত্যি ছেলেটার কথা মত আমি নামাজে বসে পরলাম। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার উদ্দেশ্যে। কিছু সময় আগে যে পাপ করতে যাচ্ছিলাম, সেই পাপের ক্ষমা চাওয়ার জন্য সেজদায় লুটিয়ে পরলাম।

সারা রাত ঘুম না হলেও ফজরের নামাজের পর ঠিকই ঘুম আসলো। বেশ ভালো ঘুম হলো। দীর্ঘদিন ঠিকমত রাতে ঘুমাতে পারিনি। বিছানায় শুয়ে শুয়ে শুধু ছটফট করেছি। তবে আজ তেমন কিছু হয়নি। বেশ ভালোই ঘুমিয়ে উঠেছি আর দারুণ ফ্রেশ ফ্রেশ লাগছে। বিছানা ছেড়ে ফ্রেশ হয়ে রান্না ঘরের দিকে ছুটে গেলাম। মা তখন দুপুরে খাওয়ার জন্য রান্না বসিয়েছে। আমি মায়ের পাশে যেয়ে বসে টুকটাক কাজে হাত লাগাচ্ছি আর একটু একটু করে কথা বলছি। মা ও আমার সাথে কথা বলছে, মা একটু পর পর শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখের ঘাম মুছছে আর রান্নার কাজ করছে।

মায়েরা সত্যিই খুব কষ্ট করে। কতই না ত্যাগ করে, যদি আমি গতরাতে মারা যেতাম তবে কি মায়ের মুখটা আমি আর দেখতে পেতাম? এই যে বাবা সকাল বেলা নাস্তা করেই অফিসে চলে গেছে কার জন্য গিয়েছে? নিশ্চই আমাদের জন্যই গিয়েছে। তারা শাষণ করে ঠিকই। তবে আমাদের ভালোর জন্যই করেন। প্রতিটা বাবা মা তাদের সন্তানদের অনেক ভালোবাসেন, শুধু আমরা ঠিকমত বুঝতে পারি না বলে।

মা: এখান থেকে উঠে যেয়ে নাস্তা করে নে, এখানে খুব গরম।

মা তুমিও বের হয়ে একটু ফ্যানের নিচ থেকে রেস্ট নিয়ে তারপর না হয় আবার আসো।

মা: না একবারে যাবো, বার বার গেলে আসলে রান্না আর শেষ হবে না। তাছাড়া ঠাণ্ডাও লেগে যাবে। তুই যা যেয়ে নাস্তা করে নে।

মায়ের চোখের দিকে মুখের দিকে তাকালাম। আজ কেন জানি বড্ড মমতাময়ী মনে হচ্ছে মাকে। আমি আস্তে করে রান্না ঘর থেকে বের হয়ে ডাইনিং এ চলে আসলাম। মুখে খাবার তুলতে যাবো ঠিক তখনি গতরাতের সেই ছেলেটার কথা মনে পরে গেলো। ছেলেটা আমাকে না বাঁচালে আজকের এতো সুন্দর সকালটা আমার দেখা হতো না। ছেলেটাকে একটা ধন্যবাদ দেয়া উচিৎ ছিলো। কিন্তু উনার বাড়ি কোথায় আর হুটকরে কোথায় থেকে এসেছিলো তার কিছুই আমিতো জানি না। ছেলেটার সাথে দেখা করা খুব দরকার।

দুপুরের একটু আগে আগে গোসল করে ভেজা চুল গুলো রোদ্দে শুকাতে সিঁড়ি ধরে উপরের দিকে ছাদে উঠতে শুরু করলাম। ভেজা কাপড় গুলো মেলে দিয়ে যখন খোলা চুল গুলো শুকানোর জন্য তোয়ালে দিয়ে জারা দিচ্ছিলাম। ঠিক তখনি পাশের ছাদ থেকে সেই অপরিচিত কণ্ঠ স্বর বলে উঠলো। সব কিছু ঠিক ঠিক আছেতো? নাকি আজ ছাদে এসেছেন লাফ দেয়ার জন্য।

আমি সেদিকে ঘুরে রাতের সেই ছেলেটিকে দেখে বেশ অবাক হয়েই প্রশ্ন করলাম আপনি এখানে কেন?

আমি এখানেই থাকি মানে এই বাসাতেই ভাড়া এসেছি, আমি জাহাঙ্গীর আর আপনি?

আমি রত্না কিন্তু আপনাকে আগেতো এ বাড়িতে কখনো দেখিনি।

জাহাঙ্গীর: তিন মাস হলো এই বাড়িতে এসেছি।

এই গরমে ছাদে কি করছেন?

জাহাঙ্গীর: কবুতরকে খাবার দিচ্ছি। কিন্তু আপনি কেন এসেছেন? গতরাতে যা করতে চেয়েছিলেন তার জন্য আসেননিতো?

না না তার জন্য আসিনি। আর হ্যাঁ আপনাকে ধন্যবাদ গত রাতের জন্য।

জাহাঙ্গীর: ঠিক আছে ধন্যবাদ দেবার দরকার নেই। কিন্তু আপনি যা করতে চেয়েছিলেন তা ঠিক না।

আমি সব জানি সব বুঝি কিন্তু, পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে আমার সামনে আর কোন উপায় নেই।

জাহাঙ্গীর: মানুষের সামনে যদি বিপদ থাকে তখন আল্লাহকে স্বরণ করতে হয়। সব দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও বান্দার জন্য আল্লাহর দরজা সব সময় খোলা থাকে। আশা করি আল্লাহ আপনার সকল সমস্যার সমাধান করে দিবে। আর হ্যাঁ সময় মত নামাজ পড়ে নিবেন। দেখবেন আস্তে আস্তে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে ইনশা আল্লাহ।

আমার সমস্যার আর কোন সমাধান নেই।

জাহাঙ্গীর: আল্লাহ সকল সমস্যার সমাধান রেখেছেন। নিশ্চই আল্লাহ আপনার সমস্যা গুলোর ও সমাধান করে দিবেন।

কথা বলতে বলতে মসজিদ থেকে আজানেন সুর ভেসে আসলো। আজ শুকবার পবিত্র জুম্মার দিন। জাহাঙ্গীর কবুতরকে খাবার দেয়া বন্ধ করে দিয়ে এসে রেলিং ধরে দাঁড়ালো।

জাহাঙ্গীর: তাহলে এখনকার মত থাকুন পরে আবার দেখা হবে। আর হ্যাঁ অবশ্যই নামাজ পরবেন। দেখবেন সকল দুচিন্তার সমাধান হয়ে যাবে। আর হ্যাঁ চেষ্টা করবেন পরিবারের মানুষ গুলোর সাথে মিলেমিশে থাকার জন্য। হয়তো আমাদের আবার দেখা হয় যাবে হুট করে যে কোন সময়।

কথা গুলো বলে জাহাঙ্গীর নিজের মত হেঁটে চলে গেলো। আমি শুধু ওর চলে যাওয়া পথের দিকে চেয়ে রইলাম। ছেলেটার কথায় প্রচণ্ড মায়া রয়েছে, রয়েছে অনেক বিশ্বাস। যেখানে সবাই আমাকে নানান রবম বাজে কথা বলে জীবনটা বিষিয়ে তুলেছে। সেখানে এই ছেলেটা আমাকে নতুন করে পথ চলার কিংবা বেঁচে থাকার উৎসাহ যোগাচ্ছে।
হয়তো সে আমার সম্পর্কে জানে না। জানলে হয়তো সেও আমার সাথে এমন করে কথা বলতো না। হয়তো অন্য মানুষদের মত আমাকে এড়িয়ে চলতো। কথা গুলো ভাবতে ভাবতে ঐ পাশের ছাদে থাকা কবুতর গুলোর দিকে তাকালাম। তারা নিজেদের মত করে খাবার খাচ্ছে আর বাকবাকুম বাকবাকুম করে নেচে গেয়ে চলেছে। মাঝে মাঝে একটু দূরে উড়ে গিয়ে বসছে। আবার ছুটে এসে সবার সাথে খাবার খাচ্ছে। কত সুন্দর সুশৃঙ্খল ভাবে এতো এত কবুতর এক সাথে থাকছে খেলছে। আর আমরাতো মাত্র দু’জন মানুষ ছিলাম তবুও এক সাথে সারাটা জীবন কাটাতে পারলাম না।

নানান রকম চিন্তা ভাবনা করতে করতে ছাদ থেকে নিচে নেমে আসলাম। দরজার সমানে এসে দাঁড়াতেই বাবা দরজা খোলে বের হলো মসজিদে যাবার জন্য। আমাকে দেখে দাঁড়িয়ে মাথার কাছে মুখ নিয়ে এসে হয়তো কোন সুরা পড়ে ফুঁক দিয়ে মসজিদের পথে হাঁটা শুরু করলো। ঘরের ভিতর ঢুকতেই ছোট ভাইকে দেখলাম পাঞ্জাবী পরে রেডি হয়েছে মসজিদে যাবে বলে। রুমন দরজার দিকে এগিয়ে আসতেই আমি আগের মত বায়না ধরে বললাম ভাই মসজিদ থেকে আমার জন্য জিলাপি নিয়ে আছিস। রুমন আমার দিকে ঘুরে মুচকি হাসি দিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেলো।

গত রাতের পর থেকে সত্যিই সব কিছু কেমন অন্য রকম মনে হচ্ছে আমার কাছে। ছেলেটার মাঝে সত্যিই কিছু একটা রয়েছে। তার কথায় সত্যিই অনেক মায়া রয়েছে। নিজের রুমে এসে বসে বসে যখন কথা গুলো ভাবছিলাম তখন ছোট ভাই নামাজ পড়ে এসে দরজায় নক করতেই আমি বিছানা ছেড়ে দরজার কাছে চলে আসতেই রুমন আমার দিকে জিলাপির ব্যাগটা এগিয়ে দিয়ে নে তোর যত খুশি খেতে ইচ্ছে করে খেয়ে নে। আমি হাত বাড়িয়ে ব্যাগটা নিয়ে কতদিন পর তুই আমার জন্য জিলাপি নিয়ে আসলি।

রুমন: তুইতো এখন আর খেতে চাস না তাই আনা হয়না।

কথাটা বলেই আবার হাঁটা শুরু করলো নিজের রুমের দিকে। আমি জিলাপির প্যাকেট টেবিলের উপর রেখে ওয়াশ রুমে যেয়ে ওযু করে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলাম। নামাজ শেষে মোনাজাতে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলাম বার বার গত রাতের এমন ঘটনার জন্য। আমার কাঁধে যে শয়তান ভর করেছিলো তার হাত থেকে রক্ষার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলাম। কেননা আমার কাছে মনে হচ্ছে সত্যিই জীবন অনেক সুন্দর। এতো সুন্দর পৃথিবীটা ছেড়ে চলে যাবো এতো তাড়াতাড়ি কেন? আমারতো এখনো যাবার সময় হয়নি।

নামাজ শেষে ডাইনিং এ এসে সকলে এক সাথে দুপুরের খাবার খেতে বসলাম। মা সবার প্লেটে খাবার বেড়ে দিচ্ছে। বাবার প্লেটে মাছের মাথাটা তুলে দিতেই বাবা মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো ঐটা রত্নাকে তুলে দে ওর মাছের মাথা খুব পছন্দ।
বাবার কথায় আমার চোখ দু’টো ভিজে উঠলো। খাবার মুখে উঠছে না টপটপ করে চোখ বেয়ে পানি পরতে শুরু করলো। কিছু মুহুর্তে নিজের চোখের পানি সামলানো খুবি কষ্ট কর। এই মুহুর্তে শত চেষ্টার পরেও আমি আমার চোখের পানি সামলাতে পারছি না। যদি গতরাতে আমি মারা যেতাম তবে আজকে সবার সাথে বসে আমি খেতে পারতাম না। বাবার যে ভালোবাসা আমার প্রতি এখনো সেই আগের মতই রয়েছে তা আমি না জেনেই ঐপারে চলে যেতাম।

বাবা: কান্না করিস না মা। জীবন খুব কঠিন, আমাদের প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করেই টিকে থাকতে হয়। সব ভুলে আবার নতুন করে শুরু কর। দেখবি তুই ঠিকই পেরে উঠবি।

আমি দু’হাতে চোখের পানি মুছে নিয়ে সবার সাথে খেয়ে নিলাম। রুমন আর বাবা খাওয়া শেষ করে উঠে চলে গেলো। আমি আর মা সব কিছু গুছাতে শুরু করলাম।

মা: জানিস তোর বাবা তোকে নিয়ে খুব চিন্তা করে। কেন যে এমন হলো। আল্লাহর কাছে আমরা কি পাপ করেছিলাম জানি না। যার শাস্তি তুই পাচ্ছিস।

মা চিন্তা করো না। নিশ্চই আল্লাহ দুঃখের পর সুখ রেখেছেন। একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।

মা: তাই জেনো হয়।

মায়ের চোখের কোনে পানি এসে জমা হয়েছে। আমি মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। বুকের ভিতরটা কেমন জানি হাল্কা হাল্কা অনুভুত হচ্ছে। মনে হচ্ছে বুকের উপর থাকা একটা পাথর সরে গেছে।

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here